এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছে ভারতের ইঙ্গিতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এসকাপের পরিকল্পিত এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। গত সপ্তাহে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্তটি নেয়ার পর যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, অনেক আগেই বাংলাদেশকে এতে যুক্ত করা দরকার ছিল কিন্তু তা না করে অর্থাৎ সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর না দিয়ে এবং এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে গড়িমসি করে আগের সরকারগুলো, বিশেষ করে চার দলীয় জোট সরকার রাষ্ট্রের ‘অনেক বড় ক্ষতি করেছে!' আওয়ামী লীগ সরকার এখন সে ক্ষতিই পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে লোভ দেখাতে গিয়ে মন্ত্রী বলেছেন, এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হলে তারা পূর্বদিকে যতোদূর চোখ যায় ততোদূর পর্যন্ত যেতে পারবেন! তাদের নাকি কোনো বাধা থাকবে না! এ ধরনের কথা শুনে অনেকেরই সন্ত্রাসীদের খোঁজে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মহাকাশ এবং সমুদ্রের তলদেশ ভ্রমণের কথা মনে পড়ে গেছে কিন্তু যোগাযোগমন্ত্রী নির্বিকার থেকেছেন অন্য এক উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে প্রলোভন দেখিয়ে বলা হয়েছে, এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হলে বাংলাদেশ বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে কথাটা এমনভাবেই শোনানো হয়েছে যেন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল ভাড়া খাটার জন্য! যেন বছরে মাত্র সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ! মন্ত্রী টাকার অংকের কথা বলেছেন, কিন্তু এশিয়ান হাইওয়ের বর্তমান রূপ বাংলাদেশকে চার ভাগে ভাগ করে ফেলবে ও বিদেশী মানে প্রতিবেশীর চারণক্ষেত্রে পরিণত করবে সে কথা বলেননি।
এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যতিব্যস্ততা এবং মাত্র সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার জন্য আদিখ্যেতা দেখে দেশপ্রেমিকদের মধ্যে সঙ্গত কারণে প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে একযোগে সামনে এসেছে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকটি কারণ, বাংলাদেশের সড়ক, সমুদ্র বন্দর ও জমিন ভাড়া দিয়ে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখানো হলেও সরকারের উদ্দেশ্য আসলে ভারতের স্বার্থ হাসিল করে দেয়া। উল্লেখ্য, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সড়ক পথে যোগাযোগ, ভ্রমণ ও বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্যে এশিয়ান হাইওয়ে নির্মাণের প্রকল্পটি প্রণীত হয়েছিল ১৯৯২ সালে। এর উদ্যোক্তা ছিল জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন এসকাপ (ইকনোমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক)। ২০০১ সালে সিউলে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ২০০৩ সালের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এসকাপের ৫৮তম সম্মেলনে ৩২ দেশের মধ্যে এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে একটি আন্তঃরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক তৈরি করা হয়। কিন্তু সাংহাইতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ৩২ দেশের মধ্যে ২৬টি দেশ সমঝোতায় স্বাক্ষর করলেও সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, উত্তর কোরিয়া ও তুর্কমেনিস্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশও এতে স্বাক্ষর করেনি। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। এর কারণ উল্লেখের আগে স্মরণ করা দরকার, বিএনপির বিরোধিতা ও অস্বীকৃতি সত্ত্বেও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকার এশিয়ান হাইওয়ের ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিল। সে অনুযায়ী কাজও এগিয়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশকে হাইওয়ে থেকে পিছিয়ে আনা হয়। এর কারণ, এক লাখ ৪১ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের মধ্যে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যে দুটি মূল রুটের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে নয়। সেজন্য জোট সরকার এএইচ-৪১ কে সাব-রিজিওনাল বা উপ-আঞ্চলিক রুট না করে মেইন রুট তথা এএইচ-১ বানানোর দাবি তুলেছিল। এটা করা গেলেই শুধু বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু ভারতের আপত্তিতে জোট সরকারের দাবি পূরণ করা হয়নি। ভারত সেই থেকে বাংলাদেশকে চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করার জন্য এসকাপের মাধ্যমে চাপ দিয়ে আসছে। মিয়ানমারের সঙ্গে কূটকৌশল খাটিয়েও ভারত বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।
উল্লেখ্য, প্রকৃত এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে এসকাপের পরিকল্পনায় যে মহাসড়কটি চিহ্নিত আছে সেটা জাপান থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর ভিত্তিতে চার দলীয় জোট সরকারের দাবি ছিল, শের শাহর আমলে তৈরি গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড ধরে দক্ষিণের আরাকান রোড (শাহ সুজা রোড) ও নাফ নদী হয়ে এশিয়ান হাইওয়ে মিয়ানমারের মংড়ু শহরে পৌঁছাবে এবং মংড়ু ও ইয়াকিব থেকে রাজধানী ইয়াঙ্গুন হয়ে ক্রমান্বয়ে কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর, ব্যাংককের মধ্য দিয়ে চীন, লাউস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামকে যুক্ত করবে। এসকাপের মূল পরিকল্পনাতেও সেটাই ছিল। কিন্তু ভারতের ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর এশিয়ান হাইওয়ের রুট পাল্টে ফেলা হয়েছে। এসকাপ এএইচ-১ নামে প্রধান যে রুটটি নির্ধারণ করেছে সে রুটের শুরু হবে যশোরের বেনাপোল সীমান্তে এবং বেনাপোল থেকে ঢাকা ও সিলেট হয়ে রুটটি বাংলাদেশের তামাবিল সীমান্তে পৌঁছাবে। এসকাপের এএইচ-২ নামের দ্বিতীয় রুটটি পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা সীমান্তে শুরু হবে এবং সেখান থেকে দিনাজপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও ঢাকা হয়ে আবারও সিলেটের একই তামাবিল সীমান্তে গিয়ে শেষ হবে। এরপর হাইওয়েটি তামাবিল থেকে দুর্গম পাহাড়ী পথ বেয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলং ও আসামের রাজধানী গৌহাটির পাশাপাশি মনিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম হয়ে দক্ষিণে যাবে- যে পর্যন্ত যাওয়ার পর ভারতের এশিয়ান হাইওয়ের আর কোনো প্রয়োজন থাকবে না। মিজোরাম থেকে এশিয়ান হাইওয়ে মিয়ানমারের প্রদেশ শান, কুচিন, কারেন, চিন প্রভৃতির ভেতর দিয়ে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত যাবে। এর ফলে বাংলাদেশকে অন্তত ২০০০ কিলোমিটার বা প্রায় ১২০০ মাইল অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে। অথচ চট্টগ্রাম-টেকনাফ-মংড়ু -আকিয়াব-ইয়াঙ্গুন হয়ে যেতে পারলে বাংলাদেশের জন্য ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত দূরত্ব হবে মাত্র ৩০০ মাইলের মতো। শুধু তা-ই নয়, এসকাপের কথামতো তামাবিল-আসাম-মেঘালয় রুটে যুক্ত হতে হলে বাংলাদেশকে নিজের খরচে প্রায় ১০৫০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। উল্লেখ্য, অনেকটা সান্ত্বনা দেয়ার ঢঙে এসকাপ তার প্রকল্পে এএইচ-৪১ নামেও একটি রুটের প্রস্তাব রেখেছে। এর শুরু হবে খুলনার মংলা বন্দর থেকে। এটা সিরাজগঞ্জের হাতিকুমরুলের মধ্য দিয়ে ঢাকা ও কাঁচপুর হয়ে প্রথমে চট্টগ্রামে এবং তার পর চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পর্যন্ত যাবে। বাংলাদেশের জন্য লোভনীয় মনে হলেও এএইচ-৪১ নামের রুটটি রয়েছে এসকাপের সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের তালিকায়। এর বাস্তবায়ন আদৌ কখনো হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ করেছেন ওয়াকিবহাল মহল। হলেও এর মাধ্যমেও ভারতই উপকৃত হবে, বাংলাদেশ নয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের ‘অনেক বড় ক্ষতি' করার অভিযোগ তোলা হলেও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই চার দলীয় জোট সরকার বাংলাদেশকে এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত করতে সম্মত হয়নি। কারণ, বর্তমান রুটের বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশের স্বাধীন অবস্থান ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দেবে। বাংলাদেশ আর একক রাষ্ট্রের অবস্থানে থাকতে পারবে না। বাংলাদেশ চারটি টুকরো হয়ে যাবে। তাছাড়া চারটি মহাসড়কের তিনটিই রয়েছে ভারত অভিমুখে। এগুলো দিয়ে ভারতীয়রা এবং তাদের যানবাহন ও পণ্যসামগ্রী যাতায়াত করবে। ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব তাদের চারণক্ষেত্রে পরিণত হবে। পৃথিবীর অনেক দেশই এ ধরনের হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। কিন্তু কোনো দেশকেই বাংলাদেশের মতো চার-চারটি টুকরো করে ফেলা হয়নি। অন্য কিছু বিষয়ও লক্ষ্য করা দরকার। বেনাপোল ও বাংলাবান্ধা থেকে তামাবিল পর্যন্ত মহাসড়কের দিকে লক্ষ্য করলে এ সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এর পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য আসলে ভারতের জন্য বাংলাদেশের জমিন ও সড়ক-মহাসড়ক উন্মুক্ত করিয়ে নেয়া। সোজা কথায়, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতকে করিডোর পাইয়ে দেয়া। এই করিডোর পাওয়ার জন্যই ভারত বহুদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এতদিন দেশটি ট্রানজিটের আড়াল নিয়েছে, এবার এসকাপের মাধ্যমে নিচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ের আড়াল। এ বিষয়ে বাংলাদেশের আপত্তির কারণ নিয়ে অনেক উপলক্ষেই আলোচনা করা হয়েছে। প্রধান কারণ হিসেবে এসেছে ভারতের মনোভাব। সকল পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতি ও মনোভাব মোটেও বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। তাছাড়া পৃথিবীর কোনো ছোট দেশই প্রতিবেশী বড় দেশকে তার ভূমি, সড়ক ও সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি সকল দিক থেকেই বিপজ্জনক। চট্টগ্রাম বন্দরের কথাই ধরা যাক। ধারণ ও পরিবহন ক্ষমতা খুব কম বলে শুধু বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনকারী জাহাজগুলোকেই বন্দরে ও বহির্নোঙ্গরে দিনের পর দিন, এমনকি মাস পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়। কন্টেইনার জটও সেখানে নিয়মিত বিষয়। ভারতকে যদি ওই বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয় তাহলে এখনকার চাইতে শতগুণ বেশি সংখ্যক জাহাজ যাতায়াত করবে। ফলে জাহাজ ও কন্টেইনারজটও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে চুক্তি থাকায় ভারত এ ক্ষয়ক্ষতি মানবে না। তখন সহজে বাংলাদেশের কোনো জাহাজকে বন্দরে ভিড়তে দেয়া হবে না। অগ্রাধিকার দিতে হবে ভারতীয় জাহাজগুলোকে। এক পর্যায়ে ভারতই বন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিনিয়ে নেবে। ভারত একই সঙ্গে তার পণ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে চাইবে। গোপন আয়োজনে বিভিন্নস্থানে ভারতীয় পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক ও লরিতে ডাকাতি ও হত্যা-লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটিয়ে হলেও ভারত বাংলাদেশে তার সেনাবাহিনী ঢুকিয়ে দেবে।
চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে পণ্য আনা-নেয়ার জন্য শুধু নয়, সড়ক পথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যে পণ্য আনা-নেয়াকে নিশ্চিত করার জন্যও ভারত বাংলাদেশে তার সেনাবাহিনীকে নিয়ে আসবে। বাংলাদেশের সড়ক পথের দিকটিকেও বিবেচনায় রাখা দরকার। এমনিতেই আমাদের সড়ক পথ খুব বেশি দীর্ঘ নয়। তার ওপর প্রায় সবগুলো হাইওয়ে নামেই হাইওয়ে। এগুলো সব সময় থাকে জীর্ণ দশায়। প্রতি বছর প্রতিটি সড়কের বিভিন্ন স্থানে কয়েক বার করে মেরামতের কাজ করতে হয়। ছোট-বড় সেতুগুলোর অবস্থাও নড়বড়ে। তার ওপর যদি ভারতের ভারি যানবাহন চলাচল শুরু করে তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের যাতায়াত ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে। এর কারণ, এসব সড়ক-মহাসড়কে ও সেতুগুলোর ওপর দিয়ে চলাচলকারী বাংলাদেশের যানবাহনের সংখ্যা যদি ১০ হাজার হয়ে থাকে তাহলে ভারতের যানবাহনের সংখ্যা হবে অন্তত ৪০ হাজার। অর্থাৎ সড়ক ও সেতুগুলোর বহন ক্ষমতার চাইতে অনেক বেশি সংখ্যক ও বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল করবে। ফলে সড়কগুলো এবড়ো-থেবড়ো হয়ে দেবে যাবে, অনেক সেতু ভেঙেও পড়বে। তেমন অবস্থায় নির্মাণ ও মেরামতের ঠিকাদারিও ভারতীয়রাই আদায় করে নেবে।
এভাবে কোনো বিবেচনাতেই এশিয়ান হাইওয়ের আড়ালে ভারতকে করিডোর দেয়ার এবং চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এখানে পারস্পরিক আস্থার বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ভারত একটি সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র বলে শুধু নয়, ঐতিহাসিক কারণেও বাংলাদেশ ভারতের ওপর আস্থা রাখতে পারে না। বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্নও এসেছে একই আস্থার কারণে। ভারতের প্রতি আস্থা সৃষ্টি হওয়ার চমৎকার সুযোগ গেছে স্বাধীনতার পর। কারণ ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করেছিল। কিন্তু আস্থা তৈরির দুর্লভ সে সুযোগটিকেও ভারতই হাতছাড়া করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন দেয়াকে পুঁজি বানিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই ভারত বাংলাদেশকে অবাধ লুন্ঠনের ক্ষেত্র বানিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের নমনীয় নীতির সুযোগে ভারত হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ও অন্যান্য সম্পদ নিয়ে গেছে। দেশ ছেয়ে গেছে ভারতীয় পণ্যে, চোরাচালান হয়েছে সর্বব্যাপী। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বিপুল ঘাটতির মধ্যে রাখা, অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা, ভূমি ও সমুদ্রের সীমানা নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি ও তা জিইয়ে রাখা এবং সীমান্তে হত্যা পর্যন্ত এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ করা সম্ভব নয়, যেখানে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে শত্রুতাপূর্ণ ব্যবহার না করে চলেছে। ফারাক্কাসহ বাঁধের পর বাঁধ নির্মাণ ও পানির গতিপথকে বাধাগ্রস্ত করে ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পানি আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন চুক্তি লংঘন করেও ভারত বাংলাদেশকে তার আধিপত্যবাদী নীতির ইচ্ছাধীন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব কারণেই ভারতের প্রতি বাংলাদেশীদের মনোভাব বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। জনগণ এখনো ভারতের ওপর কোনো ব্যাপারেই সামান্য আস্থা রাখতে পারে না। বরং এশিয়ান হাইওয়ের আড়ালে করিডোর এবং বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার মতো কোনো আয়োজনের কথা শুনলেই ভীত-সন্ত্রস্ত ও শংকিত হয় তারা। এই ভীতি ও আশংকা থেকেই এসেছে বর্তমান পর্যায়ের বিরোধিতা। বস্তুত ভারতের প্রতি আস্থা সৃষ্টি হওয়ার আগে এবং অবকাঠামোগতভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি না নিয়ে এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ভারতকে করিডোর ও সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার পরিণতি বাংলাদেশের জন্য হবে ভয়ংকর রকমের ধ্বংসাত্মক। তাছাড়া এশিয়ান হাইওয়ের নামে ভারত বাংলাদেশকে যেটা গেলাতে চাচ্ছে সেটা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য চরমভাবে অসম্মানজনকও। এমন আয়োজন কোনোক্রমেই মেনে নেয়া যায় না। একে ভারতের আরো একটি মারাত্মক ধরনের শত্রুতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। কারণ বর্তমান পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হলে লাভ হবে কেবলই ভারতের। সে ট্যাবলেটই বাংলাদেশকে গেলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারও গেলানোর চেষ্টাকে হালাল করতে চাচ্ছে। ৫০০ মিলিয়ন ডলার আয় করার প্রলোভনও ধ্বংসাত্মক এবং অসম্মানজনক। কথাটা ক্ষমতাসীনরা এমনভাবে বলেছেন যেন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল ভারতের কাছে ভাড়া খাটার জন্য! তাছাড়া ভারতীয়রা সব সময় নিজেদের লোকজনই সঙ্গে নিয়ে আসবে। সুইপার-চাপরাশি ও মালটানা কুলি-মজদুর ধরনের কিছু কাজ ছাড়া আর কোনো কাজেই বাংলাদেশীরা সুযোগ পাবে না। ফলে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বড় অংশও ভারতীয়দের পকেটেই চলে যাবে।
সব মিলিয়েই এসকাপের বর্তমান পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের কোনোভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এজন্যই চার দলীয় জোট সরকার সম্মত হয়নি বরং বিরোধিতা করেছিল। দেশের স্বার্থ বিরোধী হওয়ায় চুক্তিতে স্বাক্ষর করা দূরে থাক, সমঝোতা স্মারকে অনুস্বাক্ষর পর্যন্ত করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী একেই ‘গড়িমসি' এবং ‘রাষ্ট্রের অনেক বড় ক্ষতি' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। উল্লেখ্য, জোট সরকারের এই দেশপ্রেমিক অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় ভারত বাংলাদেশকে ‘এক হাত নেয়ার' পদক্ষেপ নিয়েছিল। ভারতের প্রচন্ড চাপ ও কূটকৌশলে মিয়ানমারও বাংলাদেশকে বাদ দিয়েই এশিয়ান হাইওয়ে চালু করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। এ ব্যবস্থা অবশ্য ভারতের জন্য লাভজনক হওয়ার নয়। কারণ, এশিয়ান হাইওয়ের নামে ভারতের আসলে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে নিজের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াত করার সুবিধা আদায় করা বেশি দরকার। বাংলাদেশকে বাদ দেয়া হলে সেটা সম্ভব নয়। সুতরাং ভারত ভয় দেখালেও বাংলাদেশের ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই এরই সূত্র ধরে দেশপ্রেমিক সকল দল ও মহলও মনে করেন, বাংলাদেশকে কেবল তখনই এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত করা যেতে পারে যখন সেটি হবে মূল পরিকল্পনার ভিত্তিতে। অর্থাৎ গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড ধরে তথা টেকনাফ ও মংড়ু -আকিয়াব হয়ে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত। এটা করা গেলে বাংলাদেশকে অযথাই ভারতের আসাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে ঘরের কাছে পাশের বাড়ি মিয়ানমার যেতে হবে না। ঘুরতে হবে না অতিরিক্ত ২০০০ কিলোমিটার বিপদসংকুল পথ। ১০৫০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের ঝক্কি পোহাতে হবে না, সামলাতে হবে না বিপুল খরচের ধাক্কাও। এটা না করা হলে তার অর্থ দাঁড়াবে ভারতকে করিডোর দিয়ে দেয়া। একথা বুঝতে হবে যে, বেনাপোল ও বাংলাবান্ধা থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কোনোভাবে তামাবিল হয়ে মেঘালয় পর্যন্ত যেতে পারলে ভারতের কাছে এশিয়ান হাইওয়ের এক কানা কড়িও মূল্য থাকবে না। কারণ ভারতের দরকার করিডোর, এশিয়ার উন্নয়ন নয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের তো প্রশ্নই উঠতে পারে না। সুতরাং এশিয়ান হাইওয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশেরও কঠোর অবস্থান নেয়া দরকার। মূলত এ দৃষ্টিকোণ থেকেই চীনকে এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত করার দাবি জানিয়েছিল জোট সরকার। চীন যুক্ত হলে বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারতের দার্জিলিং ও শিলিগুড়ি এবং ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন চুম্বি ভ্যালি (তিববত) হয়ে বাংলাদেশ সহজেই চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। এই পথে নেপালের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য করা সহজ হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমে ভারত এশিয়ান হাইওয়ের যে ট্যাবলেট গেলাতে চাচ্ছে সেটা কোনোক্রমেই গেলা যাবে না। সরকারের উচিত হবে সমঝোতা স্মারকে অনুস্বাক্ষর করে পরিকল্পিত হাইওয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং একথা জানিয়ে দেয়া যে, এমন কোনো আয়োজনে বাংলাদেশ যেতে পারে না- যার মাধ্যমে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি ছাড়া কোনো উপকার হওয়ার প্রশ্নই আসেনা! আসুন আমার দেশকে সকল ষড়যন্ত্রকে রুখে দেই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিক্রী হবে ভারতের বাজারে! বাহবা দিতেই হয় টেকি বোদ্ধাদের
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।