somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চেতনার বাইরে। (পর্ব--২)

০৩ রা জুলাই, ২০০৮ রাত ৮:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বুড়িটাকে কষ্ট করে আর আবিরের কাছে আসতে হলো না, উল্টো আবিরই হনহন করে হেঁটে হেঁটে বুড়ির কাছে এসে থামলো।

আবির অত্যন্ত কোমল এবং অপরাধ মাখা স্বরে বললো, "দেখুন আমি আসলে আপনাকে কথাগুলো ঠিক ওভাবে বলতে চাইনি। বুঝতেই তো পারছেন, স্টেশনটা এমনিতেই কেমন ভূতূড়ে, তার উপর এতো রাতে আপনার মতো একজন বয়স্কাকে দেখে আমি সত্যিই চমকে গিয়েছিলাম। ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম কি করবো, তাই আপনি যখন আমাকে আপনার বাড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন তখন একটু দ্বিধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। তবে এখন আমি ঠিক করে ফেলছি, আমি আপনার সাথেই যাবো, আপনি যদি অনুমতিটা এখন আবার দেন।"

এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলো আবির। কথাগুলো শুনে বুড়ি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, "আপনে ভাইবা চিন্তা ঠিক করছেন তো? পরে আবার আমার লগে যাইয়া কিন্তু কইতে পারবে না যে আপনারে আমি কেন বাড়িতে লইয়া গেলাম।"
আবির সাথে সাথেই বললো, "আপনি মনে হয় এখনো আমার উপর রাগ করে আছেন, আপনাকে আর ঐসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, আমি ভেবে চিন্তেই আপনার সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।আপনি দয়া করে হাঁটতে শুরু করেন, আমি আপনার সাথে সাথেই হাঁটছি।"

বুড়ি আর কিছু বললো না, হাঁটতে শুরু করলো তার আপন গতিতে। আবিরও তার পিছন পিছন হাঁটতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় তারা বুড়ির বাড়িতে গিয়ে পোঁছালো।

বুড়ির বাড়িটা দৌচালা একটা টিনের ঘর। টিনের উপর ছনের মতো কি যেন দেখা যাচ্ছে। অন্ধকার থাকায় আবির খুব একটা ভালো বুঝতেও পারছে না। ঘরের মধ্যেও গুটগুটে অন্ধকার। বাড়িতে বুড়ি ছাড়া আর মনে হয় কেউ থাকে না। বুড়ি আবিরকে বাইরে দাঁড়া করিয়ে রেখে ঘরের ভেতর গেলো হারিকেন ধরাতে। আবিরের সত্যিই এখন খুব ভয় লাগতে শুরু করেছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সে আগে কোন দিনই পড়ে নি। এতো রাতে চেনা নেই জানা নেই এমন একটা জায়গায় এসে পড়লো সে। তার উপর বুড়ির চলাফেরা গতিবিধিও কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগতে শুরু করেছে--সব চিন্তা ভাবনা করে, নিজের ভাগ্যটাকেই দুষতে শুরু করলো আবির। এমন সময়ই হঠাৎ করে বুড়িকে দেখা গেলো, হারিকেন নিয়ে ঘরের ভেতর থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। আবিরের কাছে এসে বুড়ি বললো, "আপনে ঘরে আসেন, সামনের এই রুমটায় বসেন। আমি ভিতরের রুমে আছি। আপনে আরাম করেন। আমি আপনের খাওন দাওন আমার মেয়েরে দিয়া পাঠাই দিতাছি।"
এই কথা শুনে চমকে গেলো আবির, এতক্ষণ সে ভেবেছিলো বুড়ির হয়তো কেউই নেই। একাই থাকেন বাড়িটাতে। অথচ এখন বলছেন মেয়েকে দিয়ে খাওয়া পাঠাবেন। আবার এতক্ষণ বাড়ির পুরোটা জুড়েই গুটগুটে অন্ধকার ছিলো। বাড়িতে অনন্ত একজন মানুষ থাকলেও তো এই ধরনের পরিবেশ বিশ্বাসযোগ্য না। বুড়িকে ধীরে ধীরে আরও রহস্যময়ী মনে হচ্ছে তার। আবির কি করবে বুঝতে পারছে না। সে কি আবার ফিরে যাবে স্টেশনের দিকে?
আবির অন্যমনস্ক হয়ে চিণ্তা করছিলো এই সব কথা, হঠাৎ করেই গলার স্বর কিছুটা উঁচু করেই বুড়িটা বললো, "কি হইলো, আপনে ভিতের আসেন না ক্যান, দরজা দিয়া দিমু তো।রাইত মেলা হইয়া গেলো। তাড়াতাড়ি ভিতরে আসেন।"
আবির আর কিছু ভাবার আগেই ঘরে ঢুকে গেলো। বুড়ি ঘরের দরজাটা লাগিয়ে আস্তে আস্তে ভিতরে চলে গেলেন।
আবির বসে আছে একটা খাটিয়ার উপর।সে প্রচন্ড রকম ঘামাতে শুরু করেছে। তার খুবই অস্থির লাগছে। তবুও আবির যথা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। জুতা, মোজা খুলে বসেছে সে। শার্টের উপরের দিকের দুইটা বোতামও খুলে দিয়েছে। রুমটাতে কোন ফ্যান না থাকায় আবিরের প্রচন্ড গরমও লাগছে। এই মুহূর্তে তার পানি খাওয়া দরকার। যার খাওয়া নিয়ে আসার কথা, সেও তো আসছে না। আবিরের ভালো ক্ষুধাও লেগেছে। শরীরটাকে কিছুটা এলিয়ে দিয়ে সে শুন্য চোখে তাকিয়ে আছে ঘরটার সিলিং এর দিকে। হঠাৎ করেই তার পকেটের মোবাইলটার কথা মনে হলো; টেনশান, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে ভুগতে সে মোবাইলের কথা ভুলেই গিয়েছিলো। মা নিশয়ই এতক্ষণে অনেক বার ফোন করেছে। কিন্তু ফোনের আওয়াজ তো সে শুনলো না, ভাবতে ভাবতেই মোবাইলটা পকেট থেকে বের করলো আবির। হায় খোদা! মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই। এই জন্যই তো মোবাইলের কোন সাড়া শব্দ নেই। মা নিশ্চয়ই এতক্ষণে ফোন করে করে তাকে না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছেন।

এমন সময় ঘরে ঢুকলো একটা মেয়ে।বুড়ির মেয়েটাই হয়তো। মেয়েটার বয়স ২৩/২৪ এর মতো হবে। পল্লী সংস্কৃতির আদলে দুই প্যাঁচ দেয়া একটা শাড়ি পড়েছে সে। মাথায় ঘোমটা দেয়া। কিন্তু ঘোমটায় মেয়ের মুখটা ঢাকা পড়ে নি। ঢাকা পড়লে মনে ভালোই হতো। এমন অবিশ্বাস্য রুপ দেখার চেয়ে মনে হয় না দেখাও ভালো। আবির তার চোখ ঘুরাতে পারছে না। ছোট বেলায় সে মার কাছ থেকে পরীদের গল্প শুনেছিলো। কিন্তু কোন পরীও এর চেয়ে সুন্দর হতে পারে কিনা, সন্দেহ আছে। মেয়েটার সৌন্দর্য্য এই মুহূর্তে আবিরের কাছে অপার্থিব ঠেকছে। সাধারণ ভাষায় মানুষকে যে ধরনের ফর্সা বলা হয়, এই মেয়ে তার চেয়ে হাজার গুণে বেশী ফর্সা। তার গায়ের রঙটাকে ঠিক ফর্সাও বলা চলে না। মনে হচ্ছে কেউ যেন তার মুখটাতে লালচে ধরণের একটা আভা মাখিয়ে দিয়েছে। মেয়েটার পুরো রুপ, অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে যেন এগুলো পাতার উপর ভেসে থাকা জলের ফোটা। টোকা দিলেই ফোটাটা পাতা বেয়ে বেয়ে পড়তে শুরু করবে। আবির মেয়েটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকলো।

আবিরের দিকে না তাকিয়েই মাথা নিচু করে মেয়েটা হঠাৎ বললো, "আপনের খাবার দিয়া গেলাম। আপনে খান। কোন কিছু লাগলে আওয়াজ দিয়েন। আমার নাম কুসুম।"
আবির এখনও হা করে তাকিয়ে আছে। সে কি বলবে বুঝতে পারছে না। মেয়েটার তার জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন সে আবিরের "আচ্ছা" না বলা পর্যন্ত দাঁড়িয়েই থাকবে। হঠাৎ আবিরের মনে হলো, মেয়েটার একটা ছবি নেয়া দরকার। ছবি আঁকা আর ছবি তোলা আবিরের ছোটবেলার অভ্যাস। সে যেখানেই যায় তার সাথে একটা ডিজিটাল ক্যামেরা আর ছবি আঁকার জিনিসপত্র থাকে। আবির আর দেরী করলো না। সে তাড়াতাড়ি তার ব্যাগ থেকে ডিজিটাল ক্যমেরাটা বের করলো, এই ধরনের একটা অপার্থিব সৌন্দর্য্যকে যদি সে ক্যামেরায় বন্দী করতে না পারে, তাহলে তার পুরো জীবনটাই বৃথা হয়ে যাবে।
ক্যামেরাটা বের করেই আবির কুসুমকে বললো, "কুসুম, আমি কি আপনার একটা ছবি তুলতে পারি।"
কুসুম কিছু বলছে না, কিন্তু সে যে মুচকি মুচকি হাঁসছে তা বোঝা যাচ্ছে। আবির আবার জিজ্ঞাসা করলো, "কুসুম আমি যদি আপনার একটা ছবি তুলি, আপনার কি তাতে কোন আপত্তি আছে?"
কুসুম মাথা নিচু করেই না সূচক মাথা নাড়লো।
আবির তাড়াহুড়া করে তার ক্যামেরার ফ্ল্যাশটা রেডী করে কুসুমের মুখ বরারবর ক্যামেরাটা নিয়ে আসলো। ফোকাসটা ঠিক করে নিয়েই সে পর পর তিনটা ছবি তুললো কুসুমের।

ছবিগুলো তুলেই আবির সাথে সাথে তার ক্যামেরার স্ক্রিনে চোখ রাখলো। একি! কুসুমের একটা ছবিও ওঠেনি। ভালো করে ছবিগুলো তাকিয়ে দেখলো আবির। কুসুমের আশেপাশে এবং পিছনে রাখা সব আসবাবপত্রেরই ছবি উঠেছে, শুধু কুসুমের ছবি নেই। ধক্ করে উঠলো আবিরের বুক। এমন কান্ড সে আগে কোন দিন দেখেনি।আবির কিছুই বুঝতে পারছে না,
এরই মাঝে কুসুম বলে উঠলো, "আমি এখন
যাই?"
"দয়া করে যাবেন না, আমি আপনার আর কয়েকটা ছবি তুলবো", বলেই আবির এক নাগাড়ে আরও পাঁছটা ছবি তুললো কুসুমের।
আবির আবার তার ক্যামেরার স্ক্রিনে চোখ রাখলো। কি আশ্চর্য্য! সবই ঠিক আছে, আসবাবপত্র সহ অন্য সব কিছুরই ছবি উঠছে, শুধু কুসুমের ছবি ওঠেনি।
এরই মাঝে কুসুম আর আবিরের অনুমুতির জন্য দাঁড়িয়ে না থেকে হুট করে অন্য ঘরে চলে গেলো।

আবির নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে অস্বাভাবিকভাবে ঘামতে শুরু করেছে। ভীষণ ভয়ও লাগছে তার । পেটটা গুলিয়ে যেন বমি আসতে শুরু করেছে। আবির নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। তার চোখগুলোও যেন আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে আসছে। আবির স্পষ্টই বুঝতে পারছে--অস্বাভাবিক, কঠিন এক ঘোরের মধ্যে চলে যেতে শুরু করেছে সে।


................................(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০০৮ রাত ৩:০৬
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×