পরিবর্তনের কথা বলে মাত্র ক'দিন আগে আমাদের দেশেও নির্বাচনে ব্যাপক বিজয় অর্জন করেছেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট। শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি সন্ত্রাসবাদ দমনে দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স গঠনের কথা বলছেন। গত ১৭ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেল আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সস্ত্রাসবাদ মোকাবিলা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, অনেক দেশের জন্যই বড় সমস্যা। সন্ত্রাস দমনে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের জন্য তিনি অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করবেন। বিষয়টিকে প্রধানমন্ত্রী এতটাই গুরুত্ব দিচ্ছেন যে, গত ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার স্টিফেন ইভান্স সুধাসদনে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলে তিনি তাকে বলেন, সন্ত্রাসবাদের কোনো সীমানা নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতাও চান।
ভাবতে অবাক লাগে, পরিবর্তনের কথা বলে ক্ষমতায় আসার পরও আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেন পৃথিবীর পরিবর্তনের হাওয়াটা অনুভব করতে পারলেন না! ৯/১১-এর পর মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে প্রেসিডেন্ট বুশ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছিলেন তাতে পৃথিবীর শান্তি বিনষ্ট হয়েছে, সংঘাত ও অবিশ্বাসের মাত্রা বেড়েছে। বুশের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুধু যে পৃথিবীকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে তা নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রকেও ফেলে দেওয়া হয়েছে এক ব্ল্যাকহোলে। এই ব্ল্যাকহোল থেকে উদ্ধারের জন্যই মার্কিন জনগণ ওবামাকে ভোট দিয়েছে। আর ওবামাও তেমন পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার করেছেন জাতির সাথে। এ কারণেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম ভাষণেই তিনি প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ও মার্টিন লুথার কিংয়ের স্বপ্নের কথা উল্লেখ করলেন- যে স্বপ্নের সাথে জড়িয়ে আছে সাম্য-মৈত্রী ও স্বাধীনতার কথা। ওবামা আরো বললেন, অতীতের সমস্ত ঘৃণা অবসানের কথা। তিনি মুসলিম দেশসমূহ ও গরিব দেশগুলোর সাথে কাজ করার নতুন উপায় অবলম্বনের প্রত্যয়ও ঘোষণা করেছেন। আসলে বুশের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের পেছনে ঘৃণার যে তত্ত্ব কার্যকর ছিল সেটাই এবার বর্জন করেছে মার্কিন জনগণ, ওবামাও জনগণের সেই মনোভাবকে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করলেন তাঁর প্রথম ভাষণেই। কিন্তু দু:খের বিষয় হলো, আমাদের প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের সেই হাওয়াটা যেন টের পেলেন না। তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বললেন, অথচ আঁকড়ে থাকলেন ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের' সেই পুরানো তত্ত্ব- যা মিথ্যা ও প্রতারণার দোষে দুষ্ট এবং ঘৃণিতও বটে। সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধেতো তিনি যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনারের কাছে সাহায্য ভিক্ষা চাইলেন, কিন্তু এ ব্যাপারে খোদ যুক্তরাজ্যের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গিটা কেমন তা কি তিনি অবগত নন? বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিব্যান্ড প্রেসিডেন্ট বুশের ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র পাঁচদিন আগে বললেন, “প্রেসিডেন্ট বুশের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' ধারণাটি একটি বড় ভুল, আর এই যুদ্ধে সামরিক শক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দেয়াও আরেকটি ভুল পদক্ষেপ।” তিনি আরো বলেন, সন্ত্রাসের মোকাবিলা করার প্রকৃত উপায় হচ্ছে আইন ও মানবাধিকার পরিস্খিতির উন্নয়ন ঘটানো, দমন অভিযান চালিয়ে বা মানবাধিকার পরিস্খিতির অবনতি ঘটিয়ে সন্ত্রাস ব করা যাবে না। আশা করি বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের' ব্যাপারে নতুন ভাবনার খোরাক পাবেন।
আমাদের দেশে আমরা সন্ত্রাসের যে সব ঘটনা লক্ষ্য করেছি তার মূলে ছিল কিছু বিভ্রান্তি এবং অপরিপক্ক চিন্তা-চেতনার ছাপ। দেশের রাজনীতিবিদ, আলেম-ওলামা ও সরকার যখন ঐক্যবদ্ধভাবে সন্ত্রাস মোকাবিলায় এগিয়ে এলো তখন শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইদের পরাজয় ঘটলো। আসলে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীই সন্ত্রাস দমনে যথেষ্ট। এ জন্য দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স কিংবা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকা আমরা লক্ষ্য করেছি। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আমরা দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে আবার নতুন কোনো উপদ্রব দেখতে চাই না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে যারা অবগত আছেন তারা জানেন যে, বুশের সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধকে প্রণোদনা দিয়েছে স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত' তত্ত্ব। হান্টিংটন এই তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন ১৯৯৩ সালে। আর এর দীর্ঘ ৫২ বছর আগে ১৯৪১ সালে ৮০ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন, ‘সভ্যতার সংকট' প্রবল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব শান্তি ও সভ্যতা-সংস্কৃতির সংকট স্খান পেয়েছিল ঐ প্রব।ে ১৯৩৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘এশিয়ার সহিত ইউরোপের সম্পর্ক' শীর্ষক প্রবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মূল্যবোধের যে দ্বন্দব তা বিবৃত হয়েছে। ঐ প্রবে তিনি লেখেন, “পাশ্চাত্যের এই ভেদাভেদ তন্ত্রের মূলে রহিয়াছে অন্য জাতির প্রতি ইহাদের অপরিসীম ঘৃণা। জন্মগত স্বাধিকারের নামে অসীম গর্বভরে অন্যজাতিকে ঘৃণা করাই পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।” আমরা হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত' তত্ত্বে সেই ঘৃণার প্রকাশ লক্ষ্য করেছি। আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আমরা বুশকে লক্ষ্য করেছি সেই তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে। পাশ্চাত্য সভ্যতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, আরো অনেকেই কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে আমরা খৃস্টান বংশোদ্ভূত ফিলিস্তিনী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মুখপাত্র এবং প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদের কথা উল্লেখ করতে পারি। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘প্রাচ্যবাদ' গ্রন্থেও পাশ্চাত্য সভ্যতার বিশ্লেষণ হয়েছে। তিনিও উল্লেখ করেছেন, পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো, অন্য জাতির প্রতি ঘৃণা। হান্টিংটনরা আসলে সভ্যতায় প্রাচ্যের ভূমিকা স্বীকার করতে চান না। অথচ সভ্যতা শুধু পাশ্চাত্যের অবদান নয়, প্রাচ্যেরও।
আমরা এবার ফিলিস্তিনের গাজায় যে হত্যাযজ্ঞ লক্ষ্য করলাম তাকি আসলে দু'টি সভ্যতার মধ্যে কোনো সংঘাতের ফসল ছিল? না, আসলে তা ছিল রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সভ্যতার সংকটের ফসল যার মূলে ছিল অন্য জাতির প্রতি ঘৃণা। এই ঘৃণা থেকেই বুশ তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। ওবামা অবশ্য এই ঘৃণার পথ পরিহারের কথা বলেছেন, নতুন পথ পরিক্রমার কথা বলেছেন। আমরা মনে করি আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও উচিত হবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পুরনো পথ পরিহার করে নতুন পথের অভিযাত্রী হওয়া। কারণ, এ পথেই নিহিত রয়েছে জাতির মঙ্গল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


