‘ডিজিটাল' পদ্ধতিতে ক্ষমতায় যেতে না যেতেই সুর পাল্টে গেছে আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীদের। সত্য তো এড়াচ্ছেনই, তারা এমনকি এমন অনেক প্রতিশ্রুতির কথাও পাল্লা দিয়ে অস্বীকার করেছেন- যেগুলো মানুষ নির্বাচনের আগে তাদের মুখ থেকেই শুনেছে। যেমন জিনিসপত্রের দাম কমানোর বহুল আলোচিত বিষয়টি নিয়ে তারা রীতিমতো তামাশা শুরু করেছেন। নির্বাচনে বিজয় হচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়ার পর মুহূর্ত থেকে এ ব্যাপারে কথা উল্টাচ্ছেন নেতারা। প্রথমেই এসেছে চাল ও সারের প্রসঙ্গ। কারণ, নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা বিভিন্ন জনসভায় বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে তারা ‘১০ টাকা কেজি দরে' চাল খাওয়াবেন ‘বিনামূল্যে' সার দেয়ার কথা তিনি এমনকি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত জনসভাতেও ঘোষণা করেছিলেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীরা দিব্যি সে কথা অস্বীকার করে চলেছেন। তারা বলছেন, শেখ হাসিনা নাকি কোনো ভাষণেই এ ধরনের অঙ্গীকার করেননি, প্রতিশ্রুতিও দেননি। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব বলেছেন, মেনিফেস্টোতেই যা বলা হয়, তা বাস্তব নয়। তার মানে তাদের মেনিফেস্টোকেই তারা অস্বীকার করবেন। নতুন একটি ‘গোপন তথ্য'ও আবিষ্কার করেছেন তারা। বলেছেন, ‘১০ টাকা কেজি দরে' চাল খাওয়ানোর এবং ‘বিনামূল্যে' সার দেয়ার মতো কথাগুলো নাকি আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বিএনপি প্রচার করছে।
অন্য অনেকভাবেও নতুন সরকারের ‘চমক' সৃষ্টিকারী মন্ত্রীরা জবর দেখিয়ে চলেছেন। ৮ জানুয়ারি পবিত্র আশুরার ছুটি কাটানোর পরিবর্তে কারওয়ান বাজারে গিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী কর্নেল (অব
চমৎকার! আশ্বাস বটে ‘প্রেসক্রিপশন' এবং ‘দাওয়াই'ও বলা যায় একে। এটা কিন্তু মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের কাহিনী স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। মরহুম শেখ মুজিব 'যুক্তফন্সন্ট মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দুর্নীতি দমন বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। যেখানেই গেছেন সেখানেই জনসভায় শেখ মুজিব বলেছেন, কোথাও কোনো সরকারি কর্মচারীকে ঘুষ খেতে বা দুর্নীতি করতে দেখলে জনগণ যেন ‘দুই পয়সার পোস্ট কার্ডে' ওই কর্মচারীর নাম লিখে তার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। পোস্ট কার্ড পেলেই তিনি অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্খা নেবেন।
বলা হচ্ছে, ফারুক খানও জনগণকে বোকা বানানোর জন্য সেকালের শেখ মুজিবকে অনুসরণ করতে চাচ্ছেন। কারণ, সেকালের ‘দুই পয়সার পোস্ট কার্ড' যেমন মন্ত্রী শেখ মুজিব পর্যন্ত পৌঁছায়নি, একালের মোবাইলেও তেমনি মন্ত্রী ফারুক খানকে পাওয়া যাবে না। বাস্তবে ব্যস্ততার কারণেই সাধারণ মানুষের পক্ষে যখন-তখন একজন মন্ত্রীকে পাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া মোবাইলও মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীরাই ধরে থাকে। সুতরাং এমন বোঝানো ঠিক নয় যে, ‘মোবাইল' করলেই কেউ মন্ত্রী ফারুক খানকে পেয়ে যাবেন, তার কাছে নালিশ জানাতে পারবেন এবং চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্খা নেয়া হবে।
দাম কমানোর ব্যাপারেও বাণিজ্যমন্ত্রী কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য কথা বলেননি। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তার বরং মতপার্থক্যের প্রকাশ ঘটেছে। কারণ, দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, প্রয়োজনে বাজার ব্যবস্খায় সরকার হস্তক্ষেপ করবে। অন্যদিকে ফারুক খান বলেছেন, গণতান্ত্রিক সরকার বলে তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চান না। পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, সরকারের উচিত প্রথমে নিজের নীতি-কৌশল ঠিক করা এবং তারপর দাম কমিয়ে আনার মতো বিষয়গুলোতে পদক্ষেপ নেয়। না হলে একেক মন্ত্রী একেক ধরনের কথা বললেও পরস্পর বিরোধী সিদ্ধান্তের কথা জানালে সবকিছু উল্টো ‘গুবলেট' হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে সরকার সাউথ এশিয়ান টাস্ক ফোর্সের ব্যাপারে অতি উৎসাহ দেখালেও সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যার প্রতিবাদে ‘টু শব্দটিও' করেননি। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার দিনটি থেকে প্রায় প্রতিদিনই প্রায় বাংলাদেশীকে হত্যা করছে বিএসএফ। কিন্তু সরকার কোনো উচ্চবাচ্য করছেন না। অন্য যে কোনো দেশ হলে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে আনা হতো এবং ভারত সরকারের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠানো হতো। মৌখিকভাবে রাষ্ট্রদূতকেও সতর্ক করা হতো। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি এবং তার মন্ত্রণালয় এ পর্যন্ত কিছুই করেনি। নয়াদিল্লীতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনারও এ ব্যাপারে নড়াচড়া করেছেন বলে শোনা যায়নি।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুনও জবর কথা শুনিয়েছেন। নির্বাচনের পর থেকে প্রতিদিন যখন দেশের কোথাও না কোথাও চারদলীয় জোটের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর আওয়ামী লীগের গুণ্ডা-সন্ত্রাসীরা আক্রমণ চালাচ্ছে, আক্রমণে অনেকের যখন মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে এবং হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে যখন প্রাণের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে, তখনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে বসেছেন, সবই নাকি বিএনপির অভ্যন্তরীণ গোলমালের কারণে ঘটেছে! বিএনপি ও জামায়াত শুধু নয়, তার এই নিষ্ঠুর মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে এমনকি আওয়ামীপন্থী প্রথম সারির দৈনিকটিও। বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সঠিকভাবেই বলেছেন, নিজ দলীয় নেতা-কর্মীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যেই সাহারা খাতুন মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয়ার এবং মিথ্যাচার করার আওয়ামী চরিত্রের নগ্ন বহি:প্রকাশ ঘটেছে।
বস্তুত যে কোন বিচারে দেখা যাবে, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে উচিত যেখানে ছিল হত্যা-সন্ত্রাসের নিন্দা জানানো এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্খা নেয়া-অন্তত লোক দেখানোর জন্য হলেও ব্যবস্খা নেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া, সাহারা খাতুন সেখানে সরাসরি একজন ‘যথার্থ' আওয়ামী লীগ নেত্রীর চেহারা-চরিত্র নিয়ে হাজির হয়েছেন। জনমনে আশংকাও বেড়েছে একই কারণে। সাধারণ মানুষকেও বলতে শোনা যাচ্ছে, এমন একজন দলবাজ নেত্রীর কাছে আর যা-ই হোক, হত্যা-সন্ত্রাসসহ অপরাধ দমনের আশা করা যায় না। বাস্তবে তিনি বরং আইন-শৃকôখলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকেও দলীয় পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করে ছাড়বেন। সচেতন পর্যবেক্ষকরা আবার স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন- যে আমলে পুলিশ থেকে রক্ষীবাহিনী পর্যন্ত প্রতিটি বাহিনীকে আওয়ামী লীগের দলীয় স্বার্থে গুণ্ডা মাস্তানের মতো ব্যবহার করা হতো।
বোঝা যাচ্ছে, মিথ্যাচার করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এখনো অপ্রতিদ্বন্দবীর অবস্খানেই রয়ে গেছে। এজন্য অন্য একটি কথাও আলোচিত হচ্ছে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে। কথাটা হলো, বাংলাদেশের জনগণ আর যা-ই হোক, বোকা অন্তত নয়। তারা চাল ও সারের দামসহ বিভিন্ন বিষয়ে মাত্র ক'দিন আগে ঘোষিত অঙ্গীকারের কথা ভুলে যাবে এবং মন্ত্রীদের মিষ্টি কথায় প্রভাবিত হয়ে বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাপাতে সম্মত হবে- এ ধরনের চিন্তার পরিণতি মোটেও শুভ হওয়ার কথা নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

