somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... “সফটওয়্যার মুক্তি দিবস – ২০১১” তে বাংলাদেশে উৎসব আয়োজন
কথায় বলে- স্বাধীনতার মর্ম সেই বুঝে যার বন্দীত্বের অভিজ্ঞতা রয়েছে। নির্বোধের কোন যৌক্তিক বোধ থাকে না বলে স্বাধীনতা তার কাছে কেবলই অর্থহীন একটা শব্দ মাত্র। কিন্তু সৃজনশীল ব্যক্তি মাত্রেই স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কেননা তাঁরা জানেন সৃজনশীলতা মানেই মুক্ত স্বাধীন যেমন ইচ্ছে সৃষ্টির বহমান উচ্ছ্বাস ! একান্তই নিজের মতো গড়ে নেয়ার অহঙ্কারী গর্বিত স্রষ্টা এরা। তাঁদের সৃষ্টির মধ্য দিয়েই সভ্যতা এগিয়ে যায়। তাই সবাই স্রষ্টা হতে চায়, কেউ পারে কেউ পারে না।

আমি হয়তো অক্ষর দিয়ে কাব্য করার নামে কিছু গড়তে চাই। কিন্তু এইসব মুক্ত স্বাধীন অক্ষরকেও কেউ না কেউ আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন বলে আমি আমার স্বাধীন অধিকারে এসব অক্ষরকে নিজের মতো করে সাজানোর মধ্যে দিয়ে সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠার চেষ্টা করি। যাঁরা প্রযুক্তির কবি, তাঁরাও প্রযুক্তিকে নিজের মতো সাজিয়ে গড়ে তুলেন নতুন নতুন প্রাযুক্তিক ভুবন। কিন্তু তাদের জন্যেও প্রয়োজন হয় প্রযুক্তির অক্ষর, যাকে সমকালীন আধুনিক সংজ্ঞায় আমরা বলি সফটওয়্যার। আমার ভাষা এবং আমার অক্ষরকে যেমন আমার মতো করে ব্যবহারের স্বাধীন অধিকার রয়েছে, তেমনি সেই সৃজনোন্মুখ প্রযুক্তি-কবিদেরও রয়েছে প্রযুক্তির ভাষা ও অক্ষর তথা সফটওয়্যারগুলো নিজের মতো করে ব্যবহারের অধিকার। এ অধিকারকে স্বীকার না-করার অর্থই হচ্ছে মানুষের স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতাকেও অস্বীকার করা। মানুষ কোন যন্ত্র নয়, জন্মগতভাবেই মানুষ স্বাধীন সত্তাকে ধারণ করেই এগিয়ে যায়। এটাই সভ্যতার ইতিহাস। এ ইতিহাস মানবতারই ইতিহাস। প্রযুক্তির ভুবনেও রয়েছে মানুষের এমন গর্বিত ইতিহাস, যার সাথে যুক্ত হয়ে ‘মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলন’ নামটিও আজ প্রাযুক্তিক উৎকর্ষে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে আলোকিত করে দিয়েছে মানুষের সৃজনশীল বিকাশের আনন্দধারাকে। তাই আপনি যদি নিজেকে সৃজনশীল ভাবতে পছন্দ করেন, কিংবা মানুষের সৃষ্টির স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হন, তাহলে নিচের ঘোষণাটিকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না ! কারণ এটা সেই দর্শন যা মানুষকে কোন বন্দী যন্ত্র বা রোবট নয়, সৃজনশীল মানুষ হিসেবেই ভাবতে চায়, এবং ভাবেও ! কেন ভাবে ?

তা নিজেই পরখ করে দেখুন নিচের অফিসিয়াল ঘোষণাটিতে, যা আমি হুবহু তুলে দিলাম সবার অবগতির জন্য ।-


“সফটওয়্যার মুক্তি দিবস – ২০১১” তে বাংলাদেশে উৎসব আয়োজন
মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলন একটি সামাজিক আন্দোলন যার উদ্দেশ্য কম্পিউটার ব্যবহারকারীর অধিকার সংরক্ষণ করা। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলন, মুক্ত সফটওয়্যার তৈরি করতে, ব্যবহার করতে এবং মানোন্নয়ন করতে উৎসাহ প্রদান করে। আশির দশকের শুরুর দিকে রিচার্ড স্টলম্যান এই দর্শনকে বাস্তবায়নের জন্য গ্নু(GNU) প্রকল্প শুরু করেন। এজন্যেই তাঁকে এই আন্দোলনের প্রবক্তা হিসাবে গণ্য করা হয়। এই আন্দোলন কে তরাণ্বিত করতে ২০০৪ সাল থেকে প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় শনিবারে পালন করা হচ্ছে “সফটওয়্যার মুক্তি দিবস”। ২০১১ সালে এই দিনটি হলো ১৭ই সেপ্টেম্বর। আরো বিস্তারিত জানতে ঘুরে আসুন – http://wiki.softwarefreedomday.org থেকে। সারা পৃথিবীতে কারা কারা এই দিনটি উদযাপন করছে তা দেখতে হলে এখানে ঘুরে আসুন http://wiki.softwarefreedomday.org/CategoryTeam2011

ফাউন্ডেশন ফর ওপেন সোর্স সলিউশনস বাংলাদেশ এ বছর সকল উন্মুক্ত সফটওয়্যারপ্রেমীকে সাথে নিয়ে পালন করতে যাচ্ছে “সফটওয়্যার মুক্তি দিবস – ২০১১”। আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হবে প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বনানী ক্যাম্পাসে।
.
আয়োজনের তারিখ ও সময়: ১৭ই শে সেপ্টেম্বর ২০১১ইং, শনিবার। সকাল ১০টা থেকে শুরু হবে আয়োজন। আয়োজন স্থল: প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়, বনানী ক্যাম্পাস। আয়োজনের বিস্তারিত সূচী (৮ঘন্টা ৩০মিনিটের দিনব্যাপী এ আয়োজন সকলের জন্য উন্মুক্ত):
.
১। সকাল ১০টায় আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে নিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ঘোষনা করা হবে এবং সাথে কিছু স্বাগত বক্তব্য দেবেন আয়োজক এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।
২। সকাল সাড়ে দশটা থেকে শুরু হয়ে দিনব্যাপী আয়োজনে বিভিন্ন ধরনের মুক্ত সফটওয়্যার ও লিনাক্স ডিস্ট্রোর ইতিহাস আর চিত্রসহ ডঙ্গল, ফেস্টুন, ব্যানার নিয়ে প্রদর্শনী চলবে।
৩। দিনব্যাপী এ আয়োজনে আরো থাকছে ”সফটওয়্যার মুক্তি আন্দোলন” নিয়ে তথ্যভিত্তিক ভিডিও চিত্র প্রদর্শনী।
৪। এছাড়াও আয়োজনস্থলে থাকবে বিভিন্ন জনপ্রিয় লিনাক্স ডিস্ট্রোগুলোর পেনড্রাইভে, পছন্দের মিডিয়াতে এবং সিডি/ডিভিডিতে বিতরনের ব্যবস্থা।
.
বিশেষ আকর্ষণ:
প্রথমবারের মতন এবার থাকছে ‍‍”লিনাক্স ইন্সটলেশন বুথ”। যেখানে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকগণ আয়োজনে অংশগ্রহনকারীর পছন্দ অনুসারে তাঁদের ল্যাপটপ কিংবা নেটবুকে লিনাক্স ভিত্তিক বিভিন্ন ডিস্ট্রো ইন্সটল এবং ইন্সটল পরবর্তী নিত্য প্রয়োজনীয় সেটিংসগুলো করে দেবেন। (অনলাইনে ফর্মপূরনকারীরা অগ্রাধিকার পাবেন।)
.
আয়োজনস্থ্যলের লেআউট


মো: আশিকুর রহমান (আশিকুর_নূর)
সহকারী সমন্বয়ক, অান্তর্জালিক প্রকাশনা, “সফটওয়্যার মুক্তি দিবস – ২০১১, বাংলাদেশ” উদযাপন পরিষদ
ফাউন্ডেশন ফর ওপেন সোর্স সলিউশনস বাংলাদেশ।

আয়োজনে আপনার যোগদান নিশ্চিত করতে এই ফর্মে আপনার তথ্য যুক্ত করে দিন

…]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29447703 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29447703 2011-09-14 00:46:47
"লিনাক্স ডে - ২০১১" - বাংলাদেশ, কুড়ি বছর পূর্তির উৎসব আয়োজন।

আপনি কি লিনাক্স ভালোবাসেন ? অথবা লিনাক্স সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ? কিংবা, কেন আপনি লিনাক্স ব্যবহার করবেন না, এটুকু জানার সে কৌতুহলও সফলভাবে নিবারণ করতে হলে চলে আসুন নিম্নে ঘোষিত অনুষ্ঠান আয়োজনে ! অন্তত এটা বলতে পারি, ঠকবেন না ! চমৎকার কিছু বন্ধুও পেয়ে যেতে পারেন !
...
"লিনাক্স ডে - ২০১১" - বাংলাদেশ, কুড়ি বছর পূর্তির উৎসব আয়োজন।

১৯৯১ সালের ২৫শে আগস্ট, হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তির এক ছাত্র লিনুস টরভ্যাল্ডস ঘোষনা দেন উন্মুক্ত সোর্স ভিত্তিক কার্নেল “লিনাক্স” রিলিজের। সেই থেকে আজ অবধি লিনাক্স ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম সারা বিশ্বের সার্ভারের জগৎটা দাপিয়েই বেড়াচ্ছে। কিন্তু লিনাক্স ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেমগুলো এখন আর শুধুই সার্ভারের জগতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই বিষয়টা প্রযুক্তিপ্রেমী সব বাংলাদেশী কে জানাতে, বোঝাতে এবং ডেক্সটপ দুনিয়ায় লিনাক্স ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেমের বীরত্বপূর্ণ সাফল্য গাঁথার কিছু ইতিহাস সবার সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে ফাউন্ডেশন ফর ওপেন সোর্স সলিউশনস বাংলাদেশ (Foundation for Open Source Solutions Bangladesh) বা সংক্ষেপে এফওএসএস বাংলাদেশ (FOSS Bangladesh) এবছরে লিনাক্সের ২০ তম জন্মবার্ষিকীতে “লিনাক্স ডে – ২০১১” উদযাপন করতে যাচ্ছে। আপনি যদি প্রযুক্তিপ্রেমী হোন এবং লিনাক্স সম্পর্কে জানতে আগ্রহী থাকেন তো চলে আসুন আমাদের এ আয়োজনে।

আয়োজনের তারিখ ও সময়: ২৫ শে আগস্ট, ২০১১ইং, বৃস্পতিবার। সকাল ১০টা থেকে শুরু হবে এ আয়োজন।
আয়োজন স্থল: ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র বা টিএসসি (লবি ও গেমস রুম), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আয়োজনের বিস্তারিত সূচী:
১। সকাল ১০টায় ব্যানার-ফেস্টুন সহ পদযাত্রা/শোভাযাত্রা শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে থেকে শুরু হয়ে, রাজু ভাস্কর্য, শহীদ মিনার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’র পাখি চত্বরে এসে শেষ হবে।
২। সকাল সাড়ে দশটা থেকে শুরু হয়ে দিনব্যাপী টিএসসির করিডোর আর লবিতে বিভিন্ন ধরনের লিনাক্স ডিস্ট্রোর ইতিহাস আর চিত্রসহ ডঙ্গল, ফেস্টুন, ব্যানার নিয়ে প্রদর্শনী চলবে এবং এ আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
৩। আরো থাকছে ওপেন সোর্স এবং লিনাক্স নিয়ে আমাদের এবং দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংগঠনের সেবামূলক কাজকর্মের ভিডিও চিত্র প্রদর্শনী, দিনব্যাপী।
৪। বিকাল ৪টা থেকে শুরু হবে আমন্ত্রিত অতিথি ও দশর্কদের মাঝে মত বিনিময় এবং আলোচনা অনুষ্ঠান।
৫। এছাড়াও আয়োজনস্থলে বিভিন্ন জনপ্রিয় লিনাক্স ডিস্ট্রোগুলোর পেনড্রাইভ বা পছন্দের মিডিয়াতে অথবা সিডি/ডিভিডিতে বিতরনের ব্যবস্থা থাকবে।

আয়োজনে আপনার যোগদান নিশ্চিত করতে এই ফর্মে আপনার তথ্য যুক্ত করে দিন।

--
আশিকুর নূর
সহকারী সমন্বয়ক, অান্তর্জালিক প্রকাশনা
“লিনাক্স ডে - ২০১১” উদযাপন পরিষদ
ফাউন্ডেশন ফর ওপেন সোর্স সলিউশনস বাংলাদেশ
...
[ আর লিনাক্স কমিউনিটি ফোরাম'] -এও ঢু মেরে দেখে আসতে পারেন, যদি কাজে লেগে যায় ! ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29435721 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29435721 2011-08-20 23:29:38
| অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং একজন বাবাসাহেব | পর্ব: ৫/৮ |
[ ডিসক্লেইমার: লেখার বিষয় সংবেদনশীল এবং কিঞ্চিৎ গবেষণাধর্মী। ইতঃপূর্বে এটি মুক্ত-মনা বাংলা ব্লগে সিরিজ আকারে আটটি পর্বে প্রকাশিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে ই-বুক আকারে সেখানে সংরক্ষিত হয়েছে। রিপোস্ট সিরিজ হলেও বিষয়বস্তুর কারণে আশা করি কারো বিরক্তির কারণ হবে না। তাছাড়া পাঠক হিসেবে অনায়াসে এড়িয়ে যাবার স্বাধীনতা তো রয়েছেই ! ]

পর্ব-১
পর্ব-২
পর্ব-৩
পর্ব-৪ এরপর...
...
০৪
সম্পদ অর্জন এবং তা নিজের অধিকারে রাখার প্রচেষ্টা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনেই এককালে ব্যক্তির উত্তরাধিকার তৈরি জরুরি হয়ে পড়ে। এবং এ কারণেই মানব সমাজে বিবাহপ্রথার সৃষ্টি হয় বলে সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত। বৈদিক সমাজে বিবাহকে অন্যতম ধর্মানুষ্টানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানেও বৈষম্যবাদী বর্ণপ্রথার তীব্র উপস্থিতি। বিশেষ করে নিম্নবর্গীয় শূদ্রনারীকে উচ্চবর্ণীয়দের দ্বারা ভোগ করার ব্যবস্থা পাকা করা হলেও শূদ্রদের জন্য কোন মর্যাদা বা সুযোগ না রেখে সর্বতোভাবে বঞ্চিত করার কূটকৌশলী প্রয়াস মনুসংহিতার বিবাহ ব্যবস্থায় তীব্রভাবে লক্ষ্যণীয়।

সবর্ণাহগ্রে দ্বিজাতীনাং প্রশস্তা দারকর্মণি।
কামতস্তু প্রবৃত্তানামিমাঃ স্যুঃ ক্রমশো বরাঃ।। (৩/১২)
বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য- এই দ্বিজাতিগণের দারপরিগ্রহব্যাপারে সর্বপ্রথমে (অর্থাৎ অন্য নারীকে বিবাহ করার আগে) সমানজাতীয়া কন্যাকেই বিবাহ করা প্রশস্ত। কিন্তু কামনাপরায়ণ হয়ে পুনরায় বিবাহে প্রবৃত্ত হলে (অর্থাৎ সবর্ণাকে বিবাহ করা হয়ে গেলে তার উপর যদি কোনও কারণে প্রীতি না জন্মে অথবা পুত্রের উৎপাদনের জন্য ব্যাপার নিষ্পন্ন না হলে যদি কাম-প্রযুক্ত অন্যস্ত্রী-অভিলাষ জন্মায় তাহলে) দ্বিজাতির পক্ষে বক্ষ্যমাণ নারীরা প্রশস্ত হবে। (পরবর্তী শ্লোকে তা বর্ণিত হয়েছে)


শূদ্রৈব ভার্যা শূদ্রস্য সা চ স্বা চ বিশঃ স্মৃতে।
তে চ স্বা চৈব রাজ্ঞশ্চ তাশ্চ স্বা চাগ্রজম্মনঃ।। (৩/১৩)
বঙ্গানুবাদ: একমাত্র শূদ্রকন্যাই শূদ্রের ভার্যা হবে; বৈশ্য সজাতীয়া বৈশ্যকন্যা ও শূদ্রাকে বিবাহ করতে পারে; ক্ষত্রিয়ের পক্ষে সবর্ণা ক্ষত্রিয়কন্যা এবং বৈশ্যা ও শূদ্রা ভার্যা হতে পারে; আর ব্রাহ্মণের পক্ষে সবর্ণা ব্রাহ্মণকন্যা এবং ক্ষত্রিয়া, বৈশ্যা ও শূদ্রা ভার্যা হতে পারে।

অর্থাৎ এখানে ‘অনুলোম’ বিবাহের বিষয়টিকেই অনুমোদন করা হয়েছে। উচ্চবর্ণের পুরুষের সাথে অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্ণের কন্যার বিবাহকে অনুলোম বিবাহ বলে। এর বিপরীত বিবাহের নাম প্রতিলোম বিবাহ। প্রতিলোম বিবাহ সকল স্মৃতিকারদের দ্বারাই নিন্দিত। মনু মনে করেন, প্রথমে সজাতীয়া কন্যার সাথে বিবাহই প্রশস্ত। পুনর্বিবাহের ইচ্ছা হলে অনুলোম-বিবাহের সমর্থন দেয়া হয়েছে।
কিন্তু এখানেও অন্য ভার্যায় সমস্যা নেই, শূদ্রা ভার্যার ক্ষেত্রেই যত বিপত্তি।

দৈবপিত্র্যাতিথেয়ানি তৎপ্রধানানি যস্য তু।
নাশ্লন্তি পিতৃদেবাস্তং ন চ স্বর্গং স গচ্ছতি।। (৩/১৮)
বঙ্গানুবাদ: শূদ্রা ভার্যা গ্রহণের পর যদি ব্রাহ্মণের দৈবকর্ম (দেবতার উদ্দেশ্যে যজ্ঞ বা যে ব্রাহ্মণভোজনাদি হয়, তা), পিত্র্যকর্ম (পিতৃপুরুষের প্রতি করণীয় কর্ম যেমন শ্রাদ্ধ, উদক-তর্পণ প্রভৃতি) এবং আতিথেয় কর্ম (যেমন অতিথির পরিচর্যা, অতিথিকে ভোজন দান প্রভৃতি) প্রভৃতিতে শূদ্রা ভার্যার প্রাধান্য থাকে অর্থাৎ ঐ কর্মগুলি যদি শূদ্রা স্ত্রীকর্তৃক বিশেষরূপে সম্পন্ন হয়, তাহলে সেই দ্রব্য পিতৃপুরুষগণ এবং দেবতাগণ ভক্ষণ করেন না এবং সেই গৃহস্থ ঐ সব দেবকর্মাদির ফলে স্বর্গেও যান না (অর্থাৎ সেই সব কর্মানুষ্ঠান নিষ্ফল হয়।)

অর্থাৎ শূদ্রা নারী ব্রাহ্মণের প্রথম পরবর্তী ভার্যা হয়ে ব্রহ্মভোগের বস্তু হলো ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্ত্রীর কোনো মর্যাদাই তার প্রাপ্য হয় না। আর যদি সে প্রথম বিয়ে করা স্ত্রী হয় ?

শূদ্রাং শয়নমারোপ্য ব্রাহ্মণো যাত্যধোগতিম্।
জনয়িত্বা সুতং তস্যাং ব্রাহ্মণ্যাদেব হীয়তে।। (৩/১৭)
বঙ্গানুবাদ: সবর্ণা স্ত্রী বিবাহ না করে শূদ্রা নারীকে প্রথমে বিবাহ করে নিজ শয্যায় গ্রহণ করলে ব্রাহ্মণ অধোগতি (নরক) প্রাপ্ত হন; আবার সেই স্ত্রীতে সন্তানোৎপাদন করলে তিনি ব্রাহ্মণত্ব থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পড়েন (অর্থাৎ সমানজাতীয়া নারী বিবাহ না করে দৈবাৎ শূদ্রা বিবাহ করলেও তাতে সন্তান উৎপাদন করা ব্রাহ্মণের উচিত নয়)।

এছাড়া ব্যভিচারের দণ্ডের ক্ষেত্রেও বৈষম্যবাদী বর্ণপ্রথা চোখে পড়ার মতো-


শূদ্রো গুপ্তমগুপ্তং বা দ্বৈজাতং বর্ণমাবসন্।
অগুপ্তমঙ্গসর্বস্বৈর্গুপ্তং সর্বেণ হীয়তে।। (৮/৩৭৪)
বঙ্গানুবাদ: কোনও দ্বিজাতি-নারী (অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ত্রিয় ও বৈশ্য নারী) স্বামীর দ্বারা রক্ষিত হোক্ বা না-ই হোক্, কোনও শূদ্র যদি তার সাথে মৈথুন ক্রিয়ার দ্বারা উপগত হয়, তাহলে অরক্ষিতা নারীর সাথে সঙ্গমের শাস্তিস্বরূপ তার সর্বস্ব হরণ এবং লিঙ্গচ্ছেদনরূপ দণ্ড হবে, আর যদি স্বামীর দ্বারা রক্ষিতা নারীর সাথে সম্ভোগ করে তাহলে ঐ শূদ্রের সর্বস্বহরণ এবং মারণদণ্ড হবে।

অথচ উচ্চবর্ণিয়দের ক্ষেত্রে একই অপরাধের জন্য বিবিধ বিধানের মাধ্যমে মনুশাস্ত্রে বর্ণক্রমানুসারে বিভিন্ন মাত্রার কিছু অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে মাত্র।

০৫
বৈদিক শাস্ত্র মনুসংহিতায় বলা হচ্ছে যে, ব্রহ্মা তাঁর পা থেকে শূদ্রের সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ শূদ্রের জন্ম নিজে নিজে বা তার ইচ্ছায় হয়নি বা এ প্রক্রিয়ায় তার কোন কর্মদোষও জড়িত নেই। জড়িত কেবল স্রষ্টা ব্রহ্মার তীব্র বৈষম্যমূলক দৃষ্টি। অথচ মনুসংহিতায় শূদ্রের প্রতি অন্য বর্ণকে যে অমানবিক আচরণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা এককথায় ন্যাক্কারজনক।

ন শূদ্রায় মতিং দদ্যান্নোচ্ছিষ্টং ন হবিষ্কৃতম্।
ন চাস্যোপদিশেদ্ ধর্মং ন চাস্য ব্রতমাদিশেৎ।। (৪/৮০)
বঙ্গানুবাদ: শূদ্রকে কোন মন্ত্রণা-পরামর্শ দেবে না। শূদ্রকে উচ্ছিষ্ট দান করবে না। যজ্ঞের হবির জন্য যা ‘কৃত’ অর্থাৎ সঙ্কল্পিত এমন দ্রব্য শূদ্রকে দেবে না; শূদ্রকে কোনও ধর্মোপদেশ করবে না এবং কোনও ব্রত বা প্রায়শ্চিত্ত করতেও উপদেশ দেবে না।

কেউ এ বিধান অমান্য করলে তার পরিণতি বর্ণিত হয়েছে এভাবে-


যো হ্যস্য ধর্মমাচষ্টে যশ্চৈবাদিশতি ব্রতম্।
সোহসংবৃতং নাম তমঃ সহ তেনৈব মজ্জতি।। (৪/৮১)
বঙ্গানুবাদ: যে ব্যক্তি (কোন ব্রাহ্মণকে ব্যবধানে না রেখে) নিজে শূদ্রকে ধর্মোপদেশ দেন, বা প্রায়শ্চিত্তাদি ব্রতের অনুষ্ঠান করতে আদেশ দেন, তিনি সেই শূদ্রের সাথে অসংবৃত নামক গহন নরকে নিমগ্ন হন।

উল্লেখ্য যে, মনুশাস্ত্রে শূদ্রের কোনরূপ সম্পদ অর্জনকেও নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।


শক্তেনাপি হি শূদ্রেণ ন কার্যো ধনসঞ্চয়ঃ।
শূদ্রো হি ধনমাসাদ্য ব্রাহ্মণানেব বাধতে।। (১০/১২৯)
বঙ্গানুবাদ: ‘ধন অর্জনে সমর্থ হলেও শূদ্রকে কিছুতেই ধন সঞ্চয় করতে দেওয়া চলবে না, কেননা ধন সঞ্চয় করলে ব্রাহ্মণদের কষ্ট হয়৷ শাস্ত্রজ্ঞানহীন শূদ্র ধনমদে মত্ত হয়ে ব্রাহ্মণদের পরিচর্যা না করে অবমাননা করতে পারে৷’

এই যখন অবস্থা- সম্পদ অর্জন নয়, কোনরূপ খাবার সরবরাহও নয়, তাহলে শূদ্রদের বেঁচে থাকার উপায় ? উপায় একটা রয়েছে বৈ কি। এক্ষেত্রে যেসব জন্মদাস শূদ্র ব্রাহ্মণ বা অন্য উচ্চবর্ণীয়দের সেবা শুশ্রূষায় কৃতপরায়ণ হবে তাদের প্রতি অবশ্য কিছুটা করুণা দেখানো হয়েছে। যেমন-

শূদ্রাণাং মাসিকং কার্যং বপনং ন্যায়বর্তিনাম্।
বৈশ্যবচ্ছৌচকল্পশ্চ দ্বিজোচ্ছিষ্টঞ্চ ভোজনম্।। (৫/১৪০)
বঙ্গানুবাদ: ন্যায়চরণকারী শূদ্রগণ (অর্থাৎ সে সব শূদ্র ব্রাহ্মণ-শুশ্রূষা পরায়ণ) মাসে মাসে কেশ বপন (অর্থাৎ কেশমুণ্ডন) করবে এবং জননশৌচে ও মরণাশৌচে বৈশ্যের মত অশৌচ পালনের পর শুদ্ধ হবে এবং ব্রাহ্মণের উচ্ছিষ্ট ভোজন করবে।

উচ্ছিষ্টমন্নং দাতব্যং জীর্ণানি বসনানি চ।
পুলাকাশ্চৈব ধান্যানাং জীর্ণাশ্চৈব পরিচ্ছদাঃ।। (১০/১২৫)
বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণ উচ্ছিষ্ট অন্ন, জীর্ণ-পরিত্যক্ত বস্ত্র, ধানের পুলাক অর্থাৎ আগড়া (অসার ধান) এবং জীর্ণ পুরাতন ‘পরিচ্ছদ’ অর্থাৎ শয্যা-আসন প্রভৃতি আশ্রিত শূদ্রকে দেবেন।

মনুসংহিতায় বর্ণিত সামাজিক বিচার ব্যবস্থায় দণ্ড প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বর্ণবৈষম্যের তীব্রতা লক্ষ করা যায়। অধমর্ণদের প্রতি উত্তমর্ণের খারাপ আচরণের দণ্ডের সাথে উত্তমর্ণের প্রতি অধমণের্র খারাপ আচরণের দণ্ডে যথেষ্ট ভেদ রয়েছে। কিন্তু নিম্নবর্ণ শূদ্র ও অন্ত্যজদের প্রতি দণ্ড প্রয়োগের বিধি একেবারেই অমানবিকতায় পর্যবসিত হতে দেখা যায়।


পঞ্চাশদ্ ব্রাহ্মণো দণ্ড্যঃ ত্রিয়স্যাভিশংসনে।
বৈশ্যে স্যাদর্দ্ধপঞ্চাশৎ শূদ্রে দ্বাদশকো দমঃ।। (৮/২৬৮)
বঙ্গানুবাদ: (উত্তমর্ণ) ব্রাহ্মণ যদি (অধমর্ণ অনুসারে) ক্ষত্রিয়ের প্রতি আক্রোশন বা গালিগালাজ করে তা হলে তার পঞ্চাশ দণ্ড হবে, বৈশ্যের প্রতি করলে পঁচিশ পণ এবং শূদ্রের প্রতি করলে বারো পণ দণ্ড হবে।

শতং ব্রাহ্মণমাক্রুশ্য ক্ষত্রিয়ো দণ্ডমর্হতি।
বৈশ্যোহ প্যর্দ্ধশতং দ্বে বা শূদ্রস্তু বধমর্হতি।। (৮/২৬৭)
বঙ্গানুবাদ: ক্ষত্রিয় যদি ব্রাহ্মণকে গালাগালি দেয় তা হলে তার এক শ পণ দণ্ড হবে। এই একই অপরাধে বৈশ্যের দণ্ড হবে দেড় শ কিংবা দুই শ পণ; আর শূদ্র শারীরিক দণ্ড প্রাপ্ত হবে (এই দণ্ড অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী বধ পর্যন্ত হতে পারে)।

এই শারীরিক দণ্ড কেমন হবে তাও বিশদ ব্যাখ্যাকারে বর্ণিত হয়েছে-


যেন কেনচিদঙ্গেন হিংস্যাচ্চেৎ শ্রেষ্ঠমন্ত্যজঃ।
ছেত্তব্যং তত্তদেবাস্য তন্মনোরনুশাসনম্।। (৮/২৭৯)
বঙ্গানুবাদ: শূদ্র কিংবা অন্ত্যজ ব্যক্তি (শূদ্র থেকে চণ্ডাল পর্যন্ত নিকৃষ্ট জাতি) দ্বিজাতিগণকে (ব্রাহ্মণ, ত্রিয়, বৈশ্য) যে অঙ্গের দ্বারা পীড়ন করবে তার সেই অঙ্গ ছেদন করে দেবে, এটি মনুর নির্দেশ।

মনুশাস্ত্র অনুযায়ী একজাতি শূদ্র যদি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য- এইসব দ্বিজাতিকে দারুণ কথা বলে গালি দেয় তা হলে তার জিহ্বাছেদন কর্তব্য (৮/২৭০), যদি নাম ও জাতি তুলে আক্রোশন করে তবে তার মুখের মধ্যে দশ-আঙুল পরিমাণ জ্বলন্ত লৌহময় কীলক প্রবেশ করিয়ে দেবে (৮/২৭১), যদি ঔদ্ধত্যবশতঃ ব্রাহ্মণকে “তোমার এই ধর্ম অনুষ্ঠেয়, এখানে ধর্মানুষ্ঠানে তোমাকে এই সব কাজ করতে হবে” এইসব বলে ধর্মোপদেশ করে তা হলে রাজা তার মুখে ও কানে উত্তপ্ত তেল ঢেলে দেবেন (৮/২৭২), যদি হাত উঁচিয়ে কিংবা লাঠি উঁচিয়ে ক্রোধের সাথে উচ্চ জাতিকে প্রহার করে তবে তার হাত কেটে দেবে এবং পায়ের দ্বারা যদি ক্রোধের সাথে প্রহার করে তা হলে পা কেটে দেবে (৮/২৮০), ঔদ্ধত্যবশতঃ ব্রাহ্মণের গায়ে থুতু-গয়ের প্রভৃতি দিলে রাজা অপরাধীর ওষ্ঠদ্বয় কেটে দেবেন, মূত্রাদি ত্যাগ করলে পুরুষাঙ্গ এবং পায়ুবায়ু ত্যাগ করলে মলদ্বার কেটে দেবেন (৮/২৮২)। (অপমান করার অভিপ্রায়ে কোনও শূদ্র যদি ঔদ্ধত্যবশতঃ) ব্রাহ্মণের চুল ধরে টানে, কিংবা পা, দাড়ি, গ্রীবা (গলা) কিংবা বৃষণ (অণ্ডকোষ) ধরে টানে তাহলে রাজা কোন রকম বিচার না করেই ঐ শূদ্রের দুটি হাতই কেটে দেবেন (৮/২৮৩)। শুধু তা-ই নয়-


ব্রাহ্মণান্ বাধমানন্তু কামাদবরবর্ণজম্।
হন্যাচ্চিত্রৈর্বধোপায়ৈরুদ্বেজনকরৈর্নৃপঃ।। (৯/২৪৮)
বঙ্গানুবাদ: যদি কোনও শূদ্র ইচ্ছাপূর্বক ব্রাহ্মণকে শারীরিক বা আর্থিক পীড়া দেয়, তাহলে অতি কষ্টপ্রদ নানা উদ্বেগজনক-উপায়ে (যেমন শূলে চড়িয়ে, মস্তক ছেদন করে দীর্ঘকাল যন্ত্রণা ভোগ করিয়ে) সেই শূদ্রকে বধ করা উচিত।

তাছাড়া-

সহাসনমভিপ্রেপ্সু রুৎকৃষ্টস্যাপকৃষ্টজঃ।
কট্যাং কৃতাঙ্কো নির্বাস্যঃ স্ফিচং বাহস্যাবকর্তয়েৎ।। (৮/২৮১)
বঙ্গানুবাদ: যদি কোন শূদ্রজাতীয় ব্যক্তি ব্রাহ্মণের সঙ্গে এই আসনে বসে তা হলে তার কোমরে ছেঁকা লাগিয়ে দাগ দিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে কিংবা তার পাছা খানিকটা কেটে দেবে।

শূদ্রজন্ম যে প্রকৃত অর্থেই দাসজন্ম, এ বিষয়টা যাতে কারো কাছে অস্পষ্ট না থাকে সেজন্যে মনুশাস্ত্রে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে-


শূদ্রং তু কারয়েদ্ দাস্যং ক্রীতমক্রীতমেব বা।
দাস্যায়ৈব হি সৃষ্টোহসৌ ব্রাহ্মণস্য স্বয়ম্ভুবা।। (৮/৪১৩)
বঙ্গানুবাদ: ক্রীত অর্থাৎ অন্নাদির দ্বারা প্রতিপালিত হোক্ বা অক্রীতই হোক্ শূদ্রের দ্বারা ব্রাহ্মণ দাসত্বের কাজ করিয়ে নেবেন। যেহেতু, বিধাতা শূদ্রকে ব্রাহ্মণের দাসত্বের জন্যই সৃষ্টি করেছেন।

ন স্বামিনা নিসৃষ্টোহপি শূদ্রো দাস্যাদ্বিমুচ্যতে।
নিসর্গজং হি তত্তস্য কস্তস্মাত্তদপোহতি।। (৮/৪১৪)
বঙ্গানুবাদ: প্রভু শূদ্রকে দাসত্ব থেকে অব্যাহতি দিলেও শূদ্র দাসত্ব কর্ম থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। দাসত্বকর্ম তার স্বভাবসিদ্ধ কর্ম (অর্থাৎ জন্মের সাথে আগত)। তাই ঐ শূদ্রের কাছ থেকে কে দাসত্ব কর্ম সরিয়ে নিতে পারে ?

বৈশ্যশূদ্রৌ প্রযত্নেন স্বানি কর্মাণি কারয়েৎ।
তৌ হি চ্যুতৌ স্বকর্মভ্যঃ ক্ষোভয়েতামিদং জগৎ।। (৮/৪১৮)
বঙ্গানুবাদ: রাজা বিশেষ যত্ন সহকারে বৈশ্য এবং শূদ্রকে দিয়ে তাদের কাজ অর্থাৎ কৃষিবাণিজ্যাদি করিয়ে নেবেন। কারণ, তারা নিজ নিজ কাজ ত্যাগ করলে এই পৃথিবীকে বিক্ষুব্ধ করে তুলবে।

অর্থাৎ শূদ্রকে তার নিজ কর্মের বাইরে বিকল্প জীবিকা গ্রহণের কোন সুযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথচ উচ্চবর্ণিয়দের জন্য প্রতিকুল সময়ে ভিন্ন জীবিকা গ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগ এই মনুসংহিতায় বিশদভাবেই দেয়া হয়েছে।
(চলবে...)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29342159 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29342159 2011-03-11 03:13:44
| অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং একজন বাবাসাহেব | পর্ব: ৪/৮ |
[ ডিসক্লেইমার: লেখার বিষয় সংবেদনশীল এবং কিঞ্চিৎ গবেষণাধর্মী। ইতঃপূর্বে এটি মুক্ত-মনা বাংলা ব্লগে সিরিজ আকারে আটটি পর্বে প্রকাশিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে ই-বুক আকারে সেখানে সংরক্ষিত হয়েছে। রিপোস্ট সিরিজ হলেও বিষয়বস্তুর কারণে আশা করি কারো বিরক্তির কারণ হবে না। তাছাড়া পাঠক হিসেবে অনায়াসে এড়িয়ে যাবার স্বাধীনতা তো রয়েছেই ! ]

পর্ব-১
পর্ব-২
পর্ব-৩ এরপর...
...
০৩
মনুসংহিতায় নারীকে কোন্ দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে তা মনুর শ্লোক থেকেই ভালোভাবে অনুধাবন করা যায়-

ক্ষেত্রভূতা স্মৃতা নারী বীজভূতঃ স্মৃতঃ পুমান্।
ক্ষেত্রবীজসমাযোগাৎ সম্ভবঃ সর্বদেহিনাম্।। (৯/৩৩)
বঙ্গানুবাদ: নারী শস্যক্ষেত্রের মতো, আর পুরুষ শস্যের বীজস্বরূপ। এই ক্ষেত্র ও বীজের সংযোগে সকল প্রাণীর উৎপত্তি।

বীজস্য চৈব যোন্যাশ্চ বীজমুৎকৃষ্টমুচ্যতে।
সর্বভূতপ্রসূতির্হি বীজলক্ষণলক্ষিতা।। (৯/৩৫)
বঙ্গানুবাদ: বীজ ও যোনি এই দুটির মধ্যে বীজই শ্রেষ্ঠ বলে কথিত হয়। কারণ, সর্বত্র সন্তান বীজের লক্ষণযুক্ত হয়ে থাকে।

শাস্ত্রীয় পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত মনুশাস্ত্রে শস্যক্ষেত্ররূপী নারীর চেয়ে বীজরূপ পুরুষেরই শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে তা কি আর বলতে হয় ! তবে পবিত্র শাস্ত্র এটা প্রচার করেই ক্ষান্ত হয়নি। নারী যে একটা নিকৃষ্ট কামজ সত্ত্বা তা প্রমাণেও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে-


স্বভাব এষ নারীণাং নরাণামিহ্ দূষণম্।
অতোহর্থান্ন প্রমাদ্যন্তি প্রমদাসু বিপশ্চিতঃ।। (২/২১৩)
বঙ্গানুবাদ: ইহলোকে (শৃঙ্গার চেষ্টার দ্বারা মোহিত করে) পুরুষদের দূষিত করাই নারীদের স্বভাব; এই কারণে পণ্ডিতেরা স্ত্রীলোকসম্বন্ধে কখনোই অনবধান হন না।

মাত্রা স্বস্রা দুহিত্রা বা না বিবিক্তাসনো ভবেৎ।
বলবানিন্দ্রিয়গ্রামো বিদ্বাংসমপি কর্ষতি।। (২/২১৫)
বঙ্গানুবাদ: মাতা, ভগিনী বা কন্যার সাথে কোনও পুরুষ নির্জন গৃহাদিতে বাস করবে না, কারণ ইন্দ্রিয়সমূহ এতই বলবান্ (চঞ্চল) যে, এরা (শাস্ত্রালোচনার দ্বারা আত্মসংযম অভ্যাস করতে পেরেছেন এমন) বিদ্বান্ ব্যক্তিকেও আকর্ষণ করে (অর্থাৎ কামক্রোধাদির বশবর্তী করে তোলে)।

অর্থাৎ তথাকথিত শাস্ত্রজ্ঞ হয়েও আসলে পুরুষ অভব্যই হয়, এবং তার দুরাচারকে সুকৌশলে ব্রহ্মবাক্য দিয়ে শেষপর্যন্ত নারীর উপরই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। নারী যে আসলে মানুষ নয়, অন্যান্য ভোগ্যবস্তুর মতোই পুরুষের ব্যবহারযোগ্য উপভোগের সামগ্রী মাত্র তা নিচের শ্লোক থেকে বুঝতে কি কোন সমস্যা হয় ?

স্ত্রিয়ো রত্নান্যথো বিদ্যা ধর্মঃ শৌচং সুভাষিতম্।
বিবিধানি চ শিল্পানি সমাদেয়ানি সর্বতঃ।। (২/২৪০)
বঙ্গানুবাদ: স্ত্রী, রত্ন (মণি-মাণিক্য), বিদ্যা, ধর্ম, শৌচ, হিতবাক্য এবং বিবিধ শিল্পকার্য সকলের কাছ থেকে সকলেই গ্রহণ করতে পারে।

মনুশাস্ত্রে আসলে নারীর স্বাধীনতা কখনোই স্বীকার করা হয়নি-


বালয়া বা যুবত্যা বা বৃদ্ধয়া বাপি যোষিতা।
ন স্বাতস্ত্র্যেণ কর্তব্যং কিঞ্চিৎ কার্যং গৃহেষ্বপি।। (৫/১৪৭)
বঙ্গানুবাদ: স্ত্রীলোক বালিকাই হোক, যুবতীই হোক কিংবা বৃদ্ধাই হোক, সে গৃহমধ্যে থেকে কোনও কাজই স্বামী প্রভৃতির অনুমতি ছাড়া করতে পারবে না।

বাল্যে পিতুর্বশে তিষ্ঠেৎ পানিগ্রাহস্য যৌবনে।
পুত্রাণাং ভর্তরি প্রেতে ন ভজেৎ স্ত্রী স্বতন্ত্রতাম্।। (৫/১৪৮)
বঙ্গানুবাদ: স্ত্রীলোক বাল্যাবস্থায় পিতার অধীনে থাকবে, যৌবনকালে পাণিগ্রহীতার অর্থাৎ স্বামীর অধীনে থাকবে এবং স্বামীর মৃত্যু হলে পুত্রদের অধীনে থাকবে। (পুত্র না থাকলে স্বামীর সপিণ্ড, স্বামীর সপিণ্ড না থাকলে পিতার সপিণ্ড এবং পিতার সপিণ্ড না থাকলে রাজার বশে থাকবে), কিন্তু কোনও অবস্থাতেই স্ত্রীলোক স্বাধীনতা লাভ করতে পারবে না।

উল্লেখ্য যে, সপিণ্ড মানে যিনি মৃতব্যক্তির শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে পিণ্ড দানের যোগ্য। হিন্দুশাস্ত্রে পিণ্ডদানের ক্রমাধিকারের সাথে সম্পত্তির অধিকার অর্জনের বিষয়ও জড়িত।

পিত্রা ভর্ত্রা সুতৈর্বাপি নেচ্ছেদ্বিরহমাত্মনঃ।
এষাং হি বিরহেণ স্ত্রী গর্হ্যে কুর্যাদুভে কুলে।। (৫/১৪৯)
বঙ্গানুবাদ: স্ত্রীলোক কখনো পিতা, স্বামী কিংবা পুত্রের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না; কারণ, স্ত্রীলোক এদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে পিতৃকুল ও পতিকুল- উভয় কুলকেই কলঙ্কিত করে তোলে।

বিশীলঃ কামবৃত্তো বা গুণৈ র্বা পরিবর্জিতঃ।
উপচর্যঃ স্ত্রিয়া সাধ্ব্যা সততং দেববৎ পতিঃ।। (৫/১৫৪)
বঙ্গানুবাদ: স্বামী বিশীল (অর্থাৎ জুয়াখেলা প্রভৃতিতে আসক্ত এবং সদাচারশূন্য), কামবৃত্ত (অর্থাৎ অন্য স্ত্রীতে অনুরক্ত) এবং শাস্ত্রাধ্যায়নাদি ও ধনদানাদি গুণবিহীন হলেও সাধ্বী স্ত্রীর কর্তব্য হল স্বামীকে দেবতার মতো সেবা করা।

কামং তু ক্ষপয়েদ্দেহং পুষ্পমূলফলৈঃ শুভৈঃ।
ন তু নামাপি গৃহ্নীয়াৎ পত্যৌ প্রেতে পরস্য তু।। (৫/১৫৭)
বঙ্গানুবাদ: পতি মৃত হলে স্ত্রী বরং পবিত্র ফুল-ফল-মূলাদি অল্পাহারের দ্বারা জীবন ক্ষয় করবে, কিন্তু ব্যভিচারবুদ্ধিতে পরপুরুষের নামোচ্চারণও করবে না।

অর্থাৎ নারীর কোন জৈবিক চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে না। এই চাওয়া-পাওয়াকে পবিত্র মনুশাস্ত্রে স্বীকার করা হয়নি। তবে নারীর ক্ষেত্রে জৈবনিক চাহিদাকে স্বীকার করা না হলেও শাস্ত্রে পুরুষের কামচরিতার্থতার প্রয়োজনকে কিন্তু অস্বীকার করা হয়নি, বরং তা পূরণের জন্য পবিত্র বিধানও তৈরি করে দেয়া হয়েছে-


ভার্যায়ৈ পূর্বমারিণ্যৈ দত্ত্বাগ্নীনন্ত্যকর্মণি।
পুনর্দারক্রিয়াং কুর্যাৎ পুনরাধানমেব চ।। (৫/১৬৮)
বঙ্গানুবাদ: (সুশীলা-) ভার্যা স্বামীর পূর্বে মারা গেলে তার দাহাদি অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করে পুরুষ পুনরায় দারপরিগ্রহ ও অগ্ন্যাধ্যান করবে (যদি ধর্মানুষ্ঠান ও কামচরিতার্থতার প্রয়োজন থাকে, তবেই ঐ স্বামীর পুনরায় দারপরিগ্রহ করা উচিৎ। তা না হলে পত্নী নেই বলে বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস অবলম্বন করতে পারে)।

যারা পবিত্র ধর্মগ্রন্থে নারী-পুরুষের সমতা খুঁজে বেড়ান, তারা আসলে কী যে খুঁজেন বুঝা দায়। তবে মনুশাস্ত্রে স্ত্রীর মর্যাদা কতটুকু তা এই শ্লোক থেকেও কিঞ্চিত অনুধাবন করা যেতে পারে-


ভার্যা পুত্রশ্চ দাসশ্চ শিষ্যো ভ্রাতা চ সোদরঃ।
প্রাপ্তাপরাধাস্তাড্যাঃ স্যূ রজ্জ্বা বেণুলেন বা।। (৮/২৯৯)
বঙ্গানুবাদ: স্ত্রী, পুত্র, ভৃত্য, শিষ্য এবং কনিষ্ঠ সহোদরভ্রাতা অপরাধ করলে সূক্ষ্ম দড়ির দ্বারা কিংবা বেতের দ্বারা শাসনের জন্য প্রহার করবে।

তবে প্রিয়জনকে প্রহার বলে কথা, তাই শাস্ত্র কি এতোটা নির্দয় হতে পারে ! প্রহারের নিয়মও বলে দেয়া হয়েছে-


পৃষ্ঠতস্তু শরীরস্য নোত্তমাঙ্গে কথঞ্চন।
অতোহন্যথা তু প্রহরন্ প্রাপ্তঃ স্যাচ্চৌরকিল্বিষম্।। (৮/৩০০)
বঙ্গানুবাদ: রজ্জু প্রভৃতির দ্বারা প্রহার যদি করতে হয়, তাহলে শরীরের পশ্চাদ্ভাগে প্রহার কর্তব্য; কখনো উত্তমাঙ্গে বা মাথায় যেন প্রহার করা না হয়; এই ব্যবস্থার অন্যথা করে অন্যত্র প্রহার করলে প্রহারকারী চোরের মতো অপরাধী ও দণ্ডনীয় হবে।

তারপরও এসব হচ্ছে শাস্ত্রবাক্য। আর শাস্ত্র কি উচিত কথা বলতে কার্পণ্য করতে পারে ? তাই বলা হচ্ছে-


ভার্যা পুত্রশ্চ দাসশ্চ ত্রয় এবাধনাঃ স্মৃতাঃ।
যত্তে সমধিগচ্ছন্তি যস্য তে তস্য তদ্ ধনম্।। (৮/৪১৬)
বঙ্গানুবাদ: স্মৃতিকারদের মতে ভার্যা, পুত্র ও দাস- এরা তিনজনই অধম (বিকল্পে অধন); এরা তিনজনেই যা কিছু অর্থ উপার্জন করবে তাতে এদের কোনও স্বাতন্ত্র্য থাকবে না, পরন্তু এরা যার অধীন ঐ ধন তারই হবে।

দাসী হোক বাঁদী হোক, তবু তো স্ত্রী, তাকে ছাড়া পুরুষের চলেও না। তাই মনুসংহিতায় পুরুষদেরকে স্ত্রী-স্বভাব সম্পর্কে জ্ঞাত করা না হলে কি চলে !


শয্যাসনমলঙ্কারং কামং ক্রোধমনার্জবম্।
দ্রোহভাবং কুচর্যাঞ্চ স্ত্রীভ্যো মনুরকল্পয়ৎ।। (৯/১৭)
বঙ্গানুবাদ: বেশি নিদ্রা যাওয়া, কেবল বসে থাকার ইচ্ছা, শরীরকে অলংকৃত করা, কাম অর্থাৎ পুরুষকে ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা, অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, নীচহৃদয়তা, অন্যের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং কুচর্মা অর্থাৎ নীচ পুরুষকে ভজনা করা- স্ত্রীলোকদের এই সব স্বভাব মনু এদের সৃষ্টি-কালেই করে গিয়েছেন।

এরকম অদ্ভুত বক্তব্য মনুশাস্ত্রে নিতান্ত কম নয়। তাই বোধ করি শাস্ত্র অত্যন্ত সচেতনভাবেই স্ত্রী-রক্ষকদেরকে সতর্ক করে দিয়েছে-


ইমং হি সর্ববর্ণানাং পশ্যন্তো ধর্মমুত্তমম্।
যতন্তে রক্ষিতুং ভার্যাং ভর্তারো দুর্বলা অপি।। (৯/৬)
বঙ্গানুবাদ: স্ত্রীলোককে রক্ষণরূপ-ধর্ম সকল বর্ণের পক্ষে শ্রেষ্ঠ ধর্ম- অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ কর্তব্য। এই ব্যাপার বুঝে অন্ধ, পঙ্গু প্রভৃতি দুর্বল স্বামীরাও নিজ নিজ স্ত্রীকে রক্ষা করবার জন্য যত্ন করবে।
প্রশ্ন হতে পারে, স্ত্রী-রক্ষায় এতোটা গুরুত্ব দেয়া হলো কেন ? কারণ-

স্বাং প্রসূতিং চরিত্রঞ্চ কুলমাত্মানমেব চ।
স্বঞ্চ ধর্মং প্রযত্নেন জায়াং রক্ষন্ হি রক্ষতি।। (৯/৭)
বঙ্গানুবাদ: যে লোক যত্নের সাথে নিজের স্ত্রীকে রক্ষ করে, তার দ্বারা নিজ সন্তান রক্ষিত হয়। কারণ, সাঙ্কর্যাদি দোষ না থাকলে বিশুদ্ধ সন্তান-সন্ততি জন্মে। স্ত্রীকে রক্ষার দ্বারা শিষ্টাচার রক্ষিত হয় এবং নিজের কুলমর্যাদা রক্ষিত হয়। স্ত্রীকে রক্ষা করলে নিজেকেও রক্ষা করা হয় এবং স্ত্রীকে রক্ষা করলে স্বামী তার নিজের ধর্মকেও রক্ষা করতে পারে।

তাই, কিভাবে স্ত্রীকে রক্ষা করতে হবে তার উপায়ও মনু বাতলে দিয়েছেন-


ন কশ্চিদ্যোষিতঃ শক্তঃ প্রসহ্য পরিরক্ষিতুম্।
এতৈরুপায়যোগৈস্তু শক্যাস্তাঃ পরিরক্ষিতুম্।। (৯/১০)
বঙ্গানুবাদ: স্ত্রীলোকসমূহকে কেউ বলপূর্বক বা সংরোধ বা তাড়নাদির দ্বারা রক্ষা করতে পারে না। কিন্তু বক্ষ্যমাণ উপায়গুলি অবলম্বন করলে তাদের রক্ষা করা যায়।

কী উপায় ?


অর্থস্য সংগ্রেহে চৈনাং ব্যয়ে চৈব নিযোজয়েৎ।
শৌচে ধর্মেহন্নপক্ত্যাঞ্চ পারিণাহ্যস্য বেক্ষণে।। (৯/১১)
বঙ্গানুবাদ: টাকাকড়ি ঠিকমত হিসাব করে জমা রাখা এবং খরচ করা, গৃহ ও গৃহস্থালী শুদ্ধ রাখা, ধর্ম-কর্ম সমূহের আয়োজন করা, অন্নপাক করা এবং শয্যাসনাদির তত্ত্বাবধান করা- এই সব কাজে স্ত্রীলোকদের নিযুক্ত করে অন্যমনস্ক রাখবে।

মূলত মনুশাস্ত্রে কোথাও নারীকে শূদ্রের চেয়ে বেশি মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্মৃতি বা বেদাদি ধর্মশাস্ত্রে বা কোন ধর্মানুষ্ঠানে শূদ্রকে যেমন কোন অধিকার দেয়া হয়নি, নারীকেও তেমনি স্বভাবজাত দাসী বানিয়েই রাখা হয়েছে-


নাস্তি স্ত্রীণাং ক্রিয়া মন্ত্রৈরিতি ধর্মে ব্যবস্থিতিঃ।
নিরিন্দ্রিয়া হ্যমন্ত্রাশ্চ স্ত্রিয়োহনৃতমিতি স্থিতিঃ।। (৯/১৮)
বঙ্গানুবাদ: স্ত্রীলোকদের মন্ত্রপাঠপূর্বক জাতকর্মাদি কোনও ক্রিয়া করার অধিকার নেই- এ-ই হলো ধর্মব্যবস্থা। অর্থাৎ স্মৃতি বা বেদাদি ধর্মশাস্ত্রে এবং কোনও মন্ত্রেও এদের অধিকার নেই- এজন্য এরা মিথ্যা বা অপদার্থ, -এই হলো শাস্ত্রস্থিতি।

(চলবে...)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29297276 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29297276 2010-12-27 22:57:06
| অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং একজন বাবাসাহেব | পর্ব: ৩/৮ |
[ ডিসক্লেইমার: লেখার বিষয় সংবেদনশীল এবং কিঞ্চিৎ গবেষণাধর্মী। ইতঃপূর্বে এটি মুক্ত-মনা বাংলা ব্লগে সিরিজ আকারে আটটি পর্বে প্রকাশিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে ই-বুক আকারে সেখানে সংরক্ষিত হয়েছে। রিপোস্ট সিরিজ হলেও বিষয়বস্তুর কারণে আশা করি কারো বিরক্তির কারণ হবে না। তাছাড়া পাঠক হিসেবে অনায়াসে এড়িয়ে যাবার স্বাধীনতা তো রয়েছেই ! ]

পর্ব-১
পর্ব-২ -এর পর.....

০২
মনুষ্য সমাজে সন্তান জন্ম নিলে তার একক পরিচিতির জন্যে একটি নামের প্রয়োজন হয়। অবশ্য পালনীয় বৈদিক বিধি মনুসংহিতায় তা অস্বীকার করা হয়নি। তবে বর্ণপ্রথার কঠিন নিগড় নামকরণ ব্যবস্থার মধ্যেও পরিয়ে দেয়া হয়েছে সুকৌশলে। বিধি অনুসারে এমনভাবে নামকরণ করতে হবে, নাম থেকেই যেন বুঝা যায় কে উচ্চবর্ণের প্রভুবংশীয় এবং কে নিম্নবর্গীয় দাসজাত শূদ্রবংশীয়।

মঙ্গল্যং ব্রাহ্মণস্য স্যাৎ ক্ষত্রিয়স্য বলান্বিতম্।
বৈশ্যস্য ধনসংযুক্তং শূদ্রস্য তু জুগুপ্সিতম্।। (২/৩১)
বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণের নাম হবে মঙ্গলবাচক শব্দ (‘মঙ্গল’ শব্দের অর্থ ‘ধর্ম’; সেই ধর্মের সাধক ‘মঙ্গল্য’; ইন্দ্র, বায়ু প্রভৃতি দেবতাবাচক শব্দ বা ঋষিবাচক শব্দ মঙ্গলের সাধন, তাই ‘মঙ্গল্য’; যেমন- ইন্দ্র, বায়ু, বসিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র প্রভৃতি); ক্ষত্রিয়ের নাম হবে বলসূচক শব্দ (যেমন, প্রজাপাল, দুর্যোধন, নৃসিংহ প্রভৃতি); বৈশ্যের নাম হবে ধনবাচক অর্থাৎ পুষ্টিবৃদ্ধিসমন্বিত (যেমন ধনকর্মা, গোমান, ধনপতি প্রভৃতি) এবং শূদ্রের নাম হবে জুগুপ্সিত (নিন্দা বা হীনতাবোধক, যেমন- কৃপণক, দীন, শবরক ইত্যাদি)।

শর্মবদ্বাহ্মণস্য স্যাদ্ রাজ্ঞো রক্ষাসমন্বিতম্।
বৈশ্যস্য পুষ্টিসংযুক্তং শূদ্রস্য প্রৈষ্যসংযুতম্।। (২/৩২)
বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণের নামের সাথে শর্মা এই উপপদ যুক্ত হবে (অর্থাৎ আগে মঙ্গলবাচক শব্দ তারপর ‘শর্মা’ এই উপপদ যুক্ত হবে; যেমন শুভশর্মা), ক্ষত্রিয়ের নামের সাথে ‘বর্মা’ বা এইরকম কোনও রক্ষাবাচক উপাধি যুক্ত হবে; (যেমন বলবর্মা), বৈশ্যের নামের সাথে যুক্ত হবে ‘বৃদ্ধ, গুপ্ত, ভূতি’ প্রভৃতি পুষ্টিবোধক উপপদ (যেমন গোবৃদ্ধ, ধনগুপ্ত, বসুভূতি প্রভৃতি) এবং শূদ্রের নামের উপাধি হবে প্রৈষ্য (দাস বা ভৃত্য) বাচক শব্দ (যেমন দীনদাস, ব্রাহ্মণদাস, দেবদাস প্রভৃতি)।

আর স্ত্রী-জাতির নামের ক্ষেত্রে ?


স্ত্রীণাং সুখোদ্যমক্রূরং বিস্পষ্টার্থং মনোহরম্।
মঙ্গল্যং দীর্ঘবর্ণান্তমাশীর্বাদাভিধানবৎ।। (২/৩৩)
বঙ্গানুবাদ: স্ত্রীলোকদের পক্ষে এমন নাম রাখতে হবে- যে নাম সুখে উচ্চারণ করতে পারা যায় অর্থাৎ স্ত্রীলোক ও বালকেরাও যে নাম অনায়াসে উচ্চারণ করতে পারে (যেমন যশোদাদেবী; এই নাম দুরুশ্চারণাক্ষরহীন হবে, যেমন ‘সুশ্লিষ্টাঙ্গী’ এই রকম নাম হবে না), সে নাম যেন ক্রূরার্থের প্রকাশক না হয় (অর্থাৎ ডাকিনী, পরুষা প্রভৃতি নাম হবে না), যে নাম বিস্পষ্টার্থ হবে (অর্থাৎ অনায়াসে যে নামের অর্থবোধ হয়; ‘কামনিধা’, ‘কারীষগন্ধী’ প্রভৃতি যে সব নামের অর্থ স্পষ্ট নয় এমন নাম হবে না), যে নাম হবে মনোহর অর্থাৎ চিত্তের আহ্লাদজনক (যেমন শ্রেয়সী; কিন্তু ‘কালাক্ষী’ জাতীয় নাম মনের সুখ উৎপাদন করে না), যে নাম মঙ্গলের বাচক হয় (যেমন চারুমতী, শর্মমতী; বিপরীত নাম যেমন ‘অভাগা’, ‘মন্দভাগ্যা’ প্রভৃতি হবে না), যে নামের শেষে দীর্ঘ স্বর থাকে (যেমন ‘ঈ’কার, আ-কার যুক্ত নাম), যে নামের উচ্চারণে আশীর্বাদ বোঝায় (যেমন ‘সপুত্রা’, ‘বহুপুত্রা’ প্রভৃতি)।

যাই হোক, পুরুষের ভোগ্যসামগ্রি হিসেবে স্ত্রীলোকের একটি সুন্দর নাম যে তাকে ভোগের ক্ষেত্রেও মানসিক পরিতৃপ্তিজনক ক্ষেত্র বা আবহ তৈরি করে, বৈদিক ঈশ্বরের মনেও তা রেখাপাত করতে পেরেছে বলে মনে হয়। ভাবতে ভালোই লাগে, ঈশ্বর কি তাহলে পুরুষ সম্প্রদায়ের কেউ ? অবশ্য মনুসংহিতায় সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত ব্রহ্মা তো পুরুষগুণবাচকই। সেভাবেই তাঁকে উপস্থাপিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের প্রাসঙ্গিক বিষয়ে যাবার আগে এই সংহিতা বা শাস্ত্র রচিত হবার শাস্ত্র-বর্ণিত ইতিহাস অতি সংপ্তিভাবে জেনে রাখলে শাস্ত্রবিধিগুলো অনুধাবনে সহায়তা হতে পারে।

স্বয়ম্ভু ভগবান কর্তৃক পূর্বে অপ্রকাশিত এই বিশ্বসংসার সৃষ্টি ও সংহারের পর্যায়ক্রমিক বিশদ বর্ণনার এক পর্যায়ে এসে মনুসংহিতায় বলা হচ্ছে-


এবং স জাগ্রৎস্বপ্নাভ্যামিদং সর্বং চরাচরম্।
সঞ্জীবয়তি চাজস্রং প্রমাপয়তি চাব্যয়ঃ।। (১/৫৭)
বঙ্গানুবাদ: এইরূপে সেই অব্যয় পুরুষ ব্রহ্মা স্বীয় জাগ্রৎ ও স্বপ্ন অবস্থার দ্বারা এই চরাচর বিশ্বের সতত সৃষ্টি ও সংহার করছেন।

এরপরই আমরা পেয়ে যাই এই শাস্ত্র প্রস্তুতির উল্লেখ-


ইদং শাস্ত্রং তু কৃত্বাসৌ মামেব স্বয়মাদিতঃ।
বিধিবদ্ গ্রাহয়ামাস মরীচ্যাদীংস্ত্বহং মুনীন্।। (১/৫৮)
বঙ্গানুবাদ: ব্রহ্মা সৃষ্টির প্রথমে এই শাস্ত্র প্রস্তুত করে আমাকে যথাবিধি অধ্যয়ন করিয়েছিলেন এবং আমি (মনু) মরীচি প্রভৃতি মুনিগণকে অধ্যয়ন করিয়েছি।


প্রখ্যাত শাস্ত্রভাষ্যকার মেধাতিথি মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ের এই ৫৮ সংখ্যক শ্লোকের ভাষ্যে বলেন- “নারদশ্চ স্মরতি। শতসাহস্রো গ্রন্থঃ প্রজাপতিনা কৃতঃ স মন্বাদিভিঃ ক্রমেণ সংক্ষিপ্ত ইতি।” অর্থাৎ এখানে নারদ বলছেন- “এই গ্রন্থ শতসাহস্র বা লক্ষ সন্দর্ভাত্মক; প্রজাপতি (ব্রহ্মা) এটি রচনা করেছেন। তারপর ঐ লক্ষ সন্দর্ভটিকে ক্রমে ক্রমে মনু প্রভৃতি মহর্ষিগণ সংক্ষিপ্ত করেছেন।”

এই একই শ্লোকের টিকায় কুল্লুকভট্ট নারদের উক্তি উল্লেখ করে বলেন- ব্রহ্মা প্রথমে স্মৃতিগ্রন্থটি প্রণয়ন করেন; তারপর মনু নিজ ভাষায় তার সারসংক্ষেপ করেন এবং সেই সংক্ষিপ্ত গ্রন্থটিই তাঁর শিষ্যদের মধ্যে প্রচার করেন।

পৃথিবীকে সপ্তদ্বীপা কল্পনা করে সেই সেই দ্বীপে সাতটি জাতির পর্যায়ক্রমে বসতি স্থাপনের উল্লেখ দেখা যায়। এই সাতটি ছিল মূল জাতি। প্রত্যেক মূল জাতির আদি পিতা মনু; ফলে মোট সাতজন মনুর অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এঁরা হলেন- স্বায়ংভুব, স্বারোচিষ, ঔত্তমি, তামস, রৈবত, চাক্ষুষ ও বৈবস্বত। এঁদের মধ্যে বৈবস্বত মনুকে আর্যজাতির আদি পিতারূপে কল্পনা করা হয়েছে। মনুসংহিতায় এই মনুর কথাই বলা হয়েছে। মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ে (শ্লোক ৩২-৩৫) দেখা যায়, প্রজাপতি ব্রহ্মা থেকে বিরাট্ পুরুষের উৎপত্তি হয়েছিল এবং সেই বিরাট্ পুরুষ তপস্যার দ্বারা মনু-কে সৃষ্টি করেছিলেন। মনু আবার প্রজাসৃষ্টির অভিলাষে ক্লেশকর তপস্যা করে যে দশজন প্রজাপতি (এঁরা সকলেই মহর্ষি) সৃষ্টি করলেন তাঁরা হলেন- মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, প্রচেতা, বশিষ্ঠ, ভৃগু এবং নারদ। প্রথম অধ্যায়ের শ্লোক ৫৮-৫৯ অনুযায়ী বলা হচ্ছে, ব্রহ্মা মনুসংহিতায় আলোচনীয় শাস্ত্র অর্থাৎ বিধিনিষেধসমূহ প্রস্তুত করে প্রথমে মনু-কে অধ্যয়ন করিয়েছিলেন এবং তারপর মনু তা মরীচি প্রভৃতি মুনিগণকে পড়িয়েছিলেন। ভৃগুমনি এই সম্পূর্ণশাস্ত্র মনুর কাছে অধ্যয়ন করলেন। চারটি বর্ণের ও সঙ্কর জাতিগণের ধর্মসমূহ জানার উদ্দেশ্যে মনু-সমীপে আগত মহর্ষিদের মনু জানালেন যে, তিনি এইসব শাস্ত্র ভৃগুকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং এই ভৃগুই ঐ শাস্ত্র আদ্যোপান্ত সকলকে শোনাবেন। মনুকর্তৃক এইভাবে আদিষ্ট হয়ে মহর্ষি ভৃগু খুশি হয়ে সকল ঋষিকে তাঁদের জিজ্ঞাস্যের উত্তর দিতে লাগলেন- এভাবেই মনুসংহিতা ভৃগু কর্তৃক সংস্কার ও সংকলিত হয়ে প্রচারিত হলো। এ প্রসঙ্গে মনুসংহিতার সর্বশেষ অর্থাৎ দ্বাদশ অধ্যায়ের অন্তিম শ্লোকটি লক্ষ্যণীয়-


ইত্যেতন্মানবং শাস্ত্রং ভৃগুপ্রোক্তং পঠন্ দ্বিজঃ।
ভবত্যাচারবান্নিত্যং যথেষ্টাং প্রাপ্লুয়াদ্ গতিম্।। (১২/১২৬)
বঙ্গানুবাদ: ভৃগুর দ্বারা কথিত এই মনু-সৃষ্ট-শাস্ত্র নিয়মিত পাঠ করতে থাকলে দ্বিজগণ সতত আচারনিষ্ঠ হন এবং যথাভিলষিত উৎকৃষ্ট গতি অর্থাৎ স্বর্গ লাভ করেন।

কিন্তু এ মুহূর্তে স্বর্গ লাভের বদলে আমাদের প্রয়োজন মনুসংহিতা গ্রন্থটি অলৌকিকতার মোড়কে লৌকিক বর্ণাশ্রমপ্রসূত কী ভয়ানক জাতি-বিভেদ ও বর্ণ-বিদ্বেষে দুষ্ট তা অনুধাবন করা। তাই প্রাসঙ্গিক আলোচনায় ফিরে আসাই উত্তম।

(চলবে....)

[পরবর্তী পর্ব: ৪/৮ এখানে]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29274438 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29274438 2010-11-19 17:31:59
| অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং একজন বাবাসাহেব | পর্ব: ২/৮ |
[ ডিসক্লেইমার: লেখার বিষয় সংবেদনশীল এবং কিঞ্চিৎ গবেষণাধর্মী। ইতঃপূর্বে এটি মুক্ত-মনা বাংলা ব্লগে সিরিজ আকারে আটটি পর্বে প্রকাশিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে ই-বুক আকারে সেখানে সংরক্ষিত হয়েছে। রিপোস্ট সিরিজ হলেও বিষয়বস্তুর কারণে আশা করি কারো বিরক্তির কারণ হবে না। তাছাড়া পাঠক হিসেবে অনায়াসে এড়িয়ে যাবার স্বাধীনতা তো রয়েছেই ! ]

[ ১ম পর্ব]

মনুসংহিতা ও ব্রাহ্মণ্যবাদ
পৃথিবীতে যতগুলো কথিত ধর্মগ্রন্থ রয়েছে তার মধ্যে মনে হয় অন্যতম বর্বর, নীতিহীন, শঠতা আর অমানবিক প্রতারণায় পরিপূর্ণ গ্রন্থটির নাম হচ্ছে ‘মনুস্মৃতি’ (Manu-smriti) বা ‘মনুসংহিতা’ (Manu-samhita)। ব্রাহ্মণ্যবাদের (Hinduism) আকর গ্রন্থ শ্রুতি বা ‘বেদ’-এর নির্যাসকে ধারণ করে যেসব স্মৃতি বা শাস্ত্র গ্রন্থ রচিত হয়েছে বলে কথিত, তার শীর্ষে অবস্থান করছে মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা। তাই মনুসংহিতা ও ব্রাহ্মণ্যবাদকে আলাদা করে দেখার উপায় নেই। মনুসংহিতা মানেই ব্রাহ্মণ্যবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ মানেই মনুসংহিতা। এটাকে তৎকালীন বৈদিক আর্য সমাজ ও প্রচলিত হিন্দু সমাজের অবশ্য পালনীয় পবিত্র সংবিধান বা সামগ্রিক ও সম্পূর্ণ জীবনাচরণবিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। বারোটি অধ্যায়ে প্রায় দুহাজার সাতশত শ্লোক সংবলিত এ গ্রন্থটির পাতায় পাতায় ধর্মীয় বিধানের নাম দিয়ে সংস্কৃত অক্ষরে অক্ষরে যে শ্লোকগুলো উৎকীর্ণ রয়েছে, অধিকাংশ শ্লোকের ভাবার্থকে যদি মনুষ্য সমাজে পালনীয় নীতি হিসেবে বিবেচনা করতে হয়, তাহলে মানুষের সমাজে কোন মানবিক বোধ আদৌ রয়েছে বা অবশিষ্ট থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করাটাই অবিশ্বাস্য মনে হয়। এ ব্যাপারে কোন বিস্তৃত ব্যাখ্যায় না গিয়ে বরং মনুসংহিতা থেকে অনুবাদ ও ভাবার্থসহ কিছু শ্লোকের নমুনা-উদাহরণ টানলেই বিষয়গুলো আমাদের সামনে অধিকতর স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে।

উল্লেখ্য, মনুসংহিতাকে পরিপূর্ণ একটি ধর্ম ও শাস্ত্র গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এজন্যে যে, এই গ্রন্থে বিশ্বজগৎ বা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় বস্তুনিচয়, গোটা প্রাণীকূল, উদ্ভিদ, গ্রহ-নক্ষত্র-পৃথিবী, আলো-জল-হাওয়া, দিন-রাত্রি-সময়-কাল-যুগ, জীব-জগতের উৎস, স্বভাব-চরিত্র-জীবনযাপন, গুণ ও দোষবাচক সমস্ত অনুভব-অনুভূতি, স্বর্গ-মর্ত্য-নরক, জীবলোক-মৃতলোক, সাক্ষি-বিচার-শাসন, আচার-অনুষ্ঠান, জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ, খাবার-খাদ্য, ভক্ষ্য-অভক্ষ্য, শূচি-অশূচি ইত্যাদি যাবতীয় বস্তুগত ও ভাবগত বিষয়ের সৃষ্টিরহস্য ব্যবহার-বিবেচনা বর্ণিত হয়েছে কল্পনার সমৃদ্ধ শিখরে অবস্থান করে অত্যন্ত আকর্ষণীয় নিজস্ব ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। কথিত হয় যে মহান স্রষ্টা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন, এ সবকিছু রক্ষার জন্য তাঁর মানব সৃষ্টিও জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে মানুষও সৃষ্টি হলো। কিন্তু মানব সৃষ্টি ও পরিপালনের ক্ষেত্রে এসে ব্রহ্মা বা ঈশ্বর বোধ করি নিজেকে আর সুমহান মর্যাদায় ধরে রাখতে পারেন নি। যে শ্রেণীবিদ্বেষপ্রসূত তীব্র অসমতাভিত্তিক বর্ণপ্রথার আশ্রয় নেয়া হয়েছে তাতেই সন্দেহ গাঢ় হয়ে ওঠে যে এটা আদৌ কোন অতিলৌকিক পবিত্র বিধিবিধান কিনা। বরং ধর্মীয় মোড়কে এক ঘৃণ্য আর্থ-সমাজ-রাজনীতির অত্যন্ত দুরভিসন্ধিমূলক হীন প্রচেষ্টা বলেই মনে হয়। তার পেছনে যে এক অতীব স্বার্থান্বেষী ভণ্ড প্রতারক গোষ্ঠির সূক্ষ্মতম কারসাজিই কার্যকর হতে পারে, তা বুঝতে খুব বেশি যুক্তিবাদী হবার প্রয়োজন পড়ে না। বিস্তৃত পরিসরে না গিয়ে আমরা প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ের নমুনা-উদাহরণ পর্যবেক্ষণ করে নিতে পারি। এক্ষেত্রে বঙ্গানুবাদসহ উদ্ধৃত শ্লোক ব্যবহারে সদেশ প্রকাশনী কলকাতা থেকে বইমেলা ১৪১২-এ প্রকাশিত মানবেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘মনুসংহিতা’ সুলভ সংস্করণ গ্রন্থটির সহায়তা নেয়া হয়েছে।

০১
এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করে অতঃপর স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা কি আদতে মানুষ সৃষ্টি করলেন, না কি কিছু বিভেদপূর্ণ বর্ণ (varnas) (জাতি) সৃষ্টি করলেন, মনুসংহিতা পাঠ করলে তা প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যায়। তবে গোটা গ্রন্থে যেখানে যা কিছুই বলা হয়েছে জাতি হিসেবে ব্রহ্মাসৃষ্ট বর্ণগুলোকেই বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন-

সর্বস্যাস্য তু সর্গস্য গুপ্ত্যর্থং স মহাদ্যুতিঃ।
মুখবাহুরুপজ্জানাং পৃথক্ কর্মাণ্যকল্পয়ৎ।। (১/৮৭)
বঙ্গানুবাদ: এই সকল সৃষ্টির অর্থাৎ ত্রিভুবনের রক্ষার জন্য মহাতেজযুক্ত প্রজাপতি ব্রহ্মা নিজের মুখ, বাহু, উরু এবং পাদ- এই চারটি অঙ্গ থেকে জাত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের পৃথক পৃথক কার্যের ব্যবস্থা করে দিলেন।

অধ্যাপনমধ্যয়নং যজনং যাজনং তথা।
দানং প্রতিগ্রহঞ্চৈব ব্রাহ্মণানামকল্পয়ৎ।। (১/৮৮)
বঙ্গানুবাদ: অধ্যাপন, স্বয়ং অধ্যয়ন, যজন, যাজন, দান ও প্রতিগ্রহ (উপহার বা দান-সামগ্রি গ্রহণ)- এই ছয়টি কাজ ব্রহ্মা ব্রাহ্মণদের জন্য নির্দেশ করে দিলেন।

প্রজানাং রক্ষণং দানমিজ্যাধ্যয়নমেব চ।
বিষয়েম্বপ্রসক্তিশ্চ ক্ষত্রিয়স্য সমাসতঃ।। (১/৮৯)
বঙ্গানুবাদ: প্রজারণ, দান, যজ্ঞ, অধ্যয়ন, নৃত্যগীতবনিতাদি-বিষয়ভোগে অনাসক্তি, এই কয়েকটি কাজ ব্রহ্মা ক্ষত্রিয়গণের জন্য সংক্ষেপে নিরূপিত করলেন।

পশূনাং রক্ষণং দানমিজ্যাধ্যয়নমেব চ।
বণিক্পথং কুসীদঞ্চ বৈশ্যস্য কৃষিমেব চ।। (১/৯০)
বঙ্গানুবাদ: পশুদের রক্ষা, দান, যজ্ঞ, অধ্যয়ন, বাণিজ্য (স্থলপথ ও জলপথ প্রভৃতির মাধ্যমে বস্তু আদান-প্রদান করে ধন উপার্জন), কুসীদ (বৃত্তিজীবিকা- টাকা সুদে খাটানো) এবং কৃষিকাজ- ব্রহ্মা কর্তৃক বৈশ্যদের জন্য নিরূপিত হল।

অধীয়ীরংস্ত্রয়ো বর্ণাঃ স্বকর্মস্থা দ্বিজাতয়ঃ।
প্রব্রূয়াদ্ ব্রাহ্মণস্ত্বেষাং নেতরাবিতি নিশ্চয়ঃ।। (১০/১)
বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য- এই তিনবর্ণের লোকেরা দ্বিজাতি; এঁরা নিজনিজ কর্তব্য কর্মে নিরত থেকে বেদ অধ্যয়ন করবেন। কিন্তু এঁদের মধ্যে কেবল ব্রাহ্মণেরাই অধ্যাপনা করবেন, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই দুই বর্ণের পক্ষে অধ্যাপনা করা উচিত নয়। -এটাই শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত।

এতমেব তু শূদ্রস্য প্রভুঃ কর্ম সমাদিশৎ।
এতেষামেব বর্ণানাং শুশ্রূষামনসূয়য়া।। (১/৯১)
বঙ্গানুবাদ: প্রভু ব্রহ্মা শূদ্রের জন্য একটি কাজই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, -তা হলো কোনও অসূয়া অর্থাৎ নিন্দা না করে (অর্থাৎ অকপটভাবে) এই তিন বর্ণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের শুশ্রূষা করা।

উপরোক্ত শ্লোকগুলো থেকে আমরা এটা বুঝে যাই যে, স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা গোটা বিশ্ব-জগৎ সৃষ্টি করেছেন তো বটেই। তবে এই বিশ্ব-জগৎ সুষ্ঠুভাবে রক্ষাকল্পে তিনি আসলে কোন মানুষ সৃষ্টি করেন নি। চারটি বর্ণ সৃষ্টি করলেন- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। এদের আবার দুটো ভাগ- প্রথম তিনটি উচ্চ বর্ণ, আর চতুর্থটি অর্থাৎ শূদ্র হচ্ছে নিম্নবর্ণ, যে কিনা উচ্চবর্ণীয়দের সেবাদাস। আবার ব্রাহ্মণ, যে কিনা কোন শারীরিক শ্রমের সাথে কোনভাবেই জড়িত নয়, সকল বর্ণের শীর্ষে। শুধু শীর্ষেই নয়, ক্ষমতার এতোটাই কল্পনাতীত উচ্চ অবস্থানে অবস্থিত যে, জগতের সবকিছুর মালিক বা প্রভুও হচ্ছে ব্রাহ্মণ। সন্দেহ তীব্র হলে নিচের শ্লোকগুলো দেখা যেতে পারে-

উত্তমাঙ্গোদ্ভবাজ্জৈষ্ঠ্যাদ্ ব্রহ্মণশ্চৈব ধারণাৎ।
সর্বস্যৈবাস্য সর্গস্য ধর্মতো ব্রাহ্মণঃ প্রভুঃ।। (১/৯৩)
বঙ্গানুবাদ: ব্রহ্মার পবিত্রতম মুখ থেকে উৎপন্ন বলে, সকল বর্ণের আগে ব্রাহ্মণের উৎপত্তি হওয়ায়, এবং বেদসমূহ ব্রাহ্মণকর্তৃক রক্ষিত হওয়ার জন্য (বা বেদসমূহ ব্রাহ্মণেরাই পঠন-পাঠন করেন বলে)- ব্রাহ্মণই ধর্মের অনুশাসন অনুসারে এই সৃষ্ট জগতের একমাত্র প্রভু।

ব্রাহ্মণো জায়মানো হি পৃথিব্যামধিজায়তে।
ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ধর্মকোষস্য গুপ্তয়ে।। (১/৯৯)
বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণ জন্মগ্রহণ করা মাত্রই পৃথিবীর সকল লোকের উপরিবর্তী হন অর্থাৎ সমস্ত লোকের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন। কারণ, ব্রাহ্মণই সকলের ধর্মকোষ অর্থাৎ ধর্মসমূহ রক্ষার জন্য প্রভুসম্পন্ন হয়ে থাকেন।

সর্বং স্বং ব্রাহ্মণস্যেদং যৎ কিঞ্চিজ্জগতীগতম্।
শ্রৈষ্ঠ্যেনাভিজনেনেদং সর্বং বৈ ব্রাহ্মণোহর্হতি।। (১/১০০)
বঙ্গানুবাদ: জগতে যা কিছু ধনসম্পত্তি সে সমস্তই ব্রাহ্মণের নিজ ধনের তুল্য; অতএব সকল বর্ণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে ব্রাহ্মণই সমুদয় সম্পত্তিরই প্রাপ্তির যোগ্য হয়েছেন।

স্বমেব ব্রাহ্মণো ভুঙ্ক্তে স্বং বস্তে স্বং দদাতি চ।
আনৃশংস্যাদ্ ব্রাহ্মণস্য ভুঞ্জতে হীতরে জনাঃ।। (১/১০১)
বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণ যে পরের অন্ন ভোজন করেন, পরকীয় বসন পরিধান করেন, পরের ধন গ্রহণ করে অন্যকে প্রদান করেন, সে সবকিছু ব্রাহ্মণের নিজেরই। কারণ, ব্রাহ্মণেরই আনৃশংস্য অর্থাৎ দয়া বা করুণাতেই অন্যান্য যাবতীয় লোক ভোজন-পরিধানাদি করতে পারছে।

ন তং স্তেনা ন চামিত্রা হরন্তি ন চ নশ্যতি।
তস্মাদ্রাজ্ঞা নিধাতব্যো ব্রাহ্মণেষ্বক্ষয়ো নিধিঃ।। (৭/৮৩)
বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণকে যে ভূমি-অর্থ প্রভৃতি দান করা হয় তা এমনই নিধি (ন্যস্ত সম্পত্তি) যে, সেই নিধি চোরেরা অপহরণ করতে পারে না, শত্রুরা হরণ করতে পারে না, এবং তা নিজেও নষ্ট বা অদৃষ্ট হয় না। এই জন্য রাজার কর্তব্য হল, ব্রাহ্মণগণের কাছে এই অক্ষয় নিধি ন্যস্ত করা।

সমমব্রাহ্মণে দানং দ্বিগুণং ব্রাহ্মণব্রুবে।
প্রাধীতে শতসাহস্রমনন্তং বেদপারগে।। (৭/৮৫)
বঙ্গানুবাদ: অব্রাহ্মণকে যে বস্তু দান করা হয় তার সমপরিমাণ ফল পাওয়া যায়, তার দ্বারা অতিরিক্ত ফল হয় না। ব্রাহ্মণব্রুবকে (অর্থাৎ যিনি জাতিমাত্রে ব্রাহ্মণ, কিন্তু ব্রাহ্মণোচিত গুণসম্পন্ন নন) দান করলে পূর্বাপেক্ষা দ্বিগুণ ফল লাভ হয়। যে ব্রাহ্মণ বেদাধ্যয়ন আরম্ভ করেছেন, তাঁকে দান করলে লক্ষগুণ ফল লাভ হয়; এবং যিনি সমস্ত বেদশাখাধ্যেতা বেদপারগ ব্রাহ্মণ, তাঁকে দান করলে অনন্ত ফল লাভ হয়।

বুঝাই যাচ্ছে, কথিত ব্রহ্মার পবিত্রতম মুখ হতে সৃষ্ট বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণই জগদীশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অতএব কাউকে কর দিয়ে ব্রাহ্মণের চলার কথা নয়। এবং তা-ই মনুসংহিতার পাতায় পাতায় খুব ভালোভাবে জানান দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
মনুশাস্ত্রে রাজার কর্তব্য হিসেবে নিরাপদে রাজ্য পরিচালনার প্রয়োজনেই প্রজাদের কাছ থেকে কর ধার্য্য ও গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে-


নোচ্ছিন্দ্যাদাত্মনো মূলং পরেষাঞ্চাতিতৃষ্ণয়া।
উচ্ছিন্দন্ হ্যাত্মনো মূলমাত্মানং তাংশ্চ পীড়য়েৎ।। (৭/১৩৯)
বঙ্গানুবাদ: কর, শুল্ক প্রভৃতি গ্রহণ না করে রাজা নিজের মূলোচ্ছেদন করবেন না অর্থাৎ রাজকোষ শূন্য করবেন না; এবং অতিলোভবশতঃ বেশি কর নিয়ে প্রজাদেরও মূল নষ্ট করবেন না। কারণ, এইভাবে নিজের ও পরের মূলোচ্ছেদ ঘটালে নিজেকে এবং প্রজাবর্গকে উৎপীড়িত করা হয়।

অতএব কার কাছ থেকে কিভাবে কী পরিমাণ কর আদায় করা হবে তার বিস্তারিত শ্লোক-বয়ান মনুশাস্ত্রে উদ্ধৃত রয়েছে। তবে সাধারণসূত্রে বলা হচ্ছে-


যৎ কিঞ্চিদপি বর্ষস্য দাপয়েৎ করসংজ্ঞিতম্।
ব্যবহারেণ জীবন্তং রাজা রাষ্ট্রে পৃথগ্জনম্।। (৭/১৩৭)
বঙ্গানুবাদ: যে সব ‘পৃথগ্জন’ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ও শ্রোত্রিয় ছাড়া অন্য লোক কৃষি, পশুপালন প্রভৃতি কোনও একটি ব্যবহার অর্থাৎ বৃত্তি অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের কাছ থেকে রাজা বার্ষিক যৎ কিঞ্চিৎ হলেও কর গ্রহণ করবেন।

যে ব্রাহ্মণ কল্পশাস্ত্রের সাথে এক বেদ অথবা ব্যাকরণ প্রভৃতি ছয়টি বেদাঙ্গের সাথে বেদশাখা অধ্যয়ন করেন এবং বেদাধ্যয়নাদি কাজে নিরত থাকেন, তাঁকে ‘শ্রোত্রিয়’ বলা হয়। উপরোক্ত ৭/১৩৭ সংখ্যক শ্লোকে এই বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ ও শ্রোত্রিয়ের কাছ থেকে কোনরূপ কর গ্রহণকে নিরস্ত করা হয়েছে। তবে মনুসংহিতার ১০/১২৯ সংখ্যক শ্লোকের দ্বারা (পরবর্তীতে নিচে বর্ণিত হয়েছে) শূদ্রের ধন-সম্পদ অর্জনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও শূদ্রের কাছ থেকে কর আদায় নিষিদ্ধ হয়নি। যেহেতু তার অর্জিত সম্পদ থাকার কথা নয়, তাই এই কর পরিশোধ হবে বাধ্যতামূলক শ্রমদানের মাধ্যমে-

কারুকান্ শিল্পিনশ্চৈব শূদ্রাংশ্চাত্মোপজীবিনঃ।
একৈকং কারয়েৎ কর্ম মাসি মাসি মহীপতিঃ।। (৭/১৩৮)
বঙ্গানুবাদ: পাচক, মোদক প্রভৃতি কারুক এবং কাংস্যকার, লৌহকার, শঙ্খকার প্রভৃতি শিল্পী ও কায়িক পরিশ্রমের দ্বারা জীবিকানির্বাহকারী শূদ্র- এদের দ্বারা রাজা প্রতি মাসে একদিন করে নিজের কাজ করিয়ে নেবেন।

কিন্তু পরধন অর্জনে মত্ত ব্রাহ্মণের কাছে কোনক্রমেই কর নেয়া যাবে না। অর্থাভাবে রাজা মরণাপন্ন হলেও ক্ষতি নেই, তবু কোন ব্রাহ্মণ যেন রাজার রাজ্যে ক্ষুধায় মরণাপন্ন না হন, এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে-


ম্রিয়মাণোহপ্যাদদীত ন রাজা শ্রোত্রিয়াৎ করম্।
ন চ ক্ষুধাহস্য সংসীদেচ্ছ্রোত্রিয়ো বিষয়ে বসন্।। (৭/১৩৩)
বঙ্গানুবাদ: রাজা ধনাভাবে মরণাপন্ন হলেও শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণের কাছ থেকে কখনও যেন কর গ্রহণ না করেন। রাজার রাজ্যে বাস করতে থেকে কোনও শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ যেন ক্ষুধায় মরণাপন্ন না হন।

মনুসংহিতার পরতে পরতে উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব ও ক্ষমতা প্রদান আর নিম্নবর্ণ শূদ্রের নিচত্ব ও তাকে বঞ্চনা করার কৌশল বিভিন্নভাবে বিভিন্নরূপে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন, রাজকার্যে ও বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় ক্রিয়া-অনুষ্ঠানে সবাইকে উদ্ধারের নিমিত্তে ক্ষমতাসীন পরামর্শক ব্রাহ্মণের উপস্থিতি অবশ্যম্ভাবী। প্রয়োজনীয় গুণ ও যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক ব্রাহ্মণ হলেই হলো, এবং তা-ই হতে হবে। কিন্তু যত যোগ্যতা বা গুণের আধারই হোক শূদ্রকে কিছুতেই নিয়োগ মর্যাদা দেয়া যাবে না।

জাতিমাত্রোপজীবী বা কামং স্যাদ্ব্রাহ্মণব্রুবঃ।
ধর্মপ্রবক্তা নৃপতের্ন তু শূদ্রঃ কথঞ্চন।। (৮/২০)
বঙ্গানুবাদ: বিদ্যা ও গুণসম্পন্ন ব্রাহ্মণের অভাব হলে রাজা জাতিমাত্রোপজীবী অর্থাৎ জাতিসর্বস্ব ব্রাহ্মণকে অথবা ক্রিয়ানুষ্ঠানবিহীন ব্রাহ্মণব্রুবকেও (অর্থাৎ নামে মাত্র ব্রাহ্মণকেও) নিজের ধর্মপ্রবক্তার পদে (শাস্ত্রীয় আইন বিশ্লেষক) নিযুক্ত করবেন, কিন্তু শূদ্র যদি সর্বগুণসম্পন্ন, ধার্মিক এবং ব্যবহারজ্ঞও হয়, তবুও তাকে ঐ পদে নিয়োগ করতে পারবেন না।

শাস্ত্র বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ব্রাহ্মণকেই ধর্মপ্রবক্তা করার বিধান থাকায় বিদ্বান্ ব্রাহ্মণকেই ঐ কাজে নিযুক্ত করতে হয়। কাজেই ক্ষত্রিয় প্রভৃতি অন্য তিন বর্ণের লোককে ধর্ম নিরূপণের কাজে নিযুক্ত করা নিষিদ্ধ। তবুও এখানে শূদ্রকে ঐ কাজে নিয়োগ করতে নিষেধ করার তাৎপর্য হলো, ঐ কাজের জন্য উপযুক্ত বিদ্বান ব্রাহ্মণ পাওয়া না গেলে ক্ষত্রিয় বা বৈশ্যকে ঐ কাজে হয়তো নিয়োগ করা যেতে পারে, কিন্তু কিছুতেই শূদ্রকে নয়। এই ব্রহ্মবিধি ভঙ্গ হলে কী পরিণতি হবে তাও মনুশাস্ত্রে ব্যাখ্যা করা হয়েছে-


যস্য শূদ্রস্তু কুরুতে রাজ্ঞো ধর্মবিবেচনম্।
তস্য সীদতি তদ্রাষ্ট্রং পঙ্কে গৌরিব পশ্যতঃ।। (৮/২১)
বঙ্গানুবাদ: বিচারসভায় যে রাজার সাক্ষাতে শূদ্র ন্যায়-অন্যায় ধর্ম বিচার করে, সেই রাজার রাজ্য কাদায় নিমগ্ন গোরুর মতো দেখতে দেখতে নষ্ট হয়ে যায়।

যদ্রাষ্ট্রং শূদ্রভূয়িষ্ঠং নাস্তিকাক্রান্তমদ্বিজম্।
বিনশ্যত্যাশু তৎ কৃৎস্নং দুর্ভিক্ষব্যাধিপীড়িতম্।। (৮/২২)
বঙ্গানুবাদ: যে রাজ্য ধর্মাধিকরণে (বিবাদ নিরূপণের ব্যাপারে-) শূদ্রের প্রাধান্য ও নাস্তিকদের প্রভুত্ব, এবং যেখানে দ্বিজগণের (ব্রাহ্মণদের) অভাব, সেই রাজ্য দুর্ভিক্ষ ও নানারকম রোগে পীড়িত হয়ে অতি শীঘ্রই বিনষ্ট হয়।

অপরাধ সংঘটন হলে রাজার বিচারে দণ্ড প্রয়োগের ক্ষেত্রে মনুসংহিতার ৮/৩৭৯ সংখ্যক শ্লোক অনুযায়ী শাস্ত্রের বিধান হলো- প্রাণদণ্ডের যোগ্য অপরাধেও ব্রাহ্মণের এই দণ্ড বা অঙ্গচ্ছেদনাদি করা যাবে না। যদিও অন্যান্য বর্ণের পক্ষে বধাদি প্রাণদণ্ডই বিধেয়। এছাড়া মনুশাস্ত্রে আরো বলা হচ্ছে-


ন জাতু ব্রাহ্মণং হন্যাৎ সর্বপাপেষ্বপি স্থিতম্।
রাষ্ট্রাদেনং বহিষ্কুর্যাৎ সমগ্রধনমক্ষতম্।। (৮/৩৮০)
বঙ্গানুবাদ: ব্রাহ্মণ যে কোনও পাপ বা অপরাধই করুক না কেন (যত কিছু অপরাধ আছে সে সবগুলি একসাথে অনুষ্ঠান করলেও) রাজা তাকে হত্যা করবেন না; পরন্তু সমস্ত ধনের সাথে অক্ষত শরীরে তাকে রাষ্ট্র থেকে নির্বাসিত করবেন।

কারণ-

ন ব্রাহ্মণবধাদ্ ভূয়ানধর্মো বিদ্যতে ভুবি।
তস্মাদস্য বধং রাজা মনসাপি ন চিন্তয়েৎ।। (৮/৩৮১)
বঙ্গানুবাদ: এই পৃথিবীতে ব্রাহ্মণবধের তুলনায় গুরুতর অধর্ম (অর্থাৎ পাপ) আর কিছুই নেই। এই কারণে ব্রাহ্মণকে বধ (এবং অঙ্গচ্ছেদনাদি) করার কথা রাজা কখনও মনে মনেও চিন্তা করবেন না।


(চলবে...)

[পরের পর্ব: ৩/৮] ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29264734 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29264734 2010-10-31 22:54:14
| অস্পৃশ্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং একজন বাবাসাহেব | পর্ব: ১/৮ |
[ ডিসক্লেইমার: লেখার বিষয় সংবেদনশীল এবং কিঞ্চিৎ গবেষণাধর্মী। ইতঃপূর্বে এটি মুক্ত-মনা বাংলা ব্লগে সিরিজ আকারে আটটি পর্বে প্রকাশিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে ই-বুক আকারে সেখানে সংরক্ষিত হয়েছে। রিপোস্ট সিরিজ হলেও বিষয়বস্তুর কারণে আশা করি কারো বিরক্তির কারণ হবে না। তাছাড়া পাঠক হিসেবে অনায়াসে এড়িয়ে যাবার স্বাধীনতা তো রয়েছেই ! ]


কলঙ্ক
খুব বেশিকাল আগের কথা নয়, একসময় সাধারণ পৌর শহরগুলোতেই কিছু কিছু ভ্রাম্যমান নারী-পুরুষ দেখা যেত যাদের কোমরে অনিবার্যভাবে বাঁধা থাকতো একটি ঝাড়ু, আর গলায় বা কোমরে ঝুলানো থাকতো একটি টিনের মগ জাতিয় পাত্র। ঝাড়ুটি হলো তার পেশাগত প্রতীক বা পরিচয়। তাদের কাজ হচ্ছে লোকালয়ের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করে শহরটিকে পরিচ্ছন্ন রাখা। পেশাগতভাবে এরা পৌর-কর্তৃপক্ষের শুধু যে বেতনভুক কর্মচারী তা-ই নয়, সম্প্রদায়গতভাবেও এদের পেশাটা তা-ই। সামাজিক শ্রমবিন্যাস অনুযায়ী তাদের জন্য অন্য পেশা বরাদ্দ ছিলো না। তাই জন্মগতভাবে বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এ পেশাই তাদের জীবিকার একমাত্র উৎস। আর সাথের মগটি ছিলো তাদের সামাজিক অবস্থানের এক ভয়াবহ অস্পৃশ্যতার প্রতীক। অর্থাৎ সব ধরনের ছোঁয়াছুয়ির উর্ধ্বে থেকে অন্য কাউকে যাতে কোনরূপ অশূচি হবার বিড়ম্বনায় পড়তে না হয় সেজন্যেই এ ব্যবস্থা। পানির তেষ্টা পেলে কোন হোটেল বা চা-দোকানের বাইরে থেকে মগটা বাড়িয়ে দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে দোকানের কেউ হয়তো নিরাপদ অবস্থান থেকে ওই মগটিতে পানি ঢেলে দিতো। এমনকি কোন পাবলিক টিউবওয়েলে ছোঁয়ার ঝুঁকি না নিয়ে এরা অপেক্ষায় থাকতো দয়া করে কেউ যদি টিউবওয়েল চেপে কিছুটা পানি ঐ মগে ঢেলে দেয়। কিংবা টাকা দিয়ে দোকান থেকে চা খেতে চাইলেও চায়ের কাপ স্পর্শ করার অধিকার নেই বলে গরম চা ওই মগেই ঢেলে দেয়া হতো। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অন্য লোকজনের সাথে এক কাতারে বসার তো প্রশ্নই উঠে না! নিরাপদ দূরত্ব বাঁচিয়ে মাটিতে বসে পড়াটাই তাদের জন্য অনুমোদিত ব্যবস্থা। তারপরও তাদের ছোঁয়ায় ঐ স্থানটা নোংরা হয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল থাকতো সবসময়। এরা হলো ধাঙড়, মেথর বা সুইপার। তাদের বসবাসের ব্যবস্থাও সেরকমই। ভদ্রপাড়া থেকে দূরে স্বতন্ত্র কোন বস্তি বা পল্লীতে এদের গোষ্ঠিগত বসবাস। এদের সংস্কৃতি ভিন্ন, জীবনধারা ভিন্ন, উৎসব-উদযাপন সবই ভিন্ন এবং অনিবার্যভাবে গোষ্ঠিগত।

এদেরই একটি অংশ আবার চর্মকার বলে পরিচিত, ভাষার অপভ্রংশতায় যাদেরকে চামার বলে ডাকা হয়। যারা মূলত মৃত পশুর চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে জুতো বা চামড়া জাতিয় দ্রব্যাদি তৈরির সাথে জড়িত। এরা সমাজের অনিবার্য অংশ হয়েও অস্পৃশ্য সম্প্রদায়। সমাজের যে কোন সামাজিক কর্মকাণ্ডে এদের শ্রমের প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অধিকার এদের নেই। এধরনের আরো বহু সম্প্রদায় রয়েছে আমাদের সমাজে একই রকম অস্পৃশ্য। স্বভাবতই অধিকতর সভ্য ও শিক্ষিত নাগরিকদের বাসস্থান শহরের চিত্র থেকে যদি আমাদের দৃষ্টিটাকে দূরবর্তী পল্লী অঞ্চলের দিকে নিয়ে যাই, তাহলে এই বাস্তবতাই আরো অনেক কঠিন ও তীব্র হয়ে দেখা দেবে। কেননা গ্রামের সামাজিক কাঠামোতে জীবিকার উৎস আরো অনেক বেশি সঙ্কুচিত বলে এসব অস্পৃষ্য সম্প্রদায়গুলোর মানবেতর জীবন-ধারণ খুবই শোচনীয় পর্যায়ে ঘুরপাক খেতে থাকে। তাদের বসবাস থাকে গ্রামের বাইরের দিকে অত্যন্ত অবহেলিতভাবে অবস্থায়। দেখতে শুনতে চেহারায় আকারে অন্য বর্ণ বা সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর মতো হয়েও কেন এরা সামাজিকভাবে এতো অস্পৃশ্য অপাঙক্তেয় ? যুগে যুগে এ প্রশ্নটা যে উত্থাপিত হয়নি তা নয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এদের পেশার অনেক ক্ষেত্রেই অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ ইদানিং জীবিকার তাগিদে ভাগ বসালেও এই অস্পৃশ্যদের জন্য অন্য পেশায় জড়িত হওয়া কিছুতেই সম্ভব হয়নি আজো। কারণ অস্পৃশ্যতা এদের গা থেকে মুছে যায়নি বা মুছা হয়নি। অথচ তাদের পেশায় ভাগ বসালেও অন্য সম্প্রদায়কে কিন্তু এই অস্পৃশ্যতার দায় বইতে হয় না। এতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সমাজ নিয়ন্ত্রিত এই অস্পৃশ্যতার দায় আসলে পেশা বা কর্মগত নয়, সম্পূর্ণই জন্মগত একটা অভিশাপ। কর্মদোষ নয়, জন্মদোষটাই এখানে একমাত্র উপাত্ত। কিন্তু সমাজ বা সামাজিক ব্যবস্থা কি চাইলেই কোন সম্প্রদায়কে অছ্যুৎ বা অস্পৃশ্য বানিয়ে দিতে পারে ? প্রশ্নটা যত সহজে করা যায়, উত্তরটা বোধ করি তত সহজ বা সাবলীল নয়। এর পেছনে আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশের হাজার বছরের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক কাঠামো তৈরিতে যে ধর্মীয় বর্ণাশ্রমগত নিপীড়নের ইতিহাস তথা মানব-দলনের যে ঐতিহ্য বা কালো অধ্যায় মিশে আছে তার শিকড় এতোটাই গভীরে প্রোথিত যে, গোটা সামাজিক সত্তাটাই বুঝি এই বর্ণবাদের সাথে একাত্ম হয়ে মিশে আছে। অর্থাৎ আচারে বিচারে জীবনে যাপনে সামাজিকতায় এই ধর্মীয় বর্ণবাদী ব্যবস্থা থেকে সমাজকে বা সমাজের কোন অংশকে পৃথক করা শরীর থেকে চামড়া আলগা করার মতোই দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। চামড়ার কোথাও একটু টান পড়লে গোটা শরীরটাই আৎকে ওঠে, বিগড়ে যায়। তাই বলে কি এই সভ্য জগতের তথাকথিত সভ্য মানুষদেরকেও এভাবেই হাজার বছরের কলঙ্ক বয়ে বয়ে যেতে হবে ?

সভ্য মানুষরা তা বয়ে যাচ্ছে বৈ কি ! কেননা আজো যারা এই সমাজ সংসারের অধিকর্তা হিসেবে জন্মগতভাবে মহান উত্তরাধিকার বহন করছে, সেইসব ক্ষমতাসীন উচ্চবর্ণীয়দের অনুকূল এই প্রাচীন ব্যবস্থাকে পাল্টানোর খায়েশ তাদের হবেই বা কেন ! কিন্তু সমাজের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হয়েও একটা আরোপিত ব্যবস্থায় কেবল জন্মগত কারণে নিম্নবর্ণীয় বা অস্পৃশ্য হবার অভিশাপে যাদের সমস্ত অর্জন কুক্ষিগত হয়ে চলে যায় অন্যের অধিকারে, তারা এটা মানবেন কেন ? আসলে এরা কখনোই মানেনি তা। ক্ষমতাহীন এই না-মানার প্রতিবাদ-বিদ্রোহকে তাই দমন করা হয়েছে বড় নিষ্ঠুরভাবে, নির্দয় প্রক্রিয়ায়। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস সে সাক্ষ্যই দেয় আমাদেরকে।

বৈদিক আধিপত্য
ইতিহাসের সাক্ষ্য থেকে জানতে পারি, মুঘলদেরও বহুকাল আগে প্রাচীন আর্যরা এই ভারতবর্ষে শুধু বহিরাগতই ছিলো না, এই আর্যরা আদিনিবাসী জনগোষ্ঠি ও তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির উপরও চালিয়েছিলো ব্যাপক আক্রমণ। আর এই আক্রমণেই একদিন ধ্বংস হয়ে যায় এসব আদিনিবাসী জনগোষ্ঠির মাধ্যমে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধ সিন্ধু সভ্যতা। এই সিন্ধু সভ্যতাকেই কেউ কেউ হরপ্পা সভ্যতা বা দ্রাবিড়ীয় সভ্যতা হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। আক্রমণকারী আর্যরা আদিনিবাসী জনগোষ্ঠিকে দাসে পরিণত করার লক্ষে যে চতুর্বর্ণ প্রথা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংগ্রাম করে, শেষপর্যন্ত এতে সফলও হয় তারা। ফলে এককালের সিন্ধুসভ্যতার আদিনিবাসী জনগণই হয়ে যায় তাদের কাছে অনার্য অর্থাৎ শাসিত অধম। আর্যরা হয়ে ওঠে মহান শাসক। আর তাদের প্রচলিত বৈদিক ধর্ম হয়ে ওঠে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক সত্ত্বা। এই বৈদিক ধর্মের উৎস হিসেবে স্বীকৃত হয় স্মৃতি বা বেদ নামের মহাগ্রন্থ। আর এই বেদের নির্যাস নিয়েই আরোপিত এই ধর্মটির প্রচারিত সংবিধান হয়ে ওঠলো মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা। এর মাধ্যমে যে সমাজ-কাঠামোর নির্মাণ যজ্ঞ চলতে থাকলো তার ভিত্তি এক আজব চতুর্বর্ণ প্রথা। যেখানে আদিনিবাসী অনার্যরা হয়ে যায় নিম্নবর্ণের শূদ্র, যারা কেবলই উচ্চতর অন্য তিন বর্ণ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্যের অনুগত সেবাদাস। কোনো সমাজ-সংগঠনে বা কোন সামাজিক অনুষ্ঠান যজ্ঞে অংশগ্রহণের অধিকার শূদ্রদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আর যারা এই ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে প্রতিবাদী-বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চাইলো, এদেরকেই সুকৌশলে করা হলো অছ্যুৎ, দস্যু, সমাজচ্যুত বা অস্পৃশ্য সম্প্রদায়। চাতুর্যপূর্ণ চতুর্বর্ণের এই অসম সমাজ ব্যবস্থার কুফল সমাজে গভীরভাবে সংক্রমিত হতে থাকলে এই মাটির সন্তান শাক্যমুণি গৌতম বুদ্ধ (৫৬৩-৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন। গৌতম বুদ্ধ (Buddha) এ দেশেরই আদিনিবাসী হওয়ায় তাঁর এই সামাজিক বিদ্রোহে আদিনিবাসী অনার্য জনগোষ্ঠি তাঁকে ব্যাপকভাবে সমর্থন জানায়। ফলে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটতে থাকে দ্রুত। এবং বুদ্ধের নির্বাণলাভ বা মৃত্যুর পর আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সাম্যবাদী বৌদ্ধধর্ম। গোটা উপমহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে বুদ্ধের অহিংসা পরম ধর্মের ডাক।

মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট মহামতি অশোকের (৩০৪-২৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজত্বকালকেই (২৭৩-২৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) বৌদ্ধধর্মের সুবর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। গৌরবময় আর্যসম্রাট হয়েও মহামতি অশোক কলিঙ্গের যুদ্ধের (খ্রিস্টপূর্ব ২৬১) ভয়াবহ রক্তপাত, আহত-নিহতের বিপুল সংখ্যাধিক্য ও যুদ্ধের বীভৎসতায় বিচলিত হয়ে যান। যুদ্ধে জয়লাভ করলেও এই যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতি দেখে তিনি বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়েন। প্রচলিত হিন্দুধর্মের মানবাধিকারহীন অসহিষ্ণুতা আর যুদ্ধের পথ ত্যাগ করে তিনি বেদবিরোধী বৌদ্ধধর্মকেই তাঁর আচরিত ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন এবং অহিংসার পথে সাম্রাজ্য পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেন। এরপর অশোক দেশে ও বিদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন জায়গায় তাঁর প্রতিনিধিদের পাঠান। জানা যায় তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে শ্রীলংকা পাঠান। এছাড়া তিনি কাশ্মীর, গান্ধার, ভানাভাসী, কোংকন, মহারাষ্ট্র, ব্যকট্রিয়, নেপাল, থাইল্যান্ড, ব্রহ্মদেশ, লাক্ষাদ্বীপ প্রভৃতি স্থানেও বৌদ্ধধর্ম প্রচার করান।

সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর আবারো ব্রাহ্মণ্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এবং বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের উপর নেমে আসে দলন-পীড়ন। ব্রাহ্মণ্যবাদের কালো থাবার নিচে প্রকৃতই চাপা পড়ে যায় আদিনিবাসী অনার্য জনগোষ্ঠির উজ্জ্বল আগামী। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে দীর্ঘকালব্যাপী ব্রাহ্মণ্যবাদের এই অত্যাচার নির্যাতন ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের কোমরটাই ভেঙে দেয়। শেষপর্যন্ত যাঁরা বেঁচে গেলো তারাও এ দেশ থেকে বিতারিত হলো।

ইতিহাস গবেষক মনীন্দ্র মোহন বসু এ প্রসঙ্গে লিখেন-

অবশেষে এই তান্ত্রিক বৌদ্ধমত তিব্বত, নেপাল প্রভৃতি দেশে যাইয়া আশ্রয়লাভ করিয়াছে। বৌদ্ধধর্মের এই পরাজয় এত সম্পূর্ণ হইয়াছিল যে, ধর্মের সঙ্গে ধর্মগ্রন্থসমূহও ভারতবর্ষ হইতে বিতাড়িত হইয়াছে। থেরবাদী সম্প্রদায়ের গ্রন্থগুলো সিংহল ও ব্রহ্মদেশ হইতে আবিষ্কৃত হইয়াছে। আর মহাযান মতের শাস্ত্রসমূহ পাওয়া গিয়াছে প্রধানত চীন, জাপান প্রভৃতি দেশে। চর্যাপদের পুঁথি নেপালে আবিষ্কার হইয়াছিল। আর ইহার অনুবাদের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে তিব্বতী ভাষায়। এখন ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের সমাধির স্মৃতিচিহ্ন মাত্রই দৃষ্ট হইয়া থাকে।

উল্লেখ্য হীনযান বা থেরবাদী মত ও মহাযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধমত বৌদ্ধধর্মেরই দুটি শাখা।

অধ্যাপক হরলাল রায় চর্যাগীতি গ্রন্থে লিখেন-

ধর্ম কোলাহলেই বাংলা সাহিত্যের পুষ্টি ও বিকাশ। ভারতেই আমরা দেখতে পাই, ব্রাহ্মণ্যধর্মের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পালি সাহিত্যের সৃষ্টি। হিন্দুধর্মের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণেই বৌদ্ধধর্ম ভারত হতে বিতাড়িত হয়েছিল। … বৌদ্ধধর্ম তার জন্মভূমি ভারতে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল। যারা সংস্কৃতকে আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন, তাদের পক্ষে যে অন্য ভাষা সহ্য করা অসম্ভব ছিল, তা মনে করা যুক্তিযুক্ত। সর্বগ্রাসী হিন্দুধর্ম শক্তিশালী অনার্য সভ্যতাকে কুক্ষিগত করে। এ সময়ে বৌদ্ধ সমাজের বুদ্ধিজীবীরা রিক্ত সর্বস্বান্ত হয়ে ধীরে ধীরে ভারত থেকে তিব্বত ও আসামের দিকে সরে পড়েছেন।


অর্থাৎ বৈদিক ব্রাহ্মণদের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি জাতিভেদমূলক ব্রাহ্মণ্যবাদী চতুর্বর্ণ প্রথার নিগড়ে ভারতের মাটিবর্তি অহিংস বৌদ্ধধর্ম দীর্ঘকাল যাবৎ নিগৃহিত হতে হতে ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় পতিত হলো। যদিও চীন ও জাপান সহ অনেকগুলো দেশের কোটি কোটি মানুষ বুদ্ধের অহিংস ধর্ম গ্রহণ করে ততদিনে বৌদ্ধ হয়ে গেলেন, ভারতবর্ষ রয়ে গেলো এক বিদ্বেষপূর্ণ অমানবিক বর্ণবাদী বিষাক্ত দর্শনের নিরাপদ প্রজননভূমি হয়ে।

(চলবে...)

[পরের পর্ব: ২/৮]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29264212 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29264212 2010-10-31 00:22:27
| দুই-মেগাপিক্সেল | ক্ষুধা ও শিল্প…|

ছবিতে যে শিল্পকর্ম দেখা যাচ্ছে, এটা কোন পথ-শিল্প নয়। বা কোনো দিবস উদযাপনও নয়। ছন্নছাড়া মনের খেয়ালে কোন্ সুদূর মফস্বল থেকে রাজধানী শহরে চলে আসা এক ক্ষুধার্ত অসহায় শিল্পীর কষ্টের ক্ষরণ। ব্যক্তি ভিক্ষা চাইতে পারে, কিন্তু শিল্পীর হাত কি কখনো ভিক্ষুক হয় ? তবু ক্ষুধার কাছে ব্যক্তি আর শিল্পীসত্তা যখন একাকার হয়ে যায়, শিল্প বুঝি থমকেই যায়। আহা ক্ষুধা !

[আগ্রহ বেশি হলে এখানে দেখুন] ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29130936 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29130936 2010-04-08 02:02:19
| দুই-মেগাপিক্সেল | পানিইইই…|

আজ (২২ মার্চ ২০১০) বিশ্ব পানি দিবস।
কেউ যদি প্রশ্ন করেন, এই দিবসের উপজীব্য কী ? অত্যন্ত সোজা উত্তর। ঘুম থেকে উঠে এরপর গোটা দিনটাই কেটে গেলো; পানিহীন। এক ফোটা পানি নেই সাপ্লাই লাইনে ! মধ্যরাতে ক্যালেন্ডার ডেট পাল্টে গেছে আরো প্রায় ঘণ্টাখানেক আগেই। তবুও দুঃসহ প্রতীক্ষায় বসে আছি….।

উপরের ছবি দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। কেননা এটা গত বছরের ঠিক এ সময়টাতেই তোলা, দোতলার ফ্ল্যাট থেকে। সিটি কর্পোরেশনের অফিসে বিল জমা দিয়ে যিনি ওয়াসার এই পানিটুকু ক্রয় করেছিলেন, তার ফিরে আসার আগেই পানির গাড়ি চলে এসেছিলো। সিটি কর্পোরেশানের এই তরিৎ সেবায় খুশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও ক্রেতা ভদ্রলোক আসার আগেই আশেপাশের লোকজন নিয়ে গেছে সব পানি। আর সেদিন আমার পানিশূন্য ফ্ল্যাটে রান্না চড়ে নি।

ঢাকাবাসের এই দুঃসহকালে যখন দিনের অষ্টমবারের বিদ্যুতবিহীন ঘণ্টায় হাসফাস করছি তখন কী করে বলবো আগামীকাল কী অপেক্ষা করছে….!
…]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29121658 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29121658 2010-03-23 01:25:33
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন…|৯১-১০০|
...............................................
[উৎবচনগুচ্ছ : (৯১-১০০)]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————

(৯১)
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতি হচ্ছে সেক্স বা জননক্রিয়া,
সভ্য মানুষের চোখে যা অশ্লীল।

(৯২)
মানুষের সার্বভৌমত্ব হচ্ছে- মানুষ হতে কোন ঈশ্বরের প্রয়োজন হয় না;
আর ঈশ্বরের অসহায়ত্ব হলো- মানুষ না থাকলে যার কোন অস্তিত্বই থাকে না।

(৯৩)
ধর্মের অক্ষমতা হলো- নিজেকেই ধারণ করতে অক্ষম সে;
স্রষ্টার অক্ষমতা- সৃষ্টের দাক্ষিণ্য ছাড়া তিনি অচল।

(৯৪)
ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন এটা কাহিনী;
সত্য হলো, মানুষই ঈশ্বরের স্রষ্টা।

(৯৫)
উদ্বৃত্ত শরীর, একমাত্র দুঃসহ বোঝা
যা চাইলেই মানুষ ফেলে দিতে পারে না।

(৯৬)
সময়ের ভার মানুষকে কুকুর বানিয়ে ফেলে;
আগেভাগে তাই সৃজন ও মননের ভেক্সিন নিতে হয়।

(৯৭)
রাজনীতি কি নীতির রাজা, না কি রাজার নীতি
সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়- যখন বৈশ্যবৃত্তি ঠাঁই গাড়ে
সেটা আর রাজনীতি থাকে না, নতুন এক বেশ্যাবৃত্তিতে পরিণত হয়।

(৯৮)
লেখক-চরিত্র সবচাইতে ভঙ্গুর পদার্থ,
কলমের এক খোঁচাতেই যা গুঁড়ো হয়ে যায়।

(৯৯)
জগতের একমাত্র নিঃস্ব প্রাণী মানুষ,
সকল প্রাণীকে সে নিঃস্ব করতে ভালোবাসে।

(১০০)
স্বাভাবিক আয়ুগ্রস্ত মানুষের শতায়ু হওয়া অভিশাপ;
দেয়া এবং নেয়া উভয়টাতেই অক্ষম সে।


[৮১-৯০] [*][১০১-১১০]
…]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29115458 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29115458 2010-03-13 12:50:54
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন…|৮১-৯০|
...............................................
[উৎবচনগুচ্ছ : (৮১-৯০)]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————


(৮১)
ভুল হচ্ছে সেই শুদ্ধতম সম্ভাবনা
যা মানুষের পছন্দের তালিকায় আসে না কখনোই।

(৮২)
‘তেল দেয়া’ বিস্ময়কর এক প্রায়োগিক আর্ট,
সঠিকভাবে দিতে জানলে তা দাতাকেই তেল-চকচকে করে তুলে।

(৮৩)
ভুলে যাওয়া কঠিনতম কাজ;
চেষ্টা করে হয়তো কোনকিছু মনে করা যায়,

কিন্তু চেষ্টা করে ভুলে যাওয়া যায় না।

(৮৪)
কৈশোর আর বয়স্কের তফাৎ বয়সে নয়,
অনিশ্চয়তায় আর মৃত্যুচিন্তায়; যা কৈশোরে থাকে না।
অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুচিন্তার ক্রমবর্ধমান তীব্রতা নিয়েই
মানুষ ক্রমান্বয়ে বয়স্ক হতে থাকে।

(৮৫)
বৈশ্যবৃত্তি আর বেশ্যাবৃত্তির মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য,
বানানের দুয়েকটা ‘কার’-চিহ্ণের ভিন্নতা ছাড়া;
উভয় বৃত্তির মৌল শব্দই ‘বশ’।

(৮৬)
মনুষ্যসমাজে শুকরের আধিক্য মানুষের নোংরামিকেই চিহ্ণিত করে;
যত্রতত্র বিষ্ঠা ছড়ালে বরাহ-দর্শন তো হবেই !

(৮৭)
মেরুদণ্ডী প্রাণীর পায়ের আধিক্য মেরুদণ্ডের অবনমনই নির্দেশ করে;
দুপেয়ে প্রাণীর উল্লম্ব ও ঋজু মেরুদণ্ড চতুষ্পদীতে আনুভূমিক হয়ে যায়।

(৮৮)
সৌন্দর্যবোধ হচ্ছে সেই নান্দনিক উপলব্ধি,
ভিন্ন আঙ্গিকে যা মানুষকে যৌন পরিতৃপ্তি দেয।

(৮৯)
জগতের যেকোন বস্তু বা প্রাণীকে ব্যবচ্ছেদ করলে
কার্যকর কিছু ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য বেরিয়ে আসে;
মানুষের আচরিত ধর্মকে ব্যবচ্ছেদ করে তেমন কিছুই পাওয়া যায় না,
উদ্ভট কিছু গোঁড়ামি আর ভণ্ডামি ছাড়া !

(৯০)
না-জানার মধ্যে মূর্খতা নেই, জানার চেষ্টা না-করাটাই মূর্খতা;
আর মূর্খতার পরিচায়ক হচ্ছে গোঁয়ার্তুমি।
চিন্তক-অঙ্গে বৈকল্য আসলেই মানুষ গোঁয়ার্তুমিতে আক্রান্ত হয়।


[৭১-৮০] [*][৯১-১০০]
…]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29111257 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29111257 2010-03-06 19:37:54
[Khona] খনা, জনভাষ্যে মিশে থাকা আমাদের লোকভাষ্যকার…(শেষ পর্ব)|-(রিপোস্ট সংরক্ষণ)

[আগের পর্ব এখানে]

০৫.
কিছু কিছু বচনকে সাধারণ জনেরা খুব সহজে এক ডাকেই খনার বচন হিসেবে চিহ্ণিত করে ফেলেন। কেননা বচনগুলোর গঠনরীতির মধ্যেই খনা নামটি উৎকীর্ণ থাকে। যেমন-

(ক)
‘খনা বলে শুন কৃষকগণ/ হাল লয়ে মাঠে বেরুবে যখন/ শুভ দেখে করবে যাত্রা/ না শুনে কানে অশুভ বার্তা।/ ক্ষেতে গিয়ে কর দিক নিরূপণ/ পূর্ব দিক হতে হাল চালন/ নাহিক সংশয় হবে ফলন।’
(খ)
‘খনা বলে শুনে যাও,/ নারিকেল মূলে চিটা দাও।/ গাছ হয় তাজা মোটা,/ তাড়াতাড়ি ধরে গোটা।’
(গ)
‘পূর্ণিমা অমাবস্যায় যে ধরে হাল,/ তার দুঃখ হয় চিরকাল।/ তার বলদের হয় বাত,/ তার ঘরে না থাকে ভাত।/ খনা বলে আমার বাণী,/ যে চষে তার হবে জানি।’
(ঘ)
‘খনা বলে চাষার পো,/ শরতের শেষে সরিষা রো।’
(ঙ)
‘বৎসরের প্রথম ঈষাণে বয়,/ সে বৎসর বর্ষা হবে খনা কয়।’
(চ)
‘উঠান ভরা লাউ শসা,/ খনা বলে লক্ষ্মীর দশা।’
(ছ)
‘খনা ডাকিয়া কন,/ রোদে ধান ছায়ায় পান।’
(জ)
‘ডাক দিয়ে বলে মিহিরের স্ত্রী, শোন পতির পিতা,/ ভাদ্র মাসে জলের মধ্যে নড়েন বসুমাতা।/ রাজ্য নাশে, গো নাশে, হয় অগাধ বান,/ হাটে কাটা গৃহী ফেরে কিনতে না পান ধান।’
(ঝ)
‘ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তুলা,/ তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান।/ খনার বচন, মিথ্যা হয় না কদাচন।’
(ঞ)
‘মাঘ মাসে বর্ষে দেবা,/ রাজায় ছাড়ে প্রজার সেবা।/ খনার বাণী,/ মিথ্যা না হয় জানি।’
(ট)
‘ধানের গাছে শামুক পা,/ বন বিড়ালী করে রা।/ গাছে গাছে আগুন জ্বলে,/ বৃষ্টি হবে খনায় বলে।’
(ঠ)
‘কচু বনে ছড়ালে ছাই,/ খনা বলে তার সংখ্যা নাই।’
(ড)
‘যে গুটিকাপাত হয় সাগরের তীরেতে,/ সর্বদা মঙ্গল হয় কহে জ্যোতিষেতে।/ নানা শস্যে পরিপূর্ণ বসুন্ধরা হয়,/ খনা কহে মিহিরকে, নাহিক সংশয়।’

[খনার বচন/ নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা/ ঢাকা/ পঞ্চম সংস্করণ ২০০৭]

বাক্যের গাথুনিতেই যেহেতু খনা শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়েছে, ফলে এগুলোকে যে কেউ খনার বচন বলতেই পারেন। তাই বলে এটা প্রমাণসিদ্ধ হয়ে যায় না যে বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় দশম রত্ন হিসেবে একমাত্র খনা নাম্নী কোন বিদূষী জ্যোতিষশাস্ত্রী রমণীর মুখনিঃসৃত বাণী এগুলো। এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ইতিহাসবেত্তাদের এদিকে মনোযোগ আকর্ষিত হওয়াটাও জরুরি বৈকি।

সুবল চন্দ্র মিত্রের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ (১৯২৯)-এর তথ্য অনুসরণে, মহাকবি কালিদাসের সংস্কৃত গ্রন্থ ‘জ্যোতির্বিদ্যাভরণ’-এ মৌর্য বংশের গুপ্তসম্রাট মহারাজা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের (যিনি বিক্রমাদিত্য নামে খ্যাত) নবরত্ন সভার নবরত্নদের নাম পাওয়া যায় এভাবে-
“ধন্বন্তরি-ক্ষপণকামরসিংহ-শঙ্কু-বেতালভট্ট-ঘটকর্পর-কালিদাসাঃ খ্যাতোবরাহমিহিরোনৃপতেঃ সভায়ং রত্নানি বৈ বররুচির্ণব বিক্রমস্য।”
অর্থাৎ, নৃপতি বিক্রমের সভায় যে নয়জন রত্ন-
(১) ধন্বন্তরি (২) ক্ষপণক (৩) অমরসিংহ (৪) শঙ্কু (৫) বেতালভট্ট (৬) ঘটকর্পর (৭) কালিদাস (৮) বরাহমিহির (৯) বররুচি।
কিংবদন্তীয় লোককাহিনী অনুযায়ী অসম্ভব বিদূষী জ্যোতিষ রমণী হিসেবে খনা যেভাবে রূপায়িত, প্রকৃতই যদি এর কোন ইতিহাসনিষ্ঠতা থাকতো, তাহলে সমকালীন উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে কালিদাসের লেখনিতে খনা নামের উপস্থিতি কি অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিলো না ? কিন্তু কালিদাসের কোথাও খনার অবস্থিতি রয়েছে এরকম তথ্য জানা নেই।

মহাকবি বেদব্যাস রচিত এযাবৎ প্রাচীনতম মহাকাব্য মহাভারতের পৌরাণিক চরিত্র শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত উপদেশবাণী হিসেবে শ্রীমদ্ভাগবত গীতা ব্যবহারিক মূল্য বিবেচনায় নির্দিষ্ট একটি ধর্মগোষ্ঠির কাছে ধর্মগ্রন্থের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। এখানে ইতিহাসনিষ্ঠতার বদলে ধর্মভীরু একটি জনগোষ্ঠির কিংবদন্তীতুল্য অলৌকিকতায় বিশ্বাসেরই প্রাধান্য দেখতে পাই আমরা। তবে লিপিবদ্ধ ও বহুলচর্চিত সাহিত্য হিসেবে গীতায় যেমন শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণীরূপের এদিক ওদিক বা সংযোজন-বিয়োজনের কোন সুযোগ সাধারণভাবে নেই, লোকায়ত কিংবদন্তীয় চরিত্র খনা’র বিষয়টা মনে হয় ঠিক তার উল্টো হওয়াটাই দারুণভাবে সম্ভব। আর তাই কৃষিসম্পৃক্ত প্রাচীন সমাজে আমাদের বহু অখ্যাত লোক-কবিদের সৃজনশীল মেধায় উপরোক্ত ধরনের এরকম খনার বচন তৈরি হওয়াটা অসম্ভব বা বিচিত্র কিছু নয়। ফলে আমাদেরকে আবারো সেই একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে হচ্ছে- খনার বচন আসলে কী ?

লোক-সংস্কৃতির চিরায়ত ধারায় এমন কিছু গীত-রীতির কথা আমরা জানি যা বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে থাকে। যেমন জারি, সারি, ধামাল, গম্ভিরা, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি। উদাহরণ হিসেবে রাজশাহী অঞ্চলের গম্ভিরার কথাই ধরি। নাম না জানা বিভিন্ন গীতিকারের নির্দিষ্ট রীতি ও সুরে লেখা গীতের লোকায়ত সমাহার এই গম্ভিরার ধরনে আজকাল অনেক আধুনিক কবি ও গীতিকারের লেখা গানও গম্ভিরার সুরে অনেক শিল্পীরা গেয়ে থাকেন। এগুলোকে আমরা গম্ভিরাই বলে থাকি। রংপুর অঞ্চলের ভাওয়াইয়া বা সিলেট অঞ্চলের ধামাল গানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রচয়িতার নাম জানা থাকলে গীতিকার হিসেবে তাঁর নাম চলে আসে, নইলে বলা হয় সংগৃহিত; অর্থাৎ লোকায়ত উৎস। সেই লোকায়ত উৎসটা যে কোন অচেনা একক রচয়িতাই হবেন তা কিন্তু নয়। খনার বচনের ক্ষেত্রেও এমনটা হওয়া কি অসম্ভব খুব ? খনার বচনকে এরকম সুনির্দিষ্ট একটা প্রবচন রীতি হিসেবে কল্পনা করাটা কি খুব কষ্টকর ?


০৬.
খনার বচন হিসেবে পরিচিত বা পরিবেশিত প্রবচনগুলোর উৎস প্রমাণীত বা অপ্রমাণীত যা-ই হোক, এগুলোর একটা ভাব-রীতি বা ধরণ ইতোমধ্যে চিহ্ণিত হয়ে আছে যে, “খনার বচনে আছে কৃষিকাজের বিবিধ রীতি-পদ্ধতি ও নিয়ম-নির্দেশ। হাল, চাষ, বলদ, ভূমি, বীজ, ফলন, বৃষ্টি, বন্যা, শিলা, ঝঞ্ঝা, মাস, ঋতু প্রভৃতি সম্মন্ধে জ্যোতিষী ব্যাখ্যা এগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়। বৃষ্টি ও আবহাওয়া সম্পর্কে রচিত বচনে সাধারণত বৃষ্টি, বন্যা, খরা, সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী থাকে।… এই বর্ষা বৃষ্টি হলে কৃষক চাষ করবে, বীজ বুনবে, চারা রোপণ করবে, ফসল ফলাবে। বচনগুলো বাংলার ‘কৃষিদর্শন’।” …[পৃ.১৭৫, ওয়াকিল আহমদ/ লোককলা প্রবন্ধাবলি/ গতিধারা, ফেব্রুয়ারি ২০০১]

এ পর্যায়ে এসে তাহলে এ প্রশ্ন আসাটা কি খুব অস্বাভাবিক যে, এই বচনগুলোর নাম আবহাওয়া বা কৃষি বচন না হয়ে খনার বচন হলো কেন ? খনার বচন তো আসলে আবহাওয়া বা কৃষি বচনই। তবু তাকে কেন খনার বচন বলা হয় এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা কি আপাতভাবে কয়েকটি সম্ভাবনা বিবেচনায় নিতে পারি ?

দার্শনিক মিল বলতেন- নাথিং হ্যাপেনস উইদাউট অ্যা কজ। প্রতিটা ঘটনার পেছনেই একটি কারণ রয়েছে। সংঘটিত কোন ঘটনার কার্য-কারণ খোঁজা মানুষের আদিমতম কৌতুহলেরই অংশ। অজানাকে জানা বা জ্ঞানন্বেষণের এই আদিম প্রবণতার ধারাবাহিকতাই মূলত মানুষের চিরায়ত সমকালীনতা। হাজার বছর আগের বা আজকের অবস্থানে মৌলিক কোন তফাৎ নেই, মাত্রাগত ভিন্নতাটুকু ছাড়া। আর এই মাত্রাগত অবস্থাটা হলো মানব প্রজাতি কর্তৃক জাগতিক রহস্য উন্মোচন বা জ্ঞান বিকাশের তুলনামূলক অবস্থান। মানুষের জ্ঞানের জগতে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরার কালের সমকালীনতায় পৌঁছা এবং সেখান থেকে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরার কালের সমকালীনতা পর্যন্ত হেঁটে আসতে মানব সভ্যতার মাত্রাগত অবস্থানের যে তুলনামূলক পরিবর্তন সাধিত হয়ে এসেছে, এরই ধারাবাহিকতায় কত ভাঙাগড়া কত পট পরিবর্তন ঘটে গেছে মানব সভ্যতায়। এগুলোই হয়তো ইতিহাসের নুড়ি-পাথর। এই কার্য-কারণ সম্পর্ক খুঁজতে খুঁজতেই মানুষের বা সভ্যতার এগিয়ে যাওয়া। এক বিশ্বাস থেকে আরেক বিশ্বাসে পদার্পণ, আবার পুরনো অকার্যকর হয়ে ওঠা সে বিশ্বাসকেও ছুঁড়ে ফেলে অন্য কোন আধুনিক বিশ্বাস বা মতবাদ আঁকড়ে নেয়া। তাই জাগতিক ঘটনাবলির কার্য-কারণ খোঁজার ইতিহাসই মূলত মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস। এসব করতে গিয়ে মানুষ কোন কার্য-কারণ সম্পর্কের যে আপাত ব্যাখ্যা তৈরি করে, সেটা করে তার সমকালীন জ্ঞানের স্তর বা বিন্যাস দিয়ে। সভ্যতা ক্রমশই এগিয়ে যায় বলে একশ’ বছর আগের ব্যাখ্যা আর আজকের ব্যাখ্যা তাই এক থাকে না, থাকতে পারে না।

জগতের যে ঘটনাগুলো মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না, তার কার্য-কারণ সম্পর্ক খুঁজতে গিয়ে সমকালীন আহরিত জ্ঞান দিয়েও যখন পরিপূর্ণভাবে তার রহস্য উন্মোচন করতে ব্যর্থ হয়, তখনই সে আশ্রয় নেয় কল্পনার বা কাল্পনিক ধারণা সৃষ্টির। আর এগুলোকে অদ্ভুতভাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্যে যে সন্তোষজনক যুক্তির প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাকে পরিতৃপ্ত করতেই জন্ম নেয় কতকগুলো লোককথা, উপকথা, পুরাণ বা রূপকথার। আমাদের প্রচলিত ধর্মীয় কাহিনীগুলো এই পর্যায়ের বলে জাগতিক ঘটনাবলির কার্য-কারণ সম্পর্কের তৎকালীন ধর্মীয় ব্যাখ্যার সাথে মানব সভ্যতার হেঁটে হেঁটে অনেকদূর এগিয়ে আসা আধুনিক ব্যাখ্যার বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে আজ। এরকমই আরেকটি বিষয় হলো তথাকথিত জ্যোতিষশাস্ত্র।

অজানার প্রতি মানুষের নিরাপত্তাহীনতার ভয় বা সন্দেহ চিরকালের। বিশাল প্রকৃতির মহাজাগতিক ক্ষমতার কাছে নিতান্তই অসহায় মানুষের এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকেই মনোজগতে জন্ম নেয়া শুভ-অশুভ জাতীয় সংস্কারগুলো জাগতিক সকল ক্রিয়াকর্মে বিপুল প্রভাব বিস্তার করে মানুষকে করে তুলেছে অদৃষ্টবাদী। এই অদৃষ্টবাদিতাই হলো তথাকথিত জ্যোতিষশাস্ত্রের আসল পুঁজি। দৃশ্যমান গ্রহ-নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক শক্তি তথা আবহাওয়া ও জলবায়ুর মধ্যের আন্ত-সম্পর্কের যে নিয়মতান্ত্রিকতা, দীর্ঘকালীন পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে মানুষের আহরিত জ্ঞানে এ সত্য ধরা পড়েছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। আর তাই এই সত্যের সাথে কাল্পনিক শুভ-অশুভের অলৌকিক সংস্কার যুক্ত হয়ে গড়ে ওঠা জ্যোতিষশাস্ত্রই নিয়ন্ত্রণ করেছে এতদঞ্চলের তৎকালীন মানুষের মনোভূমি। এছাড়া কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় প্রকৃতি ও জলবায়ুর সাথে মানুষের সম্পর্ক এমনিতেই গভীর। এই প্রকৃতিনির্ভরতা মানুষকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট শুভ অশুভ পরিণতিগুলোর প্রতি। ফলে ‘যদি হয় চৈতে বৃষ্টি, তবে হবে ধানের সৃষ্টি।’ বা ‘আখ, আদা, পুঁই, এই তিনে চৈতি রুই’ জাতীয় কৃষিদর্শনভিত্তিক প্রবচনের সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এবং সাথে ‘সোম ও বুধে না দিও হাত, ধার করিয়া খাইও ভাত’ বা ‘মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা’ জাতীয় শুভ-অশুভ শঙ্কা মিশ্রিত অলৌকিক সংস্কার জাতীয় প্রবচনগুলোও প্রভাব বিস্তার করেছে ধর্মীয় রূপকথার আদলে। কিন্তু একটি নিরক্ষর কৃষিভিত্তিক সমাজে এসব লৌকিক জ্ঞানের ব্যবহারিক শৃঙ্খলা আনয়নে সুনির্দিষ্ট কিছু রীতি মেনে চলায় বাধ্য করার সাবলীল প্রক্রিয়া হলো ধর্মগাথার আদলে কাল্পনিক কোন মনোশাসক সৃষ্টি, যা একাধারে হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য ও আকর্ষণীয়। এরই বহিঃপ্রকাশ হয়তো উপকথার আদলে একজন লীলাবতী বা বিদুষী খনা নামের কিংবদন্তীয় কোন জ্যোতিষশাস্ত্রীর লোককাহিনীর সৃষ্টি ও এর ব্যাপ্তি। যথাযথ সময়ে যে কিনা কৃষিসম্পৃক্ত কোন প্রাজ্ঞ চাষার মুখ দিয়ে বলতে পারে- ‘বাঁশের ধারে হলুদ দিলে,/ খনা বলে দ্বিগুণ বাড়ে।’ কিংবা ‘শুনরে বাপু চাষার বেটা,/ মাটির মধ্যে বেলে যেটা,/ তাতে যদি বুনিস পটল,/ তাতে তোর আশার সফল’ ইত্যাদি। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যরহিত কোন কাল্পনিক রূপকথা বা কিংবদন্তী নির্ভর ধারণা থেকে চূড়ান্ত কোন অনুসিদ্ধান্ত টানা হয়তো পরিমিত বিবেচনার প্রমাণ রাখে না।

আরেকটি সম্ভাবনা ও যুক্তিকে এক্ষেত্রে বেশ জোরালো মনে হতে পারে। তা হচ্ছে, খনা কোন ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়, প্রবচনের একটি বিশেষ রীতি বা ধারার নাম হলো খনার বচন। আর এই রীতি বা ধারাটি কী, তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবু খনা শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করে আমরা এর একটি অনুমান খুঁজে নেয়ার চেষ্ট করতে পারি।

‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ গ্রন্থে ‘খনা’ শব্দের দুটো অর্থ চিহ্ণিত করা হয়েছে। একটি হচ্ছে বিশেষণবাচক- নাকি সুরে কথা বলে এমন। অন্যটি বিশেষ্যবাচক এবং সেই রূপকথা আশ্রিত- বিখ্যাত বাঙালি মহিলা জ্যোতিষী; মিহিরের স্ত্রী। উক্ত অভিধানে খনার বচনের বিশেষ্যবাচক অর্থটি করা হয়েছে এভাবে- জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী চাষাবাদ, বৃক্ষরোপণ, গৃহনির্মাণ প্রভৃতি শুভাশুভ বিষয়ক সুপ্রচলিত প্রবচন যা খনার রচিত বলে প্রসিদ্ধ।

অর্থাৎ খনার বচনের একটি সুনির্দিষ্ট রীতি বা ধরন ইতোমধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী চাষাবাদ, বৃক্ষরোপণ, গৃহনির্মাণ, আবহাওয়া, জলবায়ু প্রভৃতি বিষয়সংশ্লিষ্ট শুভাশুভ বিষয়ক সুপ্রচলিত প্রবচনই খনার বচন। এক্ষেত্রে সংশয়ের কোন কারণ দেখি না। সংশয়ের কারণ থেকে যায় শুধু খনা শব্দ বা নামের যৌক্তিক উৎস নিয়েই। সম্ভবত এরও একটি চমৎকার সম্ভাব্যতা যাচাই করে নিতে পারি আমরা।
খনা (খন্ + আ) শব্দের মৌল শব্দ হচ্ছে খন। উল্লেখিত বাংলা অভিধানে এই ‘খন’ শব্দেরও দুটো ভিন্ন কিন্তু পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অর্থ চিহ্ণিত রয়েছে। একটি হলো- ক্ষণ শব্দের কোমল রূপ। আর ‘ক্ষণ’ অর্থ দেয়া আছে ‘মুহূর্ত’। অভিধানে খন শব্দের অন্য অর্থটি মুদ্রিত আছে এভাবে- ভবিষ্যৎ অর্থবোধক (হবে’খন, দেখব’খন)। {‘এখন’ শব্দের ‘এ’ লোপে; স. ক্ষণ>}।

উপরোক্ত বিবেচনায় এখন ‘খনা’ শব্দটির ক্রিয়া-বিশেষণবাচক একটি লোকায়তিক অর্থ যদি এভাবে করা হয়, ভবিষ্যতের কোন বিশেষ (শুভাশভ) মুহূর্ত, কোথাও কি ভুল হবে ? যদি ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে ‘খনার বচন’ শব্দযুগলের একটি বাচ্যার্থ দাঁড়ায় এরকম, যে বচনের মধ্য দিয়ে কোন বিষয়ের ভবিষ্যৎ শুভাশুভ মুহূর্ত নির্দেশিত হয় বা হয়েছে, তা-ই খনার বচন। ফলে আরো কিছু প্রশ্নেরও ধারণাগত যৌক্তিক ব্যাখ্যা পেয়ে যেতে পারি আমরা। খনার বচন যে কেবল খনা নামধারী সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিবিশেষেরই রচিত হতে হবে তা নয়। হতে পারে বিজ্ঞ কিছু নিরক্ষর লোক-চাষার। অথবা প্রাচীন কৃষিদর্শন-অভিজ্ঞ কিছু লোক-কবির। বা কৃষিনির্ভর কিছু চতুর ও প্রাজ্ঞ জ্যোতিষীর। তবে এ বচনগুলো যে বিভিন্ন কালের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের মুখে মুখে ছড়া কাটার মতোই একগুচ্ছ লোকায়ত ভবিষ্যৎ বাণী, তাতে বোধকরি দ্বিমত করার খুব জোরালো অবকাশ থাকবে না। খনার বচনের সবগুলো প্রবচন হয়তো এখনো সংগ্রহ করা সম্ভব হয় নি বা খনার বচনের প্রকৃত সংখ্যাও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণীত করা সম্ভব নয়। তবু খনার বচনের সেই সব বচন রচয়িতাকে যদি আমরা ‘খনা’ নামেই চিহ্ণিত করি, তাহলে বলতেই হয়, খনা হচ্ছে জনভাষ্যে মিশে থাকা আমাদের একগুচ্ছ লোক-ভাষ্যকার।
(Image: from internet)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29111078 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29111078 2010-03-06 13:28:33
[Khona] খনা, জনভাষ্যে মিশে থাকা আমাদের লোকভাষ্যকার…।১ম পর্ব |-(রিপোস্ট সংরক্ষণ)



০১.
‘মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা’ কিংবা ‘কলা রুয়ে না কাটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’ অথবা ‘বেঙ ডাকে ঘন ঘন, শীঘ্র হবে বৃষ্টি জান’ বা ‘বামুন বাদল বান, দক্ষিণা পেলেই যান’, এগুলো জনপ্রিয় খনার বচন। কৃষিভিত্তিক জন-মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত এরকম বহু লোক-বচনের সাথেই আমরা পরিচিত। খনার বচনও আছে প্রচুর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের লোক-সাহিত্যে খনা নামে কেউ কি আদৌ ছিলেন ? আসলে এ প্রশ্নটাও বিভ্রান্তিমূলক। কেননা লোক-সাহিত্য বলতেই আমরা বুঝে নেই যে, লোক-মুখে প্রচলিত সাহিত্য অর্থাৎ জনরুচির সাথে মিশে যাওয়া যে প্রাচীন সাহিত্য বা সাহিত্য-বিশেষের কোন সুনির্দিষ্ট রচয়িতার সন্ধান আমরা পাই না বা জানা নেই তা-ই লোক-সাহিত্য। সাহিত্যে যেহেতু রয়েছে, রচয়িতা আছে তো বটেই। কিন্তু তা লিপিবদ্ধ ছিলো না বলে কাল-চক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া এই রচয়িতারা নাম-পরিচয় হারিয়ে চিহ্ণহীন লোকায়ত পরিচয়ে চিরায়ত জনস্রোতের অংশ হয়ে গেছেন। তাঁদের লিপিহীন মহার্ঘ রচনাগুলো হয়ে গেছে আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, অনেক গবেষক-সংগ্রাহকদের গভীর শ্রমসাধ্য অবদানে কালে কালে সংগৃহীত ও সংরক্ষিত হয়ে যাকে আমরা আজ লোক-সাহিত্য বলে চিহ্ণিত করছি।

লোক-সাহিত্যের এই প্রাথমিক ও অনিবার্য বৈশিষ্ট্য স্বীকার করে নিলে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে এ সিদ্ধান্তে আসতে হয় যে, খনার বচন বিশুদ্ধ লোক-সাহিত্যের অংশ হতে পারে কি না, নয়তো লোক-সাহিত্যে খনা নামের সুনির্দিষ্ট কোন একক রচয়িতা থাকতে পারে কি না। এক্ষেত্রে যেকোন একটি সম্ভাবনা সত্য হওয়া সম্ভব। পরস্পর-বিরোধী দুটো সম্ভাবনা একইসাথে সত্য হতে পারে না। তাহলে কোনটি সত্য ?

‘খনা’ নামে কেউ থাক বা না থাক, খনা (khona) নাম বা শব্দটি যে আজ কিংবদন্তী, তা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবেন না। গ্রামে গঞ্জে কৃষি-সম্পৃক্ত আমাদের প্রাচীন প্রবীন গুরুজনেরা এখনো খনা’র কৃষিতত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন কালজয়ী বচনের মাধ্যমে অন্যদেরকে জ্ঞানদান করে থাকেন। জলবায়ু ও প্রকৃতির সাথে কৃষির নিবিড় সম্পর্ক অনস্বীকার্য। এই সম্পর্কগুলো খনার বচনের মধ্য দিয়ে যে অব্যর্থ সূত্রাবদ্ধতা পেয়ে গেছে, তাকে কালোত্তীর্ণের মর্যাদা না দিয়ে উপায় নেই। কিন্তু তাতে করে খনা নামের কোন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিপরিচয় প্রমাণসিদ্ধ হয় না। বর্তমানে সংগৃহীত খনার এই আদি বচনগুলোর এরূপ কোন প্রমাণসিদ্ধ লিপিবদ্ধতা না থাকায় জনভাষ্যের কালপরিক্রমায় সেগুলোর অঞ্চল ও ভাষাভিত্তিক বহু ভ্রংশ-উপভ্রংশ ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে এগুলোর আদিরূপ জানার কোন উপায় আর অবশিষ্ট নেই। এছাড়া জনমানুষের মুখে মুখে জনশ্রুত বচনগুলোয় যে কোনো একজন খনার গুটিকয় বচনের সাথে কালে কালে আরো বহু খনার প্রাকৃতিক রচনার সম্মিলন ঘটে নি, তা-ই বা কে বলবে ? বরং কালে কালে কৃষিভিত্তিক সমাজ-সংশ্লিষ্ট বহু জনের বহু অভিজ্ঞতার সমন্বয় সাধনের মধ্য দিয়ে একটা সম্মিলিত মাত্রা পাওয়া এই শ্লোকসদৃশ জমাট রূপটিকেই অধিক যুক্তিসংগত বলে মনে হয়। তাই খনার বচন বলতে আমরা যদি খনা নামের কোন একক ব্যক্তিবিশেষের রচনা না বলে বিভিন্ন কালের বিভিন্ন জনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাপ্রসূত জ্ঞানের জমাটবদ্ধ সম্মিলিত রচনা বলে বিবেচনা করি, তা কি খুব অযৌক্তিক হবে ?

০২.
জনভাষ্যের রহস্যময় প্রতিনিধিত্বকারী এই প্রতীকী চরিত্র খনা আসলে কি কোন মিথ-আশ্রয়ী চরিত্র ? ঢাকা ‘নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা’ প্রকাশনী থেকে ২৩ মে ১৯৯৫, ০৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪০২-এ একশ’টি বচনের সমন্বয়ে ‘খনার বচন’ নামে প্রকাশিত হাতের মুঠোয় পুরে ফেলার মতো ক্ষুদ্রাকৃতির বইটির ‘বিদূষী খনা’ শিরোনামে গ্রন্থিত ভূমিকাতূল্য লেখাটিতে কিছু মজার বিষয় লক্ষ্য করা যায়। ‘খনা যে প্রাচীন বাংলাদেশের একজন বিদূষী খ্যাতনাম্নী জ্যোতিষী ছিলেন, সে সম্পর্কে সন্দেহের আর কোন অবকাশ নেই’ বলে সন্দেহমুক্ত করতে নিশ্চয়তাবিধানের যে প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে, তাতে কি আমরা আসলে সন্দেহমুক্ত হতে পারি ? ওখানে আবার বলা হচ্ছে- ‘খনা সম্পর্কে বাংলা ও উড়িয়া ভাষায় কিংবদন্তী আছে। গল্প দুটি প্রায় একরকম কিন্তু একটি মূল জায়গায় মত-পার্থক্য আছে।’ কী সেই মত-পার্থক্য ? তা বুঝতে আমাদেরকে উপরোক্ত বই অনুসরণে কিংবদন্তীয় গল্পটি সম্পর্কে আগে একটা ধারণা নিতে হয়।

কিংবদন্তী:
‘খনা ছিলেন লংকাদ্বীপের রাজকুমারী। লংকাদ্বীপবাসী রাক্ষসগণ একদিন স্ববংশে তাঁর পিতা-মাতাকে হত্যা করে এবং তাঁকে হস্তগত করে। একই সময়ে উজ্জয়িনীর মহারাজ বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার প্রখ্যাত জ্যোতিষ পণ্ডিত বরাহ তাঁর ভুল গণনায় স্বীয় নবজাত শিশু সন্তান মিহির-এর সহসা অকাল মৃত্যুর কথা জেনে নবজাতককে একটি তাম্র-পাত্রে রেখে স্রোতে ভাসিয়ে দেন। জ্যোতিষ গণনায় তিনি মনে করেছিলেন এভাবে শিশুটি মৃত্যু থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে। পরিত্যক্ত এই শিশুকেও ভাসমান তাম্র-পাত্র থেকে রাক্ষসেরা তুলে নেয় এবং দুটো শিশুকে একসাথে পালন করতে থাকে।

খনা ও মিহির কালক্রমে জ্যোতিষ শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন এবং যৌবনে পরস্পর পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। খনা খগোল শাস্ত্রেও পারদর্শী হয়ে ওঠেন। একদিন খনা ও মিহির গণনায় অবগত হলেন যে, মিহির উজ্জয়নীর সভাপণ্ডিত বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহের পুত্র। এক মাহেন্দ্রক্ষণে উভয়ে রাক্ষস গুরুর অনুমতিক্রমে এবং একজন অনুচরের সহায়তায় পালিয়ে ভারতবর্ষে যাত্রা করেন। উজ্জয়িনীতে এসে খনা ও মিহির পণ্ডিত বরাহের নিকট আত্মপরিচয় দেন। কিন্তু পণ্ডিত সে কথা বিশ্বাস করতে চাইলেন না। কারণ তিনি গণনা দ্বারা জানতে পেরেছিলেন যে, এক বছর বয়সেই তাঁর পুত্র মিহিরের মৃত্যু ঘটবে। খনা তখন তাঁর একটি বচন উদ্ধৃতি দিয়ে শ্বশুরের ভুল গণনা প্রতিপন্ন করেন-

‘কিসের তিথি কিসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার
কি করো শ্বশুর মতিহীন, পলকে আয়ু বারো দিন।’

অর্থাৎ এ গণনায় মিহিরের আয়ু ১০০ বছর। পণ্ডিত বরাহ সানন্দে খনা ও মিহিরকে স্বগৃহে গ্রহণ করেন। এদিকে পালাবার পর দ্বীপনেতা পলাতক দম্পতিকে ধরার জন্যে আয়োজন করেছিলেন। তখন খনা-মিহিরের ওস্তাদ বলেন যে, ওরা জ্যোতিষী গণনা দ্বারা এমন এক অনুকূল মুহূর্তে পলায়ন করেছেন যে, তারা নিরাপদে পৌঁছে যাবেন। ফলে অনুসন্ধান পরিত্যক্ত হয়।

ক্রমে খনার অগাধ জ্ঞানের কথা জানাজানি হয়ে যায়। রাজসভাতে তিনি আমন্ত্রিত হন। খনার জ্ঞান-গরিমা সভা-পণ্ডিতদের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি তিনি পণ্ডিত বরাহের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বহু দুঃসাধ্য সমস্যা সমাধান করে দিতে লাগলেন। এতে অপমানিত ও ঈর্ষান্বিত পণ্ডিত বরাহ পুত্র-বধুকে জিহ্বা কর্তন করে তাকে বোবা বানিয়ে দেয়ার জন্য পুত্রকে আদেশ করেন। মিহির খনাকে একথা সবিশেষ জানান। খনা এ শাস্তি মেনে নেন। পিতৃ-আদেশে মিহির এক তীক্ষ্ণধার ছুরিকা দ্বারা খনার জিহ্বা কর্তন করেন। মাত্রাধিক রক্তক্ষরণে অসামান্যা বিদূষী খনার মৃত্যু হয়। খনার কর্তিত জিহ্বা ভক্ষণ করে টিকটিকি গুপ্ত জ্ঞান লাভ করে।

উড়িয়া কিংবদন্তী অনুযায়ী খনার আসল নাম ছিল লীলাবতী। শ্বশুর বরাহ তার পুত্র মিহিরকে আদেশ করেছিলেন পুত্রবধুর জিহ্বা কেটে ফেলতে। তাই সে ‘খনা’। আসলে লীলাবতী ও খনা একই ব্যক্তি হতে পারেন। তবে দুটো গল্পেরই সারমর্ম এক: খনার মৃত্যুর কারণ ছিল তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা।

উড়িয়া কিংবদন্তী অনুযায়ী পিতার আদেশ পেয়ে নিরূপায় স্বামী মিহির খনার জিহ্বা কর্তনের পূর্বে কিছু কথা বলার সুযোগ দিয়েছিলেন। খনা তখন কৃষি, আবহ-তত্ত্ব, জ্যোতিষশাস্ত্রীয় এবং মানবজীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বহুবিধ কথা বলে যান। পরবর্তীকালে সে সব কথা ‘বোবার বচন’ বা খনার বচন’ নামে অভিহিত হয়।

খনা সিংহলের রাজকুমারী হলেও বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক-সূত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন ইতিহাসে। ফলে খনার ভাষা বাংলা হওয়া খুব অবাস্তব নয়। তবে খনার বচনের বর্তমান ভাষা মূল ভাষার বিবর্তিত রূপ। তাঁর আবির্ভাব কাল সম্পর্কে ধারণা করা যায় সম্ভবত তিন চারশ’ বর্ষের মধ্যে হয়েছিল।’

‘খনার বচন’ পুস্তিকার উপরোক্ত রূপকথা জাতীয় গল্প ও একপেশে অনুসিদ্ধান্তটি পড়ে খনা নামের সুনির্দিষ্ট কারো অস্তিত্বের স্বপক্ষে স্পষ্ট ও যৌক্তিক কোন সিদ্ধান্তে আসা কি সম্ভব ?

খনা বিষয়ক অন্য এক কিংবদন্তী অনুসারে তাঁর নিবাস ছিলো পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসাতের দেউলি গ্রামে। পিতার নাম অনাচার্য। চন্দ্রকেতু রাজার আশ্রম চন্দ্রপুরে তিনি বহুকাল বসবাস করেন। কিন্তু কিংবদন্তী তো কিংবদন্তীই, মানব-কল্পনার পাখা যেখানে অবাধ্য মাধুরী নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ইচ্ছাপুরে !

০৩.
বাংলা লোকসাহিত্যের চারটি মৌলিক উপাদান- প্রবাদ ও প্রবচন, ধাঁধা, ছড়া ও মন্ত্র নিয়ে গবেষক অধ্যাপক ওয়াকিল আহমদ-এর অত্যন্ত পরিশ্রমের ফসল বইপত্র প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত ৭৬৮ পৃষ্ঠার ঢাউস আকারের গবেষণা গ্রন্থ ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’। এটা মূলত তাঁর সংশ্লিষ্ট চারটি গবেষণা গ্রন্থ, যার প্রথম তিনটি প্রথমে বাংলা একাডেমী ও চতুর্থটি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত, এর সামষ্টিক প্রকাশনা বলা যায়। এর প্রথম অংশটির নাম ‘প্রবাদ ও প্রবচন’। এই অংশের ভূমিকায় লেখকের উদ্ধৃতাংশ প্রণিধানযোগ্য।

‘…বাংলাদেশ লোকসাহিত্য অতি সমৃদ্ধ। বাংলার মাটি খুব উর্বর; আবহাওয়া কৃষি-উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। জীবিকার জন্য বাংলার মানুষকে অধিক শ্রম করতে হয় না। এদেশে কৃষি-নির্ভর অর্থনীতি ও সামন্ত-শাসন দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়। ইংরেজ-শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এদেশে প্রকৃত অর্থে নগর গড়ে ওঠেনি। মানুষ গ্রামে-গঞ্জে বসবাস করতো। একটি সীমিত শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষা সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে লোকসাহিত্য সৃষ্টির যেসব শর্ত আবশ্যক, বাংলাদেশে সেসব বিদ্যমান ছিল। বাংলার মানুষের ভাষা ছিল, ভাষা প্রকাশের আবেগ, অনুভূতি ছিল। অক্ষর-জ্ঞান না থাকায় মানুষ নিজের সৃষ্টিকে লিপিবদ্ধ করতে পারেনি; মুখের কথা লোকমুখে তুলে দিয়েছে। শ্রুতির আর স্মৃতির উপর নির্ভর করে লোকরচনা এক পুরুষ থেকে অন্য পুরুষে প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে। লোকসাহিত্য এই অর্থেই জনসমষ্টির রচনা। মধ্যযুগের সামন্ত ও ইংরেজ আমলের আধা-সামন্ত সমাজ লোকসাহিত্য সৃষ্টির উপযোগী ক্ষেত্র ছিল বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে এ-সৃষ্টির প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত আছে।…’

উদ্ধৃতিটি একারণেই প্রণিধানযোগ্য যে, এখান থেকেই খুব সংক্ষেপে আমাদের লোকসাহিত্যের মেজাজ, মর্জি ও সৃষ্টি-রহস্যের একটা ধারণা পেয়ে যাই আমরা। আমাদের লোকায়ত ধারায় ও সার্বজনীন রুচিতে অত্যন্ত সাবলীলভাবে মিশে থাকা বাংলা প্রবাদ ও প্রবচনের খুব শক্তিশালী সুস্পষ্ট প্রভাবটিকে আমরা কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। নিত্যদিনের কর্মকোলাহলে তা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ শুরু করলাম কিনা। আসলে তা নয়। এটা ‘পরের ধনে একটু পোদ্দারি’ করে নেয়া আর কি ! তাছাড়া পোদ্দারিটা পরের ধনেই করতে হয়। নইলে নিজের ধনে অন্য কিছু হলে হতে পারে, কিন্তু পোদ্দারি হয় না। কিভাবে ?

এই যে কথাগুলো বললাম, পাঠক হযতো খেয়াল করেছেন, তা বলতে গিয়ে দুটো বিশেষ বাক্যবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে- ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ ও ‘পরের ধনে পোদ্দারি’। এই ছোট্ট দুটো বাক্যবন্ধের বিকল্প হিসেবে যে দীর্ঘ বর্ণনা বা বিবৃতির প্রয়োজন হতো, তাতে করেও বক্তব্য-বিষয়কে কতোটা স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল করা যেতো তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু আবহমান বাঙালির প্রচলিত কিছু প্রবাদ বা প্রবচনের যথার্থ আশ্রয় ও ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সে সীমাবদ্ধতাটুকু নিমেষেই অতিক্রম করা সহজ হয়ে গেছে। দু-চারটা শব্দের এরকম একেকটা বাক্যবন্ধ হাজারটা শব্দের গাথুনির চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী। এগুলোই প্রবাদ ও প্রবচন। এর শক্তিমত্তা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকেনি বলেই আমাদের আবহমান জীবনধারায় তা লোকমুখে যুগের পর যুগ পেরিয়ে বর্তমানে এসেও এর উপযোগিতা একটুও না হারিয়ে পূর্ণ ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে সতত বহমান রয়েছে। মনের ভাব যথার্থরূপে প্রকাশে মুখের ভাষাকে দিয়েছে সমৃদ্ধি। তবে কথায় কথায় প্রবাদ ও প্রবচনের উল্লেখ টানলেও এ দুটোর মধ্যে যে বিস্তর প্রভেদ রয়ে গেছে, তা হয়তো বেশিরভাগ সময়ই আমরা খেয়াল করি না বা পার্থক্য নির্ণয়ের প্রয়োজনও বোধ করি না। উপরোক্ত যে দুটো বাক্যবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে, তার প্রথমটি ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ হচ্ছে প্রবাদ এবং দ্বিতীয়টি অর্থাৎ ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ হচ্ছে প্রবচন।

কেন একটি প্রবাদ আর অন্যটি প্রবচন, এই কৌতুহল নিবৃত্তির প্রয়োজনে আমরা আপাতত গবেষক ওয়াকিল আহমদ-এর পূর্বোক্ত ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’ গবেষণা গ্রন্থের প্রয়োজনীয় সহায়তাটুকু নিতে পারি। ‘প্রবাদ ও প্রবচন’ অংশের বিস্তৃত পরিধির মধ্যে তিনি ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রবাদ ও প্রবচনের শত শত সংগৃহিত নমুনা সংকলন করে এগুলোর আবশ্যকীয় ব্যাখ্যা, বিবেচনা, রূপ ও গঠন-প্রকৃতি নির্ণয় এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে ব্যাপক প্রস্তুতি ও প্রয়াস নিয়েছেন। আমরা নাহয় এর নির্যাসটুকুর দিকেই লক্ষ্য নিবদ্ধ করি।

প্রবাদ নিয়ে ব্যাপক মন্থনের পর তিনি প্রবাদের কতকগুলো বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করেন এভাবে-

০১. প্রবাদ হলো একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বাক্য।
০২. প্রবাদের উদ্ভবে লোকের বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে।
০৩. বাচ্যার্থ নয়, ব্যঞ্জনার্থই প্রবাদের অর্থ। এই অর্থে প্রবাদ রূপকধর্মী রচনা।
০৪. প্রবাদে বুদ্ধির বা চিন্তার ছাপ থাকে।
০৫. সংগীত গান করা হয়, ছড়া আবৃত্তি করা হয়, মন্ত্র বলা হয়, ধাঁধা ধরা হয়, প্রবাদ বাক্যালাপে, বক্তৃতায় অথবা লেখায় প্রসঙ্গক্রমে উচ্চারিত হয়। প্রবাদের স্বাধীন সত্তা আছে, কিন্তু স্বাধীন প্রয়োগ নেই। প্রবাদ বক্তব্যকে তীক্ষ্ণ, যুক্তিকে জোরালো ও প্রকাশকে অর্থবহ করে তোলে।
০৬. প্রবাদের শিকড় ঐতিহ্যে প্রোথিত। ঐতিহ্য থেকে রস সঞ্চয় করে প্রবাদ অর্থপূর্ণ হয় ও ভাষার মধ্যে বহমান থেকে তাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

অর্থাৎ প্রবাদের অবয়ব ক্ষুদ্র হলেও এর একটি বিষয় আছে, অর্থ আছে। বিষয়টি রূপক-সংকেতের ভাষায় শব্দচিত্রে আরোপিত হয়, আর অর্থ হয় ব্যঞ্জিত। ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ এর নিহিতার্থ হলো, সাধারণ এক কাজ করতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক অন্য বড় বিষয়ের অবতারণা করা বা জড়িয়ে যাওয়া। ‘ধান ভানা’ ও ‘শিবের গীত’ দুটি বিপরীতধর্মী বাক্য দ্বারা এই অর্থ প্রকাশ করা হয়েছে। একইভাবে প্রবাদের আরেকটি উদাহরণ টানা যায়- ‘ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে।’ এর নিহিতার্থ হলো, অন্যের কৃতিত্বকে নিজের কৃতিত্ব বলে জাহির করা।

অন্যদিকে প্রবচন বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রবচনের যে বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ধারণ করা হয়, তা হলো-

০১. প্রবচনে জাতির দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার কথা এক বা একাধিক বাক্যে সংহত রূপে প্রকাশিত হয়।
০২. সাধারণ গদ্যে অথবা অন্ত্যমিলযুক্ত ছন্দোবদ্ধ পদ্যে প্রবচন রচিত হয়।
০৩. প্রবচন মূলত বাচ্যার্থনির্ভর; এতে রূপক, প্রতীক, সংকেত, চিত্রকল্পের স্থান নেই।
০৪. প্রবচনের আবেদন প্রত্যক্ষ, সরস ও সহজবোধ্য।
০৫. প্রবাদ অপেক্ষা প্রবচন আকারে-প্রকারে বড় হয়। প্রবাদের অর্থের ধার বেশি, প্রবচনের অর্থের ভার বেশি।
০৬. প্রবচনের বিচিত্র অর্থ ধারণ ও বহন ক্ষমতা আছে। তবে এসব অর্থ একটি কেন্দ্রীয় ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ থাকে।
০৭. প্রবচন রচনায় স্বাধীনতা আছে; এজন্য এতে আবেগ, আনন্দ ও রসের স্থান আছে।

অর্থাৎ প্রবচন বাচ্যার্থনির্ভর; একটি একক বা কেন্দ্রীয় বক্তব্যকে অবলম্বন করে প্রবচন রচিত হয়। অন্ত্যমিল যুক্ত দুটো চরণ নিয়ে প্রধানত প্রবচনের অবয়ব গড়ে উঠে। এতে ছড়ার ছন্দের প্রাধান্য আছে। গদ্যাশ্রিত সরল ও যৌগিক বাক্যের প্রবচনও আছে। ছন্দ, চরণ, অন্ত্যমিল সহযোগে পদ্যের আঙ্গিক পরিলক্ষিত হলেও প্রবচন কবিতা নয়। মূলত শ্রুতিমধুর ও স্মৃতি-সুখকর করার জন্য প্রবচন পদ্যান্বিত হয়ে থাকে। কবিতা-পাঠের আনন্দ প্রবচনে নেই। লেখায়, বক্তৃতায় বা আলোচনায় উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত সময়ে প্রবচন উচ্চারণে আনন্দ নিহিত থাকে। ‘পরের ধনে পোদ্দারি, লোকে বলে লক্ষ্মীশ্বরী।’ এই প্রবচনটিতে কোন ব্যঞ্জনার্থ নিহিত নেই। বরং বাচ্যার্থ বা আরিক অর্থের মধ্যেই প্রবচনের বক্তব্য স্পষ্ট। অন্যের সম্পদ ভোগ-ব্যবহারের মাধ্যমে অহমিকা প্রদর্শনের প্রবণতাকে শ্লেষার্থে এই প্রবচনে সরস উপস্থাপন করা হয়েছে।

গবেষক ওয়াকিল আহমদ সেই চর্যাপদের কাল থেকে ব্যবহৃত প্রবাদ ও প্রবচনের নমুনাসহ আলোচনা করতে গিয়ে এই দুটি ধারার বাইরে আরেকটি ধারা হিসেবে বচন-এর যে মৃদু উল্লেখ করেছেন, তা আলাদাভাবে ব্যাখ্যা বা কোন সুনির্দিষ্ট বিবেচনার প্রয়োজন বোধ করেননি। বরং বচন আর প্রবচনের একাত্মতাই লক্ষ্য করি আমরা। তাঁর সংগৃহিত ও সংকলিত বিপুল সংখ্যক প্রবচনগুলোতে লক্ষ্য করলে জনভাষ্যে চড়ে আসা লোকায়ত ধারার সেইসব প্রবচনগুলোও সংরক্ষিত অবস্থায় দেখতে পাই, যেগুলো ইতোমধ্যে খনার বচন হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে। এবং এখানে এসেই আমাদেরকে আবারো পুরনো প্রশ্নে ফিরে যেতে হয়, তাহলে খনার বচনের প্রকৃত উৎসটা আসলে কোথায় ?

০৪.
‘মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা।’ এই প্রবচনটি উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে লেখাটা শুরু করা হয়েছিলো। এটি পূর্বোক্ত ‘নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা’ প্রকাশনীর ‘খনার বচন’ নামের ক্ষুদ্রাকৃতির বইটিতে মুদ্রিত ০২ ক্রমের উদ্ধৃত বচন। যদিও বইটিতে মুদ্রিত বচনের কোন সংখ্যাক্রম উল্লেখ করা হয়নি, কেবল প্রতি পৃষ্ঠায় একটি করে বচন মুদ্রিত রয়েছে। তবু আলোচনার সুবিধার্থে মুদ্রিত বচনের ধারাবাহিক ক্রমিক অবস্থানকেই ক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই বইয়ে সংকলিত বচনগুলোকে বলা হচ্ছে ‘খনার কৃষি ও ফল সংক্রান্ত বচন’। কিন্তু বচনগুলো যে সত্যিই খনা’র তার কোন উৎসের সন্ধান আমরা বইটি থেকে পাই না।

অন্যদিকে এপ্রিল ২০০৭-এ বইপত্র থেকে প্রকাশিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গবেষক ওয়াকিল আহমদ-এর ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’ গবেষণা গ্রন্থের ‘প্রবাদ ও প্রবচন’ অংশে সংগৃহিত ‘আবহাওয়া ও চাষবাস’ বিষয়ক প্রবচনের ৩৪২ নম্বরে উপরোক্ত প্রবচনটিকেই সংকলিত করা হয়েছে কোন নাম-পরিচয়হীন রচয়িতার লোকায়ত প্রবচন হিসেবে। বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে সংঘটিত অত্যন্ত শ্রমশীল গবেষণাকর্মের কোথাও, যদি কোন ভুল না করে থাকি, খনা নামটি চোখে পড়ে না।

একইভাবে ‘খনার বচন’ বইয়ের ২৪ ক্রমের ‘আমে ধান, তেঁতুলে বান’ বচন ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’ গ্রন্থের ৩৩১ নম্বরে আবহাওয়া ও চাষবাস বিষয়ক লোকায়ত প্রবচন হিসেবে সংকলিত। ৪৫ ক্রমের খনার বচন ‘তিন নাড়ায় সুপারি সোনা,/ তিন নাড়ায় নারিকেল টেনা,/ তিন নাড়ায় শ্রীফল বেল,/ তিন নাড়ায় গেরস্থ গেল।’ ওয়াকিল আহমদ-এর লোকায়ত প্রবচন সংগ্রহে ৩৩৯ নম্বরে সংকলিত। তদ্রূপ ২১ ক্রমের খনার বচন ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ,/ ধন্য রাজা পুণ্য দেশ’ ওয়াকিল আহমদের ৩৪০ নম্বরে এসে একটু আগপর হয়ে সংকলিত হয়েছে ‘ধন্য রাজা পুণ্য দেশ,/ যদি বর্ষে মাঘের শেষ’ হিসেবে। আবার ৩৫ ক্রমের ‘তাল বাড়ে ঝোঁপে, খেজুর বাড়ে কোপে’ খনার বচনটিকে ওয়াকিল আহমদের ৩৩৮ নম্বরে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত রূপে দেখতে পাই- ‘নারিকেল বাড়ে কোপে, তাল বাড়ে ঝোপে’ হিসেবে।

কোথাও কোথাও আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করা যায়। যেমন পূর্বোক্ত ‘খনার বচন’ বইয়ের ৩৮ ও ৭০ ক্রমের বচন দুটো হলো- ‘চৈত্রেতে খর খর,/ বৈশাখেতে ঝড় পাথর,/ জ্যৈষ্ঠতে তারা ফুটে,/ তবে জানবে বর্ষা বটে।’ এবং ‘জ্যৈষ্ঠে খরা আষাঢ়ে ভরা,/ শস্যের ভার সহে না ধরা’। ছেটেছুটে এ দুটো বচনেরই একটি সম্মিলিত রূপ আমরা দেখি ওয়াকিল আহমদের সংগৃহিত ‘আবহাওয়া ও চাষবাসভিত্তিক’ ৩৩৭ নম্বর লোকায়ত প্রবচনটিতে- ‘ চৈতে খর খর, বৈশাখে ঝড়-পাথর / জ্যৈষ্ঠে শুখো, আষাঢ়ে ধারা, / শস্যের ভার না সহে ধরা।’ তবে ফেব্রুয়ারি ২০০১-এ ‘গতিধারা’ থেকে প্রকাশিত ওয়াকিল আহমদের অন্য একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘লোককলা প্রবন্ধাবলি’র ‘বৃষ্টি-আবাহন ও বৃষ্টি-বারণ লোকাচার’ অধ্যায়ের এক জায়গায় আমরা খনার বচনের কথা উল্লেখ পাই এভাবে-

“ খনার বচনে আছে কৃষিকাজের বিবিধ রীতি-পদ্ধতি ও নিয়ম-নির্দেশ। হাল, চাষ, বলদ, ভূমি, বীজ, ফলন, বৃষ্টি, বন্যা, শিলা, ঝঞ্ঝা, মাস, ঋতু প্রভৃতি সম্মন্ধে জ্যোতিষী ব্যাখ্যা এগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়। বৃষ্টি ও আবহাওয়া সম্পর্কে রচিত বচনে সাধারণত বৃষ্টি, বন্যা, খরা, সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী থাকে-

চৈত্রেতে খর খর।
বৈশাখেতে ঝড় পাথর।।
জ্যেষ্ঠেতে তার ফুটে।
তবে জানবে বর্ষা বটে।।

অথবা

শনির সাত মঙ্গলের তিন।
আর সব দিন দিন।।
ভাদুরে মেঘ বিপরীত বায়।
সেদিন বৃষ্টি কে ঘোচায়।।

এই বর্ষা বৃষ্টি হলে কৃষক চাষ করবে, বীজ বুনবে, চারা রোপণ করবে, ফসল ফলাবে। বচনগুলো বাংলার ‘কৃষিদর্শন’।”

এখানে উদ্ধৃত বচন দুটোর উৎস সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- Tamonash Chandra Dasgupta Aspects of Bengali Society, from old Bengali Literature, Calcutta, 1935. p.23 ও পৃ.২৩৩। উল্লেখ্য, প্রথম বচনটি আমাদের পূর্বোক্ত ‘খনার বচন’ বইটির ৩৮ ক্রমে হুবহু উক্ত রয়েছে। তবে দ্বিতীয়টি সেখানে নেই।
হয়তো এভাবে অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে এমন আরো প্রচুর নমুনা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হবে না যে, এক জায়গায় যা গবেষকদের শ্রমলব্ধ সংগ্রহে লোকমুখে প্রচারিত নাম-পরিচয়হীন রচয়িতার লোকায়ত প্রবাদ বা প্রবচন হিসেবে সংগৃহিত হয়েছে, অন্যত্র তা-ই খনার বচন হিসেবে সংকলিত হয়ে আছে কোথাও। এই যেমন গবেষক ওয়াকিল আহমদেরই ‘বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা’ গবেষণা গ্রন্থের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক লোকায়ত প্রবচন সংগ্রহে ৩১৩, ৩১৭ ও ৩১৯ নম্বর প্রবচনগুলো হচ্ছে- ‘উনা ভাতে দুনা বল,/ অতি ভাতে রসাতল।’, ‘ঘোল, কুল, কলা- তিনে নষ্ট গলা।’ এবং ‘তপ্ত অম্ল, ঠাণ্ডা দুধ, যে খায় সে অদ্ভুত’। এগুলোই পূর্বে উল্লেখিত ‘খনার বচন’ বইয়ে যথাক্রমে ৯৫, ৪৮ ও ৭৭ ক্রমে সংকলিত রয়েছে। যদিও শেষোক্ত দুটো বচনকে সামান্য পরিবর্তিত চেহারায় দেখি আমরা এভাবে- ‘ঘোল, কুল, কলা- তিন নাশে গলা।’ এবং ‘তপ্ত অম্ল ঠাণ্ডা দুধ, যে খায় সে নির্বোধ।’ এখানে ‘নষ্ট’ শব্দের জায়গায় ‘নাশে’ এবং ‘অদ্ভুত’ শব্দের বদলে ‘নির্বোধ’ শব্দের প্রতিস্থাপন ঘটলেও বচন-প্রবচনের ভাব বা অর্থের কোন পরিবর্তন ঘটে নি।

এসব ঘটনা থেকে একটা বিষয় হয়তো আমাদের কাছে স্পষ্ট হতে থাকে যে, আমাদের লোকসাহিত্যের অত্যন্ত শক্তিশালী ধারা হিসেবে লোকায়ত প্রবাদ-প্রবচন সংগ্রহ ও সংকলনে আমাদের গবেষকরা যতোটা সাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন, খনার বচনের সম্ভাব্যতা নিয়ে বোধ করি ততোটা নিঃসন্দেহ হতে পারেন নি। তবে এ মন্তব্যকে কোনভাবেই মোক্ষম করার দুঃসাহস দেখানো হচ্ছে না এজন্যেই যে, বর্তমান লেখকের অপরিসীম সীমাবদ্ধতা কোনক্রমেই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার সন্দেহরেখা অতিক্রম করতে পারে নি। তবুও আপাত ধারণা থেকে এরকম প্রশ্নমুখর হওয়াটা হয়তো অসঙ্গত হবে না যে, খনার বচন নামে যে প্রবচনগুলো বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকলিত হয়েছে বা হচ্ছে, তা কি শুধুই শ্রুতিনির্ভর কোনো কিংবদন্তীয় গল্প-কাহিনী বা রূপকথা আশ্রিত কাল্পনিক আবেগ ? না কি এর পেছনে রয়েছে বিলুপ্ত কোন ইতিহাসনির্ভরতা ? ইতিহাসবেত্তা কোন লোক-গবেষকই তা ভালো বলতে পারবেন। প্রকৃত সত্য কী তা নিরসন না হওয়াতক খনা নামের কোন একক ব্যক্তি বা ব্যক্তিনীর অবস্থিতির বিপরীতে আমাদের সন্দেহের আঙুলটা নাহয় খাড়া হয়েই থাকলো।

[২য় পর্বে সমাপ্য]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29111061 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29111061 2010-03-06 12:58:23
| ইয়োগা, সুস্থতায় যোগচর্চা | একটু সুলুক-সন্ধান |
'ইয়োগা, সুস্থতায় যোগচর্চা'

লেখকের জবানবন্দী:
চোখ ফেরালেই ইদানিং সুদেহী মানুষের অভাববোধ ভয়ানক পীড়া দিয়ে উঠে। তারচে’ও প্রকট সুস্থ দেহে সুমনা সত্ত্বার অভাব। আমরা কি দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছি ! সর্বগ্রাসী দুষণের মাত্রাতিরিক্ত সংক্রমণে মানুষের শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখা বাস্তবিকই কঠিন আজ। এ বড় দুঃসহ কাল। শরীরের সাথে মনের যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, তার সূত্র ধরেই নাগরিক সভ্যতায় আজ দিনকে দিন সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার সাথে পাল্লা দিয়ে একদিকে যেমন বেড়ে চলছে মানসিক অস্থিরতা, টেনশন আর অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে অতিদ্রুত ভেঙে পড়ছে সতেজ মনে সুস্থ থাকার ন্যুনতম ভারসাম্যও। এই কঠিন দুঃসময়ে নিজের দিকে একটু ফিরে তাকানোর সময়ও কি হবে না আমাদের !

শহর বন্দর গ্রাম গঞ্জ থেকে একে একে বিলীন হয়ে যাচ্ছে চোখে নিবিড় আদর বুলানো সবুজ বৃক্ষ, বুক ভরে শ্বাস নেয়ার নির্মল বাতাস, বিশুদ্ধ পানীয় জলের স্বচ্ছতা, খেলার মাঠ আর আকাশের উদারতা এবং সুস্থ দেহে বেঁচে থাকার অনিবার্য শর্তগুলো। আমাদের অজান্তেই আমরা যে কতো নীরব ঘাতকের চিহ্ণিত লক্ষ্য হয়ে যাচ্ছি সে খেয়াল কি রাখছি ? সৃজনশীল হওয়া সে তো বহু দূরের কথা। অথর্ব মন আর ভাঙা শরীর নিয়ে এতো সহজ মৃত্যুর দিকে জটিল সব অসুখের ডিপো হয়ে তিলে তিলে ভোগে ভোগে যেভাবে এক দুঃসহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা, সামনে এখন দুটো পথই খোলা। সব কিছু মেনে নিয়ে বাধ্য প্রাণীর মতো একযোগে আত্মহত্যা করা, নয়তো ঘুরে দাঁড়ানো। যিনি আত্মহত্যা করার মৌলিক অধিকারের ঝাণ্ডা উড়িয়ে মার্চপাস্ট করবেন, তাঁর সাথে তো আর কোন হিসাব চুকানোর কিছু নেই। যিনি তাঁর মানবিক সৃজনশীলতাকে অর্থবহ বাঁচিয়ে রাখার জন্যই ঘুরে দাঁড়াতে চান, আসুন আমরা সে চেষ্টাটাই করে দেখি একবার। আর সে চেষ্টা কিছুতেই যাতে বিফলে না যায়, তারই ছোট্ট প্রয়াস এই ‘ইয়োগা, সুস্থতায় যোগচর্চা’ গ্রন্থটি।

স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এটিকে কেবল একটি যোগ-ব্যায়ামের সাধারণ বই মনে করার ভ্রান্তি নিমেষেই কেটে যাবে বইটি একটু উল্টে-পাল্টে দেখলেই। কেননা যোগ-ব্যায়ামের সাধারণ সব বিষয়ের স্বাভাবিক ও বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনের পাশাপাশি একটি মনোদৈহিক প্রায়োগিক দর্শন হিসেবে ‘ইয়োগা’র হাজার বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও ইতিহাস খুঁড়ে পৃথক অধ্যায়ে তুলে আনা হয়েছে আধুনিক ইয়োগার জনক ঋষি পতঞ্জলি’র অষ্টাঙ্গ যোগের সারস্বত বয়ান, যা পাঠককে ইয়োগার সুরম্য গভীরে সাবলীল প্রবেশে সহায়তা করবে । এতে খোঁজা হয়েছে কিভাবে একটি আধ্যাত্ম দর্শন তার প্রায়োগিক উপযোগিতা নিয়ে ধর্ম বর্ণ গোত্র জাতি নির্বিশেষে দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের অনিবার্য সুস্থাকাক্সার এক মনোহর ব্যবহারিক জগতে। মনো-দৈহিক স্বাস্থ্যরহস্যের উৎসমূলেও দৃষ্টি সম্পাতের চেষ্টা করা হয়েছে। সুস্থতার নিমিত্তে প্রাত্যহিক অনুশীলনকে অত্যন্ত কার্যকর ও আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন যোগাসনের বেশ কতকগুলো আসন-বৈচিত্র্য্ও উপস্থাপন করা হয়েছে। বইয়ে সন্নিবিষ্ট বিভিন্ন আসন, মুদ্রা, প্রাণায়াম, ধৌতি ইত্যাদি চর্চা-প্রণালীর সাথে এগুলোর উপকারিতা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতার বিষয়গুলোও সংশ্লিষ্ট আইটেমের বর্ণনায় স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বিরক্তিকর কিছু রোগ ও এর নিরাময়ের উপায় নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। সর্বোপরি আগ্রহী চর্চাকারীদের ব্যবহারিক সুবিধার বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আশা করি এ থেকে সবাই উপকৃত হবেন।

বইয়ের নাম: ইয়োগা, সুস্থতায় যোগচর্চা
বইয়ের ধরন: স্বাস্থ্য ও গবেষণা
লেখক: রণদীপম বসু
প্রকাশক: শুদ্ধস্বর, ৯১ আজিজ সুপার মার্কেট (৩য় তলা), শাহবাগ, ঢাকা।
(ফেব্রুয়ারি’২০১০)
মুদ্রিত মূল্য: ৩৭৫ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৪০
অলংকরণ:
প্রচ্ছদশিল্পী: সব্যসাচী হাজরা

বইটি প্রকাশের পেছনে দেখা অদেখা অনেকের শ্রম ও আন্তরিকতা জড়িয়ে আছে নিঃসন্দেহে। অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে মুক্ত অন্তর্জালিক বিশ্বের তথ্য ভাণ্ডার থেকে শুরু করে ইতিপূর্বের বিভিন্ন দেশি-বিদেশি লেখকের প্রকাশনা যাচাই বাছাই এবং দীর্ঘকালীন ব্যক্তিগত ইয়োগাচর্চা ও অভিজ্ঞতার সর্বোত্তম সমন্বয়ের যথাসাধ্য চেষ্টা এই বই। তাই ইয়োগা-বিশ্বের চেনা-অচেনা সবার প্রতিই আমার সবিশেষ ঋণ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

[মুদ্রিত বইয়ের পাতা আর অন্তর্জালিক পৃষ্ঠায় তফাৎ অনেক, এবং এর উপস্থাপন ও পাফরম্যান্সও ভিন্ন। তবু বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নিতে আগ্রহী হলে এই ইয়োগা-সাইটটি] দেখতে পারেন।

সবার জন্য একটা সুস্থ, সুন্দর ও চমৎকার আগামীর কামনা রইলো। ভালো থাকবেন সবাই।
…]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29101585 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29101585 2010-02-20 13:25:43
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন…|৭১-৮০|
...............................................
[উৎবচনগুচ্ছ : (৭১-৮০)]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————

(৭১)
যে সমাজে গাধার শ্রেষ্ঠ গুণ হলো সে গাধা
আর মানুষের নিকৃষ্ট অপরাধ হচ্ছে সে মানুষ,
সে সমাজ বাঙালির।

(৭২)
প্রকৃতির সবুজ ছোঁয়া থেকে যে যতো দূরবর্তী
সে ততো সভ্য,
বহুতলশীর্ষ ফ্ল্যাটে হয় সভ্যতম মানুষটির বসবাস।

(৭৩)
আজকাল কোন কোন অফিসে ঢুকলে মনে হয়
ভুল করে বুঝি মসজিদেই ঢুকে গেলাম,
জরুরি ফাইলের চাইতে জায়নামাজই অধিক মূল্যবান সেখানে।

(৭৪)
পুলিশের আচরণই বলে দেয় রাষ্ট্রের মানসিক স্বাস্থ্য কেমন।

(৭৫)
যতদিন চাকুরে থাকে ততদিন সে দাস;
অবসরে গেলেই তৎক্ষণাৎ সে পেনশনভোগী এক ব্যবহারযোগ্য দাসীতে পরিণত হয়।

(৭৬)
সেবার সাথে মুনাফার যোগসূত্র মানে
ধর্ষণের মাধ্যমে ধর্ষিতাকে যৌনসুখ দেবার মহত্ত্ব !

(৭৭)
একান্ত সেবক মানে, হয় সে ভণ্ড নয় স্বার্থপর।

(৭৮)
ঝুলন্ত ব্রা’কে পুরুষ দেখে স্তন, নারী ভাবে আব্রু।

(৭৯)
ওকে নিয়ে ঘুরতে যাবার পথ-খরচা না রেখে নিজের জন্য ঔষধ কিনে বোকারা;
অর্থহীন দীর্ঘ জীবনের চাইতে অর্থময় স্বল্প জীবন অনেক বেশি তাৎপর্যময়।

(৮০)
সবাই নিজে নিজে একেকজন সাংঘাতিক নীতিবান মানুষ;
নিজের সাথে বনে না এমন সব নীতিই অনীতি বা দুর্নীতি।


[৬১-৭০] [*][৮১-৯০]
…]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29064480 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29064480 2009-12-23 22:31:15
| ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নোবেল বক্তৃতা |

[১০ ডিসেম্বর ২০০৬ অসলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত নোবেল বক্তৃতা]

‌'দারিদ্র্যকে আমরা জাদুঘরে পাঠাতে পারি'
-মুহাম্মদ ইউনূস
...

মান্যবর রাজা, রাজকীয় মান্যবর, নরওয়ের নোবেল কমিটির মাননীয় সদস্যবৃন্দ, সুধীমণ্ডলী, ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ!

গ্রামীণ ব্যাংক ও আমি নিজে সবচেয়ে মর্যাদাকর পুরস্কার গ্রহণ করতে আজ গভীর সম্মানিত বোধ করছি। এই সম্মানে সম্মানিত হয়ে আমি পরম রোমাঞ্চিত, অভিতূত ও আপ্লুত। নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে সারাটা বিশ্ব থেকে অগুণতি বার্তা আসছে আমার কাছে। কিন্তু যা আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করে, যখন প্রায় প্রতিদিন আমি টেলিফোন পাই গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ গ্রাহক, বাংলাদেশের সেই সুদূর পল্লীজনপদগুলির মানুষের কাছ থেকে, যারা আমাকে জানাতে চান এই মহৎ স্বীকৃতি পেয়ে তারা কতোখানি গৌরববোধ করছেন।

গ্রামীণ ব্যাংকের ৭০ লাখ ঋণগ্রাহক-মালিক সদস্যদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত ৯ নারী প্রতিনিধি এ পুরস্কার গ্রহণের জন্য আমার সাথে অসলোতে এসেছেন। আমি তাদের পক্ষ থেকে এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক-কে মনোনীত করায় ধন্যবাদ জানাই। তাদের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংককে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাদায়ক পুরস্কার দিয়ে তাদেরকে আপনারা অতুলনীয় সম্মানের অধিকারী করেছেন। আপনাদের এ পুরস্কারের সুবাদে বাংলাদেশের ৯ জন গৌরবান্বিত পল্লীনারী এখানে নোবেল প্রাপকের মর্যাদায় আজকের এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে খোদ নোবেল শান্তি পুরস্কারে এক নতুন তাৎপর্য যোগ করেছেন।

গ্রামীণ ব্যাংকের সব ঋণগ্রাহক আজকের দিনটি উদযাপন করছেন তাঁদের জীবনের মহত্তম দিবস হিসেবে। তাঁরা এ অনুষ্ঠান দেখার জন্য আর সবাইকে সাথে নিয়ে গোটা বাংলাদেশের নিজ নিজ গ্রামে তাদের নাগালের সবচে কাছের টিভি সেটটির চারপাশে জড়ো হয়েছেন।

বিশ্বজুড়ে লাখো নারী যারা তাঁদের বেঁচে থাকার ও তাঁদের সন্তানসন্ততির উন্নততর জীবনের জন্য আশার আলো ফোটাতে নিত্য সংগ্রাম করে চলেছেন এ বছরের এ পুরস্কার তাদের সকলকে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদায় সমাসীন করেছে। তাই আজকের এ মুহূর্তটি তাদের জন্য এক ঐতিহাসিক মহামুহূর্ত নিঃসন্দেহে।

দারিদ্র্য শান্তির জন্য হুমকি

ভদ্রমহোদয় ও মহিলাগণ!
শান্তির সাথে দারিদ্র্যের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে - এই ধারণার প্রতি নরওয়ের নোবেল শান্তি কমিটি আমাদেরকে এই পুরস্কার দিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। দারিদ্র্য শান্তির জন্য হুমকি।

বিশ্বব্যাপী আয়ের বণ্টনের ছবি থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। বিশ্বের মোট আয়ের ৯৪ শতাংশ যায় বিশ্বের মাত্র শতকরা ৪০ জনের পকেটে। বাকি শতকরা ৬০ জন বিশ্ব আয়ের মাত্র ৬ শতাংশ দিয়ে জীবন নির্বাহ করে। বিশ্ব জনসমষ্টির অর্ধেকের দৈনিক গড় আয় ২ ডলার। আর প্রায় ১০০ কোটির মতো লোকের দৈনিক আয় এক ডলারেরও কম। এটি আর যা-ই হোক শান্তির জন্য কোনো ফর্মুলা হতে পারে না।

নতুন সহস্রাব্দের সূচনা হয়েছে বিশ্ব পর্যায়ে নতুন মহত্তম স্বপ্ন দিয়ে। ২০০০ সালে বিশ্বনেতারা জাতিসঙ্ঘে একত্রিত হয়ে অন্যান্য বিষযের সাথে ২০১৫ সাল নাগাদ দারিদ্র্য অর্ধেকে কমিযে আনার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মানবেতিহাসে আর কখনও গোটা বিশ্ব সমস্বরে এমন বলিষ্ঠ লক্ষ্য নির্ধারণ করেনি যে লক্ষ্য অর্জনের সময় ও আকার নির্ধারণ করে দেওয়া হযেছে। কিন্তু তারপরই এসেছে ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাস ও ইরাকের যুদ্ধ, আর বিশ্বও সেই সাথে তার এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের চলতি পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। বিশ্ব নেতাদের মনযোগ সরে গেছে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে। ইরাক যুদ্ধে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই খরচ হয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার।

আমি বিশ্বাস করি, সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জয় আর যা-ই হোক হবার নয়। সবচেয়ে বলিষ্ঠ ভাষায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে হবে। আমাদের অবশ্যই একসাথে দাঁড়াতে হবে এর বিরুদ্ধে আর এর অবসানে সব রকমের উপায় আমাদের সন্ধান করতে হবে। সন্ত্রাসের চির অবসানের জন্য আমাদেরকে এর মূল কারণগুলি খুঁজে বের করতেই হবে। আমি বিশ্বাস করি, অস্ত্রের পেছনে অর্থ অপচয়ের চেয়ে গরিব মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে সম্পদ নিয়োগ করাই অধিকতর উন্নত নীতিকৌশল।

দারিদ্র্যের অর্থ সকল মানবাধিকার থেকে বঞ্চনা

শান্তিকে উপলব্ধি করতে হবে মানবিক তাৎপর্যে --- সুপরিসর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ন্যায়সঙ্গত না হলে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার না থাকলে পরিবেশের অবক্ষয় ঘটলে শান্তি হুমকির মুখে পড়ে।

কোনো রকম মানবাধিকার না থাকার অর্থই হলো দারিদ্র্য। চরম দারিদ্র্যজনিত হতাশা, বৈরিতা ও ক্ষোভে কোনো সমাজে শান্তি টেকসই হতে পারে না। তাই স্থায়ী শান্তির জন্য আমাদেরকে অবশ্যই মানুষ যাতে একটা সুন্দর জীবনযাপন করতে পারে সেজন্য তাদের সুযোগ করে দিতে হবে।

দরিদ্রদ্রের নিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টি। তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করাই আমাদের সকল কাজের মর্ম বলেই গত ৩০ বছরে আমাদের সকল প্রয়াস সে কাজেই নিবেদিত রেখেছি।

গ্রামীণ ব্যাংক

নীতিপ্রণেতা কিংবা কোনো গবেষক নয়, আমার চারপাশ ঘেরা দারিদ্র্যের কারণেই আমি দারিদ্র্য ইস্যু নিয়ে কাজ করতে মাঠে নেমেছিলাম। তারপর সে কাজ থেকে আর ফেরা হয়নি। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে তখন ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ ও আকাল চলছে। এ পটভূমিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে অর্থনীতিশাস্ত্রের সূক্ষ্ম তত্ত্বগুলি পড়ানো আমার কাছে কঠিন মনে হলো। হঠাৎ ধারণা হলো নিদারুণ
ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের মোকাবেলায় আমার কাছে অর্থনীতির এ সব তত্ত্ব নিতান্তই অন্তঃসারশূন্য। আমি আমার আশপাশের মানুষকে, এমনকি মাত্র একজনকে একটি দিনের জন্যও একটু স্বস্তি দিতে আশু সাহায্য করতে চাচ্ছিলাম। আর এরই ফলে আমি মুখোমুখি হলাম দরিদ্র মানুষগুলির সামান্যতম টাকাপয়সা দিয়ে সহায়তা করতে যারা কোনোও রকমে বেঁচে থাকার জন্য লড়ে চলেছে। গ্রামের এক নারীকে দেখলাম মহাজনের কাছ থেকে এক ডলারের কম পরিমাণ টাকা কর্জ করছে এই কঠিন শর্তে যে ঐ নারী হাতে যেসব পণ্য তৈরি করে সেগুলি মহাজন তার নিজের নির্ধারিত দামে কিনে নেবার অধিকারী হবে। আমি এটা লক্ষ্য করে মর্মাহত হলাম যে বাস্তবিকপক্ষেই এটাতো শ্রমদাস বা শ্রমদাসী কেনার মতো মধ্যযুগীয় বর্বর ব্যবস্থা।

আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয ক্যাম্পাসের পাশের গ্রামেই এই মহাজনী কর্জ ব্যবসার শিকার সকলের একটা তালিকা তৈরি করলাম আমি।

তালিকাটা তৈরি হলো ৪২ জনকে নিয়ে। ওরা কর্জ নিয়েছে মোট ২৭ ডলারের সমান টাকা। আমি আমার নিজের পকেট থেকে ঐ টাকাটা ওদেরকে দিলাম যাতে ওরা মহাজনের কবল থেকে রক্ষা পায। আমার এই সামান্য কাজে তাদের মাঝে যে আলোড়ন আমি লক্ষ্য করলাম তাতে আমি এ কাজে আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়লাম। যদি এতো সামান্য অর্থ দিয়ে এতোগুলি মানুষকে এতো সুখী করতে পেরে থাকি তাহলে একাজটাই আরও বেশি করে কেন নয়?

এ কাজটাই আমি তখন থেকে করে আসছি। এ পর্যায়ে আমি প্রথমেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটা ব্যাংক-কে এই গরিব লোকগুলিকে ঋণ দেবার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করলাম। কাজ হলো না। ব্যাংক বললো, দরিদ্ররা ঋণ দেবার মতো আস্থাযোগ্য নয়। কয়েক মাস ধরে সকল প্রয়াস ব্যর্থ হবার পর আমি ঐ গরিবলোকগুলি ব্যাংক থেকে যে টাকা ধার নেবে তার জামিনদার হবার প্রস্তাব দিতে টাকাটা অবশেষে পাওয়া গেলো। এরপর যে ফল পাওয়া গেলো তা একেবারেই অভাবিত, আমি রীতিমতো অবাক হলাম। ঐ গরিব লোকগুলি যতোবারই ঋণ নিক না কেন ততোবারই যথাসময়ে তাদের ঋণ পরিশোধ করলো। এতোকিছুর পরেও কিন্তু ব্যাংকের মাধ্যমে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের কাজে নানা রকমের সমস্যা চলতেই থাকলো। আমি তাই তখন দরিদ্রদের জন্য আলাদা একটা ব্যাংক গড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আর এতে শেষ পর্যন্ত সাফল্য এলো ১৯৮৩ সালে। আমি এ ব্যাংকের নাম দিলাম গ্রামীণ ব্যাংক।

আজ গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশের ৭৩ হাজার গ্রামের প্রায় ৭০ লাখ দরিদ্র মানুষকে ঋণ দিচ্ছে যাদের শতকরা ৯৭জনই নারী। গ্রামীণ ব্যাংক কোনোরকম বন্ধক/জামানত ছাড়াই গরিব পরিবারগুলিকে আয়বর্ধক, গৃহনির্মাণ, পড়াশোনা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে ঋণ দিয়ে থাকে। আর এর সাথে রয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক সদস্যদের জন্য সঞ্চয়, পেনশন তহবিল ও বীমার নানারকমের আকর্ষণীয সুযোগসুবিধা। ১৯৮৪ সালে প্রবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের গৃহঋণের অর্থ কাজে লাগিয়ে ৬ লাখ ৪০ হাজার গৃহ নির্মাণ করা হযেছে। আর এসব বাড়ির আইনি মালিকানা হলো নারীদের। আমরা নারীদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছি এ কারণে যে আমরা দেখেছি নারীদের ঋণ দিলে তাতে সবসময় তাদের পরিবার সবচে বেশি উপকার পেয়েছে।

সামগ্রিকভাবে ব্যাংক মোট প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের সমমূল্যমানের ঋণ দিযেছে। এ ঋণ পরিশোধের হার ৯৯%। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়মিতভাবে মুনাফা করে থাকে। আর্থিক দিক থেকে এ ব্যাংক স্বনির্ভর, ১৯৯৫ থেকে একে কোনো দাতার টাকা নিতে হয়নি। এখন গ্রামীণ ব্যাংকের আমানত ও নিজ সম্পদের হার তার সকল বকেয়া ঋণের ১৪৩ শতাংশ। গ্রামীণ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের ঋণগ্রাহকদের শতকরা ৫৮ জন দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছেন। অর্থাৎ আর তারা দরিদ্র হিসেবে গণ্য নন।

গ্রামীণ ব্যাংকের জন্ম একটা অতি ছোট্ট দেশজ প্রকল্প হিসেবে যার কর্মপরিচালনায় ছিল আমার কিছু ছাত্রছাত্রী। এরা সবাই স্থানীয় যাদের তিনজন এখনও গ্রামীণ ব্যাংকে আমার সাথেই রয়েছে এ কয় বছর যাবত। এ প্রতিষ্ঠানের এখন শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে আমার সঙ্গে আজ এখানে উপস্থিত রয়েছে আপনারা আমাদেরকে যে সম্মাননায় সম্মানিত করেছেন তাতে অংশীদার হতে।

গ্রামীণ ব্যাংকের ধারণার সূচনা বাংলাদেশের একটা ছোট্ট গ্রাম জোবরায়। আজ সে ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের চারদিকে। প্রায় প্রতিটি দেশেই এখন গ্রামীণ মডেলের কার্যক্রম রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রজন্ম

৩০ বছর আগে আমাদের যাত্রা শুরু। আমাদের যারা ঋণগ্রাহক তাদের সন্তানদের জীবনে আমাদের কাজের কী প্রভাব পড়েছে তা আমরা বরাবর পর্যবেক্ষণে রেখেছি। যে সব নারী আমাদের ঋণগ্রাহক তারা তাদের সন্তানদের বেলায় সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই নারীরা ১৬টি সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করে অনুসরণ করে আসছে তাদের নিজ কল্যাণে। এ সব সিদ্ধান্তের একটি ছিল তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানোর। গ্রামীণ ব্যাংকের উৎসাহে অচিরেই এ সব নারীর সন্তানেরা বিদ্যালয়ে যেতে শুরু করে। আর এ সব ছেলেমেয়েদের অনেকেই তাদের ক্লাসে সেরা ছাত্রছাত্রী হয়ে ওঠে। আমরা তাদের এ সাফল্য ও কৃতিত্ব উপযাপনের লক্ষ্যে প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমরা স্কলারশিপ প্রবর্তন করি। গ্রামীণ ব্যাংক এখন প্রতি বছর ৩০ হাজার স্কলারশিপ দেয়।

এসব ছাত্রছাত্রীর অনেকে উচ্চশিক্ষার স্তর পেরিয়ে ডাক্তার, প্রকৌশলী, কলেজ শিক্ষক ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত হয়েছে। গ্রামীণ ছাত্রছাত্রীরা যাতে তাদের উচ্চশিক্ষা স্বাচ্ছন্দ্যে সমাপ্ত করতে পারে সেজন্য ছাত্রঋণ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে। এদের অনেকে এখন পিএইচডিধারী। ১৩ হাজার ছাত্রছাত্রী এই ঋণের সুবিধে নিয়েছে। আর বছরে এ সংখ্যার সাথে যোগ হচ্ছে ৭০০০-এরও বেশি করে।

আমরা গড়ে তুলছি সম্পূর্ণ এক নতুন প্রজন্মের নাগরিক, যারা তাদের পরিবারকে দারিদ্রের নাগাল থেকে দূরে সরানোর মতো যোগ্যতার অধিকারী হবে। আমরা দারিদ্র্যের ঐতিহাসিক নিরবচ্ছিন্নতা ভাঙতে চাই।

ভিখারীরা হতে পারে ব্যবসায়ী

ক্ষুদ্রঋণ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের শতকরা ৮০টি দরিদ্র পরিবারের নাগালে পৌঁছে গেছে। আমরা আশা করছি ২০১০ সাল নাগাদ দেশের শতকরা ১০০টি পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে।

তিনবছর আগে আমরা প্রধানত ভিখারীদের নিয়ে একটা একান্ত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এক কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো বিধিবিধান এদের মানতে হয় না। তাদেরকে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হয়। তারা তাদের সাধ্য অনুযায়ী যে কোনো অঙ্কের টাকা যখন তাদের সুবিধা হয় পরিশোধ করতে পারে। আমরা তাদের আইডিয়া দিয়েছিলাম : তারা বাড়ি বাড়ি তো ভিক্ষা করতে যায়ই। তাই যখন তারা ভিক্ষা করতে যায় সঙ্গে করে কিছু হালকা খাবার, খেলনা বা গৃহসামগ্রী নিয়ে যেতে পারে বিক্রির পণ্য হিসেবে। আইডিয়াটা বেশ কাজে লেগে যায়। আমাদের এই কার্যক্রমের আওতায় ৮৫ হাজার ভিখারী রয়েছে। এদের পাঁচ হাজার ইতিমধ্যেই ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের আর অন্তত ভিক্ষা করতে হয় না। এই ভিখারীদের গড়ে ১২ ডলারের সমান টাকার ঋণ দেওয়া হয়।

আমরা কল্পনাযোগ্য সকল উপায়ে দরিদ্রদেরকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামে উৎসাহিত ও সাহায্য সহায়তা করে থাকি। আমরা অন্য সকল উপায়ের সাথে সবসময় ক্ষুদ্রঋণের পক্ষে প্রচার করি এই যুক্তি দেখিয়ে যে অন্য যে সব উপায়ে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই চলে তাতে এটি আরও বেশি সুফল আনতে সহায়ক হয়।

দরিদ্রদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) গোটা দুনিয়াকে দ্রত বদলে দিচ্ছে। যোগাযোগে দূরত্ব লোপ পাচ্ছে, দেশ-বিদেশের সীমারেখা মুছে গিয়ে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের নতুন এক জগত গড়ে উঠছে। যোগাযোগের খরচ কমে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তি যদি দরিদ্রদের চাহিদা মেটাতে তাদের নাগালে আনা যায় আমার ধারণা তাদের জীবন বদলে ফেলার একটা সুযোগ মিলবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে দরিদ্রদের নাগালে নিয়ে আসার পয়লা ধাপ হিসেবে আমরা একটা মোবাইল বা সেলফোন কোম্পানি গড়ে তুলি যার নাম গ্রামীণ ফোন। গ্রামে ফোন করার সেবা দিয়ে আয় করার জন্য আমরা দরিদ্র নারীদেরকে মোবাইল ফোন কেনার জন্য গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাদেরকে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করি। আমরা ক্ষুদ্রঋণ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মধ্যে সুন্দর একটা ফলদায়ক যোগাযোগ লক্ষ্য করেছি।

এই ফোনের ব্যবসাটা দারুণ সাফল্য লাভ করে। এ ব্যবসাটা গ্রামের যারা ক্ষুদ্রঋণ নেয় তাদের জন্য রীতিমতো লোভনীয় উদ্যোগ ব্যবসা হয়ে ওঠে। এ ভাবে পল্লী জনপদে যে সব নারী মোবাইল ফোনের সেবা দেওয়ার ব্যবসায় নেমেছে “টেলিফোন লেডি” হিসেবে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ে। এই টেলিফোন লেডিরা দ্রুত এ ব্যবসার নাড়ীনক্ষত্র আয়ত্ত্ব করে, নতুন নতুন উদ্ভাবনী প্রতিভার পরিচয় দেয় এই ব্যবসায়ে। এমনি করে টেলিফোন ব্যবসা দ্রুত দারিদ্র্য থেকে মুক্তি ও সমাজে মর্যাদা লাভের উপায় হয়ে ওঠে। আজকে বাংলাদেশে এরকম টেলিফোন লেডির সংখ্যা ৩ লাখ যারা বাংলাদেশের সকল গ্রামে টেলিফোন সার্ভিস দিচ্ছে। গ্রামীণ ফোনের গ্রাহক সংখ্যা এখন এক কোটির বেশি। দেশে এটিই বৃহত্তম মোবাইল টেলিফোন কোম্পানি। টেলিফোন লেডিরা গ্রামীণ ফোনের এই মোট গ্রাহক সংখ্যার একটা সামান্য অংশ হলেও তারা কিন্তু কোম্পানির মোট রাজস্বের ১৯ শতাংশের জোগানদার। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ডের মোট নয় সদস্যের যে আট সদস্য আজকের এ মহতী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন তাদের চারজনই টেলিফোন লেডিদেরই প্রতিনিধি।

গ্রামীণ ফোন নরওয়ের টেলিনর ও বাংলাদেশের গ্রামীণ টেলিকম-এর এক যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি। টেলিনর এ কোম্পানির ৬২ শতাংশ শেয়ারের মালিক আর গ্রামীণ টেলিকমের মালিকানা হলো ৩৮ শতাংশের। আমাদের পরিকল্পনা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্রামীণ ব্যাংকের দরিদ্র নারীদেরকে সিংহভাগের মালিকানা দিয়ে এ কোম্পানিকে একটা সামাজিক ব্যবসায়ে রূপান্তরিত করা হবে। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছি। কোনোও একদিন গ্রামীণ ফোন দরিদ্রদের মালিকানায় আরও এক বিরাট উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে যাবে।

মুক্তবাজার অর্থনীতি

মুক্তবাজার পুঁজিবাদে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। দাবি করা হয় মুক্তবাজার যতো মুক্ত হবে কি, কেমন করে ও কার জন্য - এ প্রশ্নগুলির সমাধানেও পুঁজিবাদের ফলও ততো ভালো হবে। আরও দাবি করা হয়, ব্যক্তি পর্যায়ে লাভের জন্য ব্যক্তির অন্বেষণ সমষ্টিপর্যায়ে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সুফল নিয়ে আসবে।

আমি বাজারের স্বাধীনতা জোরদার করার পক্ষে। আর একই সময়ে আমি বাজারে যে সব শক্তি কাজ করে সে সবের ওপর ধারণামূলক বিধিনিষেধ আরোপের একান্ত বিরোধী। এর উৎপত্তি হলো এই অনুমানে যে উদ্যোক্তারা একমাত্রিক মানুষ বিশেষ যারা তাদের ব্যবসায় জীবনে একটিমাত্র মিশনে নিবেদিত। বলাবাহুল্য সেটি হলো মুনাফা সর্বাধিক করা। পুঁজিবাদের এই ব্যাখ্যা উদ্যোক্তাদেরকে তাদের জীবনের সকল রাজনৈতিক, আবেগীয়, সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও পরিবেশগত দিকমাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সম্ভবত এটি করা হয় এক যুক্তিনির্ভর সরলীকরণ হিসেবে। কিন্তু তাতে মানব জীবনের একান্ত নির্যাসকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়েছে।

মানুষ এক অপূর্ব সৃষ্টি যার সত্তায় মিশে আছে অনন্ত মানবীয় গুণ ও সামর্থ। আমাদের গড়া তত্ত্বগুলিতে তাই এসব মানবীয় গুণের কুসুমকলি ভাববাচ্যে দূরে না সরিয়ে রেখে প্রস্ফুটিত করার ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্ত থাকা উচিত।

মুক্তবাজারে ভূমিকাপালকদের ওপর এ বিধিনিষেধই বিশ্বের বহু সমস্যার কারণ। পৃথিবীর মোট জনসমষ্টির অর্ধেকই হতদরিদ্র। কিন্তু তাদের এই সমস্যার সমাধান বিশ্ব করেনি। স্বাস্থ্য পরিচর্যার সুবিধা বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নাগালে নেই। সবচে সমৃদ্ধ ও মুক্তবাজার রয়েছে এমন দেশও তাদের জনসংখ্যার পঞ্চমাংশের স্বাস্থ্য পরিচর্যার সুবিধা দিতে পারেনি।

মুক্তবাজারের সাফল্যে আমরা এতোই চমৎকৃত যে আমরা আমাদের মৌলিক ধারণাগুলির ব্যাপারে কোনোরকম সংশয় প্রকাশ করতেও কখনও সাহস পাইনি। ব্যাপারটা আরও জঘন্য করে তোলার জন্য আমরা বরং যতোটা পারা যায় আমাদের নিজেদেরকে তাত্ত্বিক নিরিখে একমাত্রিক মানুষে রূপান্তরিত করার জন্য বাড়তি খাটুনি খেটেছি যাতে করে মুক্তবাজার কার্যব্যবস্থা সাবলীল কাজ করতে পারে।

‘উদ্যোক্তা’র একটা বিস্তৃততর সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করে আমরা মুক্তবাজারের চৌহদ্দির মধ্যে পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে আমরা বিশ্বের বহু অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান করতে পারি। মনে করুন, একজন উদ্যোক্তার প্রেরণার একক উৎসের (যেমন, সর্বাধিক মুনাফা করা) বদলে দুটি উৎস রয়েছে এবং এ দুই উৎস আবার পরস্পর বিরোধী অথচ সমান বাধ্যবাধকতাসম্পন্ন --- ক) সর্বাধিক মুনাফা করা ও খ) মানুষ ও জগতের কল্যাণ সাধন।

এখন এ দুয়ের প্রতিটি প্রেরণা একটি পৃথক ধরনের ব্যবসা অভিমুখী। আমরা প্রথম ধরনের প্রেরণাকে বলবো মুনাফা সর্বাধিকারক ব্যবসা আর দ্বিতীয় ধরনের ব্যবসাকে বলবো সামাজিক ব্যবসা।

এই সামাজিক ব্যবসা হবে বাজারে প্রবর্তিত নতুন একধরনের ব্যবসা যার উদ্দেশ্য পৃথিবীকে বদলে দেওয়া। এই সামাজিক ব্যবসায় বিনিযোগকারীরা তাদের বিনিয়োজিত পুঁজি ফিরে পেতে পারবে কিন্তু কোম্পানি থেকে কোনো মুনাফা নিতে পারবে না। বরং মুনাফা ফিরে যাবে কোম্পানিতে যা দিয়ে ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটবে আরও দূরবর্তী এলাকায় আর সেই সাথে পণ্য বা সেবার মান আরও উন্নত হবে। এ ধরণের সামাজিক ব্যবসায় হবে লোকসান ও মুনাফাবিহীন কোম্পানি।

আমাদের প্রস্তাবিত সামাজিক ব্যবসা আইনে স্বীকৃত। বহু কোম্পানি রয়েছে যারা তাদের মূল ব্যবসায় তৎপরতা ছাড়াও সামাজিক ব্যবসা গড়তে এগিয়ে আসবে। মুনাফাবিহীন খাতের বহু কর্মীও এটিকে আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করবেন। মুনাফাবিহীন খাতে যেখানে প্রতিষ্ঠানকে তার কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাবার জন্য চাঁদা সংগ্রহ করতে হয় সেখানে সামাজিক ব্যবসা হয় স্বনির্ভর আর সেই সাথে সম্প্রসারণের প্রয়োজনে উদ্বৃত্ত তৈরি করতে পারে কেননা, এটা মুনাফাবিহীন উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান। সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তার পুঁজি সংগ্রহের জন্য তার নিজস্ব নতুন ধরনের মুলধন বাজারে যাবে।

বিশ্ব জুড়ে, বিশেষ করে বিত্তবান দেশগুলির যুবক-তরুণেরা সামাজিক ব্যবসার ধারণাকে অত্যন্ত আবেদনময় বলেই দেখবেন এ কারণে যে এ ব্যবসা তাদেরকে তাদের সৃষ্টিধর্মী প্রতিভা কাজে লাগিয়ে অনেক কিছু বদলে দেবার চ্যালেঞ্জ নেবার আমন্ত্রণ জানায়। আজকের বহু তরুণ-তরুণী বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বে কোনো অর্থবহ, রোমাঞ্চকর চ্যালেঞ্জ নেবার সুযোগ দেখতে পায় না বলে হতাশায় ভোগে। অথচ এর পাশাপাশি সমাজতন্ত্র তাদের লড়াই করার স্বপ্ন দেখায়। তরুণেরা তাদের একান্ত নিজের নিটোল, নিখুঁত এক বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখে।

সামাজিক ব্যবসা বিশ্বের প্রায় সকল আর্থসামাজিক সমস্যার প্রতিকার দেবে। কেবল চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবসায়ের উদ্ভাবনীমূলক মডেল তৈরি করে তা সাশ্রয় ও কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে বাঞ্ছিত সামাজিক সুফল নিয়ে আসা। দরিদ্রের জন্য স্বাস্থ্য পরিচর্যা, তথ্য প্রযুক্তি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, বিপণন ও নবায়নযোগ্য ইন্ধনশক্তি - এ সবই হলো সামাজিক ব্যবসার রোমাঞ্চকর কর্মক্ষেত্র।

সামাজিক ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, এ ব্যবসা মানবজাতির অতীব গুরুত্ববহ বিষয়গুলির সুরাহা করে। বিশ্বের মোট জনসমষ্টির যে ৬০ শতাংশ দারিদ্র্যরেখার নিচে অবহেলিত রয়ে গেছে এ ব্যবসা তাদের জীবনের খোলনলচে বদলে দিতে পারে। তাদেরকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে সহাযতা করতে পারে।

গ্রামীণের সামাজিক ব্যবসা

এমনকি সর্বাধিক মুনাফাকারী কোম্পানিগুলিকে পরিকল্পিত উপায়ে সামাজিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করা যায়। এটা করা যায় ঐ কোম্পানিতে গরিবদের পূর্ণ বা সিংহভাগের মালিকানা দিয়ে। এ হলো দ্বিতীয় ধরনের সামাজিক ব্যবসায় কোম্পানির দৃষ্টান্ত। গ্রামীণ ব্যাংক সামাজিক ব্যবসার এই শ্রেণীভুক্ত।

দরিদ্র মানুষ এসব কোম্পানির শেয়ার দাতাদের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পেতে পারে অথবা তারা তাদের নিজের টাকা দিয়ে এসব কোম্পানির শেযার কিনতে পারে। ঋণগ্রাহকরা তাদের নিজের টাকা দিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের শেয়ার কিনেছে। তাদের এ শেয়ার যারা ঋণগ্রাহক নয় তাদের কাছে হস্তান্তরযোগ্য নয়। পেশাদার ও নিবেদিতপ্রাণ একদল লোক এ ব্যাংকের দৈনন্দিন কর্মতৎপরতা পরিচালনার কাজ করে থাকে।

দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় দাতারা সহজেই এ ধরনের সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যখন কোনো দাতা কোনো গ্রহীতা দেশে কোনো সেতু নির্মাণের জন্য কোনো ঋণ বা মঞ্জুরি দেয় তখন ঐ দাতা স্থানীয় দরিদ্রদের মালিকানায একটা সেতু কোম্পানি গঠন করতে পারে। আর এ কোম্পানি পরিচালনার দাযিত্ব দিতে হবে একটি অঙ্গীকারাবদ্ধ কোনো ব্যবস্থাপনা কোম্পানিকে। এ কোম্পানির যে মুনাফা হবে তা স্থানীয় মালিক দরিদ্র মানুষগুলি মুনাফা হিসেবে ও আরও সেতু নির্মাণের অর্থ জোগানোর কাজে ব্যয় হবে। এভাবে বহু অবকাঠামো প্রকল্প যেমন, সড়ক, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, উপযোগ কোম্পানি এভাবে গড়ে তোলা যায়।

গ্রামীণ প্রথম ধরনের দুটি সামাজিক ব্যবসা গড়ে তুলেছে। এর একটা হলো দই তৈরির কারখানা বা য়োগার্ট কারখানা। এ কারখানায় পুষ্টিমান যুক্ত দই তৈরি হবে অপুষ্টির শিকার দরিদ্র শিশুদের জন্য। এ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হচ্ছে ফ্রান্সের ডানোনের সাথে যৌথ উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে। বাংলাদেশে অপুষ্টিপীড়িত সকল শিশুর কাছে এই দই না পৌঁছানো অবদি এই ফ্যাক্টরির সম্প্রসারণ চলবে। এই ব্যবস্থার আওতায় আরেকটি চেইন প্রতিষ্ঠান হবে চক্ষু হাসপাতাল। এ সব হাসপাতালের প্রতিটিতে বছরে ১০ হাজার চোখের ছানির অস্ত্রোপচার করা হবে। তবে এর জন্য খরচ ধরা হবে ধনী-গরিব ভিত্তিতে বিভিন্ন অঙ্কে।

সামাজিক স্টকমার্কেট

সামাজিক ব্যবসাগুলির সাথে বিনিযোগকারীদের যোগাযোগ করিয়ে দেবার জন্য আমাদের দরকার সামাজিক স্টক বাজার গড়ে তোলা যেখানে কেবল সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির স্টক-শেয়ারের বেচাকেনা চলবে। এই স্টক এক্সচেঞ্জে বিনিয়োগকারী আসবেন কোনো সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তহবিল জোগানোর স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে। এক্সচেঞ্জেও অনুরূপ উদ্দেশ্য থাকবে। আর যদি কারও নিছক টাকা বানানোর ইচ্ছে থাকে তাহলে তিনি এখনকার স্টক এক্সচেঞ্জে যাবেন।

সামাজিক স্টক এক্সচেঞ্জগুলির যথাকর্ম পরিচালনা নিশ্চিত করার জন্য আমদের কিছু রেটিং এজেন্সি স্থাপন করা, পরিভাষাসমূহ প্রমিত করা, সংজ্ঞা নির্ধারণ করা, প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করা, প্রতিবেদন ফর্ম্যাট গড়ে তোলা এবং দ্য ওয়াল স্ট্রিট জর্নালের মতো নতুন অর্থনৈতিক প্রকাশনা প্রকাশের ব্যবস্থা করার দরকার হবে। এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠা করতে হবে বিজনেস স্কুলের মতো বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার ওপর কোর্স ও ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে তরণ ব্যবস্থাপক প্রশিক্ষণের জন্য। শিক্ষার্থীরা এখানে সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে দক্ষতার সাথে ব্যবস্থাপনা শিখবেন। সর্বোপরি, এ সব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের নিজেদেরকে একেক জন সামাজিক ব্যবসা উদ্যোক্তা হবার প্রেরণা দেবে।

বিশ্বায়নে সামাজিক ব্যবসায়ের ভূমিকা

আমি বিশ্বায়নের সমর্থক। আমি বিশ্বাস করি দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যান্য বিকল্পের তুলনায় বিশ্বায়ন গরিবদের বরং ঢের বেশি উপকার করতে পারে। তবে বিশ্বায়ন হতে হবে যথার্থ ধরনের বিশ্বায়ন। আমার ধারণায় বিশ্বায়ন হলো শত লেনযুক্ত একটা জনপথের মতো কিছু যা সারা বিশ্বের ওপর দিয়ে চলে গেছে। যদি আমরা ধরে নিই, এ সড়ক সকলের জন্য খোলা তাহলে এর লেনগুলির নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলির কাছ থেকে নেবে বিশাল আকারের ট্রাকসমূহ। এই মহাসড়ক থেকে বাংলাদেশী রিকশাগুলি তুলে দেওয়া হবে। আর সকলের জন্য লাভজনক বিশ্বায়নের লক্ষ্যে এ বিশ্ব মহাসড়কের জন্য আমাদের অবশ্যই ট্রাফিক আইন, ট্রাফিক পুলিশে ও ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ থাকতে হবে যা দরিদ্র্যদের জন্য এ ব্যবস্থায় একটা জায়গা ও কর্মতৎপরতার ব্যবস্থা নিশ্চিত থাকবে যাতে তারা সবলদের কনুইয়ের ঠেলায় মহাসড়ক থেকে ছিটকে না পড়ে। বিশ্বায়নকে আর যা-ই হোক আর্থসাম্রাজ্যবাদে পর্যবসিত হওয়া চলবে না।

শক্তিশালী বহুজাতিক সামাজিক ব্যবসায়ও গড়ে তোলা যেতে পারে দরিদ্র মানুষ ও দেশগুলির জন্য বিশ্বায়নের সুবিধা নিশ্চিত করতে। সামাজিক ব্যবসা হয় গরিবদেরকে তাতে মালিকানা দেবে নয় এ ব্যবসায় লব্ধ মুনাফা দরিদ্র দেশের মধ্যেই রাখবে যেহেতু এ সব প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য মুনাফা নেওয়া নয়। যদি বিদেশী সামাজিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সরাসরি অন্য কোনো দেশে পুঁজি বিনিযোগ করে তাহলে যে দেশে এই বিনিয়োগ হচ্ছে সে দেশটির জন্য রীতিমতো এক রোমাঞ্চকর সুসংবাদ। লুটেরা কোম্পানিগুলির কবলমুক্ত থেকে ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে দরিদ্রদেশগুলির মজবুত অর্থনীতি গড়া হবে সামাজিক ব্যবসার প্রধান আগ্রহের ক্ষেত্র।

আমরা যা চাই তা সৃষ্টি করি

আমরা যা চাই বা যা আমরা প্রত্যাখ্যান করি না তা আমরা পেয়ে থাকি। আমরা এ বাস্তবতা মেনে নিয়েছি যে সবসময়ই দারিদ্র্য আমাদের ঘিরে থাকবে, দারিদ্র্য মানব নিয়তিরই অঙ্গ। ঠিক এ কারণেই আমরা আমাদের চারপাশে দরিদ্রদের নিয়েই আছি, থাকি, থাকবো। আমরা যদি স্থির বিশ্বাসে মনে করে থাকি দারিদ্র্য আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, দারিদ্র্য কোনো সভ্যসমাজের অঙ্গ নয় তাহলে আমাদের উচিত ছিল দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়ার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা ও নীতি প্রণয়ন করা।

আমরা চাঁদে যেতে চেয়েছিলাম, মানুষ চাঁদে পা রেখেছে। আমরা যা চাই তা পেতে পারি। আমরা যদি কোনো কিছু অর্জন না করে থাকি তাহলে সেটা তা হয়নি এজন্য যে আমরা সে বিষয়ে মনোনিবেশ করিনি। আমরা যা চাই তা গড়ি।

আমাদের মানসিকতা কি তার ওপর নির্ভর করে আমরা যা চাই তা কেমন করে পাবো। মানসিকতার ছাঁচ একবার তৈরি হয়ে গেলে সেটা বদলানো খুবই কঠিন। আমাদের জগত আমাদের মানসিকতা অনুযায়ী গড়ে ওঠে। আমাদের পটভূমি, আমাদের মানসিকতার গড়ন জ্ঞানবৃদ্ধির সাথে সাথে দ্রুত বদলানোর, নতুন করে গড়ার জন্য আমাদের পথ ও উপায় বের করতে হবে। আমরা যদি আমাদের মানসিকতার আদল নতুন করে গড়তে পারি, আমরা আমাদের জগতও বদলাতে পারবো।

আমরাই দারিদ্র্যকে পাঠাতে পারি জাদুঘরে

আমি বিশ্বাস করি, আমরা দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়তে পারি কেননা, দরিদ্ররা দারিদ্র্য সৃষ্টি করেনি। এটির জন্ম দিয়েছে, লালন করেছে আর্থসামাজিক ব্যবস্থা যে ব্যবস্থা আমরা গড়েছি, সে ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান, ধারণা ও নীতি তৈরি করেছি আমরা। সে নীতিও অনুসরণ করেছি আমরা ।

দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়েছে কারণ আমরা আমাদের যে তাত্ত্বিক কাঠামো গড়েছি তাতে মানব সামর্থ্যরে ঊনমূল্যায়ন করে নানা ধারণা ও প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে যেগুলি খুবই সঙ্কীর্ণ (যেমন,ব্যবসা, কেউ ঋণ দেওয়ার মতো আস্থাযোগ্য কিনা, উদ্যোক্তার ভূমিকা ও কর্মসংস্থান সম্পর্কিত ধারণা) ও অসম্পূর্ণ (যেমন, আর্থপ্রতিষ্ঠানসমূহ যেখানে দরিদ্রদের প্রবেশাধিকার নেই)। মানুষের সামর্থ্যরে ঘাটতি নয় বরং ধারণাযন পর্যায়ে ব্যর্থতাই দারিদ্র্য সৃষ্টির কারণ।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার থাকলে আমরা দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব রচনা করতে পারি। দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্বে আপনারা কেবল একটি জায়গাতেই দারিদ্র্যকে দেখতে পারেন আর সেটা হলো জাদুঘর। শিশুদের তখন এরকম দারিদ্র্য সংক্রান্ত জাদুঘর দেখাতে নিয়ে যাওয়া হবে। আর তারা মানুষকে কেমন দুঃখ-দুর্দশা ও অবমাননায় পড়তে হয় তা দেখে তারা শিউরে উঠবে। এ রকম দীর্ঘকাল ধরে চলা এতোগুলি মানুষের অবিশ্বাস্য মানবেতর অবস্থা তাদের পূর্বপুরুষ কেমন করে মেনে নিয়েছে তা ভেবে শিশুরা তাদেরকে দোষারোপ করবে।

মানব শিশু পৃথিবীতে তার নিজের যত্ন নেওয়ার মতো করেই শুধু নয় বরং, তারা সামগ্রিকভাবে গোটা পৃথিবীর কল্যাণ প্রসারে অবদান রাখার যোগ্যতা রাখার মতো পরিপূর্ণরূপে সজ্জিত হয়েই ভুমিষ্ঠ হয় । কেউ কেউ তাদের জীবনে এ সম্ভাবনা কিছুটামাত্রায় কাজে লাগানোর, তাদের অনেকে জন্মসূত্রে পাওয়া সামর্থ্যরে অপূর্ব উপহারকে পূর্ণ বিকশিত ফুলের মতো মেলে ধরার সুযোগ পায় আবার অনেকেই পায় না। তাদের সে সুপ্ত সম্ভাবনা অনাবিষ্কৃত থাকা অবস্থায়ই তাদের জীবনাবসান ঘটে, তাদের সৃষ্টিশীলতা থেকে, তাদের অবদান থেকে পৃথিবী বঞ্চিত থেকে যায়।

গ্রামীণ আমাকে মানুষের সৃষ্টিশীলতার অটল বিশ্বাসে বিশ্বাসী করেছে। আর সে কারণে আমার এ বিশ্বাসও জন্মেছে যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের দুর্বিষহ দুর্দশা ভোগের জন্য মানুষ জন্মায়নি।

আমার কাছে গরিব মানুষ বনসাই বৃক্ষের মতো। আপনি যখন কোনো মহীরুহের বীজ ফুলের টবে বপন করেন তখন আপনি ঐ সুউচ্চ বৃক্ষের মাত্র কয়েক ইঞ্চি উঁচু একটা প্রতীকমাত্র পান। আপনি যে বীজ ফুলের টবে বপন করেছিলেন তাতে কোনো ত্রুটি ছিল না, কেবল মাটির বুনিয়াদটুকুই ছিল অপর্যাপ্ত। প্রতীকী এই কথাগুলির সরলার্থ হলো এই যে গরিব মানুষ বনসাইয়ের মতো। এ সব মানুষের বীজে তথা সম্ভাবনায় কোনো গলদ নেই, গলদ কেবল এই যে সমাজ তাদের প্রতিভা বা সামর্থ্য বিকাশের জন যথেষ্ট বুনিয়াদ দেয়নি। এই দরিদ্র লোকগুলিকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে আমাদের যা করা দরকার তাহলো তাদের জন্য সামর্থ্যদায়ক পরিবেশ দেওযা।

তাই আসুন যাতে প্রতিটি মানুষ তাদের শক্তি-সামর্থ্য ও সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ ঘটানোর ন্যায্য সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করতে সকলে হাত মেলাই।

ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ,

আমি আমার কথা শেষ করবো নরওয়ের নোবেল কমিটিকে আমার গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এ জন্য যে, তাঁরা স্বীকার করেছেন যে দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র নারীর মাঝে যেমন তাদের এক চমৎকার জীবন যাপনে]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29056290 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29056290 2009-12-09 23:12:12
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন…|৬১-৭০|
...............................................
[উৎবচনগুচ্ছ : (৬১-৭০)]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————
...
(৬১)
প্রশংসা বহুল চর্চিত একটি লেনদেন মাত্র,
যা খরচ করে মানুষ তার চেয়ে বেশি লাভ করতে চায়।

(৬২)
ক্ষমতার ব্যবহার ক্ষমতাকে অন্ধ করে।
অন্ধ সিংহের চাইতে দৃষ্টিবান গাধাও কার্যকর।

(৬৩)
বিয়ে হলো সংশোধনের অযোগ্য ভুল,
যা করে গবেটরা বীরত্ব দেখায়
আর বীরেরা বুদ্ধু সাজে।

(৬৪)
টক-শো আর চিড়িয়াখানায় একটাই তফাৎ;
টক-শো’তে কিছু মানুষ প্রদর্শন করানো হয়
আর চিড়িয়াখানায় পশু।

(৬৫)
সবচেয়ে পরাধীন সে-ই, যার আত্মহত্যার অধিকার নেই।

(৬৬)
অনিয়ন্ত্রিত ক্রুদ্ধতা জলাতঙ্কে আক্রান্ত একটা উন্মাদগ্রস্ত কুকুর।

(৬৭)
ধর্মগ্রন্থ এক অলৌকিক তাবিজ, যার ক্ষমতা কেবল কল্পনায়।
মূর্খ-সমাজে কল্পনার ক্ষমতা অসীম।

(৬৮)
আশ্চর্য হওয়ার ক্ষমতা মানুষকে স্বপ্নবান করে।
স্বপ্নবান মূর্খ স্বপ্নহীন জ্ঞানীর চেয়ে উত্তম।

(৬৯)
অশ্লীলতার জন্ম অবদমিত কামনায়, যা
লালিত ও পরিপুষ্ট হয় ভদ্রলোকালয়ে।

(৭০)
বেঁচেথাকার আশ্চর্য প্রেরণা হচ্ছে মৃত্যুচিন্তা।


[৫১-৬০] [*][৭১-৮০]
...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29055079 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29055079 2009-12-07 20:58:40
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন...|৫১-৬০|
...............................................
[উৎবচনগুচ্ছ : (৫১-৬০)]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————
.
(৫১)
যে রোগে কেবল রোগীই টের পায় না কিছু, ভোগে অন্যরা,
তা হলো পাগলামী।

(৫২)
তাঁরাই ধড়িবাজ,
সর্বাবস্থায় যাঁরা হাসিটাকে ধরে রাখে, মুছে না কখনো।

(৫৩)
সংস্কারমুক্তির প্রথম পাঠোত্তীর্ণে
তথাকথিত যে আস্তিক লোকটি আমাকে সর্বাগ্রে অভিনন্দন জানালো,
ভণ্ডের তালিকায় তাঁকেই আমি টুকে নিলাম সর্বাগ্রে।

(৫৪)
সম্রাট শাজাহানকে কৃতিত্ব দেয় সবাই, অথচ
রাষ্ট্রের কোষাগার নিঙড়ে নির্মিত তাজমহল হলো
মানবিক নিঃস্বতার এক মহার্ঘ স্মারক।

(৫৫)
পায়ের গঠন স্বপ্নকে সুগঠিত করে;
পা-হীন মানুষের স্বপ্নও পঙ্গু হয়ে যায়।

(৫৬)
সভ্যতা হলো চশমার মতো,
দৃষ্টিহীন চোখে তা অশ্লীল ও মূর্খ ফ্যাশন।

(৫৭)
মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ হলো চাইলেই সে গুণশূন্য হতে পারে,
অন্য প্রাণীরা তা পারে না।

(৫৮)
বুড়ো আঙুল সবকিছুকে ওকে করে দেখানোয় পারঙ্গম হলেও
গোল বাঁধাতেও ওস্তাদ সে,
এজন্যেই বুড়ো আঙুলকে টিপসই ছাপে আটকে রাখা হয়।

(৫৯)
সবকিছু খেতে পারা ছাগলের দোষ নয়, অনেক বড় গুণ;
মানুষের হীনমন্যতার নিকৃষ্ট নমুনা হলো ছাগলকে ছাগল বানিয়ে রাখা।

(৬০)
একটি অক্ষরকে ধারণ করার আগের ও পরের মানুষটি ভিন্ন হয়ে যায়,
এখানেই অক্ষরের অসীম ক্ষমতা।
শাসক যতো শক্তিধরই হোক, একটা অক্ষরের ক্ষমতাও রাখে না।
...

[৪১-৫০] [*][৬১-৭০]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29054721 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29054721 2009-12-07 02:03:25
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন...| ৪১-৫০|
...............................................
[উৎবচনগুচ্ছ : (৪১-৫০)]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————
.
(৪১)
কবি হবার প্রথম শর্তই হলো নির্লজ্জ হওয়া ;
লজ্জা নিয়ে কোন জননক্রিয়া হয় না।

(৪২)
কাউকে চিনতে হলে, তাকে বিপজ্জনকভাবে রাগিয়ে দাও ;
জিহ্বায় তার যেটুকু পোশাক অবশিষ্ট থাকবে, সেটুকুই সভ্য সে।

(৪৩)
শিক্ষা সেই মুখোশ, যা পরে মানুষ
সামাজিকতার ভাঁড়ামি আর নিখুঁত ভণ্ডামি করে।

(৪৪)
স্তনপিণ্ডে পাথরের আগ্রহ থাকে না;
কারণ সে নিজেকেও প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে।

(৪৫)
একটা অশ্লীল ও হাস্যকর রণক্ষেত্রকে সবাই ঠাট্টা করে দাম্পত্য বলে, যেখানে
দু’পক্ষেই অপেক্ষা করে নোংরা পরাজয়।

(৪৬)
জগতের জটিলতম কূহকের নাম- সন্তানের চোখ;
শেষপর্যন্ত যার পাঠোদ্ধার হয় না।

(৪৭)
চরিত্র হলো স্বভাবের শৃঙ্খলে বাঁধা নিজস্ব কারাগার;
এ থেকে মুক্তি পায় না কেউ, শৃঙ্খলের ধরন পাল্টায় কেবল।

(৪৮)
মানুষের যে আদিম প্রহসনটি আশ্চর্যজনকভাবে টিকে আছে এখনো,
তা হলো ‘নাম’-পরিচয়। অথচ নাম কোন পরিচয়ই বহন করে না। আর
মানুষের অদ্ভুত রসবোধের উৎকৃষ্ট ঠাট্টাটি হচ্ছে ‘নামকরণ’।

(৪৯)
নারী এক অদ্ভুত যন্ত্র,
সহজ বিষয়কে যে অনায়াসে জটিল বস্তুতে প্রক্রিয়াজাত করে।

(৫০)
পুরুষ হচ্ছে লোকাল বাস,
কখনোই যাত্রীক্ষুধা মেটে না।

...

[৩১-৪০] [*][৫১-৬০] ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29039303 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29039303 2009-11-07 15:22:31
[ছোটদের গল্প...| অর্ক’র চোখ |
...

ঘটনার শুরু কিন্তু গতকাল পঞ্চম শ্রেণীর অংকের ক্লাস থেকে। একেবারে ভিন্নভাবে। সব ছাত্রের মনোযোগ যখন অংক স্যারের দিকে, অর্ক’র দৃষ্টিটা বারবার মাথার উপরে ভন্ভন্ করে ঘুরতে থাকা ফ্যানটাতে গিয়ে আটকে যাচ্ছে। অংক স্যারও এই অমনোযোগী ছাত্রের ব্যাপারটা খেয়াল করেই ডাক দিলেন- এই ছেলে, দাঁড়াও !
থতমত খেয়ে দাঁড়ালো সে।
তোমার কী সমস্যা বলো তো ? ওখানে কী দেখছো ?
একটু ইতস্তত করে বললো- স্যার, সাপ।
সাপ ! কোথায় ?- স্যারের কণ্ঠে বিস্ময়।
অর্ক তর্জনীটা ফ্যানের দিকে তাক করে ধরলো- ওইখানে।

ভন্ভন্ করে এতো জোরে ঘুরছে যে ফ্যানের ব্লেডগুলোও দেখা যাচ্ছে না, শুধু অস্পষ্ট একটা ছায়াবৃত্ত ছাড়া। ওখানে সাপ কোথায় ! কেউ দেখতে পেলো না। তবু হুড়মুড় করে ক্লাসের ভেতরে মুহূর্তের মধ্যেই একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। ‘সাপ সাপ’ বলে সবাই ফ্যানটার কাছ থেকে দূরে সরতে গিয়ে হাউকাউ চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেলো। হট্টগোল শুনে পাশের ক্লাসরুম থেকে বাংলা স্যারও চলে এসেছেন। ততক্ষণে অংক স্যার একটা একটা সুইচ অফ-অন করে করে সুনির্দিষ্ট সুইচটা অফ করতেই ফ্যানের গতি কমে এলো। একটু পরেই ব্লেডের সাথে প্যাঁচানো চিকন কালো রশির মতো সাপটাকে দেখা যেতে লাগলো। এবং ফ্যানটা স্থির হতেই ওটা ঝুপ করে পড়লো নিচে বেঞ্চের উপর। ততক্ষণে অর্কও ওটা থেকে কিছুট দূরে সরে এসেছে। আর ‘সাপ এলোরে সাপ এলোরে’ বলে আবারো একটা হুড়াহুড়ি এবার ক্লাসরুম থেকে একেবারে বারান্দায় গিয়ে পৌঁছলো।

কোত্থেকে একটা বাঁশের লম্বা লাঠি নিয়ে অল্প বয়েসী পিয়ন ছেলেটা সোজা সাপটার কাছে চলে এলো। বেশ সাহসী ছেলে বলা যায়। লাঠিটা তাক করে আঘাত করার আগে তীক্ষ্ণভাবে কী যেন পর্যবেক্ষণ করেই চেঁচিয়ে ওঠলো সে- স্যার, এইটা তো পিলাস্টিকের সাপ !
ভালো করে দেখো- বলে সতর্ক করলেন বাংলা স্যার।
সে যে একটুও মিথ্যে কথা বলেনি তা প্রমাণ করতে এবার লাঠির আগায় খোঁচা দিয়ে সাপটাকে মাটিতে ফেলে দিলো। পড়েই চিৎ হয়ে গেলো ওটা। একটার পর একটা বক্সের মতো প্লাস্টিক কারখানার তৈরি খাঁজগুলো নজরে আসতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সবাই। শঙ্কিত ভাবটা কেটে যেতেই ক্লাস জুড়ে ছেলেদের হাসির তুবড়িতে খলবল করে ওঠলো রুমটা। কিন্তু অংক স্যারের রাগটা এবার ঠিকই চড়ে উঠেছে- ফাজিল ছেলে কোথাকার ! কই সে ?

ভয়ে ভয়ে স্যারের সামনে এগিয়ে এলো অর্ক। স্যারের স্বরকম্পন আরো বেড়ে গেছে তখন- তুমি যা করেছো তাতে তোমাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা উচিত ! বেয়াদব ছেলে কোথাকার !
অর্ক কাঁদো কাঁদো গলায় মিনতি করলো- আমি তো কিছু করিনি স্যার !
করিনি মানে !- স্যারের গলা তখন চরমে।
এরই মধ্যে হেডস্যারও চলে এসেছেন। নিয়ম কানুনে অত্যন্ত কড়া এই হেডস্যারকে ইস্কুলে সবাই সমীহ করে চলে। তিনি আসতেই সবাই যার যার সীটে গিয়ে বসে পড়লো। কেবল অর্ক দাঁড়িয়ে রইলো। ক্লাসের সবাইকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়ে অর্ককে সাথে করে তাঁর রুমের দিকে নিয়ে গেলেন। পেছন পেছন অংক স্যারও গেলেন।

সাধারণত জরুরি কোন প্রয়োজন ছাড়া হেডস্যারের রুমে ছাত্রদের খুব একটা যাওয়া হয় না। গুরুতর কোন ব্যাপার হলেই কেবল ওখানে ডাক পড়ে কারো। তাই হেডস্যারের রুমে ঢুকে অর্ক’র খুব ভয় হতে লাগলো। হেডস্যার তাঁর চেয়ারে বসেই সোজা অর্ক’র দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন- তুমি যে অপরাধ করেছো এটাকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধ বলে। এর সাজা কী জানো ? স্কুল থেকে বের করে দেয়া।
আমি স্যার কিছু করিনি- খুব সন্ত্রস্ত কণ্ঠে জবাব দিলো সে।
তাহলে কে করেছে ?
আমি জানিনা স্যার !
হঠাৎ হেডস্যারের কঠিন কণ্ঠ গমগম করে ওঠলো- তুমি কি মিথ্যা বলার পরিণাম জানো ?
ভয়ে অর্ক’র গলা দিয়ে তখন আর শব্দ বেরুচ্ছে না। তবু মরিয়া হয়ে সে বললো- জী স্যার, আমি মিথ্যা কথা বলি না।
কিন্তু স্যার যে তাঁর কথা বিশ্বাস করেছেন তা কী করে বুঝবে সে ?
তোমার বাবার ফোন নম্বর আছে ?
জী স্যার !

ফোন নম্বরটা রেখে হেডস্যার তাকে ক্লাসে ফেরৎ পাঠালেন। খুব বিমর্ষ মনে অর্ক ফিরে এলো ক্লাসে। কিছুই ভালো লাগছে না তার। সে যে ফ্যানের মধ্যে কোন প্লাস্টিকের সাপ ছুঁড়েনি বা এ সম্পর্কে সে কিছুই জানে না, এটা কেউ বিশ্বাস করছে না ! লজ্জায় অপমানে তার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ইস্কুল ছুটি হয়ে গেলো। বিমর্ষ অর্ক মাঠ পেরিয়ে গেটের দিকে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে টের পেলো, কে যেন তাকে কী বলছে।

সহপাঠী লাবিব। ওর দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই সে বললো- হেডস্যার তোকে মেরেছে রে ?
না তো !
তোকে জিজ্ঞেস করেনি এটা কে করেছে ?
হাঁ, করেছে !
তুই কী বলেছিস ?
আমি তো জানি না ওটা কে করেছে !
ও আচ্ছা...। বেশ আশ্বস্ত হয়েই চলে গেলো সে।
...

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই আব্বু জানতে চাইলেন- কী রে বাবু, আজ স্কুলে কী হয়েছে রে ?
অর্ক’র কাছে সবিস্তারে সব শুনে ‘ও তাই ! ঠিকাছে’ বলে আব্বু তাঁর কম্পিউটার নিয়ে বসে গেলেন। কিন্তু অর্ক’র বুক জুড়ে অনেক অভিমান দানা বেঁধে ওঠেছে তখন। এতগুলো ঘটনা ঘটে গেলো ! অথচ আব্বুর ‘ও তাই, ঠিকাছে’ বলেই শেষ ! আরো বেশি ভারি হয়ে ওঠা মনটাকে বুকে চেপে পড়ার টেবিলে মাথা গুঁজে বসে রইলো সে। হঠাৎ মাথায় আদরের স্পর্শে বুকটা চনমন করে ওঠলো। মুখ না তুলেই বুঝে গেছে, এই ঘ্রাণ আম্মুর। ‘ঔষধটা খেয়ে নাও বাবা !’
মুখ চোখ কুঁচকে এলো অর্ক’র। এ-বেলা এইটা ও-বেলা ওইটা করে করে অতিষ্ঠ করে তোলা ঔষধগুলোর উপর রীতিমতো বিরক্ত সে। কিন্তু কিছুই করার নেই।
...

গত ছুটিতে আব্বু-আম্মুর সাথে মামারবাড়ি চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে তাঁর প্রিয় ভ্রমণ- ট্রেনের জানালায় বসে গাছপালা মাঠ ঘাট নদী বন কে কতো জোরে পেছনে ছুটতে পারে- সে খেলাটাই দেখছিল খুব কৌতুক নিয়ে। দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে মাথাটা জানালায় ঠেশ দিয়ে রেখেছিল। হয়তো জানালা দিয়ে মাথাটা বাইরের দিকে কিছুটা বেরিয়েও ছিল। আচমকা কী যেন একটা ভয়ঙ্কর কিছু এসে কপালের ঠিক মাঝখানটায় প্রচণ্ড বাড়ি খেলো ! তারপর আর কিছু বলতে পারে না অর্ক। যখন জ্ঞান ফিরলো, ঘুটঘুটে অন্ধকার একটা ঘরে নিজেকে আবিষ্কার করে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। চারদিকের শোরগোলের মধ্যেও অভ্যস্ত নাকে আম্মুর শরীরের ঘ্রাণটা পেয়ে গেছে ঠিকই।
এতো অন্ধকার কেন আম্মু ?
ওহ্, জেগেছিস তুই ! মাথায় চোখে ব্যান্ডেজ করা যে বাবা !

ক’দিন পর ব্যান্ডেজ খোলা হলে যেদিন থেকে স্বাভাবিকভাবে দেখতে শুরু করলো, সেদিনই খুব আশ্চর্য ও মজার ঘটনাটা খেয়াল করলো সে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে ঠিক নাকের উপর ছাদে ঝুলানো ভন্ভন্ করে ঘুরন্ত ফ্যানটাকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে তীক্ষ্ণভাবে তাকাতেই ফ্যানের গতিটা কেমোন মন্থর হয়ে গেলো ! দৃষ্টি স্বাভাবিক করতেই ফ্যানটা আবার আগের মতো দ্রুত ঘুরছে। আবার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করলো, গতি মন্থর হয়ে যাচ্ছে। ফ্যানের গায়ে উদ্ভট অর্থহীন লেখাটা দিব্যি পড়তে পেরেছে সে ! পড়ে আর হাসি চেপে রাখতে পারলো না - চমেকহাফ্যা৫৭৮ ! নিয়মিত ডিউটিতে পরিদর্শনে এলে ডাক্তার আঙ্কেলকে বলতেই তিনি চুলগুলো নেড়েচেড়ে আদর বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন- খুব মজা বুঝি ? তারপরেও ওটা একটা ক্ষতিকর রোগ বাবা। আমি যে ঔষধগুলো লিখে দেবো তা নিয়মিত খাবে কিন্তু ! কেমন ? আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।

সেই থেকে অর্ক’র স্বাস্থ্যটাও দিনে দিনে ভেঙে পড়তে লাগলো। আব্বু আম্মু আরো কতো যে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছেন তাকে ! ডাক্তার আঙ্কেল বলেছেন, চোখের অসুখটা সেরে গেলেই স্বাস্থ্য আবার ভালো হয়ে উঠবে। যত তাড়াতাড়ি সেরে যায় ততই মঙ্গল। তাই যতো বিরক্তই লাগুক ঔষধ খেতে এখন কোন আপত্তি করে না সে।
...

পরদিন ইস্কুলে যেতেই কিছুক্ষণের মধ্যে হেড স্যারের ডাক এলো। উঠে দাঁড়াতেই লাবিবের সাথে চোখাচোখি। ওর ভয়ার্ত চোখে একটু ম্লান হাসি বিনিময় করে হেড স্যারের রুমের দিকে বেরিয়ে গেলো অর্ক। বুকটা দুরুদুরু করতে লাগলো। কিন্তু রুমে ঢুকেই আজ হতবাক সে। গতদিনের ঠিক উল্টো পরিবেশ। হেডস্যার চেয়ার থেকে উঠে এসে অর্ক’র মাথায় মুখে আদর বুলিয়ে বললেন- আমি তোমার আব্বুর কাছে সব শুনেছি বাবা। গতকালকে তোমাকে অনেক বকেছি, তাইনা ! তুমি আসলে খুব ভালো ছেলে। এখন থেকে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে, আর ডাক্তার সাহেব যা বলেন তা মেনে চলবে। স্কুলে তোমার কোন অসুবিধা হলে আমাকে বলবে, কেমন ? যাও।
হেড স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখে কোত্থেকে যেন পানি চলে এলো। মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। ক্লাসরুমে যখন ঢুকলো তখন তার মন ভালোলাগায় টম্বুর হয়ে আছে।

লেজার পিরিয়ডে ফুরফুরে আনন্দ নিয়ে ঝিরিঝিরি বাতাসের মধ্যে রেইনট্রি গাছটার ছায়ায় লাবিবসহ অন্য অনেকের সাথে বসলো সে। উপরের ক্লাসের বড় ভাইয়ারা সুযোগে কিছুক্ষণ ক্রিকেট খেলে নিচ্ছে। কিন্তু খেলা দেখে অর্ক’র কেবল হাসিই পেতে লাগলো। তীক্ষ্ণ চোখে খেয়াল করছে সে, বলটা যাচ্ছে বামে আর ব্যাট হাঁকাচ্ছে ডানে। আবার কখনো বলটা বাউন্স করে উপরে উঠে যাচ্ছে, অথচ ব্যাট পেতে দিচ্ছে গড়ানো বল আটকানোর মতো করে। এই অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপ দেখে হিহি করে হাসছে আর চেঁচিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে অর্ক ভুলেই গেছে অথবা জানে না যে, তার অস্বাভাবিক দৃষ্টিতে যেগুলোকে অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে, আসলে ওগুলোই স্বাভাবিক। কিন্তু মন্তব্য সে করেই যাচ্ছে- হি হি হি, এই দেখছিস লাবিব, বল কোথায় আর ব্যাট করছে কোথায় ! এক্কেবারে কার্টুনের মতো লাগছে না ! হি হি হি হি...!

‘এই ছেলে !’ একটা আদেশঝরানো কণ্ঠে চমকে ওঠলো অর্ক। পাশেই দাঁড়ানো শক্তসমর্থ গড়নের লম্বাচওড়া ছেলেটি। পরনের ইস্কুলড্রেস বলে দিচ্ছে এ ইস্কুলেরই উপরের ক্লাসের ছাত্র। কে যেন তাকে রণিভাই বলে ডাকলো। কিন্তু সেদিকে খেয়াল না করেই কণ্ঠে সেই আদেশের সুর- ‘তুমি কোন্ ক্লাসে পড়ো ?’
ক্লাস ফাইভ।
প্রাইমারী ক্লাসের ছাত্র হয়ে বড় ভাইদের সম্পর্কে এরকম মন্তব্য করতে তোমার লজ্জা হয় না ! স্যরি বলো !
আশেপাশে নানান ক্লাসের নানান ভঙ্গির ছাত্ররা, সবার মনোযোগ তখন এদিকে। এরই মধ্যে কিছু কিছু ছাত্রের জটলাও তৈরি হয়ে গেলো এখানে। অর্ক বুঝতে পারছে, হয়তো সে ভুল করেছে, শুধু একটা ‘স্যরি’ বললেই সবকিছু মিটে যাবে। কিন্তু এতোসব কৌতূহলী চোখের সামনে নিজেকে সে খুব অপমানকর অবস্থায় আবিষ্কার করলো। তাই উত্তরের মধ্যে সেই জেদ প্রকাশ পেলো- ‘স্যরি। কিন্তু আমি যা দেখেছি তাই বলেছি !’
যা দেখেছি মানে !
রণি’র কণ্ঠে বিস্ময়। এই দুর্বিনীত ছেলে বলে কী ! ক্রিকেটের ক্রিজে দাঁড়ানো যে কী জিনিস, এটা বুঝাতে ওকে তো তাহলে একটু শিক্ষা দিতে হয় ! তাই কিছুটা উত্তেজিত স্বরে বললো- তুমি কি পারবে এরকম এক ওভার বল ঠেকাতে ? হয় স্যরি বলো, না হয় ক্রিজে গিয়ে দাঁড়াও !
সতীর্থ কেউ কেউ রণিকে শান্ত করতে এগিয়ে এলো- বাদ দে তো, বাচ্চা ছেলে এসবের বুঝে কী ! ফাইভের ক্লাস-টিচার স্যারকে একটা কমপ্লেন জানিয়ে রাখলে হবে...।
ওদের কথা শেষ হবার আগেই অর্ক’র স্পষ্ট ঘোষণা- আমি ক্রিজে যাবো !
...

অর্ক’র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এ মুহূর্তে তীব্রবেগে ছুটে আসা ক্রিকেট বলটার উপর। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। ওপাশ থেকে রণি’র ছুঁড়ে দেয়া বলটা মাঝামাঝি দূরত্ব পার হয়ে এসে মাটিতে আছাড় খেলো। মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো ওটা। তারপর আবার লাফ দিয়ে উঠে স্ট্যাম্প আগলে রাখা ব্যাট হাতে প্রস্তুত অর্ক’র দিকে আসতে লাগলো। তবে অর্ক নিশ্চিত হয়ে গেছে বলটা যে এখন আর স্ট্যাম্প বরাবর আসবে না। বলটা যেখানে আছাড় খেয়েছিলো সেখানের মাটি যে সমতল নয়, বরং একটু উঁচু নিচু ছিলো, কিংবা ছোটখাটো পাথরের কণায় হোঁচট খেয়েছে তা তো পরিষ্কার। কারণ সে দেখতে পাচ্ছে বলের গতিমুখ কিছুটা বেঁকে গেছে। অর্থাৎ অফ-সাইড বা পেছন দিক দিয়ে রেরিয়ে যাবে বলটা। তার হাতের মুঠো ব্যাটের হাতলটাকে আরো ভালোভাবে চেপে ধরেছে। বাঁ পা’টা এক স্টেপ এগিয়ে যেতে প্রস্তুত হয়ে গেছে। কেননা ইতোমধ্যে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, বলটাকে ইস্কুলের বাউন্ডারির ওপারে পাঠাবে।

দর্শকদের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা। এতোবড়ো ব্যাটটাকে তুলতে পারবে কি না এটাই যেখানে সন্দেহ, সেই পিচ্চি ছেলেটাই কিনা আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ান বোলার রণি’র মারাত্মক পেস বলটাকে সোজা শূন্য দিয়ে বাউন্ডারীর বাইরে পাঠিয়ে দিলো ! রীতিমতো উল্লাস চলছে জুনিয়র শিবিরে, সিনিয়রদের মুখ থমথমে, চোখে অবিশ্বাস !

দ্বিতীয় বল করতে প্রস্তুত রণি। মুখ চোখ পাথরের মতো কঠিন হয়ে আছে। প্রেস্টিজ ইস্যু। এমন স্নায়ুচাপে কখনো পড়েনি সে। বাংলাদেশ ক্রিড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপি’তে তাকে নেয়ার আলোচনা চলছে। একদিন জাতীয় দলে খেলবে এবং দেশের সেরা পেস-বোলার হবে, এই টইটম্বুর আত্মবিশ্বাসে টোকা লাগায় এবার সত্যি আগ্রাসী হয়ে উঠেছে সে। ঘুরেই বল হাতে দৌঁড়াতে শুরু করলো। হাত ও কাঁধের শিরা-উপশিরা পেশীগুলো সাপের ফণার মতো তড়পাচ্ছে যেন।

ব্যাট হাতে প্রস্তুত অর্ক তীক্ষ্ণ চোখে রণি’র হাতের বলটাতে দৃষ্টি আটকে রেখেছে। সবকিছু স্লো-মোশন ছবির মতো ধীরলয়ে চলছে এখন। ভয় পাইয়ে দেয়ার মতো কী বিকট মুখ চোখ করে রণি ভাইয়াটা হাতটাকে চক্রাকারে ঘুরিয়ে উপর থেকে মুঠোয় ধরা বলটাকে সর্বশক্তিতে ঠেলা দিয়ে ছেড়ে দিলো। ছুটে আসা বলটাকে ঝাপসা ঝাপসা লাগছে। মাঝামাঝি দূরত্ব পেরিয়ে অনেকটা এগিয়ে এসে ওটা মাটিতে ধাক্কা খেয়ে ফের লাফ দিলো এবং সোজা তার পেট বরাবর আসতে লাগলো। ঝাঁকি দিয়েই শক্ত মুঠোয় ধরা ব্যাটটাকে উপরে তুলে বলটার ঠিক মুখোমুখি মেলে ধরবে সে। কী আশ্চর্য ! যেভাবে ভাবছে, হাত দুটো সেই দ্রুততায় ব্যাটটাকে তুলতে পারছে না ! বলটা উঠে আসা ব্যাটের হাতলের কানায় ঠক করে বাড়ি খেয়ে চকিতেই কোণাকুণি উপরের দিকে উঠে যেতে লাগলো।...

খুব অস্বাভাবিক হলেও অর্ক তার তীক্ষ্ণ চোখের বিশেষ দৃষ্টিশক্তি দিয়ে রণি’র দ্বিতীয় বল করার দৃশ্যটাকে যেভাবে ধীর গতিতে প্রত্যক্ষ করছিলো, দর্শকদের চোখে এই ঘটনাই কিন্তু ধরা পড়লো স্বাভাকিক দ্রুততায়। তারা দেখতে পেলো আহত চিতার মতো সবেগে ছুটে এসে রণি তীব্রগতিতে ছুঁড়ে দিলো বলটাকে। চোখের পলকে ওপাশে অর্কের বাড়িয়ে দেয়া ব্যাটের সাথে সংঘর্ষ হতেই সোজা উপরের দিকে শূন্যে উঠে গেলো বলটা। এবং হতবাক হয়ে সবাই দেখলো ক্রিজের মধ্যে চিৎ হয়ে নিঃসাড় পড়ে আছে অর্ক নামের ছেলেটা ! আচমকা স্তব্ধতা কেটে যেতেই হৈ হৈ করে সবাই ছুটে গেলো মাঠের দিকে। খবর পেয়ে স্যারেরাও ছুটে এলেন। সাথে সাথে খোঁজ পড়লো এম্বুলেন্সের।
...

কিছুক্ষণ আগে জ্ঞান ফিরেছে অর্ক’র। সিস্টার এসে অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিয়ে গেছে। বাঁ হাতে স্যালাইন চলছে এবং ক্রমেই সুস্থ হয়ে ওঠছে সে। কিন্তু আজ তার মন খারাপ। খুব ভালোভাবে খেয়াল করে দেখেছে, তীক্ষ্ণভাবে তাকালেও ফ্যানের গতিটা এখন একটুও কমছে না আর। আম্মুকে বলতেই কপালের ব্যান্ডেজটাতে হাত বুলাতে বুলাতে কী খুশি আম্মু ! কিন্তু অর্ক’র যে মশা-মাছি-পোকা-মাকড়ের ওড়াউড়ি, প্রজাপতির পাখা চালনা, কাকের দুষ্টুমি বা গুলতির পাথরটা কিভাবে আমের বোঁটায় গিয়ে আঘাত করে, ধীর গতিতে সেসব দৃশ্যের কিছুই আর মজা করে দেখা হবে না ! যদিও ডাক্তার আঙ্কেলের কথামতো তার স্বাস্থ্য আবার ভালো হয়ে ওঠবে। তাহলে আবার অনেক খেলাধূলা করতে পারবে সে। সহজে ক্লান্ত হবে না কিংবা জ্ঞানও হারাবে না। কিন্তু রণি ভাইয়ের মতো এমন চমৎকার ক্রিকেট কি খেলতে পারবে সে ? ইশ্, যদি পারতো ! ভাবতে না ভাবতেই কেবিনের দরজায় রণি’র মুখটা ভেসে ওঠলো। সাথে সাথে অর্ক’র চেহারাটাও উজ্জ্বল হয়ে ওঠলো। এখন থেকে সে রণি ভাই’র কাছে খেলা শিখবে।

শিয়রের কাছে আসতে না আসতেই অর্ক তার ডান হাত দিয়ে রণি'র হাতটা ধরে বললো- রণি ভাইয়া, আমি খুব স্যরি ! প্লীজ আমাকে...
তার আগেই রণি তার অন্য হাত দিয়ে অর্ক’র মুখটা আলতো করে চেপে ধরে স্মিত হেসে মাথাটাকে এপাশ-ওপাশ নাড়াতে লাগলো। দুজনের কেউ টের পায়নি, অর্ক’র আম্মুর সাথে কুশল বিনিময় সেরে হেডস্যার কখন যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
(২০-০৭-২০০৯)
...
[প্রকাশিত: শিশু কিশোর পত্রিকা মাসিক ‘টইটম্বুর’, অক্টোবর ২০০৯, বিশ্ব শিশু দিবস সংখ্যা]
...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29030672 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29030672 2009-10-23 18:39:30
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন...|৩১-৪০|
...............................................
[উৎসর্গ : হুমায়ুন আজাদ, যাঁকে আদর্শ ভাবলে প্রাণিত হই ]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————

.
(৩১)
মৃত্যু হিসাব-নিকাশহীন এক কাল্পনিক যাত্রা
যার কোনো শুরু নেই, শেষও নেই;
যেখানে কোন ধর্মগ্রন্থ নেই।

(৩২)
শুচিবাই কোন পরিচ্ছন্নতা নয়,
মনের কোণায় লুকিয়ে থাকা নিজস্ব নোংরামির বহিঃপ্রকাশ;
যেখানে রুগ্নতার চেয়ে বেশি থাকে অসভ্যতা।

(৩৩)
ব্যাঙের বের হবার সাধ্য নাই বলে তাকে কূপমণ্ডুক হয়েই জীবন কাটাতে হয়।
কিন্তু মানুষের সাধ্য অসীম,
তবু বাঙালির শখ কূপমণ্ডুক থাকাতেই ;
এজন্যে বাঙালি মানুষ হয না, হতে পারে না।

(৩৪)
মানুষই সবচেয়ে অসভ্য প্রাণী, কারণ
সে কেবল নিজের অনুকূলেই নিজের মতো করে সভ্যতা নির্মাণ করেছে।
তাই মানুষের সভ্যতা প্রকৃতির অনুকূল নয়।

(৩৫)
সু-স্বাস্থ্য মানে নিরোগ থাকা নয়।
এই বিশাল ও ভয়ঙ্কর জীবাণুমণ্ডলে ডুবে থেকে
রোগ-জীবাণু মুক্ত থাকার কথা কেবল নির্বোধরাই ভাবতে পারে।
সুস্থ থাকার সামর্থই হচ্ছে স্বাস্থ্য।

(৩৬)
আবেগ হচ্ছে প্রাকৃতিক অসভ্য অবস্থা ;
মানুষ যতক্ষণ আবেগহীন থাকে, ততক্ষণ সে দিগম্বর হয় না।

(৩৭)
মুদ্রা বা অর্থের শক্তি তার লেনদেনের মধ্যে,
প্রতিটা লেনদেন মানুষের ভেতরটাকে একটানে বাইরে নিয়ে আসে।

(৩৮)
যা বাস্তব তা-ই সত্য, তাই
বাস্তবতাকে স্বীকার না-করার অর্থ
নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা।

(৩৯)
প্রকৃতির সৌন্দর্য্য তার নগ্নতায়।
মানুষ যতক্ষণ প্রকৃতির অনুকূলে থাকে, তার নগ্নতা সৌন্দর্য্য ছড়ায়;
প্রকৃতির প্রতিকূলে মানুষই হয়ে উঠে সবচেয়ে অশ্লীল।

(৪০)
পিতা আর জন্মদাতা এক নয়।
জননযন্ত্র সক্রিয় হলেই জন্ম দেয়া যায়,
পিতা হতে দরকার হয় বাৎসল্যের।
...

[২১-৩০] [*][৪১-৫০]
...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29030300 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29030300 2009-10-22 23:41:14
| দুই-মেগাপিক্সেল…| রায়েরবাজার টু ধানমন্ডি |

১৬ জানুয়ারি ২০০৯, ছুটির দিন থাকায় দুই-মেগাপিক্সেলটা সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য রায়েরবাজার বধ্যভূমি। এর আগে যাইনি কখনো। লোকেশান নিয়ে জানলাম, মিরপুর থেকে ‘শতাব্দী’ টাউন সার্ভিসে ‘শংকর’ নামক জায়গায় নেমে রিক্সায় গন্তব্যস্থল। আমি তো আর চিনি না, গাবর যাত্রী পেয়ে বাসঅলা আমাকে নামিয়ে দিলো পিলখানার রাইফেল স্কয়ারের কাছে। কী আর করা ! বাংলাদেশ রাইফেলস-এর সুদৃশ্য ফটকটি তাক করে দিলাম সাটার টিপে।



এরপর এখান থেকেই রিক্সায় উঠলাম। চিপা-চাপা গলি-গালা পেরিয়ে ভেড়িবাধের খা খা শূন্যতায় এসে ঢাকাকে কেমন অপরিচিত লাগলো। দূর থেকে বধ্যভূমি নজরে এলো। ঝিম ঝিম করা দুপুর। কোলাহলহীন অদ্ভুত ফাঁকা পরিবেশ দেখে কল্পনা করার চেষ্টা করলাম ছত্রিশ বছর আগের সেই একাত্তরে এলাকাটা কেমোন নির্জন ভয়াল আর দুর্গম ছিলো।



অনেক বড় এরিয়া নিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমি। এখানে এলে ভেতরটা সত্যি সত্যি ফাঁকা হয়ে যায়। ইচ্ছেমতো সাটার টিপছি। দুটো উদোম গতরের বাচ্চা ছেলে এসে সামনে দাঁড়ালো। নিজেকে দেখা ও দেখানোর ইচ্ছা মানুষের চিরন্তন। সম্ভবত জেনেটিক কোডেই তা গাঁথা থাকে। এরাও তো এর বাইরে নয়। সাটার টিপলাম তাদের দিকে। একটুকু চাওয়া, মনিটরে নিজেদের চেহারা দেখে সে কী খুশি ! আহা, কতো অল্পেই তুষ্ট এরা !



আবার রিক্সায় ফেরা। গলি-গালা পেরিয়ে মূল সড়কে পৌঁছেই হাঁটা ধরলাম। যাবার সময় এদিকে চমৎকার কিছু স্থাপনা চোখে পড়েছিলো। এখনকার লক্ষ্য সেগুলোই। কিন্তু চোখে পড়ছে না একটাও। তাহলে কি ভিন্ন ভিন্ন রাস্তায় আসা যাওয়া ! ইবনে সিনা’র সুদৃশ্য স্থাপনাটা চোখে পড়তেই ক্লিক।



এবার সামনে পড়লো ‘ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’। ভাবলাম দেই ক্লিক করে।



আরেকটু এগুতেই বাঁ পাশে লেকের লাগোয়া সেই লাল বাড়িটা। জাহাজের আদলে তৈরি বাড়িটার ছবি দূর থেকে অনেককেই তুলতে দেখলাম। আমি আর ভীড়ের মধ্যে না গিয়ে আড়াআড়ি গিয়েই ক্লিক করলাম। একটুকু গাছের আড়াল না হয় থাকলোই !





বিকেলের আলো ততক্ষণে মজে এসেছে। ‘ইউল্যাব’-এর স্থাপনাটা যেদিকে, দুই-মেগাপিক্সেল তাক করতে গিয়ে শেষ সূর্যটা ডিসটার্ব করলো। করলে করুক।



হাঁটতে হাঁটতে রাইফেলস স্কয়ার পেরিয়ে সিটি কলেজ মোড়ের কাছে এসে ফিরতি বাসে উঠলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা নামি নামি। বাসের জানালা দিয়ে চোখ পড়লো মৃনাল হকের তৈরি আরেকটা ভাস্কর্য ‘অর্ঘ্য’। চলন্ত বাস থেকেই ক্লিক করলাম। হলো না। ওটার জন্য আরেকদিন বাসের জানালায় বসতে হবে।



বাসায় ফিরে দেখি স্ত্রীর শ্বাসকষ্টটা উঁকিঝুকি মারছে ফের। কিন্তু ইনহেলারটা কোথায় রাখলো খুঁজেই পাচ্ছে না সে।
…]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29029796 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29029796 2009-10-21 23:55:24
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন…| ২১ – ৩০ |
...............................................
[উৎসর্গ : হুমায়ুন আজাদ, যাঁকে আদর্শ ভাবলে প্রাণিত হই ]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————

.
(২১)
আফসোস হচ্ছে সেই ধুর্ততা,
সময়কে ধরতে না পেরে কপট ও মূর্খরা যা করে থাকে।

(২২)
মানুষকে পশু বানানোই মানুষের শ্রেষ্ঠ বিনোদন,
পশুরা তা জানলে তাদের নিজস্ব সমাজে
জঘণ্য গালিটা হবে ‘মানুষ’।

(২৩)
যার রক্ত দাসত্ব মুছতে পারে না
তার অনুরোধ হয় নির্দেশের স্বরে,
একজন স্বাধীন প্রভু নির্দেশ করে অনুরোধের সুরে।

(২৪)
যে নিজেকে ফাঁকি দেয়, সে অন্যকেও ফাঁকি দেয়;
যখন সে অন্যকে ফাঁকি দেয়,
আসলে সে নিজেকেই প্রতারিত করে।

(২৫)
যে পুরুষ নারীকে অবজ্ঞা করে, সে ধ্বংসকে আমন্ত্রণ জানায়;
নারীর প্রতি অনুগত যে, সে স্ত্রৈণ;
যে বিশ্বস্ত থাকে, আজীবন অন্ধত্বই নিয়তি তার।
সৃষ্টিশীল পুরুষেরা নতুন অপশনের খোঁজে জীবনটাই ব্যয় করে দেয়।

(২৬)
যে নারী পুরুষকে বিশ্বাস করে, সে বোকা;
যে অবিশ্বাস করে, সে নির্বোধ;
যে নির্ভর করে, সে অকর্মণ্য।
অথচ এর বাইরে নারীর জন্য কোনো অপশন রাখেনি পুরুষ।

(২৭)
অহঙ্কার সেই জ্বলজ্বলে বই, যার পাতায় পাতায়
অশ্লীল শব্দ আর অর্থহীন বাক্যের সমাহার।

(২৮)
মুদ্রাদোষ মানুষের একমাত্র স্মারক, যা তার পরিচয় বহন করে।
অসভ্য মানুষ এটাকে দোষ বলে প্রচার করেছে।

(২৯)
মানুষের ক্ষমতা তার স্বপ্নের চেয়ে বড় হয় না।
ক্ষমতা একরৈখিক, সীমাবদ্ধ; স্বপ্ন বহুমাত্রিক, অসীম।
স্বপ্নের দুর্বলতা হলো, তাকে টেনে নিচে নামানো যায় না।

(৩০)
উইগ, মাথার টাক ঢাকার সাথে সাথে মানুষের গুণগুলোও ঢেকে ফেলে।
ভণ্ড-ধার্মিকের মতো মানুষকে অভিনয়বাজ শয়তানে পরিণত করে।
...

[১১-২০] [*][৩১-৪০]
...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29029304 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29029304 2009-10-21 00:47:40
| দুই-মেগাপিক্সেল...| আইডেনটিটি |

অর্থনীতির হিসাবে ওরা এসেছে বিশ্বের অন্যতম সেরা শক্তিশালী রাষ্ট্রটি থেকে। জাপান। তারুণ্যে ভরপুর এদেরকে দেখলেই বুঝা যায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা সেদেশের স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী। উচ্ছল প্রাণ-চাঞ্চল্য সাথে নিয়ে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশটিতে এসেছে বেড়াতে কিংবা কোন শিক্ষা সফরে, হয়তো অভিজ্ঞতা অর্জন বা কোন গবেষণা সন্দর্ভ তৈরির জন্য। এ-সবই ধারণা। কিন্তু ছবি যা বলে, তা হয়তো ধারণা নয়। সফরের প্রামাণ্য হিসেবে ডিজিটাল আলোয় যে অভিজ্ঞতাটুকু তাদের মুঠোবন্দী হচ্ছে, তা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।



একদিন হয়তো তাদের অভিজ্ঞতার এই আলো কিংবা অন্ধকার টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়বে অন্তর্জালিক বিশ্বের প্রতিটা ডিজিটাল কোণায়; ক্যাপশানে হয়তো লেখা থাকবে বোধ্য বা অবোধ্য ভাষায়- এই দেখো বাংলাদেশ !

আমার দুখিনী বাংলা, তোমার উদোম গতর এখনো উন্মুক্ত; নগ্ন, এক টুকরো কাপড়ের আশায়। ক্ষুধায় আর্ত হাত যে সাদা-কালো বুঝে না, খুঁজে শুধু এক বেলার আহারের আশ্বাস.. !

...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29028755 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29028755 2009-10-20 00:14:17
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন…| ১১ – ২০ |
...............................................
[উৎসর্গ : হুমায়ুন আজাদ, যাঁকে আদর্শ ভাবলে প্রাণিত হই ]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————
.
(১১)
অধিকাংশ প্রাণীর শব্দ বিক্ষেপণের দুটো মুখ থাকে-
একটা সামনে বা উপরে, অন্যটা নিচে বা পেছনে।
এই দুটো মুখের বিভেদ ঘুচাতে জানেন যিনি,
আজকাল তাকেই সফল মানুষ বলে।

(১২)
অফিস হচ্ছে সেই খোঁয়াড় যেখানে
নতুন কোন সৃজন হয় না,
যা আছে তা ধ্বংস করার প্রক্রিয়া ছাড়া।

(১৩)
মানুষের ব্যক্তিত্ব তাঁর চেহারায় নয়,
হাঁটার স্টাইলেই আঁকা থাকে।

(১৪)
‘না’ বলতে জানে না যে, তাঁর ‘হাঁ’ বলাটাই ভণ্ডামি।

(১৫)
অংক শেখার প্রথম পাঠই হচ্ছে অংক ভুলে যাওয়া,
ভুলতে না পারলে বিসর্জনের শুদ্ধতা আসে না।

(১৬)
কম্পিউটার বানায় যে, ততক্ষণই সে কম্পিউটার চালায়।
আর যে কম্পিউটার চালায়, আসলে কম্পিউটার তাকে চালায়।

(১৭)
শ্রাদ্ধের নামে মৃতের কোন শেষকৃত্য হয় না,
প্রকৃতপক্ষে জীবিতরা নিজেদেরই শ্রাদ্ধ করে।

(১৮)
আহার সংযমে দৈহিক ওজন বাড়ানোয় কোন অলৌকিকতা নেই,
রয়েছে বস্তুগত চাতুর্য্য।

(১৯)
গাম্ভীর্য একধরনের স্বার্থপর অক্ষমতা,
যা মানুষকে প্রকাশিত হতে দেয় না।

(২০)
মেরুদণ্ডের অবস্থান মানুষের হাড়বাঁধানো শিরদাঁড়ায় নয়,
যৌবনে থাকে জননযন্ত্রে, বার্ধক্যে ব্যাংক-ব্যালেন্সে।

...
[০১-১০] [*][২১-৩০]
...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29028075 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29028075 2009-10-18 22:19:12
| হঠাৎ হুক্কা-হুয়া রব ছাড়িয়া নিজের পরিচয় প্রকাশ করিলো...!

...
প্রশাসনে সংখ্যালঘুদের ব্যাপক মূল্যায়ন ’। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় বেশ বড় হরফে এই শিরোনামের রিপোর্টটি পড়ে হোঁচট খেলাম প্রথমেই। এরপর অনেকগুলো প্রশ্ন মনে উঁকি দিতে থাকলো। তবে সবার আগে যে প্রশ্নটি এলো তা হলো- সংবাদপত্র কেন ?

সংবাদপত্র কেন ? আদৌ কি আমাদের সংবাদপত্রের প্রয়োজন আছে ? এই যুগে এসে এরকম অদ্ভুত প্রশ্নে যে-কেউ বিস্মিত হতেই পারেন। তাতে করে প্রশ্নের গুরুত্ব হারিয়ে যাবে না। প্রশ্ন তার অবস্থানে ঠিকই থেকে যাবে। হযতো একটু ইনিয়ে বিনিয়ে এই প্রশ্নগুলোই অন্যভাবে করা হবে- সংবাদপত্র আমাদেরকে কী দেয় ? এতে হয়তো কেউ কেউ বিরক্ত হবেন- এটা কোন নতুন প্রশ্ন হলো ! তবু পুরনো প্রশ্নই কখনো কখনো নতুন করে ছুঁড়তে হয় বৈ কি। সত্যি করে বলুন তো, সংবাদপত্র আমাদেরকে আসলে কী দেয় ? কেউ হয়তো বলবেন, কেন, সমসাময়িক উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্যতায় এনে দেয়। কেউ বলবেন বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের যোগান দেয। কেউ বলবেন যে আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। কেউ বলবেন আনন্দ দেয় বিনোদন দেয়, কেউ বলবেন রাষ্ট্র ও সমাজের নানান অসংগতি অনাচার তুলে ধরে অন্যায় ও অবিচারের প্রতিবাদ করে। আবার কেউ কেউ হয়তো বলবেন আলু দেয়, বাঁশ দেয়, কাঁচকলা দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কেউ আবার ফোঁড়ন কাটতে পারেন- বিজ্ঞাপনও দেয়। সবার কথাই সত্যি। সংবাদপত্র আমাদেরকে এ সবই দিতে পারে এবং দেয়ও। তবে দেয়ার প্রক্রিয়া, বিষয় আর উদ্দেশ্যের ভিন্নতার কারণে উপস্থাপন বৈগুন্যে যা দেয়া হয় তা কি আর তা-ই থাকে ? এসব ভিন্নতার মাধ্যমেই পাঠকের কাছে প্রতিটা সংবাদপত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও নির্দিষ্ট হয়ে যায়। সচেতন পাঠক মাত্রেই চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারেন ওটা বিনোদন পত্রিকা, ওটা অপরাধ পত্রিকা, ওটা সাহিত্য পত্রিকা, ওটা কৌতুক পত্রিকা, ওটা চিন্তাজীবী পত্রিকা, ওটা ফালতু পত্রিকা, ওটা কাজের পত্রিকা, ওটা তদবিরি বা দলীয় পত্রিকা এসব। এক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর যে কৃতিত্বটা স্বীকার করতে হবে তা হলো, সব ধরনের বিষয় বা বিষয় বৈচিত্র্যকে ধারণ করে একই অঙ্গে এই পত্রিকাগুলো এতো রূপের মিশ্রন ঘটিয়েছে যে, একজন সাধারণ নাগরিককে আর ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের পত্রিকা না রাখলেও চলে। একটি দৈনিক থেকেই সব ধরনের টেস্ট চেখে নেয়া সম্ভব। খবর, তথ্য, বিনোদন, সাহিত্য, মতামত ইত্যাদি হরেকরকম বিষয়ে পাঠকরুচির সমন্বয় ও সমাবেশ ঘটাতে আজকাল দৈনিকগুলোর এতো আয়োজন দেখে অনেকেই হয়তো মুগ্ধ-বিস্ময়ে ভাবতেও পারেন, আহা, পাঠক-সন্তুষ্টির জন্য এরা কতো কিছুই না করছে ! পারলে জানটাও দিয়ে দেয় আর কি ! আসলেই কি তা-ই ? আমাদের অধিকাংশ দৈনিকের জন্মেতিহাস তো তা বলে না।


জন্মেতিহাস জেনে তারপর পত্রিকা পড়তে হবে এমন দায় সাধারণ পাঠকের নেই বা থাকেও না। কিন্তু অসংখ্য অপরাধকর্মের মাধ্যমে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ এবং তারপরে বটগাছে পরিণত হয়ে সেসব অপরাধ ধামাচাপা দিতে অন্যায় প্রভাব বিস্তার করার লক্ষ্য নিয়ে যারা পত্রিকা বের করেন, তারা পত্রিকার মাধ্যমে সমাজসেবা করবেন বা পাবলিককে জ্ঞানী গুণী সভ্য বানিয়ে তোলার মহৎ কর্মে ব্রতী হবেন এমনধারা চিন্তা করে কেউ বোকার স্বর্গে বাস করতে চাইলে করুন। তবে পত্রিকা মালিকের স্বার্থের এক কানাও ক্ষতি হয়েছে এ ধরনের কোন ভালো উদ্যোগ গ্রহণ বা আয়োজন করার নজির কোন পত্রিকা কি আজো সৃষ্টি করতে পেরেছে ? কিন্তু এদের ভেতরের উদ্দেশ্য তো বাইরে থেকে নিরীহ পাঠকের বোঝার কোন উপায় নেই। ফলে পাঠকের বিভ্রান্তি কাটারও কোন সুযোগ থাকে না যে, কোন কোন পত্রিকা কী কৌশলে তাদের হীন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কিভাবে পাঠকমনে ফের সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর স্লো-পয়জনিং এর মতো হীন কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। তার একটি নমুনা হলো শুরুতেই উল্লেখ করা ‘প্রশাসনে সংখ্যালঘুদের ব্যাপক মূল্যায়ন’ শীর্ষক রিপোর্টটি। ১১ অক্টোবর ২০০৯ তারিখের দৈনিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রতিবেদক কাদের গনি চৌধুরীকৃত রিপোর্টটি পড়লে মনে হবে বাংলাদেশে আদতে কোন মানুষ নেই, আছে মুসলমান ও সংখ্যালঘু। আর সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও কোন বাঙালি নেই, আছে সেই মুসলমান ও সংখ্যালঘুই। এরকম জঘন্য সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন রিপোর্টটির উল্লেখযোগ্য অংশ এরকম-

‘জনপ্রশাসনের পদোন্নতিতে এবার সংখ্যালঘুদের ব্যাপক মূল্যায়ন করা হয়েছে। যুগ্ম সচিব পদে এবার নজিরবিহীনভাবে ৭৯ শতাংশ সংখ্যালঘু সরকারি কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। আর মুসলমানরা পেয়েছেন মাত্র ৩৯ শতাংশ। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনের ৮৪ ব্যাচের ১২০ জন কর্মকর্তা এবার যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। অনেকে সুপারসিডেড হওয়ায় পদোন্নতি তালিকায় সর্বশেষ স্থান পাওয়া কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম লস্কর-এর সিরিয়াল নম্বর ২৬৭। এ ২৬৭ জন কর্মকর্তার মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৩৮ জন রয়েছেন। এ ৩৮ জনের মধ্যে ৩০ জনই এবার যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পদোন্নতির হার ৭৯ শতাংশ। অপরদিকে ২২৯ জন মুসলমান কর্মকর্তার মধ্যে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে ৯০ জনকে। বাদ পড়েছেন ১৩৯ জন। মুসলমান কর্মকর্তাদের পদোন্নতির হার মাত্র ৩৯ শতাংশ। এটি পদোন্নতি পাওয়া শেষ কর্মকর্তার সিরিয়াল হিসাব করে বের করা হয়েছে। যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি ফিটলিস্টে যেসব কর্মকর্তার নাম রয়েছে তা হিসাব করলে মুসলমান কর্মকর্তাদের পদোন্নতির হার আরও কমে যাবে। শুধু তা-ই নয়, যুগ্ম সচিব হিসেবে অন্যান্য ক্যাডারদের আরও ১০ সংখ্যালঘু কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে অন্যান্য ক্যাডারের মাত্র ৩৩ জন মুসলমান কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতির জন্য তৈরি ফিটলিস্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ লিস্টের প্রথম ১০০ জনের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১২ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের সবাইকে এবার পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। প্রথম ১০০ জনে সুপারসিডেড হয়েছেন ৬১ জন। তারা সবাই মুসলমান। এমনকি পদোন্নতি তালিকায় একনম্বরে থেকেও সুপারসিডেড হলেন এসএম মফিদুল ইসলাম। অত্যন্ত মেধাবী এ সরকারী কর্মকর্তা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন এবং মুখে দাড়ি আছে বলে তাকে জামায়াত সমর্থক আমলা আখ্যা দিয়ে পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়। পদোন্নতির ফিটলিস্ট বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজনকে পদোন্নতি দেয়ার পর তার পরের সিরিয়ালে যেসব মুসলমান কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের বাদ দেয়া হয়, আবার পেছনে গিয়ে যেখানে সংখ্যালঘু কর্মকর্তা রয়েছেন তাকে বা তাদের পদোন্নতি দিয়ে পরবর্তী মুসলমান কর্মকর্তাদের নাম বাদ দেয়া হয়।’.......


...‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যে ৮ কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাননি এদের মধ্যে ২ জন বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন, ২ জনের পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কস ছিল না এবং বাকি ৪ জনকে বিএনপিপন্থী হিসেবে চিহ্ণিত করে পদোন্নতি দেয়া হয়নি বলে সূত্র জানায়। অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ৭ সেপ্টেম্বর পদোন্নতি দেয়া হয় ৬০ জনকে। তাদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৩ জন পদোন্নতি পান। বর্তমানে জনপ্রশাসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৬৮ জন কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব ও একই পদমর্যাদায় কর্মরত আছেন। উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয় ২৭১ জনকে। তাদের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন ৫০ জন। সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে জনপ্রশাসনে কর্মরত আছেন ৯৬ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কর্মকর্তা। সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে জনপ্রশাসনে ৪ হাজার ৫৩০ জন কর্মকর্তা কর্মরত। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ১১১ জন মুসলমান এবং ৪১৯ জন সংখ্যালঘু। ৬৩ জন সচিবের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রয়েছেন ৩ জন। ১৮৫ জন অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে ২২ জন সংখ্যালঘু, ৪৩৩ জন যুগ্ম সচিবের মধ্যে ৬৮ জন, ১ হাজার ৩৮৬ জন উপসচিবের মধ্যে ১৭০ জন, ১ হাজার ৪৮৮ জন সিনিয়র সহকারী সচিবের মধ্যে ৯৬ জন এবং ৯৭৫ জন সহকারী সচিবের মধ্যে ৬০ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন।’

রিপোর্টটি পড়ার পর প্রথমেই যে প্রশ্নটা উঁকি দিলো তা হলো, এই স্বাধীন দেশে খুব নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট এরকম একটা লেখা ছাপানোর অভিরুচি কোন পত্রিকার থাকতে পারে কি না ? অথচ এই ‘আমার দেশ’ পত্রিকার প্রথম পাতার লোগোর সাথে যে শ্লোগানটি মুদ্রিত হয়, তা হলো ‘স্বাধীনতার কথা বলে’। স্বাধীনতার কথা বলার চমৎকার নমুনা বৈ কি ! এরপরই যে প্রশ্নটি এলো, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে কোন নাগরিককে কেউ সংখ্যালঘু চিহ্ণিত করে কটাক্ষ করার অধিকার সংরক্ষণ করেন কিনা ? এই রাষ্ট্রের নাগরিক যোগ্যতা যাচাই ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কি কোন নাগরিককে বাঙালি বা বাংলাদেশি হতে হয়, না কি মুসলমান হতে হয় ? এই গোটা রিপোর্টটিতে কোথাও সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যোগ্যতার মাপকাঠি কী বা দায়িত্ব পালনে অযোগ্য কেউ মূল্যায়িত হলেন কিনা তা সুস্পষ্টভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কেবল রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুত্বকেই মূল্যায়নের মানদণ্ড হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে সংখ্যালঘুত্বকেই কটাক্ষ বা অপমান করা হয়েছে। ব্যক্তির যোগ্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড কি সংখ্যালঘুত্বের অনুপাত ? এই রিপোর্টে রীতিমতো সংখ্যালঘু কর্মকর্তাদের নামের তালিকাও দেয়া হয়েছে। ওখানে একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর নাম রয়েছে। প্রতিবেদকের যে হীন মানসিকতা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে, তাতে তাঁর দৃষ্টিতে মুসলমান কর্মকর্তাদের শতকরা ৩৯ জনের বিপরীতে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদেরকে তো শতকরা ১০০ ভাগ পদোন্নতি দেয়া হয়ে গেছে। তিনি তো বহুভাবে বিভিন্ন অংক কষে গণিতে তাঁর দক্ষতা দেখিয়ে দিয়েছেন। আনুপাতিক হার সমান করে তিনি এটাও দেখিয়ে দিতে পারতেন ক’জন হিন্দু, ক’জন বৌদ্ধ বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া দরকার ছিলো। সাথে সাথে বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকার আমলের এরকম একটা লিস্টি এনে তুলনামূলক চিত্র হাজির করতে পারতেন এই বলে যে, দেখেন সেই সরকারের আমলে পদোন্নতির অনুপাত কতো যত্ন করে ঠিক রাখা হয়েছিলো। সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাটাতেও যে সাম্প্রদায়িকতার মতো জঘন্য নোঙরামি তলে তলে কতো জমা হয়ে যাচ্ছে, এই প্রতিবেদনটা তার অন্যতম উৎকৃষ্ট নমুনা হিসেবে অক্ষয় হয়ে রইলো। এসব নিন্দাযোগ্য হীন প্রবণতাগুলোকে চিহ্ণিত করেই বোধহয় প্রয়াত হুমায়ুন আজাদ তাঁর প্রবচনগুচ্ছের ৬২ নম্বর প্রবচনটি লিখেছিলেন এভাবে- ‘এদেশের মুসলমান এক সময় মুসলমান বাঙালি, তারপর বাঙালি মুসলমান, তারপর বাঙালি হয়েছিলো; এখন আবার তারা বাঙালি থেকে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি মুসলমান থেকে মুসলমান বাঙালি, এবং মুসলমান বাঙালি থেকে মুসলমান হচ্ছে। পৌত্রের ঔরষে জন্ম নিচ্ছে পিতামহ।

সুন্দরের প্রতি সহজাত দুর্বলতার কারণেই আমরা সুন্দর সুন্দর কথা আর বুলি শুনে কতো মুগ্ধ হয়ে পড়ি। আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোর লোগোর সাথে মুদ্রিত এরকম কতো চমৎকার চমৎকার কথা মুদ্রিত রয়েছে। যেমন ‘প্রথম আলো’- প্রচেষ্টার ১০ বছর, ‘জনকণ্ঠ’- স্বাতন্ত্র্য ও নিরপেক্ষতায় সচেষ্ট, ‘যায় যায় দিন’- পনের কোটি মানুষের জন্য প্রতিদিন, ‘সংবাদ’- প্রকাশনার ৫৯ বছর, ‘ইনকিলাব’- শুধু দেশ ও জনগণের পক্ষে, ‘ভোরের কাগজ’- মুক্ত প্রাণের প্রতিধ্বনি, ‘মানবজমিন’- কারও তাঁবেদারি করে না, ‘ইত্তেফাক’- ৫৬ পেরিয়ে আস্থায় শীর্ষে, ‘যুগান্তর’- সত্যের সন্ধানে নির্ভীক, ‘আমাদের সময়’- নতুন ধারার দৈনিক, ‘নয়াদিগন্ত’(সাতরঙ)- সময়ের সাথে সময়ের আগে, ‘সমকাল’- অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস এবং ‘আমার দেশ’- স্বাধীনতার কথা বলে, ইত্যাদি।
কিন্তু কোন্ মধু-বুলির আড়ালে কী বিষাক্ত কামড় অপেক্ষা করে আছে, দৈনিক পত্রিকার সাধারণ পাঠক হিসেবে আমাদের যাচাই করার কোন উপায় জানা আছে কি ? আমাদেরকে হঠাৎ করে হুক্কা-হুয়া ডাক শুনেই যেমন কোন কিছুর উপস্থিতির প্রমাণ জানতে হয়, তেমনি পত্রিকায় প্রকাশিত এইরকম বিশেষ বিশেষ প্রতিবেদন থেকেই বুঝে নিতে হয় পত্রিকাটির লক্ষ্য, চিন্তাধারা বা দৃষ্টিভঙ্গি কী। ‘আমার দেশ’ পত্রিকাটির প্রিন্টার্স লাইনে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে নাম রয়েছে মাহমুদুর রহমান। সম্পাদকের অনুমতি বা নির্দেশ ছাড়া তো কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন প্রতিবেদন পত্রিকায় প্রকাশ করার কথা নয়। উল্লেখিত প্রতিবেদনটিও যে সম্পাদকের স্পেশাল নির্দেশ ছাড়া তৈরি হয় নি তা কোন নির্বোধও না বুঝার কথা নয়। ‘আমার দেশ’ পত্রিকাটির প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, এটা নিশ্চয় একজন পাঠক ও রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে জানার অধিকার আমরা সংরক্ষণ করি। আর এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকাই বা কী, তা কি কেউ বলবে ?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29027223 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29027223 2009-10-17 12:41:35
| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন…|০১ -১০|
...............................................
[উৎসর্গ : হুমায়ুন আজাদ, যাঁকে আদর্শ ভাবলে প্রাণিত হই ]
...
সতর্কতা: ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার বা মুক্তচিন্তা বিষয়ে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
————————————

.
(০১)
যুবতী মেয়েদের চুলের দৈর্ঘ্য নির্দেশ করে
তার সংস্কারের শিকড় কতোটা গভীরে প্রোথিত,
আর কথায় কথায় স্রষ্টাকে উদ্ধৃত করার সংখ্যা দিয়ে মাপা যায়
পুরুষের ভণ্ডামির বিস্তার।

(০২)
শিল্পের ঘাড়ে কাপড় তুলে দিয়ে
অশ্লীলতার বৈধ বিপণনকারীর তালিকায়
সর্বাগ্রে আসে স্বঘোষিত কবিদের নাম।

(০৩)
নিচের কাপড় তুলে মুখ ঢেকে যারা লজ্জানিবারণ করে,
তাদের লজ্জাস্থানই উন্মুক্ত হয়।
তা দেখে লজ্জা পায় অন্যেরা,
আর কেউ কেউ মজা পায়।

(০৪)
কখনো কখনো নির্দোষ হলেও
ভণ্ডামির উৎকৃষ্ট উপায়ই হলো সবকিছু স্রষ্টার নামে সঁপে দেয়া।

(০৫)
নিজেকে গোপন করতে মানুষ অন্যকে উদ্ধৃত করে, আর
অন্যকে আড়াল করতে নিজেকে নিয়ে বদমায়েশি করে।

(০৬)
মানুষ যতক্ষণ পশু থাকে
ততক্ষণ সে নিজেকে মানুষ বলে প্রচার করে।

(০৭)
এখন বৃষ্টি হলে আমার পিতা যা করতেন
আমিও তা-ই করি, নিজেকে রক্ষা করি। আর আমার সন্তান
বৃষ্টিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কৈশোরে আমি যা করতাম।
ব্যক্তি বদলে যায়, মানুষ বদলায় না।

(০৮)
আগে ছোট অফিসের বড় কর্মকর্তা হয়ে অধঃস্তনকে নিয়ে
যেরকম ব্যতিব্যস্ত ছিলাম, এখন বড় অফিসের ছোট কর্মকর্তা আমাকে নিয়ে
আমার বসও সেরকম ব্যতিব্যস্ত থাকেন।
দায়িত্বহীন মানুষ আর ভারহীন গাধায় কোনো পার্থক্য নেই।

(০৯)
মানুষের লেজ দৃশ্যমান নয় বলে
লেজেগোবরে শব্দটি মানুষ অন্যায়ভাবে লেজযুক্ত পশুদের ঘাড়ে চাপিয়ে
অনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে।

(১০)
মোবাইল ফোন হচ্ছে সেই যন্ত্র, যা দিয়ে মানুষের
ভণ্ডামি রেকর্ড হয়, আর নষ্টামি আড়ালে থাকে।

...
[*][১১-২০]
...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29027041 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29027041 2009-10-17 01:59:15
| ‘দারিদ্র্য বিমোচনের বিরুদ্ধে’ সংগ্রাম !!! ...
খবরটাতে চমক আছে বলতেই হবে, ‘১৭ অক্টোবর একই মঞ্চে বক্তব্য রাখবেন হাসিনা-খালেদা।’ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বহুদিন ধরে দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে যেখানে পরস্পর কথা বলা দূরে থাক্, মুখ দেখা-দেখিও বন্ধ থাকাটাই স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়ে আসছে, সেখানে দুই নেত্রী একই মঞ্চে অবস্থান করে বক্তব্য রাখবেন, বিষয়টার গুরুত্ব খাটো করে দেখার উপায় তো নেই-ই, জাতির কাছে এরকম বহুল কাঙ্ক্ষিত ঘটনা যে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটা সুবাতাস বইয়ে দেয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে, নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্যেও তা আশ্বস্ত হওয়ার ব্যাপার বৈ কি। এই বিরল ঘটনা কী করে সম্ভব হচ্ছে ? অনেকগুলো পত্রিকাতেই খবরটা এসেছে। ১২ অক্টোবর ২০০৯ তারিখের দৈনিক ‘সমকাল’ থেকে জানা যাচ্ছে যে আগামী ১৭ অক্টোবর ২০০৯ তারিখ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (প্রাক্তন চীন-মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র) বিকেল ৩.০০টায় দারিদ্র্য বিমোচনে জাতিসংঘের মিলেনিয়াম ক্যাম্পেইনের অর্থসহায়তায় বাংলাদেশের সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ (এপিপিজি) আয়োজিত ‘দারিদ্র্য বিমোচন’ শীর্ষক অনুষ্ঠিতব্য এক বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইতোমধ্যে দুই নেত্রী উপস্থিত থাকতে রাজি হয়েছেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ভাষণ দেবেন।

এ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে “দাঁড়াও, কাজ করো, দারিদ্র্য হটাও”। জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অনুসারে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্ধেক জনশক্তিকে দারিদ্র্যমুক্ত করার লক্ষ্যে দারিদ্র্য বিমোচনের বৈশ্বিক ক্যাম্পেইনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতেই এই আয়োজন। জানা যায় জাতীয় সংসদের স্পীকার ও এপিপিজি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবেন। দুই নেত্রী ছাড়াও এখানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, এপিপিজি’র দুই কো-চেয়ারম্যান ও সরকারি দলের চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ এবং বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকও বক্তব্য রাখবেন। এছাড়া নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দাতাদেশ ও সংস্থার প্রতিনিধি এবং কূটনীতিকরা এতে উপস্থিত থাকবেন। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক, পদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হবে। সম্মেলন উপলক্ষে দেশের প্রতিটি মহানগর ও জেলা সদরে বড় ধরনের সমাবেশের আয়োজন করা হবে। এইসব সমাবেশে উপস্থিত সুধীজনের সামনে সরাসরি সম্মেলনটি সম্প্রচার করে দেখানোর ব্যবস্থা করা হবে। জেলা প্রশাসনকে ওই সমাবেশ অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ।

এই সম্মেলনের জন্য যে বিশাল ও বর্ণিল আয়োজন করা হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সবই ঠিক আছে। শুধু সন্দেহের একটা ‘কিন্তু’ যুক্ত হয়ে যায় যখন শোনা যায় যে দেশী-বিদেশী ছোট বড় এতো এতো আমন্ত্রিতদের মধ্যে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল লরিয়েট প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নাম নেই। অর্থাৎ তাঁকে এ সম্মেলনে অফিসিয়ালি আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। বড়ই মজার বিষয় ! ড. ইউনূসকে নিয়ে যার যার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, কেউ কি এই নিশ্চয়তা দিতে পারবেন যে আমন্ত্রিত অতিথিরা সবাই গুণে-মানে-যোগ্যতায়-অবস্থানে ড. ইউনূসের চাইতে এগিয়ে ? তিনি কি কোন দেশদ্রোহী ? তাঁর বিরুদ্ধে কি অপরাধী হিসেবে গোটা কয়েক মামলা ঝুলে আছে ? না-কি কর ফাঁকি দিয়েছেন তিনি ? ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত সাদাসিধে সৎ ও বাহুল্যহীন জীবন যাপনকারী এই ব্যক্তিই যে জাতিসংঘে বা আন্তর্জাতিক বিশ্বে দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ক ভাবনাজগতে একটি উজ্জ্বল ও বিশেষ আইকন হিসেবে উচ্চ মর্যাদা পেয়ে থাকেন, এটা কি অস্বীকার করা যাবে ? সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদক ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ প্রদান অনুষ্ঠানে আমেরিকায় তাঁর প্রতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের কুটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত নজিরবিহীন নির্লিপ্তির মধ্য দিয়ে বিদেশের মাটিতে যে রাষ্ট্রীয় হীনমন্যতা দেখানো হয়েছে, নিজের দেশে নিজ মাটিতেও সেই হীনমন্যতাই কি প্রকাশ করা হচ্ছে না ? ব্যক্তি বিরোধ, দলীয় বিরোধ, রাজনৈতিক বিরোধ বা তাত্ত্বিক বিরোধ কারো সাথে কারো হয়তো থাকতেই পারে। তাই বলে একজন যোগ্য নাগরিকের সাথে জাতীয় মান-সম্মান ভূলুণ্ঠিত হওয়ার মতো রাষ্ট্র পর্যায়ের বিরোধ কি হতে পারে ? তাহলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দল মত নির্বিশেষে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কথাটা কি ফাঁকা বুলি হয়ে গেলো না !

সেলুকাসের এতো বৈচিত্র্য-বিস্ময় এ দেশেই বুঝি সম্ভব। নিজে চোখ বন্ধ রেখে কেউ দেখছে না ভাবা কতোটা শুভ বুদ্ধির পরিচায়ক কে জানে, তথ্য-প্রযুক্তির আলোকবেগের কল্যাণে আমাদের এসব সুকৃত (!) অর্জন কি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কারো অজানা বা অপ্রকাশিত থাকছে ? ঢাকায় অবস্থানকারী বিভিন্ন দেশের এমবেসি বা হাইকমিশনগুলোও নিশ্চয়ই বসে বসে মূলো চিবুচ্ছে না বা ঘুমাচ্ছে না। এ জন্যেই কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং ভারতের কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী’কে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাঁরা নির্ধারিত অন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির কারণ দেখিয়ে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন নি ? শোনা যায় নোবেল লরিয়েট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সহ বিশ্বপর্যায়ের আরো কাউকে কাউকে এ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁদের উপস্থিতি এই সম্মেলনকে অবশ্যই আরো ঐশ্বর্য্যময় ও ফলপ্রসূ করে তুলবে। এই দেশের নাগরিক হিসেবে আমরাও তা চাই।

কিন্তু আমাদের সরকার কি সত্যি সত্যি দারিদ্র্য বিমোচনে আন্তরিক ? সন্দেহ হয়। কেননা ১২ অক্টোবর ২০০৯-এর দৈনিক ‘সমকাল’-এর প্রথম পাতায় ‘সামনের সারি ফাঁকা : স্পিকার ভীষণ ক্ষুব্ধ’ শীর্ষক আরেকটি প্রতিবেদন আমাদেরকে এ বিষয়ে সন্দেহবাতিক করে তুলে। সামনের সারিতে আসনের দাবিতে যখন জাতীয় সংসদের অধিবেশন বর্জন করছে বিরোধী দল, তখন কিনা চলমান অধিবেশনে সামনের সারিতে আসন পাওয়া সাংসদদেরকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ! প্রধানমন্ত্রী ছাড়া বাকি সিনিয়র সংসদ সদস্যদের এমন অনুপস্থিতি নিয়ে নাকি গত ১১ অক্টোবর ২০০৯ তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্পীকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। এ কারণে রোববার দিনের নির্ধারিত কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ‘দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র’ (পিআরএসপি) নিয়ে সাধারণ আলোচনা বাতিল করতে হয় !

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের পর অধিবেশন শুরুতেই স্পিকার আবদুল হামিদ বলেন- ‘দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে উত্থাপন করে দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি) নিয়ে সাধারণ আলোচনার কথা ছিল। কিন্তু যারা আলোচনার জন্য তুমুল আগ্রহ দেখিয়েছিলেন তাদেরই অধিবেশন কক্ষে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি যিনি আলোচনা উত্থাপন করবেন (অর্থমন্ত্রী) তিনিও নেই। সামনের সারির মন্ত্রী ও নেতারা অনুপস্থিত। প্রধান হুইপকেও দেখা যাচ্ছে না।’... ...‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি নিজে নির্ধারিত সময়ে সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হতে পারলে মন্ত্রীরা পারবেন না কেন ? এটি আমি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছি না। এভাবে তো চলতে পারে না।

দৈনিক পত্রিকাগুলোয় চোখ বুলালেই এসব কতো বাহারি ঘটনার পরোক্ষ সাক্ষি হয়ে যাই আমরা। দারিদ্র্য বিমোচন হবে কি হবে না, সরকার এতে আন্তরিক কি-না, এসব নিয়ে বহু তর্ক-বিতর্ক হতে পারে বা হতে থাকবে। তবে এসব আলামতের মধ্যে একটা কাকতালীয় মুদ্রন-ত্রুটিতে চোখ পড়তেই প্রথমে চমকে উঠলাম। অতঃপর হাসতে হাসতে পেটে খিল পড়ার যোগার। সমকালের ‘একই মঞ্চে হাসিনা-খালেদা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটির ১৭ পাতায় মুদ্রিত চতুর্থ লাইন থেকে উদ্ধৃত ত্রুটিপূর্ণ বাক্যটি কি সেরকম কোন আগাম আলামতেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে-
সম্মেলন থেকে ‘দারিদ্র্য বিমোচনের বিরুদ্ধে’ ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ‘শপথ’ও নেবেন দুই নেত্রী।
...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29026985 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29026985 2009-10-17 00:15:13
| ‘একুশে পদক’ চান ? এখনই আবেদন করুন…!

গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকের ১২ পৃষ্ঠায় ‘বিনোদন প্রতিদিন’ বিভাগের পাতায় প্রকাশিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রদত্ত বিজ্ঞপ্তিটিকে নিশ্চয়ই কেউ বিনোদন হিসেবে নেবেন না। তবু সিরিয়াস এই বিজ্ঞপ্তিটাকে কেন যেন মজার একটা বিনোদন হিসেবেই মনে হলো। আমার ভুল হয়ে থাকলে পাঠক চোখে নিশ্চয়ই তা এড়াবে না। একুশে পদক- ২০১০-এ পুরস্কার প্রদানের নিমিত্তে আগ্রহী প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন চেয়ে প্রদত্ত এ বিজ্ঞপ্তিটিতে বলা হচ্ছে- ‘ এতদ্বারা সর্বসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে একুশে পদক- ২০১০ এর পুরস্কার প্রদানের নিমিত্ত নিম্ন বর্ণিত যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি/ সংগঠনকে নির্ধারিত ছকে জীবনবৃত্তান্ত উল্লেখ পূর্বক আগামী ২২-১০-২০০৯ ইং তারিখের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের যে কোন মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন যে কোন দপ্তর/ অধিদপ্তর/ সংস্থা এবং জেলা প্রশাসনের (সংশ্লিষ্ট জেলা) দপ্তরে দাখিলে জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। উপরোক্ত দপ্তর/ সংস্থা মনোনয়ন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অগ্রায়ন করবে।..’ ( বিজ্ঞপ্তির ভাষা ও বানান হুমহু রাখা হয়েছে- লেখক।)



পাঠকেরা বিশ্বাস করেন আর না করেন, এতটুকু পড়েই বুকের ভেতরটায় কেমন আনচান করতে লাগলো ! এর আগ পর্যন্ত এই রাষ্ট্রীয় পদক প্রাপ্তির বিষয়টিকে বহুৎ দূরের বিশাল কিছু একটা ভেবে এসেছি। ওটা পেতে আগ্রহী হবার কল্পনাতীত দুর্মতি চিন্তারও অগম্য ছিলো। কিন্তু এটাকে হঠাৎ এখন সর্বসাধারণের আবেদনযোগ্য করে তোলায় মনের মধ্যে কী যেন একটা ভুলকি মারতে লাগলো। অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতিতে দেখেছি আগ্রহী প্রার্থীরা নিজের বায়োডাটা তৈরি করে কতকগুলো প্রকাশিত বই বিজ্ঞপ্তি-নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়ে অতঃপর পুরস্কার ঘোষণার দিন গুনা শুরু করে দেয়। শুনেছি কেউ কেউ নাকি আবার নিজের যোগ্যতাকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করতে নানারকম যোগাযোগের অন্ধি-সন্ধি খোঁজায়ও ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একুশে পদকের ক্ষেত্রে কেমন হবে জানি না, তবে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর পর সুধীমহলের বিস্ময় আর শিল্পী সমাজের প্রতিবাদ প্রতিক্রিয়া যেভাবে ঝরতে লাগলো, তাতে করে আশঙ্কায় আছি, কি জানি এই প্রক্রিয়াটি রদ হয়ে আমার মতো অনেকেরই জেগে উঠা আশা-ভরসার বেলুনটা ঠুশ করে আবার ফেটে যায় !

শিক্ষা সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অসামান্য অবদার রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ গুণী ও কৃতী ব্যক্তিদেরকে ১৯৭৬ সাল থেকে সম্মানজনক এই রাষ্ট্রীয় একুশে পদক (Medal of Ekushey Padak) প্রদান করা হয়ে আসছে। এ জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন চাওয়ার ঘটনায় বিস্মিত সুধিমহলের কিছু প্রতিবাদও ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০০৯ প্রথম আলোতেও এ ধরনের কিছু মন্তব্য চোখে পড়লো। নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার এ বিজ্ঞপ্তিকে পদক পাওয়ার যোগ্যদের জন্য অসম্মানের বিষয় বলে বিবেচনা করছেন- ‘ এটা বিস্ময়কর, আমাদের অবাক করেছে। একুশে পদকের মতো বড় মাপের পদকের জন্য কোন যোগ্য প্রার্থী আবেদন করবে না।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বলেন- ‘ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে অবদান রাখা সম্মানিত ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানকে একুশে পদকে ভূষিত করে সরকার জাতির মহিমাকে সবার সামনে মেলে ধরে সমাজ বিকাশে প্রেরণাদায়ক ভূমিকা পালন করে। এই তাৎপর্যপূর্ণ কর্তব্য সম্পাদনে যে সংবেদনশীলতা ও সম্মানবোধ প্রদর্শন করতে হয়, তার কোন তোয়াক্কা না করে যেভাবে এবং যে ভাষায় পদকপ্রাপ্তি অভিলাষী ব্যক্তিদের আবেদন করার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, তা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক মনোভাবের পাশাপাশি কুরুচি ও সৌজন্যবোধের অভাবই প্রকাশ পেয়েছে।’

এসব মন্তব্য প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফুল আলমের যে বক্তব্যটি প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে তাকে আপত্তিকর মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাঁর বক্তব্যটি হলো- ‘ এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটা অন্যভাবে দেখার কিছু নেই। সরাসরি দরখাস্ত দেওয়ার উদ্দেশ্যে এটা দেওয়া হযনি।’
অথচ বিজ্ঞপ্তিটা পড়লেই সচিব হুজুরের বক্তব্যের সাথে অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। তিনি নিজে যদি এই বৈপরীত্য টের না পেয়ে থাকেন, তাহলে নিরূপায় আমাদেরকেই বোধ করি নতুন করে বাংলা ভাষা শিক্ষা নিতে হবে।

বিজ্ঞপ্তির ২ নং ক্রমে প্রথমে প্রার্থীর যোগ্যতা উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে- ‘ এতদ্বারা একুশে পদক যাঁকে প্রদান করা হবে- (ক) তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। (খ) তাঁকে একজন সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, ভাষাবিদ ও ভাষা সংগ্রামী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, দারিদ্রবিমোচনে অবদানকারী ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব হতে হবে। (গ) সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ অবদান থাকতে হবে। (ঘ) চরিত্রগুণ ও দেশাত্মবোধে তাঁকে অনবদ্য হতে হবে। (ঙ) দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভাষা/ মাতৃভাষার স্বীকৃতি/ উৎকর্ষতার জন্য নিবেদিত এবং উল্লেখযোগ্য অবদানকারী ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন।

আগ্রহী প্রার্থীর এসব যোগ্যতা যে আছে তার প্রমাণ কী ? এজন্যে বিজ্ঞপ্তির ৩ নং ক্রমে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে- ‘ আবেদনকারীকে নির্ধারিত ছক পূরণ-পূর্বক সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের বিষয়ে প্রমানপত্র ও আলাদা জীবনবৃত্তান্ত সহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হবে।’ কৌতুহলী পাঠক বিজ্ঞপ্তির এই বাক্যটা আবারো খেয়াল করে দেখুন, বাক্যের প্রথমে রয়েছে ‘আবেদনকারীকে’ এবং বাক্যের শেষে রয়েছে ‘আবেদন করতে হবে’। সচিব হুজুরের বক্তব্য যে কতোটা অসার ও বিভ্রান্তিমূলক তা কি স্পষ্ট হয়ে উঠে না ? বিজ্ঞপ্তির ৪ নং ক্রমে বলা হয়েছে- ‘ সকল মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন দপ্তর/ অধিদপ্তর/ সংস্থা ও জেলা প্রশাসকগণ স্বপ্রনোদিত হয়েও একুশে পদকের মনোনয়ন পাঠাতে পারবেন। প্রাপ্ত আবেদন পত্র সমূহ প্রাথমিক যাচাইক্রমে (প্রয়োজনে) ২৯-১০-২০০৯ তারিখের মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবেন।’

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিটিতে বানান-ত্রুটির কথা নাই বললাম। এ পর্যন্ত আলোচনা থেকে এটা কি স্পষ্ট নয় যে, বিজ্ঞপ্তির ২ নং ক্রমের উল্লেখিত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি/ সংগঠনকেই নির্ধারিত ছকে জীবনবৃত্তান্ত উল্লেখপূর্বক আবেদন করতে হবে ? বিজ্ঞপ্তির ভাষায় তো তা স্পষ্ট। তবে অপশন হিসেবে ৪ নং ক্রমে উল্লেখিত মন্ত্রণালয়াধীন দপ্তর/ অধিদপ্তর/ সংস্থা ও জেলা প্রশাসনগণ স্বপ্রণোদিত হয়েও একুশে পদকের মনোনয়ন পাঠাতে পারবেন। কিংবা বিজ্ঞপ্তির ৫ নং ক্রম অনুযায়ী ‘ একুশে পদক প্রাপ্ত সম্মানিত সুধীবৃন্দ উপযুক্ত ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন প্রদান করে সরাসরি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করতে পারবেন।’ অথবা ৬ নং ক্রম অনুযায়ী ‘ দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনাকারী (অধিকাংশ জেলায়) বেসরকারী সংস্থা/ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান উপযুক্ত ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করে মন্ত্রণালয়ে সরাসরি প্রস্তাব প্রেরণ করতে পারবেন।’ এ জন্যে বিজ্ঞপ্তির সর্বশেষ ৭ নং ক্রম অনুযায়ী ‘ আবেদন সম্পর্কিত তথ্য ছক মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (www.moca.gov.bd ) হতে সংগ্রহ (download) করা যাবে।’

যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য আদান-প্রদানে মুখের কথার কোন বেইল নেই, তাই সচিব হুজুর মুখে যা-ই বলুন, আমরা কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেবো। অতএব বাংলাদেশের যে কোন নাগরিক নিজেকে শর্ত অনুযায়ী যোগ্য মনে করলে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকের জন্য আবেদন করতে পারেন। তাই দেশের সুধীমহল এতে যতোই বিস্মিত হোন বা প্রতিবাদে তীব্র হন না কেন, আমি কিন্তু মনে মনে যার পর নাই প্রীত হয়েছি ! আর যাই হোক, চাইলে আমিও তো একটা আবেদন করে দেখতে পারি ! এমন সুযোগ হাতে পেয়ে পায়ে ঠেলি কী করে ! শুধু ২(ঘ) পয়েন্ট মোতাবেক চরিত্রগুণ ও দেশাত্মবোধে অনবদ্য হবার একটা সার্টিফেটের জন্যে না হয় কোন চরিত্রহীন গেজেটেড কর্মকর্তার কাছে যা একটু ধর্না দিতে হবে। হুমায়ুন আজাদের মতো কোন ব্যক্তিত্ব এই পুরস্কার পেলেও অন্তত এটা তো সবাইকে ধরে ধরে বলতে পারবো, আমিও এই পদকের প্রার্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম ! কিন্তু বিভিন্ন পত্রিকায় যেভাবে প্রতিবাদের ঝড় দেখছি, আমার খায়েশ বুঝি শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থেকে যাবে !

৩০-০৯-২০০৯ এর দৈনিক সমকালে দেখি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলছেন- ‘ পদকপ্রাপ্তদের কেউ না কেউ মনোনয়ন দেবেন। এখানে পদকের জন্য আবেদন করা আমার কাছে অনেকটা টেন্ডার প্রক্রিয়ার মতো মনে হচ্ছে, যা এই পদকের মর্যাদাকে হেয় করে।’ এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন বলছেন- ‘ আমার ব্যক্তিগত অভিমত আসলে আবেদন করে পদক পাওয়া যায় না। কারও জীবনের ওপর স্টাডি করে পদক দেওয়ার বিষয়টি নিরূপিত হয়।’ তাঁদের বক্তব্যের পর শেষপর্যন্ত আমার মতো নির্বোধ গাধাদের হা করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না, যখন আবার সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সেই সচিব হুজুর শরফুল আলমের বক্তব্য পড়ি- ‘ বিগত ১৮ বছর ধরে যেভাবে একুশে পদকের জন্য মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে, এবারও তাই করা হচ্ছে।’

(একুশে পদকের ছবি উৎস: উইকিপিডিয়া)


[ স্বাক্ষরই বলে দেয় আমি মূর্খ] ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29019196 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29019196 2009-10-02 13:33:46
। কররেখা ।
। কররেখা ।

.
মানুষের পদরেখা মানুষ বোঝে না
শুধু কররেখা গুনে গুনে কী আশ্চর্য মিলিয়ে নেয়
খরদাহ জ্যোতিষ্কের কাল, পাথরের অলৌকিক স্বভাব
কিংবা সময়ের গর্ভের আগাম উত্তাপ, সবই।
তবে কি কররেখা রেখা নয়, চুপ করে পড়ে থাকা নদীর স্বভাব ?

মানুষের কররেখা নদীই যেমন।
বুকের বর্ষায় ভেজা নিঃসঙ্গ উঠোন জুড়ে
এপার ওপার করে কতোবার মারিয়েছো তুমি ?
বসে যাওয়া বিবর্ণ পায়ের ছাপ নেড়েচেড়ে অসম্ভব কুটিকুটি আমি
পাইনি খুঁজে কোনো রেখাময় পায়ের প্রপাত-
কূলপ্লাবী স্রোতে-জলে যে নদী হারাতে জানে !
ওখানে ভাসাবো বলে নির্জন রেখাতটে বসে বসে
আয়ুধ সাম্পান গড়ে ঘূণের মোচ্ছবে শুনি আজ-
আহা, মানুষের পদতলে রেখা নেই, নদীর আহ্বানও নেই !

বুকের বর্ষায় ভেজা পিচ্ছিল উঠোন ভেঙে সত্যিই হেঁটে গেলে
একবারও ডাকেনি কি বৃক্ষল শরীরে তোমার
উন্মূল পতনের স্বর ? দেহের উষ্ণতা মেখে লেপ্টানো এ মাটি-বুক
অদৃশ্য উড়ালে না হয় হয়ে যেতো হৈমন্তী আকাশ,
সে সব হয়নি কিছুই।

নাই হলো দেয়া-নেয়া পরস্পর আদিম অভাব,
কখনো কি দেখা হবে তোমার আমার ?
কররেখা গুনে যদি দেখা যেতো নদীর স্বভাব...!
(২১-০৬-২০০৯)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29008895 http://www.somewhereinblog.net/blog/ranadipam/29008895 2009-09-12 02:32:38