তিন মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন ১৮ মাসের দ্বারপ্রান্তে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক মূল দায়িত্ব একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কিন্তু বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার সে কাজটি এখনো করতে সক্ষম হয়নি। আগামী কত মাসের মধ্যে তা সম্পন্ন করতে পারবেন তা কেউ বলতে পারছে না। সরকার তার সাংবিধানিক মূল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেও নিত্য-নতুন বিভিন্ন দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। জনগণকে তারা বুঝাতে চাইছে সরকার তো বসে নেই। একটার পর একটা কাজ তারা করেই চলেছে। বিগত ৩৫ বছরে যে কাজ কেউ কখনো করেনি তাদেরকেই তা করতে হচ্ছে। ‘আলী বাবা চল্লিশ চোর'-এর মর্জিনার মতো ‘ছি: ছি: এও জঞ্জাল' বলে গান গাইতে গাইতে বহুমুখী সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এ সরকার। ভালোভাবে দেশ গড়ে শান্তির সমীকরণ প্রতিটি গৃহে পৌঁছে দিতে সরকার অতিমাত্রায় ব্যস্ত! আর এ মহতি লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকারি উদ্যোগে সম্প্রতি শেষ হলো দেশব্যাপী পরিচালিত রোড শো এসো বাংলাদেশ গড়ি।' রোড শো-এর যাত্রা শুরু হয় ১ জুন। সারাদেশের ৫০টি জেলা এবং ১৭৫টি ইউনিয়ন ঘুরে রোড শো'টি ১৩ জুলাই রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসে। বলা হয়েছে, সৎ, যোগ্য নেতৃত্ব, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, দুর্নীতি রোধ, টেলিযোগাযোগ খাতকে উৎসাহ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশ গড়তে গণসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী রোড শো'-এর আয়োজন করা হয়। এছাড়া স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের উদ্যোগে এ বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে দেশব্যাপী শুরু হয় ফ্রেসজেলমুখ সাফাই, দেশ সাফাই' কার্যক্রম। এ দু'য়ের সফল সমাপ্তি উপলক্ষে ১৭ জুলাই মিরপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ।' হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা গানের তালে মেতে উপভোগ করেন এ কনসার্ট। কনসার্টটিতে গান পরিবেশন করেন জনপ্রিয় শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু, মিলা, খালিদ, মমতাজ ও আইয়ুব বাচ্চু। ১৮ই জুলাই দৈনিক ইত্তেফাক এ সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে লেখে, “জনপ্রিয় শিল্পীদের জনপ্রিয় সব গানে দর্শক-শ্রোতা উদ্বেল হয়ে ওঠে। গানের পাশাপাশি জনপ্রিয় শিল্পীরা দর্শকদের দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার আহ্বান জানান। দর্শকরাও শিল্পীদের এ উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দেন। মনে হচ্ছে, একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও দেশ গঠন এখন কেবল সময়ের ব্যাপার! কিন্তু কনসার্ট-এ অংশগ্রহণকারী হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠনের যে সাড়া দিয়েছেন সে সাড়ায় তারা কত সময় উজ্জীবিত থাকবেন সেটাই প্রশ্ন। ইত্তেফাক এ সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের সাথে এক তরুণী শিল্পীর ছবিও ছাপিয়েছে। ওড়নাবিহীন তরুণীটি যে শর্টটাইট ড্রেস পরিধান করেছে তাতে তার শরীরের উপরের আকর্ষণীয় অংশ দর্শকেরা বেশ আকর্ষণীয়ভাবেই উপভোগ করেছেন। শর্টটাইট ড্রেসের আকর্ষণীয় দেহের এসব গান এবং ভারী ভারী শ্লোগান অনেকের কাছে অল্প সময়ের জন্য হলেও বড় আকর্ষণীয় হয় বটে কিন্তু তাতে কারো চরিত্র পবিত্র হয়ে ভালো কাজের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয় বলে শুনিনি। বরং উল্টোটিই বেশি ঘটে। , কনসার্টের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত দেশগড়ার যে প্রক্রিয়া দেখছি তা যদি সার্থক হয় তাহলে বরং আরো বেশি বেশি কনসার্টের আয়োজন করলেই ভাল হবে। শুধু ঢাকা কেন দেশের প্রতিটি বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা এমনকি প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে কনসার্ট আয়োজন করা তো কঠিন কোনো কাজ না। এতোদিন রাজনীতিবিদরা যে কাজটি করতে পারেননি, অর্থাৎ দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠনে ব্যর্থতার যে পরিচয় দিয়েছেন তা যদি দেশব্যাপী রোড শো এবং কনসার্ট দিয়ে করা যায় তাহলে আর অযথা দেরি কেন? সংশ্লিষ্টদের বলবো- এমন সুযোগ হেলায় হারানো ঠিক হবে না।
রোড শো'তে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করায় রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজটের কারণে যে জনদুর্ভোগ হয় তাকে চেপে গিয়ে ‘প্রথম আলো' লিখে, ‘রোড শো যেসব সড়ক প্রদক্ষিণ করে সেগুলোতে অবশ্য সাময়িক যানজটের সৃষ্টি হয়।' সাময়িক যানজটের' (!) বিষয়টিও তুচ্ছ মনে হবে যখন পাঠকেরা পরবর্তী বাক্যটি পড়বেন। পত্রিকাটি লিখেছে, তবে বাহারি রঙের গাড়ির বহর থেকে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ....... ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশগড়ার ডাকে ঠিকই আকৃষ্ট হয়েছে সাধারণ মানুষ।' সাধারণ মানুষ এবং সচেতন পাঠকেরাও কিন্তু বুঝতে পেরেছেন যে, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীনতার এ সময়ে সরকারের রোড শো'তে যতোটা না আকৃষ্ট হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ তার চেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়েছে তথাকথিত সুশীল সমাজের মুখপাত্র ‘দৈনিক প্রথম আলো'। সায়েদাবাদ এলাকার জনৈক পথচারী পত্রিকাটিকে যথার্থই বলেছেন, “এ সরকারের আমলে নতুন নতুন অনেক কিছুই দেখা যাচ্ছে।” ‘নতুন নতুন অনেক কিছু' করতে গিয়ে সরকারের কাছে জনসেবার কাজটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। অত্যন্ত দু:খজনক হলেও সত্য যে, সিডরের পর প্রায় ৮ মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত ঘূর্ণিদুর্গত এলাকার অসংখ্য মানুষ খোলা আকাশের নিচে জীবনযাপন করছে। রোড শো, কনসার্ট, বিদেশ ভ্রমণ প্রভৃতির মাধ্যমে সরকার যেখানে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করছে সেখানে সিডর বিধ্বস্ত এলাকার হাজার হাজার মানুষকে একটু আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা আকাশের নিচে থাকা ব্যাপক অংশের দুর্গত মানুষের ভোগান্তির কথা স্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: শাহ নেওয়াজ তালুকদার ‘নয়া দিগন্ত'কে বলেন, “আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করছি।” শরণখোলার ঐ গৃহহীন হাজার হাজার অসহায় মানুষের পাশ দিয়ে ‘এসো বাংলাদেশ গড়ি' এর রোড শো'টি অতিক্রম করেছে কি না জানি না, গাড়ির বহরটি দেশব্যাপী ভ্রমণ করতে কতো টাকা ব্যয় হয়েছে তাও অজানা, কনসার্ট এবং মালয়েশিয়া ভ্রমণে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তাও হয়তো অজানা থাকবে, কিন্তু এই অর্থগুলো যদি গৃহহীন মানুষদের একটু আশ্রয় দেয়ার জন্য ব্যয় করা হতো তাহলেই হয়তো ‘দেশ গড়ার' কাজ করার দৃষ্টান্ত স্খাপিত হতো। রাজধানী ঢাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে জাতির স্বঘোষিত বিবেক বলে দাবিদার সুশীল সমাজের যেসব নেতা রঙিন চশমা পড়ে পৃথিবীকে রঙিনরূপে দেখতে অভ্যস্ত, যাদের কাছে দু:খী, অনাহারী, গৃহহীন মানুষের কান্নাকে হাসি বলে মনে হয় তারা আর যা হউন- আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে ‘গড়া'র পরিবর্তে যে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন তা এ দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ বুঝতে পেরেছে। এই বিদেশ চালিত সরকার দেশকে আর কোথায় নিয়ে যাবে? তা এখনো সন্দেহমন্ডিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



