somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আরজ আলি মাতুব্বর - ২

১১ ই অক্টোবর, ২০০৭ ভোর ৬:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের সমাজের অসংখ্য মানুষের এই অভিজ্ঞতা অভিন্ন হলেও এই লড়াইয়ের টিকে থাকার এবং ফলাফলের অভিজ্ঞতায় আরজ আলী ভিন্ন৷ ভয়াবহ কঠিন জীবন সংগ্রাম এবং অভাব অনটন তাঁর পুস্তকপ্রীতি আর কৌতূহল শেষ করতে পারে নি৷ আদর্শলিপি পাবার সাত বছরের মাথায় তিনি অনটনের মধ্যেও 'পুঁথি-পুস্তক' সংগ্রহ শুরু করেন৷ ১৮ বছরে তিনি বই সংগ্রহ করেছিলেন ৯০০৷ বইএর আলমারি ছিল না, কেনার সাধ্যও ছিল না৷

সেজন্যই এক ঘূর্ণিঝড়ে দুর্বল ঘরের সঙ্গে বইগুলোও উড়ে চলে যায়৷ উন্মাদের মতো চেষ্টা করেছিলেন বহু বছরে বহু কষ্টের সংগ্রহ পুনরুদ্ধার করতে৷ কিন্তু লাভ হয়নি, "পরের দিন পথে-প্রান্তরে পেয়েছিলাম দু'চারখানা ছেঁড়া পাতা৷ মাতৃশোকে আমি কাঁদিনি, কিন্তু বইগুলোর দুঃখে সেদিন আমার যে কান্নার বান ডেকেছিলো, তা আমি রোধ করতে পারিনি৷"৩ হেরে না গিয়ে আবার বই সংগ্রহে নিয়োজিত হলেন৷ কিন্তু ঘরের উন্নতি না হওয়ায় বই পুস্তক নতুন ভাবে সংগ্রহ করবার ১৭ বছর পর একই ঘটনা তাঁর জীবনে আবারও ঘটলো৷ বলাই বাহুল্য, বই রাখতে গেলে শুধু ঘর থাকাই যথেষ্ট নয়, দরকার যথেষ্টই শক্তপোক্ত ঘর৷

আরজ আলী গ্রামীণ জগতে মানুষের প্রয়োজন এবং দৈনন্দিন কাজ ও সমস্যা থেকে কখনও বিযুক্ত হননি, হবার অবসরও পাননি৷ এই যুক্ততা ছিল তাঁর জীবন, ছিল তাঁর জীবিকা৷ তিনি আমিন-এর কাজ করতেন৷ গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন কাজের সুবিধার জন্য তিনি স্বল্প খরচের চুলাও তৈরি করেছিলেন৷ দ্বিতীয় খণ্ডে এর নকশা ও প্রস্তুত প্রণালী আছে৷ জমি জমার পরিমাপের সামান্য ভুলত্রুটি কিংবা জালিয়াতির কারণে বাংলাদেশে কত পরিবার ধ্বংস হয়েছে তার হিসাব করা কঠিন৷ পরিচিতজনেরা বলেছেন আমিন হিসেবে আরজ আলী এতটাই নিখুঁত ছিলেন এবং তা সকলের বিশ্বাস এমনভাবেই অর্জন করেছিল যে শুধুমাত্র তাঁর কাজের জন্যই বহু মানুষের জীবন বেঁচেছে, বহুসংঘাত আর খুনোখুনির হাত থেকে নিস্তার পেয়েছে মানুষ৷ কাজের এই দতা ও নিষ্ঠার কারণে শুধু নিজ গ্রাম নয় আশেপাশের একটি বড় অঞ্চল জুড়ে তাঁর একটি গণভিত্তি তৈরি হয়েছিল৷

এই গণভিত্তিই তাঁকে শক্তি যুগিয়েছিল প্রচলিত অনেক বিশ্বাস ও প্রথা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের৷ তাঁকে নাস্তিক বলে কেউ কেউ কোণঠাসা করতে চাইলেও তিনি খুব কদর নিয়ে সারাজীবন কাজ করেছেন৷ এমনকি আশেপাশের পির, ধর্মীয় নেতারাও তাঁর বিরুদ্ধে কখনও ফতোয়া জারি করেননি৷ আরজ আলী এই বিষয় নিয়ে সবার সঙ্গেই আলোচনায় আগ্রহী ছিলেন৷ তিনি উন্মুক্ত ছিলেন, যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করলে তাঁর প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিলে তিনি তা গ্রহণ করতে কুন্ঠিত ছিলেন না৷ এবং সেটাই, এবং প্রশ্ন উত্থাপনের ভঙ্গীই তাঁকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসী করেনি, তাঁকে নিঃসঙ্গ করেনি, যদিও "স্থানীয় বিশেষ সমাজে" তিনি দীর্ঘদিন "অবহেলিত ও তিরস্কৃত" হয়েছেন৷৪

জ্ঞানের কি ডিগ্রী হয়?

নিজের নামে পাননি বলে অন্যের নামে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়েছেন৷ এক পর্যায়ে এসে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিশদের বুঝিয়ে দিয়ে কাজ করেছেন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য৷ তিনি নিজেই বলেছেন, "দিনমজুরী করেছি মাঠে মাঠে আমিনগিরি রূপে৷ ...টাকা আমার নেই৷ আর জীবিকা নির্বাহের জন্য আমার টাকার প্রয়োজনও নেই৷"৫ নির্মাণের খরচ কমানোর জন্য লাইব্রেরি নির্মাণে শারীরিক অংশগ্রহণ করেছেন৷

তিনি খুব পরিষ্কার ছিলেন এই বিষয়ে যে, "বস্তুতঃ বিদ্যাশিার ডিগ্রী আছে, কিন্তু জ্ঞানের কোনো ডিগ্রী নেই৷ জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন৷ সেই অসীম জ্ঞানার্জনের মাধ্যম স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, তা হচ্ছে লাইব্রেরী৷"৬
এই লাইব্রেরি নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি বহু মানুষের কাছে হাত পেতেছেন, তাঁদের সহযোগিতা চেয়েছেন৷ কিন্তু সবার কাছ থেকে তাঁর অভিজ্ঞতা একরকম হয়নি৷ যাদের সঙ্গতি নেই তাঁদের কাছ থেকেই তিনি সহযোগিতা পেয়েছেন সবচাইতে বেশি৷ সেজন্যই তিনি বলেন, "লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে স্থানীয় বিত্তবানদের আমি সহানুভূতি পাইনি৷ তবে মজুরদের সাহায্য পেয়েছি প্রচুর৷...তাঁরা তাঁদের মজুরীর অর্ধেক নিয়ে আমার লাইব্রেরীর নির্মাণকাজ সমাধা করেছেন৷ কাজেই এ গ্রামের মজুরদের কাছে আমি ঋণী, হুজুরদের কাছে নয়৷"৭

এই লাইব্রেরি যাতে তাঁর মৃতু্যর পরও টিকে থাকে সেজন্য তাঁর উদ্বেগ ছিল এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও তিনি গ্রহণ করেছেন৷ লিখিতভাবে তহবিল, লাইব্রেরি ও যাবতীয় অনুষ্ঠানাদির পরিকল্পনা জানিয়ে গেছেন৷ মৃতু্যর পর নিজের অবশিষ্টাংশ যাতে মানুষের কাজে লাগে সে ব্যবস্থাও করেছেন৷ মৃতদেহ বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে দান করেন৷ চুদ্বয় চুব্যাংকে৷
গ্রন্থের প্রতি আরজ আলীর যে এই অপ্রতিরোধ্য আগ্রহ_তার কারণ কি? ডিগ্রী লাভের তো তাঁর কোন অবস্থাই ছিল না কারণ মক্তবের পর কোন শিা প্রতিষ্ঠানে, এদেশের অধিকাংশ মানুষের মতোই, তাঁরও প্রবেশাধিকার কার্যত নিষিদ্ধ ছিল৷ ছোটবেলা থেকেই কাজ করেই তাঁর বই সংগ্রহ এবং পড়া৷ ডিগ্রী লাভের জন্য অবশ্য বই খুব বেশি দরকারও হয় না, চারপাশে দেখি, অনেকসময় ডিগ্রী-পিপাসু ব্যক্তিদের বই-এর প্রতি, বিদ্যাচর্চার প্রতি এক সীমাহীন ঔদাস্য এমনকি বিকর্ষণও তৈরি হয়৷

এইসব মানুষের মনের মধ্যে ছোট-বড় ডিগ্রীর অল্পশিা-কুশিা এমনই জমাট বেঁধে বসে যে সব কৌতূহল, জগত-মানুষ-সমাজ সম্পর্কে সব প্রশ্নও বিলুপ্ত হয়৷ অচল মস্তিষ্ক এবং বড় বড় ডিগ্রী যে একসঙ্গেই চলতে পারে তার উদাহরণ পাবার জন্য আমাদের খুব বেশি পরিশ্রম করতে হবে না৷
অন্যদিকে আরজ আলী মাতুব্বরের বই-এর প্রতি, বিদ্যাচর্চার প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহের প্রধান কারণই হলো জগত মানুষ সংসার নিয়ে, অতীত বর্তমান ভবিষ্যত্নিয়ে, অপার কৌতূহল এবং মাথায় অনেক প্রশ্ন৷ আসলে কৌতূহল আর প্রশ্ন এমনই যে তার কোন সীমা বলে কিছু নেই৷ কৌতূহল পূরণ করবার জন্য যত প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করা যায় ততই নতুন নতুন প্রশ্নের আবির্ভাব ঘটে৷

কাজেই কেউ যদি প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে শুরু করেন সে এক অবিরাম যাত্রা৷ এই যাত্রা কঠিন কেননা তা প্রচলিত অনেক বোধ-বিশ্বাসকে আঘাত করে, এই যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ কেননা তা বিদ্যমান মতার কাঠামোকে িেপয়ে তুলতে পারে, এই যাত্রা গভীর আনন্দের কেননা তা ক্রমান্বয়ে সীমানা সমপ্রসারিত করতে থাকে, অসীমের দিকে তাকানোর মতা বা আত্মবিশ্বাস দান করে এবং সীমার মধ্যে নিজকেই যেন পূর্ণ করতে থাকে৷ এই প্রশ্নই আমাদের সামনে আরজ আলী মাতুব্বরকে উপস্থিত করেছে৷

তিনি তাঁর জ্ঞানের সীমা সমপ্রসারণে তাঁর সমাজের সকল জ্ঞানচর্চার মাধ্যমকেই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন৷ বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুঁথি পাঠ করে করে তাঁর পাঠের মতা যেমন বাড়ে তেমনি নতুন নতুন চিন্তার জগত্উন্মোচিত হতে থাকে৷ তিনি লিখেছেন, "স্থানীয় কতিপয় তরুণের আগ্রহে পুঁথি ও সারি গানের দল গঠনপূর্বক গান করিতে আরম্ভ করি এবং বিভিন্ন মৌলবি সাহেবদের নিকট কোরান, হাদিস, কেয়াস, ফেকাহ ইত্যাদি মুসলিম ধর্মগ্রন্থগুলির ও পুরুত-ভটচাজ্জিদের নিকট বেদ, পুরাণ, গীতা, রামায়ণ-মহাভারতাদি হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলির বঙ্গানুবাদ পাঠ ও শ্রবণ করি_উক্ত গানের তর্কসমুদ্র পার হওয়ার জন্য৷"৮

কাদের ধারাবাহিকতা রা করেন আরজ আলী মাতুব্বর? তিনি নিজেই বলেন, "প্রশ্নের কারণ কি? কারণ 'অজানাকে জানার স্পৃহা মানুষের চিরন্তন' এবং "এইরকম 'কি' ও 'কেন'র অনুসন্ধান করিতে করিতেই মানুষ আজ গড়িয়া তুলিয়াছে বিজ্ঞানের অটল সৌধ৷"৯ আরজ আলী মাতুব্বর এই সৌধ নির্মাণে হাত দিয়েছেন কোন প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন ছাড়াই৷

প্রশ্ন নিয়ে যায় অকূল চিন্তা সাগরে

আমাদের সমাজ প্রশ্ন উত্থাপনকে কঠোরভাবে নিরুত্সাহিত করে৷ বারবার বলে, 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর'৷ মানুষের মনোজগতে প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করবার েেত্র অস্বস্তি এবং ভয় কাজ করে৷ আরজ আলীর বিশিষ্টতা এখানে যে, তিনি এই ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন৷ আরজ আলী মাতুব্বর লিখেছেন, "এলোমেলোভাবে মনে যখন যে প্রশ্ন উদয় হইতেছিল, তখন তাহা লিখিয়া রাখিতেছিলাম, পুস্তক প্রণয়নের জন্য নহে, স্মরণার্থে৷ ওগুলি আমাকে ভাসাইতেছিল অকূল চিন্তা-সাগরে এবং আমি ভাসিয়া যাইতেছিলাম ধর্মজগতের বাহিরে৷"১০

যে প্রশ্নগুলি তিনি টুকে রাখছিলেন সেগুলো তাঁর আশেপাশে মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস, প্রথা, অনুশাসনকে ঘিরেই৷ এর প্রায় সবগুলোই ধর্মের নামে প্রতিষ্ঠিত৷ কিন্তু এর সব ধর্মগ্রন্থে নাও থাকতে পারে৷ বাস্তবে ধর্ম যেভাবে উপস্থিত সেটাই আরজ আলীর বিবেচনার বিষয় হয়েছে৷ এই প্রশ্নগুলি নিয়ে শুধু যে তিনিই অকূল সাগরে ভেসে যাচ্ছিলেন তা নয়, তার আশেপাশের মানুষদেরকেও তা নাড়া দিচ্ছিল ভয়ানকভাবে৷ আর কিছু নয় শুধুই প্রশ্ন৷

অল্পদিনের মধ্যেই প্রচারিত হলো তিনি নাস্তিকতা প্রচার করছেন৷ এই প্রচার শুনে এলেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, 'সমাজ-শাসন রার দায়িত্বে নিয়োজিত' সরকারি কর্মকর্তা৷ ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে (ইং ১৯৫১ সালে) ১৩৫৮ সালের ১২ জ্যৈষ্ঠ বরিশালের তত্কালীন 'ল-ইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট ও তবলিগ জামাতের আমির'কে তিনি প্রশ্নের তালিকা দেন৷ জবাবে সন্তুষ্ট হলে তিনি জামাতভুক্ত হবেন এই প্রতিশ্রুতিও প্রদান করেন৷ কিন্তু সেই ''করিম সাহেব চলিয়া যাইবার পরে আমি পাইয়াছিলাম কমু্যনিজমের অপরাধে আসামী হিসাবে ফৌজদারী মামলার একখানা ওয়ারেন্ট, কিন্তু আমার প্রশ্নগুলির জবাব আজও পাই নাই৷''১১

১৯৫১ সালের ১২ই জুলাই কোর্টে জবানবন্দি দিতে গিয়ে আগের প্রশ্নগুলোই সুসংগঠিত আকারে 'সত্যের সন্ধানে' নামে তিনি উপস্থাপন করেন৷ তিনি বলছেন, "'সত্যের সন্ধান'-এর পাণ্ডুলিপিখানার বদৌলতে সে মামলায় আমি দৈহিক নিষ্কৃতি পেলাম বটে, কিন্তু মানসিক শাস্তি ভোগ করতে হলো বহু বছর৷ কেননা তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, 'সত্যের সন্ধান' বইখানা আমি প্রকাশ করতে পারবো না ও ধর্মীয় সনাতন মতবাদের সমালোচনামূলক অন্য কোনো বই লিখতে পারবো না এবং পারবো না কোনো সভা-সমিতিতে-বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বমত প্রচার করতে৷

যদি এর একটি কাজও করি, তবে যে কোনো অজুহাতে আমাকে পুনঃ ফৌজদারীতে সোপর্দ করা হবে৷ অগত্যা কলম-কালাম বন্ধ করে আমাকে বসে থাকতে হলো ঘরে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত৷ এভাবে নষ্ট হয়ে গেলো আমার কর্মজীবনের অমূল্য ২০টি বছর৷ বাংলাদেশে কুখ্যাত পাকিস্তান সরকারের সমাধি হলে পর 'সত্যের সন্ধান' বইখানা প্রকাশ করা হয় ১৩৮০ সালে, রচনার ২২ বছর পর৷"১২

শুধু প্রশ্ন উত্থাপনের অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিকে কলম কালাম চর্চা থেকে রাষ্ট্রের বল দিয়ে থামিয়ে রাখা হলো৷ প্রশ্নের প্রতি এত ভয় রাষ্ট্রের, কলম ও কালাম নিয়ে এত ভয়!

সেই ১৯৫১ সালের প্রশ্ন থেকে শুরু করে মৃতু্য পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে নিভৃত গ্রামে একা, মৃদু কেরাসিনের বাতি নিয়ে আরজ আলী মাতুব্বর যেসব বিষয় অধ্যয়ন, বিশেষণ ও সূত্রবদ্ধ করেছেন সেগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়৷ এগুলো হল-

(১) দৈনন্দিন দুর্ভোগ এবং তার পরিবর্তনের সম্ভাব্যতা৷
(২) লোভ এবং ভয় কেন্দ্রিক ধর্ম- ডিসকোর্স৷
(৩) জগতের উদ্ভব এবং তার নিয়ম৷
(৪) ঈশ্বর, শয়তান, রাম, রাবণ, ফেরেশতা, দেবতা সম্পর্কিত মিথ পর্যালোচনা৷

আলাহর গজব কিংবা কপালের লেখা

আরজ আলী মাতুব্বরকে বিশেষভাবে ভাবিত করেছে মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ এবং সে সম্পর্কে মানুষের নিজস্ব ব্যাখ্যা, সমাজে অধিপতি চিন্তায় সেসব দুর্ভোগ আর অপমান যুক্তিযুক্ত করবার চেষ্টা৷ এসব বিষয় অনুসন্ধান করতে গিয়েই তিনি ক্রমশ আরও গভীর দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন৷ দারিদ্র্য, অনাহার, অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্গতি ইত্যাদি আরজ আলীকে বাইরে থেকে দেখতে হয়নি৷ তিনি এর মধ্যেই ছিলেন৷ কিন্তু এসব ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে করতে তিনি সেই বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন যা মনে করে বা মনে করতে শেখায় যে, এসব কিছুই কপালের লেখা, এর পরিবর্তন সম্ভব নয়৷

আমাদের দেশে এযাবতকাল যত বড় দুর্যোগে মানুষ পড়েছেন তার সবগুলোতেই এর কারণ হিসেবে শোনা গেছে যে, এগুলো হল 'আলাহর গজব'৷ ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর কিংবা ১৯৯১ সালে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে যখন লাধিক মানুষ নিহত হয়েছিলেন তখন তিগ্রস্ত অঞ্চলে ঘুরতে গিয়ে এরকম কথা আমি নিজেও অনেক শুনেছি৷ ১৯৯১ সালের সেই ঘূর্ণিঝড়ে গ্রামের পর গ্রাম সমান হয়ে গিয়েছি। অত ঘর তখন সমগ্র এলাকায় খুঁজে পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব৷ হঠাত্হঠাত্একটা দুটো ঘর অত পাওযা যাচ্ছিল যেগুলো পাকা।
(চলবে......)

তথ্যসূত্রঃ
৩. ঐ (১, ২১৩)
৪. সংপ্তি জীবন বাণী, ঐ, ২, ২৬২
৫. স্মরণিকা, ঐ, ১, ২০৫
৬. স্মরণিকা, ঐ, ১, ১৯৯
৭. স্মরণিকা, ঐ, ১, ২০০
৮. সংপ্তি জীবন বাণী, ২, ২৬০
৯. সত্যের সন্ধান, ১, ৫০
১০. সত্যের সন্ধান, প্রথম সংস্করণের ভূমিকা, ১, ৪৭
১১. সত্যের সন্ধান, প্রথম সংস্করণের ভূমিকা, ১, ৪৭
১২. অনুমান, সমাপ্তি, ১, ১৯২
১৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×