বাংলাদেশে প্রথম গণতন্ত্র হত্যা
বাংলাদেশে প্রথম গণতন্ত্র হত্যাকারী কোনো সামরিক ব্যক্তি নয়। কলংকের কথা হলো, এমন এক ব্যক্তি এ কর্মটি সম্পন্ন করেন, যিনি ক্ষমতাসীন হওয়ার পূর্বে সারা জীবন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছেন, যিনি জননেতা হিসেবে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের আনুগত্য ও হেফাযতের শপথ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তার মতো জনপ্রিয়তার কিংবদন্তি পুরুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মাত্র দু' বছর পরই যে শাসনতন্ত্রের হেফাযতের শপথ নিলেন সে গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রকেই বিকৃত করে একদলীয় বাকশালী শাসন চালু করেন। তিনি কেন তার ভক্ত জনগণের উপর এত অল্প সময়ের মধ্যে আস্খা হারালেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। তাহলে কি বাস্তবে তার জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল?
তিনি আক্ষেপ করে তাঁর তৈরি দলীয় বাহিনী সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেলাম চোরের খনি।'
তিনি নি:সন্দেহে একজন যোগ্য সংগঠক ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্বে যে বিশাল ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন তা যদি চোরের খনিতে পরিণত হয়ে থাকে তাহলে এর জন্য তিনি ছাড়া আর কেউ তো দায়ী হতে পারে না।
গণতান্ত্রিক পন্থা রুদ্ধ হয়ে গেল
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা করাই গণতন্ত্রের প্রধান দাবি। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্খাই বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাজনীতি হিসেবে গণ্য। নির্বাচিত দলীয় সরকার তার মেয়াদকালে জনগণকে সন্তুষ্ট করতে অক্ষম হলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ অন্য দলকে নির্বাচিত করে। এটাই প্রচলিত গণতান্ত্রিক নীতি।
একদলীয় বাকশালী ব্যবস্খায় নির্বাচন হলে জনগণ বাধ্য হয়ে বাকশালকেই ভোট দেবে। এটাকে নির্বাচন বলা হাস্যকর। বাকশাল যাদেরকে মনোনয়ন দেবে তারাই নির্বাচিত হবে। তাহলে ভোটের কোনো দরকারই নেই। নির্বাচনী প্রহসন করেই মেয়াদ শেষে আবার বাকশালী শাসনই চালু হবে।
বাকশালী ব্যবস্খায় ৪টি দৈনিক পত্রিকা সরকারি মালিকানায় রাখার ব্যবস্খা করা হয়। আর সব পত্রিকা ব করে দেওয়া হয়। সরকারি পত্রিকায় সবসময় সরকারের সব কাজের প্রশংসাই করা হবে। সরকারের সমালোচনা করার জন্য কোনো পত্রিকা না থাকলে জনগণ সরকারি স্বেচ্ছাচারিতা সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবে না।
এ জাতীয় ব্যবস্খায় গোটা দেশ কারাগারে পরিণত হবে। জনগণ সরকারের গোলাম হয়ে নীরবে সবকিছু সহ্য করতে বাধ্য হবে। এ থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো গণতান্ত্রিক পথই থাকবে না।
জাতীয় সংসদে এমন স্বৈরশাসন কেমন করে অনুমোদন পেল?
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শাসনতন্ত্রের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশালী স্বৈরশাসনের পক্ষে নির্বাচিত ৩০০ সংসদ সদস্য কেমন করে সম্মতি দিলেন তা বিশ্বের মহাবিস্ময়। সংগ্রামী আওয়ামী লীগের বিপ্লবী নেতৃবৃন্দসহ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ কেমন করে এমন চরম গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন?
জানা যায় যে, ৩০০ এমপি'র মধ্যে মাত্র দু'জন গণতন্ত্র হত্যার প্রতিবাদে সংসদ সদস্য পদ পরিত্যাগ করেন। তাঁরা হলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এজি ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। তাঁরাও অবশ্য আওয়ামী লীগেরই দলীয় এমপি ছিলেন। তবে এ দুজনই মাত্র গণতন্ত্রে আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী ছিলেন।
বর্তমানে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী ড. কামাল হোসেন এবং ১৯৭৫ সালে কারাগারে নিহত চার জাতীয় নেতাসহ আওয়ামী লীগের সকল এমপি অভাবে গণতন্ত্র হত্যায় নেতার আনুগত্য করলেন।
উক্ত সংসদের নির্বাচন ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৭টি আসন দয়া করে দখল করেনি। সে নির্বাচন কতটুকু ‘নিরপেক্ষ' ছিল তা কারো অজানা নেই।
স্বৈরশাসনের অনিবার্য পরিণাম
একটি গণতান্ত্রিক দেশে যদি এমন স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা হয়, যে শাসন থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবশিষ্ট থাকে না, তাহলে এর ঐতিহাসিক পরিণাম অনিবার্য হয়ে পড়ে। তখন শক্তি প্রয়োগ করে স্বৈরশাসনের অবসান করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না।
বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার বহাল করার জন্য শক্তি প্রয়োগ ছাড়া আর কোনো উপায় রইল না। জনগণের পক্ষে শক্তি প্রয়োগের কোনো সুযোগ ছিল না। সরকারবিরোধী আন্দোলন করে গণ-অভ্যুথানের উপায়ও ছিল না। অসহায় ও নিরুপায় জনগণকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করার জন্য সামরিক বিপ্লব ছাড়া আর কোনো পথই খোলা ছিল না। এই পথেই মুজিব শাসনের পতন ঘটে।
এমন পরিস্খিতিতে দেশে দেশে সশস্ত্র বাহিনীই সাধারণত এ ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন মি. ভুট্টোর স্বৈরশাসন থেকে ১৯৭৭ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সামরিক শাসক নিজেই আবার স্বৈরশাসকে পরিণত হয়।
মুজিব সরকারের সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা বিভাগ, শেখ মুজিবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ভারত সরকারের গোয়েন্দা সংস্খা ‘র' এবং মুজিব সরকারের ঘনিষ্ঠ বু রাশিয়ার গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান কেজিবি সদা তৎপর থাকা সত্ত্বেও মুজিব হত্যার মতো এতো বিরাট ঘটনা সত্যিই অলৌকিক ব্যাপার।
মুজিব হত্যার পরিকল্পনাকারী সেনা কর্মকর্তারা লিবিয়ার কর্নেল গাদ্দাফীর মতো সামরিক শাসন কায়েম করেননি। তারা শাসনতন্ত্রকে মুলতবি করেননি এবং জাতীয় সংসদকে বাতিল ঘোষণা করেননি। শেখ মুজিব সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী খোন্দকার মুশতাক আহমদকে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করতে সম্মত করান। তিন সশস্ত্রবাহিনীর প্রধানগণ নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করায় জুনিয়র অফিসারদের সশস্ত্র বিপ্লব সফল হয়। দেশ ও জনগণ স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পায় এবং গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত হয়।
বিপ্লবী জুনিয়র অফিসারগণ যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এ দু:সাহস করতেন, তাহলে তারা সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করতেন, শাসনতন্ত্র বাতিল বা মুলতবি করতেন, জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দিতেন এবং সশস্ত্রবাহিনী প্রধানদেরকে অপসারণ করতেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, দেশ ও জনগণের কল্যাণের উদ্দেশ্যেই তাঁরা জীবনের এত বড় ঝুঁকি নিয়ে এ অসাধ্য কাজ সমাধা করার হিম্মত দেখিয়েছেন।
মুজিব হত্যার প্রতিক্রিয়া
১৯৭১ ও '৭২ সালে শেখ মুজিবের যে আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা ছিল এবং তিনি জনগণের যে আবেগপূর্ণ ভালোবাসার অধিকারী ছিলেন, যদি এর সামান্য পরিমাণও অবশিষ্ট থাকত তাহলে সপরিবারে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরূপ প্রতিক্রিয়া কিছুটা হলেও প্রকাশ পেতো। জনগণের সামান্য সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাকশাল নেতৃবৃন্দ অন্তত প্রতিবাদ মিছিল বের করতেন। কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া হয়নি।
এর জলন্ত সাক্ষী ১৫ আগস্ট থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাসমূহ। দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ সে সময় প্রধান পত্রিকা ছিল। ঐ পত্রিকা দুটোতে ১৫ আগস্ট থেকে ক্রমাগত যত সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে সঠিক তথ্য জানা যাবে।
আমি তখন লন্ডনে ছিলাম। আমি ইস্ট লন্ডন এলাকায় অবস্খান করতাম যেখানে বাংলাদেশি প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বসবাস করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তারা দেশের জনগণের চেয়েও বেশি উৎসাহের সাথে সক্রিয় ছিলেন। দেশে তো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কারণে প্রকাশ্যে তৎপরতা চালানো সহজ ছিল না। লন্ডনে তো পরিবেশ ভিন্ন ছিল। মুজিব হত্যার পর দেশে তো কেউ সামান্য প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। কিন্তু লন্ডনের পরিবেশে আওয়ামী লীগ সমর্থকরাও কেন সামান্য বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারলেন না তা সত্যিই বিস্ময়ের ব্যাপার। কেউ ব্যক্তিগতভাবেও শোক প্রকাশ করেছে বলে জানা যায়নি।
লন্ডনের পত্রিকায় ১৫ আগস্টের খবর যে ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল এর বিশুদ্ধ অনুবাদ থেকে জনগণের মধ্যে মুজিব হত্যার প্রতিক্রিয়া জানা যায়। নিম্নে অনুবাদ পেশ করা হলো :
‘১৫ আগস্ট। ঢাকায় কারফিউ জারি করা হয়। শুক্রবারের নামাযের সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে দু' ঘন্টার জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হয়। ঐ সময় সংগঠিত মিছিলের আকারে জনগণকে মসজিদের দিকে যেতে দেখা যায়। তাদের চোখ-মুখ, হাবভাব ও আচরণ দেখে মনে হয় যে, তারা কোনো জাতীয় উৎসব পালন করছে। রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে একই দৃশ্য দেখা গেল।'
লন্ডনের পত্রিকায় প্রকাশিত এ রিপোর্ট সঠিক কি না এর সাক্ষ্য তারাই দিতে পারেন যারা তখন ঢাকায় ছিলেন। আওয়ামী লীগের ৪৫ ঊর্ধ্ব সকলেই এর সাক্ষী।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ এ বছর (২০০৮) ১৫ আগস্টে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে দাবি করেন যে, মুজিব হত্যার জন্য যদি ফাঁসি দিতে হয় তাহলে তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকেই প্রথমে ফাঁসি দেওয়া উচিত। পত্রিকায় এটুকুই পড়েছি। কোন্ যুক্তিতে তিনি এ দাবি করলেন তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি।
আমার ধারণা, এ দাবির পেছনে যুক্তি হলো যে, সেনাপ্রধান হিসেবে দেশের প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালনে সেনাপ্রধান ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরই অধীনস্ত কতক সেনা কর্মকর্তা কেমন করে এ হত্যাকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা করল যে, তা তিনি টেরই পেলেন না। এরপর আরো বড় অপরাধ হলো যে, সেনাপ্রধান হয়ে হত্যাকারীদের অপরাধকে অনুমোদন দিয়ে তাদের মনোনীত রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করলেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

