সম্প্রতি একুশে টেলিভিশন (ইটিভি) চ্যানেলের এক টকশোতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী শাহরিয়ার কবির চরম উস্কানিমূলকভাবে বললেন, সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন করলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি তার নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে। এ রাষ্ট্রের আর কোনো প্রয়োজন নেই। এটাই যদি ইসলামী রাষ্ট্র হবে, তবে কেন আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করলাম। পাকিস্তান কেন আমরা ভাংলাম। আমরা যদি ইসলামী হুকুমতই কায়েম করতে চাই পাকিস্তানই তো আমাদের জন্য ভাল ছিল। বড় দেশ ছিল। আমরা একটা সেক্যুলার ডেমোক্রেসী চেয়েছিলাম বলেই মুক্তিযুদ্ধ করে এদেশ স্বাধীন করেছিলাম।”
শাহরিয়ার কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী বাংলাদেশ যেহেতু স্বাধীন হয়ে গেছে কাজেই ইসলামের আর কোনো স্খান এই দেশে নেই। কিন্তু তার স্মরণে থাকা উচিত যে ইসলামের বিপক্ষে অবস্খান নিয়ে কেউই সুবিধা পায়নি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ সালমান রুশদী ইসলামের বিরুদ্ধে স্যাটানিক ভার্সেস লিখে বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়ে এখন লোকচক্ষুর আড়ালে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন তছনছ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের দাউদ হায়দার এখন জার্মানিতে নির্বাসিত জীবন যাপন করছে। তসলিমা নাসরিনের অবস্খাও সকলেরই জানা। তার বড়ই প্রিয়দেশ ভারতেও তার শান্তি নেই। রাতের অন্ধকারে এ শহর ও শহরে পালিয়ে থাকতে হয় তাকে। ভারত সরকারও তাকে নিয়ে বিব্রতকর অবস্খায় পড়ে। হযরত মুহাম্মদ (সা
শাহরিয়ার কবির পেশায় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সংবাদকর্মী ছিলেন। পরবর্তীতে আখের গোছানোর উদ্দেশ্যে মানবাধিকার কর্মীর লেবাস ধারণ করেন। মানবাধিকারের ছদ্মাবরণে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে শাহরিয়ার কবীরের অপতৎপরতা উল্লেখ করা যেতে পারে। ঘটনাটি ২০০১ সালের ২২ নবেম্বরের। তিনি সেদিন কলকাতা থেকে ঢাকা ফেরার পথে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ষড়যন্ত্রমূলক ডকুমেন্টসহ ধরা পড়েন। এগুলোর মধ্যে ছিল ৪টি ভিডিও ক্যাসেট, ১টি ডিএইচএস ভিডিও ক্যাসেট, ১০টি অডিও ক্যাসেট এবং ৩টি সিডি।
এ সম্পর্কে ২৬ নবেম্বর এক রিপোর্টে দৈনিক মানবজমিন লিখেছে- তার (শাহরিয়ার কবিরের) ক্যাসেটে কলকাতাস্খ বাংলাদেশ উদ্বাস্তু কল্যাণ পরিষদের ব্যানারে বিভিন্ন মিছিলের চিত্র রয়েছে। সূত্রমতে, বৃহত্তর বরিশাল, যশোর, খুলনা ও ফরিদপুরের বেশকিছু লোক পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবির গড়ে তোলে। কলকাতাস্খ নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের অঙ্গ সংগঠন বাংলাদেশ উদ্বাস্তু কল্যাণ পরিষদ। শাহরিয়ার কবির নির্মিত ক্যাসেটের আপত্তিকর, চাঞ্চল্যকর ও দেশদ্রোহিতার তথ্য নিয়ে গোয়েন্দারা মাঠে নেমেছেন। নিখিল বঙ নাগরিক সংঘের সভাপতি হচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশকে ভারতভুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে তিনি দিল্লী গিয়েছিলেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, একটি বিদেশী গোয়েন্দা সংস্খা প্রায় ১ কোটি টাকার বিনিময়ে ক্যাসেট তৈরি ও ‘পূর্ণিমা' নামের সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ক একটি কল্পিত ছবি তৈরির ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবিরকে বেছে নেয়। শাহরিয়ার কবিরের ক্যাসেটে স্বাধীন বঙ্গভূমি সম্পর্কে বেশকিছু নতুন তথ্য মিলেছে। তাদের ভাষ্য খুলনা, যশোর, বরিশাল ও ফরিদপুরকে নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে ভারতের বাংলাদেশ উদ্বাস্তু কল্যাণ পরিষদ ও নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘ কাজ করে যাচ্ছে। তাদের শ্লোগান ছিল সীমারেখা মানছি না, মানবো না'। ক্যাসেটে তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া স্খান পেয়েছে। তাতে আরো বলা হয়েছে, সীমারেখা সমস্যার সৃষ্টি করছে। এ সমস্যা দূর করতে বঙ্গভূমির কোন বিকল্প নেই।
শাহরিয়ার কবীরের এ অপরাধ বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১২৩-ক এবং ১২৪-ক ধারা অনুসারে শাস্তিযোগ্য গুরুতর রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অপরাধ। কিন্তু তিনি ২১ জানুয়ারি ২০০২ সালে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে যান। আওয়ামী বলয়ের সর্বশক্তি এবং তার সাথে বাইরের কিছু বিশেষ শক্তির বিরামহীন তৎপরতা সংঘবদ্ধভাবে তার বিচারের পথে বাধার সৃষ্টি করে। এর ফলে তাকে আর বিচারের কাঠগড়ায় ফিরতে হয়নি। কিন্তু এসব অপকর্মের পরও শাহরিয়ার কবীররা একবারও ভাবেন না যে, যাদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধায় গদ-গদ, যাদের নুন-নেমক খেয়ে নিজ দেশ, নিজ মাটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন তারা কতটুকু বিশ্বাস করে তাকে। নাকি তার এসব কর্মকাণ্ডে তাকে মীর জাফরের দৃষ্টিতে দেখে। আসলে কারো নুন নেমক খেলে যা হয় আর কি।
শাহরিয়ার কবীর দেশের বিরুদ্ধে আরেকটি অস্ত্র ব্যবহার করেন। তা হলো, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান নিখোঁজ হন। শাহরিয়ার কবীরের দাবি '৭১-এর ঘাতক-দালাল রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী জহির রায়হানকে অপহরণ করে নিয়ে হত্যা করেছে। শাহরিয়ার কবীররা গোটা জাতিকে কতটা বোকা ভাবলে এখনো এসব অসার উক্তি করার সাহস দেখায়। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর '৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুতেই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাকবাহিনী পরাজিত হতে থাকে। এক একদিন এক একটি এলাকা শত্রুমুক্ত হতে থাকে। ডিসেম্বরের শুরুতেই পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা জানের নিরাপত্তার সানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
স্বাধীনতার দেড় মাস পর সৃষ্ট পরিস্খিতিতে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির পক্ষে জহির রায়হানকে অপহরণ করা কোন অবস্খাতেই সম্ভব হতে পারে না। সঙ্গত কারণেই তখন তাদের আত্মরক্ষায় ব্যস্ত থাকাটাই স্বাভাবিক। সে অবস্খায় কাউকে অপহরণ অথবা খুন করার অভিযোগ একেবারেই হাস্যকর, অযৌক্তিক, উদ্দেশ্যপ্রণোগিত। দেশকে অস্খিতিশীল করে তোলার দুরভিসি নিয়েই এ ধরনের অসার দাবি তোলা হচ্ছে। জহির রায়হানের এই নিখোঁজ হওয়া নিয়ে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তৎকালীন সরকার। যার প্রধান ছিলেন দেশের শীর্ষস্খানীয় একজন আইনজীবী। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। শাহরিয়ার কবীররা কেন তাকে জিজ্ঞেস করেন না ওই তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে। তখনতো কোন রাজাকার, আল-বদর ক্ষমতায় ছিলো না। ক্ষমতার দণ্ডমুণ্ডের হর্তাকর্তা ছিলেন স্বাধীনতার একচ্ছত্র দাবিদার আওয়ামী লীগ নেতারা। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে কেন তারা জহির রায়হানের নিখোঁজ রহস্য উদঘাটন করেননি। তারপর বিগত ১৫ বছরে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনামলে ৫ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। এ ৫ বছরেও স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হলো না কেন? কেন জহির রায়হানের নিখোঁজ রহস্য উদঘাটন করা হলো না? এ জন্য তো কোন দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠী দায়ী হতে পারে না। তা হলে আমরা নিশ্চিত ধরে নিতে পারি, বিশেষ মহলের ইঙ্গিতে জহির রায়হানকে অপহরণ ও নিখোঁজ করার পেছনে সুদূরপ্রসারী কোন উদ্দেশ্য ছিল। যার ফলে বিশেষ মহলের পরামর্শে শাহরিয়ার কবীররা এক-এক সময় এক-এক ইস্যু নিয়ে মাঠে নামেন অথবা দূর নিয়ন্ত্রিত রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে মাঠে নামানো হয়। যে গলায় তাদের নুন-নেমক গেলানো হয়, সেই গলা দিয়ে দেশকে অকার্যকর অথবা ব্যর্থ রাষ্ট্র আখ্যা দেয়া, সংখ্যালঘু নির্যাতনের উদ্ভট সব কল্পকাহিনী, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির তিন যুগের বস্তা পচা কাহিনী নিয়ে মাঠ গরম করার অপচেষ্টা করেন। আর এসব করা না হলে যে তাদের নেমকহারাম হতে হবে। শাহরিয়ার কবীররা নুন-নেমক খেয়ে নেমক হারাম হতে চান নাতো, তাই রিমোট কন্ট্রোলের বোতামে যখনই চাপ পড়ে তখনই এক একটি অযৌক্তিক ইস্যু নিয়ে দেশের স্বাভাবিক পরিস্খিতিকে অস্খিতিশীল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হন। অতীতেও তারা তাই করেছেন। প্রতিবেশী দেশটির স্বার্থরক্ষায় এবং তাদের সুদূরপ্রসারী নীল-নকশা বাস্তবায়নে এরা সদা তৎপর। বর্তমান সরকারকে এ বিষয়টি অবশ্যই মনে রাখতে হবে। সচেতন হতে হবে আগামীর বাংলাদেশকে গড়ার নতুন প্রজন্মকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

