দুঃস্বম্পর্কের এক বোনের ঝিকাতলার বাসার চারতলার কোণার দিকটার একটা রুমে গত দুই মাস প্রবল উৎকণ্ঠা আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছে চৈতী। প্রতিদিনই তার মনে হয়েছে--এই বুঝি পুলিশ এসে জিজ্ঞাসা করবে--এই বাসায় চৈতী নামে কেউ আছে? এমন অসহনীয় যন্ত্রনাময় দিনগুলোতে চৈতীর সুখের একমাত্র উৎস ছিলো ফাহমিম। ফাহমিমে সাথে কথা বলার মুহুর্তগুলোতে সে জগতের সকল চিন্তা ভাবনা, উৎকন্ঠা ডিঙ্গিয়ে ফাহমিমের ভালোবাসার অন্য আরেক পৃথিবীতে এসে হারিয়ে যেত। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস--সেই ফাহমিমও আজ তার জীবনে মরীচিকার মতো হয়ে উঠতে শুরু করেছে--কথাগুলো ভাবছে আর অঝোরে কেঁদে চলেছে চৈতী। ব্যাপার যেটা হয়েছে তা হলো--এখন থেকে ঠিক আধা ঘন্টা আগে চৈতীকে ফোন করেছে ফাহমিম। ডিবি অফিসারদের সাথে তর্কাতর্কিতে শেষ পর্যন্ত পেরে না উঠে ফাহমিম বাধ্য হয় তাদের সাথে ডিবি অফিসে যেতে। যাওয়ার আগে সে অফিসারদের কাছে কিছু সময় চেয়ে নিয়ে ঘরের ভিতর যায়। তখনই ফোন করে সে সমস্ত ঘটনা জানায় চৈতীকে। সব শুনে নীরবে শুধু দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছে চৈতী, কিছুই বলতে পারেনি সে ফাহমিমকে। কিন্তু ফোন রাখার আগে ফাহমিম যখন বলে উঠলো--"চৈতী, তুমি আমার সাথে এতো বড় জঘন্য অন্যায় করবে, তা আমি স্বপ্নেও চিন্তা করিনি"-- তখন চৈতীর ধৈর্য্য আর কোন বাঁধ মানেনি। ডুকরে কেঁদে উঠেছিলো সে। সেই থেকে গত আধ ঘন্টা ধরেই অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে চৈতী। তার মনে ভিড় করছে হাজারো সব প্রশ্ন। এখন আমি কি করবো? ফাহমিমেরই বা কি হবে? আমার এতো বড় একটা অপরাধের জন্য ফাহমিম খেসারত দিবে? যে ফাহমিম একদিন তাকে চরম বিপদের দিনে বাঁচিয়েছিলো, সেই ফাহমিমই আজ শুধু তার কারণেই এতো বিরাট একটা ঝামেলায় আটকে যাবে? যে ফাহমিমকে সে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছিলো, সে ফাহমিমকেই আজ ভয়াবহ পুলিশী নির্যাতনের মুখে পড়তে হবে শুধু মাত্র তার ভুলের কারণে? নাহ্, এ হতেই পারে না, সে নিজে গিয়েই পুলিশের কাছে ধরা দিবে। কিন্তু পুলিশের কাছে ধরা দেয়া মাত্রই তো তারা চৈতীর পুরো দলটা সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য দেয়ার জন্য চৈতীকে বাধ্য করবে। সেক্ষেত্রে তার দলের লোকেরা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে তার বাবা , মা ,ভাই বোন, এমন কি ফাহমিমের উপরও হামলা চালাতে পারে, সে কি করবে এখন তবে?--চৈতীর মনে হচ্ছে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, সে তার ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করে করেই কোথা থেকে যেন ফালি ফালি মেঘ ভেসে ভেসে এসে ঢেকে দিয়ে যাচ্ছে পূর্নিমার চাঁদটাকে।
এখন বাজে সকাল পৌনে নয়টা। চৈতী বসে আছে ডিবি অফিসে--অফিসার কামরুল আহসানের সামনে। গতরাতে নিজের সাথে চূড়ান্ত বোঝাপোড়া শেষ করে সে পুলিশের কাছে ধরা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অফিসার চৈতীর জবানবন্দী নিচ্ছেন। অন্যদিকে গত রাতে ফাহমিমকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পরও পুলিশ তার কাছ থেকে তেমন কোন তথ্যই পায়নি, পাওয়ার কথাও নয়, যেহেতু ফাহমিম এই ব্যাপারে কিছুই জানে না। তাই ফাহমিমকে ছেড়ে দেওয়া হবে কিনা, তা নিয়ে যখন অফিসারার দোটানার মধ্যে ছিলেন, তখনই এসে হাজির হয় চৈতী। চৈতীর মুখে সব শুনে অবশেষে ফাহমিমকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
চৈতীর জবানবন্দী নেয়া শেষ। একটু পরেই তাকে থানায় পাঠিয়ে দেয়া হবে, সেখান থেকে চালান করে দেয়া হবে কোর্টে। তার আগে চৈতী অফিসারদের কাছে পাঁচ মিনিট সময় প্রার্থনা করেছে ফাহমিমের সাথে কিছু কথা বলার জন্য। প্রবল পুলিশি পাহারায় ফাহমিম আর চৈতী পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখন ডিবি অফিসের ছোট্ট একটা কক্ষে। দুজনের মাঝেই এখন অসহনীয় নীরবতা। শেষে কথা বলতে আরম্ভ করলো চৈতীই। ফাহমিমের দিকে না তাকিয়েই সে বললো, "আমি জানি, ইতিমধ্যেই তুমি আমাকে প্রবলভাবে ঘৃণা করতে শুরু করেছো, তা তুমি করতেই পারো, শুধু বিদায়বেলায় তোমায় একটা অনুরোধ করে যাই--তুমি পারলে কিছুদিনের জন্য ঢাকা থেকে সরে অন্য কোথাও গিয়ে থেকে আসো। আমার দলের সদস্যরা সব কিছু জানতে পারলে তোমার উপর হামলা করতে পারে। তাই তুমি যদি ১৫/২০ দিনের জন্য অন্য কোথাও চলে যাও, তোমার জন্য মনে হয় মঙ্গল হবে। তারপর নিজের হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখা কয়েক ভাঁজ করা একটা কাগজ ফাহমিমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চৈতী বললো,"এই চিঠিটা রাখো, এখানে আমি কিছু কথা লিখেছি, সময় করে পড়ে নিও পারলে ,আমার আর কিছু বলার নেই, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও, ভালো থেকো।"
কথাগুলো শোনার পর ফাহমিমের কোন ভাবান্তর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। সে কেবলই শুন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে চৈতীর দিকে। একসময় চৈতী ফাহমিমের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো। চৈতীকে নেয়ার জন্য পুলিশও চলে এসেছে। একসময় পুলিশের সাথে ডিবি অফিসের বাইরে রাখা প্রিজন ভ্যানের দিকে চলে যেতে শুরু করে চৈতী। ফাহমিমও বের হয়ে আসে ডিবি অফিসের বাইরে। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে চৈতীর দিকে। প্রিজন ভ্যানে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা চৈতীও শেষবারের জন্য দেখে নেয় ফাহমিমকে। হঠাৎই একটা পুলিশ এসে প্রিজন ভ্যানের দরজাটা বন্ধ করে দিলো। মুহুর্তের মধ্যেই যেন দুজন দুজনার পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলো ফাহমিম আর চৈতী।
এখন রাত প্রায় বারোটা। ট্রেনে চড়ে ফাহমিম ছুটে চলেছে সিলেটের উদ্দেশ্যে। চৈতীর কথামতো সে ঢাকা থেকে কিছুদিনের জন্য সরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফাহমিম যাচ্ছে সিলেটে তার এক বন্ধুর বাসায়। একসময় নিজের মানিব্যাগ থেকে ধীর লয়ে চৈতীর দেয়া চিঠিটা বের করে আনলো সে। সারাদিনে প্রবল ব্যস্ততা আর টেনশানের মাঝে চৈতীর চিঠিটা আর পড়া হয়ে উঠেনি। আস্তে আস্তে চিঠিটা খুলে নিজের চোখের সামনে ধরলো ফাহমিম। চৈতী লিখেছে--
আমি জানি, এই চিঠিটা যখন তুমি পড়ছো, তখন আমি তোমার কাছ হতে অনেক দূরে। আমাদের দুজনার মধ্যে এতোদিন আত্নাগত যে যোগাযোগটা ছিলো, তাও হয়তো ক্রমশই বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। আমার কাছে না হলেও তোমার কাছে হয়তো তাই। আমি জানি, ভালোবাসার যে পথটা তুমি আমার হৃদয় পর্যন্ত বিস্তৃত করে দিয়েছিলো একদিন, তার বাঁকে বাঁকে এখন শুধুই ঘৃণা। তোমার হৃদয়ের যেখনাটায় তুমি আমাকে দেবীর আসনে বসিয়েছিলে, সেখানা থেকেও আজ আমি খসে পড়ে গেছি হেলায়--জানি, এটাই আমার প্রাপ্য। কিন্তু আমার ভালোবাসা? আমার ভালোবাসা তো কোন দোষ করেনি, আমি না হয় তোমার সাথে অন্যায় করেছি, তোমাকে মিথ্যে বলেছি, কিন্তু আমার ভালোবাসা তো নয়। তোমায় পাগলের মতো ভালোবেসেছিলাম বলেই তো নিজের অক্ষমতাকে মিথ্যার আবরণ দিয়ে ঢাকতে চেয়েছিলাম।বিশ্বাস করো, সেই আবরণটার নিচেও ভালোবাসার চিরন্তন পবিত্রতা নিয়েই তোমার প্রতি আমার অন্ধ ভালোবাসাটা দিন রাত সদা জাগ্রত ছিলো। ফাহমিম তুমি বিশ্বাস করো, ভালোবাসার রূপে চৈতীর যে অবয়বটাকে তুমি তোমার হৃদয়ে স্থান দিয়েছিলে, তাতে কোন পাপ নেই, কোন মিথ্যে নেই, কোন ছলনা নেই। তুমি আমাকে ঘৃণা করো, কিন্তু আমার ভালোবাসাকে নয়, তুমি আমাকে তোমার হৃদয় থেকে ছুড়ে ফেলে দাও, কিন্তু আমার ভালোবাসাকে নয়।আমি জানি, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আমার ১২/১৩ বছরের জেল হয়ে যাবে। ততদিনে তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করবে। তোমার ঘর আলো করে কয়েকটা নতুন প্রাণ পৃথিবীর আলোয় হেসে উঠবে অবলীলায়। অথচ আমি? পার্থিব আলোর মুখ দেখা তো দূরে থাক্, নিজের ভালবাসার মুখ, আমার ফাহমিমের মুখটাই হয়তো আর কোন দিন দেখা হয়ে উঠবে না আমার। নিয়তির কি খেলা দেখো! ভেবেছিলাম সব ঝামেলা শেষ হয়ে গেলে তোমার সাথে প্রাণ ভরে দেখা করবো, তোমার কোলে মাথা রেখে নতুন আরেকটা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখবো।অথচ কিছুই করা হলো না। তোমার হাতটাও আর কোন দিন ছুঁয়ে দেখা হবে না, তোমার কাঁধে মাথা রেখে জগতের সকল চিন্তা-ভাবনা, উদ্বেগকে বিদায় জানাতে পারবো না, তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে বুক ভরে কোনদিন ডুকরে কেঁদে উঠাও হবে না। কোনদিন আমার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে তুমি আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিবে না, আমার চোখে চোখ রেখে ভালোবাসার মধুর প্রেমময় কোন কথাও তুমি আমায় শোনাবে না। হয়তো এতো সুখ আমার কপালেই ছিলো না।হয়তো তোমার মতো এতো বিশাল মনের একজন মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতাই আমার হয়নি। তাই সকল অপরাধ মাথায় নিয়ে আমায় চলে যেতে হলো। বিদায়বেলায় তাই তোমায় শুধু একটুকু অনুরোধ করি-- তোমার হৃদয়ের ছোট্ট একটা কোণায় আমার ভালোবাসাটাকে লুকিয়ে রেখো। যদি কোনদিন প্রবল বর্ষণে অথবা একাকী বিকেলে এই ভালোবাসাটা তোমায় খুব পোড়ায়, তোমায় খুব যন্ত্রণা দেয়--তবে আমার প্রতি তোমার ঘৃনার অবয়টাকে ভুলে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও তুমি সেই ভালোবাসাটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিও তোমার ভালোবাসার আলতো স্পর্শে। এই জীবনে আমার তো কিছু পাওয়া হলো না--তোমার হৃদয়ের কোথাও আমার ভালোবসাটা স্থান পেয়েছে--সেটা ভেবেই না হয় আমার চিরদুখী আত্মাটা একটুকু শান্তির পরশ লাভ করে যাক আজীবন। বলো, আমার এই ছোট্ট অনুরোধটা তুমি রাখবে না? নিজের প্রতি যত্ন নিও, ভালো থেকো।
ইতি,
তোমার চৈতী।
চিঠিটা পড়া শেষ করে আগের মতোই ভাঁজ করে মানিব্যাগে রেখে দিলো ফাহমিম। দ্রুত গতিতে ট্রেন ছুটে চলেছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে হু হু করে ঢোকা বাতাস বারে বারেই এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে ফাহমিমের চুলগুলো। ফাহমিম ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। চারিদিকে গুটগুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকারটাই ক্রমশ অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াটে লাগতে শুরু করেছে ফাহমিমের। কারণ তার চোখ বেয়ে বড় নীরবেই গড়িয়ে যাচ্ছে কান্নার অনিঃশেষ সব স্রোত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

