শেষ বিকালে অফিস থেকে বের হয়ে রিকশায় উঠে বাসার দিকে যখন রওনা করছিলো ফাহমিম, তখনও সূর্যটা নিভু নিভু করছিলো পশ্চিম আকাশে। আকাশের দিকে তাকিয়েই বিমোহিত হয়ে গেলো সে। আকশের গায়ে তথাকথিত নীলে রংয়ের কোন ছিটেফোটাও নেই। আকাশটাকে দেখে রংহীন বিশাল একটা ল্যান্ডস্ক্যাপের মতো মনে হচ্ছে। আর তার মাঝে মাঝে এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রঙ বেঙয়ের আঁকা-বাঁকা ছোপগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বেশ বড় মাপের কোন এক চিত্র শিল্পী সেই বিশাল ল্যান্ডস্ক্যাপটাতে আপন ঢঙে রঙ তুলির ঝড় তুলেছেন অপার্থিব ছন্দময়তায়। আকাশ নামক এই বিশাল ল্যান্ডস্ক্যাপটাকে কাঠের কোন ফ্রেমে বাঁধাই করে যদি ড্রইং রুমের দেয়ালে যত্ন করে সাজিয়ে রাখা যেত তাহলে মনে হয় খুব একটা খারাপ হতোনা--ভাবতে ভাবতেই নিজ মনে হেসে উঠলো ফাহমিম। ড্রইং রুমের মতো এতো গাল-ভরা একটা বিলাসিতার রূপক আর যাই হোক, অন্তত তার মতো স্বল্প বেতনের একজন এন.জি.ও কর্মীর দিনাতিপাতের কঠোর সংগ্রামের সাথে খুব একটা মেলে না। মালিবাগের একটা ছোট্ট চিপা গলির শেষ মাথায় অনেক কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকা একটা দোতলা বাড়ির নীচতলার যে ছোট্ট ঘরটায় সে থাকে তাকে ঘর না বলে একটা জরাজীর্ণ ঘুপচির মতো ধরা যেতে পারে। ঘরটার সাথে কোন রকমে জোড়া লাগিয়ে দেয়া সংকীর্ণ রান্নাঘর আর বাথরুমটাকে দেখলে মনে হবে এই ধরনের জোড়াতালি দেয়া আয়োজন যেন করাই হয়েছে ফাহিমের মতো জীবন সুতোর কোন রকমর ঝুলে থাকা মানুষগুলোকে জীবন নামক অতি মহার্ঘ্য এক বস্তুর, আর কিছু না হোক, অন্তত উচ্ছিষ্ট অংশের স্বাদটা প্রাণ ভরে নিতে দেয়ার জন্য।
ফাহমিম যখন তার বাসায় এসে পৌঁছে তখন সন্ধ্যার বিদায় লগ্নে আগত রাতের আয়োজনে পুরো মহা-নগরী রং বেরংয়ের আলোক সজ্জায় সজ্জিত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ফাহমিমের অফিস মতিঝিলে, মতিঝিল থেকে অফিস ছুটির এই বেলাটাতে মালিবাগ পৌঁছানো ছোটখাটো একটা যুদ্ধের মতো ব্যাপার। রাস্তায় অসহ্য জ্যামজট লেগেই থাকে, এই জ্যামজট ঠেলে মতিঝিল থেকে মালিবাগ পৌঁছাতে প্রায় প্রতিদিনই এক ঘন্টার মতো লেগে যায় ফাহমিমের। রিকশায় বসে থাকতে থাকতেই মাঝে মাঝে সে অস্থির হয়ে ওঠে, আর যেদিন বাসে করে বাসায় ফিরে সে-- গবাদিপশুর পালের মতো একজনের পিঠের সাথে আরেকজনের পিঠের, নিতম্বের সাথে নিতম্বের ধাক্কাধাক্কিতে কিংবা একজনের শরীর থেকে ভেসে আসা ঘামের দুর্গন্ধ আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে যাওয়ার অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতায় বাসে থাকার প্রতিটা মুহূর্তকে তার কাছে মনে হয় যেন জীবন গাত্রে এক একটা বিশাল বিষ-ফোঁড়া। এই সকল বিষ-ফোঁড়ার নীলে নীল হতে হতেই তাকে বাসায় ফিরে আসতে হয়। প্রতিদিন বাসায় ফিরেই সে যে কাজটা করে তা হলো-- বাথরুমটার মরচে ধরে যাওয়া ঝর্নাটা ছেড়ে তার নীচে ঠিক আধা ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা। আজও বাসায় ফিরে সে সেই কাজটাই করেছে। যেহেতু ফাহমিম এখনো অবিবাহিত এবং সে ছাড়া তার ঘরে আর কেউই থাকে না, অগত্যা রান্নাবান্না সহ ঘরের সব কাজ তাকেই করতে হয়। রান্নাবান্নায় অবশ্য ফাহমিমের হাত খুবই ভালো, বেশ কয়েক পদের রান্না করতে পারে সে, চা টাও বেশ ভালোই বানায়, ফাহিমের চা খেয়ে বাড়িওয়ালা মুগ্ধ হয়ে বলেছে--ফাহমিম যদি মেয়ে হতো শুধু মাত্র তার হাতের যা খাওয়ার জন্যই তিনি তার সাথে নিজের ছেলের বিয়ের দিতেন। আজো বাথরুম থেকে গোসল করে বের হয়ে গভীর আনন্দের সাথে নিজের জন্য কড়া করে এক কাপ চা বানিয়ে এনে খুব আয়েশী ভঙ্গিমায় খেয়েছে ফাহিম আর পায়ের উপর পা উঠিয়ে সূক্ষ মনোযোগ দিয়ে পত্রিকার পাতায় চাকরীর বিজ্ঞাপনগুলোতে চোখ বুলিয়েছে।
এখন রাত নয়টার মতো বাজে। ফাহমিম বসে আছে তার বিছানাটার ঠিক মাঝখানে। এই অভ্যাসটা তার খুব ছোটবেলার। বিছানায় বসতে গেলেই তাকে ঠিক মাঝখানটায় বসতে হয়, কোন কারণ ছাড়াই তার এই অভ্যাস। ছোটবেলায় বিছানার মাঝখনাটায় পা গুটিয়ে যেভাবে মায়ের কাছে পড়ত বসতো ফাহমিম, আজও সে সেভবেই পা গুটিয়ে বসে থাকে বিছানার মাঝে। বসে বসে সে এখন চ্যানেল আইতে রাতের খবর দেখছে। ফাহমিমের সাদা কালো দুনিয়াটা টেলিভিশনের রূপালী জগতেও সাদাকালোই। বহু কষ্টে সে একাটা সাদাকালো টেলিভিশন জোগাড় করেছে কয়েক মাস আগে, মান্ধাত্যার আমলের এক মডেল, রিমোর্টটা পর্যন্ত নাই, ডিশের লাইনটাও সে নিয়েছে বহু তদবীর করে, চোরাই লাইনই বলা যেতে পারে। বাড়িওয়ালায় লাইনের সাথে একটা চিকন মতো তার জুড়ে দিয়ে কোন রকমে ঝিরঝির অবস্থায় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো দেখে সে। বিরাট বিরাট সব দুর্নীতির এই দেশে এই ধরনের ছোটখাটো দুর্নীতি বিশাল সাগরের এক ফোটা পানির মতোই, কারো কোন মাথাব্যাথা থাকার কথা না এইসব ছোটখাটো চোরাই ব্যাপার নিয়ে।
হঠাৎ করেই ফাহমিমের ঘরের দরজাটায় বেশ কয়েকটা টোকা পড়লো। এই সময়ে তার কাছে সাধারণত কারো আসার কথা না, আজকে মাত্র মাসের ২০ তারিখ, বাড়িওয়ালাও নিশচয়ই তার বাড়িভাড়া নেয়ার জন্য আসেনি, তবে কে আসলো--ভাবতে ভাবতেই বিছানাটা ছেড়ে উঠে এসে ঘরের দরজাটা খুললো ফাহমিম। খুলেই চমকে গেলো সে। ২৫/২৬ বছর বয়েসের হালকা পাতলা গড়নের মোটামুটি রূপবতি একটা মেয়ে জগতের সকল অস্থিরতা আর উৎকণ্ঠা নিয়ে ভয়াল চোখে তাকিয়ে আছে ফাহমিমের দিকে। অচেনা অজানা এমন একটা মেয়েকে এতো রাতে এই অবস্থায় দেখে ফাহিমও কিছুটা ভড়কে গেলো মূহুর্তের জন্য।
...........................................................................(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

