somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চেতনার বাইরে। (পর্ব-১)

০২ রা জুলাই, ২০০৮ রাত ৮:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এখন বাজে রাত পৌনে একটার মতো। এই মাত্র আবির নিতাইগঞ্জ স্টেশনে এসে নেমেছে। তার নিতাইগঞ্জ পৌঁছাতে এতক্ষণ লাগার কথা ছিলো না, পথের মধ্যে ট্রেনের ইঞ্জিনে কী যেন একটা সমস্যা দেখা দেয়, তাই ট্রেন পুরা পাক্কা দুই ঘন্টা লেট করেছে। পৌঁছাতে পৌঁছাতে অবশেষে মধ্যরাত্রি হয়ে গেলো।নিতাইগঞ্জ স্টেশনটা দাঁড়িয়ে খুবই সংকীর্ণ একটা প্লাটফরমের উপর। চারিদিকে নিকষ অন্ধকার, জনমানুষের কোন বালাই নেই। এতো নির্জন জায়গা এর আগে কোনদিন আবির দেখেনি। আবিরের মনে হচ্ছে সে তার হৃদ-কম্পনটাও যেন এখন স্পষ্ট শুনতে শুরু করেছে। একটা শব্দ অবশ্য পুরো জায়গাটা জুড়েই আছে, সেটা হচ্ছে ঝিঝি পোকার শব্দ, অনবরত তারা ডেকেই চলেছে। স্টেশনের একটা কোণা থেকে অবশ্য একটা লাল লাইটের আলো উঁকি মারছে। স্টেশন মাষ্টারের ঘর হবে হয়তো, তবে ওখানে আদৌ কেউ আছে কিনা সেই ব্যাপারে আবিরের যথেষ্টই সন্দেহ আছে। ঘরটার কাছে যেয়ে আবির দেখলো সেখানে আসলেই কেউ নেই। স্টেশনের পুরো পরিবেশটাই আবিরের কাছে কেমন যেন ঘোলাটে এবং অস্বাভাবিক লাগছে। এই ধরণের একটা আধি-ভৌতিক পরিবেশে ২৬ বছরের একজন শক্ত সামর্থ্যবান যুবক হওয়া সত্ত্বেও যে আবিরের বুকটা কিছুটা হলেও দুরু দুরু করতে শুরু করেছে--তা মনে হয় না বললেও চলে।
আবির খুবই ক্লান্ত, সারাদিন ট্রেনে থাকার দখলটা তার উপর দিয়ে ভালোভাবেই গিয়েছে। সে ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে গিয়ে প্লাটফর্মটার মাঝখানটায় থাকা রুগ্ন জরাজীর্ণ বেঞ্চীটাতে বসলো। তাকে অবশ্য নিতাইগঞ্জ স্টেশনটা পেরিয়ে আরও ভিতরের দিকে কইলান্দিপুর গ্রামে যেতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা কিভাবে সম্ভব হবে তা আবির বুঝে উঠছে না। এমনিতেই তো জায়গাটা জনমানবহীন, তার উপর এখানে কোন যানবাহনও তার চোখে পড়ছে না, সে কি করবে বুঝতে পারছে না। বাধ্য হয়েই হয়তো তাকে পুরা রাতটা স্টেশনের এই বেঞ্চিটাতে শুয়ে বসে কাটিয়ে দিতে হবে, তারপর সকাল হয়ে গেলে হয়তো এখানে রিকশা গাড়ি কিছু পাওয়া যাবে, তখন আশে পাশের লোকজনদের কইলান্দিপুর যাওয়ার রাস্তাটা জিজ্ঞাসা করে সে কইলান্দিপুরের দিকে রওনা দিতে পারবে--এই ভাবতে ভাবতেই আবির হঠাৎ করে খেয়াল করলো--তার দিকে কেউ যেন আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। অন্ধকারে প্রথমে শুধুই অবয়বটা বুঝা যাচ্ছিলো মানুষটার, এখন আস্তে আস্তে অন্ধকারের ভেতর থেকে বের হয়ে এসে মানুষটার পুরা আকৃতিটাই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। আবির এখন স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে-- আনুমানিক ষাট সত্তর বছরের একজন বয়স্ক মহিলা বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে যাওয়া শরীরটা নিয়ে হেলেদুলে তার দিকে এগিয়ে আসছে। আবির একটু চমকে গেলো। এতো রাতে যেখানে কোন মানুষ তো দূরে থাক, একটা পশু-পাখিরও অস্ত্বিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ঠেকছে, সেখানে এই বুড়ি কি কারণে এই স্টেশনমূখী হয়েছেন--তা আবির ভেবেই পাচ্ছে না। এই ভাবতেই ভাবতেই আবির হঠাৎ করে দেখলো বুড়িটা তার একদম কাছে চলে এসেছে। বুড়িটার মুখের অনেকটাই ঘোমটায় ঢাকা। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে যা দেখা যাচ্ছে তাতে আবিরের অনুমানটাই ঠিক মনে হচ্ছে। বুড়িটার মুখের চামড়া অবিশ্বাস্য কুঁচকানো, বয়সে কোন ভাবেই তার সত্তরের নিচে না।
বুড়িটা তার কুজো শরীরটা নিয়ে মাথাটা নিচু করেই আবিরকে বললো, "বাবা, আপনি কি কোন পেরেশানির মধ্যে আছেন?"
বুড়ির এই হঠাৎ প্রশ্নে আবির একটু ভড়কে গেলো। এই ধরণের জনমানবহীন একটা স্টেশনে এরকম বয়স্ক একজন মহিলার উপস্থিতি আবির কোন প্রকারেই সহজভাবে নিতে পারছে না। আবির খানিকটা ভয়ও পেতে শুরু করেছে বৈকি।
তারপরেও সে তার গলার স্বরটাকে যথা সম্ভব স্বাভাবিক রেখেই বললো, "জি, আমার আসলে কইলান্দিপুর গ্রামে যেতে হবে, কিন্তু এতো রাতে সেখানে কিভাবে যাবো তাই বুঝতে পারছি না, এখানে কোন যানবাহনও দেখতে পাচ্ছি না, তাছাড়া কইলান্দিপুর যাওয়ার রাস্তাটাও আমি খুব একটা ভালো চিনি না, তাই একটু চিন্তায় আছি।"
বুড়িটা বললো, "এইখান থেকে তো কইলান্দিপুর গ্রাম মেলা পথ। কম কইরা হলেও দুই ঘন্টার রাস্তা। মনে হয় না এই রাত্রে আর আপনার কইলান্দিপুর যাওয়া ঠিক হইবো, আপনে একটা কাজ করতে পারেন, আপনে এই রাতটা আমার বাড়িতে কাটাইতে পারেন, তারপরে কাইলকা সকাল হইলে আপনি কইলান্দিপুর রওনা হইয়া যাইয়েন।"
বুড়ির এই কথা শুনে আবির তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকালো। তার এই ব্যাপারটা এখনও বোধগম্য হচ্ছে না যে , হঠাৎ করে কেনই বা এই বুড়িটা এতো রাতে এদিকে আসলো এবং এখন কেনই বা তাকে সেধে সেধে নিজের বাড়িতে রাতটা কাটানোর পরামর্শ দিলো। বুড়ির কথায় কি জবাব দিবে আবির বুঝতে পারছে না।
শেষে অনেকক্ষণ চুপ থেকে আবির বললো, "আসলে আমি এখনও আপনার পরিচয়টাই তো জানলাম না। তাছাড়া এই জনমানবশূণ্য একটা জায়গায় এতো রাতে আপনি কীই বা করছেন তাও তো বুঝতে পারছি না। তার উপর আপনি আমাকে চেনেন না জানেন না, অথচ আমাকে আপনার বাড়িতে রাতটা কাটানোর কথা বলছেন। পুরা ব্যাপারটাই কেমন অস্বাভাবিক না? তাছাড়া আপনাকে আমি বিশ্বাসই বা করি কি করে?"

বুড়িটা আগের মতোই মুখটাকে ঘোমটার আড়াল করে বললো, "আমার বাড়ি এইখান থেকে দশ মিনিটের রাস্তা। আমি গত ৪০ বছর ধইরা এইখানেই থাকি। আমি এই পথ ধইরাই বাড়ির দিকে যাইতেছিলাম। হঠাৎ আপনারে দেইখা মনে হইলো আপনে হয়তো কোন বিপদে পইড়া এইখানে বইসা আছেন। সাধারণত কেউ এতো রাত পর্যন্ত এই স্টেশনে বইসা থাকে না। জায়গাটা খুব নীরব। নীরব জায়গা ভালা না। তাই ভাবছিলাম--আপনারে একটু সাহায্য করি। এখন আপনে যদি মনে করেন আমার লগে যাওয়া আপনের ঠিক হইবো না,তাইলে যাওনের দরকার নাই। আমি বরং যাই গা।"

কথাগুলো বলেই বুড়ি উল্টা দিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করলো। আবির বুঝতে পারছে না সে কি করবে। হুট করে কোথা থেকে আসা এক বুড়িকে বিশ্বাস করে তার সাথে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? আবার এমন নিশুতি রাতে এই জনমানবহীন একটা অন্ধকার জায়গায় পুরো রাতটা কাটানো-- বড় কোন অঘটন ডেকে আনবে না তো? এর চেয়ে বুড়ির কথাটাকে বিশ্বাস করে তার সাথে যাওয়াটাই কি শ্রেয় হবে?যেহেতু বুড়ির কথাগুলো খুব একটা অবিশ্বাসযোগ্যও মনে হচ্ছে না, তার বাড়িতে রাতটা কাটানোই কি বুদ্ধিমানের কাজ ?--কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না আবির। এদিকে বুড়ি আস্তে আস্তে আবিরের কাছ থেকে দূরে চলে যেতে শুরু করেছে। আরেকটু গেলেই বুড়িটা অন্ধাকরে মিলিয়ে যেতে শুরু করবে। আবির খুব দ্রুত চিন্তা করছে। কিন্তু তার চিন্তাগুলো তার যেয়েও দ্রত গতিতে জট পাকাতে শুরু করেছে।
তারপর শেষমেষ কি জানি কি ভেবে আবির চিৎকারে করে পিছন থেকে বুড়িটাকে ডাক দিলো, "এই যে শুনছেন?"

আবিরের ডাক শুনে বুড়িটা থমকে দাঁড়ালো। নিজের কুঁজো হয়ে যাওয়া শরীরটার পুরোটাকে আবার আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে আবিরের দিকে আসতে আরম্ভ করলো বুড়িটা।


...........................(চলবে)


সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১৯
১৫টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×