মিয়ানমারের সমরসজ্জার উদ্দেশ্য এখনও অস্পষ্ট। সীমান্তে পরিত্যক্ত বিমানবন্দর যুদ্ধ বিমানের ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে। তৈরি করা হচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া। কেউ বলছেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গার প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে চাচ্ছে। অনেকের ধারণা, বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই মিয়ানমারের এই সমরসজ্জা।
সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে ব্যাপক সমর প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘমেয়াদি কোনো লক্ষ্য নিয়ে বেশ কয়েকটি স্থায়ী সামরিক স্থাপনা তৈরি করছে তারা। মিয়ানমারের এ সমরসজ্জার উদ্দেশ্য এখনও অস্পষ্ট। কারও কারও মতে, পরমাণু শক্তি অর্জন এবং এ সম্পর্কিত গোপন স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি করছে মিয়ানমার। আবার কেউ মনে করছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বিতর্কিত সমুদ্রসীমার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে তারা। এত বড় বড় বিষয়ের খোঁজ রাখেন না যারা, সেসব সাধারণ মানুষের বিশ্বাস বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমারে ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ করাটাই আসল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের জন্য এর কোনোটিই উপেক্ষার নয়। দেশের পূর্বাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে দিনে দিনে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।এহেন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ এমন কথাও বলেছেন যে, তিন পার্বত্য জেলা থেকে সেনাক্যাম্প তুলে নেওয়ার সরকারি চিন্তাভাবনা শুরু হওয়ার পর্যায়ে মিয়ানমারের সমর প্রস্তুতির কথা ফলাও করে প্রচারের চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের অনেকেই এ প্রচারণাকে উদ্দেশ্যমূলক বলে মনে করেন। তাদের মতে, মিয়ানমারের এই সমর প্রস্তুতি কয়েক বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে।
কিন্তু তারা জানে মিয়ানমারের সমর প্রস্তুতির মুখে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা নিশ্ছিদ্র করতে হলে স্থানীয় জনসমর্থন সুসংহত করাকেই প্রথম কাজ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দেশের সমর বিশ্লেষকরা পাহাড়ি-বাঙালি মতপার্থক্যের পরিবেশকে দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করছেন। মতপার্থক্য নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে নিজেদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করেছে মহলটি। তাদের নিয়ত চেষ্টার কারণেই বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ এতদিন আশ্চর্যজনক নীরবতা পালন করেছে।
বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ থাকলেও বিষয়টিকে বরাবরই রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের তৎপরতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের সামরিক প্রস্তুতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন বিষয়টিকে আর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার পর্যায়ে নেই। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের শাহপরীর দ্বীপ থেকে শুরু করে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ, উখিয়া, রামু এবং বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি কিংবা সমতলের সীমান্ত নির্বিশেষে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়ার কাজ বেশ কিছুদিন আগে থেকেই শুরু করেছে মিয়ানমার সরকার। আগামী অক্টোবরের মধ্যে ১২ ফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়া তৈরির কাজ শেষ করতে চায় মিয়ানমার সরকার। তবে পাহাড়ি এলাকায় কাজ শেষ করতে কয়েক মাস ছাড় দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। প্রথমে সবাই ভেবেছিল রোহিঙ্গাদের যে বিশাল অংশ বাংলাদেশে চলে গেছে তাদের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতেই এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সে বিভ্রান্তি কেটে গেছে।
সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকার যারা এসব খোঁজ-খবর রাখেন তাদের ধারণা, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমারের যে বিরোধ রয়েছে তার সমাধানে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেই মিয়ানমার এত আয়োজন করছে। বিরোধপূর্ণ এলাকা থেকে সামরিক ছত্রছায়ায় সমুদ্রতলের তেল-গ্যাস তুলে নিতেই এসব প্রস্তুতি।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড সম্প্রতি সপক্ষ ত্যাগ করে অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের দুই সামরিক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এক সংবাদ প্রকাশ করেছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোয়ে জো জানিয়েছেন, বিদেশে গোপনে প্রশিক্ষণ পাওয়া সৈনিক ও কর্মকর্তাদের নিয়ে সেনাবাহিনীতে গড়ে তোলা হয়েছে নিউক্লিয়ার ব্যাটালিয়ন। এর কার্যক্রম চলছে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের সেতক্ষ পাহাড়ে। নোং লেইং পাহাড়ি এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে পরমাণু কমপ্লেক্স। মিয়ানমারের গোপন পারমাণবিক চুক্তি ও প্লুটোনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পে সহায়তা করছে উত্তর কোরিয়া। দক্ষিণ মিয়ানমার হয়ে নৌপথে অতি গোপনে পারমাণবিক সরঞ্জাম আনা হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার একটি রহস্যজনক জাহাজ জুলাই মাসের প্রথমদিকে অজ্ঞাত বন্দরের উদ্দেশে ভারত মহাসাগরের দিকে যাত্রা করে। একপর্যায়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সেটি অনুসরণ করতে থাকায় জাহাজটি পাঁচদিন পর আচমকা দিক পরিবর্তন করে উত্তর কোরিয়ার পথে ফিরতি যাত্রা করে। এ ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার সংবাদপত্রে প্রকাশ পাওয়া আগের তথ্যটির সমর্থন মিলেছে। রহস্যজনক জাহাজটি মিয়ানমারের জন্য পারমাণবিক সরঞ্জাম বহন করছিল বলেই ধারণা করা হয়।
মিয়ানমারের অনেকেই এখন মনে করেন ভূগর্ভে পারমাণবিক বিস্ফোরণ কিংবা বিকল্প পরমাণবিক স্থাপনা তৈরি হচ্ছে এই রেঞ্জে। আর এ জন্যই এর আশপাশের ২৬টি গ্রামের মানুষকে আশ্রয়হীন করা হয়েছে। এদের অনেকেই এখন বাংলাদেশে। মিয়ানমারের পারমাণবিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই বাংলাদেশের পাশে মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটে প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে তোলা হচ্ছে বলে সে দেশের সচেতন অংশ ধারণা করছে।
তথ্যসূত্রঃ সমকাল

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



