সেই একই বিদেশীদের তৎপরতা সম্প্রতি আবারও জোরদার হতে শুরু করেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ও বর্তমান দুরবস্খার জন্য যাদের সঠিকভাবেই দায়ী করা হয়। ভেতরে ভেতরে বিদেশীরা অবশ্য সব সময়ই তৎপর থেকেছে। কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন করে তারা এখন প্রকাশ্যেও তৎপরতা চালাচ্ছে। পরিবর্তিত কৌশলের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে তাদের যাতায়াত বাড়ছে দিন দিন। সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা সম্পর্কে খোঁজ-খবর করতে এবং দিকনির্দেশনা দিতে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঘুরে গেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক প্রধান উপ-সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড ক্যাম্প। পদমর্যাদায় তেমন উচ্চ পর্যায়ের না হলেও প্রধান উপদেষ্টা থেকে সেনাপ্রধান পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যেকে তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তার সম্মানে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আয়োজিত নৈশ ভোজে রাজনীতিকদের মহাসমাবেশ ঘটেছিল। ডোনাল্ড ক্যাম্পও সবাইকে ‘ধন্য' করে গেছেন। প্রতিটি উপলক্ষেই তিনি ২০০৮ সালের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার এবং গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা তুলে দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন। তার এ তাগিদের মধ্যে নির্দেশের সুরও অস্পষ্ট ছিল না।
ডোনাল্ড ক্যাম্পেরও আগে ২২ জানুয়ারি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ২১ জন সদস্য এক বিবৃতিতে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়েছেন। এই বিবৃতির ধারাবাহিকতায় ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এসেছিলেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ১০ জন সদস্য। পরদিন, ৭ ফেব্রুয়ারি এসেছেন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ড। তিনিও ২০০৮ সালের মধ্যে সংসদ নির্বাচন করার তাগিদ দিয়ে গেছেন। ওদিকে ৮ এপ্রিল এক দিনের ঝটিকা সফরে এসে আলোচনার ঝড় তুলেছিলেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাকি স্মিথ। এক দিনের মধ্যেই তিনি প্রধান উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেছেন। নির্বাচন সম্পর্কে জ্যাকি স্মিথ বলেছেন, তারা অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকার নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং কাজ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবশ্য নির্বাচনের চেয়ে বেশি আগ্রহী দেখা গেছে বাংলাদেশের কথিত সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে। যাওয়ার আগে ৯ এপ্রিল এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলে গেছেন, বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ‘ঘনিষ্ঠ' যোগাযোগ রয়েছে এবং বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের দমনের জন্য ব্রিটেন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে। দু' দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে ‘ঘনিষ্ঠ' সম্পর্কের কথা বললেও ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিন্তু কোনো একটি গোষ্ঠীরই নাম জানাননি। জানাতে বরং অস্বীকার করেছেন। গণতন্ত্রের ‘পূজারী' হলেও কথিত সন্ত্রাসীদের দমন করার কাজে একটি অনির্বাচিত সরকারকেই তারা কেন বেছে নিয়েছেন সঙ্গত সে প্রশ্নের সদুত্তর দেননি তিনি। ফলে নির্বাচন এবং নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ব্যাপারে ব্রিটেনের আন্তরিকতা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
ব্রিটিশ মন্ত্রীদের পর মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের তিন সিনিয়র কর্মকর্তা। তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন সে দেশের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড এ বাউচার। এর পর গত সপ্তাহে এসেছে ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিনিধি দল। তারা আগামী সংসদ নির্বাচন ‘নিবিড়ভাবে' পর্যবেক্ষণ করার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সরকার, সাংবাদিক ও সুশীল নামধারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইসি প্রতিনিধিরা। খোঁজ-খবর করেছেন নির্বাচনের নানাদিক সম্পর্কে। প্রতিনিধি দলটি ব্রাসেলসে ফিরে গিয়ে সদর দফতরে যেভাবে রিপোর্ট পেশ করবে তার ভিত্তিতেই পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে ইসি। এই প্রতিনিধি দল ঢাকায় থাকতেই এসেছেন ব্রিটেনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উন্নয়ন মন্ত্রী শহীদ মালিক। তিনিও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তার দেশের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
এভাবেই বিদেশীরা আরো একবার দৃশ্যপটে আসতে শুরু করেছেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ আসছে তাদের দিক থেকে। আলোচনা জমেও উঠছে সে কারণে। কিন্তু এই আলোচনা নির্বাচন নিয়ে ততোটা হচ্ছে না, যতোটা হচ্ছে বিদেশীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে। এরও কারণ বিদেশীরাই তৈরি করছেন। ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঝটিকা সফরের কথা আগেই বলা হয়েছে। নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সরকার নিয়ে কথা বললেও তাকে বেশি আগ্রহী মনে হয়েছে কথিত সন্ত্রাসীদের দমনের ব্যাপারে। কোনো একটি গোষ্ঠীর নাম না বললেও কথাটা তিনি এমনভাবেই বলেছেন যেন সত্যি সত্যি কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বাংলাদেশ ও ব্রিটেনে ঘনিষ্ঠ' যোগাযোগ রক্ষা করে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে এবং যেন এ ব্যাপারে তাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে! দেশপ্রেমিকদের মধ্যে আপত্তি ও প্রতিবাদও উঠেছিল একই কারণে। তারা বলেছেন, সত্যিই তেমন কোনো প্রমাণ বা সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে ব্রিটিশ মন্ত্রীর উচিত ছিল কথিত গোষ্ঠীগুলোর নাম প্রকাশ করা, যাতে বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণ তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে পারে। অন্যদিকে জ্যাকি স্মিথ কান্ডজ্ঞানহীন রাজনীতিকের মতো শুধু ঢালাও মন্তব্য করে গেছেন।
এজন্য শুধু নয়, অন্য একটি কারণেও ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। পরোক্ষভাবে হলেও তিনি স্বীকার করেছেন, সন্ত্রাস বিরোধী আন্তর্জাতিক যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক নাম্বার মিত্র ব্রিটেনও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তা না হলে ব্রিটেনের মতো শক্তিশালী এবং আধুনিক সমর প্রযুক্তিতে অগ্রবর্তী একটি দেশে দু-একটি নয়, কয়েকটি পর্যন্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৎপর থাকতে পারতো না যেখানে সন্ত্রাসী কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্বই থাকার কথা নয়। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই স্বীকৃতিকে কিন্তু সহজ-সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, কুটিল ইংরেজ জাতি সাধারণত নিজেদের কোনো দোষ বা ব্যর্থতা স্বীকার করে না, পরিবর্তে অন্যের ঘাড়ে সব দোষ ও দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করার মধ্য দিয়ে জ্যাকি স্মিথ ব্রিটেনকেও বাংলাদেশের কাতারে নামিয়ে এনেছেন। বোঝা গেছে, এর পেছনে অন্য কোনো গুরুতর উদ্দেশ্য রয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ব্রিটেনের কথা বলেছেন সত্য, কিন্তু জোর অনেক বেশি দিয়েছেন তিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে।
আশংকারও সৃষ্টি হয়েছে এখানেই। কারণ বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বহুদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চেষ্টা ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জ্যাকি স্মিথও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ শুধু সন্ত্রাসী রাষ্ট্রই নয়, দেশ হিসেবেও বাংলাদেশ ব্যর্থ ও অকার্যকর হতে চলেছে। আর কোনো রাষ্ট্র যখন ব্যর্থ ও অকার্যকর হয়ে পড়ে তখনই আন্তর্জাতিক ‘দায়িত্ব' পালন করতে এগিয়ে আসে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো মোড়ল দেশগুলো। তাদের সঙ্গে অংশ নেয় ব্যর্থ ও অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত রাষ্ট্রের বৃহৎ প্রতিবেশীরা। দেশটিতে শুরু হয় ঢালাও লুণ্ঠন।
বিশ্লেষণের এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সংক্রান্ত মন্তব্যে সে সময় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ, তেল-গ্যাসসহ প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর দখল প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশের জমিনের ওপর দিয়ে যথেচ্ছভাবে যাতায়াত এবং সমরাস্ত্র ও পণ্য আনা-নেয়া করার লক্ষ্য নিয়ে অপতৎপরতা শুরু হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু চার দলীয় জোটের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিরোধে এসব উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতেও কোনো নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে এসব পাওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে পাওয়াটাই যেখানে প্রধান বিবেচ্য সেখানে বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার থাকা-না থাকায় ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ‘সঙ্গী' রাষ্ট্রের কিছুই যায়-আসে না। তারা বরং অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় রাখতেই বেশি আগ্রহী থাকবে। এজন্যই প্রকাশ্যে নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক সরকারের কথা বললেও ব্রিটিশ মন্ত্রী নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তরিকতার প্রমাণ রাখতে পারেননি।
মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড এ বাউচারের সাম্প্রতিক সফরের কথাও স্মরণ করে দেখুন। তার সঙ্গে এসেছিলেন অন্য কেউ নন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক ডেস্কের একজন উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাদের উদ্দেশ্যের মধ্যেও প্রাধান্যে ছিল সন্ত্রাসবাদ ও বাংলাদেশের বাস্তব অবস্খা দেখা। রিচার্ড বাউচাররা ঢাকায় আসার আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়ে রেখেছিলেন, বাংলাদেশের ওপর তিন ডি-ভিত্তিক মার্কিন নীতির বাস্তবায়ন চেষ্টা চলছে (এই তিন ডি হচ্ছে ডেমোক্র্যাসি বা গণতন্ত্র, ডেভেলোপমেন্ট বা উন্নয়ন এবং ডিনায়াল অফ টেরোরিজম বা সন্ত্রাসবাদ প্রত্যাখ্যান)। বাংলাদেশ এই তিনটি ডি-র ক্ষেত্রে কোন অবস্খানে রয়েছে এবং বাংলাদেশকে কোন্ ক্ষেত্রে কিভাবে কতটা ‘সহায়তা' করতে হবে সে সব নির্ধারণ করতেই ঢাকায় এসেছিলেন রিচার্ড বাউচাররা।
তাদের এই সফরে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়ার কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন সরকারের মনোভাব পাল্টে গেছে। দরিদ্র দেশ হিসেবে নয়, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র ‘মুসলমানদের দেশ' হিসেবেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তথাকথিত সন্ত্রাস বিরোধী আন্তর্জাতিক যুদ্ধের সমর্থনে বাংলাদেশের ভূমিকাকেও যুক্তরাষ্ট্র সন্তোষজনক মনে করে না। চার দলীয় জোট সরকারের শেষ দুটি বছরে অনেকভাবেই এ মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক ও আফগানিস্তানে অবৈধ দখল প্রতিষ্ঠার দিনগুলোতে হঠাৎ করেই বাংলাদেশে বোমাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বেড়ে গিয়েছিল। জেএমবি ও হুজি ধরনের এমন কিছু সংগঠনও হঠাৎ দৃশ্যপটে এসেছিল, আগে যেগুলোর নাম শোনা যায়নি। তাদের কর্মকান্ডের ফলে এই প্রচারণা চালানো সহজ হয়েছিল যে, বাংলাদেশ ‘ইসলামী' জঙ্গিদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছিল, প্রতিটিই ছিল একই আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার অংশ।
ঘটনাপ্রবাহের ওই বিশেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইসের মন্তব্য স্মরণ করে দেখুন। ২০০৫ সালের মার্চে ভারত সফরকালে বাংলাদেশকে ‘অত্যন্ত সমস্যাপূর্ণ রাষ্ট্র' হিসেবে চিহ্নিত করে কন্ডোলিজা রাইস ঘোষণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘বাংলাদেশের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে' এবং এই প্রক্রিয়ায় ভারতকে ‘সঙ্গে রাখবে'। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেছিলেন, বাংলাদেশে ভারতকে ‘সঙ্গে নিয়ে' যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ ভূমিকা' পালন করার ‘দায়িত্ব' রয়েছে। এর পর পরই ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে. টমাস তার ‘ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী' উচ্চারণ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ‘বিকল্প শক্তি' ক্ষমতা দখল করবে। এই ‘বিকল্প শক্তি'র পরিচিতি সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরে রাষ্ট্রদূত টমাস বলেছিলেন, ‘আপনারা তা দেখতে পাবেন।'
জনগণকে সত্যিই ‘তা' দেখতে হয়েছে এবং এখনো ‘তা'-ই দেখতে হচ্ছে বলেই নতুন পর্যায়ে বিদেশীদের বেশি যাতায়াতে তারা ভীত ও উদ্বিগ্ন না হয়ে পারছে না। বিদেশীরা যদি শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠান ও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তাগিদ দিতেন তাহলে হয়তো কথা বাড়াতে হতো না। অন্যদিকে অনেক বেশি ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন তারা তথাকথিত সন্ত্রাস দমনের ব্যাপারে। সন্ত্রাস বিরোধী এত বলিষ্ঠ নীতি অনুসরণ এবং সফলতা অর্জন করার পরও বাংলাদেশকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাতে কসুর করছেন না তারা। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথাও তারা যথেচ্ছভাবেই বলে চলেছেন, অনেকে এমনকি কূটনৈতিক রীতি-নীতি ও শিষ্টাচার মেনে চলারও প্রয়োজন বোধ করছেন না। বাংলাদেশে নিযুক্তি পাওয়ার পর আয়োজিত প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস ফন্সান্সিস মরিয়ার্টির কথাগুলো স্মরণ করে দেখুন (২১ এপ্রিল, ২০০৮)। মূলকথায় তিনি জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, জরুরি অবস্খা কার্যকর রেখে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাই জরুরি অবস্খা তুলে নিতে বলেছেন। সেনাবাহিনী প্রসঙ্গেও খোলামেলা ভাষাতেই বলেছেন মরিয়ার্টি সেনাবাহিনী ‘আরো বেশি' ভূমিকা রাখলে বাংলাদেশ এই অঞ্চল ও অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অন্যদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কেও টান পড়বে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কথাগুলোর মধ্যে যে সত্যতা নেই তা নয়। কিন্তু কোনো বিদেশি কূটনীতিক এভাবে এসব কথা বলতে পারেন না। কারণ বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। নির্বাচন কখন হবে বা সেনাবাহিনী কোন ভূমিকা রাখবে এসবই বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়। এখানে বিদেশি কূটনীতিকদের নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক আইনও কূটনীতিকদের কর্মকান্ডের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু কূটনীতিকদের অনেকেই প্রায় নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন, পরামর্শের আড়ালে নির্দেশ দেন। নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূতও সেরকমই করেছেন।
এ প্রসঙ্গে কিছু কঠিন সত্য জানানো দরকার। বিষয়টি কিন্তু মোটেই সহজ-সরল নয়। কারণ, বাংলাদেশে বিদেশি কূটনীতিকরা অনেক আগে থেকেই অভ্যন্তরীণ সকল বিষয়ে নাক গলিয়ে এসেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে তো বটেই, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও দূতিয়ালি তারা কম করেননি। উদাহরণের জন্য বেশি পেছনে যাওয়ার দরকার নেই। চার দলীয় জোট সরকারের শেষ দিনগুলোতে বিশেষ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস, ব্রিটেনের হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী এবং ভারতের হাই কমিশনার বীণা সিক্রির তৎপরতার কথা স্মরণ করে দেখুন। অবস্খা এমন হয়ে পড়েছিল যেন তারাই জাতির ‘ভাগ্য বিধাতা'! চার দলীয় জোট-বিরোধী এমন কোনো রাজনৈতিক দলের নাম বলা যাবে না, যার নেতারা এসব কূটনীতিকের দ্বারস্খ না হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, তাদের ‘ঘাড়ে তোলার' জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠীর রাজনীতিকদের মধ্যে সে সময় প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। পরিস্খিতির সুযোগ নিয়ে কূটনীতিকরাও জাতির ঘাড়েই ‘সওয়ার' হয়েছেন। সে অভিজ্ঞতা আর অভ্যাস থেকেই এবার কথা বলেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি। সুতরাং শুধু তাকে দোষ দেয়া অনুচিত।
এখানেই রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় দায়িত্বের প্রসঙ্গ এসে যায়। কারণ এই অভিযোগ অস্বীকার করা যাবে না যে, কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দেশের এবং সরকারের বিরোধিতাকে একাকার করে ফেলা হয়েছে বলেই বিদেশীরা কথায় কথায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর সুযোগ পেয়েছে। এমনটা অতীতে যেমন হয়েছে, বর্তমান পর্যায়েও তেমনি হচ্ছে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দেশের স্বাধীন মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া এবং কোনো অবস্খাতেই বিদেশীদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ না দেয়া। সকল রাজনৈতিক দল যদি দেশের স্বাধীন মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে কূটনীতিকরা কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলতে বাধ্য হবেন এবং কোনো ইস্যুতেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কখনো হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবেন না। তেমন আয়োজন অবশ্যই নিশ্চিত করা দরকার।
গণতন্ত্রে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের মতানৈক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। যে কোনো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একক বা সম্মিলিতভাবে সরকারের বিরোধিতা করতে পারে, দাবি আদায়ের জন্য দলগুলো আন্দোলন করতে পারে। কিন্তু দেশের স্বাধীন মর্যাদার জন্য অবমাননাকর কোনো কর্মকান্ড কোনো অবস্খাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কূটনীতিকসহ বিদেশীদের উচিত তাদের সীমার মধ্যে অবস্খান করা এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলা। সংসদ নির্বাচনের মতো কোনো বিষয় নিয়েই প্রকাশ্যে তাদের কথা বলার এবং নির্দেশ চাপিয়ে দেয়ার অধিকার থাকতে পারে না। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন কিভাবে আয়োজন করা হবে এসবই বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়। যে কোনো বিষয়ে বিতর্ক ও আন্দোলন করা থেকে সমাধানে বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জড়িত থাকবেন কেবল বাংলাদেশের রাজনীতিকরাই। অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও চুক্তিসহ সকল সিদ্ধান্তও নেবে নির্বাচিত সরকার এবং জাতীয় সংসদ। সমগ্র এ প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই কূটনীতিক তথা বিদেশীদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।
বিদেশীদের নখর আঘাতে বিধ্বস্ত হতে চলেছে বাংলাদেশ ! চারদিক থেকে বেঁধে আঘাত !
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।