খুব লিখতে ইচ্ছা করছে কিন্তু কি লিখব ভেবেই পাচ্ছি না। মাথায় আসছে না কিছু। হামা ভাই শুন্য মাথা আর কাগজ কলম নিয়ে বসলেই চমৎকার সব লেখা দাঁড়িয়ে যায়। নৈশচারীর রাত গভীরতর হয়, ভাবনার দল দানা বাঁধে আর মন ছুঁয়ে যাওয়া গভীর জীবনবোধ কলমের খোঁচায় প্রাণ পায়। অন্যদেরও নিশ্চয়ই এমনি হয়। আর আমার! একে তো লিখি যা-তা, তাও কত কাটাকাটি, ছেঁড়াছেঁড়ির পর। এ নিয়ে দুঃখ যে খুব হচ্ছে তা না। আমি লেখিয়ে নই, এ ব্যাপারে আমি পরিষ্কার।
ছেলেবেলায় আর সবার মত ছড়া লিখতাম। শিশু আর নবারুনের কোনায় একটা কোনমতে ছাপা হলে পরে, সারাদিন বুকের ভিতর কি “ঈদ-ঈদ, নুতনজামা-নুতনজামা” খুশীর ফল্গুধারা! তারপর যা হয় গতানুগতিক সাধারনের—উঁচু ক্লাসের পড়ার চাপ, রেসাল্ট ভাল করা নিয়ে বাড়ির লোকদের মৃদু ভৎর্সনা, কৈশোরের গোপন সব ভাল লাগা, মন্দলাগা, অকারণ মন খারাপের তলায় পড়ে ছড়া লেখালেখির মৃতপ্রায় দশা- ডাইরি লেখা তখন অক্সিজেনের মতই অপরিহার্য—দখল করে নিল অবসরের সবটুকু সময়। তাই লেখালেখির স্ফোটন প্রাত্যহিক রোজনামচার ধারাবিবরণিতে ঠাঁই নিল।
ইউনিভার্সিটিতে উঠে ডানা কাটা পরে বহু মেয়ের-বিয়ে হয়ে যায়, বাবা মা অনেক সচেতন হন মেয়ের গতিপ্রকৃতি নিয়ে। আর সেই জায়গায় আমার যেন পূনঃজন্ম হল। ডানা গজাল বরং। হৈ হুল্লোর, আড্ডা, নুতন বন্ধু-বান্ধব সব মিলিয়ে ঘোরের মত, কেমন মাতাল মাতাল অবস্থা—দিন কিভাবে যায় বুঝিইনি। যখন ফার্ষ্ট ইয়ার ফাইনালে ডাব্বা মারলাম, তখন হুস ফিরল।
সেকেন্ডইয়ারে ভোল পালটে আমি সিরিয়াস স্টুডেন্ট হয়ে গেলাম। আদাজল খেয়ে লাইব্রেরীর দোতালায় সকাল-সন্ধ্যা স্বরসতীকে ভজানোর কি আপ্রাণ চেষ্টাই না করতাম—তেমন লাভ হল না যদিও। তবে হাল ছাড়লাম না। তৃতীয়বর্ষে বিদ্যাদেবী অবশেষে কৃপা করলেন। মান বাঁচল কোনমতে। সে সময় দিস্তা দিস্তা নোট লিখেছি, নীলক্ষেতে রফিক ভাইয়ের দোকানে সেগুলা ক্যান্সারাস কোষ-বিভাজনেরমত কপি হয়ে ছড়িয়ে গেছিল সবখানে। আমার অনেক বন্ধু বা অবন্ধু অনেক মন দিয়ে, কেউ বসে, কেউ শুয়ে, কেউ বা হেঁটে হেঁটে তা পড়েছে! পাঠকের অভাব ছিল না সত্যি!!
মাষ্টার্সে আবার পাখা মেলে উড়াল দেবার খায়েশটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। একব্যাচ পিছের কিছু ছাত্র পড়ানোর বদৌলতে আর্থিক সচ্ছলতাও তাতে ক্যাটালিস্ট হিসাবে সহযোগি হয়েছিল। আজীবন নারীবাদী, সমাজতন্ত্রের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত এই আমি ক্যাপিটালিস্ট ষড়যন্ত্রে ফ্যাশন সচেতন হয়ে উঠলাম, দুনিয়া রঙিন হয়ে উঠল যেন। তখনি একদিন হঠাৎ বর্জ্রপাতের মত মনে হল আমি প্রেমে পড়েছি—তাও আবার আমারই ক্লাসের নেহাত গোবেচারা মার্কা, কাঠখোট্টা টাইপ এক খুব খুব ভাল ছাত্রের। আর যে ছেলেগুলি অবিরাম ফোন করত, আইসক্রিম খাওয়াবে বলে সাধাসাধি করত, নিত্যদিন সূক্ষ্ম বা স্থূল স্তুতিতে মন ভরাতে চাইত, কিম্বা জিআরই একসাথে পড়ার জন্য লাফালাফি করত—এ বেচারা তার মধ্যে নেই। ভুলেও যদি কখন ফোন করত, সেটা খুবই নিরস কোন লেখাপড়ার ব্যাপারে। আমি ভাবলাম, এই-ই খাঁটি সোনা—একেবারে খাঁদবিহীন। হাদারাম আমি বুঝিইনি ইনি নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন, ঘন চাটু সহাস্যে কবুল করতে তার এত ভাল লাগে—সামান্য একটা মেয়েকে ভালবেসে অসাধারণ করে তুলবার কোন ইচ্ছাই তার নেই। এই এঁকেই প্রগাঢ় প্রেমে আপ্লুত হয়ে স্বরচিত কালজয়ী (স্বমতবাদে) এক কবিতা তার জন্মদিনে উপহার দিলাম। তার উচ্চস্বরে হাসি আজো কানে অনুরণিত হয়—“কি লিখেছ এটা? কবিতা? তুমি কবিতা লেখ নাকি? মানে কি? একটা ডিক্সনারী দিলেও তো পারতে এর সাথে!”
এত অভিমান ধারণ করার ক্ষমতা আমার ছোট্ট মনটার ছিল না। তার এই সরল (তার মতে) দুষ্টুমিতে সামিল হবার, “ব্যাপার না কোন” এই ভেবে হাসবার মত অভিনেত্রী হতে পারিনি তখনো। তাকে বল্লাম, “তোমার মানিব্যাগ দাও”। সে দিতেই সেটার এক কোনে গুজে দিয়ে বলেছিলাম, “এটা হারিও না।“
বলেই কোন এক অজুহাতে ফিরে এসেছিলাম ঘরে।
তারপর আর লিখিনি কিছু। অভিমান? হতে পারে। ইচ্ছাও হয় নি, সুযোগও নয়। উচ্চ শিক্ষার্থে বাইরে চলে গেছিলাম। তারপর চাকরি, জীবনকে বয়ে বেড়ানোর ব্যস্ততায় ভুলেছিলাম সব। দেশে ফিরবার পর, এক বন্ধু সামুর খোঁজ দিলেন, তার অনুরোধেই আবার আবোল তাবোল লিখালেখি। আমি জানি এগুলো বাংলা সাহিত্যের কোথাও কিছু কন্ট্রিবিউট করে না—কোনই মূল্য নেই কোথাও। নেহাতই আমার আর আপনাদের (যারা এ অব্দি পড়ছেন, কি ভেবে কি জানি) সময়ের অপচয়। কিন্তু আমার অবাধ্য, নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা পড়তে না চাওয়া মনটার কাছে এর মূল্য অনেক। কেমন ব্যাখ্যাতীত প্রশান্তি আর আনন্দের উৎসমুখ এই অর্বাচীণ লেখালেখি। তাই লিখি অকারণ- যা মনে আসে। বার বার পোস্টাই আপনাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে! এই দেখুন না, কিছু খুঁজে না পেয়ে লেখালেখির ইতিবৃত্ত লিখে ফেল্লাম! আপনাদের সময়ক্ষরণের জন্য ক্ষমা করে দেবেন আমাকে। পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ বিকাল ৩:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



