রিলিজ লেটার হাতে নিয়ে স্থানুর মত বসে থাকলাম। আজ রাতে ফ্লাইট। দারফুরে পোস্টিং। দুদিনের মধ্যে ওখানে রিপোর্ট করতে হবে। ইউনাইটেড নেশনের হয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার মত একজন সাধারন ইঞ্জিনিয়ারের জন্য বিশাল ব্যাপার। আর আর্থিক দিকটাও ফেলনা নয়। সেনাবাহিনীতে রীতিমত দলাদলি আছে এইসব এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া নিয়ে। কিন্তু রাইদাকে কি করে জানাবো এসব? ও মানতেই চাইবে না। সপ্তাহ দুয়েক পরে আমাদের বিয়ে! পালিয়ে যেয়ে কাজি অফিসে। বন্ধুদের বলা আছে, মোটামুটি সবকিছু প্লান করা আছে। এছাড়া উপায় যে নেই। ডাকসাইটে সেক্রেটারির মেয়েকে আমার মত অজ্ঞাতকূলশীল, ঢাকার বুকে নিজস্ব চূলা-ছাদহীন ছেলের সাথে বিয়ে দেবে না তার পরিবার, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাইদা তার বাবার মতই একরোখা, জেদি। একই গোঁ, চল বিয়ে করে ফেলি। দেখি ওরা কি করে!
এখন যদি ওকে জানাই যে আমার কালকে দেশ ছেড়ে যেতে হবে, বিয়েটা পিছিয়ে দিতে হবে বছর খানেক, ওর রিএকশ্যন ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। প্রথমেই বলবে আমি জানতাম, আমার ভাগ্য এমনই। আমি যা চাই, তা কোনদিন পাই না। তারপর বলবে তুমি আসলে চাওনি। তুমি আমাকে চাও না। আমি জোড় করে বিয়ে করতে চেয়েছি। তুমি আমাকে একটুও ভালবাসনা!
তারপর অঝোরে কাদঁবে। কোনদিন এই অভিমানী, অবুঝ মেয়েটা জানবে না, তার এক এক ফোটা চোখের জল, পৃথিবীর সবচেয়ে দামী মোতির থেকেও দামী। এত মূল্য দেবার ক্ষমতাই আমার নেই। তাই ওর চোখে জল কোনদিন দেখতে চাই না, কক্ষনো না। তবে এটা ঠিক, কাঁদলে রাইদাকে অপূর্ব সুন্দর লাগে। ফর্সা মুখটা লাল লাল হয়ে যায়, বনলতা সেনের মত মায়াবী চোখ ফুলে ফুলে আরো মায়াবী হয়ে যায়—সারা পৃথিবীর সব মায়া এসে জড় হয় ওর দুচোখে। সব যুক্তি, সব রাগ কোথায় যে গায়েব হয়ে যায়—শুধু একবুক ভালবাসা টলটল করে, হৃদয়ের নদী উপচে যায়। পাগলী একটা!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালাম। ফোনটা করতে একদম ইচ্ছে করছে না। মেয়েটার কাল রাতের উচ্ছলতা মনে পড়ে যাচ্ছে। ডায়াল করতেই একবার বাজার আগেই রাইদার চঞ্চলতা ইথারে ভেসে এল। কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কথার নির্ঝরিনী বইয়ে দিল--
“তুমি এত সকালে? তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন? তুমি ঠিক আছ তো? জান, কি হয়েছে, আম্মু আজ ভোরে আমাকে কি বলেছে? ঐ যে ছেলে পক্ষ আমাকে দেখতে এসেছিল না, ওরা নাকি বিয়ের ডেট ঠিক করতে চায়। আম্মু বল্ল তাদেরও নাকি পছন্দ। আমি হু হা করে নাস্তার টেবিল থেকে চলে আসলাম। ওরা তো জানে না কি শক ওয়েট করছে ওদের জন্য। তুমি চুপ কেন?”
“রাই-“
“আমি জানিতো তুমি কি বলবে। সেই একই কথা, একই ভাঙ্গা রেকর্ড। বাবা মার অমতে বিয়ে করে আমি সুখি হব না। তাদের বুঝিয়ে রাজি করাতে। তুমি বাবাকে চেন না। উনার কথাই আইন—পৃথিবী উলটে গেলেও উনার মত বদলাবে না।“
“রাই, একটু শুনো। জরুরী কথা আছে”
“জরুরী কথা বলবে বল, এত গম্ভীরভাবে কথা কেন বলছ? এখনি স্বামীগিরি ফলানোর চেষ্টা? মানাচ্ছে না তোমাকে--” ওর খিল খিল হাসি আমার সাজিয়ে রাখা কথাগুলোকে আবার এলোমেলো করে দিল।
“রাইদা, একটু সিরিয়াস হও।“ ওর পুরো নাম ধরে ডাকলাম বহু দিন পর। রাইদা যে আমার রাই, তাইতো ডাকি ওকে আমি! কিন্তু আজ ছেলেমানুষী নয় কোন, আজ বিষন্ন গম্ভীর একদিন। খানিক আগের গম্ভিরতাকে কাটিয়ে অনেক স্নেহে বল্লাম,
“রাই, আমার কথাগুলো শুনো। আমার দারফুরে পোস্টিং হয়েছে, আজকে রাতে আমার ফ্লাইট। আমি সরি বেইবি। আমাকে যেতেই হবে। তুমি তো জান আর্মির নিয়ম।“
অপর পাশের স্তব্ধতা এতটাই ঘন, মনে হচ্ছে যেন ছুরি দিয়ে কাটা যাবে। কি ভাবছে মেয়েটা?
“কি হল রাই কথা বলছ না কেন? প্লিজ কিছু বল। আমি এক বছর পরে আসব। একটা পজেটিভ দিক হচ্ছে, আমি ফিরে আসলে, আমাদের ফাইনান্সিয়াল প্রব্লেম থাকবে না। তোমার আব্বু আম্মুর সাথে তখন কথা বলে –“
“নিষাদ, তুমি ফাজলামী করছ আমার সাথে? একদম ভাল হবে না বলে দিলাম!“
“রাইদা—“
আমার গলার স্বরে কি ছিল জানি না। রাই আমাকে আর কিছু বলতে দিল না। চিৎকার করে বলে উঠল,
“তুমিতো যেতে পারবে না বেইবি। আমি চাই না তুমি যাও। তুমি এমন করতে পার না। তুমি যাবার পর আমার বাবা-মা আমাকে ঐ ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে। তুমি সেটা চাও?”
“রাইদা শোন—“
“না, আমি কিছু শুনতে চাই না। তুমি যেতে পারবে না, এটাই শেষ কথা। তুমি রিসাইন কর। তোমার কাছে আমি ইম্পর্টেন্ট না তোমার কেরিয়ার? তুমি বুঝতে পারছ না, আমার আরেক জায়গায় বিয়ে হয়ে যাবে। আমি সেটা ঠেকাতে পারব না। আমাকে ইমোশোনালি ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে দিয়ে দেবে। তুমি যেতে পারবে না নিষাদ। আমি বিশ্বাস করতেই পারছি না এমন হচ্ছে। বল তুমি ফাজলামি করছ। এটা হতে পারে না।”
“রাই, জান, শোন, আমাকে যেতেই হবে। তুমি তো জানো আমার উপায় নেই। আমি শপথ নিয়েছি, আমার যেতেই হবে। আমি আসি তোমাদের বাসায়? তোমার আব্বু আম্মুর সাথে কথা বলে যাই? নিশ্চ্য়ই উনারা বুঝবেন।“
“নিষাদ, ইউ হ্যাভ এবসোলিউটলি নো আইডিয়া। আমার বিয়ে হয়ে যাবে। ওহ মাই গড! তুমি শুনছ আমার কথা?”
“কিন্তু রাই, আমাকে যে যেতেই হবে, বুঝার চেষ্টা কর—“
আমি কি বলব খুঁজে পাচ্ছি না। রাইও একদম চুপ! হঠাৎ সব নিস্তব্ধতা ভেংগে দিয়ে ও বলল,
“তুমি যাবেই তাই না? তোমার সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত। আমি যাই বলি না কেন, তা বদলাবে না, তাই না? ঠিক আছে যাও। আমার এখন মনে হচ্ছে, সেটাই বোধহয় ঠিক হবে। কারন তুমি থেকে গেলেও তোমাকে আমি বিয়ে করব না। তোমার কাছে আমার অবস্থান পরিষ্কার। আমি বুঝে গেছি। কিন্তু আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু কাম সেকেন্ড। তোমার প্রায়োরিটি তোমার কাজ, আমি না। তোমার আসতে হবে না আর নিষাদ। তুমি ভাল থেক। আর বাসায় আসার চেষ্টা কর না। আমি বের হয়ে যাচ্ছি। বাই।“
রাইদার টেলিফোন নামিয়ে রাখার শব্দ মনে হয় আমাকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়াবে। কত অসংখ্যবার ডায়াল করেছি ওর নাম্বার। বাসায় দৌড়ে গেছি কিন্তু ও দেখা করেনি। কি হতাশা নিয়ে প্লেনে উঠলাম, কি শুণ্যতা বুকে নিয়ে, সেটা আমিই জানি! কেন এমন হল?
প্লেন ছেড়ে দেবার ঘোষনা এল। শেষবারের মত ট্রাই করলাম। রাইয়ের অশ্রুশিক্ত গলা শুনে মনটা গুড়িয়ে গেল একেবারে।
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ও বলল, “তোমাকে আমি কোনদিন ক্ষমা করব না। কোনদিন না! তুমি হয়তো তোমার ক্যারিয়ারে অনেক উন্নতি করবে কিন্তু কোনদিন তৃপ্তি পাবে না। এই প্রবঞ্চনার ফল তুমি পাবেই। তুমি ভাল থেক, অনেক নাম হোক তোমার, কিন্তু আমি চাই না তুমি কোনদিন সুখি হও, কারন আমার সব সুখ তুমি কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলে আজকে। আমি কি করে বেঁচে থাকব আমি জানি না। তবে আমি আম্মুকে একটু আগে বলেছি আমি বিয়েতে রাজি। আমার সাথে আর কোনদিন যোগাযোগ করার চেষ্টা কর না। আমি চাই না তোমাকে। খোদা হাফেজ।“
কখন ও লাইন কেটে দিয়েছে আমি জানি না। ফোনটা কান থেকে নামাতেও ভুলে গেছিলাম। বিমানবালা মনে করিয়ে দিলেন সেল বন্ধ করার সময় হয়ে গেছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস বুক চিড়ে উঠে এল। মনে মনে বল্লাম,
“আমি বর দিনু দেবী তুমি সুখি হবে
ভুলে যাবে সর্বগ্লানি বিপুল গৌরবে।“
----------------
আমার প্রানাধিক প্রিয় কবিতার শেষকটি লাইন—সেই কবিতাকে অধমের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা--এই অপরিনত, যুক্তি-বিবর্জিত গল্প সেই জন্য লেখা।
দেবযানীঃ ক্ষমা কোথা মনে মোর
করেছ এ নারীচিত্ত কুলিশকঠোর
হে ব্রাক্ষণ। তুমি চলে যাবে স্বর্গলোকে
সগৌরবে, আপনার কর্তব্য পুলকে
সর্ব দুঃখশোক করি দূর পরাহত;
আমার কী আছে কাজ, কী আমার ব্রত।
আমার এ প্রতিহত নিস্ফল জীবনে
কী রহিল, কিসের গৌরব? এই বনে
বসে রব নতশিরে নিঃসঙ্গ একাকী
লক্ষ্যহীনা। যে দিকেই ফিরাইব আঁখি
সহস্র স্মৃতির কাঁটা বিঁধিবে নিষ্ঠুর,
লুকায়ে বক্ষের তলে লজ্জ্বা অতি ক্রুর
বারম্বার করিবে দংশন। ধিক ধিক,
কোথা হতে এলে তুমি, নির্মম পথিক,
বসি মোর জীবনের বনচ্ছায়াতলে
দন্ড দুই অবসর কাটাবার ছলে
জীবনের সুখগুলি ফুলের মতন
ছিন্ন করে নিয়ে, মালা করেছ গ্রন্থন
একখানি সূত্র দিয়ে। যাবার বেলায়
সে মালা নিলে না গলে, পরম হেলায়
সেই সূক্ষ্ণ সূত্রখানি দুইভাগ করে
ছিড়ে দিয়ে গেলে। লুটাইল ধূলি ‘পরে
এ প্রাণের সমস্ত মহিমা! তোমা ‘পরে
এই মোর অভিশাপ-যে বিদ্যার তরে
মোরে কর অবহেলা, সে বিদ্যা তোমার
সম্পূর্ণ হবে না বশ—তুমি শুধু তার
ভারবাহী হয়ে রবে, করিবে না ভোগ
শিখাইবে, পারিবে না করিতে প্রয়োগ।
কচঃ আমি বর দিনু দেবী তুমি সুখি হবে
ভুলে যাবে সর্বগ্লানি বিপুল গৌরবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই নভেম্বর, ২০১১ রাত ৯:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


