বাংলাদেশে ক্ষমতা স্পষ্টত দুইটা ভাগে বিভক্ত।এই বিভক্তিতে বিরোধিতার সম্পর্কে সাম্প্রদায়িকতার পর্যায়ও আমলে নেয়ার মতো।এক পক্ষ বেশি ক্ষমতা ফলানোর সুযোগ পেলে আরেক পক্ষের উপর হিংস্রভাবে ঝাপিয়ে পড়তে পিছপা হন না।
এই বিষয়ে একটু পরেই বুঝিয়ে বলবো। তার আগে গুরুত্বপূর্ণ খবরটা বলি। আমরা সবাই জানি আজ সুপ্রীম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম মেম্বার (সভাপতি মন্ডলীর সদস্য) ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরের সংসদ সদস্য পদ খারিজ হয়ে গেছে।এইটা রাজনৈতিক ভাবে অনেক বড় খবর হয়তো। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্শ্বিব্যাংকের ছাতার ছায়ায় ফুলে-ফেপে ওঠা সুশীল ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার শিক্ষাটা পেয়ে গেলেন ড. মহিউদ্দিন।
তার এই পরিণতি বরণের ওছিলায় আমাদের বুঝে নেয়া দরকার বাংলাদেশে উদগ্র প্রকাশের জায়গা থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে যতোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হোক না কেন আসলে সুশীল ক্ষমতার জোরই বেশি।
এই ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য আমরা পাঠককে কিছু ঘটনার দিকে নিয়ে যেতে চাই-
১. ড. মহিউদ্দিনের দম্ভ ও সুশীলদের প্যাদানী খাওয়া
সবাই খেয়াল করলে মনে করতে পারবেন ড. ,মহিউদ্দিন খান আলমগীর হচ্ছেন বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যকার সেই আমলাতান্ত্রিক প্রতিনিধি যারা চাকরিসূত্রেই বাংলাদেশকে নিজেদের পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করেন।তারা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের মধ্যকার সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ মনে করেন। একারণে তারা প্রয়োজন মনে করলে সরকারকেও উলটপালট করে দিতে পারেন( ৯৬ সালে বিএনপি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আমলাদের জনতার মঞ্চ বিদ্রোহের কথা স্মরণীয়)।
তো এই মহিউদ্দিন সাহেবের বিরুদ্ধে দুদক দুর্নীতির মামলা দায়ের করেছিলেন। এই মামলা দায়েরের ফলে তিনি বেশ আহত হন। কারণ আমলা-মানসে দুদকের এই কর্মকান্ড অত্যন্ত যন্ত্রণার কারণ হয়েছিল। যে কারণে দেখা গেল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি না কোন দলীয় সিদ্ধান্ত, না কোন সরকারী সিদ্ধান্তের আলোকে, ঝাপিয়ে পড়লেন দুদকের বিরুদ্ধে।বলে রাখা দরকার যেহেতু ড. মহিউদ্দিন পাকিস্তান আমলের আমলা সেহেতু তার কাছে রাজনীতির গতি-প্রকৃতি ও ক্ষমতার লেনদেন কোন ব্যাপারই না।তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে দুদককে ফুটবলের মতো কইষ্যা লাথি দিতে লাগলেন।
সর্বশেষ গত ৩ মে ঘটান বিশাল আত্মঘাতী কান্ড। সেটি হচ্ছে-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের মতো দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রয়োজন নেই। ওই সময় তারা সংবিধান লঙ্ঘন করে গোষ্ঠীস্বার্থে বিশেষ মহলের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেছে। দুদক আইন সংশোধন ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুদককে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিলে সেনাপ্রধানও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চাইবেন। তাই তত্ত্বাবধায়ক আমলের মতো ক্ষমতার অপব্যবহারকারী দুদকের প্রয়োজন নেই।
তার এই বক্তব্যকে একজন সৎ রাজনীতিকের সততার পক্ষে অবস্থান বলে অনেকে মনে করতে পারেন।কিন্তু ড. মহিউদ্দিন দুদকের বিরুদ্ধে একদিকে যেমন ক্ষেপেছেন আতে ঘা লাগায়, আরেক দিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার উপর সুশীল ক্ষমতার দাপট (জরুরি সময়ে আসলে ক্ষমতাসীন তো ছিল সুশীলরাই) তাই তিনি এভাবে ক্ষেপলেন।এমনকি তিনি বাংলার সুশীল কুল শিরোমনি ড. মোজাফফরের উপরও এক হাত নিছেন ওই দিন। এবং ফলাফলে দেখা গেল সরকারও দুদকের বিধি-ক্ষমতা সংশোধন করে ওইটারে ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করা হয়ে গেল।এর মাধ্যমে মূলত শেখ হাসিনাও দেখালেন তার সরকার রাজনৈতিক ক্ষমতাকে সুশীল ক্ষমতার উর্ধ্বে স্থান দেয়।
২. সুশীলরা যেভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে
ড. মহিউদ্দিন দুদককে এভাবে নাঙ্গা করার পর ও সরকার দুদককে ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করার পর অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন এ দেশে সুশীলদের উত্থানের অন্যতম হাতিয়ার দুর্নীতির প্রসঙ্গটা বুঝি আড়ালে চলে যাচ্ছে।কিন্তু আমরা যারা জানি দেশে দেশে সুশীল সমাজকে গড়ে তুলেছে বিশ্বব্যাংক। তারা বিশ্বাস করতাম স্রষ্টা বিশ্বব্যাংক সৃষ্টি সুশীল সমাজকে রক্ষা করতে নিশ্চয় রাজনৈতিক ক্ষমতার 'দুষ্টু লোকদের' জব্দ করবেই করবে। তো সেই ঘটনা বিশ্বব্যাংক ঘটালো আদালতের মাধ্যমে।এই ব্যাপারটা।
আজ আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত রায় দিয়ে জানিয়ে দিলো বেচারার সংসদ সদস্য পদ খারিজ।।এই রায়ের সার কথা হচ্ছে বেচারা মহিউদ্দিনের আসনে আবারো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।যা প্রকারন্তরে শেখ হাসিনার জন্য একটি প্রচন্ড আঘাতও বটে।
এখন আমাদের জন্য এলেমটা হচ্ছে কিভাবে এই ঘটনা ঘটলো তার মাজেজা অনুসন্ধানে।
সেইটা হচ্ছে-দুদক যেমন বিশ্বব্যাংকের একটা প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় গঠিত হয়েছিলো, তেমনি স্বাধীন বিচার বিভাগও বিশ্বব্যাংকের একটা প্রকল্পেরই অন্তর্গত।
দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের যোগান দেয় বিশ্বব্যাংক। তেমনি আদালতের বিচারপতিদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাও দেয়া হয় বিশ্বব্যাংকের অনুদান থেকে।এই বিষয়টা প্রকাশ্য নয়। তবে এটা আকেলমান্দরা জানেন, দুদকের প্রতিমাসের রিপোর্টই বিশ্বব্যাংকের কাছে জমা দিতে হয়। তেমনি প্রধান বিচারপতির দপ্তর থেকেও বিশ্বব্যাংকে এই বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে হয়।সরকার বাজাটে দেখায় না তারা দুদক ও বিচার বিভাগের বেতন-ভাতা কোথা থেকে যোগান দেয়।কিন্তু সত্য হচ্ছে এ দুটি বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প থেকেই অর্থের যোগান দেয়া হয়।
তাই এই সম্পর্ক আমাদের ভেবে দেখতে হবে যে, বিশ্বব্যাংকের এক প্রকল্প দুদক যখন ব্যর্থ হয়, তখন নিশ্চয় আরেক প্রকল্প স্বাধীন বিচার বিভাগ বিশ্বব্যাংকের মান-ইজ্জত রক্ষার জন্য এগিয়ে আসবেই
৩.আমরা যে ভাবে সুশীল ও রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই দেখলাম
ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ার ষোল কলা পূরণ করে আদালত যে রায় দিয়েছে এই রায় নিশ্চয় বাংলাদেশের আদালতের জন্য এক বিশাল খারাপ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।মূলত সাজা প্রাপ্ত হওয়ায় তাকে নির্বাচন কমিশন তাকে প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল।
তাই নির্বাচন কমিশনের এই প্রার্থীতা বাতিলের সিদ্ধান্তের পেছনে মূলতঃ কাজ করেছে তার সাজা প্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা দায়ী।এর উপর ভিত্তি করে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ড. মহিউদ্দিন হাইকোর্টে রীট আবেদন জানালে সেখানে তার আবেদন খারিজ করে নির্বাচন কমশিনের সিদ্ধান্তকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চেম্বার জজের কাছে নালিশ করলে হাইকোর্টের রায় স্থগিত হয়ে যায়।গতকাল আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ চেম্বার জজের সিদ্ধান্ত বাতিল করে হাইকোর্টের রায়ই বহাল রাখে।
কিন্তু পাঠকবৃন্দ আমি যে দাবি করছি এই ঘটনা ঘটেছে মূলত দুদককে কেন্দ্র করে সেইটার প্রমাণ কি?
এবার তাহলে শুনুন ঘটনা কোথায় ঘটেছে।যেই মামলার সাজার ভিত্তিতে আপীল বিভাগ ড. মহিউদ্দিনকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে অযোগ্য ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখলো, সেই সাজা বাতিলের ব্যাপারে এই আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চই গত ৪ জুলাই এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সিদ্ধান্তে জানানো হয়েছে ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরের বিরুদ্ধে দুনর্ীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলা হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছে আপীল বিভাগ। রবিবার প্রধান বিচারপতি ফজলুল করিমের নেতৃত্বে আপীল বিভাগের ছয় সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ দুদকের দায়ের করা আপীল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে।উলেস্নখ্য, ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব গোপন করার অভিযোগে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করে দুদক। এ মামলায় সংসদ ভবন সংলগ্ন বিশেষ জজ আদালত-৩ মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে ১৩ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই সাথে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে। এ রায় বাতিলের জন্য মহিউদ্দিন খান আলমগীর হাইকোর্টে আবেদন করেন। হাইকোর্ট গত ১৩ আগস্ট ২০০৯ তারিখে মামলাটি বাতিল করে রায় দেয়। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে দুদক আপীল করলে রবিবার সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ শুনানি শেষে আপীল খারিজ করে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখে। মামলায় মহিউদ্দিন খান আলমগীরের পক্ষে ব্যারিস্টার রফিকুল হক, দুদকের পক্ষে এ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম খান এবং এ্যাডভোকেট আবদুল আজিজ খান উপস্থিত ছিলেন। মহিউদ্দিন খান আলমগীরের আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এ মামলার সেনশন যথাযথ ছিল না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুদকের চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধুরী রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করতে এসব মামলা দায়ের করিয়েছেন। এসব মামলা সুনির্দিষ্ট আইন মেনে দায়ের করা হয়নি। দুদক এসব মামলা করে শুধু দেশের অর্থ অপচয় করছে।
তাহলে ঘটনা কী দাড়ালো যেই মামলার ভিত্তিতে ড. মহিউদ্দিন সাজাপ্রাপ্ত, সেই মামলা বাতিল হওয়ায় সাজাও বাতিল হয়ে গেলো। যার ফলে নির্বাচন কমিশন তাকে অযোগ্য ঘোষণা করার সিদ্ধান্তও বাতিল হয়ে যায়।আপীল বিভাগের গত ৪ জুলাইয়ের রায়ের ফলাফলে এটাই তো মর্ম বেদনা।অথচ এই রায়ের পর আপীল বিভাগের সেই পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চই আবার বাতিল মামলার বাতিল সাজার ভিত্তিতে তার সংসদ সদস্য পদ খারিজ করারও বন্দোবস্ত করে বসলো।
এই ঘটনা আদাল মাত্র ১১ দিনের মাথায় এমনি এমনি ঘটিয়ে দিলো।এটা বললেই বিশ্বাসযোগ্য হবে।নাকি বুক পকেটে গোপণ অভিলাষের বসবাস?
তাহলে আমরা কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হবো?
নিশ্চয় বলা যায়-বাংলাদেশে ১/১১'র মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা যে সুশীল ক্ষমতার অধীনে গেছে এ নিয়ে আর কোন সন্দেহ নাই।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ৩:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



