বাংলাদেশের কাছে দীর্ঘদিন থেকেই ট্রানজিট চেয়ে আসছে ভারত। কিন্তু দেশের নিরাপত্তার কথা ভেবেই হোক অথবা কৌশলগত অন্য যে কোন কারণেই হোক ইতোপূর্বে নির্বাচিত কোন সরকারই তাতে রাজী হয়নি। ট্রানজিট আদায়ে বাংলাদেশের ওপর ভারতের বহুমুখী চাপ সত্ত্বেও জনমতের কথা ভেবে নির্বাচিত সরকারগুলো এতে রাজী না হলেও ডক্টর সমৃদ্ধ বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অতিউৎসাহী কোনো কোনো ডক্টরেটের মনোভাব যেন ভিন্ন। সেই সঙ্গে দেশের কিছু সংখ্যক মিডিয়াও ভারতকে ট্রানজিট দিতে জোরেসোরেই কাজ করছে। অথচ ট্রানজিট সম্পর্কে তারা আদৌ কোন ব্যাখ্যা জানেন কিনা আমার তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ট্রানজিট নামে যা বলা হচ্ছে তা কি ট্রানজিট না করিডোর সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন বোধ করছি। ট্রানজিট হচ্ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক স্খান থেকে অন্য কোন স্খানে যাওয়া, পাঠানো বা পণ্য পরিবহন বোঝায়। আর করিডোর অর্থে বলা হয়েছে, এ বাড়ি হতে ও বাড়ি যেতে যে পথ, তাকে করিডোর বলা হয়। করিডোর' শব্দের দ্বিতীয় অর্থ করা হয়েছে এভাবে, দীর্ঘ অপ্রশস্ত এক টুকরো জমি নিজ মালিকানাধীন। পথ হিসেবে যা অন্য দেশের ওপর দিয়ে চলে গেছে।সেই দেশের মালিকানাধীন ভূখণ্ড কথাটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সুতরাং বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং এদেশের ভারতীয় দালাল গোষ্ঠী ভারতের সাথে যে চুক্তিটি করতে বড় বেশি আগ্রহী সেটি ট্রানজিট চুক্তি নয়, একেবারেই সেটি করিডোর প্রদান।
বাংলাদেশের একটি আজব চিত্র। কারণ, দুনিয়ার অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, নিজ দেশের খেয়ে পরে বেঁচে অন্য দেশের দালালী করে, অন্য দেশের স্বার্থ রক্ষায় জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে। কিন্তু বাংলাদেশে তেমন ঘটনা ঘটে চলেছে। মীর জাফর আর লেন্দুপ দর্জির উত্তরসূরিরা এখনো আছে আমাদের চারপাশে। তারা গোটা জাতিকে আহাম্মক ভেবে বোঝানোর চেষ্টা করছে, ভারতকে করিডোর দেয়া হলে বাংলাদেশ প্রতিবছর দু'হাজার কোটি টাকা লাভ করবে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে দুর্নীতি অনিয়ম, অব্যবস্খাপনা ব করা গেলে যে দেশ তার চেয়েও বেশি লাভবান হবে সে কথা কেউই বলছেন না।
পাকিস্তানের সিন্ধু নদীর উজানে ভারত বাঁধ দিতে সাহস করেনি। কিন্তু স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ৩১ মে মাত্র ৪১ দিনের পানিচুক্তি করে পরীক্ষামূলকভাবে ভারতকে ফারাক্কা বাঁধ চালু করার সুযোগ করে দেয় তৎকালীন সরকার। সেই ৪১ দিন আজও শেষ হয়নি। উপরন্তু বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি নদীতে বাঁধ দিয়ে এদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড দুর্বলতর করে দিয়েছে। ভারতীয় দালালরা সে সম্পর্কে কখনো টু শব্দটিও করেনি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত এদেশ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রাংশ সোনাদানা নিয়ে নিজ দেশের শিল্পবিকাশ ঘটিয়েছে। ১৯৭১ সালের পর ভারতের দেশরক্ষা খাতে ইস্টার্ন কমান্ড বাবদ বিপুল খরচের আর প্রয়োজন না হওয়ায় সেই অর্থে তারা শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় আসাম, মেঘালয়, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, ত্রিপুরা ও অরুনাচল তথা সেভেন সিস্টার বলে খ্যাত ওই সাত রাজ্যের স্বাধীনতা আন্দোলন ভারতের জন্য এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাত রাজ্যের ১৮টি গেরিলা সংগঠন ভারত সরকারকে নাস্তানাবুদ করছে। এসব স্বাধীনতাকামীদের দমন করার জন্য সেখানে ৫ লাখ সৈন্য মোতায়েন করে রেখেছে ভারত। বাংলাদেশের অবস্খানের জন্যই ভারতের ওইসব রাজ্য কোলকাতার বিশাখাপট্টম অথবা মাদ্রাজ সমুদ্র বন্দরের সাথে কোন সমুদ্রপথ বা নৌপথ সংযোগের সুবিধা লাভ করতে পারছে না। শুধু বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যকার ১৩/১৪ মাইল প্রস্খের বহুল আলোচিত সংকীর্ণ ভূখণ্ড ‘শিলিগুড়ি করিডোর'-এর মাধ্যমে সেভেন সিস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে ভারত। হিমালয় পর্বতের পাদদেশীয় শিলিগুড়ি, দার্জিলিং ও কুচবিহার এ তিন জেলার মধ্য দিয়েই ৭ রাজ্যের সঙ্গে ভারত যোগাযোগ করতে পারছে।
ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ৭ রাজ্যের মধ্যে আসাম ও মনিপুর ছাড়া অন্য কোন রাজ্যে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির সময় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। সেসব রাজ্যের প্রায় সব কটিতেই মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অহম, বোড়ো, নাগা, লুসাই, ত্রিপুরা, কুকী, খাসিরা, মিরি, মিসমী, আভর, চাকমা, গারো, মনিপুরীসহ আদিবাসী উপজাতী জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাছড়া ‘শিলিগুড়ি করিডোর' থেকে শুরু করে দার্জিলিং জেলা ও পার্শ্ববতি কিছু স্খান জুড়ে ‘গুর্খাল্যান্ড' অঞ্চলে নেপালের গুর্খা উপজাতীয়রা বসবাস করছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা সুভাষ ঘিসিং-এর গুর্খাল্যান্ড আন্দোলন আর স্বাধীনতাকামী বোড়োদের ক্রমবর্ধমান সশস্ত্র আন্দোলন ও গেরিলা যুদ্ধ ভারতীয় প্রশাসনকে অস্খির করে তুলেছে। আর তা দমন করার জন্যই বাংলাদেশের বুক চিড়ে ভারত করিডোর চাইছে। কিন্তু বাংলাদেশের তাতে লাভ কি? ভারতীয় দালালরা ২ হাজার কোটি টাকার মুলো ঝুলিয়ে রাখছে জাতির সামনে। কিন্তু ভারতকে করিডোর দেয়া হলে বাংলাদেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে দালাল শ্রেণী তা একবারও উচ্চারণ করছে না।
প্রথমত: উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৭ রাজ্যের প্রায় ৬/৭ কোটি জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চনার শিকার। আর সেই অধিকার বঞ্চিত হওয়া থেকেই তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী তথা স্বাধীনতা আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে। ভারতকে করিডোর প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ালে সেভেন সিস্টারের অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশেও। ওই অঞ্চলে এখন যেমন গ্যাস পাইপ লাইন উড়িয়ে দেয়া, বেতার যোগাযোগ ধ্বংস করে দেয়া, রেল লাইন উপড়ে ফেলে দুর্ঘটনা ঘটানোর মাধ্যমে অসংখ্য প্রাণহানি, পানি সরবরাহে বাধার সৃষ্টি, সড়ক-সেতু বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার মত প্রতিদিনই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে, ভারতকে করিডোর দেয়া হলে এসবের টার্গেট হবে বাংলাদেশও। ভারতীয় দালালদের অতিউৎসাহ ও পরামর্শে এ ধরনের চিন্তা কী করে প্রশাসনের মাথায় স্খান পায় তা বোধগম্য নয়। করিডোর দেয়া হলে বাংলাদেশ কি পাবে ভারতের কাছ থেকে? ২ হাজার কোটি টাকা। ক্ষতি হবে কত? তার সঠিক হিসাব এই মুহূর্তে করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ভারতকে ৫০০ মাইল করিডোর দেয়ার আহ্বানে কর্তাব্যক্তিরা দিল্লী ছুটে যান। কিন্তু বাংলাদেশও নেপালের সঙ্গে ১৩/১৪ মাইল করিডোর চাইতে পারে, ভুটান, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য করিডোর চাইতে পারে। ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেয়ার দাবি জানাতে পারে। আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প বাতিল, তালপট্টি দ্বীপ দখলমুক্ত হওয়া, সীমান্ত সংঘর্ষ ব, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়দের উস্কানি দেয়া ব, পুশইন তৎপরতা বসহ আরো অনেক দাবি জানাতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশ এইসব দাবি জানাচ্ছে কি? কথা ছিল, “শিলিগুড়ি করিডোর” দিয়ে নেপালে বাণিজ্য সুবিধা পেলে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করার সুযোগ পাবে নেপাল। কিন্তু ভারতের অসহযোগিতার কারণে শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তাহলে করিডোর আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতা কি করে আশা করে ভারত?
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত দু'টি আলাদা রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের কাছে মাত্র ৬ মাসের ট্রানজিট চেয়েছিল পাকিস্তান। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বড়ই প্রয়োজন ছিল ওই ট্রানজিট। কিন্তু ভারতের কর্তাব্যক্তিরা তখন দম্ভ করে বলেছিলেন ৬ মাস কেন ৬ ঘন্টার জন্যও পাকিস্তানকে ট্রানজিট দেয়া হবে না। নেপালের সঙ্গে মাত্র ১৩/১৪ মাইল ট্রানজিট দিতে নারাজ ভারত। এতোসব সত্ত্বেও কি করে তারা ট্রানজিট চায়? বিষয়টা এ রকম যে, আমি কাউকে ট্রানজিট না দিলেও আমাকে দিতে হবে।
ট্রানজিট নিয়ে কথা উঠলেই দালাল শ্রেণীর পাশাপাশি এক শ্রেণীর ভারতবাব মিডিয়ার নগ্নতাও চোখে পড়ার মতো। গত কিছুদিন ধরেই করিডোর বিষয়ে দু' একটি কাগজে লেখালেখি হলেও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্খার অর্থপুষ্ট চিহ্নিত মিডিয়ার নীরবতা এদেশের মানুষকে বিস্মিত করে তুলেছে। গত ৯ জুলাই একটি দৈনিকে পাঁচ কলাম জুড়ে প্রধান সংবাদের শিরোনাম ছিল “১৮ জুলাইয়ের মধ্যে ট্রানজিট চায় ভারত”। ওই দিনই সকাল ৯টার দিকে চ্যানেল আই'র ‘সংবাদপত্রের পাতা থেকে' আলোচনা অনুষ্ঠানে দৈনিকটির উল্লেখিত সংবাদ শিরোনাম না দেখিয়ে দেখানো হলো ষষ্ঠ কলামে প্রকাশিত “ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলন শুরু” খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে তহবিল গঠনে ফখরুদ্দীনের আহ্বান শিরোনামের সংবাদটি। সিঙ্গেল কলামে প্রকাশিত ওই সংবাদটিকে দেখিয়েই কাগজটি সরিয়ে নেয়া হলো। প্রশ্ন হচ্ছে, চ্যানেল আই-এর মতো একটি সংবাদ মাধ্যমের এমন আচরণ কেন? স্বদেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বিদেশের স্বার্থরক্ষায় এমন তৎপরতা কেন? সীমান্তে বিএসএফ গুলী করে দু'জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করলো গত ১৮ জুলাই। আওয়ামী মহল থেকে কোনো বাদ-প্রতিবাদ নেই। পরদিন ১৯ জুলাই কিছু ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করলে ছাত্রলীগ তাদের ওপর হামলা চালায়। এর অর্থ কি দাঁড়ায়? তার মানে ভারত আমাদের সীমান্তরক্ষীদের পাখির মতো গুলী করে হত্যা করবে, আমাদের নাগরিকদের হত্যা করবে, মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে, ভারত যা খুশি তাই করবে কিন্তু তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারবে না। এরই নাম গণতন্ত্র! এরই নাম স্বাধীনতা! ভারতীয় দালালরা আজ দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ঠাঁই নিয়েছে। সেখানেও ভারতের অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চারকারীদের টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে। হায়রে সাধের স্বাধীনতা!
১৮ জুলাইয়ের মধ্যেই বাংলাদেশের অনির্বাচিত সরকারের কাছে ট্রানজিট চেয়েছে ভারত। এ নিয়ে দিল্লীতে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও হয়ে গেল। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বৈঠক চলাকালেই বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা সীমান্তে দু'জন বিডিআর সদস্যকে গুলী করে হত্যা করে বিএসএফ। পরদিনই যশোরের চৌগাছা সীমান্তে বিএসএফ'র গুলীতে ২ জন কৃষক নিহত হয়। কেন এই হত্যাকাণ্ড? বাংলাদেশকে ভড়কে দেয়ার জন্য নয়তো? ভয় দেখিয়ে কার্যসিদ্ধির কৌশল নয়তো? আমরা আরো লক্ষ্য করেছি, গত ২৪ এপ্রিল সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ ৬ দিনের ভারত সফরকালে বিএসএফ দু'জন বাংলাদেশীকে হত্যা করে তাকে স্বাগত জানায়, ২৫ তাং আরো দু'জন, ২৬ তারিখ আবারো কোনো কারণ ছাড়াই বিএসএফ গুলিবর্ষণ করে। এভাবে সীমান্তে উত্তেজনার মধ্যদিয়েই তার ৬ দিনের সফর শেষ করতে হয়েছে। একইভাবে পররাষ্ট্র সচিবের দিল্লী সফরকালে সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যায় মেতে উঠেছে বিএসএফ। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিএসএফ ও অরাষ্ট্রীয় গ্রুপগুলোর হাতে প্রাণ হারিয়েছে ৭০১ জন বাংলাদেশী। এর মধ্যে বিএসএফ হত্যা করেছে ৬৫৩ জন। ধর্ষিত হয়েছে ১৩ জন নারী। এ সময়ের মধ্যে বিএসএফের হামলায় আহত হয়েছে ৭২৭ জন, গ্রেফতার ২৬২ জন, ৮ শিশুসহ অপহরণ করা হয়েছে ৮৯ জনকে। আর লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৬৪টি। ভারত যে আমাদের সুপ্রতিবেশী এ হচ্ছে তার আংশিক চিত্র! ভারত এ ধরনের জঘন্য অপরাধ অব্যাহত রাখলেও এদেশের কিছু কুলাঙ্গার একটি শব্দও উচ্চারণ করছে না। উপরন্তু ভারতকে করিডোর দেয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। বিগত আওয়ামী সরকার শুধু উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে আটক করেই ভারতকে খুশি করেনি। গোপন আঁতাতের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারত বহু সমরাস্ত্র ও সামরিক রসদ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে পাচার করার সুযোগ নিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজার-উখিয়ায় জনগণের হাতে ধরা পড়ে যাওয়া একাধিক ট্রাকভর্তি ভারতীয় সীল লাগানো সমরাস্ত্র ও গোলাবারূদের গন্তব্য সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল ছিল। এ নিয়ে পার্লামেন্টে বিরোধীদল হৈ চৈ করে তদন্তের দাবি জানায়। কিন্তু স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী সংসদকে জানিয়ে দিলেন কৌশলগত কারণেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। পরবর্তীতে গণঅসন্তোষের ভয়ে তদন্তের পরিবর্তে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়া হয়। সুতরাং করিডোর পাওয়ার আগেই এ ধরনের বহু অস্ত্রের চালান পাচার হয়ে গেছে অথবা ধরা পড়েছে। কিন্তু ভারতকে করিডোর দেয়া হলে তার পরিণাম কি হতে পারে দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার স্বার্থেই তা গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত।
বিশ্বের নানা দেশে ট্রানজিটের মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রানজিট পরস্পরের মধ্যে অতি পুরনো এবং সাধারণ দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক ব্যবস্খার অংশ। বিশেষ করে বিশ্বের স্খল পরিবেষ্টিত দেশগুলো তাদের পণ্য আমদানি-রফতানির জন্য অন্য দেশের ভূ-ভাগ ও সমুদ্র বন্দর বা নৌপথ ব্যবহারের জন্য ট্রানজিট চুক্তি করে থাকে। এসব চুক্তির ফলে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা বহুলাংশে কাটিয়ে আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। আফগানিস্তান, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, ভুটান, বলিভিয়া, চাঁদ, মালি, নাইজার, ইথিওপিয়া, জিম্বাবুয়ে, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, হাঙ্গেরী, অস্ট্রিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, চেকপ্রজাতন্ত্র, শ্লোভাক এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে আলাদা হয়ে যাওয়া কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরঘিজিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান ছাড়াও বেলারুশ, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান ভূ-পরিবেষ্টিত এসব রাষ্ট্রের নিজস্ব কোন সমুদ্র বন্দর না থাকায় সঙ্গত কারণেই পাশাপাশি সমুদ্র বন্দর রয়েছে এমন কোন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তির মাধ্যমে আমদানি-রফতানি সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে এসব দেশ।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারতের অবস্খান সম্পূর্ণই ভিন্ন। ভারত এ অঞ্চলে একটি বড় দেশ। এ কারণে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে সে বরাবরই তুচ্ছ জ্ঞান করে আসছে। ভারত আয়তনে বড় দেশ হলেও চিন্তা-চেতনায়, মননে আজও পর্যন্ত বড় হতে পারেনি। এ কারণে প্রতিবেশী কোন দেশের সঙ্গেই তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠেনি। এমন একটি বৈরী মনোভাবের দেশকে করিডোর দেয়া মোটেও নিরাপদ নয়। প্রসঙ্গত দরিদ্র ও স্খলবেষ্টিত প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল, সিকিম ও ভুটানের কথা বলা যেতে পারে। সিকিম একই অবস্খার শিকার হয়ে অবশেষে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। ভুটান স্বাধীন দেশ বলে দাবি করলেও কার্যত তেমন নয়। ভুটানের প্রতিরক্ষা, অর্থ, যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাধ্য হয়ে ভারতের ওপর ছেড়ে দিয়ে প্রায় আশ্রিত রাজ্যের মর্যাদা নিয়ে টিকে আছে। একই অবস্খা নেপালের। ভারতের কলকাতা বন্দর ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে দেশটির আমদানি-রফতানি। ভারতের মর্জি ভালো হলে আমদানি-রফতানি সচল থাকে। এর অন্যথা হলে টুঁটি চেপে ধরা হয়। এ অবস্খা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যই ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর ব্যবহার করে বাংলাদেশের মংলা বন্দর ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছিল নেপাল। সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ভারতের হঠকারিতায় এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়। অথচ নেপাল বিশ্বের মধ্যে একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র। এই স্বগোত্রীয় রাষ্ট্রকেই যখন ছাড় দেয়নি ভারত, তাহলে তাকে বিশ্বাস করার আর কোন পথই থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বহু দ্বিপাক্ষিক সমস্যা রয়েছে। ভারত এখনো পার্বত্যাঞ্চলে উপজাতীয়দের উস্কানি দিয়ে অশান্ত অবস্খা জিইয়ে রেখেছে। সীমান্ত সংঘর্ষ নিত্যদিনকার ঘটনা। ফারাক্কা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান না করে বরং দিন দিনই তা বাড়ছে। বাংলাদেশী খেদাও এর নামে ভারতের বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টাও ব করেনি ভারত। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব মুছে ফেলার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে তারা। তারই অংশ হিসেবে তথাকথিত বঙ্গভূমি আন্দোলনকারীদের অর্থ, অস্ত্র আর ট্রেনিং দিচ্ছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্খা। এ দেশের উত্তরাঞ্চলকে আলাদা করার জন্য গারো, খাসিয়াসহ উপজাতীয়দের উসকে দেয়ার কাজ চলছে অত্যন্ত সংগোপনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দালাল তৈরির ব্যাপক মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্খাটি। উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির নামে ভারতীয়দের বেলেল্লাপনা এদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিযে নয়া প্রজন্মের মগজ ধোলাইয়ের কাজ চলছে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। শোনা যায়, এ দেশের পে-চ্যানেল ব্যবসায়ীদের লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে ভিডিও চ্যানেলের মাধ্যমে বিরামহীনভাবে হিন্দী গান, উদোম শরীরী নাচ তথা ভারতীয় অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়ে এদেশের যুব সমাজকে ধ্বংস করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা সংস্খাটি। অথচ বাংলাদেশের হাতেগোনা ৭/৮টি চ্যানেলের অনুষ্ঠান প্রদর্শনে ভারতে রয়েছে অস্বাভাবিক কড়াকড়ি। বাংলাদেশকে একটি অস্খিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ৮ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অতি সংগোপনে কাজ করে যাচ্ছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্খাটি। তারই অংশ হিসেবে তথাকথিত ঘাদানিক (ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি)সহ আরো কয়েকটি সংগঠন প্রকাশ্যেই কাজ করছে। সম্প্রতি কোটি কোটি টাকা যোগান দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে একটি ফোরামকে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া প্রবীণদের জীবনের এই অন্তিম সময়ে অর্থের প্রলোভন দিয়ে দেশকে অরাজকতার মুখে ঠেলে দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। স্বাধীনতার এই ৩৭ বছর পরে তাদের বোধোদয় হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া দরকার। যাদের নিয়ে ফোরাম গঠিত হয়েছে তাদের সবাই যে ওই গোয়েন্দা সংস্খাটির আশীর্বাদপুষ্ট তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এ ছাড়াও ভারতের সঙ্গে বহু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে যার ফলে দু'দেশের মধ্যে আস্খাহীনতার দেয়াল খাড়া হয়ে আছে। আর এই আস্খার সংকট দূর করতে হবে ভারতকেই। এমতাবস্খায় করিডোর প্রদান এ দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ ভাবতেই পারে না। ভারতকে করিডোর দিলে আমাদের কোন ক্ষতি হবে না এ দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠী যেদিন এ রকম আস্খা নিতে পারবে কেবল সে দিনই ভারতকে করিডোর দেয়ার বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। অন্যথায় কেউ অতি উৎসাহী হয়ে এ ধরনের আত্মঘাতী চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে তার পরিণতি সম্পর্কেও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার অধিকার শুধুই জনগণের।
ঢাকাস্খ ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, প্রস্তাবিত ট্রানজিট নাকি শুধুই অর্থনৈতিক। এ দেশের মানুষকে কতটা বোকা ভাবলে জনসমক্ষে এমন মিথ্যাচার করা সম্ভব। বিষয়টি যদি তাই হতো তাহলে শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে যাতায়াতের মাধ্যমেই তো তা সম্ভব। আসলে তাদের করিডোরের আবদারের পেছনে রয়েছে সামরিক উদ্দেশ্য। সেভেন সিস্টারের মুক্তিকামী বিদ্রোহীদের দমনের জন্য তাদের দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্খা প্রয়োজন। পিনাক রঞ্জনরা বগলে ইট রেখে মুখে যতই শেখ ফরিদ বলুন না কেন, এ দেশের মানুষ কিন্তু তা বুঝতে ভুল করে না। এ কথা অবধারিতভাবে সত্য যে, সমরাস্ত্র, রসদ আর গোলাবারুদ আনা-নেয়ার জন্যই করিডোরের পীড়াপীড়ি করছে ভারত। কিন্তু তাদের চাহিদার মুখে আমরা তো ৭ রাজ্যের রোষানলে পড়তে পারি না। আর এভাবেই তো ইন্দোচীনের লড়াই ছড়িয়ে পড়েছিল কম্বোডিয়ায়।
ভারত কি রাজি হবে তার সেভেন সিস্টারের বুক চিড়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশকে ট্রানজিট দিতে? আমরাতো দীর্ঘ সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকি। তার পরিবর্তে ওই ৭ রাজ্যের মধ্য দিয়ে অল্প সময়ে সরাসরি চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে প্রস্তুত বাংলাদেশ। নেপালকে মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দিয়ে বাংলাদেশ লাভবান হতে চায়। ভুটানের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ নিতে আগ্রহী বাংলাদেশ। পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা করতে আগ্রহী বাংলাদেশ। সুতরাং ট্রানজিট চাইলে পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান-চীন এই ৬ জাতিভিত্তিক হতে পারে। এ ধরনের ৬ জাতিভিত্তিক ট্রানজিট স্খাপনে ভারত রাজি হলে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু ভারত তাতে রাজি হবে কি? আসলে করিডোর চাওয়ার পেছনে রয়েছে ভারতের অপকৌশল। ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে গ্রাস করার নীল-নকশা। আমরা তা হতে দিতে পারি না। বিগত ৩৭ বছরে বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারত অনেক কিছু পেয়েছে। বিনিময়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তির খাত প্রায় শূন্য। আর কত? বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে কেউ নতজানু হতে পারে। চিহ্নিত দালাল গোষ্ঠী উল্লসিত হতে পারে। কিন্তু গোটা জাতি কারো সেবাদাস নয়। করিডোর প্রদানের আগে এ বিষয়টি ক্ষমতাসীনদের অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে।
কিন্তু আমাদের ড. খ্যাত উপদেষ্টারা কি এই কূটনৈতিক বিজয় লাভ করবেন?
ভারত তো আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো প্রচারের অনুমতি দেয়না। সেখানে ভারতের এই গোড়া দাবী কিভাবে মেনে নিতে পারে স্বাধীন সার্বভৌম বীরের জাতি বাংলাদেশী মানুষ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

