আমাদের এই দেশে গোপাল ভাঁড়ের কোন অভাব অতীতে ছিল না। এখনও বাংলাদেশে এই গোপাল ভাঁড়ের অভাব নাই। তবে এখনকার ভাঁড়রা সব সময় দেশে থাকেন না। সময় সুযোগ মত নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেন। আর এই নিরাপদ দূরত্ব এখন আর দিল্লী-আগ্রা-কাবুল নয়-সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারের দূরত্বে। এ ধরনের হাজার হাজার মাইল দূরত্বে থাকার একটি হালে বাড়তি সুখবর সুবিধাও আছে। যেমন ধরুন যদি তেমন কেউ বৃটেন বা ইংল্যান্ডে থাকেন-লন্ডন নগরীতে হলে তো কোন কথাই নেই-পোয়াবারোতে ওদের ‘ডোল মানি’তে নাম লেখাতে পারেন- তাহলে বৃটিশ পাউন্ডে সাপ্তাহিক/মাসিক প্রাপ্তি-কোনরূপ কোন কাজ না করেও বেকার ভাতা নিয়ে জীবন কাটান- এবং সেই অর্থ দিয়েই এদেশে মাঝে মধ্যে এসে মহা মেহমানের আদরে-যতেœ জীবন উপভোগ করেন- এবং আমাদের মত মুখ্যু-সুখ্যুদের মাঝে মধ্যেই নিত্য নতুন জ্ঞান দান করেন- সেসব জ্ঞান পেয়ে আমরা ধন্য হই, এসব আধুনিক কালের বা হাল আমলের ‘ভাঁড়েরা’ নিশ্চিতভাবেই এদেশের অতীত আমলের গোপাল ভাঁড়দের থেকে অবশ্যই ভিন্নতর।
এমনি একজন ভাঁড় ফেব্র“য়ারীর শেষে সংঘটিত বিডিআর হত্যাকান্ডের পরপরই সুদুর থেকে ঢাকায় এসে প্রতিনিয়তই আমাদের একটি লেসন দিচ্ছেন। তা হল এই যে বিডিআর হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে মৌলবাদী-ইসলামী শক্তিরা- হাসিনার সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য মাত্র। কেননা, তার বক্তব্য, ওরা ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে হেরে গেছে, লক্ষনীয় যে সেই একই কথা বলেই চলেছে ভারতীয় মিডিয়া সেই প্রথম দিন থেকেই। তাছাড়া ভারতের বাঙ্গালী পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রনব মুখার্জিও সেই প্রথম দিনেই হাসিনাকে অভয় বাণী- শুনিয়েছেন। এখানে তাই হাসিনাকে আর পায় কে। ক’দিন পর ভারতের এযাবৎ কালের একমাত্র প্রাক্তন সেনা প্রধান শংকর চৌধুরী আরও এক পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে ‘গ্রেট গেম’ এর পরবর্তী খেলা চলবে বলেই সোজাসুজি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চরম আঘাত করার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। আমাদের গোপাল ভাঁড়টি একই কাজ করছেন তাতে অবাক হবার কোন কিছুই থাকতে পারে না। এদেশের হাসিনাসহ বিশেষ মহলটি বাংলাদেশে ‘মৌলবাদী’- মুসলমানদের বিরুদ্ধে- অর্থ্যাৎ গোল টুপি ও দাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে তা আগে এতটা সুস্পষ্ট না হলেও এখন বুঝি আর কোন ঘোমটা নেই। হাসিনা-মতিয়া মাথায় শাড়ীর আঁচল টেনে দেয়ার প্রকাশ্যে ছবি দেখা গেলেও। তবে হাসিনার ডাক্তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি অবশ্য ওদের দুজনের মত মাথায় শাড়ীর আঁচল টেনে দেন নাই এখন পর্যন্ত। বলা যায় না ভবিষ্যতে দিতেও পারেন-যেমন আগে মতিয়া, সাহারা এরা কেউই ভুলেও সে কাজটি করতেন না বলেই আমরা সবাই জানি। কিন্তু দীপু মনি মাথায় শাড়ীর আঁচল টেনে দিলেন আর না দিলেন সেটি কোন বড় বিষয় নয়, যেমন অন্য তিনজন এই কাজটি প্রকাশ্যে করছেন, তাতে ‘মৌলবাদী’-মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের ‘ক্রুসেড’ থেমে যায়নি। ঠিক যে শব্দটি বছর আটেক আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ সাহেব ব্যবহার করেছিলেন এরা কি তা থেকে ভিন্ন কিছু করছেন?
যদি বিডিআর এর সেই ফেব্র“য়ারীর শেষের নারকীয় হত্যাকান্ডের বিষয়ে ফিরে আসা যায়, তখন সাহারা-হাসিনার পূর্ণ জ্ঞানের মধ্যে যে সেসব ৫ ডজন সিনিয়র সামরিক অফিসারকে হত্যা করার পর কারও কারও দেহ ড্রেনের ম্যানহোলে পুরে দিয়েছিল, কারও কারও দেহ পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল, আর অনেকের দেয়া হয়েছিল ২৫/২৬ ফেব্র“য়ারীর রাতভর গণকবর এসব কি ওসব মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে গোপন বিষয় ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর জনগণের আদালতে ওদেরই দিতে হবে। এরপর হত্যাকারীরা যাতে নিরাপদে বিশেষ বিশেষ গেট দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে, সে ব্যবস্থাও তো সাহারাসহ তার কয়েকজন সঙ্গী-সাথী মন্ত্রী-এমপিরাই করেছিলেন। সেই হত্যাকান্ড ছাড়াও সাহারার সন্তানরা অফিসার এর বাড়ী লুটপাট, তাদের পরিবারের মেয়েদের ধর্ষন এবং এমনকি বাড়ীর মেহমান, চাকর-চাকরানী পর্যন্ত রেহাই পায়নি-তার দায়-দায়িত্ব ওরা কেউ কি এড়াতে পারেন?
এজন্য প্রথমে মন্ত্রী সাহারার নেতৃত্বে যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল-প্রধানমন্ত্রী গঠন করে দিয়েছিলেন, একদিন পর সাহারাকে সেখান থেকে সরানো হল। ভাল কথা, কিন্তু সাত দিনের মধ্যে যে ঐ কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছিল, এখন তার থেকে কত সাতদিন চলে গেছে। রিপোর্টের কোন হদিস নাই। এখন শোনা যাচ্ছে যে এপ্রিলের শেষে রিপোর্টটি সরকারী কমিটি দিতে পারে। কেননা, এত অর্থাৎ প্রায় দু’মাস সময় লাগার কারণ কি? কারণাদি বুঝি জটিল? নাকি কারণাদির মধ্যে এমন কিছু তথ্যাদি আছে যা শেখ হাসিনাসহ তার আরও অতি নিকটের অনেকেরই সেই নারকীয় কান্ডে অন্ততঃ পরোক্ষ হলেও ম্যাকিনেশনের (গধপযরহধঃরড়হ) প্রমাণ মানুষের কাছে ধরা পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন গবেষক এবং স্কলার সুনিতা পাল তার এক ২৯শে মার্চের নিবন্ধে প্রাসঙ্গিক ৩০টি প্রশ্ন তুলেছিলেন। এবং সেসব প্রশ্নে সাহারা, নানক, তাপস ছাড়াও হাসিনার ছেলে জয় এর দূরত্বে থেকে ওসব ঘাতকদের বাক আপ (ইঁপশ টঢ়) করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছেন সুনিতা পাল। ২৭শে ফেব্র“য়ারী আমেরিকা থেকে জয় দুবাই এসে সেখান দিয়ে পলায়নপর বেশ কিছু ঘাতকের হাতে একটি করে পুরো ইনভেলপ বা খাম তুলে দিয়েছেন। তিনি ঢাকায়ও আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মা তাকে ঢাকা আসতে বারণ করেছিলেন। এর আগে জয় যে হার্ভার্ড এ বসে অন্য একজন ইহুদী শিক্ষক (জয়ের স্ত্রী একজন ইহুদী মেয়ে) গবেষকের সাথে একত্রে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিষোদগার করে রিপোর্ট লিখে তা প্রকাশ করেছিলেন, তা তো নির্বাচনের আগেরই বিষয় ছিল।
সুনিতার অন্য যেসব প্রশ্ন ছিল, তার মধ্যে বোধ করি আরও দু’একটি এখানে উল্লেখ করা যায়। যেমন বিডিআর এর ডি জি শাকিল যে হাসিনাকে তার নিহত হবার আগে ঝঙঝ মেসেজ পাঠিয়েছিলেন-সেসব মেসেজে কি কি কথা ছিল-এখন জানার কি কোন পথ বা উপায় আছে? কেন হাসিনা বি ডি আর ২৬ তারিখের ডিনারে উপস্থিত থাকতে অস্বীকৃতি আগেই জানিয়েছিলেন, তারই বা কারণ কি? ২৫শে ফেব্র“য়ারী বিকালে যেসব ঘাতকদের সাথে তিনি কয়েক ঘন্টা আলাপ করে ‘সাধারন ক্ষমা’ ঘোষণা করেছিলেন, তারা কারা ছিল? তাদের মুখে তখন যে রঙিন মুখোশ পরা ছিল তারই বা কারণ কি ছিল? ২৫শে ফেব্র“য়ারী সকালে যে গোয়েন্দা রিপোর্ট হাসিনা পেয়েছিলেন তাতেই বা কি ছিল?
সুনিতা সঙ্গত আরও প্রশ্ন তুলেছেন সিআইডি এর অন্যতম ও খুবই শক্তিশালী তদন্ত কর্তা কাহার আকন্দের প্রসঙ্গ নিয়েও। এই আকন্দ যে হাসিনার এলাকারই এবং আত্মীয় এবং হার্ডকোর আওয়ামী যাকে কিনা অবসরকালীন ছুটিতে থাকা অবস্থা থেকে টেনে নিয়ে এসে বিশেষ ও সবচেয়ে শক্তিশালী সিআইডি এর তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেছেন হাসিনা। এই আকন্দই ১৯৯৬ সালে একইভাবে যশোর থেকে খুঁজে নিয়ে এসে মুকিতকে ‘মুজিব হত্যা’ মামলার বাদী বানিয়েছিলেন। এরপর অতি দরিদ্র মুকিতকে কিভাবে হাসিনা অনেক ধন-সম্পত্তি দিয়ে দিয়েছিলেন-যা তিনি পরে আকিজ কোম্পানীর কাছে বিক্রয় করে নিজের অবস্থার উন্নতি করেছিলেন তাও সুনিতা তার সেই প্রশ্নাদিতে উল্লেখ করেছেন। বলা বাহুল্য এসব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে বিডিআর এর নারকীয় কর্মকান্ডের সাথে যেন হাসিনা-গংদের নিশ্চিত সম্পৃক্ততা সম্পূর্ণ বাদ দেয়া হয় এবং একটি ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপিয়ে দেয়া মার্কা রিপোর্ট সরকারী ও সিআইডি উভয় টিম দেন, তার জন্যই যতসব স্কিমিং (ঝপযবসরহম) হচ্ছে। এর জন্য সময় কেনা হচ্ছে। সাধারন মানুষের মধ্যে যখন ফেব্র“য়ারীর ঘটনা নিয়ে হতাশার শেষ নেই, তখনই সুদুর ছয় হাজার মাইল দুরে থেকে উড়ে এসে গোপাল ভাড়টি তার কোটি কোটি টাকার প্রপ্যাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশে। এর ফাঁকে অবশ্য গোপাল ভাড়টি একটি বিশেষ ছায়াছবি তৈরী করার জন্য একমাত্র চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দীন চৌধুরীর কাছে থেকে পাঁচ কোটি টাকার আগাম ওয়াদা পেয়েছেন। আরও অনেকে নাকি ঐ ছবিটি তৈরী করতে ঐ গোপাল ভাড়ের কাছে সাতষট্টি কোটি টাকা অনুদানের জন্য বাড়তি ওয়াদা করেছে। সত্তরোর্দ্ধ এই গোপালভাড়ের ভাগ্য কতই না সুপ্রসন্ন হয়েছে। অথচ ১৯৭৪ সালে যখন তাকে তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য লন্ডন যেতে হয়েছিল, তখন তাকে অন্যের দয়ার দানের উপরই নির্ভর করতে হয়েছিল। এরপরও আশির দশকের প্রথম দিকে তার একজন ভাস্তি তার হাতে ৫০০টি পাউন্ড লন্ডনে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘কাকা বাবাকে লন্ডনে বাঁচিয়ে রাখবেন’। এরপর অবশ্য বৃটিশ নাগরিকত্ব পাবার পর তার আর্থিক অবস্থার উন্নত পরিবর্তন হয় স্বাভাবিকভাবেই। ডোল-মানি ছাড়াও প্রাপ্তি হতে থাকে অন্যত্র থেকেও। ২০০৯ এর বাংলাদেশের হাসিনার সরকার যে তার জন্য আরও ভাগ্যেন্নয়নের পথ সুপ্রশস্ত করে দিয়েছেন তা তো সবাই দেখছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বাঙ্গালী প্রণব মুখার্জী, একমাত্র বাঙ্গালী ভারতীয় সাবেক সেনা প্রধান শঙ্কর রায় চৌধুরী এবং ভারতীয় মিডিয়া সমূহ যে মারাত্মক হুমকির ভাষায় বিগত প্রায় দেড়টি মাস বাঙ্গালী হাসিনাকে সাহস যোগাচ্ছেন এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অনবরত শাসিয়ে চলেছেন, গোপাল ভাড়টি তা থেকে ভিন্ন কিছু যে করছেন না, তাই তো সহজ সরল স্বাভাবিকই বটে। তবে বাংলাদেশের প্রতিজন দেশপ্রেমিক মানুষ যে দিল্লীর ও দিল্লীর খাস অথচ বাংলাদেশের হাল আমলের গোপালভাড়দের দুরভিসন্ধি ধরে ফেলে তার সফল মোকাবিলা করবেই তা বোধ করি আমাদের বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



