আমার প্রিয় পোস্ট

বেঁচে থাকাই জীবন নয়, সত্যকে জানাতেই আছে জীবন!

ঈদের আনন্দ ও এগিয়ে যাওয়া পথ..........

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৯:১৪

শেয়ারঃ
0 0 0

ঈদ আসে, ঈদ চলেও যায়। কোন কোন ঈদে আর ছুটিও পাই না। কোন কোন বার সকাল বেলায় সেমাই খাবার সৌভাগ্যও হয় না! খুব মনে পড়ে ঈদের আগের রাতে বাসার আবহ্‌র কথা। সারা বাড়ি যেন ঈদের প্রস্তুতিতে মুখরিত হয়ে থাকত! আম্মা আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে রান্নাঘরে বসে যেত গোরুর মাংস, মুরগীর মাংস পরিষ্কার করতে, অন্যরা গাদা গাদা মসলা বাটত। আমার কোন কোন ভাইও আম্মার সাথে বসে যেত মাংস প্রসেস করার জন্য। আমি সারাদিন মেহেদী'র পাতা খুজে অত:পর বেটে হাত লাল করে বসে আছি সবার সাথে! টিভি হতে কিছুক্ষন পর পর শুনতে পেতাম "রমজানের ঐ রোযার শেষে এল খুশির ঈদ গানটা"। বাসার পাশেই আমার বয়সী ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আনন্দ চিৎকার শুনা যেত," আজ ঈদ , কাল ঈদ, তৌহিদ, তৌহিদ।" আমি আজও জানি না তৌহিদ মানে কি, কিন্তু তখন ঐ কথাগুলো শ্লোগান তুলতাম ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথেই! কারও কারও সাথে দুষ্টমি করে বলতাম, "দেখ্‌ দেখ্‌- বাশঝাড়ের পাশ দিয়ে আকাশে দেখ, চাঁদ দেখতে পাবি।" যেই ও আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত, পায়ে পাড়া দিয়ে বোকা বানিয়ে দিতাম দৌড়!

একটু বড় হবার পর ঈদের আগের রাতে আমার জন্যও কিছু কাজ বরাদ্ধ হয়ে গিয়েছিল! ইস্ত্রি করা! সবার পান্জাবী, পাজামা, সোফাসেটের কাপড়- ইস্ত্রি করেই ঘুমাতে যেতে হত। আমার বড় ভাইয়ার কাজ ছিল শাহবাগ থেকে অনেক রাত্রিতে ফুল কিনে আনা! আসলে অত রাত্রিতে ফুল কিনাটা ওর আসল উদ্দেশ্য ছিল নাকি ঈদের আগের রাতে সুন্দরী মেয়েদের সাথে দুষ্টমী করাটাই মুখ্য ছিল তা খুঁজতে যাব না এখন! ঈদের রাত বলে ক্যান্টর্মেন্টের মেইন খুলা থাক্‌ত প্রায় সময়, একটু রিকোয়েস্ট করলেই ছেড়ে দিত! ভাইয়া যখন গাদা গাদা ফুল নিয়ে বাসায় আসত পুরা বাসা মৌ মৌ গন্ধে ভরে যেতে! ভাইয়া বাসায় আসত ভোর ৪-৫টার দিকে! আমি ঢুলু চোখে জেগে থাকতাম ওর জন্য! সচরাচর আমাদের বাসায় কার্পেট বিছানো হত না। কিন্তু ঈদের দিন বলে কথা, বাক্স থেকে বের করে আনা হত দামি (আমাদের জন্য দামী ছিল ওটা) কার্পেট টা। জানি না এখনও আছে কিনা! সব কিছুই রাতের মধ্যে রেডী করে ঘরকে ঝকঝকে করেই তবেই ঘুমাতে যেতাম!

ঈদের জামা নিয়ে বরাবরই আমার অনেক আগ্রহ ছিল! কেও বাসায় আসলে একটু মুড নিয়ে দেখাতাম, এটা আমার গেন্জী/শার্ট, এটা আমার প্যান্ট, এটা আমার জুতা! আব্বা খুব ছোটবেলাও মারা গেলেও আমার জন্য কোন কিছুর কমতি কখনো হয় নি! সাধ্যমত আম্মা ও ভাইয়ারা সব জোগার করে রেখেছে আমার জন্য! বুদ্ধি হবার পর থেকেই (৮৩+ সাল থেকে) জানি যে আমার জন্য দামী কাপড় বরাদ্ধ আছে। হয়ত আমাকে বাসার সবাই ভুলিয়ে রাখতে চাইত যেন আমি বাবা না থাকার কষ্ট কোনদিন বুঝতে না পারি! সত্যি কথা বলতে কি কিছু কিছু সময় বাদে আর কখনই বাবা না থাকার কষ্টটা আমাকে ভোগ করতে হয় নি! বিছানাতে শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল কল্পনা করতে করতেই আম্মা অথবা ভাইয়ার ধাক্কায় ঘুম ভেন্গে যেত! "সোহাগ তাড়তাড়ি উঠে গোছল কর, নইলে নামাজ পাবে না।" ঈদের জামায়াত বেশীর ভাগ সময় সকাল সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মাঝে হত! টলতে গিয়ে বালতিতে পানি নিয়ে ঘুমকে শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলতাম! পান্জাবী পড়ে টুপি খুজতে খুজতে কাহিল হবার জোগাড় হত সবার। সারা বছর টুপিগুলোর তেমন খোঁজ না পড়লেও আজকে তারা মহামূল্যবান! মাথায় খুব টাইট অথবা ঢলঢল টুপি নিয়ে সোজা রান্না ঘরে-আম্মা বিভিন্ন রকম সেমাই রেডী করে রেখেছে। খেতে যেন সময় নষ্ট না হয় তার জন্য আগেই বাড়া থাকত সেমাই গুলো! অল্প একটু খেয়েই আম্মা/ ভাইয়াদের কাছ থেকে ভাংতি টাকা নিয়ে দিতাম দৌড়! "আল্লাহুম্মা.......রাব্বায়েক....।" মসজিদের মাইক থেকে দোয়াগুলোকে এত ভাল লাগত যে তখন ভালভাবে দোয়া না পারার পরেও ঠোট মেলাতে শুরু করে দিতাম! হাতে জায়ানাজ নিয়ে পুরা মুসল্লী হয়ে ছুটতাম মসজিদের দিকে। আমাদের ঘর থেকে মসজিদ মাত্র ৫-৭ মিনিটের পথ, তারপরেও মক্কার মানুষের মতই মসজিদের বাইরে রাস্তায় কিংবা ভাগ্য ভাল থাকলে মসজিদের ছাদে জায়গা পেতাম! হুজুর শুরু করতেন নামাজের নিয়ম তরিকা! বরাবরের মত আমি ভুল করেই যেতাম! পাশের লোকের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে হাত ঠিক করতাম, অথবা রুকুতে যেতাম! নামাজ শেষ হবার সাথে সাথে মহল্লার ছেলেরা জায়নাজ নিয়ে চলে আসত মসজিদ, ঈমাম, মুয়াজ্জেন, কবরস্থান আরও বিভিন্ন নামে টাকা তুলতে! আমি আমার পছন্দমত ছেলেদেরকে ২-৫ টাকা করে দিতাম ...২০ টাকা শেষ হতে হতেই তাকিয়ে থাকতাম কখন খুতবা শেষ হয়! ঈদের জামাতের সবচেয়ে বিরক্তি লাগত শেষের বিশাল দোয়া-----আমার মন তখন কোলাকুলির দিকে.... তখন কি আর অত বড় দোয়া ভাল লাগে!

নামাজ শেষ হতে শুরু করি পাশের লোকের সাথে ঈদের কোলাকুলি! তারপর খুজিঁ এলাকার পরিচিত কাকা- ভাইয়াদের! আর যখন আমার বড় ভাই, মেজ ভাই, সেজ ভাই, ছোট ভাই ( আমার ইমিডিয়েট বড়)- যার সাথেই দেখা হবে প্রায় কোলে তুলে নিয়ে এমন চাপ দিয়ে আমার সাথে কোলাকুলি করবে যে ভর্তা হয়ে যেতাম। কিন্তু ঐরকম ভর্তা হতে আমার খুব ভালই লাগত! দৌড়ে বাসায় চলে আসতাম আম্মার সাথে কোলাকুলি করার জন্য! আম্মাকে দেখা মাত্রই ঝাপিয়ে পড়তাম! আম্মা অনেক আদর করে কপালে চুমু দিয়ে দিতেন! ঘরে কোরআন তেলায়াতের টেপগুলো বাজতে থাকত! আমার ভাইরা সবাই আমার থেকে অনেক বড় বলে সারা বাড়িতে আওয়াজ খুব কম হত, কিন্তু ঈদের দিনে অনেক ছোট ছোট ছেলেদের শব্দ পাওয়া যেত। আম্মার কাছে নামাজের পর একদল ছোট ছোট ছেলে মেয়ে চলে আসবে যাদেরকে উনি ৫-১০-২০ টাকা করে দিতেন তাদের বয়স অনুযায়ী!

নামাজ পড়ে আসার পর ভাইয়ার বন্ধুরা (এলাকার) চলে আসত সেমাই খেতে! সবার হৈচৈ এর মাঝে দিন কিভাবে যে কাটত টেরই পেতাম না। একবার ঈদের কথা পড়ে যেটা আমার জীবনে অনেক স্মরণীয়! ঐসময় টাতে আমাদের ভালই অর্থনৈতিক সমস্যা যাচ্ছিল! ঈদ যতই কাছে চলে আসছিল কিন্তু আমার জামাকাপড়ের কথা কেও বলছিল না! আমিও বুঝতে পারছিলাম এইবার বোধহয় কিছুই পাব না! টাকার অভাব হলে সব জায়গাতেই তার ছাপ পাওয়া যায়! আম্মা ও ভাইয়ারা কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকে। পোষাক বাদেও ঘরের স্বাভাবিক কেনাকাটাও বন্ধ ছিল! সবার মন খারাপের সাথে সাথে আমিও মন খারাপ করে বসে ছিলাম! ঈদের আগের দিন দুপুর বেলায় বড় ভাই আমার হাতে একটা সপিং ব্যাগ ধরিয়ে বললেন, "এটা তোমার!" আমি খুলে দেখি ওখানে একটা শার্ট, অবশ্যই এলাকা থেকে কেনা ( যার রং পরের বার ধোয়াতেই উঠে গিয়েছিল)। শার্টটা পেয়ে আমার চোখ দিয়ে পানি চলে এসেছিল, অবশ্য তা পাওয়ার আনন্দে নয়, বাসার সবাই আমাকে কি পরিমান ভালবাসে তা বুঝতে পেরে!

ঈদ ২০০৬, আমি কোরিয়াতে! পরের দিন ঈদ। ঈদের আগেই আমার মন খারাপ হয়ে থেকে! ঈদের আগের রাতে চলে গিয়েছিলাম অন্যদেশী বন্ধুদের সাথে পার্টিতে! অনেক রাত করে ডর্মে ফিরেছিলাম। যখন ফোনে আমাকে বাংগালীরা ডাকছিল ঈদের জামাত পড়তে যাবার জন্য, আমি তখন গভীর ঘুমে কাতর! সেই ঈদে আমার নামাজ পড়া হয় নি, সেমাই খাওয়া হয় নি, অথবা ভাল করে কারও সাথে কথা বলাও হয়নি। সারাটা দিন মন খারাপ করে ছিলাম! চারিদিকে বিশাল শূন্যতায় পেয়ে বসেছিল, ঈদের খুশিতে পরিবার সাথে না থাকলে যে তা ঈদ হয় না তা ভালই বুঝতে পারছিলাম। আম্মা-ভাইয়াদের সাথে ঈদের কোলাকুলি - সবার কাছ থেকে নেয়া পরবী নেওয়ার আনন্দ সব ম্লান! দুপুর তিনটাই কোরিয়ান রেস্টুরেন্টে গিয়ে প্রথম খাবার খেয়েছিলাম, একা!

এখানে আর ৪/৫ দিন পর ঈদ, বাংগালীরা বিশাল প্রোগাম করবে। প্রথমে দাওয়াত বাংলাদেশী এমবাসিতে, তার পর পর আমার পুরনো সেই ডরমিটরির সুদৃশ্য ডাইনিং হলে ৪০ জনের ঈদজাপন! গত কয়েক বছর থেকে সবাই কম্বাইন্ডলি রান্না করে, তাই ঝামেলা তেমন হয় না কারও একার জন্য! অনেক মেনু থাকবে, আমি হয়ত বরাবরের মত সবাইকে জ্বালাব, হাসাব, দৌড়াব- কিন্তু সত্যিই মনের মাঝে কি আম্মার কথা মনে পড়বে না ! ভাইয়াদের সাথে কুস্তি করার মত কোলাকুলি কি আর হবে ! আমরা ৫ ভায়ের একসাথে বিরাট দল বেধে কি কোথাও আর যাব ! হয়ত যাব কোন দিন, হয়ত বা আর কোনদিন না! এভাবে সবকিছু হারানোর নামই হয়ত এগিয়ে যাওয়া, সিড়ি বেয়ে আরেকটা জায়গায় যাওয়া! দিনকে দিন একটা হাহাকার আমার জাগে, আমরা যতই এগোচ্ছি ততই কি জীবনকে হারাচ্ছি না! মেকানিস্টিক লাইফ, স্যালুট বস, শাঁই শাঁই করে এগিয়ে যাওয়া~

 

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৯:১৪ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৯:২৯
আশরাফ মাহমুদ বলেছেন: শেষে এসে মন খারাপ করে দিলেন। :( আহারে......ঈদ! এখন দীর্ঘশ্বাস।

আমার মনে আছে একবার শীতকালে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলাম ঈদ করার জন্য (প্রায় ঈদ করা হতো গ্রামে), বিস্তীন মাঠ পার হতে হয় (নতুবা পাকা রাস্তা ধরে অনেকটুকু ঘুরে), মাঠে ঘাস আর শিশির জমা (সকাল ছিল সময়টা)। আমি মুজা-জুতো খুলে সেই যে শিশির লাগিয়েছিলাম ত্বকে- এখনো ঘ্রাণ পাই, এখনো ওম লাগে।
১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৯:৩৩

লেখক বলেছেন: আসলেই আর কখনও সেই শিশিরে স্পর্শ পাওয়া যাবে না। আর সেই ঘ্রান কল্পনাতেই পেতে হবে! বাইরের লাইফে চাকচিক্য আছে ঠিকই জীবন নাই! শালার সুযোগ পেলেই দেশে ফিরে চাই! এভাবে বেচে থাকার চেয়ে পিপিলিকা হওয়াও অনেক ভাল!

২. ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৯:৫৯
রাশেদ বলেছেন: পড়ছিলাম পোস্টটা একটু আগে। কি বলুম! :(
১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ১০:০৫

লেখক বলেছেন: কি আর কওয়ার আছে কও! তোমার কি অবস্থা ?

৩. ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ২:৫৬
চিটি (হামিদা রহমান) বলেছেন: হায়রে প্রবাসী ঈদ:(

আমাদের মোটামুটি আনন্দে কাটে:) অনেক বাংগালী কিনা। এরপরও মার হাতের রান্না মিস করি।

আগাম ঈদ মোবারক
১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৩:৩৩

লেখক বলেছেন: আপনাকেও আগাম ঈদ মোবারক! আমাদএর এখানে এখন অনেক বাংগালী। বলতে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র সংস্করন হয়ে গেছে। প্রায় ৪০-৫০ জন মানুষ আছে এখানে! আমি বাংলাদেশকে মিস করি খুব!

৪. ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ২:৫৮
অন্তিম বলেছেন: খবর নাই অনেকদিন। তাই খবর নিতে এলাম.....।
১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৩:৩৯

লেখক বলেছেন: আসলেই খবর নাই আমার কোন! মাঝে ছিলামই না। এখন তাও মাঝে মাঝে লগইন করে বসে থাকি, কিন্তু ব্লগ দেখার সময় হয় না!

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৭০৭ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
দূরে ......বহুদূরে....অথচ.............!
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ