১২ই ফেভ্রুয়ারী, ১৯৮৬
অনিক,
তুমি কেমন আছ? অনিক নামটা আমার খুব পছন্দ! অনিকেত মানে যার ঘর-দোর নেই—ঠিক আমারই মত, আই বিলং নো হয়ার! ও, বলতে ভুলে গেছি, আমার নাম বিভা। আমি সিক্সে পড়ি। বই পড়তে আমার খুব ভাল লাগে। আমি চোখ বন্ধ করে গল্পটাকে একদম নাটকের মত দেখতে পাই। আর খুব ভাল লাগে বারান্দায় শুয়ে আকাশ দেখতে। মেঘগুলো একবার ঘোড়ার মুখ তো আরেকবার ঈগল পাখীর মত ভেসে বেড়ায়, আবার ভেঙে ভেঙে অর্থহীন সাদা ভেলা হয়ে যায়। মন কেমন করে দেখতে দেখতে। তুমি দেখ এমন?
তোমাকে আমার সম্পর্কে সব জানিয়ে দেই। আমার প্রিয় রঙ সবুজ। কারন আমি যেখানে থাকি সেই জায়গাটা একটা প্রবাল দ্বীপের মত—চারদিকে সবুজ আর সবুজ—সবুজের যে কত ভারিয়েশন আছে, তা কি তুমি জান? ফিকে থেকে গাঢ়—সব, সব আমার প্রিয়!
আমার সবচেয়ে প্রিয় বই গীতবিতান। আমার রবীন্দ্রসঙ্গীত দারুন লাগে। “ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা” গানটা শুনলেই কেন যেন কান্না পায় আমার। এমন আর কোন গান শুনলে হয় না। আর প্রিয় কবিতা হচ্ছে, “আমার মা না হয়ে তুমি আর কারো মা হলে”। এটা পড়লেই বুকের ভিতর দুমড়ে মুচড়ে উঠে। আম্মু আমাকে অনেক ভালবাসে তবে আমার ভাইকে আমার থেকে সামান্য একটু বেশি। তবে এ নিয়ে আমার খুব দুঃখ নেই। কারণ বাবা আমাকে অনেক ভালবাসেন।
বাবাকে তো দিনের বেলা দেখিই না। তবে আমার মনে আছে বাবা আমাকে ছোট্টবেলায় কাঁধে নিয়ে ঘুরত সারা ঘর। আর সবাইকে বলত আমার মেয়েটা বুদ্ধির জাহাজ! যখন আমার দুই বয়স, খাবার টেবিলে বসে বাবা নাকি আমাকে সংখ্যা শিখাচ্ছিলেন। আমি খেলতে খেলতে বাবার চায়ের পিরিচটা মাটিতে ফেলে ভেঙে ফেলেছি, বাবা দুষ্টুমি করে সবাইকে ডাকছেন, “এক্সিডেন্ট এক্সিডেন্ট, সবাই এসো”। আমি নাকি সাথে সাথে আরেকটা প্লেট ফেলে চিৎকার করছি, “দুইসিডেন্ট দুইসিডেন্ট, আসো আসো!” তখন থেকেই বাবার ধারণা আমার মাথায় কিলবিলে বুদ্ধি!
এখন আমি শংকরের চিতা-বহ্নিমান পড়ছি। জানো, নায়কটার জন্য অনেক মায়া হচ্ছে। মা বলে আমি নাকি ইচড়ে পাকা। দিন-রাত বড়দের বই পড়ে পড়ে নাকি আমার এই দশা হয়েছে।
তোমাকে একটা গোপন কথা বলি? আমার না, কোন বন্ধু নেই। না, মানে আছে অনেক জন, কিন্তু ওদের সাথে আমার সব কথা বলতে ইচ্ছা করে না। আমার বন্ধু—আমার সব কথা বলার বন্ধু হবার জন্য থ্যাংকস।
ইতি,
বিভা
৮ই নভেম্বর, ১৯৮৭
অনিক,
জান, আজকে কি হয়েছে? বাংলা ম্যাডাম শুধু শুধু আমাকে ক্লাস পরীক্ষায় কম নাম্বার দিলেন। আমি ঠিক করেছি এবার যদি বাংলায় হাইয়েস্ট না পাই, সেভেনে আবার থেকে যাব-উঠবোই না এইটে। কেমন হবে বলতো?
আজকে আরো একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। আমরা স্কুল থেকে ফিরছি। পলাশ আছে না, ওই যে ক্লাস নাইনে পড়া লাল্টু মার্কা ছেলেটা? সে আজকে ইভাকে ডেকে নিয়ে একটা লাল গোলাপ আর চিঠি দিয়েছে। আর ইভাটাই বা কি! দিব্যি হেসে হেসে নিয়ে নিল! কি বেহায়ারে বাবা—ছেলেদের সাথে বেশী ভাব করার কি দরকার! সব শয়তানের দল। মেয়েদের দেখলেই শিষ দেয় অসভ্যগুলা!
শোন, আম্মু খাবার জন্য ডাকছে। বাই! তোমার কত্ত মজা-পরীক্ষা নিয়ে ভাবতে হয় না! হিংসা হয় তোমাকে!
১৬ই জুন, ১৯৮৮
প্রিয় অনিক,
আজকে অনেক মজা হয়েছে। সবাই দিয়ার জন্মদিনে ট্রুথ অর ডেয়ার খেলছে। আমাকে ইভা জিজ্ঞেস করেছে, আমার জীবনে কোন স্পেশাল ছেলে আছে কিনা! আমি আর কি বলব? বলেই দিলাম তোমার কথা। :-D
২০শে জুলাই, ১৯৮৮
প্রিয় অনিক,
আমি ভাল নেই। আমার পিরিয়ড শুরু হয়েছে। ক্লাস সিক্সে গার্হস্থ্য-অর্থনীতি বইতে ছিল যে মেয়েদের ঋতু না ফিতু কি হবে। কিন্তু আমার কেন হবে বলতো? এত পেট ব্যাথা করছে। আম্মু বলেছে এখন থেকে প্রতি মাসে নাকি এমন হবে। এটা আল্লাহর কেমন বিচার? কিসের জন্য এই শাস্তি? ছেলেদের কেন হবে না? আর আব্বু সব জানে! কি লজ্জ্বার ব্যাপার! উফ আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে!
২৭শে মার্চ, ১৯৮৯
প্রিয় অনিক,
আজকে মনটা এত খারাপ। স্কুলে গিয়ে দেখি কে যেন ব্ল্যাকবোর্ডে বিভা+ শোভন= লাভ লিখে রেখেছে। ও, তুমিতো ওনাকে চিন না। উনি ক্লাস টেনে পড়েন। শোভন ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। খুব কড়া গলায় আমাকে বললেন, আমার মত মেয়ের কাছ থেকে উনি এটা আশা করেননি। তারপর অদ্ভুত একটা কথা বললেন। আমি নাকি নিজে লিখে উনাকে বিপদে ফেলার জন্য এটা করেছি। আজব! উনাকে কেন কিম্বা কি বিপদে ফেলব আমি? আরো যা বললেন শুনলে তুমি খুব রেগে যাবে। আমার মত মহাজ্ঞানী আতেল মার্কা মেয়ের প্রেমে কোন সুস্থমস্তিষ্কের ছেলে পড়বে না! কেউ করে এমন তীর্যক মন্তব্য? অপমান করে উনার কি লাভ হল? আমি জানি তুমি আমাকে RT এর গানের কথা মনে করিয়ে দেবে—
"যে তোরে পাগল বলে তারে তুই বলিসনে কিছু
--
আজকে তোরে কেমন ভেবে অঙ্গে যে তোর ধূলো দেবে
কাল সে প্রাতে মালা হাতে, আসবে সে তোর পিছু পিছু।।"
কিন্তু কারো মালা টালা আমি চাই না। তুমি ছাড়া আমার জীবনে আর কোন ছেলের প্রয়োজন নেই। কারো সাথে আর কথাই বলব না!
তোমার,
বিভা
২৮ শে মার্চ, ১৯৯০
প্রিয়তম অনিক,
আজকে মেট্রিক পরীক্ষার রেসাল্ট দিল। কি করে যেন আমি খুব খুব ভাল করে ফেললাম। অবাক কান্ড। তুমি খুশী হয়েছ? আব্বু-আম্মু আর সাম্য অনেক অনেক খুশী!
২০শে এপ্রিল ১৯৯০
প্রিয়তম,
আমি ঠিক করেছি আমি ঢাকায় যাব কলেজে পড়তে।বাসায় এখনো বলিনি। এখানে পড়তে ইচ্ছা করছে না। এ জায়গাটা অপার্থিব সুন্দর কিন্তু এখানের অপ্রিয় তিক্ত স্মৃতিও কম জমেনি আমার এই ১৬ বছরের জীবনে।
২৩শে মার্চ, ১৯৯৩
প্রিয় অনিক,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বিত এই ছাত্রীটির শুভেচ্ছা নাও। আজকে ক্লাস শুরু হল। কিছু নতুন ছেলেমেয়ের সাথে পরিচিত হলাম। এদের খানিক আত্মকেন্দ্রিক মনে হল। অবশ্য প্রথম দর্শনে কাউকে বিচার করা উচিত নয়। সয়েল সাইনসের ঐ ছেলেটা (নাম মনে করতে পারছি না এই মুহুর্তে!) একটু খ্যাপা আছে মনে হল--আমাকে নাকি কোলকাতার বাঙ্গালী বলে মনে হয়! কেন এমন বলল? কি অদ্ভুত! "তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি"!!
সত্যিই আমি এখানে মিসফিট! তোমার কাছে নাতো অনিক? শুধু তুমিই বোধহয় আমার আমিকে এক্সেপ্ট কর দ্বিধাহীন চিত্তে। আর কেউ না!
তোমার,
আমি
২৭শে মার্চ, ১৯৯৬
প্রিয় অনিক,
অনেক অনেক দিন তোমাকে লিখিনি। নিশ্চয়ই অনেক অভিমান করে আছ! নাহ, তোমাকে ভুলে যাই নি। তোমাকে ভুলে যাওয়া কি আমার পক্ষে সম্ভব, বল? আমার অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে তোমার গতিবিধি। তুমি নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মত ধ্রুব! গত কয়েকটা বছর কেমন করে যেন এক তুড়িতে পার হয়ে গেল। হ্যা, পড়াশোনা নিয়ে অনেক ব্যস্ত ছিলাম, ব্যস্ত ছিলাম এখানে নিজেকে মানিয়ে নিতে, নিজের স্থান করে নিতে। এই প্রক্রিয়ায় নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছি কিনা সে প্রশ্ন তুমি তুলতেই পার। অসম্ভব বোকাসোকা রবীন্দ্রনাথ পাগল মেয়েটা আজকাল আর গান শুনে না, লিখে না কোন কবিতা। কি করে জিআরই দিয়ে আমেরিকা যাবে সেই চিন্তায় মশগুল থাকে দিন রাত।
আমি জানি এ তার অন্তরআত্মার চাওয়া নয়। সে চায় না দেশের মাটি ছেড়ে চকচকে প্রকাশসর্বস্ব দক্ষিনী দুনিয়ায় যেতে। তার চাওয়া পাওয়া খুব সাধারণ। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে সে আনন্দে আত্নহারা হয়--তার প্রতিটি রক্তকণা কোলাহলে মেতে উঠে, জোৎস্না রাতে নৌকায় ঘুরতে কিম্বা ভর দুপুরে গান শুনতে শুনতে শীর্ষেন্দুর বই পড়তে তার দারুন লাগে। কেন হঠাৎ করে আমার জীবনটা এমন জটিল হয়ে গেল অনিক, বলতে পার?
গত নয় বছর ধরে কত চিঠি লিখেছি তোমাকে। আজ লিখতে হাত কাঁপছে কেন? এম আই ব্রেকিং আপ উইথ ইউ? ইজ দ্যাট ইভেন পসিবল? তোমাকে ছাড়া আমি থাকব কি করে?
হ্যা মানছি, তুমি আমার কল্পনা, তোমার কোন অবয়ব নেই কিন্তু তুমি যে আমার সবটুকু জুড়ে আছ। সেই কবে কোন ছোট্টবেলা বাবা আমাকে এই চামড়ায় বাঁধানো ডাইরীটা দিয়েছিলেন। সেই থেকে এর পাতায় পাতায় তোমাকে লিখে গেছি আমার প্রতিদিনকার রোজনামচা। তোমাকে বলিনি এমন কোন ঘটনা নেই আমার এই অতি সাধারণ জীবনে। তোমাকে তিল তিল করে গড়েছি, পৃথিবীর কোন পুরুষের পক্ষেই সেই স্থান নেয়া সম্ভব নয়। কেউ তোমার ধারে কাছে আসতে পারবে না কোন দিন--তুমি আমার সোউল মেট--আমার অন্তঃকরণের কেন্দ্র!
কিন্তু জীবনের প্রয়োজনকে এড়ানো বড় কঠিন জান। বাবা-মা আমাকে বিয়ে দেবার জন্য তোড়জোড় করছেন। মায়ের আলমারির ড্রয়ারে প্রায়ই কিছু অজানা মুখের ছবি আর দুই পাতায় বন্দী তাদের জীবন বৃন্তান্তের ইতিহাস দেখা যাচ্ছে। আমি অচেনা কাউকে তোমার জায়গায় কি করে বসাব?
তুমি নিশ্চয় বলছ, সাদিকে কি করে বসাচ্ছ তাহলে?
মেনে নিচ্ছি আমার এই মিথ্যাচার। সাদির গতকাল সগর্বে ঘোষনা দিয়েছে সে আমাকে ভালবাসে, তার নিজের জীবনের থেকেও বেশি! তুমি তো জান আমি ভীষন স্বচ্ছন্দ্য ওর সাথে, আমাদের ভাবনায় অনেক মিল। এর থেকে বেশী কোথাও পাব না আমি। তোমার কথা বলেছি আমি ওকে। ও বলেছে তোমার কাছে বিদায় নিতে, নইলে আমি কোন দিন সম্পূর্ণ রূপে ওর হতে পারব না--ইমাজিনারী প্রেমিককেও মেনে নেয়া নাকি কঠিন ওর জন্য। ভালবাসা নাকি পসেসিভ হয় অনেক!!
অনিক, আমার জীবনে কেউ "তুমি" হতে পারবে না। কিন্তু শুধু তোমাকে নিয়েও আমার জীবন যাবে কিনা তাতে এই প্রথম আমার মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। নিতান্তই স্বার্থপরের মাথা হেট করে এই সিন্ধান্ত নিয়েছি।
হে আমার চিরবন্ধু চিরনির্ভর চিরশান্তি বিদায়! আমাকে ক্ষমা করে দিও। অনেক ভালবাসি তোমায়।
অনেক অনেক অনেক ভালবাসি!
তোমার,
বিভা
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মার্চ, ২০১১ দুপুর ২:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



