somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... জলে ভাসা পদ্ম.........(পঞ্চম অংশ)......(গল্প) চতুর্থ অংশ


(৮)

গত কয়েক দিন ধরেই সিলেটে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে, রাস্তায় রাস্তায় পানি জমে গিয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় তো রীতিমতো নৌকাও চলাচল করছে। অবন্তী যে কোয়ার্টারে থাকে তার সামনের রাস্তাটার অবস্থা আরো ভয়াবহ। পানি এমন একটা উচ্চতা নিয়ে এসে এখানে বাসা বেঁধেছে যে-- এই রাস্তায় নৌকা চলাচল করা কোনভাবেই সম্ভব না, অন্যদিকে হেঁটে হেঁটে এই রাস্তার পানি ডিঙানোও পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম কাজগুলার একটা। ফলে অবন্তী পড়েছে বিরাট বিপদে, অফিসে যাওয়ার সময় তাকে বিরাট ফ্যাসাদের মধ্যে পড়তে হয়, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও এই রাস্তায় রিকশার দেখা মেলে না, যদি দেখাও মেলে তথাপি রিকশাওয়ালাগুলো তখন জমিদারের বেশে সেখানে হাজির হয়, পাঁচ/ছয় টাকার রিকশাভাড়াকে তারা তখন পনেরো/বিশ টাকা পর্যন্ত নিয়ে দাঁড়া করায়। গত কিছুদিন ধরেই তাই প্রতিদিন সকালবেলায় অফিসে যাওয়ার সময়টা অবন্তীর ব্যাপক অস্থিরতার মধ্যে কাটে। আজ সকালবেলায়ও অনেক চেষ্টা তদবির করে সে যাও একটা রিকশার দেখা পেয়েছিলো কিন্তু রিকশাওয়ালা কোনভাবেই অবন্তীর অফিস পর্যন্ত যেতে রাজি হলো না। শেষমেষ অবন্তী রিকশাওয়ালাটাকে বললো তাকে অন্তত রাস্তাটা পার করে দেয়ার জন্য, অনেক চাপাচাপির পর রিকশাওয়ালা রাজি হলো ঠিকই, কিন্তু রিকশাভাড়া চাইলো বিশ টাকা। অবন্তী দাঁত কটমট করে রিকশাওয়ালাকে বললো, "কোন আক্কেলে বিশ টাকা চাইলা? আমি কি পানিতে পড়ে গেছি?"
রিকশাওয়ালা বত্রিশপাটি দাঁত একসাথে বের করে হেসে উঠে বললো, "তাতো আফা আফনে ফড়ছেনই, আমি এইখান থুন আফনারে থুইয়া গ্যালে গা, সারাবেলা আফনারে এই ফানিতেই ফইড়া থাকা লাগবো"--কথাটা বলেই আবার একটা অট্টহাসি দিলো রিকশাওয়ালাটা। অবন্তীর রাগে গা জ্বলে যাচ্ছিলো, তার ইচ্ছা করছিলো রিকশাওয়ালা ব্যাটার দুই গালে দুইটা চড় দিয়ে তার সামনের পাটিরর দুইটা ফেলে দিতে, ফলে পরের বার ব্যাটা যখন এমন কুৎসিত ভাবে হাসতে যাবে, তখন যাতে সবাই দেখতে পারে যে শালার সামনের পাটির দুইটা দাঁত নাই। কিন্তু ব্যাপারটা যে তখন "নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা"র মতো হতো--অবন্তী তা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলো, কারণ আক্ষরিক অর্থেই সে তখন ছিলো নিরুপায় ।শেষে অন্য কোন উপায় না দেখে অগত্যা বিশ টাকা রিকশাভাড়া দিয়েই ঐ রাস্তাটুকু পার হয়ে এসে অন্য আরেকটা রিকশা নিয়ে বেলা দশটার দিকে অফিসে এসে পৌঁছায় অবন্তী।

আজ প্রায় সারাটা দিনই বৃষ্টি হয়েছে, কখনো টিপ টিপ করে, কখনো মুষলধারে। ফলে আজ বেশীরভাগ সময়ই অফিসে বসেই কাটাতে হয়েছে অবন্তীকে। বৃষ্টির কারণে চা বাগানের নিয়মিত কর্মকান্ডগুলোও কম বেশী ব্যাহত হয়েছে যদিও দুপুরের দিকে ঝিরঝির বৃষ্টির মাঝেও অবন্তীকে ২ নম্বর চাবাগানটা ভিজিটে যেতে হয়েছিলো, কারণ সেখানে চা বাগানের দুই কর্মীর মাঝে তুমুল মারামারি বেঁধে গিয়েছিলো, সেই মারামারির ফয়সালা করতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত কাক ভেঁজা হয়ে অফিসে ফিরে আসতে হয়েছে অবন্তীকে। এই তুমুল বৃষ্টি বাদলের দিনে কোয়ার্টারে ফিরে গিয়ে দুপুরের খাওয়া খাওয়ার কোন মানেই হয় না, তাই অফিসে বসেই দুপুরের খাওয়াটা সেরে নিয়েছে অবন্তী, সাথে অবশ্য তাশফিনও ছিলো। গল্প করতে করতেই দুপুরের খাওয়াটা একসাথে খেয়েছে দুজন।

এখন বাজে বিকাল সোয়া পাঁচটা। আরেকটা ব্যাপক বৃষ্টির আনাগোনা শুরু হয়ে গিয়েছে পুরো আকাশ জুড়ে। আকাশের প্রায় পুরোটাই ঘন মেঘে ঢাকা। আজকের বিকালটাকে তাই আর বিকালের মতো লাগছে না, পুরো প্রকৃতিটা জুড়ে সন্ধ্যার আগমন ধ্বনিটা যেন আজ তাই একটু আগেই আগেই বেজে গিয়েছে। অফিসের জানালাটা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাতেই অস্থির হয়ে উঠলো অবন্তী, তাশফিনের দিকে না তাকিয়েই অবন্তী বললো, "আকাশ যেভাবে কালো হয়ে আসছে, একটু পরেই মনে হচ্ছে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হবে, কিভাবে যে আজ কোয়ার্টারে পোঁছাবো-- খোদাই জানে।"
তাশফিন একটু ইতস্তত করে বললো, "আপনি কিছু মনে না করলে আমি আপানাকে নামিয়ে দিয়ে আসি? আপনার কোয়ার্টার থেকে আমার বাসাটা খুব একটা দূরে না, একটু ঘুরে যেতে হবে--এই আর কি!"
আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই অবন্তী বললো, "না না, তার কোন দরকার নেই, আপনি আমার জন্য কেন খামাকা কষ্ট করতে যাবেন?"
কথাটা শুনে নিজের চেয়ারটা ছেড়ে উঠে অবন্তীর মুখ বরাবর এসে দাঁড়ালো তাশফিন, কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে গলার স্বরটা কিছুটা গম্ভীর করে সে অবন্তীকে বললো, "আমার গাড়িতে উঠলে আপনার মান সম্মানে কি খুব বেশী বেঁধে যাবে অবন্তী? আর কতটুকু চেনা জানা হলে আপনি নিজেকে আমার কাছ হতে আড়াল করা বন্ধ করবেন?অনেক দিন তো হয়ে গেলো, আপনি কি অস্বীকার করতে পারবেন এই কয়দিনে আমার প্রতি আপনার একটুও ভালো লাগা জন্মেনি, সত্যি করে বলুন তো ?"

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো অবন্তী, শেষে কিছুটা নরম গলায় সে বললো, "স্যার, আপনাকে যে আমার ভালো লাগে এটা খুব ভালো করেই আপনি জানেন, কিন্তু......."
তাশফিন সাথে সাথেই বললো, "কিন্তু কি অবন্তী? আমাকে আর কত অপেক্ষা করতে হবে?এই যে আমার এখনও দুজন দুজনকে "আপনি" "আপনি" বলছি, আপনি আমাকে এখনো স্যার স্যার করেন--কেন এই আড়াল হয়ে থাকা? কিসের এতো সংকোচ? এতোটাদিন ধরে আমরা দুজন দুজকে জানছি, এরপরও কি আপনি বলতে চান--এখনো আমাদের আরো কাছাকাছি আসার সময় হয়নি? আপনি আমি দুজনই যথেষ্ট পরিণত বয়সের দুজন মানুষ। আমরা যদি এখন সিরিয়াস টাইপ কোন সম্পর্কের কথাও চিন্তা করি--তাতে কি খুব দোষের কিছু হয়ে যাবে?"
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলো তাশফিন। অবন্তী আগের মতোই আকাশের দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপরে তাশফিনের দিকে তাকিয়ে বললো," বিয়ে করতে চান আমাকে?"
তাশফিন বললো, "যদি বলি তাই?"
অবন্তী হেসে উঠে বললো, "স্যার আপনি আমার সম্পর্কে কতটুকুই বা জানেন, আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড--কিছুই তো আপনি জানেন না।"
অবন্তীকে থামিয়ে দিয়ে তাশফিন বললো, "জানতে চাইও না, আমি শধু জানি-- আমি আপনাকে ভালোবাসি।"
কথাটা বলেই লজ্জায় লাল হয়ে গেলো তাশফিন। তাশফিনের দিকে কিছুক্ষণ নিষ্পলক চেয়ে থাকলো অবন্তী। দুজনের মাঝে কয়েক মিনেটের জন্য নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। শেষে নীরবতাটা ভাঙলো অবন্তীই। তাশফিনের সামনে থেকে সরে গিয়ে নিজের টেবিলের দিকে যেতে যেতে অবন্তী বললো, "চলুন বের হয়ে পড়ি। বৃষ্টি চলে আসবে এখুনি।"
তাশফিন মুখটা ম্লান করে বললো, "কথার তো উত্তর দিলেন না....।"
তাশফিনের দিকে তাকিয়ে অবন্তী বললো, "আমাকে আরেকটু সময় দিন।"
তাশফিন বললো, "আমাকে আর কত জ্বালাবেন? ঠিক আছে যান, সময় নিন। কিন্তু নিজেকে এভাবে আড়াল করা তো বন্ধ করুন, আমাকে আর 'স্যার' 'স্যার' করবেন না, আমিও আর আপনাকে "আপনি" "আপনি" করতে পারবো না, তুমিও এইসব অহেতুক ফরম্যালিটি করা বন্ধ করো।"
অবন্তী হাসি হাসি মুখ নিয়ে তাকালো তাশফিনের দিকে, তারপর ঠোঁটের কোণে একটা লাজুক হাসি ঝুলিয়ে বললো, "যাও, গাড়িটা বের করো, আমি আসছি।"
অবন্তীর মুখ থেকে যেন কথাটাটা শুনতেই কেবল বাকী ছিলো তাশফিনের। কথাটা শোনার সাথে সাথেই "ইয়েস" বলে একটা চিৎকার দিয়ে বাচ্চা ছেলের মতো খুশিতে ফেটে পড়ে এক দৌড়েই অফিস রুম থেকে বের হয়ে গেলো সে। গাড়িতে উঠে তাশফিন যখন অবন্তীকে নিয়ে অবন্তীর কোয়ার্টারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো, সন্ধ্যাটা তখন রাতের মতো করে একরাশ নিস্তব্ধতা নিয়ে এসে সমস্ত প্রকৃতির উপর ভর করতে শুরু করেছে।
.....................................................(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28839315 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28839315 2008-09-06 01:53:49
জলে ভাসা পদ্ম........(চতুর্থ অংশ)......(গল্প) প্রথম অংশ দ্বিতীয় অংশ তৃতীয় অংশ


৬)

ভুরুটা কুঁচকে প্রায় আট দশ সেকেন্ডের মতো অবন্তীর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকলো তাশফিন হাসান। অবন্তীও ঠিক বুঝে উঠতো পারলো না যে তার নামটা শুনে হঠাৎ করেই এমন গম্ভীর হয়ে গেলো কেন তাশফিন। শেষে সাহস করে সে তাশফিনকে জিজ্ঞেসই করে বসলো, "স্যার কোন সমস্যা?"
কিছু একটা আসলেই চিন্তা করছিলো তাশফিন, হঠাৎ অবন্তীর প্রশ্নে কিছুটা অপ্রস্তুত লাগলো তাকে, সে মুখাবয়বটাকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক করেই বললো, "আসলে ঘটনাটা কি বুঝলেন অবন্তী, আপনার নামটা শোনার সাথে সাথেই কেন যেন মনে হলো--এই নামটা ইদানিংকালেই আমি যেন কোথাও শুনেছি, কিন্তু মনে করতে পারছি না, আমার আবার স্মৃতিশক্তির অবস্থা খুব একটা ভালো না, সকালে কোন কথা শুনলে বিকালেই তা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কাজেই কোনভাবেই এখন মনে করতে পারছি না নামটা কোথাও এবং কিভাবে শুনেছি--কথাগুলো বলেই ছোট্ট একটা হাসি দিলো তাশফিন।
সব কথা শুনে অবন্তী বললো, "স্যার এমন হতেই পরে, একই নাম নিয়ে কত হাজারো মানুষ আমাদের চারিধারে ঘোরাফেরা করে, হবে হয়তো আপনার চেনা পরিচিত কেউ।"
তাশফিন বললো, "তা আপনি ঠিকই বলেছেন, সে যাই হোক, আপনি চলে যাচ্ছিলেন, শুধুই শুধুই আপনাকে এতক্ষণ আটকে রাখালাম, মাফ করবেন, আপনি আসতে পারেন এখন।"
"জ্বি স্যার" বলে তাশফিনের রুম থেকে বের হয়ে আসলো অবন্তী। দুপুর গড়িয়ে বিকাল প্রায় আসি আসি করছে। সূর্য্যের তেজটাও অল্প করে অল্প কমতে শুরু করেছে। তাশফিনের চেম্বারটা কোম্পানীর জোনাল অফিসের যে দিকটায় অবস্থিত সেখান থেকে কোম্পানীর ৩নম্বর সেক্টরেরে দুটো চাবানের মাঝখান দিয়ে একটা লালচে মেঠো পথ সাপের মতো সরু হয়ে চলে গেছে অফিসের মূল ফটকটা পর্যন্ত। নিজের মন প্রাণ উজাড় করে দৃষ্ট শক্তির সমস্তটুকু ব্যয় করে চাবাগানের বৈকালিক প্রকৃতির অনন্ত রূপ লহমা আর নৈসর্গিক আবেদনের মাঝে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়ে বেশ ধীর পায়েই লালচে সেই মেঠো পথটা ধরে মূল ফটকটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো অবন্তী। দুধারে বিকালের নরম আলোয় ক্লান্তির পরশ নিয়ে নিবিড় হয়ে থাকা চা গাছগুলোর অনন্ত সবুজের মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অবন্তীর মনে হচ্ছিলো হয়তো সে কোন স্বপ্নই দেখছে। প্রাণহীন , রংহীন ঢাকার শুন্যতা মনটাকে এমন ভাবে আষ্ঠে পৃষ্ঠে বন্দী করে ফেলে যে সেই বন্দীদশা থেকে মুক্তির উপায়টাও যেন মানুষ এক সময় ভুলে যায়। অবন্তীও যেন তা ভুলতে বসেছিলো, তাই ঢাকা থেকে সহস্র মাইল দুরে অবস্থিত সিলেটের এই নির্জন চা বাগানের বিকালের লাজুক রূপসী প্রকৃতি আজ যখন তার সমস্ত রুপ সৌন্দর্য্য আর লাবণ্যতা নিয়ে অবন্তীর সামনে হাজির হলো, অবন্তীর মনে হলো--সে যেন হঠাৎ করেই তার চেনা জানা পৃথিবীটা ছেড়ে অন্য আরেকটা জগতে এসে উপস্থিত হয়েছে--যেখানে কোন কোলাহল নেই, কোন হট্টগোল নেই, যানবাহনের দানবীয় কোন ঝনঝনানিও নেই; এখানে আছে শুধু সবুজ, এখানের কোলাহলটা কেবলই প্রাকৃতিক, প্রকৃতি তার অথৈ রূপ আর রংয়ের অপার্থিব ছান্দসিক সুর দ্যোতনায় যে অদৃশ্য সংগীতের অবতারণা করে এখানে তার কলতানেই কেবল মুখরিত থাকে এখানকার সমস্ত পরিবেশ।

মুগ্ধতার সবগুলো দুয়ারে ঘুরতে ঘুরতে চা বাগানটা পার হয়ে এক সময় কোম্পানীর অফিস চত্বরের মূল ফটকটায় চলে এলো অবন্তী। সেখান থেকে কিছু দূরে মূল রাস্তার ধারে কয়েকটা রিকশা ঝট পাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। নিজের কোয়ার্টারে ফিরে যাবে বলে একটা রিকশা ডাকতে যাচ্ছিলো অবন্তী, হঠাৎ করেই পিছন থেকে কেউ একজন তার নাম ধরে ডেকে উঠলো, ঘাড়টা ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকালো অবন্তী। সে যা ভেবছে তাই--তাশফিন হাসান, ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে এসেই তাশফিন ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বললো, "কি ব্যাপার? যান নি এখনো?"
অবন্তী লাজুক হাসি হেসে বললো, "না স্যার, এতো সুন্দর একটা জায়গা, ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো না, তাই একটু রয়ে সয়ে এগুচ্ছিলাম, ঢাকায় তো এতো সুন্দর কোন জায়গাই নেই, তাই মুগ্ধতার রেশ হয়তো এতো তাড়াতাড়ি কাটবে না।"
তাশফিন এবার কিছুটা শব্দ করেই হেসে উঠলো, তারপর হাসি থামিয়ে বললো, "প্রথম প্রথম আমারও এমন মনে হয়েছিলো বুঝলেন, ঢাকা থেকে সবে মাত্র এসে এই পরিবেশটা দেখে মাথাটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো তখন, পরে পরে মুগ্ধতা কেটে যেতে আরম্ভ করলো, এখন তো এসবকেই আমার এক ঘেঁয়েমি লাগে।"
তাশফিনের কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে গেলো অবন্তী, সে বললো, "কি বলেন স্যার? এতো সুন্দর একটা পরিবশকে আপনার এক ঘঁয়ে লাগছে? আজব মানুষ তো আপনি"--কথাটা বলেই একটু লজ্জা পেলো অবন্তী।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তাশফিন অবন্তীকে একটু সহজ করার জন্য বললো, "কিছুদিন থাকুন ম্যাডাম, তারপরেই বুঝবেন, কোন কিছুই মানুষের বেশীদিন সহ্য হয় না, মানুষ এক বিচিত্র প্রাণী।"
অবন্তী কিছু বললো না, শুধু একটু মুচকি হাসলো। তাশফিন বললো, "আপনি তো নিশ্চয় কোয়ার্টারে ফিরে যাচ্ছেন, তাই না?"
অবন্তী হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লো।
তাশফিন বললো, "যান তাহলে, আমিও আজ আসি, শরীরটা ভালো লাগছে না, কাল দেখা হবে, ভালো থাকবেন।"
কথাগুলো বলেই একটূ দূরে পার্ক করে রাখা "G" মডেলের সিলভার কালারের একটা "Corolla" র ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো তাশফিন। দূর থেকে দাঁড়িয়েই তা দেখলো অবন্তী। সে ভেবেছিলো চলে যাওয়ার আগে তার দিকে হয়তো আরেকবার তাকাবে তাশফিন। তাশফিন তাকায়নি, গাড়িটাকে ডানদিকে ঘুরিয়ে একটানেই অতি দ্রুত চলে গেলো সে অবন্তীর দৃষ্টি সীমানার বাইরে। এই ধরনের ভাবনা হঠাৎ করেই কেন যে মনে আসলো--তা ভেবে নিজের মনে মনেই কিছুটা লজ্জা পেলো সে। শেষে একটা রিকশা ডেকে তাতে উঠে বসে সন্ধ্যা হওয়ার ক্ষাণিক আগেই কোয়ার্টারে ফিরে গেলো অবন্তী।

(৭)

সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত অফিসে কিংবা চা বাগানে থাকা অবস্থায় সময়গুলো বেশ ভালোই কাটে অবন্তীর। দুপুরের খাওয়ার খেতে মাঝে মাঝে সে কোয়ার্টারে ফিরে যায়, মাঝে মাঝে আবার অফিসেই সেরে নেয়। চা বাগানের শ্রমিকগুলোর সাথেও বেশ ভালো একটা বোঝাপোড়া হয়ে গেছে তার। কেউ কেউ তো আবার অবন্তী ম্যাডাম বলতেই পাগল। তার এই তুমুল জনপ্রিয়তা দেখে তাশফিন মাঝে মধ্যেই হেসে হেসে অবন্তীকে বলে, "আচ্ছা অবন্তী, ব্যাপারটা কি বলুন তো? আপনি এলেন যে মাত্র কয়েকদিন হলো, এরই মধ্যে আপনি কি যাদু করে ফেললেন যে চা বাগানের বেশীর ভাগ শ্রমিকের মুখেই কেবল আপনারই গুণগান।"
অবন্তী কিছুই বলে না, কেবলই হাসে। অবশ্য তাশফিনের সাথেও অবন্তীর পার্টনারশিপটা বেশ ভালোই জমেছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে কোম্পানীর উইকলি রিভিউতে দেখা গেছে তাশফিন আর অবন্তীদের সেক্টরটাই সবচেয়ে ভালো করেছে। প্রতিদিন বিকালে প্রায় ঘন্টা দেড়েকের মতো তাশফিন আর অবন্তী পুরো দিনের কর্মকান্ডের উপর একটা রিপোর্ট তৈরী করে। প্রথম দিকে কাজের ব্যাপারগুলো বুঝতে অবন্তী একটু কষ্ট হলেও পরে পরে তা একদমই কেটে যায়, তাশফিনও তাকে যথেষ্টই সহযোগিতা করেছে এই ব্যাপারে। এখন অবন্তীর কাজ কর্মে তাশফিনও বেজায় খুশি। তাশফিন আর অবন্তী দু' দুজনের সঙ্গটাও বেশ উপভোগ করে। ঢাকা থেকে চলে আসার পর এমনিতেই খুব বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিলো অবন্তী। তার উপর অফিস থেকে কোয়ার্টারে ফিরে এসে রাতের বেলা আর তেমন কিছুই করার থাকতো না তার। টিভি দেখে আর কতক্ষণই বা কাটানো যায়--নিজের এই কথাগুলোই যখন একদিন অবন্তী বলছিলো তাশফিনকে, সঙ্গে সঙ্গেই তাশফিন বলে বসলো, আপনি আমায় ফোন দিলেই তো পারেন, আমিও তো বেশ একাই থাকি, রাতের বেলাটা আমার জন্যও খুব বোরিং একটা সময়, সিলেট শহরটা রাত হলেই কেমন যেন ঘুমন্ত নগরীতে পরিণত হয়ে যায়, কিছুই তেমন ভালো লাগে না, আপনি ফোন দিলে আমার ভালোই লাগবে--কথাগুলো বলেই কেমন যেন লজ্জা পেয়ে গেলো তাশফিন। কথাগুলো আদৌ অবন্তীকে বলা ঠিক হলো কিনা তাই নিয়ে যখন তার ভেতরেরটা তোলপাড় করছে, তখনই অবন্তী বললো, "হুম! তা অবশ্য খারাপ বলেন নি, ফোন করাই যায়, কিন্তু ব্যাপারটা একটু কেমন দেখায় না?"
তাশফিন বললো, "দুজন মানুষ যদি নিজেদের ইচ্ছাতেই একে অপরের সঙ্গ কামনা করে তাতে তো আমি দোষের কিছু দেখি না।"

তাশফিনের কথা শুনে অবন্তী সেদিন আর বিষয়টা নিয়ে তেমন কিছু বলে নি। তবে গত কয়েকদিন ধরেই তাশফিনের সাথে অবন্তীর ফোনে কথা হচ্ছে, শুরুটা তাশফিনই করেছে, এখনও অবন্তীও মাঝে মধ্যে ফোন দেয়। চা বাগানের নিঝুম পরিবেশে শত ব্যস্ততার মাঝেও এই দুটি মানব হৃদয় যে নিজেদের অজান্তেই একে অপরের আরো কাছাকাছি চলে আসছিলো-- তা বলাই বাহুল্য।
...............................................................................(চলবে)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28838847 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28838847 2008-09-04 23:02:29
জলে ভাসা পদ্ম........(তৃতীয় অংশ)......(গল্প) প্রথম অংশ
দ্বিতীয় অংশ


(৪)
আজ সোমবার। গত পরশু রাতে সিলেট এসে পৌঁছানোর পর থেকে মাঝের সময়টা মোটামুটি ভালোই কেটেছে অবন্তীর। গত কাল সারাদিনই সে ঘুরে বেড়িয়েছে। কোম্পানীর কোয়ার্টারটা থেকে শাহজালাল এর মাজারটা তেমন একটা দূরে না, তাই সকালে বেরিয়েই অবন্তী প্রথমে সেখানে গিয়েছে, মাজারেরে পুরো জায়গাটা বেশ ক্ষাণিকক্ষণ সময় নিয়ে ঘুরে দেখেছে, শেষের দিকে এসে মাজারটা জিয়ারতও করেছে সে। যে কোন মাজার থেকেই বের হয়ে আসার সময় সাধারণত যা হয় --মাজারের মূল ফটকের সামনে এক দল ফকির ঘিরে ধরে সাহায্যের জন্য, অবন্তীকেও সেই ঝামেলায় পড়তে হয়েছে, তবে সে আনন্দ চিত্তেই সবগুলো ফকিরকেই কিছু না কিছু দিয়ে মাজার থেকে বেরিয়ে আসে। মাজার থেকে বেরিয়ে এস সে যায় "কিম ব্রিজ" দেখতে, সুরমা নদিটা সিলেট শহরের মাঝ দিয়ে চলে গেছে, তার উপর দিয়ে যাতায়াতের জন্যই বহুকাল আগে এই ব্রিজটা নির্মান করা হয়েছিলো। সিলেট শহরে সুরমা নদীর যে অংশটা ঢুকেছে সেই অংশটায় নদীর পাড়টাও দেখতে যথেষ্টই মনোহর, পাড়টাকে এখানকারর পর্যটনের কর্তৃপক্ষ মানুষজনের ভ্রমনের উপযোগী করে তুলেছে খুবই নিপুণভাবে, সেই পাড়টায় দাঁড়িয়ে সুরমা নদীটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলো অবন্তী, তার খুব নদী হতে ইচ্ছা করছিলো, নদীর কোন আনন্দ নেই, কোন বেদনা নেই, কোন চিন্তা ভাবনা নেই, নদীর শুধু একটাই কাজ--কেবলই বয়ে যাওয়া অনন্তকাল ধরে।ব্রিজটা দেখা শেষ করে অবন্তী যায় স্থানীয় একটা মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামে এসে অবন্তীর মন খারাপ হয়ে যায়, তেমন কিছুই নেই সেখানে দেখার মতো, তাই মিউজিয়ামে আর সময় নষ্ট না করে সে আবার কোয়ার্টারে ফিরে আসে। তারপর দুপুরেরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকালের দিকে সে যায় কোম্পানীর ৩ নম্বর সেক্টরের চা বাগান গুলো দেখতে। যে চারটা চা বাগান সুপারভাইজ করার দায়িত্ব অবন্তীকে দেয়া হয়েছে, সেগুলো সে খুব মনযোগ দিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখে, মাঝে মাঝে চা বাগানের কয়েকজন কর্মীর সাথে কথাও বলেছে সে, এর মধ্যে কয়েকজন উৎসুক কর্মী তার পরিচয় জানতে চাইলে সে শুধু মুচকি হেসেছে, কিছুই বলেনি। অবন্তী জীবনে কোনদিন চা বাগান থেকে চা পাতা তোলার দৃশ্য দেখেনি। জীবনে প্রথম বারের মতো এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে সে তাই যার পর নাই বিস্মিত এবং একই সাথে মুগ্ধও। সারি সারি হয়ে দাঁড়িয়ে কত দ্রুতই না এরা চা পাতাগুলোকে তুলে নিয়ে নিজেদের পিঠে আটকানো ঝুড়িতে জমিয়ে রাখে--পুরা ব্যাপারটাই একটা অদৃশ্য ছন্দের তালে তালে ঘটে, এই ছন্দটাও অবন্তীকে নাড়া দিয়েছে খুব। নিচ থেকে দাঁড়িয়ে চা বাগানের টিলাগুলোকে দেখে অবন্তীর কেবলই মনে হয়েছে--সারিবদ্ধভবে বেড়ে ওঠা অনন্ত সবুজ অসংখ্য চা গাছে মোড়ানো এক একটা টিলা যেন এক একটা ছোটখাটো সবুজ পিরামিড।চাবাগানগুলো দেখা শেষ করে অবন্তী যখন কোয়ার্টারে ফিরে আসে তখন দিনের আলোটা প্রায় নিভু নিভু করছিলো। কোয়ার্টারে ফিরে আসার পরের সময়টুকু খুব একটা ভালো কাটেনি অবন্তীর। ভয়াবহ একাকীত্ব চেপে ধরেছিলো তাকে, কিছুই করার ছিলো না, তার রুমে এখনো টিভি আনা হয়নি, টিভি আসতে আরো দু'এক দিন লাগবে, অন্যদিকে মোবাইলে যে কারো সাথে কথা বলবে সে-- সেই উপায়ও ছিলো না, কারণ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসার পরপরই সে তার বাংলা লিংকের সিমটা বন্ধ করে রেখেছে, আরেকটা নতুন সিম হয়তো কিনবে সে, কিন্তু তা দিয়ে তো আর ঢাকার কারো সাথে কথা বলা যাবে না--ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো অবন্তীর, মায়ের সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো তার, কিন্তু নিয়তি আজ তাকে এমন একটা জায়গায় এনে দাঁড়া করিয়েছে যে-- শুধু প্রাণপ্রিয় মা-ই নয়, চেনা পরিচিত কারো সাথেই হয়তো একটা অনির্দিষ্টকালের জন্য তার আর কোন যোগাযোগ হবে না। নিজের মাঝে এক অসীম শূন্যতা নিয়েই তাই গত রাতটা প্রবল অস্থিরতা আর মানসিক যন্ত্রণায় কাটাতে হয়েছিলো অবন্তীকে।


(৫)
এখন দুপুর সোয়া দুইটার মতো বাজে। অবন্তী এই মুহুর্তে কিছুটা অস্থিরতার মধ্যে আছে, কারণ আর পৌনে এক ঘন্টা পরেই তাকে চা বাগানের ম্যানেজার তাশফিন হাসানের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। অবন্তী একটা শাড়ি পড়েছে--সাদা জমিনের উপর রং বেরংয়ের ব্রাশ প্রিন্ট। মাথার চুল টান টান করে বেঁধেছে সে, ঠোঁটে হালকা গোলাপী রংয়ের লিপস্টিক। নারী হিসাবে সৌন্দর্য্যের যে বাড়তি ক্ষমতাটা বিধাতা তাকে দিয়েছে যে কোন জায়গায়ই তার রুচি সম্মত প্রয়োগে কোন ক্ষতি দেখে না অবন্তী, প্রথম দিনেই যদি ম্যানেজারের মনে একটা গুড ইম্প্রেশনে তৈরী করা যায়, তাতে তো কোন দোষ নেই, তাই যতটুকু সম্ভব নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিলো সে। সাজগোজ করতে করতে সময়ের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো অবন্তী। তা মনে হতেই ঘড়ি দেখলো সে, আড়াইটা বেজে গিয়েছে, আর দেরী করা যাবে না, এখনই রওনা না দিয়ে দিলে তিনটার সময় ম্যানেজারের অফিসে পৌঁছানো যাবে না--নিজের মনে ভাবতে ভাবতেই হ্যান্ডব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিলো অবন্তী, আয়নায় নিজেকে আরেকটাবার দেখে নিয়েই ম্যানেজারের অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলো সে।

অবন্তী এখন বসে আছে ম্যানেজার তাশফিন হাসানের চেম্বারে। অবন্তীর কাছে সে একটু সময় চেয়ে নিয়েছেন, কার সাথে যেন কথা বলছে তাশফিন। অবন্তী অবশ্য আড়ালে ঠিকই তাশফিন হাসনকে দেখে নিচ্ছে। তাশফিনকে দেখে প্রথম অবস্থাতেই কিছুটা চমকে গেছে অবন্তী, সে ভেবেছিলো ম্যানেজারের হয়তো মধ্য বয়সের কেউ হবেন, কিন্তু ঘটনা তা ঘটেনি, অবন্তী স্পষ্টই বুঝতে পারছে তাশফিনের বয়স খুব একটা বেশী নয়, খুব বেশী হলে ৩০ এর মতো হবে, এর বেশী তো নয়ই; শরীরটাও বেশ পেটানো, শক্ত সামর্থ্যবান যুবক বলতে যা বোঝানো হয় আরকি, ক্লিন শেইভ করা গালটাতে ফেলে দেয়া দাড়ির ছাপ খুবই স্পষ্ট, চেহারাটা কিছুটা লম্বাটে, সাথে ঘাঢ় পর্যন্ত নেমে আসা চুলগুলো মিলিয়ে তাশফিন হাসানের যে পুরো অবয়বটা তৈরী হয়েছে তাতে নির্দ্বিধায়ই তাকে একজন সুপুরুষ হিসাবে ধরে নেয়া যায়--কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলো অবন্তী, তাশফিন হাসানের কথায় তাই কিছুটা চমকে উঠলো সে।

তাশফিন মুখ গম্ভীর করে বললো, "কি ব্যাপার চমকে উঠলেন যে! কোন সমস্যা?"
অবন্তী কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললো, "না না স্যার, তেমন কিছু না।"
কাঁধ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে তাশফিন বললো, "যাক তাহলে তো ভালোই, আপনি তো গত পরশু এসেছেন, তাই না?"
অবন্তী বললো, "জ্বি। একটু আগেই চলে এসেছি।"
তাশফিন বললো, "ঠিকই করেছেন, একটা জায়গায় নতুন এলেন, সেখানে অনেকদিন কাজ করবেন, জায়গাটার আবহাওয়ার সাথেও তো খাপ খাইয়ে নেয়ার একটা ব্যাপার আছে, তাই না?
অবন্তী সাথে সাথেই বললো, "জ্বি, তাতো বটেই, গতকাল শহরের কিছু কিছু জায়গায় ঘুরেও দেখেছি, ভালো লেগেছে।"
তাশফিন হেসে বললো, "কোন জিনিসটা খারাপ লেগেছে?"
এই ধরনের প্রশ্নের জন্য তৈরী ছিলো না অবন্তী, তাই কিছুটা সময় নিয়ে সে বললো, "এখানে ধুলোটা একটু বেশী।"
তাশফিন মাথা নাড়িয়ে বললো, "একদম ঠিক বলেছেন, সিলেটের সবই ভালো, খালি ধুলোটা একটু বেশী, সে যাই হোক, আশা করি, আপনার কাজের ছোটখাটো একটা ধারনা আপনি ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছেন।"
অবন্তী বললো, "জ্বি, আমাকে গতকালই তা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।"
তাশফিন বললো, "ফাইন, তাহলে কাল থেকে শুরু করুন, প্রতিদিন বিকালের দিকে আপনাকে আমার কাছে সেই দিনের একটা ওভারঅল রিপোর্ট দিতে হবে, সেই সব রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে আমি আর আপনি মিলে প্রতি উইকে একটা উইকলি রিভিউ করবো, যেটা কোম্পানীর হেড অফিসে যাবে সপ্তাহের শেষে।কাজেই একটু সিনসিয়ারলি করবেন সব কিছু, ঠিক আছে?"
অবন্তী ঘাড় কাত করে বললো, "অবশ্যই স্যার, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো।"
তাশফিন বললো, "অনেক ধন্যবাদ, ওয়েলকাম টু দা জব, আজ তাহলে আসুন"
"থ্যাংক ইউ স্যার" বলে উঠে যাচ্ছিলো অবন্তী, তাশফিন তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, " কি কান্ড দেখুন তো! এতক্ষণ আপনার সাথে কথা বললাম, অথচ আপনার নামটাই জিজ্ঞাসা করা হলো না, নামটা ঝটপট বলে ফেলুন।"
অবন্তী হেসে বললো, "স্যার আমার ভালো নাম সাদিয়া মুস্তাফিজ, ডাক নাম অবন্তী, আপনি আমাকে সাদিয়া অথবা অবন্তী যে কোন নামেই ডাকতে পারেন।"
অবন্তীর নাম শুনে ভুরু কুঁচকে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো তাশফিন হাসান।

...............................................................(চলবে) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28838035 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28838035 2008-09-03 00:14:49
জলে ভাসা পদ্ম.........(দ্বিতীয় অংশ)......(গল্প) প্রথম অংশ


৩)

ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সুবর্না এক্সপ্রেসটা সিলেট স্টেশনে এসে যখন পৌঁছায় তখন রাত সাড়ে দশটার মতো বাজে। সিলেট জায়গাটা অবন্তীর কাছে খুবই অপরিচিত। খুব ছোটবেলায় বাবার সাথে একবার সে সিলেটে এসেছিলো, বড় হওয়ার পর আর আসা হয়নি, কাজেই স্টেশনে নেমেই একরাশ দুশ্চিন্তার মধ্যে ডুবে গেলো অবন্তী। তাছাড়া রাতের বেলা কোথাও একা একা চলা ফেরা করতেই ভীষণ ভয় পায় সে, বিশেষ করে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটা যে রাতে ঘটেছিলো তার পর থেকে রাত নিয়ে তার মনের মাঝে এক ধরনের ফোবিয়া কাজ করে সবসময়। তাকে নিতে যদিও তার কোম্পানীর একজন লোক আসার কথা কিন্তু স্টেশনের চারপাশটায় তাকিয়ে বহু খোঁজাখুঁজি করেও সেই ধরনের কাউকেই দেখতে পেলো না সে। শেষে কি করবে কি করবে ভেবে ভেবে যখন অবন্তী প্রায় অস্থিরতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যাচ্ছিলো, তখনই হালকা পাতলা গড়নের ২৪/২৫ বছর বয়সের একটা ছেলে এসে তাকে জানালো যে-- সে কোম্পানীর একজন কর্মচারী, অবন্তীকে নিতে এসেছে। অবন্তী ভালো করে ছেলেটাকে দেখলো, জীবনের সেই কুৎসিততম ঘটনাটার পর থেকে কাউকেই আর সেভাবে বিশ্বাস করতে পারে না অবন্তী। সে ছেলেটার কাছে কোম্পানীর কোন পরিচয়পত্র আছে কিনা জানতে চাইলো। পরে ছেলেটা যখন তার মানিব্যাগ থেকে নিজের আই.ডি কার্ডাটা বের করে দেখালো, কেবল তখনই পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে ছেলেটার সাথে কোম্পানীর স্টাফ কোয়ার্টারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো অবন্তী।

স্টাফ কোয়ার্টার বললেই একটা বাড়ির যে আঙ্গিক বিন্যাসটা মুহুর্তের মাঝেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার সাথে অবন্তীদের কোম্পানীর কোয়ার্টারের তেমন কোন মিল নেই। চারতলা একটা বাড়ি, ছয় সাত কাঠার মতো একটা বিশাল জায়গার উপর আগের শতকের ষাট সত্তর দশকের নির্মাণশৈলীর মোটামুটি একটা নমুনা হয়েই দাঁড়িয়ে আছে কিছু কিছু জায়গায় খসে যাওয়া সিমেন্টের আস্তরণ নিয়ে। এই নিঝুম রাতের আঁধারেও অবন্তী স্পষ্টই বুঝতে পারলো যে-- বাড়িটার চারপাশটা বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালায় ঘেরা। বাড়িটার সামনের জায়গাটাকে অনেকটা উঠোনের মতো মনে হয়, পূর্নিমা রাতে মুগ্ধ নয়নে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকে মায়াময়ী জোছনার খেলা দেখার জন্য জায়গাটা একেবারেই মন্দ না -বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ব্যাপারটা চিন্তা করছিলো অবন্তী, হঠাৎ তার সাথে আসা কোম্পানীর কর্মচারীটা বললো, "ম্যাডাম ঘরে চলুন, আপনাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে আমাকে আবার বাসায় ফিরে যেতে হবে, অনেক রাত হয়ে গেলো।"

"হ্যাঁ চলো" বলে ছেলেটার পিছু পিছু বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলো অবন্তী। তাকে কোয়ার্টারের তিনতলার উত্তর পাশের একটা ফ্ল্যাট দেয়া হয়েছে। ফ্ল্যাটটায় সর্বসাকুল্যে দুটো রুম আছে, সাথে একটা রান্নাঘর আর একটা বাথরুম। পিছনের দিকের রুমটার সাথে জরাজীর্ণ টাইপ একটা বারান্দাও আছে। অবশ্য অবন্তীর কাছে মনে হয়েছে--ঠিকঠাক মতো পরিষ্কার করা গেলে বারান্দাটা অবসরের অলস সময় কাটানোর একটা উপযুক্ত স্থান হয়ে উঠতে পারে। মাঝখানে কোম্পানীর কর্মচারীটার কাছ থেকে জরুরী কিছু খুঁটিনাটি ব্যাপার জেনে নিলো অবন্তী। যাওয়ার আগে ছেলেটার কাছে নিজের জয়েনিং ব্যাপারেও কিছু তথ্য জানতে চাইলো সে। ছেলেটা বললো, অবন্তীকে ৩ নম্বর সেক্টরের ৪টা চা বাগান সুপারভাইজ করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ৩ নম্বর সেক্টরের ম্যানেজার তাশফিন হাসানের কাছে রিপোর্ট করতে হবে তাকে। তাশফিন হাসান গত কাল ঢাকায় চলে গেছেন তার বড় ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে, তিনি ফিরে আসবেন আগামী পরশু সকালে। তাই কোম্পানী থেকে অবন্তীকে আগামী পরশু বিকাল ৩টায় তাশফিন হাসানের কাছে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। কথাগুলো বলেই ছেলেটা চলে গেলো। বিয়ে শব্দটা শুনে কেমন যেন আঁৎকে উঠলো অবন্তী,আজ সকাল বেলায় যে সে নিজেই নিজের বিয়ের সকল আয়োজনকে ফাঁকি দিয়ে চলে এসেছে--ব্যাপারটা গত কয়েক ঘন্টায় প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো সে, তাশফিন হাসানের বড় ভাইয়ের বিয়ের কথাটা শুনে সেই কূৎসিত মুহুর্তগুলোর কথা মনে পড়ে গেলো আবার তার। এতক্ষণে নিশ্চয়ই পুরো ঘটনাটা জানাজানি হয়ে গিয়েছে। বাবার জন্য খুব কষ্ট হতে লাগলো অবন্তীর। বেচারা অনেক ধুমধাম করে অবন্তীকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, বাইরের মানুষগুলোর সামনে তিনি এখন কিভাবে মুখ দেখাবেন--কথাটা ভাবতেই চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে উঠলো অবন্তীর। তার উপরে অবন্তীর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা শুনে নিশ্চয়ই এতক্ষণে হাঁটে হাঁড়ি ভেঙ্গে দিয়েছে মোতালেব, অবন্তীর হবু বর। মোতালেবের কথা মনে হতেই রাগে কটমট করে উঠলো অবন্তী। তিন বছর আগের সেই কাল রাত্রির পর থেকে গত তিনটা বছর অবন্তীর জীবনটাকে এক রকম দোজখখানায় পরিণত করে দিয়েছে জানোয়ারটা। শেষে কিভাবে কিভাবে যেন কি সব চাল চেলে নিজের পারিবারিক মর্যাদা আর বিত্তের প্রতাপ দেখিয়ে সবার কাছে নিজের আসল চেহারাটা আড়াল করে মোতালেব অবন্তীর বাবা মাকে এক সময় রাজিই করিয়ে ফেললো অবন্তীকে তার কাছে বিয়ে দেয়ার জন্য।কথাগুলো ভাবতেই কেমন যেন অসুস্থ বোধ করা শুরু করলো অবন্তী। সে ধীর পায়ে এসে দাঁড়ালো পিছনের রুমের বারান্দাটার একটা কোণায়। নাকে খুব মিষ্টি একটা গন্ধ আসলো তার। বেলী ফুলের গন্ধর মতোই তো মনে হচ্ছে--সে ভালো করে নিচের গাছগুলোর দিকে তাকালো। অবন্তী যা ভেবেছে তাই--নিচের গাছগুলোর মধ্যে একটা গাছ বেলী ফুলের। বেলী ফুলের গাছ চেনায় তার কোন ভুল হওয়ার কথা না, কারণ বেলী ফুল অবন্তীর খুবই প্রিয়। ছেলেবেলায় তারা যে বাসাটায় থাকতো, সেটার পাশেও এমনই একটা বেলী ফুলের গাছ ছিলো। সেই থেকেই অবন্তীর বেলী ফুলের প্রেমে পড়া। তার রুমের বারান্দাতেও বেলী ফুলের একটা বনসাই আছে। বেলী ফুল নিয়ে অবন্তীর এমন পাগলামি দেখে মা মাঝে মাঝেই তাকে ভয় দেখাতেন এই বলে যে বেলী ফুলের গাছে সাপ থাকে--কথাটা মনে হতেই আপন মনে হাসতে আরম্ভ করলো অবন্তী, হঠাৎ তার হাসিটা বন্ধ হয়ে গেলো, তার এভাবে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসাতে মায়ের নিশ্চয়ই এখন অনেক কস্ট হচ্ছে, কেঁদে কেটে নিশ্চয়ই এতক্ষণে দুকুল ভাসিয়ে দিয়েছেন তিনি। জীবনের চলার পথে অলক্ষেই হুট করে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা কিভাবে ঝড়ের মতো পুরো জীবনটাকে লন্ডভন্ড করে দেয়--নিজ মনে মনে ভাবতে ভাবতেই হৃদয় অবরুদ্ধ করে গুবলে উঠা বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো অবন্তী।
.........................................................................(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28837613 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28837613 2008-09-02 00:08:02
জলে ভাসা পদ্ম............(প্রথম অংশ)....(গল্প) (১)

মিজানুর রহমান নিজেও বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি এখন কি করবেন। তার মাথায় সকল চিন্তাভবনা কেমন যেন জট পাকিয়ে যেতে শুরু করেছে। তিনি প্রবল অস্থিরতা নিয়ে তার ঘরের এক মাথা থেকে অন্য মাথা অবধি দ্রুত বেগে পায়চারি করছেন। চোখে মুখে তার অসহনীয় দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। অথচ তার এমন অবস্থা হওয়ার তেমন কোন ইঙ্গিতই ছিলো না দিনের শুরুতে। উল্টো আজকের দিনটা মিজানুর রহমানের জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ আজ তার একমাত্র মেয়ে অবন্তীর বিয়ে। সকাল থেকেই মিজানুর রহমান তাই ব্যাপক আনন্দের মধ্যে ছিলেন। সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি নামাজ পড়েছেন। বাসায় আসা পারিবারিক অতিথিতেদের সাথে মন খুলে কথা বলতে বলতে সকালের নাস্তা সেরেছেন, এরপর তিনি গিয়েছেন অবন্তীর রুমে, অবন্তীর মাথায় হাত রেখে মেয়ের আশু বিয়োগ ঘটিত বেদনা নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ শিশুর মতো অঝোরে কেঁদেছেন, শেষে অবন্তীর আগত বিবাহিত জীবনের মঙ্গল কামনা করে তাকে ছোটখাটো কিছু উপদেশও দিয়েছেন। অবন্তীর রুম থেকে বেরিয়ে এসে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ফোন করায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মেয়ের বিয়েকে ঘিরে তিনি মোটামুটি একটা হুলুস্থুল টাইপ আয়োজন করেছেন, সেই আয়োজনেরই বিভিন্ন খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে তিনি ক্রমাগত কথা বলতে থাকেন বিভিন্ন জায়গায়। ছেলে পক্ষের লোকজন যাতে বিয়ে ঘটিত ব্যাপার নিয়ে কোথাও কোন খুঁত ধরতে না পেরে সেটা নিশ্চিত করার জন্য মিজানুর রহমানের আপ্রাণ চেষ্টা সেই তখন থেকেই এই ভর দুপুর অবধি অব্যাহত ছিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে অবন্তীর মা এসে তাকে যে খবরটা শুনিয়েছেন সেটার জন্য মিজানুর রহমান কোনভাবেই প্রস্তুত ছিলেন না। বিনা মেঘে বজ্রপাত প্রবাদটার যথার্থতা নিয়ে মিজানুর রহমানের মনে আজ পর্যন্তও যদি কোন সংশয় থেকে থাকতো, তবে আজ যে তা দূর হয়ে গেছে তাতে কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা না। কারণ অবন্তীর মা এসে তাকে কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছে--অবন্তী পালিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় নিজের রুমে ছোট্ট একটা চিরকুটে বড় বড় করে লিখে গিয়েছে সে--"তোমরা সবাই আমাকে ক্ষমা করো"। পুরো ব্যাপারটা অবন্তীর মার কাছ থেকে শোনার পরও মিজানুর রহমান কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এ কি করে সম্ভব! অবন্তী কেন পালিয়ে যাবে? এমন তো না যে তিনি মেয়েকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দিচ্ছেন। এই বিয়ে ঠিক করার আগে অবন্তীর সাথে তিনি বেশ কয়েকবার কথাও বলেছেন। অবন্তীর কোন পছন্দ আছে কিনা সেই বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহের সাথেই তিনি অবন্তীর সাথে কথা বলেছেন, কই অবন্তী তো তখন তাকে কিছুই বলেনি? নাকি মেয়েটা লজ্জায় কিছু বলতে পারেনি? কিন্তু তাও তো হতে পারে না, সে রকম হলে তো অন্তত পক্ষে মেয়েটার চোখে মুখে কিছুটা হলেও ব্যাপারটা ধরা পড়তো। অন্যদিকে যে ছেলেটাকে তার বর হিসাবে ঠিক করা হয়েছে তার ব্যাপারে অবন্তীর কোন আপত্তি আছে কিনা সেই ব্যাপারেও তিনি অবন্তীর কাছে জানতে চেয়েছেন, অবন্তী হাসিমুখে তাকে জানিয়েছে যে-- সে রাজি। আজ সকাল অবধিও মেয়েটাকে তিনি খুব হাসিখুশি দেখেছেন। গত কয়েকদিন ধরেই সবার সাথে খুশি খুশি মন নিয়ে কথা বলেছে অবন্তী, মুরুব্বিদের বিভিন্ন হাসি ঠাট্টায় মাথা নিচু করে হেসেছে, ভাই বোনদের খুনসুটি টিপ্পনীতে তাদের সাথে মৃদু মন্দ আহ্লাদী ঝগড়াও করেছে। মোদ্দা কথা মেয়ের গত কয়েকদিনের কর্মকান্ডের কোন কিছুতেই তিনি কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া এই কুৎসিত ঘটনার ইঙ্গিত পাননি, মিজানুর রহমান তাই অনবরতই ভেবে চলেছেন কি কারণ থাকতে পারে অবন্তীর এই অতি অপ্রত্যাশিত কান্ড ঘটানোর পিছনে। তিনিই বা এখন কি করবেন? বর পক্ষের লোকজনদের কাছে তিনি কি জবাব দিবেন? তিনি এখনো বুঝে উঠতে পারছেন জীবনের এই পর্যায়ে এনে আল্লাহ তাকে এ কোন ধরনের কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিলেন?মিজানুর রহমানের স্পষ্টই বুঝতে পারছেন তিনি জ্ঞান হারাচ্ছেন, ধীরে ধীরে নিজের চারপাশটাকে কেমন যেন ঘোলাটে আর অন্ধকার লাগতে শুরু করেছে তার। অন্যদিকে মিজানুর রহমানের বাসার সবার মধ্যেই এখন একটা প্রবল উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে, ঘটনার অতি আকস্মিকতায় সবাই যার পর নাই বিস্মিত ও স্তম্ভিত।

(২)

এখন বাজে দুপুর সাড়ে তিনটার মতো। এই ধরনের পরিস্থিতে যে কেউই ধরে নিবে যে অবন্তী হয়তো তার প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছে, যদিও ব্যাপারটা মোটেই সেরকম কিছু না, অবন্তীর হাত আকড়ে ধরে রাখার মতো কোন পরুরষই এখনো তার জীবনে আসে নি, আসলে মনে হয় ভালোই হতো, অনন্ত আজ এই চরম বিপদের অবন্তী হয়তো সেই মানুষটার কাছেই নিজের আশ্রয় খুঁজে নিতো, হায়! তার পরিবারের মানুষগুলো হয়তো কোনদিনও জানতে পারবে না কি ভীষণ মানসিক যণ্ত্রনা আর বেদনা নিয়ে সে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে আজ কঠিন এক অনিশ্চয়তার পথে।

অবন্তী এখন বসে আছে কমলাপুর রেল স্টেশনে যাত্রার শুরুর অপেক্ষায় থাকা সিলেটগামী সুবর্না এক্সপ্রেস ট্রেনের প্রথম শ্রেনীর একটা কামরার জানালার ধারের একটা সিটে। গত কয়েকদিনে সে বাসার মানুষগুলোর সাথে অনেক অভিনয় করেছে, কউকে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি নিজের চিন্তা ভাবনার কথা। ট্রেনের টিকিটটা কেটে রেখেছিলো সে অনেক আগেই। সিলেটের একটা নামকরা চা কোম্পানীর সুপারভাইজারের পোস্টে মোটামুটি বেতনের একটা চাকরি হয়ে গেছে তার। এই চাকরির কথাও সে কাউকেই বলে নি। শধু নিজের মনে মনেই আজকের দিনটার প্রতীক্ষা করেছে, যদিও এই প্রতীক্ষা ছিলো বড় বেদনার। কোম্পানীতে তার জয়েনিংটা আরো দুই দিন পরে, কিন্তু বাধ্য হয়েই টাকে দুই দিন আগেই চলে যেতে হচ্ছে, কোম্পানীকে সে এ কথাটা জানিয়েছেও, সেই অনুযায়ী কোম্পানীর পক্ষ থেকেও তার থাকা খাওয়ার বন্দোবস্তটাও দুই দিন আগেই করা হয়ে গিয়েছে। জানালা দিয়ে এক দৃষ্টিতে স্টেশনের প্ল্যাটফরমটার দিকে তাকিয়ে আছে অবন্তী। সেই ছোটবেলা থেকেই স্টেশনের অতি ব্যস্ত কোলাহলময় তাকে যার পর নাই মুগ্ধ করে। সবাই ব্যস্ত এখানে--কেউ কেউ ফিরে আসায় ব্যস্ত, কেউ কেউ চলে যাওয়ায় ব্যস্ত, কারো কারো মুখাবয়বে নীড়ে ফেরার আনন্দ, কারো কারো নীড় ছেড়ে কিছুদিন পালিয়ে বেড়ানোর আনন্দ। যারা নীড় ছেড়ে পালিয়ে বেড়ানোর আনন্দ খোঁজে, নীড়টা আছে বলেই তো আনন্দটা তাদের কাছে এতো মধুর মনে হয়, অথচ অবন্তীর? সে যে আজ তার চিরচেনা নীড় ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, সেই নীড়ে আদৌ কোনদিন আর তার ফিরে আসা হবে কিনা--সেই ব্যাপারে যথেষ্টই সন্দিহান অবন্তী, কাজেই তার এই পালিয়ে যাওয়ায় কোন আনন্দ নেই, কোন সুখ নেই, কোন রোমাঞ্চকর অনুভূতিও নেই---কথাগুলো মনে মনে ভাবছিলো অবন্তী। হঠাৎ করেই মৃদু একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে আরম্ভ করলো সিলেটগামী সুবর্ণা এক্সপ্রেস। সাথে সাথে অবন্তীর ভাবনার তালটাও কেটে গেলো। ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে অবন্তী আর অন্যান্য সকল যাত্রীদের নিয়ে সুবর্না এক্সপ্রেসটা ছুটতে লাগলো সবুজের শহর সিলেটের উদ্দেশ্যে।


..............................................................(চলবে) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28837220 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28837220 2008-09-01 00:14:23
বোঝাপড়া আমার পূর্বপুরুষেরা ঘুমিয়ে পড়েছিলো সেইবার--
৭১' এর সেই রক্ত-ভেজা সমর প্রান্তরে, এই বাংলার তরু-ছায়ায়,
লাল রক্তের বোঝাপোড়া না করেই
আমরা তাদের সন্তানেরা ঘরে ফিরে এসেছিলাম সেইবার--
বিজয়ের উল্লাসে, উচ্ছ্বাসের অবিনাশী ছন্দ-বীণায়,
লাল রক্তের বোঝাপোড়া না করেই
আমরা তোদের টুটি ছেড়ে দিয়েছিলাম সেইবার--
অসীম করুনার ছলে, মানবতার অনন্ত মায়াছয়ায়,
শ্বাপদ তোদের উড়িয়ে দিয়েছিলাম চৈতণ্যের নীলাভ আকাশে,
ভেবেছিলাম মানবতার বোধোদয়ে তুষার শুভ্র মনোষ্কামনা নিয়ে
তোরা ফিরে আসবি আবার এই বাংলার প্রান্তরে,
শ্বাপদের বেশে নয়, অনন্ত শ্বাশ্বত মণুষ্যত্বের চেতনায়।

হায় তোরা ঠিকই ফিরে এসেছিস আবার এই বাংলার প্রান্তরে,
কিন্তু কই? তোদের কণ্ঠে তো এখনো প্রতিধ্বনিত হতে শুনি না
খেটে খাওয়া কোন সাধারণ মানুষের বুলি,
বরং তোদের কণ্ঠে এখনো প্রতিনিয়তই বেজে ওঠে আড়ালে
পূর্বেকার সেই সে পাশবিক চিৎকারের প্রতিধ্বনি,
মন বলে তোরা আবারো সেই শকুনের বেশেই
ফিরে এসেছিস এই বাংলার প্রান্তরে,
মানুষের আকৃতিতে চতুষ্পদ হায়নার হিংস্র মনোবৃত্তির আনাগোনা
এখনও তবু রয়ে গেছে তোদের অন্তরে,
কারণ এখনো তোদের সমস্ত শরীর জুড়ে
অধম শ্বাপদের ভোদকা শারীরিক গন্ধ লেপটে আছে,
কুৎসিত শকুনের মতো তোদের দুর্গন্ধময় মুখগহবর থেকে এখনো অঝোরে
হিংস্রতার লোলুপ, পৈশাচিক লালা গড়িয়ে পড়ে,
এখনো দেখি তোদের সমস্ত দৃষ্টি জুড়ে ঘুরে ফিরে খেলা করে
ধূর্ত শৃগালের হিংস্র কুট-ছায়া,
তবে শোন আমরাও বুঝে গেছি, তোরা মানুষের অধম কেবলই কীট,
দৃষ্টির অগোচরে মাটির বুক ফুড়ে চোরা পথে উঠে আসা
তোরা কেবলই রক্তোচোষা শুয়োপোকা।
তবে শোন, আমরাও বলে রাখি,
লাল রক্তের বোঝাপোড়া হবে এবারই, এই বাংলার প্রান্তরেই,
আমরা মরচে ধরা বন্দুকের বেয়োনেটে আবার শাণ দিয়েছি,
আমরা ঘুণে ধরে যাওয়া কোদালের হাতলে এবার প্রতিজ্ঞার মুষ্টি বসিয়েছি,
ক্রমাগতই খিঁচে উঠতে থাকা আমাদের চোয়ালের অস্থি থেকে অস্থিতে
বড় সযত্নেই আমারা মিশিয়ে নিয়েছি এবার ধ্বংসাত্মক প্রতিশোধের লালা,
তোদের রক্তেই উসুল হবে জানিস এবার মোদের তিন পুরুষের জ্বালা,
কণ্ঠে শুনিস রবে মোদের এবার কেবল শ্বাপদ তাড়ানোর গান,
আয় হায়নার দল প্রস্তূত থাক্,
লাল রক্তের বোঝাপড়া হবে এবারই, এই বাংলার মাটিতেই,
আকাশে বাতাসে বইবে দেখিস, বইবে কেবল বাংলা মায়ের টান।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28835765 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28835765 2008-08-27 22:47:08
স্মৃতিরা কেবলই বেদনার ছল ল্যাম্পপোস্টের আলো মাড়িয়ে মাড়িয়ে ফুটপাথ
ধরে শুন্য চোখে আজকাল হেটে চলে যাই কখনো কখনো
উদ্ভ্রান্ত পথিকের মতো,
মাঝে মাঝে কান পেতে শুনি
রাতের শীতল বাতাসের অব্যক্ত প্রতিধ্বনি--
স্মৃতির জানালায় থুতনি ঝুলিয়ে দিয়ে সেই প্রতিধ্বনির মাঝেও
আমি তাই ক্রমাগতই হাতড়ে খুঁজে ফিরি ফেলে আসা সেই সুর,
নেশাখোর মাতালের ঝিমুনির অদৃশ্য সংগীত অথবা নিশাচর কুকুরের
চির দুঃখী আর্তনাদের তল থেকে অতলান্তে তলিয়ে যেতে যেতে সেই
সুর কখনো কখনো যখন বড় ক্ষীণ সুরে আমার কানে বেজে ওঠে--
পাংশু স্মৃতির ঝড়ে এলোমেলো আমি জগতের সকল শূন্যতা নিয়ে
তখন চেয়ে থাকি রাতের আকাশের পানে,
নিষ্পলক চোখে চেয়ে দেখি নক্ষত্রের আলাপন নক্ষত্রের সাথে,
অথচ নক্ষত্রের আলাপচারিতায় ব্যতিব্যস্ত এমনই কতো রাত্রির
কোলাহলময়তাকে কত অবলীলায়ই না আমরা নিথর করে দিয়েছিলাম
আমাদের প্রেমাতালের অপার্থিব শাব্দিক দ্যোতনায়,
স্মৃতির পথ থেকে পথে এমনই হাঁটতে হাঁটতে যখন এসে থেমে যাই
কোন এক অন্ধ উপত্যকায়,
মনের অজান্তেই কেবলই তোমার প্রতিবিম্ব খুঁজে ফিরি তখন,
আবার কখনো কখনো বিজন সন্ধ্যাকালে
ক্ষাণিক আগেই গত হয়ে যাওয়া আলোর ছায়াতলে
নিজের প্রতিবিম্ব হাতড়ে ফিরি,
অস্তিস্ত্বের সংকটটা যখন বড় ভয়াল সুরে অণুরণিত হয়,
জলের মাঝে এসে তীর্যকভাবে পড়া
নিজের ছায়ার অবধারিত অস্তিত্বটাকেও ভুলে গিয়ে
আজকাল আতকে উঠি কখনো কখনো--
ভাবি এই বুঝি তুমি এসে দাঁড়িয়েছো পেছনে,
শেষে তামাক পাতার জ্বলনে--
অনাহূত বেদনার লেলিহান শিখা নেভাবো বলে ,
হৃদয়ের বাতাস ভারী করে গুবলে উঠা তোমার স্মৃতির ঝড় থামাবো বলে তোমার উপহার লাইটারটায়
আজো যখন বড় আলতো করেই খোঁচা দেই--
নিমিষেই জ্বলে ওঠে আগুন,
অথচ আজ কতোকাল ধরে তোমার স্মৃতির
সমস্ত প্রান্তরটা জুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি চালালাম কতো বিষম বেদনার ছলে,
অথচ আজো এতোটাকাল পরেও একটা বারের তরেও
তোমার স্মৃতির বুক জুড়ে ধপ্ করে জ্বালানো গেলো না
আমায় দিয়ে যাওয়া আপাত মধুর তোমার প্রেমের
সেই সব ছন্নছাড়া অভয়বানী;
কারণ স্মৃতিরা কেবলই বেদনার ছল।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28834436 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28834436 2008-08-24 20:02:14
ঝরে যাওয়ার অপেক্ষায় বড় বড় অট্রালিকা, কিংবা
আমার চিরচেনা ব্যস্ত পরিমন্ডল;
কিছুতেই আজ আর মন বসে না,
কোথাও ঘটেছে কোনো ছন্দপতন,
নেই আর আগের সেই শিহরণ--
ব্যস্ত পথে ছুটে চলার,
কেউ নেই কোথাও
আমার কথা শোনার,
সবার শুধু রুদ্ধশ্বাস আসা যাওয়া, আর
প্রাণহীন মাংসপিন্ডের মতো কেবলই আমার পড়ে থাকা,
তাদের তিরস্কার আমার প্রতি, তবুও
আমার কেবলই নির্বাক অপলক চোখে তাকিয়ে থাকা,
কারণ আমর দেহখানি অবশ, মনখানি হলুদ পাতার মতো--
ঝরে যাওয়ার অপেক্ষায়,
হয়ত অচিরেই কোনো দমকা হাওয়ায় ঝরে যাবে,
মিশে যাবে ধূলায়,
ঝরা পাতার কান্নার আওয়াজ কেউ শুনবে না,
কেউই হয়ত বলবে না 'বিদায়',
কেউই হয়তো মনে রাখবে না,
মায়ার পৃথিবীতে কেই বা মনে রাখে মায়ায়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28833715 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28833715 2008-08-22 21:21:46
কৃষ্ণ-পক্ষ..........(শেষ অংশ)......(গল্প)
প্রস্তুতি প্রায় শেষ। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর বিকেলের দিকে মলাইপুর থেকে সাত গ্রাম দূরে ভারুলা চর থেকে ৬৪/৬৫ বছরের এক লোককে নিয়ে আসা হয়েছে কুসুমের চোখ উপড়ানোর জন্য। এই লোক নাকি মানুষের চোখ উপড়ানোর কাজে বিশেষজ্ঞ, চরে চরে বাদ বিবাদের রেষ ধরে বয়সকালে সে নাকি এমন বহু লোকের চোখ উপড়ে ফেলেছে।
সে এখন দু পা ছড়িয়ে দিয়ে একটা সুপারীগাছের গোড়ায় বসে আছে। তার হাতে বাঁশের দুইটা ধারালো কঞ্চি। কঞ্চিগুলোর তীক্ষণতা আর সবিশেষ আকারের দিকে নজর দিলেই বোঝা যাবে যে এই লোক আসলেই এই কাজে দক্ষ। তার থেকে একটু দূরে সুপারি বাগানটার ঠিক মাঝখানাটায় বাঁশ, কাঠ, খড়, লাড়কির মিশেলে ছোটখাটো একটা কুন্ডুলীর মতো বানানো হয়েছে। কুসুমের চোখ উপড়ে ফেলার পর এই কুন্ডুলীর ভিতর এনে তাকে পুড়িয়ে ফেলা হবে। পোড়ানোর কাজটা যাতে ঠিক মতো সম্পন্ন হয় সেই জন্য পাশের গ্রামের শ্মশানঘাটের এক ডোমেকেও নিয়ে আসা হয়েছে। ডোমের চোখমুখ জুড়ে চাপা অস্থিরতা। সে আজীবন মরা মানুষ পুড়িয়ে এসেছে, আজ তাকে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে ফেলতে হবে, তাও আবার ভিন্ন ধর্মের এক বিধবা নারী। ডোমের কোনভাবেই মনকে স্থির করতে পারছে না। সে বাগানের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় প্রবল উদ্বেগ নিয়ে পায়চারি করছে। কুসুম বসে আছে বাগানের ঠিক মাঝখানটায় কুন্ডুলিটা থেকে ক্ষাণিক দূরে। তার দুই দিকে দুই হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে এই গ্রামেরই ২৪/২৫ বছর বয়সের দুইটা ছেলে। কুসুমের চোখ মুখ অস্বাভাবিক নির্ভার, চুল খোলা, পরনে দুই প্যাঁচ দেয়া একটা শাড়ি। কুসুমের দুকুলেও কেউ নেই, বাবা নেই, মা নেই, কোন আত্মীয় স্বজনও নেই, নিঃস্ব হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার চেয়ে চলে যাওয়াই ভালো--এটা ভেবেই কি সে এতোটা নির্ভার অবস্থায় বসে আছে কিনা তা বুঝা যাচ্ছে না। তবে যে ব্যাপারটা একেবারেই স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে তা হলো ইমাম সবুর উল্লাহর মানসিক অশান্তি। খুবই টেনশানে আছেন তিনি। তার সাজানো নাটকের মঞ্চ প্রস্তুতির প্রবল আয়োজনে তিনি যার পর নাই বিস্মিত কিংবা বলা যায় ঘটনার আশু পরিণতির কথা চিন্তা করে তিনি প্রবলভাবে ঘাবড়েও যেতে শুরু করেছেন। তবে তার চোখ মুখ দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। তিনি মুখটাকে খুব হাসি হাসি করে রেখেছেন। যেন একটু পরেই তিনি কুরবানীর পশু জবাই করতে রওনা হবেন। গ্রামের মাতব্বর ছগির উদ্দিন সুপারী বাগনটা থেকে একটু দূরে রাখা একটা চেয়ারে বসে আছেন। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন বয়স্ক লোক। ছগির উদ্দিন একসময় ইমাম সবুর উল্লাহকে ডাক দিয়ে বললেন, "জনাব, রাইত ম্যালা হইতে চললো, আর দেরী করা মনে হয় ঠিক হইবো না, আফনে কুসুমরে দোয়া কলমা পড়াইয়া লন, এরপর আসল কাজটা হইয়া যাক।"

ইমাম সবুর জ্বি বলে সুপারী বাগানের ভিতর বসে থাকা কুসুমের দিকে এগুতে শুরু করলেন। সাথে সাথে উৎসুক জনতাও ইমামের পিছন বাগানের ভিতর ঢুকতে আরম্ভ করলো। ইমাম সবুর হাটু গেঁড়ে বসে থাকা কুসুমের একদম কাছাকাছি এসে বসলেন। মাথা নিচু করে তিনি কুসুমকে বললেন, "কুসুম যা হইছে সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা। তুমি আমার উপর বেজার হইও না, আল্লাহপাকের নির্দেশে আমি এইকাজ করতাছি। কাজে তুমি বেজার হইলে কিন্তু আল্লাহপাকও নারাজ হবেন। আমি তোমারে কলমা পড়াই, তুমি কলমাটা পইড়া নাও।"

কুসুম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ইমামের দিকে। তারপর মুখে এক গাদা থুতু জমিয়ে এনে আকস্মিকই সে থুতুগুলো মেরে বসলো ইমামের মুখ বরাবর। ইমাম সাহেব দাঁত কটমট করে বললেন, "মাইয়া মানুষের বেশী রাগ ভালো না, এইটা তোরে আগেও কইছি, তুই বুঝস নাই, আজকেও বুঝলি না।" কথাটা বলেই তিনি কুসুমের কাছ থেকে সরে আসলেন।

তার কিছুক্ষণ পরেই মলাইপুর গ্রামের আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হয়ে কুসুমের চিৎকার শোনা গেলো। বাঁশের ধারলো কঞ্চি দিয়ে কুসুমের চোখ দুটো উপড়ে ফেলা হয়েছে। তার চোখ থেকে অনর্গল রক্ত ঝরছে। এই দৃশ্য দেখে গ্রামের লোকজন প্রবল মানসিক ঝাঁকুনি খেলো। এই ধরনের অভিজ্ঞতা সারাজীবনেও তাদের আর হয় নাই। একজন বৃদ্ধ এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে ঘটনা স্থলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।

চোখ উপড়ানোর পর গগন বিদারী চিৎকার করে কাঁদতে থাকা কুসুমকে টেনে হিচড়ে নিয়ে আসা হলো কুন্ডুলীটার কাছে। কুন্ডুলীটাতে আগে থেকেই আগুন দেয়া হয়েছিলো। ডোমেরের নির্দেশ অনুসারে গ্রামের কয়েকজন যুবক এক পর্যায়ে কুসুমকে ধরে সেই কুন্ডুলীর মধ্যে ছেড়ে দিলো। কুন্ডুলী পাকিয়ে ওঠা বহ্নি-শিখার তীব্রতা আর ঘটনার আকস্মিকতায় কুসুমের অসহ্য, পাশবিক চিৎকার বড় অবলীলায়ই কখন যেন মিলে মিশে হারিয়ে গেলো সবার অলক্ষেই-- অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষের অনন্ত আঁধারে।তৃতীয় বিশ্বে এই চরম আধুনিকায়নের যুগেও বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এক অবলা নারী কুসুম--গ্রামীন কুসংস্কার আর অন্ধ বিশ্বাসের বলি হয়ে নিজের জীবনটাকে শেষ পর্যন্ত বিলিয়ে দিতে বাধ্য হলো সুপারী বাগনাটায় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা কুন্ডুলী পেঁচিয়ে ওঠা অসহ্য , তীব্র, অনিঃশেষ সেই অশান্ত অগ্নিশিখায়।

কুসুমের পাশবিক জীবনাবাসনের পর প্রায় ১৫ দিন কেটে গিয়েছে। মলাইপুর গ্রামে কুসুমের ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছিলো তা অনেকটাই প্রশমিত হতে শুরু করেছে। পুরো গ্রামময় যে কানাঘুষাটা শুরু হয়েছিলো তাও অনেকটাই কমে এসেছে। ইমাম সবুর উল্লাহ কুসুমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভিতরে ভিতরে গভীর উদ্বেগর মধ্যে ছিলেন, দিন রাতই তার কেবল মনে হতো এই বুঝি তার সমস্ত কুকীর্তি ফাঁস হয়ে গেলো। কুসুমের মৃত্যুর পরের কয়েকটা রাত তিনি অসুস্থতার ভান ধরে মসজিদে নামায পর্যন্ত পড়াতে যান নি , সেই সুপারি বাগানটাকে ডিঙ্গিয়ে মসজিদে যেতে হবে--এই ভয়ে, কিন্তু তিনিও গত কয়েকদিন হলো আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে আসতে শুরু করেছেন। গত কয়েক রাত ধরে তিনি নিয়মিত মসজিদে নামাজও পড়াচ্ছেন। আজ রাতেও তিনি এশার নামাজটা যথারীতি শেষ করে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষ প্রায় শেষ হতে শুরু করেছে। সবুর নিজেও তাতে মনোবল পাচ্ছেন যথেষ্ঠই। গ্রামের সবার মনে কুসংস্কারটার সমাপ্তির ব্যাপার নিয়ে যে বিশ্বাস রচিত হয়েছে তার পুরোটাই তো আসলে তার সাজানো খেলা--এটা তিনি খুব ভালো করে জানেন বলেই কুসুমের মৃত্যুর পরের কয়েকটা দিন সুপারী বাগানের সেই মহিলার ভয়ে তিনি এই পথ মাড়াতে সাহস করেন নি। তার উপর আবার এইখানেই কুসুমকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই পথে আসার কথা ভাবলেই তিনি প্রায় আধ-মরা হয়ে যেতেন। কাজেই অমাবশ্যা কাটতে শুরু করেছে জেনে তিনি মনে সাহস ফিরে পেয়েছেন আবার এবং আজো অন্যান্য দিনের মতোই কিছুটা ভয়ে ভয়ে হলেও মসজিদ থেকে আয়তুল কুসরি পড়তে পড়তে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করেছেন সবুর। একসময় তিনি সুপারী বাগানটার পাশে চলে আসলেন। পুরো বাগানময় এখনো রাজ্যের অন্ধকার। বেচারী কুসুমের ভস্ম মনে হয় এখনো বাগানের মাটির সাথে পুরোপুরি মিশে যায় নি--কথাটা ভাবতেই তার শরীর শিউরে উঠলো। তিনি দ্রুত গতিতে হাঁটতে শুরু করলেন। বাগনটার পরিধিটা এতো বিশাল যে পুরো বাগানটা পার হতে প্রায় ৬/৭ মিনিটের মতো লাগে। সবুর উল্লাহ খুব ঘন ঘন পা ফেলছেন, তার কাছে প্রতিটা মিনিট মনে হচ্ছে কয়েক ঘন্টার মতো। হঠাৎ একটা দিকে তাকিয়েই তিনি চমকে উঠলেন। তিনি মনে প্রাণে না চাইলেও তার দৃষ্টিটা আবারো সেই দিকে চলে গেলো। তিনি আল্লাহ গো! বলে একটা চিৎকার দিলেন। একি দেখছেন তিনি! সাদা শাড়ি পরা একটা মহিলা সেই দিকটা থেকে খুব ধীর পায়ে হেটে আসছে তার দিকে। তিনি ঘামতে শুরু করলেন। সবুর বুঝতে পারছেন না তিনি কি করবেন, তার ইচ্চা করছে জোরে একটা দৌড় দিতে, কিন্তু একি! তার পা নড়ছে না কেন? সবুরের মনে হচ্ছে তার পাটা যেন কেউ মাটির সাথে আটকে দিয়েছে। মহিলাটা ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে ক্রমাগত। সবুরের যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। মহিলাটা সবুরের যতই কাছে আসছে মহিলাটার পুরো অবয়বটা সবুরের কাছে ততটাই সপষ্ট হতে শুরু করেছে। তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন। এ কি! মানুষের মুখে যা শুনেছেন এতোদিন, তাই তো তিনি এখন নিজের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন স্পষ্ট। তিনি খুব ভালো করে তাকালেন মহিলাটার দিকে--হ্যাঁ তাই তো, মহিলাটার কোন চোখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু দু'চোখের দুই কোটর দেখা যাচ্ছে আর সেই কোটর দুইটা থেকে অনবরতই টপটপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে। সবুর আর সহ্য করতে পারছেন না। তিনি প্রাণপণে হাঁটতে চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। এদিকে মহিলাটাও তার প্রায় কাছে চলে এসেছে, আর মাত্র কয়েকটা হাত দূরে। তিনি আবার মহিলাটার দিকে তাকালেন। প্রকৃতি যে তার জন্য এতো বড় একটা বিস্ময় নির্ধারণ করে রেখেছিলো তা বোধ হয় সবুর স্বপ্নেও কোনদিন কল্পনা করেন নি। নিজের চোখ জোড়াকেও তিনি এখন অবিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। কারণ সাদা শাড়ি পরা যে মহিলাটা তার দিকে এগিয়ে আসছে সে আর কেউই নয়--কুসুম! সবুরের মাথা ঘুরাতে শুরু করেছে। তিনি একটা জিনিসই শুধু বুঝে উঠতে পারছে না--এতোটা দিন পরে পুড়ে যাওয়া কুসুমের ভস্মেরই যেখানে কোন হদিস পাওয়ার কথা না সেখানে তার চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত একটা মানুষ কুসুম ধীরে ধীরে তার দিকে কি করে এগিয়ে আসছে। সবুর স্পষ্টতই বুঝতে পারছেন তিনি জ্ঞান হারাচ্ছেন। তিনি আকশের দিকে তাকালেন, পুরো আকাশ জুড়েই আঁধার, তিনি সেই অন্ধাকার আকাশের দিকে তাকিয়েই স্বর উঁচিয়ে কেঁদে উঠলেন আর বললেন---"হে আল্লাহ! এ কোন শাস্তি তুমি আমার জন্য বরাদ্দ রাখলা।" এরই মধ্যে কুসুমের অবয়বধারী মহিলাটা প্রায় হাত ব্যবধান দূরত্বে চলে আসলো সবুরের। সবুর জোর গলায় বলে উঠলেন---"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।"

পরের দিন সকাল বেলা মলাইপুর গ্রামবাসী ইমাম সবুর উল্লাহর লাশ আবিষ্কার করে সেই সুপারী বাগানটার একটা কোণে। শেষে অনেক পরীক্ষণ নিরীক্ষণ করার পরেও ইমাম সবুর উল্লাহর শরীরে কোন ক্ষতচিহ্ণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।


.............................................................................(সমাপ্ত) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28831656 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28831656 2008-08-16 23:53:15
কৃষ্ণ-পক্ষ............(প্রথম অংশ)...।(গল্প)
গ্রামের শেষ সীমানাটায় বড় জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বহুকাল পুরানো মলাইপুর জামে মসজিদ। বছরের অধিকাংশ সময়ই এই মসজিদে নামায পড়ানোর মতো কোন ইমাম থাকেনা। এতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইমামতী করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া এমনিতেই যথেষ্ঠে কষ্টসাধ্য ব্যাপার, তাও যদি অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর কেউ আসতে রাজি হয়, আসার মাসখানেকের মাথায় তারা ইমামতির চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। এই গ্রামের বহু প্রাচীন এক লোকগাঁথা কিংবা কুসংস্কারই হচ্ছে এর অন্যতম প্রধান কারণ। মলাইপুর জামে মসজিদটা অতিক্রম করে গ্রামের মুল অংশটায় ঢোকার পথে একটা বিশাল সুপারি বাগান পার করে আসতে হয়। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে-- অমবশ্যার কালপক্ষে ধবধবে সাদা শাড়ী পড়া মধ্য বয়স্ক একটা মহিলা রাতভর এই সুপারি বাগানটায় আপন খেয়ালে ঘোরাফেরা করে। এই পর্যন্ত হলেও একটা কথা ছিলো, আরো যেটা শোনা যায় যে এই মহিলার নাকি চোখ নাই, উল্টো চোখের গর্ত থেকে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পড়ে। গ্রামের কাউকে জিজ্ঞাসা করা হলে সবাই এক বাক্যে এই বিশ্বাসের ব্যাপারে সমর্থন জানাবে, কিন্তু এমন লোক খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর যে সরেজমিনে মহিলাটাকে বাগানে ঘুরতে দেখেছে। বহু খোঁজাখুঁজির পর সত্তর আশি বছর বয়সের দু'একজন বৃদ্ধকে এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে জোর গলায় কথা বলতে শোনা যাবে। সে যাই হোক, কুসংস্কারই হোক আর বাস্তব ঘটনাই হোক, পুরো ব্যাপারটা এখন এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে কেউ দেখুক বা না দেখুক অমাবশ্যার কালপক্ষতে বাগানটায় সাদা শাড়ি পড়া সেই মহিলার উপস্থিতির ব্যাপারে কারো মনে কোন সংশয় নেই। মসজিদের ইমামরাও এই বিশ্বাস থেকে নিজেদেরকে আড়াল করতে পারে না এবং অগত্যাই কিছুদিন ইমামতী করার পর এই অদ্ভুতুড়ে কাহিনীর ঘোরপ্যাঁচে আটকে পড়ে প্রবল ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে তারা গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। মসজিদের বর্তমান ইমাম সবুর উল্লাহর অবস্থাটাও কোনভাবেই ব্যতিক্রম নয়। গ্রামে আশার কিছুদিনের মধ্যেই এই কাহিনী শোনার পর তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। প্রতি রাতে এশার নামাজ শেষ করে তিনি যখন নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন, প্রবল অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তার সময় কাটতে থাকে তখন, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থাটা শুরু হয় যখন সবুর সুপারি বাগানটা পার করতে শুরু করেন, তার হাত পা কাঁপতে আরম্ভ করে, মাথা ঘুরাতে শুরু করে, তিনি মনে প্রাণে তখন আল্লাহকে ডাকতে শুরু করেন আর বিড় বিড় করে আয়তুল কুসরি পড়তে থাকেন।এই ভাবে গত এক মাস পুরাটাই কেটেছে তার। চাকরিটা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন কিনা তাই নিয়েই গভীরভাবে ভাবছেন তিনি গত কয়েকদিন। অবশ্য গ্রামের লোকজনদের উপর কেমন যেন মায়া বসে গেছে তার, এদেরকে ছেড়ে যাওয়ার কথা মনে উঠতেই কেমন যেন খারাপ লাগতে শুরু করে, তার উপর হৃদয়ে আল্লাহর কালাম ধারণ করেও এই ধরেনের জাগতিক ভয়ের কাছে নতি স্বীকার করাটাও কেমন কাপুরুষতামির মতোই ঠেকছে তার কাছে। অন্যদিকে গ্রামের মাতাব্বর শ্রেনীর লোকজন থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া মানুষ--প্রায় সবার কাছেই অতি সম্মানের পাত্র হয়ে উঠেছেন সবুর উল্লাহ। তারাও চান না সবুর উল্লাহ এই গ্রাম থেকে বিদায় নিক।

অবিবাহিত সবুর উল্লাহর জীবনযাপন খুবই স্বাভাবিক, অহেতুক ফতোয়াবাজি করতেও তাকে খুব একটা দেখা যায় না, কোন প্রকার দৃষ্টিকটু কাজেও তাকে এই পর্যন্ত জড়াতে দেখা যায় নি। কিন্তু এই লোকের একটা ব্যাপারে গ্রামের কেউই এখনো অবগত নয়। কোন এক অজ্ঞাত কারণে যে কোন বিবাহিত নারীর প্রতি সবুর উল্লাহর এক ধরনের মোহ কাজ করে। অবিবাহিত কোন মেয়ে বা মহিলার দিকে --হোক সে পরীর মতো সুন্দর, সবুর উল্লাহ ভুল করেও কোন দিন তাকান না, কিন্তু বিবাহিত কোন মহিলা দেখলেই তার প্রতি তিনি আসক্ত হয়ে পড়েন। তার এই চারিত্রিক দুর্বলতা কিংবা অসংগতির ব্যাপারে গ্রামের কেউই এখনো কিছু জানতে পারে নি।

সবুর উল্লাহকে তিনবেলা রান্নাবান্না করে দিয়ে যায় এই গ্রামেরই এক মেয়ে কুসুম। মেয়েটা বিধবা,বছর তিনেকের মতো হয়েছে তার স্বামী মারা গিয়েছে। শেষে গ্রামের লোকজন মিলে তাকে মসজিদের ইমামের খাওয়া সরবাহের কাজটা ধরিয়ে দেয়। বিনিময় যে কয়েকটা টাকা গ্রামের সবাই মিলে চাঁদা তুলে তাকে দেয়, তা দিয়ে কুসুমের দিন একরকম চলে যায়। সবুর উল্লাহ প্রথম দিকে কুসুমের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। কিছুদিন হলো তিনি একজনের কাছ থেকে কুসুমের ব্যাপারে জানতে পেরেছেন। সেই থেকে শুরু। সবুর উল্লাহ ভালো করেই কুসুমের পিছনে লেগেছেন। কুসুম খাওয়ার দিতে এলে তিনি অযথাই কুসুমের সাথে কথা বলতে শুরু করেন। কুসুম চলে যেতে চাইলে, নানা রকম টাল বাহনা দিয়ে তিনি কুসুমকে বসিয়ে রাখেন। তার সাথে তিনি কুরআন হাদিসের গল্প করেন। কুসুমের স্বামী মারা যাওয়ার ব্যাপারটা যে সম্পূর্ণই আল্লাহতাআলার ইচ্ছা এই ব্যাপারে হাজার রকমের যুক্তি আর সান্ত্বনার বাণী তাকে শোনান সবুর। সবুর উল্লাহর হঠাৎ করেই তার ব্যাপারে এতো অতি আগ্রহী হয়ে উঠার ব্যাপারটা কুসুম কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। তার খালি একটাই চিন্তা---যে লোকটাকে প্রথম দিকে একটা বোবার মতো মনে হতো, সেই লোকটাই হঠাৎ করে তার সাথে কেন এতো যেচে যেচে কথা বলতে আরম্ভ করেছে।

অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষ চলছে এখন। গত কয়েক রাতের মতো আজ রাতেও সবুর উল্লাহ এশার নামাজ শেষ করে প্রবল ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে কিছুক্ষণ আগে ঘরে ফিরেছেন। কুসুম তার জন্য খাওয়া নিয়ে এসেছে। সবুর বসে আছেন তার বিছানার উপর, কুসুম ঘরের দরজা ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

কুসুম সবুরের দিকে না তাকিয়ে বললো, "ইমাম সাব, তাড়াতাড়ি খাইয়া লন, বাটিগুলান তাড়াতাড়ি আজাইর কইরা দেন, শরীরটা বেশী একটা ভালা না আইজ, ঘরে যামু গা।"

সবুর বললো, "ভালা না তো এইখানেই বিশ্রাম করো, ভালা লাগলে যাইও গা, আমিও আরাম কইরা খাইয়া লই, খাওয়া দাওয়ায় তাড়াহুড়া করতে নাই, আল্লাহপাকের নিষেধ আছে।"

কুসুম আগের মতোই মাথা নিচু করে বললো, "ছি:, এইডা আফনে কি কন? এইখানে খামাকা বইয়া থাকলে লোকজন কি কইবো? আফনেরও তো মান ইজ্জত আছে, আফনে জলদি করেন, আমি যামুগা।"

সবুর মুখে আলতো একটা হাসি দিয়ে বললো, "কুসুম, তুমি থাকলে ভালো লাগে। মনটায় কেমন ফূর্তি লাগে। তুমি যাইও না,বইসা থাকো।তোমার লগে কিছু কথাও আছে।"

কুসুম কিছুটা রেগে গিয়ে বললো, "আফনে এইগুলান কি কন? এই সব কথা ভালা না, আফনে কি কইবেন তাড়াতাড়ি কন।"

সবুর বললো, "শুনো কুসুম, আমি ঠিক করছি আমি তোমারে বিবাহ করবো,তোমারে আমার খুব মনে ধরছে, তোমার তো কোন অমত থাকার কথা না, তোমার স্বামীও নাই, এই সময় আমার মতো কারো ঘর করা তোমার লেইগা পোয়াবারোই কওন যায়, তুমি কি কও?"

সবুরের কথা শুনে চমকে উঠলো কুসুম, সে ভীত গলায় বললো, "আফনে এই গ্রামের এতো সম্মানিত একজন লোক হইয়া আমারে যে এই কথা গুলান কইতেছেন, আফনের কি একটু মুখেও বাঁধে না, আমি আফনারে বিয়া করতে যামু কোন দুঃখে, আমার সোয়ামী মইরা গেলে কি হইবো, হে এহনো আমার সোয়ামীই আছে, আমি এহনো তারে আমার সোয়ামী ভাবি। অন্য কোন বেটা মানুষের ঘর আমি করুম না, আফনের কথা শেষ হইলে আমার বাটিগুলান দিয়া দেন, আমি যাই গা।"

সবুর বললো, 'কিন্তু আমি তো তোমারে বিয়া করমু ঠিক কইরা ফালাইছি, এহন কি করা, তুমি আর অমত কইরো না, রাজি হইয়া যাও।"

কুসুম বলো, "মইরা গেলেও এইডা হইবো না, আফনে আমারে জোর কইরেন না।"

কুসুমের কথা শুনে ক্ষেপে গেলো সবুর, রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে সে বললো, "মেয়ে মানুষের আবার ইচ্ছা অনিচ্ছা কি? তোমারে বিয়া করমু এইডা হইলো গিয়া ফয়সালা, ফয়সালা মতোই কাম হইবো।"

কুসুম গলার স্বর উঁচু করে বললো, "আল্লাহর দোহাই লাগে, আফনে আমারে জোর কইরেন না, আমি কিন্তু আপনার এই কুকীর্তি সবাইরে জানাইয়া দিমু।"

সবুর বললো, "তুই আমারে ভয় দেখাস? তোর কথা এই গ্রামের কেউ বিশ্বাস করবো না, তুই ভালোয় ভালোয় আমার কথায় রাজি হইয়া যা, নয়তো তোর কপালে শনি আছে।"

কুসুম বললো, "ছি:, আফনে যে এতো বড় হারামি তা যদি কেউ জানতো!ও খোদা! আফনের যা ইচ্ছা তাই করেন, আমি কাইলই সবাইরে এই কথা জানায়া দিমু।"

এই কথা শোনার পর বিছানা থেকে হঠাৎ করেই উঠে এসে কুসুমের গালে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিলেন সবুর। ঘটনার আকস্মিকতায় যার পর নাই বিস্মিত কুসুম চিৎকার দিয়ে বললো, "আমি কাইলকাই সবাইরে জানামু, কাইলকাই আপফনের বিছার হইবো সবার সামনে"--কথাটা বলেই ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো কুসুম। বাঁধা দিলো সবুর। সে কুসুমের চুলের মুঠি ধরে টান দিয়ে ধরে কুসুমের কানের কাছে নিজের মুখ নিয়ে এসে দাঁত কটমট করে বললো, "হারামজাদি আমার লগে টক্কর দিস না, ফল ভালো হইবো না।".... কথাটা বলে কুসুমের চুলের মুঠিটা ছেড়ে দিলো সবুর। কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো কুসুম। কুসুম চলে যাওয়ার পর সবুর ভাবতে আরম্ভ করলেন, কালকে যদি কুসুম পুরো ঘটনাটা সবাইকে বলে দেয় তাহলে তো কেলেঙ্কারী কান্ড হয়ে যাবে, সেই ক্ষেত্রে এই ঘটনা কীভাবে ধামা চাপা দেয়া যায় তা নিয়ে আজকে রাতেই তাকে কিছু একটা ভেবে রাখতে হবে।

এখন বাজে সকাল সাড়ে এগারোটা। মলাইপুর গ্রামের মাতাব্বর ছগির উদ্দিনের বাড়ির উঠোনে সবাই গোল হয়ে বসে আছে। ইমাম সবুর উল্লাহ তাদের মাঝে বসে আছেন। কুসুম আজ সকালেই সবাইকে গতরাতের কথা জানিয়ে দিয়েছে। ঘটনা অতিব গুরুত্বপূর্ন হওয়ায় ছগিরউদ্দিন সকালেই সালিশ ডেকেছেন।

ছগির উদ্দিন সবুরকে বললেন, "ইমাম সাব, আফনের নামে যা শুনলাম তা কি সত্যি?"

সবুর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, তারপর ধীরে বলতে আরম্ভ করলেন, "জনাব, আপনেদের এখানে আসার পর থেকে আমি কোন খারাপ কাজ করি নাই, কোন অন্যায় করি নাই, কারো মনে কোন ব্যথা দেই নাই, সেই জায়গায় আজকে আমারে এতগুলান লোকের মাঝে বইসা একটা বিপথগ্রস্থ মেয়ে মানুষের কারণে বিছারে বসতে হবে তা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করি নাই, যাই হোক সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা, উনি ঠিক করছেন আমারে বেইজ্জতী করবেন, তাই আমারে এইখানে পাঠাইয়া দিছেন, আমার এইখানে বলার কিছু নাই, তয় আফনে যদি অনুমতি দেন আমি সব খুইলা বলতে রাজি আছি।"

ছগির উদ্দিন বললো, "বলেন।"

সবুর বলতে শুরু করলেন, "কুসুম যেই দিন আমারে খাওয়া দেয়া শুরু করলো, সেই দিন থেকেই আমি তারে ভালো কইরা লক্ষ করতেছি, তার মধ্যে কিছু অপ্রকৃতস্থ ব্যাপার আছে, প্রথম দিকে আমি কিছু বলি নাই তারে। গত পরশু রাতে আমি নামাজ পড়াইয়া ঘরে ফিরতাছি, সুপারি বাগানের কাছে আইসা আমার মাথা ঘুরাইতে আরম্ভ করলো, এতো দিন যেই ঘটনা সবার মুখে শুনছি সেই ঘটনা আমার চোখের সামনে। আমি দেখলাম সাদা শাড়ি পইরা একটা মহিলা বাগানে ঘুইরা বেড়াইতেছে আর তার চোখ দিয়া রক্ত পড়তাছে, মহিলাটার দিকে ভালো কইরা তাকাইয়া দেখি সে দেখতে অবিকল কুসুমের মতো, এই দৃশ্য দেখার পর আমি আর সহ্য করতে পারি নাই, দৌড়াইয়া বাসায় চইলা আসি। বাসায় আসার পর আমি জিন ছালা দেই,এই জিন আমি অনেকদিন ধরেই পালি। জিন আমারে জানায়-- কুসুমের চেহারায় আমি যে মহিলাটারে দেখছি, আসলে সেইটা একটা খারাপ জিন, এ বহুকাল ধইরা এই গ্রামে আছে। অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষে জিনটা বিভিন্ন মেয়েছেলের উপর আইসা ভর করে, আর তখন যার উপর ভর করে সে রাইতের বেলা সুপারী বাগানে অমন কইরা ঘুইরা বেড়ায়, জিনটা আমারে আরো জানায়-ঐ জিনটা এই কৃষ্ণপক্ষে কুসুমের উপর আইসা ভর করছে। শুইনা আমার মাথা খারাপ হইয়া যায়। শেষে গতকাল রাইতে যখন কুসুম আমার ঘরে খাওয়া নিয়া আসলো, আমি তারে ভালো কইরা দেখলাম, আমার আর কোন সন্দেহই রইলো না যে আমি পরশু রাতে তার চেহারার কাউরেই বাগানে ঘুরতে দেখছি। আমি দোয়া কলমা পইড়া কুসুমের গায়ে ফু দিলাম, দেয়ার লগে লগেই কুসুম চিৎকার দিয়া উঠলো, সে আমার লগে দস্তাদস্তি শুরু করলো, আমি বুঝতে পারলাম সমস্ত ঘটনা সেই খারাপ জিনটার কাজ। কিন্তু আমার লগে আল্লাহর কালাম থাকায় জিনটা আমার কিছু করতে পারে নাই। কিন্তু আজকে সকালে আইসা আফনে গো কাছে আমার নামে কুসুম হইয়া উল্টাপাল্টা কথা রটাইছে যাতে আমারে আফনারা এই গ্রাম থেইকা বাইর কইরা দেন।"

সমস্ত লোকজন বাক্-রুদ্ধ হয়ে সবুরের কথা শুনে গেলো। কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারলো না ইমাম সবুর উল্লাহ এই মজলিসে কতো বড় মিথ্যার আশ্রয় নিলেন এবং কতো নির্দ্বিধায় একটা সত্য ঘটনাকে মিথ্যার চাদরে অবলীলায় ঢেকে দিলেন। চারিদিকের পিনপতন নীরবতা ভেঙ্গে অবশেষে মাতাব্বর ছগির উদ্দিন বলতে শুরু করলেন, ইমামা সাহেব, আমরা মূর্খ্য মানুষ, না বুইজা আফনের লগে বিরাট বেয়াদবী করছি, আমাগো আফনে নিজ গুণে ক্ষমা দেন আর এখন বলেন এই জিনটারে তাড়ানের লেইগা আমরা কি করতে পারি?আফনে আমাগোরে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।"

সবুর কি যেন চিন্তা করলেন, তারপর মাথা নাড়িয়ে বলতে আরম্ভ করলেন, "উপায় একটা আছে, কুসুমরে এই অমাবশ্যার কৃষ্ণপক্ষে ধইরা আইনা তার চোখ দুইটা উপড়াইয়া নিয়া তারে যদি এই সুপারি বাগানটায় পুড়াইয়া মারা যায়, তাইলে সেই জিনটা চিরতরে এই গ্রাম থেকে বিদায় নিয়া যাবে।"

মাতাব্বর বললেন, তাইলে তো আমাগো কুসুম মইরা যাইবো গা, এইডা কি কইলেন ইমাম সাব। মাইয়াটা তো কোন দোষ করে নাই।"

সবুর বললেন, "আমি জানি, কুসুমের কোন দোষ নাই, কিন্তু এই বজ্জাত জিনটারে তাড়ানোর এই একটা উপায়ই আছে, নাইলে আইজ নয় কাইল সে আফনার মেয়ের উপরও আইসা ভর করতে পারে, তখন তো আফনের মেয়েরও একই পরিণতি হইবো, ভাইবা দেখেন।"

পুরো মজলিসে গুনগুন আওয়াজ শুরু হয়ে গিয়েছে। মাতাব্বর ছগির উদ্দিন কয়েকজন মুরুব্বির সাথে আলাপ করলেন কিছুক্ষণ। শেষে গলার স্বর উঁচু করে জানালেন, "আইজ রাইতেই কুসুমের চোখ উপড়াইয়া নিয়া তারে সুপারি বাগানে পুড়াইয়া ফেলা হবে।"

....................................................................(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28831033 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28831033 2008-08-15 01:46:07
জিজ্ঞাসা সম্পর্কের অবোধগম্য মায়াজাল,
সময়ের ছুরিকাঘাতে ঝরে যাওয়া জীবনাংশের পিছুটান,
কালের নৌকায় ভেসে আসা মহামানবের জীবন-দর্শন কিংবা
মহামানবের রূপে শত ভন্ডের আস্ফোলন,
ঠুনকো আয়নায় সৃষ্টির প্রতিবিম্ব,
মাটির খাঁচায় অস্পর্শী আত্মার অব্যক্ত প্রতিধ্বনি,
কিংবা একই আত্মার শতরূপী প্রতিচ্ছবি,
স্বার্থ, লোভের অতলস্পর্শী সাগরে ক্রমাগত ডুবতে থাকা
নিরূপায় বিবেকের অবিনাশী হাহাকার,
সময়ের কাল-স্রোতে ভেসে আসা ছোট-বড় উপহার, কিংবা
সময়ের বাঁকে বাঁকে অপেক্ষমান
ছোট-বড় বিস্ময়ের অনির্ধারিত উপস্থিতি,
মাঝখানে প্রেম নামক তরল,ঈষৎ-বিতর্কিত অথচ
অবধারিত, সৃষ্টির সমবয়সী এক চেতনার দ্বিমুখী যাত্রা,
সেই যাত্রাকে কেন্দ্র করে
উৎ-কাল্পনিক মহাকাব্যের গোড়াপত্তন, অথবা ঘৃণার সমাধি রচনা,
রাষ্ট্র, পৃথিবী, ইতিহাস, রাজনীতি--এসবের নামান্তরে কেবল--
পাওয়া, না পাওয়া, সুখ আর বিষাদের-- সীমানা, উপসীমানা নির্ধারণ,
একই নীলের নীচে দাঁড়িয়ে কেবল সুখ আর বিষাদের মাত্রা গণণা,
অন্ধ বাঁদুড়ের মতো আলো-রূপ সুখের পিছনে ছুটতে ছুটতে
কোন এক অচিন বসতিতে পদার্পণ, কিংবা
নব্য মাটির দলায় চিন্তা-ঊর্ধ্ব কোন প্রক্রিয়ায়--
পুরানো, নিস্তেজ প্রাণের অবধারিত সফল প্রতিস্থাপন--

কেবল এসবই কি
সেই অদৃশ্য বিধাতার জগৎ-সৃষ্টির নীল নকশার উৎস-মূল,
নাকি জগৎ-মঞ্চের কালো পর্দার আড়ালে অলক্ষ্যেই বহমান রয়েছে-- রহস্যের কোন আরেক বিশাল সমুদ্রের অথৈ নীল জলরাশি?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28830225 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28830225 2008-08-12 21:16:08
এই মন নাহি রয়। একটু দাঁড়াও, আমারেও নিয়া চলো তোমারই সাথে,
আর ভালো লাগে না এই হাসি, জল, মায়া,
দূষিত আলো , ইট পাথরের ছায়া,
আর ভালো লাগে না এই উৎব্যস্ত প্রান্তর,
আহত প্রাণের বেদনার আওয়াজ যেখানে বাজে নিরন্তর,
যেখানে প্রতিনিয়তই শোনা যায় সত্যের মুখোশধারী
মিথ্যার পায়তারা,
বড় সহজেই আড়াল হয়ে যায় যেখানে
জীবনের জয়ধারা,
আমার মিনতি তাই, আমারেও তুমি নিয়া চল এইখান হতে,
চলো মোরা চলে যাই সে পথ ধরে,
যে পথ রাজকীয় পিচঢালা নয়,যে পথ শিশির মোড়ানো,
খালি পায়ে চলে যাওয়া যায় যে পথে--
আমারেও নিয়া চলো তুমি সে পথ ধরে,
হায়, কতকাল হেঁটে যাওয়া হয়নি শিশিরে ধুয়ে ধুয়ে যাওয়া
এমন ভেজা ভেজা পথ ধরে।

হে পথিক , আমারে তুমি নিয়া চলো সেই প্রান্তরে,
যেখানে দোল খেয়ে খেলা করে স্নিগ্ধ সবুজ ঘাস,
যেখানে পায়ের তলায় থাকে কেবলই মাটি আর মাথার উপরে আকাশ,
যেখানে শত ঘাটে থেমে থেমে ক্লান্ত অবিশুদ্ধ হয়ে যায়না মুক্ত বাতাস,
প্রতি প্রভাতেই সূর্যের আলো হাসে যেখানে সত্যের আভাসে,
আমারেও তুমি নিয়া চলো সেই প্রান্তরে,
হায়, মোর মন নাহি রয় আর এই প্রাণহীন প্রাণ্তরে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28829495 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28829495 2008-08-10 22:29:08
ঘুণে ধরা অনুভূতি। মনে হ্য় মরচে ধরা এই জগৎ সংসার,
আসলে আমার অনুভূতিটাই আজ ঘুণে ধরা,
একাকিত্ত্বের ঘুণ, কেউ কাছে নেই,
কারও সময় হয়না আমার দু' একটা কথা শোনার,
আমার অনেক অভিমান হয়, কান্না আসে,
সেই কান্নার সুর বড় ভারী হয়ে কেবল
আমার পরিমন্ডলেই বাজে, আমার চোখের জল
গড়িয়ে যায়, সেই জলে ভিজে
নোনা হয়ে যায় আমার স্বপ্নগুলো, পিছলে পড়ে যায়,
তবুও কেউ আসেনা, আমার বড় অভিমান হয়,
অভিমান হয় ঈশ্বরের উপরও, কত নির্বাক তিনি,
নিশ্চুপে দেখে যান আমার লড়াই, আমার অনুভূতির সাথে,
একা আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই, আবার উঠি,
আবার পড়ে যাই, কেউ এসে ধরে না আমার হাতখানি,
মাথার উপর বিশাল আকাশটাকে মনে হয়
একটা বিশাল কালো থাবা, ওঁৎ পেতে আছে আমাকে
ছিড়ে খাওয়ার জন্য, আশে পাশের মানুষগুলোকে মনে হয়
যেন ছোট খাটো এক একটা দানব, কিংবা হয়তো
পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে আমার অনুভূতিখানিই,
সবই মনে হয় আষাঢ়ে গল্প;
বিশ্বাস, ভালোবাসা, মায়া; সবই লাগে মিথ্যা,
কেবল জন্ম সত্য, মৃত্যু সত্য আর সত্য ছায়া।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28828838 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28828838 2008-08-08 22:16:35
ফিরে এসেছি আমি আবার। আবার ফিরে এসেছি আমি কবিতার জনপদে,
কিছুকাল তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলাম আমি নিরাবেগ চেতনায়,
কিছুকাল মাতাল মাদকাসক্তের মতো
প্রেমাসক্ত হয়ে পড়েছিলাম আমি প্রিয়তমার আঙিনায়,
কিছুকাল অস্পৃশ্য লোভের সুরায় ভাসিয়েছি দুকুল,ভিজিয়েছি গলা,
কিছুকাল কুৎসিত, জাগতিক মনোষ্কামনায়
হন্যে হয়ে ঘুরে ফিরেছি আমি কেবলই সারাবেলা,
কিছুকাল অন্ধ বাঁদুড়ের মতো বৃথাই খুঁজে ফিরেছি আলোর মিছিল,
আপনার অজান্তে অহেতুক আস্ফোলনে কিছুকাল
অরণ্যে কেঁদে ফিরেছি কেবলই শ্বাপদের সামিল
কিছুকাল আমার কবিতার শব্দ, পংক্তিগুলোকে আমি অগ্রাহ্য,
অবহেলা করেছি প্রতারক প্রেমিকের মতো,
প্রিয়তমার বাহু-ডোরে মুখ বুঁজে থেকে উন্মাতাল যৌনতার
তল থেকে অতলান্তে তলিয়ে গিয়েছি আমি,
বিশাল জলারশির মাঝে ক্রমাগতই তলিয়ে যেতে থাকা
অস্তিস্ত্বহীন খড়কুটোর মতো;

তবু অধঃচেতনে বেলা অবলোয় শুনেছি আমি দূর হতে ভেসে আসা
নুপুর-নিক্কনের আওয়াজ, জোরালো হর্ষধ্বনি তোমাদের,
বুঝেছি উঠেছে মাতম কবিতার ছন্দ-বীণায় ,
বুঝেছি তোমাদের পদচারণায় মুখরিত আসর,
কবিতার প্রমোদতালে নেচে নেচে উঠে কবিতার জলসা-ঘর,
তাই আমিও ফিরে এসেছি আবার কবিতার জনপদে,
ক্ষমতাধর সাপুড়ের পাগুলে বীণার সুরে
মাতাল নাগিনের মতো, আমিও ফিরে এসেছি আবার
কবিতার নিবিড় প্রান্তরে, শব্দরাজির অসীম মায়াছায়ায়,
যদিও আমার অস্থির গোড়ায় গোড়ায়, অস্থির মন-প্রান্তরে
এখনও বাণিজ্যকতার আঁষটে গন্ধ আপন খেয়ালে লেপটে আছে,
যদিও আমার সমস্ত শরীর জুড়ে স্পষ্ট অস্পষ্ট প্রিয়তমার প্রেমাচড় সব
তার অভিমানী দৃষ্টির ধ্বংসাবশেষের রূপে
এখনও আমায় ক্রমাগত চোখ রাঙিয়ে চলে,
যদিও এখনো দূর হতে ভেসে আসা সেই বৃদ্ধ, ধূর্ত শিয়ালের ভীতিজাগানিয়া হাঁকডাকে নিরালায় কান পেতে শুনি আমি--
কতো কবি,মহাকবির আপাত ব্যর্থ জীবনাচরণের ভুলে যাওয়া ইতিকথা,
তবুও ফিরে এসেছি আমি আবার তোমাদের জনপদে,
আবার ফিরে এসেছি আমি কবিতার জনপদে,
প্রিয়তমার বাহুডোরে নয়,
কবিতার বাহুডোরেই তবে আমৃত্যু এঁকে চলি আমি জীবনের জল-ছবি,
জাগতিক কোন প্রান্তরে নয়,
কবিতার সুজলা সুফলা প্রান্তরেই তবে মিশে মিশে যাক
এই ছোট্ট শব্দচাষীর অন্তিম নিঃশাসখানি।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28828531 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28828531 2008-08-07 23:26:53
জল-ছায়া......(শেষ অংশ).....(ছোটগল্প)
এখন বাজে সকাল পৌনে নয়টা। চৈতী বসে আছে ডিবি অফিসে--অফিসার কামরুল আহসানের সামনে। গতরাতে নিজের সাথে চূড়ান্ত বোঝাপোড়া শেষ করে সে পুলিশের কাছে ধরা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অফিসার চৈতীর জবানবন্দী নিচ্ছেন। অন্যদিকে গত রাতে ফাহমিমকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পরও পুলিশ তার কাছ থেকে তেমন কোন তথ্যই পায়নি, পাওয়ার কথাও নয়, যেহেতু ফাহমিম এই ব্যাপারে কিছুই জানে না। তাই ফাহমিমকে ছেড়ে দেওয়া হবে কিনা, তা নিয়ে যখন অফিসারার দোটানার মধ্যে ছিলেন, তখনই এসে হাজির হয় চৈতী। চৈতীর মুখে সব শুনে অবশেষে ফাহমিমকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

চৈতীর জবানবন্দী নেয়া শেষ। একটু পরেই তাকে থানায় পাঠিয়ে দেয়া হবে, সেখান থেকে চালান করে দেয়া হবে কোর্টে। তার আগে চৈতী অফিসারদের কাছে পাঁচ মিনিট সময় প্রার্থনা করেছে ফাহমিমের সাথে কিছু কথা বলার জন্য। প্রবল পুলিশি পাহারায় ফাহমিম আর চৈতী পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখন ডিবি অফিসের ছোট্ট একটা কক্ষে। দুজনের মাঝেই এখন অসহনীয় নীরবতা। শেষে কথা বলতে আরম্ভ করলো চৈতীই। ফাহমিমের দিকে না তাকিয়েই সে বললো, "আমি জানি, ইতিমধ্যেই তুমি আমাকে প্রবলভাবে ঘৃণা করতে শুরু করেছো, তা তুমি করতেই পারো, শুধু বিদায়বেলায় তোমায় একটা অনুরোধ করে যাই--তুমি পারলে কিছুদিনের জন্য ঢাকা থেকে সরে অন্য কোথাও গিয়ে থেকে আসো। আমার দলের সদস্যরা সব কিছু জানতে পারলে তোমার উপর হামলা করতে পারে। তাই তুমি যদি ১৫/২০ দিনের জন্য অন্য কোথাও চলে যাও, তোমার জন্য মনে হয় মঙ্গল হবে। তারপর নিজের হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখা কয়েক ভাঁজ করা একটা কাগজ ফাহমিমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চৈতী বললো,"এই চিঠিটা রাখো, এখানে আমি কিছু কথা লিখেছি, সময় করে পড়ে নিও পারলে ,আমার আর কিছু বলার নেই, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও, ভালো থেকো।"

কথাগুলো শোনার পর ফাহমিমের কোন ভাবান্তর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। সে কেবলই শুন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে চৈতীর দিকে। একসময় চৈতী ফাহমিমের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো। চৈতীকে নেয়ার জন্য পুলিশও চলে এসেছে। একসময় পুলিশের সাথে ডিবি অফিসের বাইরে রাখা প্রিজন ভ্যানের দিকে চলে যেতে শুরু করে চৈতী। ফাহমিমও বের হয়ে আসে ডিবি অফিসের বাইরে। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে চৈতীর দিকে। প্রিজন ভ্যানে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা চৈতীও শেষবারের জন্য দেখে নেয় ফাহমিমকে। হঠাৎই একটা পুলিশ এসে প্রিজন ভ্যানের দরজাটা বন্ধ করে দিলো। মুহুর্তের মধ্যেই যেন দুজন দুজনার পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলো ফাহমিম আর চৈতী।

এখন রাত প্রায় বারোটা। ট্রেনে চড়ে ফাহমিম ছুটে চলেছে সিলেটের উদ্দেশ্যে। চৈতীর কথামতো সে ঢাকা থেকে কিছুদিনের জন্য সরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফাহমিম যাচ্ছে সিলেটে তার এক বন্ধুর বাসায়। একসময় নিজের মানিব্যাগ থেকে ধীর লয়ে চৈতীর দেয়া চিঠিটা বের করে আনলো সে। সারাদিনে প্রবল ব্যস্ততা আর টেনশানের মাঝে চৈতীর চিঠিটা আর পড়া হয়ে উঠেনি। আস্তে আস্তে চিঠিটা খুলে নিজের চোখের সামনে ধরলো ফাহমিম। চৈতী লিখেছে--

আমি জানি, এই চিঠিটা যখন তুমি পড়ছো, তখন আমি তোমার কাছ হতে অনেক দূরে। আমাদের দুজনার মধ্যে এতোদিন আত্নাগত যে যোগাযোগটা ছিলো, তাও হয়তো ক্রমশই বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। আমার কাছে না হলেও তোমার কাছে হয়তো তাই। আমি জানি, ভালোবাসার যে পথটা তুমি আমার হৃদয় পর্যন্ত বিস্তৃত করে দিয়েছিলো একদিন, তার বাঁকে বাঁকে এখন শুধুই ঘৃণা। তোমার হৃদয়ের যেখনাটায় তুমি আমাকে দেবীর আসনে বসিয়েছিলে, সেখানা থেকেও আজ আমি খসে পড়ে গেছি হেলায়--জানি, এটাই আমার প্রাপ্য। কিন্তু আমার ভালোবাসা? আমার ভালোবাসা তো কোন দোষ করেনি, আমি না হয় তোমার সাথে অন্যায় করেছি, তোমাকে মিথ্যে বলেছি, কিন্তু আমার ভালোবাসা তো নয়। তোমায় পাগলের মতো ভালোবেসেছিলাম বলেই তো নিজের অক্ষমতাকে মিথ্যার আবরণ দিয়ে ঢাকতে চেয়েছিলাম।বিশ্বাস করো, সেই আবরণটার নিচেও ভালোবাসার চিরন্তন পবিত্রতা নিয়েই তোমার প্রতি আমার অন্ধ ভালোবাসাটা দিন রাত সদা জাগ্রত ছিলো। ফাহমিম তুমি বিশ্বাস করো, ভালোবাসার রূপে চৈতীর যে অবয়বটাকে তুমি তোমার হৃদয়ে স্থান দিয়েছিলে, তাতে কোন পাপ নেই, কোন মিথ্যে নেই, কোন ছলনা নেই। তুমি আমাকে ঘৃণা করো, কিন্তু আমার ভালোবাসাকে নয়, তুমি আমাকে তোমার হৃদয় থেকে ছুড়ে ফেলে দাও, কিন্তু আমার ভালোবাসাকে নয়।আমি জানি, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আমার ১২/১৩ বছরের জেল হয়ে যাবে। ততদিনে তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করবে। তোমার ঘর আলো করে কয়েকটা নতুন প্রাণ পৃথিবীর আলোয় হেসে উঠবে অবলীলায়। অথচ আমি? পার্থিব আলোর মুখ দেখা তো দূরে থাক্, নিজের ভালবাসার মুখ, আমার ফাহমিমের মুখটাই হয়তো আর কোন দিন দেখা হয়ে উঠবে না আমার। নিয়তির কি খেলা দেখো! ভেবেছিলাম সব ঝামেলা শেষ হয়ে গেলে তোমার সাথে প্রাণ ভরে দেখা করবো, তোমার কোলে মাথা রেখে নতুন আরেকটা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখবো।অথচ কিছুই করা হলো না। তোমার হাতটাও আর কোন দিন ছুঁয়ে দেখা হবে না, তোমার কাঁধে মাথা রেখে জগতের সকল চিন্তা-ভাবনা, উদ্বেগকে বিদায় জানাতে পারবো না, তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে বুক ভরে কোনদিন ডুকরে কেঁদে উঠাও হবে না। কোনদিন আমার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে তুমি আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিবে না, আমার চোখে চোখ রেখে ভালোবাসার মধুর প্রেমময় কোন কথাও তুমি আমায় শোনাবে না। হয়তো এতো সুখ আমার কপালেই ছিলো না।হয়তো তোমার মতো এতো বিশাল মনের একজন মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতাই আমার হয়নি। তাই সকল অপরাধ মাথায় নিয়ে আমায় চলে যেতে হলো। বিদায়বেলায় তাই তোমায় শুধু একটুকু অনুরোধ করি-- তোমার হৃদয়ের ছোট্ট একটা কোণায় আমার ভালোবাসাটাকে লুকিয়ে রেখো। যদি কোনদিন প্রবল বর্ষণে অথবা একাকী বিকেলে এই ভালোবাসাটা তোমায় খুব পোড়ায়, তোমায় খুব যন্ত্রণা দেয়--তবে আমার প্রতি তোমার ঘৃনার অবয়টাকে ভুলে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও তুমি সেই ভালোবাসাটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিও তোমার ভালোবাসার আলতো স্পর্শে। এই জীবনে আমার তো কিছু পাওয়া হলো না--তোমার হৃদয়ের কোথাও আমার ভালোবসাটা স্থান পেয়েছে--সেটা ভেবেই না হয় আমার চিরদুখী আত্মাটা একটুকু শান্তির পরশ লাভ করে যাক আজীবন। বলো, আমার এই ছোট্ট অনুরোধটা তুমি রাখবে না? নিজের প্রতি যত্ন নিও, ভালো থেকো। ইতি, তোমার চৈতী।

চিঠিটা পড়া শেষ করে আগের মতোই ভাঁজ করে মানিব্যাগে রেখে দিলো ফাহমিম। দ্রুত গতিতে ট্রেন ছুটে চলেছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে হু হু করে ঢোকা বাতাস বারে বারেই এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে ফাহমিমের চুলগুলো। ফাহমিম ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। চারিদিকে গুটগুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকারটাই ক্রমশ অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াটে লাগতে শুরু করেছে ফাহমিমের। কারণ তার চোখ বেয়ে বড় নীরবেই গড়িয়ে যাচ্ছে কান্নার অনিঃশেষ সব স্রোত। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28827761 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28827761 2008-08-05 22:20:02
জল-ছায়া...............(অংশ--৩)......(ছোটগল্প)
"গতরাতে আমি আপনাকে অনেক বিরক্ত করেছি, জ্বালিয়েছি; তাই আর বিরক্ত করতে চাইনি দেখে আপনাকে না বলেই আমি চলে গেলাম, আমাকে দয়া করে ভুল বুঝবেন না, আপনি আমার যত বড় উপকার গতরাতে করেছেন তার প্রতিদান আমি দিয়ে যেতে পারলাম না, তবে যদি কোন দিন সুযোগ আসে এর প্রতিদান আমি অবশ্যই দিবো। চিরকৃতজ্ঞ হয়ে আজ বিদায় নিলাম আপনার কাছ থেকে। ভালো থাকবেন।"
---চৈতী।

এতক্ষণ চৈতীর প্রতি মনে যে ক্ষোভ জমেছিলো ফাহমিমের, তার সবটাই এক নিমিষে নাই হয়ে গেলো। উল্টো মেয়েটার জন্য কেমন যেন মায়া লাগতে শুরু করলো তার। আহারে বেচারী! কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে কে জানে!--ভাবতে ভাবতেই মনটা কেমন যেনো খারাপও হয়ে গেলো ফাহমিমের।

ফাহমিম চৈতীর ব্যাপারটা প্রায় ভুলতেই বসেছিলো। চৈতী চলে যাওয়ার প্রায় দিন বিশেক পরের ঘটনা। ফাহমিম অফিসে কাজ করছে। এমন সময় তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। নাম্বারটা চিনতে পারলো না ফাহমিম। অচেনা নাম্বার। সে ফোনটা রিসিভ করলো। ওদিক থেকে একটা মেয়ে কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে আসলো। আওয়াজটাকে কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছিলো ফাহমিমের, কিন্তু ঠিক মতো নিশ্চিত হতে পারছিলো সে ওপাড়ের মেয়েটির ব্যাপারে।

মেয়েটা বললো, "আমাকে চিনতে পারছেন?"
ফাহমিম বললো, "জ্বি, একটু চেনা চেনা তো লাগছেই, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না, কে বলুন তো আপনি?"
মেয়েটা ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বললো, "আহা এতো উতলা হচ্ছেন কেন? ভেবেই দেখুন না, আপনার পুরানো কোন বান্ধবী হতে পারি।"
ফাহমিম বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো, "নারে ভাই, আমার কোন বান্ধবী কোন কালেই ছিলো না, সেই ভাবনা বাদ, আপনিই বলে ফেলুন না আপনি কে?"
মেয়েটা আগের মতোই একটা হাসি দিয়ে বললো, "আপনি তো দেখি ভারী ভুলো মনের মানুষ, কয়েকদিন আগেই তো দেখা হলো, এরই মাঝে ভুলে গেলেন?"আচ্ছা থাক্ আপনাকে আর ভাবতে হবে না; আমি চৈতী।"

আকাশ থেকে যেন পড়লো ফাহমিম, সে ধরেই নিয়ে নিয়েছিলো এই জীবনে আর চৈতীর সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ বা কথা বার্তা হবে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো ফাহমিম, ততক্ষণে ও প্রান্ত থেকে আবার চৈতী কথা বলতে শুরু করলো, "হ্যালো, আছেন আপনি? শুনুন সেদিন অস্থিরতার মাঝে তো আর আপনার নামটাই জিজ্ঞেস করা হলো না, নামটা বলুন আপনার।"

এবার ফাহমিম বলতে শুরু করলো, "আচ্ছা মানুষ তো আপনি, কিছু না বলেই চলে গেলেন কেন সেদিন, আপনার উপর ভীষণ রাগ হচ্ছিলো, শেষ পর্যন্ত আপনার চিঠিটা পেয়ে রাগটা একটু কমেছে।"

ফাহমিমের কথা শুনে চৈতী অপরাধমাখা গলায় বললো, "আমি সত্যিই সে জন্য খুবই লজ্জিত, কিন্তু কি করবো বলুন, আমি ভেবেছিলাম আপনাকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না, আপনি ঘুমুচ্ছিলেন, তাই আর আপনাকে জাগাইনি, মাইন্ড করবেন না প্লিজ, আমার ভুল হয়ে গেছে , ক্ষমা করুন।"

ফাহমিম বললো, "না না, ঠিক আছে, ক্ষমা চাওয়া লাগবে না, আমি এমনিই একটু মজা করছিলাম। তো কি মনে করে হঠাৎ ফোন করলেন?"

চৈতী বললো, "ভাবলাম আপনার নাম্বারটা যেহেতু আমার কাছে আছেই, একটু খোঁজ-খবর নিয়ে দেখি, রাগ টাগ করলেন কিনা, তাছাড়া আমার এতো বড় একটা উপকার করলেন, আপনার প্রতি এতটুকু কৃতজ্ঞতাবোধ তো আমি দেখাতেই পারি, তাই না?"

ফাহমিম তৎক্ষণাৎ বললো, "হ্যাঁ হ্যাঁ, তা তো বটেই। তো আপনি এখন আছেন কোথায়?"

প্রশ্নটা শুনে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলো চৈতী, তারপর কেমন যেন অস্ত্বিতকর গলায় বললো, "আমি আসলে এখন আছি আমার এক বান্ধবীর বাসায়। ওর এখানে আরো কিছুদিন থাকবো। দেখি কি হয়, তত দিনে যদি বাবার সুবুদ্ধির উদয় হয়।"

ফাহমিম হাসতে হাসতে বললো, "হুম, বুঝতে পারছি, আপনি তাহলে এখনো ফেরারী।"

চৈতী ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, "তা বলতে পারেন। শুনুন আপনি কিন্তু আপনার নামটা এখনো বলেন নি।"

ফাহমিম তড়িঘড়ি করে বললো, "খুবই সরি, আমার নাম ফাহমিম।"

চৈতী বললো, "তো ঠিক আছ ফাহমিম ভাই, আজ তাহলে রাখছি, পরে না হয় কথা হবে, যে নাম্বারটা থেকে ফোন করেছি এটা আমার। সময় করে ফোন করলে খুশি হবো"

ফাহমিম বললো, "অবশ্যই, আমি ফোন করবো, ভালো থাকবেন আপনি, আর নতুন কোন খবর হলে জানাবেন কিন্তু।"

চৈতী বললো, "জ্বি আচ্ছা, ভালো থাকবেন ফাহমিম ভাই, রাখি তাহলে, bye।"

আপনিও ভালো থাকবেন বলে ফোনের লাইনটা কেটে দিলো ফাহমিম। নিজের মনে মনেই কিছুক্ষণ চৈতীকে নিয়ে ভাবলো সে। মেয়েটাকে তো ভালোই মনে হচ্ছে, বেশ মিশুক প্রকৃতির।ভাবতেই ভাবতেই নিজের কাজে আবার মনযোগ দিলো সে

এরপরে অনেক দিনই করি করি করেও চৈতীকে আর ফোন করা হয়ে উঠেনি ফাহমিমের। শেষে একদিন চৈতীই আবার ফোন দিলো, ফোন দেয়ার পর অবশ্য ফাহমিম কিছুটা অপরাধবোধে ভুগেছিলো চৈতীকে ফোন দেয় নি বলে। চৈতীকে সে তা তৎক্ষণাৎ বলেছেও। চৈতী হেসেই বলেছে, "দেননি তো কি হয়েছে? এবার থেকে দেবেন।"
এরপর থেকে মাঝে মধ্যেই ফাহমিম চৈতীকে ফোন দেয়া শুরু করলো। চৈতীও ফোন করে মাঝে মাঝে। দুই জনের সখ্যতাটা বেড়েই চলেছিলো বৈকি। নিয়ম রক্ষার সম্পর্কটা বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্কেও গড়িয়ে গেলো অল্প দিনের মধ্যে। দুই জন দুইজন সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে আরম্ভ করলো এবং সম্পর্কটা ধীরে ধীরে আরো গাঢ়ও হতে শুরু করলো। আগে যেখানে কিছুদিন পর পর কথা হতো আস্তে আস্তে সেটা প্রতিদিনের পর্যায়ে চলে আসলো। তারা একে অপরের প্রতি নিজেদের ভালো লাগার কথাও কম বেশী বলতে আরম্ভ করলো। ফলে প্রতীক্ষার ক্ষণগুলোও বাড়তে থাকলো আপন তালে। এক সময় প্রতিবেলাতেই কথা হওয়া শুরু হলো ওদের। দিনে যখন অফিসে থাকে ফাহমিম তখন অল্পক্ষণ কথা হলেও রাতভর আড্ডাটা ভালোই জমতে শুরু করে এক সময়। এক পর্যায়ে দুই জনই বুঝতে পারে তারা একে অপরের প্রতি দুর্বল হতে শুরু করে এবং এটা যে ভালোবাসারই নামান্তর তা বুঝতেই দুই জনের কারোরই তেমন একটা সমস্যা হলো না। ততোদিন শুধুই ফোনে কথা হতো ওদের, শেষে ফাহমিম যখন চৈতীর সাথে দেখা করার জন্য উতলা হয়ে উঠলো, চৈতী মন খারাপ করে বললো যে সে চট্রগ্রাম এক দুঃসম্পর্কের বোনের বাসায় আছে। তার বাবার মাথা থেকে বিয়ের ভুতটা নেমে না যাওয়া পর্যন্ত সে ঢাকায় আসতে পারবে না। কথাটা শুনে ফাহমিমের মনটা খারাপ হয়ে গেলেও প্রগাঢ় ভালোবাসার টানে সে আর চৈতীকে জোরাজুরি করতে পারেনি। অগত্যা দুরালাপনীর এই প্রান্ত হতে ওপ্রান্তে হাওয়ায় হাওয়ায়ই ভেসে বেড়াতে লাগলো ভালোবাসার অকূল সাগরে ভেসে যাওয়া ফাহমিম আর চৈতীর বাঁধভাঙ্গা প্রেমোচ্ছ্বাস।

এরই মধ্যে মাস তিনেক কেটে গেছে। চৈতী আর ফাহমিম এখন এক আত্মা। প্রেমময় দিনগুলোর সুবাধে ফাহমিমের রোজকার সংগ্রাম আর আগের মতো পীড়াদায়ক নয়।এখন সে বেশ ফুরফুরে মেজাজে অফিস করে এবং ফুরফুরে মেজাজে অফিস থেকে ফিরে আসে।প্রতিদিনকার মতো আজকেও খুব ফুরফুরে মেজাজ নিয়েই ফাহমিম বাসায় ফিরেছে। একটু পরেই চৈতিকে ফোন দিবে সে। তবে আজকে তার মেজাজ ভালো হওয়ার অন্য একটা কারণ আছে। বাড়ি থেকে মা ফোন করেছিলো আজ। মাকে চৈতীর কথা বলেছে সে। মা সব শুনে চৈতীকে দেখতে চেয়েছে, এই জন্যই ফাহমিমের মনটা আজ একটু বেশীই খুশি। সে বাসায় ফিরেই গোসল করেছে, নিজের হাতে চা বানিয়ে সে চা খেয়েছেও ব্যাপক আনন্দ নিয়ে। এখন বাজে রাত সোয়া আটটার মতো। আর পনেরো মিনিট পরেই তার চৈতিকে ফোন দেয়ার কথা। চৈতীর যেন কি একটা কাজ আছে, তাই সে ফাহমিম কে বলেছে সাড়ে আটটার দিকে ফোন দিতে। ফাহমিম তাই বার বারই প্রবল অস্থিরতা নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে সাড়ে আটটা বাজার অপেক্ষায়।এমন সময় তার দরজায় কে যেন কড়া নাড়লো। খুব আরাম করে শুয়ে ছিলো ফাহমিম, তাই যথেষ্ঠ বিরক্তি নিয়েই সে দরজাটা খুললো। দরজাটা খুলেই একটু হতচকিয়ে গেলো ফাহমিম। চারজন লোক দাঁড়িয়ে আছে বেশ গম্ভীর মেজাজে।

ফাহমিম ভুরু কুঁচকে বললো, "কে আপনারা? কি চাই?"

লোকগুলোর একজন বললো, "আপনি কি ফাহমিম?"

ফাহমিম মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, "হ্যাঁ, আমিই ফাহমিম। কেন বলুন তো?"

অপর একজন লোক তার শার্টের উপর ঝোলানো ব্যাজটা দেখিয়ে বললো,
"আমরা ডিবি অফিসার, আপনার বিরুদ্ধ ওয়ারেন্ট আছে, আপনি মাস তিনেক আগে এক রাতে চৈতী নামে কাউকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এখানে?"

হতবম্ব ফাহমিম কিছুক্ষণ শূন্য চোখে তাকিয়ে থেকে ক্ষীণ গলায় বললো," জ্বি দিয়েছি, মেয়েটা একটা বিপদে পড়েছিলো, তাই আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি।"

অফিসার বললো," কি ধরনের বিপদ ছিলো?"

ফাহমিম চৈতীর পুরো ঘটনাটা খুলে বললো।

পুরো ঘটনাটা শুনে অফিসার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো, "দেখুন ফাহমিম সাহেব, হয় আপনি মিথ্যে বলছেন, নয়তো চৈতী আপনাকে মিথ্যে বলেছে।"

ফাহমিম বললো, "কি বলছেন এই সব, আমি কেন মিথ্যা বলতে যাব, তাছাড়া চৈতিই বা মিথ্যে কেন বলবে?"

অফিসার কিছু না বলে ওয়ারেন্ট ওর্ডারের কাগজটা দিলো ফাহমিমকে, কাগজটাতে চোখ বুলিয়ে ফাহমিম কণ্ঠস্বর উঁচিয়ে বললো, "এটা হতেই পারে না।"

অফিসার আগের মতোই হেসে বললো, "এটাই সত্য, চৈতী নামে আপনি যাকে আশ্রয় দিয়েছেন সে একটা বিরাট স্মাগলিং গ্রুপের সদস্য, আমরা গত ছয় মাস ধরে তাকে হন্য হয়ে খুঁজছি, তার কাছে গ্রুপটার অনেক তথ্য আছে।মাস তিনেক আগে আমরা প্রায় তাকে ধরেই ফেলেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ধরতে পারিনি, সে এদিকে কোথাও এসে লুকিয়ে পড়ে, এতোদিন অনেক চেষ্টা তদবিরের পর আমরা সন্তোষজনক পরিমাণ তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হতে পারি যে সেদিন আপনিই তাকে আপনার বাসায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। আমরা আপনার ব্যাপারেও তলিয়ে দেখবো। আমরা সন্দেহ করছি আপনিও সেই স্মাগলিং গ্রপটার সাথে জড়িত। কাজেই আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং সে জন্য আপনাকে এখন আমাদের সাথে ডিবি অফিসে যেতে হবে।"

একটানে কথাগুলো বলে থামলো অফিসার। ফাহমিম প্রচন্ড ঘামতে শুরু করেছে। ফাহমিমের মনে হচ্ছে সে কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে। দুঃস্বপ্নও এতো অপ্রত্যাশিত হয় কিনা সেটা নিয়েই সন্দেহ হতে শুরু হলো তার। কথাগুলোর শোনার মুহুর্তের মধ্যেই যেন প্রবল কম্পনে দুলতে আরম্ভ করলো ফাহমিমের সমস্ত পৃথিবী
...............................................................................(চলবে) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28826742 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28826742 2008-08-03 01:09:19
জল-ছায়া...........(অংশ--২)...........(ছোটগল্প)
ফাহমিম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, তাকে বলতে না দিয়েই মেয়েটা হড়বড় করে বলতে আরম্ভ করলো, " দেখুন, আমি বিরাট বিপদে পড়ে এই জায়গায় এসেছি। আমাকে একটু আশ্রয় দিন, কয়েকজন লোক আমার পিছু নিয়েছে, আমি দৌড়াতে দৌড়াতে আপনাদের এই গলিটার মধ্য ঢুকে পড়েছি, অন্য কোন উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত আপনাদের এই বাড়িটায় প্রবেশ করতে বাধ্য হলাম, আপনি প্লিজ আমাকে রক্ষা করুন।"

ফাহমিম কপালে চিন্তার বলিরেখা ফুটিয়ে বললো, "কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনি না, তাছাড়া হুট করে আপনার কথা বিশ্বাসই বা করি কীভাবে। এই শহরে কতো রকমের ভাওতাবাজিই তো হয়, আপনি যে সেরকম কিছু করছেন না, তারই বা কি প্রমাণ আছে?"

মেয়েটা প্রবল বেগে মাথা নাড়িয়ে বললো, "আপনি যা ভাবছেন তার কিছুই না, আপনি শধু দয়া করে আমাকে আপনার ঘরে লুকিয়ে রাখুন, আপনার কিছুই হবে না, আমি সত্যিই বলছি, আপনি আমাকে এই দয়াটুকু করুন , আপনার দুটো পায়ে ধরি।"

মেয়েটার এরকম অনুনয় বিনয়ের পর ফাহমিম কিছুটা নরম হয়ে গেলো, সে গলার স্বরটাকে গম্ভীর করে বললো, "আপনি বলছেন তাহলে কিছু হবে না?"

মেয়েটা প্রবল অস্থিরতা নিয়ে বললো, "বললাম তো কিছুই হবে না, আপনি প্লিজ আমাকে তাড়াতাড়ি ঘরের ভেতরে যেতে দিন, লোকগুলো যে কোন মুহুর্তেই এদিকে চলে আসতে পারে।"

ফাহমিম আর কথা বাড়ালো না। মেয়েটাকে ঘরের ভেতর নিয়ে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিলো সাথে সাথে।

মেয়েটা বসে আছে ফাহমিমের বিছানাটার একটা কোণে। তাকে দেখে কোন সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে যদিও যথেষ্টই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে মেয়েটাকে, বোঝাই যাচ্ছে তার উপর দিয়ে অনেক দখল গিয়েছে।

মেয়েটা মাথা নিচু করে বসেছিলো, ফাহমিম এর প্রশ্নে মাথা তুলে তাকলো সে, ফাহিম বললো, "আসলে ঘটনাটা কি একটু খুলে বলবেন?"

মেয়েটা বললো, "প্লিজ , আগে আমাকে এক গ্লাস পানি দিন।"

ফাহমিম তার টেবিলে রাখা জগটা থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিলো। একটানেই পুরো পানিটা খেয়ে নিলো মেয়েটা।তারপর গায়ের ওড়নাটা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতেই বললো, "আমার নাম চৈতী, আমাদের বাসা আপনাদের এই গলির কয়েক গলি পরেই। কিছুদিন আগে এক ছেলের সাথে আমার বিয়ের কথা বার্তা শুরু হয়, ছেলেটাকে আমার একদমই পছন্দ না, তার প্রচুর অর্থ আছে কিন্তু ছেলেটা চরিত্রহীন, অনেকটা গুন্ডা টাইপের বলতে পারেন। কিন্তু আমার নাছোড়বান্দা বাবা ঠিক করেন এই ছেলের সাথেই আমার বিয়ে দিবেন। সব কথা বার্তা শেষ করে তিনি আজ আমার সাথে সেই ছেলেটার এংগেইজমেন্টের তারিখ ঠিক করেন। কিন্তু যেহেতু কোনভাবেই বাবার এই সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিতে পারছিলাম না, তাই আমি পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমার মা এ ব্যাপারে আমাকে হেল্প করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী আজ রাতে ছেলেরা আমাদের বাসায় আসার কিছুক্ষণ আগেই আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাই আমার এক বান্ধবীর বাসায় গিয়ে কিছুদিন গা-ঢাকা দেবো বলে। কিন্তু আমার ধুরন্ধর বাবা হয়তো কোনভাবে আমার সেই পরিকল্পনাটা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি সেই ছেলের সহায়তায় অনেক আগে থেকেই গোপনে আমদের বাড়ির চারিদিকে পাহারা বসান। আমি আজ রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সাথেই সাথেই পাহারায় থাকা কিছু লোক আমাকে অনুসরণ করা শুরু করে। আমি তা বুঝতে পারার সাথে সাথেই দৌড় দিয়ে আপনাদের গলিটায় ঢুকে পড়ি এবং অন্য কোন উপায় না দেখে আপনার দরজায় নক্ করতে বাধ্য হই।"

একনাগাড়ে পুরো ঘটনাটা বলে চৈতী থেমে যায় এবং টপটপ করে চোখের পানি ফেলতে থাকে। ফাহমিমও কি বলতে হবে বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চৈতীকে কান্না থামানোর জন্য অনুরোধ করে, পরে চৈতী কান্না থামালে ফাহমিম বললো, "সমস্যা একটাই, আমি তো বাসায় একা থাকি, আপনি একজন ব্যাচেলর ছেলের সাথে রাতটা কীভবে কাটাবেন? কিংবা ব্যাপারটা কেমনই বা দেখা যায়? তাছাড়া আমাকেই বা আপনি বিশ্বাস করবেন কি করে?"

চৈতী মুখে মলিন হাসি ফুটিয়ে বললো, "ঐ বাজে ছেলেটার হাতে নিজেকে সপে দেয়ার চেয়ে আপনার হাতে সপে দেয়াও হাজারগুণে ভালো, তাছাড়া আপনি যেখানে এতোক্ষণ আমাকে আপনার ঘরে জায়গা দিতেই এতোটা সংকোচ বোধ করছিলেন সেখানে আমার সাথে আপনি কোন রকমের খারাপ আচরণ করতে পারেন বলে তো আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।"

চৈতীর কথা শুনে কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়লো ফাহমিম। তারপর চৈতীর দিকে না তাকিয়েই সে বললো, "তাহলে তো হলোই, আপনি বিছানাতেই শুয়ে পড়ুন, আমি না হয় নিচে শোবো।"

চৈতী তৎক্ষণাৎই বললো, "না না, আপনি ব্যস্ত হবেন না, আপনি বরং শুয়ে পড়ুন, আমি আপনার চেয়ারটাতে বসেই রাতটা কাটিয়ে দিতে পারবো।"

ঘরের ফ্লোরে পড়ে থাকা কিছু ময়লা আবর্জনা সরাতে সরাতে ফাহমিম বললো, "আপনার ভদ্রতার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি যা বলেছি তাই হোক, আপনাকে বিছানা করে দিচ্ছি, আপনি বরং বিশ্রাম নিন।"

কথাটা বলেই ফাহমিম চৈতীর দিকে তাকিয়ে আবার বললো, "আপনি তো মনে হয় রাতে খাননি কিছু। আমি আসলে জিজ্ঞাসা করতেই ভুলে গিয়েছিলাম। আমি বরং বাইরে থেকে কিছু খাওয়া নিয়ে আসি।"

চৈতী বললো, "প্লিজ আমাকে আর লজ্জা দিবেন না, রাতে আমার কিছু না খেলেও চলবে।"

ফাহমিম বললো, "অতো কথার দরকার নেই। আমি বাইরে যাচ্ছি, যাবো আর আসবো, যাওয়ার সময় বাইরে তালা দিয়ে যাচ্ছি, যাতে কেউ আসলেও বুঝতে না পারে যে এই বাসায় কেউ আছে। এক কাজ করুন আপনি আমার মোবাইল নাম্বারটা টুকে রাখুন। এর মধ্যেও যদি কোন কারণে দরকার হয় সাথে সাথে আমাকে ফোন দেবেন, ঠিক আছে?"

হাঁ সূচক মাথাটা নেড়ে চৈতী নিজের ফোনে ফাহমিমের নাম্বারটা সেইভ করে রাখলো। ফাহমিম চলে গেলো খাওয়ার নিয়ে আসতে। ফাহিম চলে যাওয়ার পর চৈতী বাথরুমে গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে নিল, তারপর বাথরুম থেকে বের হয়ে এসে ফাহমিমের পুরো ঘরটায় একবার চোখ বুলালো সে।ফাহমিম যে ব্যাচেলর তা বুঝতে দেরী হলো না চৈতীর। ঘরের জিনিসপত্র খুবই এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরে আসবাবপত্রও তেমন একটা নেই। খুব একটা ভালো অবস্থায় যে ফাহমিম নেই তা খুব সহজেই অনুমান করতে পারলো চৈতী।

ফাহমিম প্রায় মিনিট পঁচিশেক পরে দুই প্যাকেট বিরিয়ানী নিয়ে বাসায় ফিরে এলো। অনেক দিন এমন ভালো-মন্দ খাওয়ার সুযোগ হয়ে উঠেনি,আজ চৈতীর উছিলায় খাওয়ার সুযোগ এসেছে, মন্দ কি!--মনে মনে একরকমের আনন্দ নিয়েই রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফ্লোরিং করে ঘুমাতে গেলো ফাহমিম, আর সারাক্ষণই ফাহমিমের বিছানাটার একটা কোণে গুটিসুটি হয়ে বসে নির্ঘুম রাতটা কাটিয়ে দিলো চৈতী। ভোরের দিকে ঘুম ভাঙলো ফাহমিমের। চোখটা খুলে বিছানার দিকে তাকাতেই বুকটা ধক্ করে উঠলো তার। একি! চৈতী নেই। হুড়মুড় করে উঠে গিয়ে ঘরের দরজার লক্ টা ঘুরিয়ে দেখলো সে। হুম! লক্ খোলা, চৈতী তাহলে চলে গিয়েছে। খুব মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো ফাহমিমের। মানুষ কেবল উপকার নিতেই জানে। উপকার শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই হয়ে যায় লাপাত্তা-- একটা বার বলে তো অন্তত যেতে পারতো মেয়েটা, রাগে গড়গড় করতে করতে বললো ফাহমিম।তারপর দরজাটার লক্ টা লাগিয়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকতে যাচ্ছিলো সে, হঠাৎ নিজের টেবিলটার দিকে দৃষ্টিটা আটকে গেলো তার। টেবিলের দিকে এগিয়ে আসলো সে,টেবিলের একটা জায়গায় থেকে পানির গ্লাস দিয়ে চেপে রাখা দুই ভাঁজ করা একটা সাদা কাগজ হাতে তুলে নিলো ফাহমিম।

.................................................................(চলবে) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28826415 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28826415 2008-08-02 01:33:10
জল-ছায়া..........(অংশ---১)...... (ছোটগল্প)
ফাহমিম যখন তার বাসায় এসে পৌঁছে তখন সন্ধ্যার বিদায় লগ্নে আগত রাতের আয়োজনে পুরো মহা-নগরী রং বেরংয়ের আলোক সজ্জায় সজ্জিত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ফাহমিমের অফিস মতিঝিলে, মতিঝিল থেকে অফিস ছুটির এই বেলাটাতে মালিবাগ পৌঁছানো ছোটখাটো একটা যুদ্ধের মতো ব্যাপার। রাস্তায় অসহ্য জ্যামজট লেগেই থাকে, এই জ্যামজট ঠেলে মতিঝিল থেকে মালিবাগ পৌঁছাতে প্রায় প্রতিদিনই এক ঘন্টার মতো লেগে যায় ফাহমিমের। রিকশায় বসে থাকতে থাকতেই মাঝে মাঝে সে অস্থির হয়ে ওঠে, আর যেদিন বাসে করে বাসায় ফিরে সে-- গবাদিপশুর পালের মতো একজনের পিঠের সাথে আরেকজনের পিঠের, নিতম্বের সাথে নিতম্বের ধাক্কাধাক্কিতে কিংবা একজনের শরীর থেকে ভেসে আসা ঘামের দুর্গন্ধ আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে যাওয়ার অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতায় বাসে থাকার প্রতিটা মুহূর্তকে তার কাছে মনে হয় যেন জীবন গাত্রে এক একটা বিশাল বিষ-ফোঁড়া। এই সকল বিষ-ফোঁড়ার নীলে নীল হতে হতেই তাকে বাসায় ফিরে আসতে হয়। প্রতিদিন বাসায় ফিরেই সে যে কাজটা করে তা হলো-- বাথরুমটার মরচে ধরে যাওয়া ঝর্নাটা ছেড়ে তার নীচে ঠিক আধা ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা। আজও বাসায় ফিরে সে সেই কাজটাই করেছে। যেহেতু ফাহমিম এখনো অবিবাহিত এবং সে ছাড়া তার ঘরে আর কেউই থাকে না, অগত্যা রান্নাবান্না সহ ঘরের সব কাজ তাকেই করতে হয়। রান্নাবান্নায় অবশ্য ফাহমিমের হাত খুবই ভালো, বেশ কয়েক পদের রান্না করতে পারে সে, চা টাও বেশ ভালোই বানায়, ফাহিমের চা খেয়ে বাড়িওয়ালা মুগ্ধ হয়ে বলেছে--ফাহমিম যদি মেয়ে হতো শুধু মাত্র তার হাতের যা খাওয়ার জন্যই তিনি তার সাথে নিজের ছেলের বিয়ের দিতেন। আজো বাথরুম থেকে গোসল করে বের হয়ে গভীর আনন্দের সাথে নিজের জন্য কড়া করে এক কাপ চা বানিয়ে এনে খুব আয়েশী ভঙ্গিমায় খেয়েছে ফাহিম আর পায়ের উপর পা উঠিয়ে সূক্ষ মনোযোগ দিয়ে পত্রিকার পাতায় চাকরীর বিজ্ঞাপনগুলোতে চোখ বুলিয়েছে।

এখন রাত নয়টার মতো বাজে। ফাহমিম বসে আছে তার বিছানাটার ঠিক মাঝখানে। এই অভ্যাসটা তার খুব ছোটবেলার। বিছানায় বসতে গেলেই তাকে ঠিক মাঝখানটায় বসতে হয়, কোন কারণ ছাড়াই তার এই অভ্যাস। ছোটবেলায় বিছানার মাঝখনাটায় পা গুটিয়ে যেভাবে মায়ের কাছে পড়ত বসতো ফাহমিম, আজও সে সেভবেই পা গুটিয়ে বসে থাকে বিছানার মাঝে। বসে বসে সে এখন চ্যানেল আইতে রাতের খবর দেখছে। ফাহমিমের সাদা কালো দুনিয়াটা টেলিভিশনের রূপালী জগতেও সাদাকালোই। বহু কষ্টে সে একাটা সাদাকালো টেলিভিশন জোগাড় করেছে কয়েক মাস আগে, মান্ধাত্যার আমলের এক মডেল, রিমোর্টটা পর্যন্ত নাই, ডিশের লাইনটাও সে নিয়েছে বহু তদবীর করে, চোরাই লাইনই বলা যেতে পারে। বাড়িওয়ালায় লাইনের সাথে একটা চিকন মতো তার জুড়ে দিয়ে কোন রকমে ঝিরঝির অবস্থায় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো দেখে সে। বিরাট বিরাট সব দুর্নীতির এই দেশে এই ধরনের ছোটখাটো দুর্নীতি বিশাল সাগরের এক ফোটা পানির মতোই, কারো কোন মাথাব্যাথা থাকার কথা না এইসব ছোটখাটো চোরাই ব্যাপার নিয়ে।

হঠাৎ করেই ফাহমিমের ঘরের দরজাটায় বেশ কয়েকটা টোকা পড়লো। এই সময়ে তার কাছে সাধারণত কারো আসার কথা না, আজকে মাত্র মাসের ২০ তারিখ, বাড়িওয়ালাও নিশচয়ই তার বাড়িভাড়া নেয়ার জন্য আসেনি, তবে কে আসলো--ভাবতে ভাবতেই বিছানাটা ছেড়ে উঠে এসে ঘরের দরজাটা খুললো ফাহমিম। খুলেই চমকে গেলো সে। ২৫/২৬ বছর বয়েসের হালকা পাতলা গড়নের মোটামুটি রূপবতি একটা মেয়ে জগতের সকল অস্থিরতা আর উৎকণ্ঠা নিয়ে ভয়াল চোখে তাকিয়ে আছে ফাহমিমের দিকে। অচেনা অজানা এমন একটা মেয়েকে এতো রাতে এই অবস্থায় দেখে ফাহিমও কিছুটা ভড়কে গেলো মূহুর্তের জন্য।

...........................................................................(চলবে) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28826154 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28826154 2008-08-01 00:39:34
হায় বিষন্নতা। কতো সহজেই সে টেনে ধরে ছুটন্ত লাগাম,
কোন বিষে নীল করে সে মেধাবীর ঘাম,
বয়ে চলা প্রাণের বাতাসে মিশায়ে দেয় সে কোন
অচিন রাগিণীর সুর, বড় বিধ্বংসী যে সুর,
যে সুর থামিয়ে দেয় বেঁচে থাকার কোলাহোল,
অস্থির আত্না ফেরারী ঘাতকের মতো
খুঁজে ফিরে তখন একটু আশ্রয়ের কোল,
কোন ছদ্মবেশে সে ভর করে আমার প্রিয়ার মন জুড়ে,
যখন তার চোখজুড়ে খেলা করে না আর আমাদের প্রেম,
তার হতে ঠিকরে বের হয় কেবলই লাগামহীন ঘৃণার চাহনি,
আর সুযোগপ্রিয় বিষণ্ণতা তখন ছোঁয়াছে রোগের মতো
এসে ভর করে আমার আত্মা জুড়ে,
অসহায় আমার আত্নার আনাগোনা তখন
কেবলই থাকে বিষাদের দুয়ারে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28825756 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28825756 2008-07-30 21:59:37
প্রকৃতির উঠোনে। যেখানে সুদীর্ঘ, ব্যস্ত পথ এসে থেমে গেছে আপন ক্লান্তিতে,
সেখানে আমি বসে থাকি একেলা--
মায়াময় জগতের সকল পিছুটান পিছনে ফেলে
নাতি-দীর্ঘ হলদে সবুজ ঘাসের পাটির উপর, প্রকৃতির উঠোনে,
শত শত রঙিন ঘাস-ফড়িঙ যেখানে দোল খেয়ে খেলা করে,
আমার চারিধারে,
আর তার পাশ দিয়ে শুভ্রতার অদৃশ্য চাদর বিছিয়ে বিছিয়ে
আপন তালে হেলে দুলে চলে গেছে স্নিগ্ধ, ধবল কাশবন--
ঈষৎ স্রোতসিনী, পিতল-রঙা জলের এক নদীর তীর ঘেঁষে ঘেঁষে--
বহুদূরের কোন গাঁয়ে অথবা অজ্ঞাত গন্তব্যের পথে,
মাঝে মাঝে কাশবন ছুঁয়ে আসা স্নিগ্ধ, শীতল বাতাস
আপন লয়ে নিবিড় তালে তালে আছড়ে পড়ে
পিতল-রঙা জলের সেই নদীর বুকে,
জলের তরঙ্গ থেকে তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তখন জল সঙ্গীতের মাতম,
নির্লিপ্ত আমি বড় নীরবে কান পেতে শুনি সেই অচেনা সঙ্গীতের সুর,
আর আমার হৃদয়ে পটে তখন অলক্ষে গুবলে ওঠে পাংশু স্মৃতির ঝড়--
আমায় দুমড়ে মুছড়ে নিয়ে চলে যায়
ফেলে আসা জীবনের হাজারো ছোট-বড় বাঁকে--
অবুঝ শৈশব, ডানপিটে কৈশোর আর অশান্ত যৌবনে--
আমায় ঘিরে থাকে তখন স্মৃতির কক্ষপথ ধরে ধরে ক্রমাগত ঘুরতে থাকা
হাজারো আপন প্রিয় মুখ,
ফেলে আসা বহু পুরানো সেই সব কালের সাক্ষী হয়ে,
আর আমি ঘোলাটে মনের চোখে তখন কেবলই চেয়ে থাকি--
সজল নয়নে;
হারিয়ে যাওয়া সেই সব চির-চেনা, অতি প্রিয়, আপন মুখ-পানে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28825130 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28825130 2008-07-29 00:57:23
চেতন-অবচেতনে। এক জোড়া চোখের পানে চেয়ে থেকে
আমি অনন্ত স্বপ্নের যে ঈষৎ চওড়া পথ ধরে ধরে চলে যাওয়ার
ব্রত নিয়েছিলাম সেই কতোকাল আগে,
সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনন্তকালের ক্লান্তি নিয়ে
আজ আমি এসে দাঁড়িয়েছি এক নির্মেঘ আকাশের তলে,
যেখানে গহীন বন তার সবুজ বৃক্ষরাজির ফাঁক গলে গলে
আমায় মায়াময় ইশারায় হাতছানি দিয়ে ডেকে চলে যায় অবোধগম্য
মোহাবিষ্ট এক আরাধনার সুরে, ঠিক যেন সেই সুর--
যেই সুর অপার্থিব এক কিংকরী বীনায়
সেই সে বিকেলে নীড়ে ফেরা পাখিদের আকুলতার মতো
আমায় আকুল করে তুলেছিলো
তার স্রোতে ভেসে যাওয়ার অনতিক্রম্য এক হাতছানি নিয়ে,
কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি অনন্যোপায়ী হয়ে হেটে চলে যাই তাই
কখনো কখনো সেই বিস্তীর্ণ গহীন বনের
জংলী আগাছায় মোড়া পথ ধরে ধরে,
হলদে হরিণ তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ঝলকানি নিয়ে
আমায় অভর্থ্যনা জানায় সেথায় কখনো কখনো পিছন পানে চেয়ে চেয়ে,
কখনো রং বেরঙয়ের ঘাস ফড়িং
আপন ছন্দময়তায় আমায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিয়ে চলে যায়
বিগলিত কোন স্মৃতির স্পর্শকাতরতা নিয়ে,
কখনো বন্য কোকিল তার আপন সুরে সুরে আমার ডেকে চলে যায়,
কখনো কখনো সারি সারি গাছের ধারে নির্বাক শুয়ে থাকা নীলাভ স্বচ্ছ জলাধার সূর্যের চুয়ে পড়া রশ্মিকে বুকে বয়ে নিয়ে চলে
আমায় জলজ আলোর সাত রঙা খেলা দেখায়,
কখনো আবার একটু দূর থেকেই থেকে থেকে ভেসে আসা
কোন বৃদ্ধ শৃগালের মাতম তোলা ভীতি-জাগানিয়া হাঁকডাক অথবা
কাছেই কোথাও লোলুপ আনাগোনায় মগ্ন হিংস্র হায়নার অবধারিত অস্ত্বিত্ব
আমায় করে তোলে ব্যকুল--
শিকারে পরিণত হওয়ার ক্ষাণিক আগেও বেঁচে থাকার অন্তিম ইচ্ছা নিয়ে রুদ্ধশ্বাস ছুটে চলা অসহায় হরিণের মতো,
তবু বিহবল আমি বসে থাকি সেথায় সেই সে চোখজোড়ার খোঁজে--
ভাবি, হয়তো সামনেই সেই স্বপ্নিল চোখজোড়ায় স্বপ্নের শেষে
বাস্তবের নতুন কোন দীর্ঘপথের শুরু-- অপেক্ষায় আছে আমার তরে,
তাই আমিও চেতন-অবচেতনে অপেক্ষায় থাকি প্রতিটি বৃষ্টিস্নাত বিকালে
বহুকাল আগে সেই সে বৃষ্টিস্নাত বিকালের শেষে জেগে ওঠা
অতলস্পর্শী এক রাশ হাহাকার বুকে বয়ে নিয়ে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28824777 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28824777 2008-07-27 23:23:42
আমার কবিতারা না হয় ঘুমিয়ে পড়ুক। আমার কবিতারা না হয় ঘুমিয়েই পড়ুক,
আমরা শব্দেরাও না হয় শব্দহীন হয়ে যাক
আমার কবিতার খাতায় অনন্তকাল ঘোরাফেরা করার অসীম ক্লান্তি নিয়ে,
তুমি তো তাই চেয়েছিলে প্রিয়তমা,তবে তাই হোক,
আমিও উদাসীন কবির খোলস ঝেড়ে ফেলে
ছা-পোষা মানুষের খোলস পরে নিলাম আজ,
আর আমার কবিতার খাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকা নয়,
আর তোমার দৃষ্টি সীমানা জুড়ে আমার উজবুক উদাসীনতার
বিষাদময় নির্বাক ছুটে চলা নয়,
আর আমার কবিতার খাতায় সৃষ্টিসুখের বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে কেঁপে উঠে তোমার সুখগুলোকে আমার পংক্তির শৃঙ্খলে আটকে ফেলা নয়,
তবে তাই হোক প্রিয়তমা,
তবে তোমার চোখ পানে চেয়ে থেকেই না হয় প্রেমময়ী উদাসীনতার
নতুন আরেক অদৃশ্য কাব্য রচনা করি আমি,
তোমার অনাবিল অনন্ত রূপ রহস্যের গভীর থেকে গভীরে হারিয়ে গিয়ে,
তোমার নিশ্চুপ পিপাসার্ত আকাঙ্খা আহবানের অতলান্তে তলিয়ে
গিয়েই না হয় নব-জীবন সৃষ্টির জৈবিক উল্লাসে মেতে উঠি আমি এবার,
আমার কবিতার খাতার সৃষ্টিসুখের অবাধ্য ইচ্ছাগুলো না হয় তোমার মাঝে হারিয়ে গিয়েই তাদের তীব্র ক্ষুধা, বুক ফাটা পিপাসা নিবারণ করুক,
কবিতার খাতায় শব্দদের ঝড় তোলার আমার অনিঃশেষ সংগ্রাম না হয়
গতিবিধি পরিবর্তন করে উঠে আসুক জীবন সংগ্রামের পথে,
কি লাভ তোমায় বনলতা, সুরঞ্জনা, প্রিয়াতা নামে ডেকে
বেলা শেষে তোমার চোখে আমার ব্যর্থ পুরুষের অবয়ব প্রত্যক্ষ করায়,
ক্ষেতের বলদের মতো আমিও তাই আজ নেমে গেলাম
জীবন ঘানি টানার চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা নিয়ে,
তিন বেলা দু'মুঠো খাবো, আর্থিক প্রাচুর্য্যতায় তোমাকে রাণী বানাবো,
আর দিনভর অনন্ত সংগ্রামের ক্লান্তি গ্লানি গুলো নিয়ে এসে নরম
বিছানায় তোমার উন্মত্ত প্রেমময়তার অতলান্তে হারিয়ে যাব রাত্রির আঁধারে,
তুমি তো তাই চেয়েছিলো প্রিয়তমা, তবে তাই হোক,
আমার কবিতারা না হয় ঘুমিয়ে পড়ুক,
আমার শব্দেরা না হয় আমার কবিতার খাতায়
তাদের বাসস্থান গুটিয়ে ফেলে পরজীবীর মতো গিয়ে বেঁচে উঠুক
অন্য কোন কবির কবিতার আশ্রয়ে,
তবে তাই হোক প্রিয়তমা, তবে তাই হোক। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28824158 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28824158 2008-07-25 22:09:10
চিরবিপ্লবীর দল। আমাদের কলমের খোঁচায় বারুদের
বিস্ফোরণ শোনা যায়,
এখনও কি তোমরা দেখোনা
আমাদের বক্তব্যের আঘাতে ঈষাণ কোণে লুকিয়ে
থাকা কালরাত্রির বিদায়,
এখনও কি তোমরা দেখোনা
পূর্বাকাশের তেজস্বী সূর্যের জ্বালাময়ী বিকিরণ
এখনো কি তোমাদের অন্তর আত্মার জঞ্জালমূলে
পড়েনি বিপ্লবের হুংকার-কোদালের কোপ বিস্মরণ
এখনও কি তোমাদের লোলুপ চাহনিতে
আঁধার রাত্রির নিষিদ্ধ স্বপ্ন ঘুরে ফিরে সুরে তোলে মাতালের
এখনও কি তোমাদের চটকদার দাম্ভিকতায়
জ্বলেনি আগুন, লেলিহান শিখা বিপ্লবী বারুদের,
তবে তোমরা অন্ধ, বধির;
হারিয়ে গেছে তোমাদের উপলব্ধির তীর,
তোমরা পুরানকে না চাহিয়াও পুরানের নিষিদ্ধ প্রেমে বিহবল,
তোমরাও জেনে রেখো,
আমরাও মুখোশ খুলতে জানি,
আমরা নতুন,আমরা চিরবিপ্লবীর দল।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28823910 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28823910 2008-07-25 00:28:55
চলে যাওয়া.........(ছোট গল্প) "আমার সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ , বৃষ্টি তোমাকে দিলাম, শুধু শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু তোমার কাছে চেয়ে নিলাম।"

গানটার সাথে অবশ্য তার আজকের দিনটার কিছু জায়গায় জাগায় মিল আছে। আজ সারাদিনই সে মুহিবের সাথে কাটিয়েছে। মেঘলা আকাশটাকে মাথা নিয়ে দুজনে মিলে ঢাকার এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে। বিকেলের দিকে আশুলিয়ার দিকেও গিয়েছে ওরা। সেখানে চটপটি ফুচকা খেয়েছে, গত কয়েকদিনের প্রবল বৃষ্টিতে আশুলিয়ের দুই প্রান্তে ফুলে ওঠা খাল বিলের পানি গুলের দিকে চেয়ে থেকে মুহিবকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ বসেও থেকেছে নীরা। সে মনে প্রাণে চাইছিলো যেন বৃষ্টি নামে। কারণ তার প্রবল কান্না পাচ্ছিলো তখন। বৃষ্টি আসলে ভালোই হতো, সে অঝোর ধারায় কাঁদতো, অথচ তার কান্নার জল বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যেত বলে মুহিব হয়তো কিছুই বুঝতো না। কিন্তু বৃষ্টি আসে নি, নীরাও অনেক কষ্টে তার কন্নাকে সামাল দিয়েছে। নীরা খুবই আবেগপ্রবণ একটা মেয়ে কিন্তু নিজের আবেগকে সংবরণ করার বিরাট ক্ষমতাও তার আছে।আজকে তার জায়গায় অন্য কোন মেয়ে হলে কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে যেত, অথচ সে বিরাট ধৈর্য্যের সাথেই সে আবেগকে সংবরণ করেছে যদিও বাসায় আসার পর সে টানা আধা ঘন্টা অঝোরে কেঁদেছে, কারণ তার কান্নার কারণটাও বিশাল। মুহিবের সাথে আজকেই তার শেষ দেখা হয়েছে। মুহিবের সাথে তার ছয় বছর বয়সী ভালবাসার করুণ সমাপ্তিটাও হয়ে গেলো এই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। কারণ গত এই মাসের দুই তারিখে নীরার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। দুই দিন পরেই তার বিয়ে। নীরার বাবা মুহিবকে পাত্র হিসাবে অযোগ্য ঘোষনা করাতেই তাদের এই পরিণতি, অবশ্য পাত্র হিসাবে মুহিব অযোগ্যই বলা যায়। মাস্টার্স পাশ করেছে সে গত বছর। এখনও কোন চাকরি বাকরি খুঁজে পায় নি, ফকিরাপুলের একটা মেসে থাকে সে। দুইটা টিউশনির অল্প কয়েকটা টাকা দিয়ে যেখানে মুহিবের নিজের দিন কাটতেই কষ্ট হয়, সেখানে নীরাকে বিয়ে করে তার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করার মতো কোন যোগ্যতার লক্ষণই মুহিব দেখাতে পারে নি। কাজেই নিজের একমাত্র মেয়েকে এই ধরনের মেরুদন্ডহীন একটা ছেলের কাছে বিয়ে দেয়ার কথা কোনভাবেই চিন্তা করতে পারেননি নীরার বাবা। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে, নীরাকে তার বাবা কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে মুহিবের মতো একটা উজবুকের সাথে না ঘোরাফেরা করার জন্য। নীরা বাবাকে কিছুই বলতে পারে নি, কিছু বলতে পারেনি সে মুহিবকেও। কারণ সে নিজেও জানে মুহিবের আসলে করার কিছুই নেই। শুধু যেদিন তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো সেদিন মুহিবকে সে বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা জানিয়েছে ধরা গলায়, মুহিবও কিছু বলতে পারে নি। শুধু অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর নীরাকে শেষ বারের মতো দেখা করার জন্য অনুরোধ করেছে সে।

বাস্তবতার আঘাতে নিজের ভালোবাসটা যে এভাবে ক্ষয়ে যাবে তা কোনদিন স্বপ্নেও কল্পনা করেনি নীরা। অবশ্য মুহিবের সাথে তার প্রথম দেখা হওয়া সেখান থেকে প্রেম এসব কিছুকেই খুব একটা চিন্তাপ্রসূত ব্যাপার বলা যাবে না, সবই ঘটেছে নীরার ঝোঁকের মাথায়। তার এখনও মনে আছে সেই দিনটার কথা। শ্যামলীর একটা ফুটপাথ ধারে কথায় যেন যাচ্ছিলো নীরা। হঠাৎই সে দেখলো ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে ২২/২৩ বছরের সুন্দর গোলগাল চেহারার একটা ছেলে এক আইসক্রীমওয়ালার কাছ থেকে কয়েকটা আইসক্রীম কিনে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টোকাই টাইপ কয়েকটা বাচ্চাকে আইসক্রীমগুলো খেতে দিচ্ছে। সেই গোলগাল চেহারার সুন্দর ছেলেটাই হচ্ছে মুহিব। এই দৃশ্য দেখার পর পরই নীরা মুহিবের কাছে গিয়ে তার ভালো লাগার কথা জানিয়েছে। মুহিব ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ নীরার দিকে তাকিয়ে নীরাকে পাগল টাগল ভেবে যখন চলে যাওয়ার উপক্রম করছিলো তখনই নীরা মুহিবকে আটকায় এবং সেধে সেধে মুহিবের মেসের ফোন নাম্বারটা নিয়ে রাখে। পরের কয়েক দিন প্রায় প্রতিদিনই নীরা মুহিবকে ফোন করত এবং একসময় মুহিব নীরার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো।আজ এতোটা কাল পরে এসে নীরার মনে হয়েছে আসলে বাস্তবতার ব্ল্যাক-হোলটার মাঝে সব স্বপ্ন আশা আকাঙ্খা হারিয়ে যায় একসময়। মানুষগুলোও কেমন করে যেন নির্লজ্জের মতো বিনা যুদ্ধে বাস্তবতার কাছে আত্নসমর্পণ করে, যেমন সে নিজেও করেছে। মুহিবের সাথে সম্পর্কটার পরিণতি দেখে ফেলেছে সে, নিজেকে আগত জীবনের জন্য প্রস্তুতও করে ফেলেছে অনেকটা এবং এখন আপাত আনন্দ নিয়ে হলেও বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝুম বৃষ্টি দেখছে, নীরা যখন এসব ভাবছিলো হঠাৎ বৃষ্টির একটা ঝাপটা কোথা থেকে এসে তাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেলো। কেমন যেন কেঁপে উঠলো নীরা-- বাস্তবতাই যদি জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হয়, তবে এতো স্বপ্ন, এতো আশা আকাঙ্খার মানে কোথায়?--নিজের মনে মনেই আবার ভাবতে আরম্ভ করলো নীরা। সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও নিয়তির কাছে যদি নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয় তবে এই শ্রেষ্ঠত্বের মানে কি?এর চেয়ে তো নিজের কাছে নিজের হেরে যাওয়াই তো শ্রেয়।কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাতে শুরু করেছে নীরাকে, কিছু একটা যেন চিন্তা করলো সে, এরপর আস্তে আস্তে নিজের পড়ার টেবিলটার কাছে এসে থামলো নীরা। টেবিলটার ড্রয়ারটা ভালো করে ঘেঁটে ঘুঁটে ধারালো একটা ব্লেড বের করে আনলো সে। ব্লেডটা নিয়ে সে তার বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। গভীর দৃষ্টি নিয়ে সে ব্লেডটার দিকে তাকিয়ে আছে এখন। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ে চলেছে, সিডি প্লেয়ারটাতেও শ্রীকান্তের সেই গানটা বেজে চলেছে অবিরাম।

নীরার বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার খবরটা শোনার পর থেকেই মুহিব স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বন্ধ করে দিয়েছে। সে সারাদিন মেসে শুয়ে থাকে। টিউশনি করতেও সে আজকাল আর বের হয় না। শুধু আজ বের হয়েছে সে নীরার সাথে দেখা করার জন্য। দেখা করে এসেই সে আবার তার মেসে এসে শুয়েছিলো। রাত আটটার তার কাছে একটা চিঠি আসে। অনেক অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিঠিটা খুলে সে পড়তে আরম্ভ করে এবং পড়া শেষ করার পর সে তার নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারে না, সে অনবরত ঘামতে থাকে। ব্যাপার যেটা হয়েছে তা হলো--আজ থেকে দুই বছর আগে সে বাংলাদেশে অবস্থানকারী এক ব্রিটিশ ভদ্রমহিলাকে ছিন্তাইকারীর হাত থেকে বাঁচিয়ে ছিলো। ঘটনার পর মহিলা মুহিবের কাছ থেকে তার ঠিকানা নিয়েছে এবং যাওয়ার সময় বলেছে, এই ঘটনার জন্য সে মুহিবের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ এবং এই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মুহিবের ঠিকানায় সে একটা উপহার সময়মতো পাঠিয়ে দিবে। মহিলার কথায় মুহিবের খুব একটা ভাবান্তর হয়নি সেদিন। সে ভেবেছিলো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার পর অতি আহ্লাদের বশে হয়তো মহিলা কথাগুলো বলেছে। সে হাসিমিখেই সেদিন মহিলাকে বিদায় দিয়েছে।

মুহিব মহিলাটার কথা ভুলেই গিয়েছিলো, চিঠিটা পড়ার পর তার মহিলার কথা আবার মনে পড়েছে, চিঠিটে যা লেখা আছে তার সারসংক্ষেপ হলো--ব্রিটিশ এই মহিলা নিঃসন্তান ছিলেন এবং একমাস হলো তিনি মারা গিয়েছেন, মারা যাওয়ার আগে তিনি তার বিপুল সম্পত্তির অর্ধেকটা একটা এতিমখানায় ডোনেট করে দিয়ে যান আর বাকি অর্ধেকটা মুহিবের নামে লিখে দেন, এই অর্ধেক সম্পত্তির মূল্যমান বাংলাদেশী টাকায় প্রায় কয়েক কোটি টাকার মতো। চিঠিটা পড়ার পড় মুহিব কতক্ষণ ঝিম মেরে পড়েছিলো। তারপর কোনরকমে উঠে দুই তিন ঘন্টা অনেক দৌড়াদুড়ি করে এই চিঠির সত্যতা যাচাই করে সে এবং এই চিঠির বিষয়বস্তুর সত্যতা সম্পর্কেও অনেকটাই নিশ্চিত এখন সে, যেহেতু চিঠিটার একজায়গায় মহিলার নাম,ঠিকানা, ব্যাংক-একাউন্ট এর নাম্বার সবই উল্লেখ করা আছে। এই কতোক্ষণে মুহিবের কেবলই মনে হয়েছে জগৎ কতো রহস্যময়--একজনের মৃত্যু ঘটনা চক্রে অন্যজনের সামনে এক অপার দিগন্তের সূচনা করে দিয়ে যায়।

এখন বাজে রাত প্রায় সাড়ে বারোটার মতো। মুহিব গভীর আনন্দ নিয়ে নীরাকে ফোন করছে। সে নীরাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলবে এবং সে জানে সমস্ত ঘটনা শোনার পর নীরাও প্রবল অহংকারের সাথে তার বিয়েটা আটকে দিতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত নীরার বাবা মুহিবকে একজন যোগ্য পাত্র হিসাবে বিবেচনা করেই নীরার সাথে তার বিয়ের বন্দোবস্ত করবে। তাই প্রবল অস্থিরতা নিয়েই মুহিব নীরাকে ফোন করে চলেছে। কিন্তু নীরা ফোন ধরছে না। গত ১৫ মিনিট ধরেই মুহিব ফোন করে চলেছে। নীরা ফোন না ধরায় তার অস্থিরতা আরো বেড়ে চলেছে। মুহিবের আর তর সইছে না এতো বড় একটা ঘটনা নীরাকে জানানোর জন্য। কিন্তু নীরা ফোন ধরছে না, ফোন বেজেই চলেছে। ওদিকে প্রবল বৃষ্টিতে নীরার বারান্দাটায় পানি জমে একাকার অবস্থা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু একি! এই পানি তো বর্ণহীন না! পানিটা কেমন লালচে লাগছে, দেখতে দেখতে পুরো বারান্দাটার পানিই লাল রঙয়ে রাঙা হয়ে উঠলো--লাল! কি অসহ্য লাল!


*(পাঠক, মুহিবের ভাগ্য পরিবর্তনের ঘটনাটি সত্য ঘটনার আলোকে, আমি নিজে এই ঘটনার পরোক্ষ সাক্ষী)*
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28823525 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28823525 2008-07-24 01:07:14
নিঃসঙ্গতা। তবুও থেমে নেই জমে জওয়া জলে
ব্যাঙেদের ভাষাহীন চিৎকার,
থেমে নেই নাইট-গার্ড এই মধ্য রজনীতেও-
একটা নিশাচর লালচে কুকুর সংগী তার,
হেঁটে হেঁটে রাস্তার
এ মাথা হতে ও মাথা অবধি,
জানিয়ে যায় বাঁশির বিদীর্ন চিৎকারে,
তোমরা ঘুমাও, আমি আছি, আমি পাহারাদার।
নিশাচর এই আমি
তবু জেগে থাকি একা,
চেয়ে থাকি জানালার গ্রিল ধরে
রাতের আকাশের দিকে,
মিটিমিটি জলে আর নিভে
দুএকটা অস্পষ্ট তারা।
নিঃসঙগতার ভারে বিষণ্ণ মন
ছুটে যায় আমার প্রিয়ার কাছে,
সামান্য একটু আশ্রয়ের খোঁজে,
হায় আমার প্রিয়াও জেগে নেই,
তাকে ছুঁয়ে যায়নি
নাইট-গার্ড এর হুঁশিয়ারি,
কিংবা জমে যাওয়া কান্না--
আমার নিঃসঙ্গতার।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28823197 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28823197 2008-07-23 02:14:04
অসমতল। বড় ব্যাথাতুর সুরে ভেসে আসে,
এইতো, এইখানে পূর্ণিমার চাঁদ থেকে থেকে
রাতভর কেবলই মুচকি হাসে,
ঐখানে অর্থের যোগান মানব জন্মের মতো
বাঁধহীন উল্লাসের ধ্বনি তোলে,
এইখানে অর্থের যোগান লোভের পেয়ালায়
কেবলই নতুন সুয়ার ঢেউ তোলে,
ঐখানে মানব শিশুর জন্ম ক্ষুধার পালে
অদম্য হাওয়ার ভয়াল হুংকার,
এইখানে মানব শিশুর আগমন চির ধন্য,
আহ্লাদী একাকিত্বের প্রতিকার,
ঐখানে শরীরের আদান প্রদান হয়
অনন্ত ক্ষুধার জ্বালায়,
এইখানে শরীরের আদান প্রদান হয়
নগ্ন লালসার ছায়ায়,
ঐখানে লাশেদের কাকুতি শোনা যায়
মৃত্যর খানিক পরেও,
এইখানে হেলায় ভুলে যাওয়া যায় কেমনে জানি
মৃত্যুর মত অবধারিত নিয়তিও।

তোমরা জান ঐখানে কাদের বাস?
মানুষ হয়েও যাদের নেওয়া হয় না মানুষের শ্বাস,
তোমরা জান এইখানে কাদের বাস?
মানুষ হয়েও যাদের কন্ঠে শোনা যায়
অধম পশুর উল্লাস।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28822814 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28822814 2008-07-22 01:20:57
তুমি আসো বড় ধীরে। আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গা অশান্ত তীরে,
যেথায় আমি দাঁড়িয়ে থাকি তোমার অপেক্ষায়,
আমার মৃত-প্রায় আত্মার শেষ নিঃশ্বাসটুকুর
অস্থির পদধ্বনি নিয়ে,
তারপরও তুমি আসো বড় ধীরে,
যখন ব্যস্ত পৃথিবীও তার সমস্ত ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে,
তুমি আসো মধ্যরজনীতে পারুলের লতায় দোল খেয়ে যাওয়া
স্নিগ্ধ বাতাস হয়ে,
কখনো হয়তো অলক্ষ্যে আমার ঘরে ঢুকে যাওয়া বেলী ফুলের
মৌ মৌ সুবাসের মতো তুমি আসো বড় নিশ্চুপে,
হয়তো হেসে হেসেই,
কিন্তু আমার শুকিয়ে যাওয়া অনুভূতির কাছে সেই হাসির আওয়াজ
বড় দূরের মনে হয়, শত আলোকবর্ষ দূরের,
তারপরও তুমি জানি কেমনে আমারে প্রাণ দাও, আর আমি আমার প্রাণ
ফিরে পাওয়া অনুভূতিটার সমস্তটুকু দিয়ে যখন তোমায় ছুঁতে যাই,
তখনই তুমি হারিয়ে যাও, আবার শুরু হয় আমার অপেক্ষাও,
হ্য়তো তুমি আসোই তোমার তরে আমার অপেক্ষার নতুন আরেক
প্রহর সাজাতে, আমি আবার অপেক্ষায় থাকি,
আবার আমার কবিতার খাতা খুলি,
আর সেই খাতাটার সমস্তটা জুড়ে তখনো থাকে কেবলই একটাই আর্তনাদ--
তুমি আসো বড় ধীরে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28822004 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28822004 2008-07-19 22:04:05
মাটির পুতুল দুঃখ হাসির মালা বদলে,
মাটির দলায় প্রাণের খেলায়,
কোন কারিগর চর্কা ঘোরায়?

শুরুও হঠাৎ, শেষও হঠাৎ,
তবু, ভ্রমের পথে মিছিল বিরাট
তবু, মায়ার ভূমে স্বপ্ন চাষে
মাটির পুতুল পিছু না হটে।

আমি, তুমি, আমরা, তোমরা,
একই কামারের অনলে পোড়া,
শত আকৃতির ছায়ায় ঢাকা
একই মাটির শত দলা।


আমার এটা, আমার ওটা,
আসলে সবই শূন্য ফোঁটা,
শত আস্ফোলনে বৃথাই ছোটা,
ভ্রমের সুতোয় আটকে থাকা।

ব্যস্ত পুতুল মায়ার খেলায়,
খেলার শেষে নিঃস্ব ঘামায়,
কারিগরের চর্কা ঘুরে আর
মাটির দলায় প্রাণের বিদায়।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28821048 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28821048 2008-07-16 20:58:02
বাণিজ্যিক পিছুটান। শতাব্দী প্রাচীন সংস্কার কিংবা অনন্ত শাশ্বত মানবিক হৃদয়ানুভূতি নয়--
বরং, বাণিজ্যিক উপকথার চটকদার শাব্দিক দ্যোতনায়
কেমন যেন অপ্রস্তুত মনে হয় আমাদের চারিধারের বিরাজমান কালকে--
হাজার বছরের পুরানো মানব সভ্যতার ক্রমবর্ধমান ভিত্তিটার
গাঁথুনিটাকে আজ মনে হয় বড় বেশী নড়বড়ে, ফাঁপা--
হয়তো ইট-পাথরের জোড়াতালি দেয়া কোন ক্ষণস্থায়ী ইমারত--
সেই ইমারতের আশেপাশে ঘুরে ফিরে অন্ধ বাঁদুড়ের মতো
আমাদের অযথাই কেবল আলোর পথে যাত্রা--অযথাই তো, কারণ
অন্তর আত্মার বাণিজ্যিক কলুষতায় আমাদের হৃদয়ের দৃষ্টিপথে
যে কালো অন্ধন্ত্বের বিকাশ ঘটেছে--
তার জমীনে তীব্রতম আলোর বিকিরণও শেষ পর্যন্ত অনন্ত আঁধারই,
শাল বনের অভাগা পেঁচার মতো
তাই আমাদেরও বোধোদয় হয় রাতের আঁধারেই,
সদ্য-ভূমিষ্ঠ বোধের--বহু-আরাধ্য সফল পদচারণার তীব্রতম আকাঙ্খা নিয়েও তাই আমরা ঘুমিয়ে পড়ি প্রভাত-লগ্নের বহু আগেই,
মাতৃহীন অবহেলিত বোধগুলোর চতুর্মূখী কান্নাকে তখন মনে হয়
বহুদূরের এক গহীন বন থেকে ভেসে আসা
কোন খেক-শিয়ালের ভীতিজাগানিয়া হাঁকডাক--
তা কর্ণগোচর না করার তীব্রতম প্রচেষ্টা নিয়ে
তাই আমরা ভীত কাপুরুষের মতো নরম কম্বলে মাথা গুঁজি,
যদিও বহুকাল আগে সৃজনশীলতার শপথ নেয়া
কোন এক হতভাগা কবি তখনও ক্লন্তিহীন জেগে থাকে,
বাণিজ্যিক পিছুটান তার কলমেও দুর্ভেদ্য শিকল পরিয়েছে,
প্রতিভা বিপন্ন হওয়ার সর্বগ্রাসী চেতনা নিয়ে
সে কেবলই অপলক চেয়ে থাকে তখন,
শত শত আলোক-বর্ষ দূরের অসীম নক্ষত্রের পানে;
অন্তিম শয্যায় থাকা তার নিরূপায়, মুমূর্ষ প্রতিভার
বেঁচে থাকার শেষ-লগ্নের শ্রবণোত্তর গগণবিদারী আর্তি, হ্য়তোবা
অন্তহীন দীর্ঘশ্বাসে মাখামাখি হৃদপিন্ড গুলিয়ে ওঠা অযাচিত অভিমান--
হয়তো বড় অলক্ষে, বড় নীরবেই আঁচড়ে পড়ে তখন;
রাত্রির কোন এক ভাগে; অদৃশ্য অসীম ছায়াপথ ঘেঁষে ঘেঁষে;
শত শত আলোকবর্ষ দূরের সেই সব নক্ষত্রের দুয়ারে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28820318 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28820318 2008-07-14 22:48:03
অজানা.....(ছোটগল্প)।
আজও মশিউর ভার্সিটি যায়নি। সকালে ঘুম থেকে উঠেছে সে ১১টার দিকে, ঘুম থেকে উঠেছে না বলে বলা ভালো বিছানা থেকে উঠেছে। গতরাতে তার ঘুম হয়নি। ভোর রাতের দিকে চোখটা একটু লেগে এসেছিলো, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সে ঘুম ভেঙ্গে গেলো, এরপর আর ঘুম আসে নি। মা এসেছিলেন ৯টার দিকে, তার সাথে কথা-টথা বলে আবারও কিছুক্ষণ শুয়ে ছিলো সে বিছানায়।পরে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে চুপচাপ নাস্তাটা কোন রকমে সেরেই আবার নিজের রুমে ফিরে এসেছে মশিউর।
সে এখন বসে আছে তার রুমের বিশাল বিছানাটার উপর। তার দুপা দুই দিকে ছড়ানো, পিঠটা একটু কুঁজো হয়ে আছে। সে এক দৃষ্টিতে তার রুমের সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখলে মনে হবে যেন সিলিং ফ্যানটা মাথার উপর ঘোরা জগতের বিশাল একটা রহস্য, আর সে গভীর মনযোগ দিয়ে সে রহস্য উদঘাটন করতে নেমেছে। এমন সময় তার মোবাইলটা বেজে উঠলো। নীরা ফোন করেছে, স্ক্রিনে তার নামটা দেখেই মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো মশিউর, নীরা মশিউরের সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন, গত চার পাঁছ বছর ধরেই তারা দুইজন দুইজনের খুব ভালো বন্ধু, কাজেই নীরার ফোন পেয়ে সেই ফোনকে অগ্রাহ্য করা কোনভাবেই মশিউরের উচিৎ হচ্ছে না। ফোন বেজেই চলেছে, অথচ সে ফোন ধরছে না। গত কিছুদিন ধরে আচরণগত যে পরিবর্তংগুলো এসেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো নিজের কাছের এবং প্রিয় মানুষগুলোকে মশিউর ক্রমাগত avoid করে চলেছে। তাকে ক্লাসে আসতে না দেখে অনেক বন্ধু বান্ধবই মশিউরকে ফোন দিয়েছে। মশিউর বাধ্য হয়ে কারো কারো ফোন ধরেছে এবং অবলীলায় বলে দিয়েছে যে তার শরীর খারাপ। কিন্তু এখন নীরাকে সে কি বলবে তাই সে বুঝতে পারছে না। নীরা যেভাবে ক্রমাগত ফোন দিয়ে চলেছে তাতে করে তার ফোন ধরা ছাড়া অন্য কোন উপায় নাই। শেষে মশিউর বাধ্য হয়েই নীরার ফোন ধরলো।ফোন করতে করতে বিরক্ত হয়ে যাওয়া নীরা মশিউরের হ্যালো শুনেই কটমট করে বললো, "কি রে শালা, ফোন ধরোস না কেন? তোর কি গায়ে লাগে না আমি যে ফোন করি? নাকি কানের দুইটা ছিদ্রিই বন্ধ হয়ে গেছে? ব্যাপার কোনটা?"
মশিউর ভাবলেশহীনভাবে জবাব দিলো, "কোন ব্যাপার নাই।"
নীরা বললো," কোন ব্যাপার না হলে নবাবের মতো ঘরে বসে আছিস কেন? ভার্সিটিতে আসা বন্ধ করলি কেন? না কি ঘরের মধ্যে মহাজাগতিক কোন ধ্যানে লিপ্ত আছেন আপনি, ঘর থেকে বের হলেই আপনার ধ্যানে ব্যাঘাত ঘটবে" , নীরার এই এক সমস্যা, বেশী রেগে গেলে আপন পর নির্বিশেষ সবাইকে সে আপনি বলতে আরম্ভ করে।
মশিউর যথারীতি ভাবলেশহীনভাবেই বললো, "কি বলতে ফোন করেছিস বল্, এতো কথা বাড়াচ্ছিস কেন?"
নীরা বললো, "বাহ্, আমি কথা বাড়াচ্ছি, না?"
অবশ্যই কথা বাড়াচ্ছিস এবং আমাকে প্রচন্ড বিরক্তও করছিস।
"কি বললি তুই, আমি তোকে বিরক্ত করছি?"
"হ্যাঁ করছিস, তুই তাড়াটাড়ি ফোনটা রেখে দিলে আমি খুবই খুশি হবো।"
মশিউরের এই কথা শুনে নীরা হতবম্ব হয়ে গেলো। এরকম আচরণ মশিউর আগে কখনোই করেনি তার সাথে। নীরা কি করবে বুঝতে পারছে না। মশিউরকে কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে তার কাছে। শেষে আর কোন কথা না বাড়িয়ে নীরা ফোনের লাইন কেটে দিলো। মশিউর ফোনটা বিছানায় রেখে পুনরায় সিলিং ফ্যানের দিকে মনযোগ দিলো।

এভাবেই দিন কাটতে লাগলো। সপ্তাহ ঘুরে মাসও চলে যেতে লাগলো। একসময় বাড়ির বাইরে যাওয়া একদমই বন্ধ করে দিলো মশিউর। ভার্সিটির টার্মগুলোও ড্রপ হয়ে যেতে লাগলো এরই মধ্যে। রুমের বাইরে আসাও সে কম বেশী বন্ধ করে দিলো।এমনকি খাওয়া দাওয়ার জন্যও সে রুমের বাইরে আসতো না।ছেলের এই অবস্থা দেখে মা মশিউরের খাওয়া দাওয়া তার রুমেই পাঠিয়ে দিতে শুরু করলেন। কিন্তু খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে মশিউরের তেমন কোন আগ্রহই দেখা যেতো না। এমনও অনেক দিন গিয়েছে--খাবারগুলো বাঁশি হয়ে পঁচে যাওয়ায় মশিউরের পুরো রুমটা জুড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ মশিউরের কোন খবর নাই। না খেতে না খেতে মশিউরের শরীর স্বাস্থ্যও ভেঙ্গে যেতে আরম্ভ করলো। যে মশিউরের চুল সবসময় আর্মিদের মতো ছোট ছোট করে কাটা থাকতো, সেই চুল বেড়ে বেড়ে তার কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসলো। মুখে দাঁড়ি গোঁফ জমতে জমতে একসময় ছোট-খাটো একটা জংগলের মতো হয়ে গেলো সেখানে। কিন্তু সেদিকে তার কোন খেয়ালই ছিলো না।একটা কাজই শুধু সে করতো সারাদিনে , সেটা হলো নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে বিছানার ঠিক মাঝখানটাতে নামায পড়ার ভঙ্গিটার মতো হাঁটু মুড়ে শরীরটাকে টান টান করে রুমের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা। রুমে কেউ আসার অনুমতি চাইলে সে দরজা খুলে দিতো ঠিকই, কিন্তু আগত ব্যাক্তির সাথে কোন রকম কথাবার্তা না বলেই সে আবার তার আগের অবস্থানে ফিরে যেত। এরকম অবস্থা দেখে মশিউরের বাবা, মা থেকে শুরু করে ঘরের অন্যান্য লোকজন, কাজের লোক সবাই খুব ভয় পেতো প্রথম প্রথম। পরে অবশ্য ব্যাপারাটা সবার সহ্যের পর্যায়ে চলে যায়, যদিও মাঝে মধ্যেই মশিউরের মা দুকূল ভাসিয়ে কান্নাকাটি করতেন যেহেতু মশিউর তার একমাত্র সন্তান এবং তার এই অবস্থা তিনি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। মশিউরের বাবা ছেলের এই উদ্ভট কর্মকান্ডের কোন মাথামুন্ডু খুঁজে না পেয়ে শেষে একদিন মশিউরকে চরম জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন যদিও তাতে খুব একটা লাভ হয়নি, কারণ বাবার কোন প্রশ্নের জবাবই মশিউর দেয়নি, শুধু ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ বাবার দিকে চেয়ে থেকে আবার সিলিংয়ের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিলো। শেষের দিকে মশিউর সবার সাথে এমনই করতো, কেউ কোন কিছু জিজ্ঞাসা করলেই সে তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতো। যদিও প্রথম দিকে মাঝে সাঝে সে কিছু কিছু ফোন রিসিভ করতো, পরে পরে সে সেটা করাও বন্ধ করে দেয়। ধীরে ধীরে তার শরীর শুকাতে শুকাতে এমনই রুগ্ন অবস্থা ধারণ করে যে মশিউরকে দেখলে মনেই হতো না যে আদৌ সে কোনদিন মানুষের অবয়ব নিয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহন করেছিলো কিনা। কিন্তু আশ্চর্য্যের ব্যাপার এই যে এই অবস্থাতেও তাকে কোনভাবেই দুর্বল মনে হতো না। কিংবা ক্রমাগত খাওয়া দাওয়া না করা সত্ত্বেও তাকে বেঁচে থাকার কিংবা অস্তিত্বের সংকটে ভুগতে হয়নি। যাই হোক, সময়ের সাথে সাথে মশিউরের কর্মকান্ডেও কিছু পরিবর্তন আসে। শেষের দিকে যেটা হতো তা হলো সে তার বিছানার ঠিক মাঝখানটাতে ঠায় দাঁড়িয়ে দুই হাত দুই দিকে দিয়ে ঘাড়টাকে পিছনের দিকে কাত করে মুখটাকে সিলিংয়ের বরাবর এনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। মাঝে মধ্যেই মশিউর তার রুমের দরজা বন্ধ করতে ভুলে যেতো। তখন তার এই ধরনের কান্ড দেখে বাসার লোকজন রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে যেতো। মশিউরের বাবা অনেক চেষ্টা করলেন তাকে একজন সাইকোলজিস্টের কাছে নেয়ার জন্য। মশিউর বাবার সেই আহবানে কোন সাড়াই দিলো না। মা অনেক চেষ্টা করে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন রকমের পানি পড়া আনিয়ে মশিউরকে খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাতেও কোন লাভ হলো না। মশিউরকে দেখলে মনেই হতো না যে আদৌ কারো কথা তার কানে যাচ্ছে। সে পড়ে থাকতো তার আপন ভুবনে। এভাবে প্রায় বছর খানেকের মতো চলে গেলো। মশিউরের রুমের দিকেও কেউ আর ভয়ে যেতো না। মাঝে সাঝে তার রুমের দরজাটা যখন খোলা থাকতো , যে যেভাবে পারতো দরজাটা বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করতো। এভাবে দিন কাটতে লাগলো। একদিন সকাল বেলা মশিউরের মা ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামায শেষ করে মশিউরের রুমের দিকে আসলেন।তিনি দেখলেন যে রুমের দরজা খোলা। অন্য সবার মতো তিনিও রুমের দরজাটা বন্ধ করার জন্য দরজাটার একদম কাছে আসলেন। এসেই তিনি একটা চিৎকার দিলেন। তিনি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলেন না যে তিনি কি দেখেছেন। তার চিৎকার চেঁচামিতে ঘরের সবাই উঠে আসলো। সবাই দেখলো--মশিউরের ঘরের মেঝেতে তার কাপড় চোপড় এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে, ঘরের জিনিসপত্রও সব ছড়ানো ছিটানো। আর তার বিছানার উপর জগতের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা ঘটেছে। বিছানাটার বালিশ, জাজিম, তোশখ সব মাটিতে পড়ে আছে, আর বিছানাটার মাঝের তক্তাটা থেকে আপাত বিশাল এক শেকড় গজিয়ে অতি অদ্ভুত প্রজাতির একটা বৃক্ষ রুমের সিলিংয়ের মাথাটা ছুঁই ছুঁই করে খাটটার ঠিক মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে।

এই দৃশ্য দেখার কিছুক্ষণের মধ্যেই মশিউরের মা জ্ঞান হারান। বাসার কাজের লোকগুলো সবাই প্রচন্ড ভয়ে পেয়ে তৎক্ষনাৎ বাসা ছেড়ে চলে যায়। ইতিমধ্যে মশিউরের মার মাথায় অনেক পানি টানি ঢলার পর তার জ্ঞান ফিরে আসে। মশিউরের বাবা সেদিন বাইরের কাউকেই কিছু জানালেন না।সারাদিনই তিনি কিছু একটা চিন্তা করলেন। তারপর রাতে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি অ্যাপার্টমেন্টটা বিক্রি করে দিবেন। তার সিদ্ধান্ত মতো পরের দিন গভীর রাতের দিকে কাঠের কাজ করে এমন কিছু লোক এসে মশিউরের রুম থেকে সেই গাছটাসহ পুরো খাটটাকে তুলে নিয়ে চলে গেলো। লোকগুলো প্রথমে পুরো ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পেরে খাটটা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে মশিউরের বাবা তাদেরকে মোটা অংকের টাকার লোভ দেখিয়ে বুঝিয়ে শুনিয়ে খাটটাকে তাদের কাছে দিয়ে দেন এবং পুরো ব্যাপারটা একদমই চেপে যাওয়ার জন্য তাদেরকে আরো কিছু মোটা অংকের টাকা ধরিয়ে দেন। এর করেক সপ্তাহ পরেই তিনি মোফাজ্জল হোসেন নামক ৩২/৩৩ বছর বয়সের সদ্য বিদেশ ফেরত এক ব্যবসায়ীর কাছে অ্যাপার্টমেন্টটা বিক্রি করে দেন এবং শেষে মশিউরের মাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যান।

এই ঘটনার প্রায় বিশ বছর পরে ঐ অ্যাপার্টমেন্টটার ঐ রুমেই হুবুহু একই রকমের ঘটনা ঘটে। মোফাজ্জল হোসেনের ছোট ছেলে জামান মশিউরের রুমটাতেই থাকতো। একসময় তার অবস্থাও মশিউরের মতোই হতে শুরু করে। মশিউরের মতোই ধীরে ধীরে সে স্বাভাবিক মানুষের জীবনযাত্রা থেকে পুরোপুরিই সরে আসে এবং শেষে একদিন সকাল বেলা বিশ বছর আগের সেই ঘটনার পুনারিবৃত্তি ঘটিয়ে জামানও মশিউরের মতো এক অতি অদ্ভুত প্রজাতির বৃক্ষে রুপান্তরিত হয়ে যায়। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28819228 http://www.somewhereinblog.net/blog/ratifblog/28819228 2008-07-11 19:34:32