ধর্ম নিরপেক্ষ শিক্ষানীতির ব্যর্থতা -মনসুর আহমদ
অবশেষে আমাদের জন্য কি ধর্মহীন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরী হচ্ছে? ওপারের দাদাদের পরামর্শে যা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে তা আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে কি? এখনই আমাদের ভাবা দরকার এবং বিবেচনা করা দরকার
পাক-ভারত উপমহাদেশে বৃটিশ শাসন পূর্বকালে যে শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল তা ছিল সে সময়ের সমাজ-রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বৃটিশ আগমনের পর এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে তাদের প্রয়োজন অনুসারে নতুন সাজে সাজাবার তারা নানা প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ১৭৫৭ খৃস্টাব্দ হতে ঐ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ইংরেজগণ ভারতবাসীদের শিক্ষার জন্য আদৌ মাথা ঘামায়নি। ১৭৯২ খৃস্টাব্দে সর্বপ্রথম মিঃ অলিভার-ভারতবাসীদের শিক্ষার জন্য বৃটিশ পার্লামেন্টে এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। অবশেষে ১৮১৩ খৃষ্টাব্দে ভারতবাসীদের শিক্ষা সম্পর্কে বিবেচনা ও সুপারিশ করার জন্য এক শিক্ষা কমিটি নিয়োজিত হয়। ১৮১৪ খৃস্টাব্দে কমিটির সুপারিশ অনুসারে ভারতবাসীদের শিক্ষার জন্য বড় লাটের নামে এক আদেশ জারি করা হয়।
১৮২৩ সালে গঠিত হয় শিক্ষা কমিটি। এই কমিটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু কলেজগুলোকে উৎসাহ দানের প্রতি লক্ষ্য রাখা। উক্ত কমিটির মাধ্যমে এদেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয় তা ছিল মুসলমানদের জন্য প্রতিকূল, নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় মুসলমান ছাত্রদের জন্য ধর্ম সম্পর্কীয় প্রাথমিক জ্ঞান লাভের কোন ব্যবস্থা ছিল না। তা ছিল মুসলমানদের পক্ষে একটা অসহনীয় ব্যাপার। এই শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল শুধু পার্থিব স্বার্থের উপর ভিত্তি করে রচিত। এ শিক্ষা ব্যবস্থার উপর আলোচনা করতে গিয়ে একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী লিখেছেন, ‘‘ইহাতে আশ্চর্য হইবার কি আছে যে, মুসলমানরা এরূপ শিক্ষা ব্যবস্থা হইতে দূরে থাকিবে, যাহাতে তাহাদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি আদৌ লক্ষ্য রাখা হয় নাই এবং যাহাতে তাহাদের নেহায়েত জরুরি বিষয়াবলী শিক্ষারও কোন ব্যবস্থা করা হয় নাই বরং যাহা তাহাদের স্বার্থের নিশ্চিতরূপে পরিপন্থী এবং তাহাদের জাতীয় ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।’’
ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীন এই শিক্ষা ব্যবস্থার অসারতা প্রসঙ্গে ইংরেজ মনীষী ড. হান্টার লিখেছেন, ‘‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মুসলমান যুবকদের ধর্মীয় শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নাই। আমরা এ কথার প্রতি মোটেই লক্ষ্য করি না যে, হিন্দুদের মধ্যে প্রাচীনকাল হইতেই এমন একটি শক্তিশালী পুরোহিত সম্প্রদায় চলিয়া আসিতেছে, যাহারা তাহাদের ছেলেদের শিক্ষাদান এবং ধর্মীয় কর্তব্য সম্পাদন করিয়া থাকেন। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে এমন কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব নাই... এইরূপ শিক্ষা ব্যবস্থা যাহা শুধু প্রার্থিব স্বার্থের ভিত্তির উপরই রচিত তাহা খুব অল্প জাতিরই প্রকৃতির অনুকূলে। অনেক বিশিষ্ট চিন্তাবিদের মতে আয়ারল্যান্ডে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অকৃতকার্যতার কারণ ইহাই।
উক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ভার সর্বতোভাবে ছিল হিন্দুদের ওপর। তারা সমগ্র শিক্ষা কোর্সকে হিন্দুধর্ম ও হিন্দু ঐতিহ্যমন্ডিত করে তোলে। ফলে তা মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য ও আশঙ্কাজনক হলাহল হয়ে দাঁড়ায়।
এর পরে পুনরায় ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এই পরিষদের নিয়মাবলী ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন কমিটির সঙ্গে যুক্ত। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাকে কোন মনীষার বাহনরূপে নয়, ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্বের সর্বময় প্রকাশ-মাধ্যমরূপে দেখতে চেয়েছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষা গভীরভাবে জীবনের সঙ্গে গ্রথিত হোক এবং তা ছড়িয়ে যাক সর্বস্তরে। লোক শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে যে এ দেশের আর্থ সামাজিক বিবিধ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব এ বিশ্বাসে তিনি ছিলেন দৃঢ়মূল।
‘‘রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছেন, পাশ্চাত্য বিজ্ঞান এবং ভারতবর্ষ আধ্যাত্ম শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছে, যে কারণে পাশ্চাত্য অশান্ত এবং প্রাচ্য দৈন্য পীড়িত। তিনি এ উভয় শিক্ষার মিলন কামনা করেছেন। এই ঐক্যের পথে বাধা তার মতে ‘ন্যাশনালিজম'। উগ্র জাতীয়তাবোধ আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের নামান্তর। তিনি বলেছেন, পৃথিবীতে নেশন গড়ে উঠল সত্যের জোরে কিন্তু ন্যাশনালিজম সত্য নয়,... স্বাজাত্যের অহমিকা থেকে মুক্তিদান করার শিক্ষাই আজকের দিনের প্রধান শিক্ষা।
‘‘প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার পথে রবীন্দ্রনাথ দেশে প্রচলিত দুই শ্রেণীর বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করেছিলেন। রাজকীয় বিদ্যালয় তাঁর মতে কেরানিগিরির কল, অপরদিকে সামাজিক বিদ্যালয়ের পায়ে পুরানো শিকল। এ কারণে তিনি শিক্ষক পরম্পরা এবং শিক্ষা বিষয়ক নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অবরুদ্ধ শিক্ষাস্রোতকে সচল করতে চাইলেন। উদার, অসাম্প্রদায়িক গ্রহণচারী মানসিকতা দ্বারা পরিশ্রুত তাঁর ‘জাতীয় ভাবনা' :
‘‘জাতীয় নামের দ্বারা চিহ্নিত করিয়া আমরা কোনো একটা বিশেষ শিক্ষাবিদকে উদ্ভাবিত করিয়া তুলিতে পারি না। যে শিক্ষা স্বজাতির নানা লোকের নানা চেষ্টার দ্বারা নানাভাবে চালিত হইতেছে তাহাকেই ‘জাতীয়' বলিতে পারি। স্বজাতির সামনেই হউক আর বিজাতীয়ের সামনেই হউক, ফলে কোনো একটা বিশেষ শিক্ষাবিধি সমস্ত দেশকে একটা কোনো ধ্রুব আদর্শে বাঁধিয়া ফেলিতে চায় তখন তাহাকে ‘জাতীয়' বলিতে পারিব না; তাহা সাম্প্রদায়িক; অতএব জাতির পক্ষে তাহা সাংঘাতিক।’’
রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের বস্তুবাদী শিক্ষার ত্রুটি আলোচনা প্রসঙ্গে আরো বলেন :
‘‘আমি জানি, ইউরোপীয় শিক্ষা ও সভ্যতার মহত্ত্ব সম্বন্ধে সুতীব্র প্রতিবাদ জাগাবার দিন আজ এসেছে। এই সভ্যতা বস্তুগত ধন-সঞ্চয়ে ও শক্তি আবিষ্কারে অদ্ভুত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু সমগ্র মনুষত্বের মহিমা তোতার বাহ্যরূপ এবং বাহ্য উপকরণ নিয়ে নয়। হিংস্রতা, লুব্ধতা, রাষ্ট্রিক কূটনীতির কুশিলতা পাশ্চাত্য মহাদেশ থেকে যেরকম প্রচন্ড মূর্তি ধরে মানুষের স্বাধিকারকে নির্মমভাবে দলন করতে উদ্যত হয়েছে ইতিহাসে এমন আর কোন দিন হয়নি।’’ রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে শিক্ষা কার্যক্রম ও কারিকুলামে তেমন কোন উন্নতি ঘটেনি। পরবর্তীতে শিক্ষাব্যবস্থার উপরে গান্ধীজীর নেতৃত্বে গ্রহণ করা হয় বরদা পরিকল্পনা। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসিত আইন পাস ও চালু হলে নয়া আইন সভার নির্বাচন শুরু হয়। নির্বাচন উত্তরকালে বিভিন্ন প্রদেশে কংগ্রেস সরকার প্রতিষ্ঠা হয়। এ সময় শিক্ষানীতির ব্যাপারে মহাত্মা গান্ধীজীর নেতৃত্বে ও তত্ত্বাবধানে বরদা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ গোটা পরিকল্পনা যে মৌলিক আদর্শ ও নীতিমালার ভিত্তিতে রচিত তার প্রধান দিকটি ছিল জাতির শিশুদের ভালো ব্যবসায়িক যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। পরিকল্পনা প্রণয়নকারীদের দৃষ্টিতে মনুষ্যত্ব ও উপার্জনের যোগ্যতা সমার্থক শব্দ। বস্তুবাদী ও ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমগ্র পরিকল্পনাটিকে এমনভাবে প্রভাবিত করে রেখেছে যে, এর মাধ্যমে যে বংশধর শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণ করবে, তারা নিরেট বস্তুবাদী হয়ে গড়ে উঠবে।
বরদা শিক্ষা পরিকল্পনা থেকে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাদ দেয়া হয়। বাদ দেয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে গান্ধীজী বলেন : ‘‘আমরা বরদা শিক্ষা পরিকল্পনা থেকে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাদ দিয়েছি। কেননা, আজকাল ধর্মীয় শিক্ষা যেভাবে দেয়া হয় এবং যেভাবে তার বাস্তব অনুশীলন হয়ে থাকে, তাতে ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদ সৃষ্টি হয়।’’
সকল ধর্মকে বাদ দিয়ে মহাত্মা গান্ধীর ধর্মের শিক্ষা পাঠ্য তালিকাভুক্ত করা হয়। কারণ, এরপর যে বংশধর ভারতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষিত হয়ে বেরুবে, তাদের নৈতিক মত, বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার উৎস হবে একমাত্র গান্ধীর ধর্ম। এর ফলে ‘‘পরবর্তী বংশধর, যারা বরদা পরিকল্পনাভুক্ত বিদ্যালয়সমূহ থেকে শিক্ষালাভ করে বেরিয়ে আসবে, তাদের ওপর বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং নতুন ভারতীয় জাতীয়তার ধারণা এত প্রবল হবে যে, তারা আপন সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার তেমন ধার ধারবে না। সুতরাং এটা নিশ্চিতভাবেই ধরে নেয়া উচিত যে, তৃতীয় বংশধর পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে ভারত সত্যিকার অর্থে এক জাতিতে পরিণত হয়ে যাবে।’’ একই সময় মধ্য প্রদেশে অন্য একটি শিক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। তা ছিল বিদ্যামন্দির পরিকল্পনা নামে খ্যাত। এর প্রণেতা ছিলেন প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী মি. শুকলা। কংগ্রেস পার্টি ১৯৩৭ সালের ৩০ জুলাই মি. শুকলাকে সভাপতি করে পল্লী অঞ্চলে বাধ্যতামূলক সর্বজনীন শিক্ষা চালু করার উপযোগী পরিকল্পনা তৈরি করার উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করে। মধ্য প্রদেশ বিধানসভার কংগ্রেস সংসদীয় দল ৪ ডিসেম্বর তারিখে পরিকল্পনাটির মঞ্জুরি দেয়।
পরিকল্পনাকে মঞ্জুর করার পর যে সিলেবাস পরিষদ গঠিত হয়, মধ্য প্রদেশের একজন মুসলমানকেও তার অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। টেকস্টবুক কমিটিতেও একজন মুসলমান রাখা হয়নি। ফলে মধ্যপ্রদেশের শাসনাধীন মুসলমানদের আপন ভবিষ্যৎ বংশধরদের শিক্ষার ব্যাপারে কিছুই বলার স্বাধীনতা রইল না। বরোদার বিদ্যামন্দিরগুলোর জন্য শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থা নিতে একটা ট্রেনিং স্কুল স্থাপন করা হয়। উক্ত স্কুলে মুসলমানের অবস্থা ছিল বড়ই করুণ ‘‘মধ্য প্রদেশে বিধান সভার সদস্য মৌলভী আবদুর রহমান সাহেব উক্ত ট্রেনিংস্কুল পরিদর্শনে গেলেন। তখন দেখতে পেলেন যে, হিন্দু ও মুসলমান সকলেই ধুতি পরা।... সেখানে সকল পাঠ্য বিষয় হিন্দী ও মারাঠী ভাষায় পড়ানো হয়। কেবলমাত্র উর্দু বর্ণমালা শিখানোর জন্য একজন মুসলমানকে নিয়োগ করা হয়েছে। মুসলমান ছাত্ররা যেখানে অস্পৃশ্যেদের মত থাকে। তারা আলাদা খাওয়া দাওয়া করে। পানি খাওয়ার পাত্র পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে না। প্রতিদিন বন্দে মাতরম সঙ্গীত দিয়ে স্কুল শুরু হয়। মুসলমান ছাত্রদেরকে প্রার্থনার ভঙ্গীতে হাত জোড় করে ও মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়।
এ দু'টি শিক্ষা নীতিই ছিল মুসলমানদের বিপক্ষে। ‘বরদা পরিকল্পনা ও বিদ্যামন্দির পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষ থেকে যে সব আপত্তি তোলা হয়েছে তার জবাবে অন্যান্য কথার সাথে সাথে এ কথাটাও বারবার বলা হচ্ছে যে, যে দেশে বহুসংখ্যক ধর্মের অনুসারীরা বাস করে সেখানে সকলের ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এরূপ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কেবলমাত্র সাধারণ বৈষয়িক শিক্ষার ব্যবস্থাই করা যেতে পারে আর সর্বজনীন শিক্ষা চালু করার জন্য ব্যাপকভিত্তিক বাধ্যতামূলক ও ধর্মহীন শিক্ষার ব্যবস্থা করা ছাড়া অন্য কোন কৌশল অবলম্বন করার থাকে না। তবে সাধারণ পাঠকদের অবগতির জন্য আমি বলতে চাই যে, ইউরোপের যেসব সুসভ্য দেশে ধর্মের কোনোই গুরুত্ব নেই, সে সব দেশের মধ্যে ফ্রান্স, চেকোস্লোভাকিয়া এবং অন্যান্য দু'চারটা দেশ ছাড়া কোন দেশই ভারতের মত নীতি অবলম্বন করেনি।
জার্মানীতে নাগরিকদের শিক্ষা ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তবে এদের দৃষ্টিভঙ্গি এই যে, সকলের শিক্ষার পদ্ধতি একই রকম হওয়া চাই। এ কারণে সেখানে বেসরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠার অনুমতিও খুব কমই দেয়া হয়। তবে দেশের সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিককে তার সন্তানের নিজস্ব ধর্মমত অনুসারে শিক্ষার ব্যবস্থা দাবি করার অধিকার দেয়া হয়েছে এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার সময়ের মধ্যেই এরূপ শিক্ষার ব্যবস্থা করা সরকারের কর্তব্যরূপে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাছাড়া একটি বিশেষ ধর্মমতের অনুসারীরা যদি কোন জায়গায় যথেষ্ট সংখ্যক বিদ্যমান থাকে এবং তারা তাদের ইচ্ছামত ধর্মীয় শিক্ষা লাভের নিশ্চয়তার জন্য আলাদা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানায় তা হলে সেই ব্যবস্থা করা সরকারের কর্তব্য।
ইংল্যান্ডে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর আপন উদ্যোগে নিজস্ব বিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনায় অধিকার রয়েছে। সরকারি শিক্ষা বিভাগ শুধু তার তদারক করে থাকে। এ ধরনের বিদ্যালয়কে সরকার সাহায্যও দিয়ে থাকে।
যুগোস্লাভিয়ায় প্রত্যেক স্বীকৃত ধর্মের শিক্ষার ব্যবস্থা সরকারি বিদ্যালয়ে করা হয়। সন্তানদের জন্য কি ধরনের ধর্মীয় শিক্ষা চাই, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পিতামাতার হাতেই ন্যস্ত করা হয়েছে, তাছাড়া যেখানে স্বীকৃত ধর্মসমূহের নিজস্ব শিক্ষ্যব্যবস্থা নিজেদেরই তৈরি করার অধিকার রয়েছে এবং সরকারি কোষাগার থেকে তাদেরকে সাহায্য করা হয়ে থাকে।
লিথুনিয়ার সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। কেবলমাত্র যেসব ছেলেমেয়ের পিতামাতা ধর্মীয় শিক্ষা দিতে ইচ্ছুক নয় তারাই এর ব্যতিক্রম। তাছাড়া সেখানেও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে আপন বিদ্যালয় স্থাপনের অধিকার রয়েছে এবং সরকার তাদেরকে এ শর্তে সাহায্য দিয়ে থাকে যে, ঐ সব বিদ্যালয়ে সরকারি শিক্ষানীতি অনুসারে বৈষয়িক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
পোল্যান্ডের যাবতীয় সরকারি বিদ্যালয়ে এবং সরকারি আনুকূল্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক। বিভিন্ন ধর্মের স্বীকৃত সমিতিগুলোকে আপন আপন ধর্মের অনুসারীদের জন্য পাঠ্যসূচি নির্ধারণ ও বিদ্যালয়ে তাদের ধর্মীয় শিক্ষার তদারক করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
এস্তোনিয়ার ছাত্রছাত্রীদের পিতামাতার আবেদনক্রমে সরকারি বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। (Democretic constitutions of Europe by A H Mcr ley. Ps3 57)
বেলজিয়ামে প্রাইমারী পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক। সেখানে স্বীকৃতি গীর্জা কর্তৃপক্ষকে ধর্মীয় শিক্ষার তত্ত্বাবধানের জন্য নিজস্ব পরিদর্শক নিয়োগের অধিকার প্রদান করা হয়েছে।
নরওয়েতে প্রাইমারী শিক্ষা পুরোপুরিভাবে ধর্মীয় সংগঠনসমূহের কর্তৃত্বে সমর্থন করা হয়েছে। ইটালীতে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং কোন ছাত্রছাত্রী তার ব্যতিক্রম নয়-যতক্ষণ তাদের পিতামাতা ব্যতিক্রমের দাবি না জানান।
ইংল্যান্ডে ধর্মীয় সংগঠনগুলো আপন অনুসারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিজ উদ্যোগেই করে থাকে এবং সরকার তার ব্যয়ভার বহন করে। সুইজারল্যান্ডে সরকারিভাবে কেবলমাত্র সেই ধর্মের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়, যার অনুসারীরা বিদ্যালয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে যেসব সংখ্যালঘু ধর্মের ছাত্রছাত্রী বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যায় থাকে তাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাও করা হয়ে থাকে (এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, চতুর্থদশ সংস্করণ-নিবদ্ধ এডুকেশন)
‘‘ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য সভ্যতাগর্বী দেশের উন্নততর শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের অবস্থা পর্যালোচনা করলে আমাদের সামনে একটি সত্য প্রতিভাত হয়ে ওঠে। এ সব ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান যেসব মৌলিক ধারণা ও চিন্তাভাবনার উপর প্রতিষ্ঠিত, তা হল এই বাস্তব ও ক্ষয়িষ্ণু দুনিয়ার উন্নতি ও প্রধান্য লাভ। এছাড়া তাদের সামনে আর কোন মহৎ লক্ষ্য নেই।
আধুনিককালের প্রবণতা হল শিক্ষাকে ব্যবহারোপযোগী করতে হবে; ব্যবহারিক মূল্যের দৃষ্টিতে অধিকতর মূল্যবান, এমন শিক্ষা অর্জনই হবে লক্ষ্য। শিক্ষার আলোয় হৃদয় লোককে উজ্জ্বল, উদ্ভাসিত ও জ্ঞান-সমৃদ্ধ করে তোলা আজ আর লক্ষ্যরূপে নির্দিষ্ট থাকেনি। শিক্ষা ব্যবস্থার এই যে বস্তুতান্ত্রিকতা তা যে সঠিক নয় তা ফুটে উঠেছে প্রখ্যাত গ্রন্থকার Bevan এর Symbolism of Belief গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন : আমরা শুধুমাত্র বাস্তবতার মধ্যে জড়িয়ে থাকতে পারি না। আমরা যখন কোন বাস্তব জীবনের পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তখন আমাদের কর্মক্ষমতা ও তৎপরতা যাচাই করার জন্যে আমাদের নিজস্ব মৌল ধারণা-বিশ্বাসসমূহের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হই। বস্তুত এ এমন একটা সত্য, যার স্বপক্ষে বহু প্রখ্যাত চিন্তাবিদের সমর্থন উদ্ধৃত করা যেতে পারে। এ থেকে এ সত্য অতি সহজেই উপলব্ধি করা যেতে পারে যে, মূলত অবস্থা ও ঘটনাবলির সুসংবদ্ধ অধ্যয়নই হচ্ছে শিক্ষা এবং তাকে কোন ব্যক্তি ও জাতির মৌল চিন্তা-ভাবনা ও মতাদর্শ থেকে কোন অবস্থায়ই বিচ্ছিন্ন করা যেতে পারে না। এ কারণেই মৌল বিশ্বাসের দিক দিয়ে মানুষে মানুষে যে পার্থক্য ধর্মবিশ্বাসের পার্থক্যের দরুন, তাকে স্বীকার করেই বিভিন্ন বিশ্বাস-অনুসারীদের শিক্ষাও বিভিন্ন হতে বাধ্য। এ সত্যকে অস্বীকার করা হলে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং তার জন্যে বিভিন্ন মৌল বিশ্বাস সম্পন্ন মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে।’’
অতএব যারা বস্তুবাদী শিক্ষাকে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে চালিয়ে দিতে সচেষ্টা হন তারা প্রকৃতপক্ষে গোটা মানবতার ধ্বংস সাধনে ব্যস্ত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


