জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের এমপিদের দূর্নীতি নিয়ে করা সিরিজট প্রায় শেষ বলা যায়। নতুন কোন তথ্য পেলেই আবার জানানো হবে সবাইকে।
এখন আসি কেন এই সিরিজটি লিখলাম সেই প্রসংগে। কেন আমি জামাতকে ঘৃনা করি।
জামাতকে কেন ঘৃনা করি :-
জামাত বিরোধীতার মূল কারন ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকা। তাদের জনগ্রহনযোগ্যতা এই বাংলায় কখনই ছিল না। সত্তর সালের নির্বাচনে তারা মাত্র চারটি আসনে জয়লাভ করে। তাদের প্রাদেশিক আমীর গোলাম আজম আওয়ামী লীগের জহিরুদ্দীনের কাছে ৮০৬৭৭ ভোটের ব্যবধানে হেরে যায়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার পরে ৪ এপ্রিল গোলাম আজম জেনারেল টিক্কা খানের সাথে দেখা করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছিল। [পূর্বদেশ, ৫ এপ্রিল, ১৯৭১]
১৫ এপ্রিল গঠিত শান্তি কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে গোলাম আজম যোগ দেয় এবং এই মাসেই সকল জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে গঠিত শান্তি কমিটিতে জামাতে ইসলামীর নেতা কর্মীর আধিক্য দেখা যায়। [দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ এপ্রিল, ১৯৭১] শান্তি কমিটি কর্মকান্ড সম্পর্কে তো আর নতুন করে কিছু বলার নাই। ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজন করা এক সম্মেলনে গোলাম আজম বলে - “পাকিস্তানের হাজারো দুশমন আছে, কিন্তু বাইরের চেয়ে ঘরে সেই সময়ে সৃষ্ঠি হওয়া দুশমনরা বেশি বিপদজনক। শান্তি কমিটি যদি দুনিয়াকে না জানান দিত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ দেশকে অখন্ড রাখতে চায়, তাহলে পরিস্তিতি হয়ত অন্য দিকে মোড় নিত”। [দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ আগস্ট, ১৯৭১]
শান্তি কমিটিকে সহায়তা করার লক্ষ্যে মে মাসে খুলনায় জামাতের এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম ইউসুফ প্রথম গঠন করে রাজাকারের দল। ঢাকার মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল কলেজের রাজাকারদের ট্রেইনিং ক্যাম্প পরিদর্শনকালে (১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১) গোলাম আজম বলে - “রাজাকার কোন দলের নয়, দেশের সম্পদ! নিহত রাজাকার রশিদ মিনহাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় এই বলে যে তার কাছ থেকে তরুণদের শেখার আছে!” [দৈনিক পাকিস্তান, ২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১]
আল বদর বাহিনীও জামাত প্রতিষ্ঠা করে। এর নেতৃত্বে ছিল মতিউর রহমান নিজামী (সমগ্র পাকিস্তান প্রধান), আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ (প্রাদেশিক প্রধান/পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান), ঢাকা মহানগরের নায়েবে আমীর মীর কাশেম আলী (৩য় নেতা) ও মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (প্রধান সংঘটক)। গোলাম আজমের তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হতো। আল বদরের ঘৃণ্য কর্মকান্ড সম্পর্কেও আমরা সবাই অবগত আছি।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এভাবে দেশের সাথে বেইমানি করা ছাড়াও তারা রাজনৈতিক কূটনীতিতে ব্যস্ত ছিল যাতে করে ক্ষমতা দখল করা যায়। সেই লক্ষ্যে ডানপন্থী দলগুলোর সাথে জোট বাঁধার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। সেই সময়ে জাতিসংঘের অধিবেশন থাকায় ১৭ সেপ্টেম্বর একটি মন্ত্রীসভা গঠন করা হয় যাতে মন্ত্রী ছিল আব্বাস আলী খান (শিক্ষামন্ত্রী) ও মাওলানা এ কে এম ইউসুফ (রাজস্বমন্ত্রী)। আব্বাস আলী খান পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনার জন্য একটি কমিটিও গঠন করে যাতে করে ইসলামী মূল্যবোধ আর পাকিস্তানী আদর্শে বইগুলো সাজানো যায় এবং কমিটির দেয়া সুপারিশগুলো মেনে চলার সিদ্ধান্তও নেয়। [দৈনিক ইত্তেফাক, ১০ নভেম্বর, ১৯৭১]
আওয়ামী লীগের শূন্য হওয়া জাতীয় পরিষদের আসনগুলোতে জামাত নির্বাচন করে এবং ১৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হয়। পাকিস্তা সরকার এই উপনির্বাচন ৬ ডিসেম্বর স্থগিত করে। এই উপ নির্বাচনে জয়ী (!) হয়ে তারা পাকিস্তানের অন্য কিছু দলের সাথে জোট বাঁধে। সেই সময় গোলাম আজম দাবী জানায় প্রধানমন্ত্রীর পদ কোন পূর্ব পাকিস্তানীকে দেবার জন্য। অবশ্য তা হয়নি। [দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ নভেম্বর, ১৯৭১]
এভাবে যে দল বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে পদে পদে, সেই দলের প্রতি আমার কখনো কোন মায়া আসে না। তাদেরকে পায়ে পিষে ফেলাই একমাত্র শাস্তি। জামাত তাই দলগতভাবে দায়ী, এই কথাতে কোন আপোষ নাই।
দূর্নীতি সিরিজের কারন :-
বেশ কয়েকবার আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল শুধু জামাতের এমপিদের দূর্নীতির কথা কেন বলি? সব দলেই তো এইরকম লোক আছে। হ্যা, সব দলেই দূর্নীতিবাজ আছে। কিন্তু আমার পয়েন্ট হলো জামাত তাদের ধর্মীয় দল হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা ধর্মীয় অনুশাসনে চলে। ধর্মের কথা বলে ভোটের রাজনীতি করে। দেওয়ালে লেখনে দেখা যায় - “সৎলোকের শাসন চাই”। সেইদলের নেতারা কেন তাহলে দূর্নীতি করবে ক্ষমতায় যেয়ে? ২০০১ সালের নির্বাচনে জামাতিরা বি এন পির সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও তাদের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো তারা আলাদাভাবে প্রকাশ করে। ম্যানিফেস্টোর প্রধান পয়েন্টগুলো ছিলঃ-
১. শরিয়া আইন প্রবর্তন করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন গঠন।
২. এই লক্ষ্যে জনমত সৃষ্ঠি করা।
৩. নামাজ বাধ্যতামূলক করে একটি আইন প্রনয়ন করা।
৪. বাইতুল আমান গঠন করা
ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে এই বিষয়গুলোতে তারা ভুলেও রা করেনি। ক্ষমতায় ৫ বছর থেকেও তারা শরীয়া আইন চালুর বিষয়ে সংসদে কোন বিল আনেনি। সংসদে একদিনও তারা জনমত পরীক্ষা করার জন্য আবেদন জানায় নাই যে দেশে শরীয়া আইন চালু হবে কি হবে না। নামাজ বাধ্যতামূলক করার আইনের ব্যাপারেও তারা টু শব্দটি করে নাই। শিক্ষার সর্বস্তরে ইসলামের মূল স্তম্ভগুলো সম্পৃক্ত করার কথা ঐ প্রস্তাবে ছিলো কিন্তু তারা ক্ষমতার ৫ বছর জবান বন্ধ করে ছিল তাদের এই ম্যানিফেস্টোর ব্যাপারে। বাইতুল আমান প্রতিষ্ঠা করে সরকারি কর আদায় সিস্টেমকে রিপ্লেস করার কথা থাকলেও তারা সেইটাও পালন করে নাই।
এই বিষয়গুলাতে জামাতের মুখ বন্ধ করে রাখা কি বুঝায়? তারা আসলেই একটা ভন্ড দল। তারা মুখে ইসলামের কথা বলে কিন্তু কাজে ইসলামের কোন প্রকাশ নেই। ভন্ডামি আর অসততাই তাদের বৈশিষ্ট্য। তারা রাস্তা খুঁজে যেন তেন উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে। যার জন্য একাত্তরে দেশের বিরুদ্ধে গিয়েছিল তারা। দেশের নিরপরাধ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে তারা তাদের লক্ষ্যে (ক্ষমতায় যাওয়া আর দূর্নীতিতে ডুবে থাকা) যে কোন উপায়ে পৌছাতে চায়। সেজন্য তাদের নিজেদের কর্মীদের বলতে বাধে না যে মরলে তারা বেহেশতে যাবে। তারা কিভাবে নিশ্চিত হলো জামাত শিবিরের লোকদের সব গুনাহ্ মাপ হয়ে গেছে!
যখন দেশ দূর্নীতিতে ডুবে গেল তখন জামাতের সৎলোকের শ্লোগান বেশ আকর্ষনীয় ছিল। তাতে মানুষ আকৃষ্ট হতে পারতো। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সেটা ছিল ভুয়া শ্লোগান।
একই সাথে আওয়ামী লীগ, বি এন পি তেও কিছু সুবিধাবাদী রাজাকার আছে। তাদের বিরুদ্ধে কখনো কিছু বলি নাই (তার মানে এই না যে ঐসব দলের রাজাকারদের প্রতি ঘৃণা নাই)। আওয়ামী লীগ বা বিএনপিতে থাকা রাজাকারদের নিয়ে লেখার কোন আগ্রহ আমার এই মুহুর্তে নাই শুধু একটি কারনেই। তা হলো জামাত। তারাই মূল অপরাধী। আগে তাদের বিনাশ হোক। তারপর বাকিদের। দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা যারা করেছে তারা সবাই সম অপরাধে অপরাধী। কিন্তু জামাত দলগত ভাবে করায় সবচেয়ে বড় শত্রু।
তাই জামাতের বিরুদ্ধে কলম ধরেছি। ধর্ম আর দূর্নীতি একসাথে যায় না।
আগামী পর্বে এতদিন তুলে ধরা জামাতি সাবেক এমপিদের দূর্নীতির একটি সারসংক্ষেপ দেয়া হবে।
উৎসর্গ: আমার এই সিরিজটি আমার খুব প্রিয় এক বড় ভাই, এস্কিমো ভাইকে উৎসর্গ করলাম। ওনার সাহায্য ছাড়া এই সিরিজ লেখা আমার দ্বারা সম্ভব ছিল না। প্রতিনিয়ত আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছেন উনি। অনেক ধন্যবাদ এস্কিমো ভাই।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ৭:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


