বন্ধুর জন্য বিজ্ঞাপন
মহাদেব সাহা
আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম যে আমার
পিতৃশোক ভাগ করে নেবে, নেবে
আমার ফুসফুস থেকে দূষিত বাতাস;
বেড়ে গেলে শহরময় শীতের প্রকোপ
তার মুখ মনে হবে সবুজ চায়ের প্যাকেট, এখানে
ওখানে দেখা দিলে সংক্রামক রোগ,
ক্ষয়কাশ উইয়ে-খাওয়া কারেন্সি নোটের মতো আমার ফুসফুসটিকে
তীক্ষ্ণ দাঁতে ছিদ্র করে দিলে, সন্দেহজনকভাবে পুলিশ ঘুরলে
পিছে, ডবল ডেকার থেকে সে আমাকে
ফেলে দেবে কোমল ব্যান্ডেজ, সে আমাকে ফেলে দেবে
ট্রান্সপারেন্ট জাদুর রুমাল, আমি যাবো পাখি হয়ে পুলিশ-স্কোয়াড
থেকে
জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে বলবো -
আমি প্রেমিকার পলাতক গুপ্তচর;
সে এসে অন্ধকারে চতুর চোরের মতো
আমার পকেট থেকে নেবে সব স্থলপদ্মগুলি
বলবে কানের কাছে চুপিচুপি অসম্ভব বদমাশ সে,
- চল ঘুরে আসি রাতের শো থেকে
তারপর নিয়ে যাবে ক্রমাগত ভুল ঠিকানায়
তবু সেই ভীষণ বদমাশটা আমার সমস্ত ভুল ভাগ করে নেবে,
ওর সমস্ত পাপ লিখে যাবে আমার ডায়েরিতে
আমার পাপ হাতে নিয়ে ধর্মযাজকের মতো অহঙ্কারে ঢুকবে গির্জায়
আমি এই ঢাকা শহরের সর্বত্র, প্রেসক্লাবে, রোস্তোরাঁয়, ঘোড়দৌড়ের
মাঠে এমন একজন বন্ধু খুঁজে বেড়াই যাকে আমি
মৃত্যুর প্রাক্কালে উইল করে যাবো এইসব অবৈধ সম্পত্তি, কুৎসা
আমার লাম্পট্য, পরিবর্তে সে আমার চিরদিন যোগাবে ঘুমের ওষুধ
আমার অপরাধের ছুরি রেখে দেবে তার বুকের তলায়, আমার
পিতার কাছে
চিঠি দেবে এই বলে - ওর কথা ভাববেন না, ও বড়ো ভালো ছেলে
নিয়মিত অফিস করে দশটা পাঁচটা; অথচ সে জানবে আমার
সব বদঅভ্যাস, স্বভাবের যাবতীয় দোষ
তবু সে যাবে আমার সাথে ক্যামেরায় ফিল্ম ভর্তি করে
নিয়ে আত্মহত্যাকারী এক যুবকের ছবি তুলে নিতে, অবশেষে
মফস্বল শহরগামী কোনো এক ট্রেনে চড়ে নেমে যাবে
আমার সাথে ভুল ইস্টিশনে;
এখানে ওখানে সর্বত্র আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম
যে আমাকে নিয়ে যাবে সুন্দরবনে হরিণ শিকারে, হরিণের শিং থেকে
তার স্বচ্ছ খুর থেকে খুঁটে নেবে দামী অংশগুলি যেন ও গাভীর
খুর থেকে বানাবে বোতাম, সে
আমাকে প্রতিদিন ধার দেবে লোভ, এখানে
সেখানে শহরের পরিচিত অঞ্চলগুলিতে আমি সেই সরল সাঙাতটিকে
খুঁজি, আমি শুধু সারাজীবন একটি বন্ধুর জন্য প্রত্যহ বিজ্ঞাপন দিই
কিন্তু হায়, আমার ব্লাডগ্রুপের সাথে
কারো রক্ত মেলে না কখনো।
----------------------------------------------------------------------
....................................................................................
শাসকের প্রতি – জয় গোস্বামী
আপনি যা বলবেন আমি ঠিক তা-ই করব, তা-ই শুনব, তা-ই খাব,
তা-ই গায়ে পরে মাঠে চলে যাব।
আমি নিজের জমি ছেড়ে দিয়ে চলে যাব
কথাটি না-বলে।
বলবেন গলায় দড়ি দিয়ে
ঝুলে থাকো সারারাত। তা-ই থাকব। শুধু
পরদিন যখন বলবেন, এইবার নেমে এসো
তখন কিন্তু লোক লাগবে আমাকে নামাতে
একা একা নামতে পারব না।
এটুকু পরিনি বলে অপরাধ নেবেন না যেন!
------------------------------------------------------------------------
আমি সম্ভবত খুব ছোট কিছুর জন্য
– হুমায়ুন আজাদ
আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য মারা যাবো
ছোট ঘাসফুলের জন্যে
একটি টলোমলো শিশিরবিন্দুর জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো চৈত্রের বাতাসে
উড়ে যাওয়া একটি পাঁপড়ির জন্যে
একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে
আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
দোয়েলের শিসের জন্যে
শিশুর গালের একটি টোলের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো চোখের মণিতে
গেঁথে থাকা একবিন্দু অশ্রুর জন্যে
একফোঁটা রৌদ্রের জন্যে
আমি সম্ভবতখুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
এক কণা জ্যোৎস্নার জন্যে
এক টুকরো মেঘের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো টাওয়ারের একুশ তলায়
হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজাপতির জন্যে
এক ফোঁটা সবুজের জন্যে
আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্যে
খুব ছোট দুঃখের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে
একটি ছোটো দীর্ঘশ্বাসের জন্যে
একফোঁটা সৌন্দর্যের জন্যে।
-------------------------------------------------------------------------
সুনীলে'র বরুণাঃ কবিতা--পদ্ম
কোন এক ঝড়ো সন্ধ্যায় জড়িয়ে ধরে বরুনা বললো,
“নাও ধর, যেদিন আমাকে তুমি ভালবাসবে
সেদিন এই সাপটাও ফুল হয়ে আমার কথা কবে”
বরুণা বললো, বিশ্বাস কর, সাপটা একটুও কামড়াবে না,
সাপটা বড় হবে, ফণা তোলবে,
সাপে সাপে খেলা হবে,
কিন্তু কামড় দিবে না।
কোন এক লক্ষী পুর্ণিমার রাতে
পূজার প্রতিমার সামনে দাড়িয়ে মা বলেছিলেন,
“বাবা, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর”
বরুনার ক্ষেত্রে আমি মায়ের কথাটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলাম।
আমি তর্কে যাইনি,
আমি বিশ্বাস করলাম,
বরুনার হাতে রাখলাম হাত,
যাত্রা শুরু করলাম সর্পিল পথে।
আমি হাটি, সাপ হাটে,
আমি ঘুমালেও সাপটা হাটে,
থেমে থাকেনি কখনো।
গতি ছিল তার, কখনো মন্থর, কখনো দূর্বার,
নিয়ে নিলো দখল যা ছিল আমার
অতুল অনন্ত অপার।
বর্ণীল আগ্রহে শুরু হল অনিমেষ ভালবাসার শ্লোগান
আজ সাপের গায়ে আমার গায়ের সুতীব্র গন্ধ।
বরুনা, সাপটা একেবারেই কামড়ায়নি…ঠিক যেমনটি তুমি বলেছিলে…।
অতঃপর, কোন এক অমাবস্যা রাতে যখন ফুলের প্রত্যাশায় আমি উজ্জীবিত
ঠিক তখনি--
দিয়েছে ছোবল আমার এতদিনের পোষা কাল নাগিণী।
বরুনা, কোথায় সে ফুল? কোথায় তুমি???
সাপের ছোবলে করলে নীলাভ আমার ভালবাসার পুণ্যভুমি !!!!
বরুনা? তবে তোমাকে ভালবাসাই কি আমার হলো পাপ?
নয়তো কেন ভালবাসাকে বানালে বিষাক্ত কাল সাপ?
------------------------------------------------------------------------
সব কথা তোমাকে জানাবো ভেবেছিলাম
তারাপদ রায়
সব কথা তোমাকে জানাবো ভেবেছিলাম
কিনে এনেছিলাম আকাশী রঙের বিলিতি হাওয়াই চিঠি
সে চিঠির অক্ষরে অক্ষরে লেখা যেত
কেন তোমাকে এখনো চিঠি লেখার কথা ভাবি
লেখা যেত
আমাদের উঠোনে কামিনী ফুলগাছে
এবার বর্ষায় ফুলের ছড়াছড়ি
তুমি আরেকটু কাছে থাকলেই
বৃষ্টিভেজা বাতাসে সে সৌরভ তোমার কাছে পৌঁছতো
আর তোমার উপহার দেওয়া সেই স্বচ্ছন্দ বেড়ালছানা
এখন এক মাথামোটা অতিকায় হুলো
সারা রাত তার হুঙ্কারে পাড়ার লোকেরা অস্থির।
তোমাকে জানানো যেত,
এবছর কলকাতায় গ্রীষ্ম বড় দীর্ঘ ছিল
এখন পর্যন্ত বর্ষার হাবভাবও খুব সুবিধের নয়।
এদিকে কয়েকমাস আগে
নিউ মার্কেট আর্দ্ধেকের বেশী পুড়ে ছাই।
আর দুনম্বর হাওড়া ব্রীজ শেষ হওয়ার আগেই
যেকোনো দুনম্বরি জিনিসের মত ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে।
এদিকে এর মধ্যে আবার নির্বাচন এসে গেল,
অথচ কে যে কোন দলে, কার পক্ষে তা আজও জানা গেলনা।
কিন্তু এসব তোমাকে কেন জানাবো?
এসব খবরে তোমার এখন কোনো প্রয়োজন নেই।
অথচ এর থেকেও কি যেন তোমাকে জানানোর ছিল,
কিছু একটা আছে, কিন্তু সেটা যে ঠিক কি
পরিষ্কার করে আমি নিজেও বুঝতে পারছিনা।
টেবিলের একপাশে কাঁচের কাগজচাপার নীচে
ধুলোয়, বাতাসে বিবর্ণ হয়ে আসছে হাওয়াই চিঠি।
তার গায়ে ডাকের ছাপের চেয়ে একটু বড়,
অসতর্ক চায়ের পেয়ালার গোল ছাপ,
পাখার হাওয়ায় সারাদিন, সারারাত ফড় ফড় করে ডানা ঝাপটায়
সেই ঠিকানাবিহীন রঙিন ফাঁকা চিঠি।
অথচ তোমার কাছে
তার উড়ে যাওয়ার কথা ছিল।
-------------------------------------------------------------------------
প্রত্যাবর্তনের লজ্জা / আল মাহমুদ
...
শেষ ট্রেন ধরবো বলে এক রকম ছুটতে ছুটতে স্টেশনে পৌঁছে দেখি
নীলবর্ণ আলোর সংকেত। হতাশার মতোন হঠাৎ
দারুণ হুইসেল দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
যাদের সাথে শহরে যাবার কথা ছিল তাদের উৎকণ্ঠিত মুখ
জানালায় উবুড় হয়ে আমাকে দেখছে। হাত নেড়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
আসার সময় আব্বা তাড়া দিয়েছিলেন, গোছাতে গোছাতেই
তোর সময় বয়ে যাবে, তুই আবার গাড়ি পাবি।
আম্মা বলছিলেন, আজ রাত না হয় বই নিয়েই বসে থাক
কত রাত তো অমনি থাকিস।
আমার ঘুম পেলো। এক নিঃস্বপ্ন নিদ্রায় আমি
নিহত হয়ে থাকলাম।
অথচ জাহানারা কোনদিন ট্রেন ফেল করে না। ফরহাদ
আধ ঘণ্টা আগেই স্টেশনে পৌঁছে যায়। লাইলী
মালপত্র তুলে দিয়ে আগেই চাকরকে টিকিট কিনতে পাঠায়। নাহার
কোথাও যাওয়ার কথা থাকলে আনন্দে ভাত পর্যন্ত খেতে পারে না।
আর আমি এঁদের ভাই
সাত মাইল হেঁটে শেষ রাতের গাড়ি হারিয়ে
এক অখ্যাত স্টেশনে কুয়াশায় কাঁপছি।
কুয়াশার শাদা পর্দা দোলাতে দোলাতে আবার আমি ঘরে ফিরবো।
শিশিরে আমার পাজামা ভিজে যাবে। চোখের পাতায়
শীতের বিন্দু জমতে জমতে নির্লজ্জের মতোন হঠাৎ
লাল সূর্য উঠে আসবে। পরাজিতের মতো আমার মুখের উপর রোদ
নামলে, সামনে দেখবো পরিচিত নদী। ছড়ানো ছিটানো
ঘরবাড়ি, গ্রাম। জলার দিকে বকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। তারপর
দারুণ ভয়ের মতো ভেসে উঠবে আমাদের আটচালা।
কলার ছোট বাগান।
দীর্ঘ পাতাগুলো না না করে কাঁপছে। বৈঠকখানা থেকে আব্বা
একবার আমাকে দেখে নিয়ে মুখ নিচু করে পড়তে থাকবেন,
ফাবি আইয়ে আলা ই-রাব্বিকুমা তুকাজ্বিবান ...।
বাসি বাসন হাতে আম্মা আমাকে দেখে হেসে ফেলবেন।
ভালোই হলো তোর ফিরে আসা। তুই না থাকলে
ঘরবাড়ি একেবারে কেমন শূন্য হয়ে যায়। হাত মুখ
ধুয়ে আয়। নাস্তা পাঠাই।
আর আমি মাকে জড়িয়ে ধরে আমার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে
ঘষে ঘষে
তুলে ফেলবো।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



