ক্ষমতায় বসতে না বসতেই সরকার ভারতের ইচ্ছা পূরণের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ক'দিন আগে পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন বলে বসেছেন, ভারতের বদৌলতে কিছু পরিমাণে হলেও পানি যে পাওয়া যাচ্ছে সেটাই নাকি আমাদের
‘সৌভাগ্য' এবং এতেই আমাদের খুশি থাকা উচিত! মন্ত্রী আরও বলেছেন, ভারত নাকি উজানে পানি প্রত্যাহার করছে না! এ এক অতি চমৎকার ‘আবিষ্কার' বটে! রমেশ চন্দ্র সেনকে তাই বলে দোষ দেয়া যাবে না। কারণ, তিনি তার পূর্বসুরীকে অনুসরণ করেছেন মাত্র। স্মরণ করা দরকার, ১৯৯৮ সালে ভারত ফারাক্কাসহ বিভিন্ন বাঁধের গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে তলিয়ে দেয়ার পরও তখনকার পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘উজান' দেশের পানিতে ‘ভাটির' দেশ বাংলাদেশকে সব সময় ‘ডুবতেই' হবে! এমনটাই ভারতের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের মনোভাব।
এমন মন্তব্যের যৌক্তিকতা বুঝতে হলে শুরুর দিকে দৃষ্টি ফেরাতে হবে। বস্তুত স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ভারতের পানি আগ্রাসন শুরু হয়েছিল। এর উপলক্ষ তৈরি করেছিল ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি। সে বছরের ১৬ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাীর সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ফারাক্কা বাঁধ চালু করার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন। কথা ছিল, ফারাক্কা বাঁধ সম্পূর্ণরূপে চালু করার আগে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে উভয় পক্ষ যাতে সমঝোতায় আসতে পারে সেজন্য ভারত প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ফিডার ক্যানেল চালু করবে। সে অনুসারে ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল। সমঝোতা ছিল, ৪১ দিনের নির্ধারিত সময়ে ভারত ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানি ফিডার ক্যানেল দিয়ে হুগলী নদীতে নিয়ে যাবে। কিন্তু ৪১ দিনের পরও ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি সরানো অব্যাহত রাখে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি নিয়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে ফিডার ক্যানেল চালু করার পর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মায় পানি প্রবাহ যেখানে ছিল ৬৫ হাজার কিউসেক সেখানে ১৯৭৬ সালে তার পরিমাণ নেমে আসে মাত্র ২৩ হাজার ২০০ কিউসেকে। এর প্রধান কারণ ছিল ফিডার ক্যানেল দিয়ে ভারতের পানি সরিয়ে নেয়া।
এভাবেই শুরু হয়েছিল ভারতের পানি আগ্রাসন। এর প্রতিবাদে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘ফারাক্কা মিছিল' (১৬ মে, ১৯৭৬)। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই মিছিলের ব্যাপক প্রচারণার সদ্ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে ফারাক্কা প্রসঙ্গ উথাপন করেছিলেন, জাতিসংঘও ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ৫ নবেম্বর ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল ‘ফারাক্কা চুক্তি'। এর মাধ্যমে গঙ্গার পানির ওপর বাংলাদেশের দাবি ও অধিকার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে একটি গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, যার কারণে ভারত যথেচ্ছভাবে কম পানি দিতে পারেনি। কিন্তু পানি প্রাপ্তির গ্যারান্টি তুলে দিয়েছিল এরশাদ তার আমলের চুক্তিতে। অবস্খা আরও পাল্টে গিয়েছিল ১৯৯৬ সালে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। সে বছরের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় এটা ছিল এক ‘ঐতিহাসিক চুক্তি।'
কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পর, ১৯৯৭ সালের মার্চেই ভারত আগ্রাসনকে আরো প্রচন্ড করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী মার্চের প্রথম ও দ্বিতীয় ১০ দিনের চক্রে বাংলাদেশের প্রাপ্য যেখানে ছিল ৩৫ হাজার কিউসেক, ভারত সেখানে দিয়েছিল গড়ে ২১ হাজার কিউসেক। সর্বনিম্ন পরিমাণ পানি পাওয়ার রেকর্ডও স্খাপিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালের মার্চেই ২৭ মার্চ বাংলাদেশ পেয়েছিল মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক। ২৯ মার্চ প্রাপ্তির পরিমাণ ছিল নয় হাজার ৩১৩ কিউসেক। যুক্তি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির ওপর তো কারো হাত নেই!' পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক আবার ব্যাখ্যা হাজির করে বলেছিলেন, ‘এবার হিমালয় থেকে অনেক কম বরফ গলেছে বলে পানিও কম পাওয়া গেছে!' অথচ সে সময় পরিচালিত অনুসানে জানা গেছে, ভারত ৬৫ শতাংশেরও বেশি পানি আগেই উজানে উঠিয়ে নিয়েছিল। এখানে উল্লেখ করা দরকার, পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের সময় ১৯৯৫ সালের ২৭ ও ২৯ মার্চ দিন দুটিতে বাংলাদেশ যথাক্রমে ১৬ হাজার ৮৮১ কিউসেক ও ১৭ হাজার ৭২৮ কিউসেক পানি পেয়েছিল। এর কারণ, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। অন্যদিকে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল না বলেই ভারত যথেচ্ছভাবে কম পানি দেয়ার সুযোগ পেয়েছিল।
একই চুক্তির সুযোগ নিয়ে ভারত এখনো পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশকে পানি বঞ্চিত করছে এবং বর্ষা মৌসুমে ফারাক্কার সকল গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে ডুবিয়ে ছাড়ছে। ২০০৪ সালের কথাই ধরা যাক। সে বছরের জুলাই মাসে ভারতের ছেড়ে দেয়া পানিতে সারাদেশ তলিয়ে গিয়েছিল। বন্যাও হয়েছিল দীর্ঘস্খায়ী। কারণ, সেবার বৃষ্টি ও বন্যা শুরু হওয়ার পর ভারত ফারাক্কা বাঁধের ১০৫টি গেটই খুলে দিয়েছিল। ভারত সেই সাথে ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত বোরাকসহ অন্য সকল বাঁধের গেট খুলে দিয়েও বাংলাদেশকে বিপন্ন করেছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ভারত বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে। এর প্রমাণ, ২০০৮ সালে এপ্রিলের শেষ ১০ দিনেও বাংলাদেশকে প্রায় পাঁচ হাজার কিউসেক কম পানি দিয়েছে ভারত। চলতি বছরেও অবস্খায় পরিবর্তন ঘটেনি। জানুয়ারির প্রথম কিস্তিতে দেয়ার কথা যেখানে ছিল ৬৭ হাজার ৫১৬ কিউসেক, ভারত সেখানে দিয়েছে ৫৬ হাজার ৪১৪ কিউসেক ১১ হাজার ১০২ কিউসেক কম। বস্তুত কোনো মৌসুমেই বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি। অভিন্ন ও সীমান্তবর্তী নদ-নদীর ব্যাপারেও ভারত একই নীতি ও মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছে। এসব নদ-নদীর কোনো একটিতেই ভারত বাংলাদেশকে বাঁধ নির্মাণ বা ড্রেজিং করতে দিচ্ছে না। বিএসএফের সশস্ত্র হামলার ভয়ে নদ-নদীগুলোতে আট বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সকল ধরনের কাজ ব রয়েছে। অন্যদিকে তিস্তা, মহানন্দা, মনু, কোদলা, খোয়াই, গোমতি ও মুহুরীসহ আরো অন্তত ১৫টি নদ-নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত।
এভাবে ফারাক্কার পাশাপাশি ছোট-বড় বিভিন্ন বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি তুলে নেয়ায় এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করায় অভিন্ন ৫৪টির মধ্যে ৪০টি নদ-নদী শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই এখন পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। ইছামতি, পাগলা, বরাল, মাথাভাঙ্গা, ধানসিঁড়ি, মধুমতি, গড়াই ও চিত্রাসহ ৪০টির বেশি নদ-নদী ইতিহাসের বিষয় হতে চলেছে। শুকিয়ে যাচ্ছে সুরমা ও কুশিয়ারার মতো আরো কিছু নদ-নদী। অনেক নদ-নদী খালে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনোটিতে এমনকি বর্ষার মৌসুমেও ছেলেরা এখন ফুটবল খেলে। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো খরস্রোতা নদ-নদীগুলোর বুকেও যেখানে-সেখানে অস্যংখ্য চর জেগে উঠেছে। এগুলোর তলদেশ প্রতি বছর তিন থেকে ছয় ফুট পর্যন্ত পলিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একই কারণে বাংলাদেশের প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার নৌপথে এখন লঞ্চ ও স্টিমার চলাচল করার উপযোগী পানি পাওয়া যাচ্ছে না। একের পর এক নৌপথ ব হয়ে যাচ্ছে। আরিচা, দৌলতদিয়া, পাটুরিয়া, নগরবাড়ি ও মাওয়া-চরজানাজাত রুটে ফেরি চলাচল অব্যাহত রাখার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে ড্রেজিং করতে হচ্ছে। একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও মৎস্য খাতসহ শিল্প-কারখানা। জীবিকার তাগিদে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকার লাখ লাখ মানুষ তাদের পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। কাজের সানে রাজধানী ও বিভিন্ন জেলা শহরে চলে যাচ্ছে তারা।
কিন্তু বাংলাদেশের এই সর্বব্যাপী ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ভারত তার ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড অব্যাহত রেখেছে। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ এর সর্বশেষ উদাহরণ। বাঁধটি নির্মিত হচ্ছে সিলেট জেলার পূর্ব সীমান্তের ১০০ কিলোমিটার উজানে সেই বোরাক নদীর মুখে, যে বোরাক সিলেটের দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার উৎস নদী। নির্মিত হলে টিপাইমুখ বাঁধ সুরমা ও কুশিয়ারার পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে। সুরমা ও কুশিয়ারার মিলিত স্রোতধারা গিয়ে মেঘনা নদীতে পড়ে বলে মেঘনার পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হবে। এর অশুভ প্রভাবে বৃহত্তর সিলেট, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর ও বরিশালসহ মেঘনা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় অতি দ্রুত মরুকরণ ঘটবে। সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলো শুকিয়ে যাবে। নৌপরিবহন অচল হয়ে পড়বে। তাছাড়া ভারতের হাতে পানি নিয়ন্ত্রণের একচেটিয়া ক্ষমতা থাকবে বলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ পানি পাবে না, অন্যদিকে বন্যার সময় বৃহত্তর সিলেটসহ দেশের বিরাট এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। পরিণতিতে কৃষি ও শিল্প-বাণিজ্যের সকল খাতেই ঘটবে মহা বিপর্যয়।
বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে ভারতের নীতি ও কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে ভারতকে সম্মত করানোর চেষ্টা চালানো দরকার। কূটনৈতিক পন্থায় ভারত সম্মত না হলে বিষয়টিকে জাতিসংঘে উথাপন করতে হবে। এতেও কাজ না হলে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। উল্লেখ্য, এ ধরনের সংকটে ফন্সান্সের বিরুদ্ধে মামলা করে স্পেন তার অধিকার আদায় করেছে। বাংলাদেশের পক্ষেও মামলায় জিতে আসা সহজেই সম্ভব। কারণ, আন্তর্জাতিক আইনে ভাটির দেশকে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করা অপরাধ। তাছাড়া চুক্তির শর্ত হচ্ছে প্রবাহের পরিমাণ যতো কম বা বেশিই হোক না কেন, প্রতিটি চক্রেই নির্ধারিত পরিমাণ পানি বাংলাদেশকে দিতে হবে। ভারতে পানি আছে কি নেই, হিমালয়ে বরফ গললো কি গললো না এসব যুক্তি মোটেই বিবেচ্য হতে পারে না। বাংলাদেশকে দেয়ার পর যে পরিমাণ থাকবে সে পরিমাণ পানিই ভারত নিজে ব্যবহার করতে পারবে।
একই সঙ্গে দাবি তুলতে হবে, ভারত যাতে নেপালকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় পানি বন্টনের আয়োজনে সম্মত হয়। উল্লেখ্য, নেপালের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানালেও ভারত দেশটির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে এককভাবে লাভবান হচ্ছে। রমেশ চন্দ্র সেনের মতো কোনো মন্ত্রীকে দিয়ে এ লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়া আদৌ সম্ভব কি না, সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকারের এই পানিসম্পদ মন্ত্রী নিজেও ইতিমধ্যে ‘বুরাষ্ট্রের' পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করেছেন। তা সত্ত্বেও সদিচ্ছা থাকলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন সফরের সময় তারা পানির দাবি তুলে ধরতে পারেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


