বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি হচ্ছে সেই সন্ধ্যা থেকেই। এখন বাজে রাত সোয়া এগারোটার মতো।থামাথামির কোন লক্ষণ নাই।একই তালে একই গতিতে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। এই ধরনের বৃষ্টিতে নীরাকে খুবই খুশি খুশি দেখায়, আজও দেখাচ্ছে। তার জন্য এই ধরনের ঝুম বৃষ্টি ব্যাপক আনন্দের খোরাক। প্যানপ্যানে বৃষ্টি সে একদমই দেখেতে পারে না। এক ধরনের বৃষ্টি আছে সারাক্ষণই টিপটিপ করে পড়তে থাকে, নীরার ভাষায় সেটাই হচ্ছে প্যানপ্যানে বৃষ্টি। সে তার রুমের দুই দিকের সব জানালা খুলে দিয়েছে, ব্যালকনির বারান্দাটাও পুরোপুরি খোলা। বৃষ্টির পানিতে ভিজে ওঠা বাতাস তার ঘরে প্রবল অবাধ্যের মতো ঘোরাফেরা করছে।মাঝে মাঝে জানালার ফাঁক গলে বৃষ্টির ফোটা এসে জানালার ঠিক পাশেই থাকা নীরার বিছানাটাকে বারে বারে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তাতে অবশ্য নীরার কোন মাথাব্যাথা আছে বলে মনে হচ্ছে না। সে আপন আনন্দে ঘরের এক মাথা হতে অন্য মাথায় পায়চারি করে বেড়াচ্ছে। সিডি প্লেয়ারে শ্রীকান্তের গান চলছে লো ভলিউমে---
"আমার সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ , বৃষ্টি তোমাকে দিলাম,
শুধু শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু তোমার কাছে চেয়ে নিলাম।"
গানটার সাথে অবশ্য তার আজকের দিনটার কিছু জায়গায় জাগায় মিল আছে। আজ সারাদিনই সে মুহিবের সাথে কাটিয়েছে। মেঘলা আকাশটাকে মাথা নিয়ে দুজনে মিলে ঢাকার এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে। বিকেলের দিকে আশুলিয়ার দিকেও গিয়েছে ওরা। সেখানে চটপটি ফুচকা খেয়েছে, গত কয়েকদিনের প্রবল বৃষ্টিতে আশুলিয়ের দুই প্রান্তে ফুলে ওঠা খাল বিলের পানি গুলের দিকে চেয়ে থেকে মুহিবকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ বসেও থেকেছে নীরা। সে মনে প্রাণে চাইছিলো যেন বৃষ্টি নামে। কারণ তার প্রবল কান্না পাচ্ছিলো তখন। বৃষ্টি আসলে ভালোই হতো, সে অঝোর ধারায় কাঁদতো, অথচ তার কান্নার জল বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যেত বলে মুহিব হয়তো কিছুই বুঝতো না। কিন্তু বৃষ্টি আসে নি, নীরাও অনেক কষ্টে তার কন্নাকে সামাল দিয়েছে। নীরা খুবই আবেগপ্রবণ একটা মেয়ে কিন্তু নিজের আবেগকে সংবরণ করার বিরাট ক্ষমতাও তার আছে।আজকে তার জায়গায় অন্য কোন মেয়ে হলে কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে যেত, অথচ সে বিরাট ধৈর্য্যের সাথেই সে আবেগকে সংবরণ করেছে যদিও বাসায় আসার পর সে টানা আধা ঘন্টা অঝোরে কেঁদেছে, কারণ তার কান্নার কারণটাও বিশাল। মুহিবের সাথে আজকেই তার শেষ দেখা হয়েছে। মুহিবের সাথে তার ছয় বছর বয়সী ভালবাসার করুণ সমাপ্তিটাও হয়ে গেলো এই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। কারণ গত এই মাসের দুই তারিখে নীরার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। দুই দিন পরেই তার বিয়ে। নীরার বাবা মুহিবকে পাত্র হিসাবে অযোগ্য ঘোষনা করাতেই তাদের এই পরিণতি, অবশ্য পাত্র হিসাবে মুহিব অযোগ্যই বলা যায়। মাস্টার্স পাশ করেছে সে গত বছর। এখনও কোন চাকরি বাকরি খুঁজে পায় নি, ফকিরাপুলের একটা মেসে থাকে সে। দুইটা টিউশনির অল্প কয়েকটা টাকা দিয়ে যেখানে মুহিবের নিজের দিন কাটতেই কষ্ট হয়, সেখানে নীরাকে বিয়ে করে তার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করার মতো কোন যোগ্যতার লক্ষণই মুহিব দেখাতে পারে নি। কাজেই নিজের একমাত্র মেয়েকে এই ধরনের মেরুদন্ডহীন একটা ছেলের কাছে বিয়ে দেয়ার কথা কোনভাবেই চিন্তা করতে পারেননি নীরার বাবা। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে, নীরাকে তার বাবা কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে মুহিবের মতো একটা উজবুকের সাথে না ঘোরাফেরা করার জন্য। নীরা বাবাকে কিছুই বলতে পারে নি, কিছু বলতে পারেনি সে মুহিবকেও। কারণ সে নিজেও জানে মুহিবের আসলে করার কিছুই নেই। শুধু যেদিন তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো সেদিন মুহিবকে সে বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা জানিয়েছে ধরা গলায়, মুহিবও কিছু বলতে পারে নি। শুধু অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর নীরাকে শেষ বারের মতো দেখা করার জন্য অনুরোধ করেছে সে।
বাস্তবতার আঘাতে নিজের ভালোবাসটা যে এভাবে ক্ষয়ে যাবে তা কোনদিন স্বপ্নেও কল্পনা করেনি নীরা। অবশ্য মুহিবের সাথে তার প্রথম দেখা হওয়া সেখান থেকে প্রেম এসব কিছুকেই খুব একটা চিন্তাপ্রসূত ব্যাপার বলা যাবে না, সবই ঘটেছে নীরার ঝোঁকের মাথায়। তার এখনও মনে আছে সেই দিনটার কথা। শ্যামলীর একটা ফুটপাথ ধারে কথায় যেন যাচ্ছিলো নীরা। হঠাৎই সে দেখলো ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে ২২/২৩ বছরের সুন্দর গোলগাল চেহারার একটা ছেলে এক আইসক্রীমওয়ালার কাছ থেকে কয়েকটা আইসক্রীম কিনে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টোকাই টাইপ কয়েকটা বাচ্চাকে আইসক্রীমগুলো খেতে দিচ্ছে। সেই গোলগাল চেহারার সুন্দর ছেলেটাই হচ্ছে মুহিব। এই দৃশ্য দেখার পর পরই নীরা মুহিবের কাছে গিয়ে তার ভালো লাগার কথা জানিয়েছে। মুহিব ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ নীরার দিকে তাকিয়ে নীরাকে পাগল টাগল ভেবে যখন চলে যাওয়ার উপক্রম করছিলো তখনই নীরা মুহিবকে আটকায় এবং সেধে সেধে মুহিবের মেসের ফোন নাম্বারটা নিয়ে রাখে। পরের কয়েক দিন প্রায় প্রতিদিনই নীরা মুহিবকে ফোন করত এবং একসময় মুহিব নীরার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো।আজ এতোটা কাল পরে এসে নীরার মনে হয়েছে আসলে বাস্তবতার ব্ল্যাক-হোলটার মাঝে সব স্বপ্ন আশা আকাঙ্খা হারিয়ে যায় একসময়। মানুষগুলোও কেমন করে যেন নির্লজ্জের মতো বিনা যুদ্ধে বাস্তবতার কাছে আত্নসমর্পণ করে, যেমন সে নিজেও করেছে। মুহিবের সাথে সম্পর্কটার পরিণতি দেখে ফেলেছে সে, নিজেকে আগত জীবনের জন্য প্রস্তুতও করে ফেলেছে অনেকটা এবং এখন আপাত আনন্দ নিয়ে হলেও বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝুম বৃষ্টি দেখছে, নীরা যখন এসব ভাবছিলো হঠাৎ বৃষ্টির একটা ঝাপটা কোথা থেকে এসে তাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেলো। কেমন যেন কেঁপে উঠলো নীরা-- বাস্তবতাই যদি জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হয়, তবে এতো স্বপ্ন, এতো আশা আকাঙ্খার মানে কোথায়?--নিজের মনে মনেই আবার ভাবতে আরম্ভ করলো নীরা। সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও নিয়তির কাছে যদি নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয় তবে এই শ্রেষ্ঠত্বের মানে কি?এর চেয়ে তো নিজের কাছে নিজের হেরে যাওয়াই তো শ্রেয়।কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাতে শুরু করেছে নীরাকে, কিছু একটা যেন চিন্তা করলো সে, এরপর আস্তে আস্তে নিজের পড়ার টেবিলটার কাছে এসে থামলো নীরা। টেবিলটার ড্রয়ারটা ভালো করে ঘেঁটে ঘুঁটে ধারালো একটা ব্লেড বের করে আনলো সে। ব্লেডটা নিয়ে সে তার বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। গভীর দৃষ্টি নিয়ে সে ব্লেডটার দিকে তাকিয়ে আছে এখন। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ে চলেছে, সিডি প্লেয়ারটাতেও শ্রীকান্তের সেই গানটা বেজে চলেছে অবিরাম।
নীরার বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার খবরটা শোনার পর থেকেই মুহিব স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বন্ধ করে দিয়েছে। সে সারাদিন মেসে শুয়ে থাকে। টিউশনি করতেও সে আজকাল আর বের হয় না। শুধু আজ বের হয়েছে সে নীরার সাথে দেখা করার জন্য। দেখা করে এসেই সে আবার তার মেসে এসে শুয়েছিলো। রাত আটটার তার কাছে একটা চিঠি আসে। অনেক অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিঠিটা খুলে সে পড়তে আরম্ভ করে এবং পড়া শেষ করার পর সে তার নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারে না, সে অনবরত ঘামতে থাকে। ব্যাপার যেটা হয়েছে তা হলো--আজ থেকে দুই বছর আগে সে বাংলাদেশে অবস্থানকারী এক ব্রিটিশ ভদ্রমহিলাকে ছিন্তাইকারীর হাত থেকে বাঁচিয়ে ছিলো। ঘটনার পর মহিলা মুহিবের কাছ থেকে তার ঠিকানা নিয়েছে এবং যাওয়ার সময় বলেছে, এই ঘটনার জন্য সে মুহিবের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ এবং এই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মুহিবের ঠিকানায় সে একটা উপহার সময়মতো পাঠিয়ে দিবে। মহিলার কথায় মুহিবের খুব একটা ভাবান্তর হয়নি সেদিন। সে ভেবেছিলো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার পর অতি আহ্লাদের বশে হয়তো মহিলা কথাগুলো বলেছে। সে হাসিমিখেই সেদিন মহিলাকে বিদায় দিয়েছে।
মুহিব মহিলাটার কথা ভুলেই গিয়েছিলো, চিঠিটা পড়ার পর তার মহিলার কথা আবার মনে পড়েছে, চিঠিটে যা লেখা আছে তার সারসংক্ষেপ হলো--ব্রিটিশ এই মহিলা নিঃসন্তান ছিলেন এবং একমাস হলো তিনি মারা গিয়েছেন, মারা যাওয়ার আগে তিনি তার বিপুল সম্পত্তির অর্ধেকটা একটা এতিমখানায় ডোনেট করে দিয়ে যান আর বাকি অর্ধেকটা মুহিবের নামে লিখে দেন, এই অর্ধেক সম্পত্তির মূল্যমান বাংলাদেশী টাকায় প্রায় কয়েক কোটি টাকার মতো। চিঠিটা পড়ার পড় মুহিব কতক্ষণ ঝিম মেরে পড়েছিলো। তারপর কোনরকমে উঠে দুই তিন ঘন্টা অনেক দৌড়াদুড়ি করে এই চিঠির সত্যতা যাচাই করে সে এবং এই চিঠির বিষয়বস্তুর সত্যতা সম্পর্কেও অনেকটাই নিশ্চিত এখন সে, যেহেতু চিঠিটার একজায়গায় মহিলার নাম,ঠিকানা, ব্যাংক-একাউন্ট এর নাম্বার সবই উল্লেখ করা আছে। এই কতোক্ষণে মুহিবের কেবলই মনে হয়েছে জগৎ কতো রহস্যময়--একজনের মৃত্যু ঘটনা চক্রে অন্যজনের সামনে এক অপার দিগন্তের সূচনা করে দিয়ে যায়।
এখন বাজে রাত প্রায় সাড়ে বারোটার মতো। মুহিব গভীর আনন্দ নিয়ে নীরাকে ফোন করছে। সে নীরাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলবে এবং সে জানে সমস্ত ঘটনা শোনার পর নীরাও প্রবল অহংকারের সাথে তার বিয়েটা আটকে দিতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত নীরার বাবা মুহিবকে একজন যোগ্য পাত্র হিসাবে বিবেচনা করেই নীরার সাথে তার বিয়ের বন্দোবস্ত করবে। তাই প্রবল অস্থিরতা নিয়েই মুহিব নীরাকে ফোন করে চলেছে। কিন্তু নীরা ফোন ধরছে না। গত ১৫ মিনিট ধরেই মুহিব ফোন করে চলেছে। নীরা ফোন না ধরায় তার অস্থিরতা আরো বেড়ে চলেছে। মুহিবের আর তর সইছে না এতো বড় একটা ঘটনা নীরাকে জানানোর জন্য। কিন্তু নীরা ফোন ধরছে না, ফোন বেজেই চলেছে। ওদিকে প্রবল বৃষ্টিতে নীরার বারান্দাটায় পানি জমে একাকার অবস্থা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু একি! এই পানি তো বর্ণহীন না! পানিটা কেমন লালচে লাগছে, দেখতে দেখতে পুরো বারান্দাটার পানিই লাল রঙয়ে রাঙা হয়ে উঠলো--লাল! কি অসহ্য লাল!
*(পাঠক, মুহিবের ভাগ্য পরিবর্তনের ঘটনাটি সত্য ঘটনার আলোকে, আমি নিজে এই ঘটনার পরোক্ষ সাক্ষী)*
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ৯:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


