কয়েক মুহুর্ত স্থায়ী নীরবতাটা ভাঙলো মেয়েটা নিজেই।
ফাহমিম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, তাকে বলতে না দিয়েই মেয়েটা হড়বড় করে বলতে আরম্ভ করলো, " দেখুন, আমি বিরাট বিপদে পড়ে এই জায়গায় এসেছি। আমাকে একটু আশ্রয় দিন, কয়েকজন লোক আমার পিছু নিয়েছে, আমি দৌড়াতে দৌড়াতে আপনাদের এই গলিটার মধ্য ঢুকে পড়েছি, অন্য কোন উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত আপনাদের এই বাড়িটায় প্রবেশ করতে বাধ্য হলাম, আপনি প্লিজ আমাকে রক্ষা করুন।"
ফাহমিম কপালে চিন্তার বলিরেখা ফুটিয়ে বললো, "কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনি না, তাছাড়া হুট করে আপনার কথা বিশ্বাসই বা করি কীভাবে। এই শহরে কতো রকমের ভাওতাবাজিই তো হয়, আপনি যে সেরকম কিছু করছেন না, তারই বা কি প্রমাণ আছে?"
মেয়েটা প্রবল বেগে মাথা নাড়িয়ে বললো, "আপনি যা ভাবছেন তার কিছুই না, আপনি শধু দয়া করে আমাকে আপনার ঘরে লুকিয়ে রাখুন, আপনার কিছুই হবে না, আমি সত্যিই বলছি, আপনি আমাকে এই দয়াটুকু করুন , আপনার দুটো পায়ে ধরি।"
মেয়েটার এরকম অনুনয় বিনয়ের পর ফাহমিম কিছুটা নরম হয়ে গেলো, সে গলার স্বরটাকে গম্ভীর করে বললো, "আপনি বলছেন তাহলে কিছু হবে না?"
মেয়েটা প্রবল অস্থিরতা নিয়ে বললো, "বললাম তো কিছুই হবে না, আপনি প্লিজ আমাকে তাড়াতাড়ি ঘরের ভেতরে যেতে দিন, লোকগুলো যে কোন মুহুর্তেই এদিকে চলে আসতে পারে।"
ফাহমিম আর কথা বাড়ালো না। মেয়েটাকে ঘরের ভেতর নিয়ে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিলো সাথে সাথে।
মেয়েটা বসে আছে ফাহমিমের বিছানাটার একটা কোণে। তাকে দেখে কোন সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে যদিও যথেষ্টই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে মেয়েটাকে, বোঝাই যাচ্ছে তার উপর দিয়ে অনেক দখল গিয়েছে।
মেয়েটা মাথা নিচু করে বসেছিলো, ফাহমিম এর প্রশ্নে মাথা তুলে তাকলো সে, ফাহিম বললো, "আসলে ঘটনাটা কি একটু খুলে বলবেন?"
মেয়েটা বললো, "প্লিজ , আগে আমাকে এক গ্লাস পানি দিন।"
ফাহমিম তার টেবিলে রাখা জগটা থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিলো। একটানেই পুরো পানিটা খেয়ে নিলো মেয়েটা।তারপর গায়ের ওড়নাটা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতেই বললো, "আমার নাম চৈতী, আমাদের বাসা আপনাদের এই গলির কয়েক গলি পরেই। কিছুদিন আগে এক ছেলের সাথে আমার বিয়ের কথা বার্তা শুরু হয়, ছেলেটাকে আমার একদমই পছন্দ না, তার প্রচুর অর্থ আছে কিন্তু ছেলেটা চরিত্রহীন, অনেকটা গুন্ডা টাইপের বলতে পারেন। কিন্তু আমার নাছোড়বান্দা বাবা ঠিক করেন এই ছেলের সাথেই আমার বিয়ে দিবেন। সব কথা বার্তা শেষ করে তিনি আজ আমার সাথে সেই ছেলেটার এংগেইজমেন্টের তারিখ ঠিক করেন। কিন্তু যেহেতু কোনভাবেই বাবার এই সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিতে পারছিলাম না, তাই আমি পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমার মা এ ব্যাপারে আমাকে হেল্প করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী আজ রাতে ছেলেরা আমাদের বাসায় আসার কিছুক্ষণ আগেই আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাই আমার এক বান্ধবীর বাসায় গিয়ে কিছুদিন গা-ঢাকা দেবো বলে। কিন্তু আমার ধুরন্ধর বাবা হয়তো কোনভাবে আমার সেই পরিকল্পনাটা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি সেই ছেলের সহায়তায় অনেক আগে থেকেই গোপনে আমদের বাড়ির চারিদিকে পাহারা বসান। আমি আজ রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সাথেই সাথেই পাহারায় থাকা কিছু লোক আমাকে অনুসরণ করা শুরু করে। আমি তা বুঝতে পারার সাথে সাথেই দৌড় দিয়ে আপনাদের গলিটায় ঢুকে পড়ি এবং অন্য কোন উপায় না দেখে আপনার দরজায় নক্ করতে বাধ্য হই।"
একনাগাড়ে পুরো ঘটনাটা বলে চৈতী থেমে যায় এবং টপটপ করে চোখের পানি ফেলতে থাকে। ফাহমিমও কি বলতে হবে বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চৈতীকে কান্না থামানোর জন্য অনুরোধ করে, পরে চৈতী কান্না থামালে ফাহমিম বললো, "সমস্যা একটাই, আমি তো বাসায় একা থাকি, আপনি একজন ব্যাচেলর ছেলের সাথে রাতটা কীভবে কাটাবেন? কিংবা ব্যাপারটা কেমনই বা দেখা যায়? তাছাড়া আমাকেই বা আপনি বিশ্বাস করবেন কি করে?"
চৈতী মুখে মলিন হাসি ফুটিয়ে বললো, "ঐ বাজে ছেলেটার হাতে নিজেকে সপে দেয়ার চেয়ে আপনার হাতে সপে দেয়াও হাজারগুণে ভালো, তাছাড়া আপনি যেখানে এতোক্ষণ আমাকে আপনার ঘরে জায়গা দিতেই এতোটা সংকোচ বোধ করছিলেন সেখানে আমার সাথে আপনি কোন রকমের খারাপ আচরণ করতে পারেন বলে তো আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।"
চৈতীর কথা শুনে কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়লো ফাহমিম। তারপর চৈতীর দিকে না তাকিয়েই সে বললো, "তাহলে তো হলোই, আপনি বিছানাতেই শুয়ে পড়ুন, আমি না হয় নিচে শোবো।"
চৈতী তৎক্ষণাৎই বললো, "না না, আপনি ব্যস্ত হবেন না, আপনি বরং শুয়ে পড়ুন, আমি আপনার চেয়ারটাতে বসেই রাতটা কাটিয়ে দিতে পারবো।"
ঘরের ফ্লোরে পড়ে থাকা কিছু ময়লা আবর্জনা সরাতে সরাতে ফাহমিম বললো, "আপনার ভদ্রতার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি যা বলেছি তাই হোক, আপনাকে বিছানা করে দিচ্ছি, আপনি বরং বিশ্রাম নিন।"
কথাটা বলেই ফাহমিম চৈতীর দিকে তাকিয়ে আবার বললো, "আপনি তো মনে হয় রাতে খাননি কিছু। আমি আসলে জিজ্ঞাসা করতেই ভুলে গিয়েছিলাম। আমি বরং বাইরে থেকে কিছু খাওয়া নিয়ে আসি।"
চৈতী বললো, "প্লিজ আমাকে আর লজ্জা দিবেন না, রাতে আমার কিছু না খেলেও চলবে।"
ফাহমিম বললো, "অতো কথার দরকার নেই। আমি বাইরে যাচ্ছি, যাবো আর আসবো, যাওয়ার সময় বাইরে তালা দিয়ে যাচ্ছি, যাতে কেউ আসলেও বুঝতে না পারে যে এই বাসায় কেউ আছে। এক কাজ করুন আপনি আমার মোবাইল নাম্বারটা টুকে রাখুন। এর মধ্যেও যদি কোন কারণে দরকার হয় সাথে সাথে আমাকে ফোন দেবেন, ঠিক আছে?"
হাঁ সূচক মাথাটা নেড়ে চৈতী নিজের ফোনে ফাহমিমের নাম্বারটা সেইভ করে রাখলো। ফাহমিম চলে গেলো খাওয়ার নিয়ে আসতে। ফাহিম চলে যাওয়ার পর চৈতী বাথরুমে গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে নিল, তারপর বাথরুম থেকে বের হয়ে এসে ফাহমিমের পুরো ঘরটায় একবার চোখ বুলালো সে।ফাহমিম যে ব্যাচেলর তা বুঝতে দেরী হলো না চৈতীর। ঘরের জিনিসপত্র খুবই এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরে আসবাবপত্রও তেমন একটা নেই। খুব একটা ভালো অবস্থায় যে ফাহমিম নেই তা খুব সহজেই অনুমান করতে পারলো চৈতী।
ফাহমিম প্রায় মিনিট পঁচিশেক পরে দুই প্যাকেট বিরিয়ানী নিয়ে বাসায় ফিরে এলো। অনেক দিন এমন ভালো-মন্দ খাওয়ার সুযোগ হয়ে উঠেনি,আজ চৈতীর উছিলায় খাওয়ার সুযোগ এসেছে, মন্দ কি!--মনে মনে একরকমের আনন্দ নিয়েই রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফ্লোরিং করে ঘুমাতে গেলো ফাহমিম, আর সারাক্ষণই ফাহমিমের বিছানাটার একটা কোণে গুটিসুটি হয়ে বসে নির্ঘুম রাতটা কাটিয়ে দিলো চৈতী। ভোরের দিকে ঘুম ভাঙলো ফাহমিমের। চোখটা খুলে বিছানার দিকে তাকাতেই বুকটা ধক্ করে উঠলো তার। একি! চৈতী নেই। হুড়মুড় করে উঠে গিয়ে ঘরের দরজার লক্ টা ঘুরিয়ে দেখলো সে। হুম! লক্ খোলা, চৈতী তাহলে চলে গিয়েছে। খুব মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো ফাহমিমের। মানুষ কেবল উপকার নিতেই জানে। উপকার শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই হয়ে যায় লাপাত্তা-- একটা বার বলে তো অন্তত যেতে পারতো মেয়েটা, রাগে গড়গড় করতে করতে বললো ফাহমিম।তারপর দরজাটার লক্ টা লাগিয়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকতে যাচ্ছিলো সে, হঠাৎ নিজের টেবিলটার দিকে দৃষ্টিটা আটকে গেলো তার। টেবিলের দিকে এগিয়ে আসলো সে,টেবিলের একটা জায়গায় থেকে পানির গ্লাস দিয়ে চেপে রাখা দুই ভাঁজ করা একটা সাদা কাগজ হাতে তুলে নিলো ফাহমিম।
.................................................................(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

