দিব্যচশমাখানা চক্ষে ধারণ করে একরাশ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল মনা চোরা। এই একটা সমস্যা, কথায় কথায় আজকাল শুধু দীর্ঘঃশ্বাস আসে তার। আক্রার এই বাজারে দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়বার মতো বিলাসিতা কি তার মতো চুনোপুটি চোরেদের মানায়? ছোটখাট চোরেদের চুনোপুটি বলা হয় কেন এই ব্যাপারটাও তার মাথায় ঢুকে না। একটা পুঁটির দম লক্ষ টাকা, তাও সব সময় আসল জিনিস পাওয়া যায় না। এইতো সেদিনই সিনথেটিক একটা পুঁটি মাছ আসল পদ্মার পুঁটি বলে চালিয়ে দিচ্ছিল হতচ্ছাড়া মাছওয়ালা। ভাগ্যিস দিব্যচশমাখানা চোখে ছিল। দ্রুত ইয়াগুগলি সার্চ মেরে জানা গেল হাজার বছর আগে পদ্মা নামে একখানা নদীতে হাঁটু পানি ছিল বটে তবে এখন সেখানে সাতখানা সেতু ছাড়া আর কিছু নাই। কোন এক কালে আওয়ামিলীগ একখানা সেতু নির্মান করেছিল, তার সাথে পাল্লা দিতে বিএনপি বানালো দুইটা। অতঃপর এই অপমানের শোধ তুলতে আওয়ামিলীগ আরো চারখানা সেতু নির্মান করে। এইভাবে হয়ত চলতেই থাকত কিন্তু ইতমধ্যে পদ্মা নদী শুকিয়ে আমসি হয়ে যাওয়ায় শেষতক তারা ক্ষান্ত দেয়। তবে এই ঘটনার ফলে, স্টোন হেঞ্জ কেন তৈরী হয়েছিল সেই রহস্য উদঘাটিত হয়। মাছওয়ালাকে চেপে ধরতেই সে বিরস বদনে জবাব দিল এই পুঁটি পদ্মা ফিসারিজ লিমিটেড কর্তৃক নির্মিত, তবে নির্মান কাজে ১০০% পদ্মার পানি ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়তে গিয়েও মনা চোরা নাকটা চেপে ধরল। বাতাসের যা দাম, অপচয় করার উপায় নাই।
সে যাহোক আমরা অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাটি না করি। স্মৃতি বড় জ্বালাময়, বারেবারে সে কাঁদায়। মনা দ্রুত অতীত চিন্তা ভাবনা হতে বর্তমানে ফেরত আসলো। এই মুহুর্তে সে বঙ্গভবণের প্রাচীর ঘেসে লুকিয়ে আছে। মতলব পরিস্কার, প্রাচীর টপকে ভিতরে ঢুকবে। কিন্তু ঢুকতে চাইলেইতো আর ঢোকা যায় না। এতো আর রমনা থানা নয় যে মোতালিব দারোগা সদর দরজা খোলা রেখেই দিয়েছে, দেখলেই ঢুকিয়ে দিবে। চারিদিকে কড়া পাহারা দারোয়ান রোবটগুলো নিয়ে অবশ্য মনার মাথা ব্যথা নাই। চীন থেকে তার ভাতিজা সম্প্রতি একখানা ‘স্তব্ধভাষ’ যন্ত্র পাঠিয়েছে। ঐটা চালু করলে আর দেখতে হয় না, আসে পাশের যত রোবট সব তব্ধা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মূল সমস্যাটা হল প্রাচীরের উপর দিয়ে বয়ে চলা অদৃশ্য লেজার। খালি চোখে দেখা যায় না বটে, তবে মনা পোড় খাওয়া লোক, আক্ষরিক অর্থেই। বহু আগে যখন মনার কচি বয়স, হাত পাকেনি তখন একবার এমন প্রাচীর টপকাতে গিয়ে আর একটু হলেই বেগুন পোড়া হয়ে মারা যাচ্ছিল। সে যাত্রা সদানন্দ ভুত তাকে রক্ষা না করলে আর দেখতে হত না। উপকারি হলেও বড্ড খিটখিটে মেজাজের ভুত সে। বেগুনপোড়া হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য মনা তার চরণে খানিকটা কৃতজ্ঞতা নিবেদন গিয়েছিল। রে রে করে তেড়ে এসে সে বলল, ‘মারার আর সময় পাস না? বলি এত অল্প বয়সে কেন মরার শখটা হল? ধীরে সুস্থে পৃথিবীর চারটা আলো বাতাস খেয়ে মরলে কার কি ক্ষতি শুনি? ভুত সমাজে আজকাল আর পা ফেলারও জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না, সবাই মরে ভুত হয়ে গেলে জায়গা হবেই বা কিভাবে? তোদের বাঁচাতে গিয়ে আমার ভুত জীবন থুড়ি মরণটা মাঠে মারা ধুত্তর জীবিত হল’। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ঝুপ করে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
নাহ্! বঙ্গদেশের জনগণের সময় জ্ঞান আর হল না, মনে মন ভারি বিরক্ত হল মনা। হিসেব মতোন এই সময়ে লোড শেডিং শুরু হবার কথা কিন্তু এখনো তার কোন সাড়া শব্দ নাই। এই কদিন আগেও বঙ্গ ভবনে লোড শেডিং হত না। জনগণের প্রবল প্রতিবাদের মুখে শেষটাই বঙ্গভবনও লোড শেডিং-এর আওতাভুক্ত। হুঁ হুঁ বাবা, কেউ খাবে কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না। তা এর ফলে মনার সুবিধায় হয়েছে বলতে হবে। জেনারেটর চালু হতে হতে মিনিট দুই লাগবে এই দুই মিনিটে চাইলে সে মোটামুটি পুরো বঙ্গ ভবন হাপিস করে দিতে পারে। তবে তার আজকের উদ্দেশ্য ভিন্ন। বিদ্যুৎ চলে যেতেই স্তব্ধভাষ যন্ত্রখানা চালু করে সে পাচিল টপকে সুড়ুৎ করে ভিতরে ঢুকে গেল। ঐতো সামনেই ফুটে রয়েছে থোকা থোকা গোলাপ, একেবারে খাঁটি প্রাকৃতিক জিনিস। এ জিনিস আর কোথাও পাওয়া যায় না। প্রথমে হল টিপাই মুখ বাঁধ, তারপর এ বাঁধ সে বাঁধ পুরো দেশটা দেখতে দেখতে মরুভুমি হয়ে গেল। এখন ফুল যা দুই চারটা ফোট তা এই বঙ্গভবন, হাওয়া ভবন এসব জাগাতেই। টুঙ্গিপাড়া আর জিয়া উদ্যানও আজকাল ভোঁ ভোঁ করে। সময় নষ্ট না করে টপাটপ কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে নিল মনা চোরা। এই জিনিস এখন সোনার চেয়েও দামি। নির্বিঘ্নে কর্ম সম্পাদিত হবার পর পাচিল টপকে ঘুরে দাঁড়াতেই টের পেল কে জানি তার হাতখানা চেপে ধরেছে। ধরার স্টাইলটাও বেশ পরিচিত পরিচিত লাগছে, এর আগেও অনেকবার সে এভাবেই ধরা খেয়েছে কিনা। মোতালিব দারোগা সব কটা দাঁত বের করে বলল, ‘জানতাম তোকে এখানেই পাওয়া যাবে। চল আজকে আমার সাথে তোকে চারটা ভাত খেতেই হবে।’ মনে মনে প্রমাদ গুনল মনা। জেলের ভাত তার মোটেও পছন্দ না। সব সিন্থেটিক খাবার দাবার সেখানে। কিভাবে বজ্র মুষ্ঠি হতে মুক্তি পাওয়া যায় মনে মনে তাই ভাবছিল, যদিও সে জানে এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে। ছেঁড়ার আশা স তো দুরাশা মাত্র।
ঠং করে একটা শব্দ হল কোথায় তরপর পরই মোতালিব দারোগার মুখে একখানা প্রশান্তির হাসে ফুটে উঠল এবং ঠিক তারপরেই সে ঠাস করে ঘুমিয়ে পড়ল। দারোগার পিছনে দেখা গেল সদানন্দ ভুত একখানা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সাধু পুরুষের ভাব যেন পৃথিবীর কোন পাপ তাকে স্পর্শ করেনি। মনা কে হা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে হুড়ো দিল, ‘হা করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? জলদি ভাগ। লগ্ন বয়ে যায়।’ মনা একখানা কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে ঝেড়ে দৌড় দিল।
জাতীয় স্মৃতি সৌধ। ইদানিং এখানে আর কেউ আসে না। চারিদিকে শুধু ধুলো বালি আর নিঃসঙ্গ বাতাসের হাহাকার। মনা চোরা তার চুরি করা ফুলকটা স্মৃতি সৌধের পাদদেশে রাখলো। বহু আগের কিছু আধ পাগলা মানুষ মরে গিয়ে তাকে শিখিয়েছিল স্বাধীনতা কাকে বলে। প্রতি বছর এই দিনে মনা তাদের কথা স্মরণ করে। দিব্যচশমাটা চালু করতেই সে দেখতে পেল তার সোশ্যাল নেটওয়ার্কের সব বন্ধুরা বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে রঙচঙে সব স্ট্যাটাস দিচ্ছে। সব কটা পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রির বাণী, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ছাড়ব আমরা।’ বিচার যে করে ছাড়বে সেটা মনাও জানে। বিচারের জন্যইতো লইফ সাপোর্ট দিয়ে গোলাম আযম, নিজামী আর মইত্যা রাজাকারদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
মনা ব্যালান্স চেক করে দেখলো এখনো তার স্টকে একটা দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়ার মতো বাতাস বাকি আছে। তারপর সাবধানে বাতাসটুকু খরচ করল সে। নাহ্ এখন সে দীর্ঘঃশ্বাস খরচ করতেই পারে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ডিসেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


