অবশেষে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের আহ্বায়ক এবং পরিকল্পনা মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব
আমরা জানি, বাংলাদেশে অনেক ফোরাম আছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদেরও আছে একাধিক সংগঠন। এখন সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের উদাহরণে উৎসাহী হয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জব্দ করার লক্ষ্যে তারাও যদি অভিযোগ গ্রহণ করে রায় প্রদান শুরু করে দেয় তাহলে দেশের পরিস্খিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর যে দল ক্ষমতাসীন হয়, তার এক নম্বর কর্তব্য ছিল যুদ্ধাপরাধী, পাকিস্তানীদের দালাল ও অপরাধীদের গ্রেফতার করা এবং বিচারের মুখোমুখি করা। এটি তাদেরই দায়িত্ব, অন্য কোন পরবর্তী সরকারের নয়। এ ক্ষেত্রে তারা মোটেই কোন কাজ করেনি, তা-ও নয়। বাহাত্তরের ২৪ জানুয়ারি জারি করা হয় ‘দ্য বাংলাদেশ কলাবেরটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার, ১৯৭২। ওটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইন ছিল না, তা ছিল পাকিস্তানীদের যেসব দালাল সহযোগী হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতির সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচারের আইন। এক সদস্যের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালও গঠিত হয়েছিল দায়রা জজ ও অতিরিক্ত দায়রা জজের নেতৃত্বে। হাজার পঞ্চাশেক অপরাধীকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। দালাল আইন দু'-তিনবার অ্যামেন্ডমেন্ট বা সংশোধন করা হয় ১৯৭২ সালের ১ জুন ও ২৯ আগস্ট। দালাল আইনের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময়ই বিতর্ক হয়েছিল। এই আইনের অপপ্রয়োগ হতে পারে, সে আশংকা ব্যক্ত করেছিলেন সে সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবীরা। তাদের মধ্যে মাওলানা ভাসানী, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, আবুল মনসুর আহমদ, আতাউর রহমান খান, আবুল ফজল, বিচারপতি এসএম মোর্শেদ, আলীম আলরাজী, এনায়েতুল্লাহ খান প্রমুখ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করেছেন। সে জন্য এক পর্যায়ে তিনি সাধারণ ক্ষমাই ঘোষণা করেন। তবে খুন-ধর্ষণের সুনির্দিষ্ট অপরাধীদের তিনি ক্ষমা করেননি।দালাল প্রশ্ন সমাধানে বঙ্গবন্ধুর সময় যথেষ্ট কাজ হয়েছে। তবে ১৯৭৫ পর্যন্ত স্বাধীনতার পক্ষ এবং পাকিস্তানী দালালদের মধ্যে একটি বিভাজনরেখা ছিল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ও বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের সরকার যেদিন কাজী জাফরের নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠন করে, সেদিন মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের-স্বাধীনতা সংগ্রামী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের পার্থক্য সম্পূর্ণ ঘুচে গেল। ওই কমিশনে মাওলানা মান্নানও ছিলেন, জাহানারা ইমামও ছিলেন। এসব তথ্যে যারা বিব্রত বোধ করছেন, তাদের রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি সত্যরে লও সহজে।রেখে অত্যন্ত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ পাকিস্তানীদের সহযোগিতা করেছেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত না হলে, আর বছর খানেক টিক্কাখাঁরা বাংলাদেশ দখল করে রাখলে অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে আজ মানুষ ভিন্ন পরিচয়ে জানত। দেশপ্রেমিকের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান, তারা বলছেন, দালালদের এ দেশে থাকার অধিকার নেই, তাদের এক্ষুণি ফাঁসি দিতে হবে, দালালদের প্রশ্নে সমস্ত জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। এসব উক্তির অর্থ বোঝার সাধ্য আমার মতো মানুষের নেই। কোনো যুদ্ধে বিজয়ী শক্তির দায়িত্ব বিরাট। ক্ষমা করার ক্ষমতা শুধু বিজয়ী শক্তিরই থাকে পরাজিতদের নয়। জাতি যদি আজ সত্যি ঐক্যবদ্ধ থাকত, তাহলে এর চেহারা হতো অন্য রকম; বিশ্বে মর্যাদা হতো অনেক উঁচুতে। দেশ আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে যদি আমরা সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করি তাহলে ১8কোটি মানুষের জীবনে নেমে আসবে অমানিশার অকার। দালাল ও স্বাধীনতা বিরোধীদের ব্যাপারে প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবু যে সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন, সেখান থেকে আবার পেছনের দিকে যাওয়া সম্ভব হবে না। কোনো সরকারের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। তিনি যাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, তাদের আবার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে না।
জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বঙ্গবু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও এ দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক এবং ভারতীয় তাত্ত্বিকরা যেন তা মানতে রাজি নন। লাগাতারভাবে তারা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের প্রোপাগাণ্ডা। তাদের প্রোপাগাণ্ডার পক্ষে তারা বাংলাদেশের সব সরকারকেই ব্যবহার করতে চান। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ যখন ভারত সফরে যান তখন ভারতীয় তাত্ত্বিক হিরন্ময় কারলেকার দি পাইওনিয়ার' পত্রিকায় তার জন্য ছাপান এক বার্তা। এতে কারলেকার ভারতীয় নীতি-নির্ধারকদের এই মর্মে পরামর্শ দেন যে, জেনারেল আহমেদকে বৈধতাদানের আগে ভারতের উচিত হবে বাংলাদেশকে ‘সেখানে থাকা' ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের শিবির গুটিয়ে নিতে বাধ্য করা, শুধু অনুপচেটিয়াই নয় উলফার পরেশ বড়ুয়াকেও ভারতের হাতে হস্তান্তরে বাধ্য করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্খা করা এবং জামায়াতে ইসলামীকে দমন করা।' লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারতীয় তাত্ত্বিকরা শুধু বিতর্কিত ও ভিত্তিহীন বক্তব্য রেখেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও হস্তক্ষেপ করতে চান, তারা ভারতে থেকেই সরকারের মাধ্যমে দমন করতে চান জামায়াতে ইসলামীকে। এখন এ দেশের জনগণকেই বিবেচনা করে দেখতে হবে, তারা কোন্ পথে যাবেন- একটি পথ হলো বঙ্গবুর সাধারণ ক্ষমা ও ঐক্যের পথ, অপরটি হলো- হিরন্ময় কারলেকারদের বিভাজন ও হিংসার পথ।
আশা করি বঙ্গবন্ধুর সরকারের মত বর্তমান সরকারও বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


