এম এন লারমার স্মারক বক্তৃতা-২ আদিবাসীদের ভূমি অধিকারসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতি কেন জরুরি : মঙ্গল কুমার চাকমা ও রোবায়েত ফেরদৌস
আদিবাসীদের ভূমি অধিকারসহ
সাংবিধানিক স্বীকৃতি কেন জরুরি
মঙ্গল কুমার চাকমা ও রোবায়েত ফেরদৌস
সাবেক সাংসদ ও জুম্ম জনগণের জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ২৬তম মৃতুবার্ষিকী আজ। সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালে ১৯৮৩ সালে ১০ নভেম্বর চার কুচক্রী গিরি (ভবতোষ দেওয়ান) প্রকাশ (প্রীতি কুমার চাকমা) দেবেন (দেবজ্যোতি চাকমা) পলাশ (ত্রিভঙ্গিল দেওয়ান)Ñএর এক বিশ্বাসঘাতকতামূলক অতর্কিত হামলায় তিনি নৃশংসভাবে শাহদাৎ বরণ করেন। চার কুচক্রী এম এন লারমাকে প্রাণে হত্যা করলেও তাঁর দর্শন ও বিপ্লবী চেতনাকে নিঃশেষ করে দিতে পারেনি। ইতিহাস প্রমাণ করেছে শহীদ এম এন লারমা জীবন্ত এম এন লারমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি দুর্বার।
গত বছরের মতো এ বছরও ঢাকায় জাতীয় কমিটির উদ্যোগে এম এন লারমার ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হতে যাচ্ছে। এম এন লারমার ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এ বছর মৃত্যুবার্ষিকীর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছে ‘আদিবাসীদের ভূমি অধিকারসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতি’।
এম এন লারমার সংগ্রামের অন্যতম অংশ ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও দেশের শোষিত-বঞ্চিত গণমানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। দ্রুত অবলুপ্তির অভিমুখে ধাবমান জুম্ম জাতিগোষ্ঠীকে জাতীয় চেতনায় জাগরিত করে যেভাবে তিনি জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তা মুক্তিকামী সংগ্রামী গণমানুষের কাছে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তিনি শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক সীমানার সংকীর্ণ পরিসরে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের পাশাপাশি দেশের শোষিত-বঞ্চিত কৃষক-শ্রমিক-মাঝিমাল্লা-কামার-কুমার-জেলে-তাঁতীদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি সর্বদা সোচ্চার ও প্রতিবাদী ছিলেন।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে তাঁর ছিল অনেক স্বপ্ন ও গভীর ভাবনা। তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় তাঁর সেই স্বপ্ন বারে বারে উচ্চারণ করেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল যে, দেশের সংবিধান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের আপামর জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করবে এবং সকল প্রকারের জাতিগতÑশ্রেণীগত নিপীড়ন, শোষণÑবঞ্চনার অবসান ঘটাবে। তাঁর বুকভরা আশা ছিল, সংবিধানে জাতিÑশ্রেণী নির্বিশেষে সকলেরই অধিকার সংরক্ষিত হবে এবং ঔপনিবেশিক অপশাসনের সকল কালাকানুন ও দমনপীড়নের চির অবসান হবে।
তিনি সংসদের ভেতরে ও বাইরে বরাবরই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও স্বায়ত্তশাসন আদায়ে ছিলেন সদা সোচ্চার। পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসন কাঠামো এবং জুম্ম জনগণের স্বতন্ত্র জাতীয়সত্তা ও বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষাপটে সংবিধানে সংবিধি ব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য তিনি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির নিকট স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে ধরেন। তিনি ১৬ সদস্যের এক জুম্ম প্রতিনিধিদল নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও দেখা করেন। এছাড়া তিনি ২ নভেম্বর ১৯৭২ সংবিধান বিলে ‘৪৭ক’ নামে নতুন অনুচ্ছেদের সংযোজনী প্রস্তাব এনে স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেন। উক্ত সংযোজনী অনুচ্ছেদে তিনি প্রস্তাব করেন যেÑ
‘৪৭ক। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি উপজাতীয় অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্য উক্ত অঞ্চল একটি উপজাতীয় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হইবে।’
এই প্রস্তাবের পক্ষে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি সেদিন গণপরিষদে ঐতিহাসিক যুক্তি তুলে ধরেন। সেসময় গণপরিষদে একমাত্র তিনিই ছিলেন নির্দলীয় ও অ-আওয়ামী লীগ সদস্য। তবু কোনোরূপ ভয়ভীতিকে তোয়াক্কা না করে অকুতোভয় চিত্তে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেনÑ
‘মাননীয় স্পিকার সাহেব, পার্বত্য চট্টগ্রামে আমরা দশটি ছোট ছোট জাতি বাস করি। চাকমা, মগ (মারমা), ত্রিপুরা, লুসাই, বোম, পাংখো, খুমি, খিয়াং, মুরং ও চাকÑএই দশটি ছোট ছোট জাতি সবাই মিলে আমরা নিজেদেরকে ‘পাহাড়ী’ বা ‘জুম্ম’ জাতি বলি। ...বৃটিশ বাংলাদেশকে শাসনের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দ-এ ‘চিটাগং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন’-এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক সবকিছু দেখাশুনার ভার বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেয়। ...১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে ভারত শাসন আইনে আবার পার্বত্য চট্টগ্রামকে ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের ‘চিটাগং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন’ দ্বারা পরিচালনা করার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তারপর বৃটিশ ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে পুনর্বার পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঐ রেগুলেশনের দ্বারা শাসন করার স্বীকৃতি প্রদান করে। তারপর পাকিস্তানের সময়ও ১৯৫৬ সাল পর্যন্তÑপ্রথম সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্তÑসেই ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন দ্বারাই পরিচালনা করা হয়। তারপর ১৯৫৬ সালের প্রথম সংবিধান এবং স্বৈরাচারী আইয়ুবের ১৯৬২ সালের সংবিধানেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঐ রেগুলেশনের দ্বারা শাসিত এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।...’
কিন্তু সেদিন এম এন লারমার কোনো যুক্তি বা ঐতিহাসিক ভিত্তি কোনোটাই তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর মনে দোলা দিতে পারেনি। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর উগ্র জাতীয়তাবাদী দাম্ভিকতায় জুম্ম জনগণের সকল ন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়। কিন্তু দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ, সকল জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার সুনিশ্চিত করা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনসহ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি সময়ের দাবিতে বর্তমানে আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।
১৯৯৭ সালে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১নং ধারায় বিধান করা হয়েছে যে, ‘উভয় পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসাবে বিবেচনা করিয়া এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছেন।’ এই অঞ্চলের আদিবাসী জুম্ম(উপজাতি) অধ্যুষিত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অন্যতম জরুরি বিষয় হচ্ছে এসব জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা।
গেলো ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। আশাব্যঞ্জক যে, বিগত নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিনবদলের সনদ’-এ অঙ্গীকার করা হয়েছে যেÑ
‘১৮.১ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, আদিবাসী ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চির অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম, মানমর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনি অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের জন্য চাকরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
১৮.২ পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অনগ্রসর অঞ্চলসমূহের উন্নয়নে বর্ধিত উদ্যোগ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী ও অন্যান্য স¤প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।’
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উক্ত নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে আদিবাসীদের ভূমি অধিকারসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি সময়ের দাবিতে আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আরো উল্লেখ্য যে, স¤প্রতি সরকারের তরফ থেকে সংবিধান সংশোধন বা কখনো কখনো ৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
বলাবাহুল্য, বাংলাদেশ একটি বহু জাতির, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। এ দেশে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী ছাড়াও প্রায় ৪৫টি আদিবাসী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশের সংবিধানে সরাসরি এসব জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি নেই। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংহতি, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নিরিখে এসব জাতিসমূহের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি যারপরনাই জরুরি। এতদ উদ্দেশ্যে যথাশীঘ্র সরকার কর্তৃক নিম্নোক্ত বিষয়াদির কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোকÑ
(ক) সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৪৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতিসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।
(খ) সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদের ৪ উপ-অনুচ্ছেদের প্রারম্ভে ‘দেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী বা’ শব্দসমূহ সন্নিবেশ করা হোক এবং এই অনুচ্ছেদের আওতায় সংবিধানে নতুন তফসিল সংযোজন করে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নামের তালিকা সন্নিবেশ করা হোক।
(গ) সংবিধানের ৪৭(১)(চ) অনুচ্ছেদের পরে নিম্নোক্ত দফা (ছ) সংযোজন করা হোক - ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্য উক্ত অঞ্চল একটি আদিবাসী বিশেষ শাসিত অঞ্চল হইবে।’
(ঘ) পার্বত্যাঞ্চলের ৩টি সংসদীয় আসনসহ দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আদিবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার পরিষদে আসন সংরক্ষণ করা হোক।
(ঙ) আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি মোতাবেক আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।
১০ নভেম্বর ২০০৯ জাতীয় পর্যায়ে
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার
২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় কমিটির ঘোষণাপত্র
প্রিয় সুধি
আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজকের এই মহতী সমাবেশে উপস্থিত হওয়ায় মানবেন্দ্র নারায়ণ মৃত্যুবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আজ থেকে ৭০ বছর আগে চেঙ্গি উপত্যকায়, বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলাধীন বুড়িঘাট মৌজার মহাপ্র“ম গ্রামে, ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জন্ম। পাহাড়ী জনপদের মরণফাঁদ নামে খ্যাত কাপ্তাই হ্রদের অতল জলরাশিতে সে গ্রামটি তলিয়ে গেছে অনেক আগেই। ১৯৬৫ সালে জেলে অন্তরীণ অবস্থায় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে সমাজকল্যাণ বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এম এন লারমা জন্মেছিলেন পশ্চাদপদ ও ঘুণেধরা জুম্ম সমাজের সাধারণ একটি পরিবারে; কিন্তু এই পরিবারটি রক্ষণশীল, পরনির্ভরশীল ও সামন্ত নেতৃত্বের বিরোধীতা করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার স্বার্থ রক্ষায় সাহসী ভূমিকা রাখেন, তারা অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও জুম্ম যুবশক্তিকে সুশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ ও প্রচারের আন্দোলন শুরু করে; কিন্তু যুবক লারমার গতিশীল চিন্তা কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মুক্তির সঙ্গে পার্বত্যবাসী জনগণের মুক্তি একই তারে বাঁধা এ প্রতীতি তার ছিল। তাই ১৯৫৬ সাল থেকে এম এন লারমা ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ করেন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে অধ্যয়নের সময় ১৯৫৮ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন। ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলনের তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব বিলোপের লক্ষ্যে শাসক শ্রেণীর আগ্রাসী উপনিবেশিক তাণ্ডব ও ভ্রান্ত নীতি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এ সময় তিনি কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একটি লিফলেট প্রকাশ করেন। সচেতন ছাত্র-যুবকরা রাতের আঁধারে এই লিফলেট সর্বত্র বিলি করলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। ফলে ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্র“য়ারি নিবর্তনমূলক আইনে সরকার এম এন লারমাকে গ্রেফতার করে; প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর এম এন লারমা ১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ চট্টগ্রাম কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন।
প্রিয় বন্ধুগণ
১৯৬২ সালে এম এন লারমার নেতৃত্বে রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি সে সময় জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজের নিকট ‘গ্রামে চলো’ শ্লোগান তুলে ধরেন। শতাব্দী প্রাচীন শাসনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা নিদ্রামগ্ন সমাজে ব্যাপক শিক্ষা প্রসার না ঘটালে জুম্ম জনগণকে অধিকার সচেতন করা সম্ভব নয় বলে তিনি ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। গ্রামে গ্রামে গিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সাধারণের মাঝে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর আহ্বান জানান তিনি। তাঁর সেই যুগান্তকারী আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিক্ষিত যুব সমাজের অনেকেই গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। তারা একাধারে শিক্ষকতা করা ও রাজনৈতিক সংগঠনের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। এম এন লারমা নিজেও ১৯৬৬ সালে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন। পরে ১৯৬৯ সালে এলএলবি পাশ করলে তিনি চট্টগ্রাম বার কাউন্সিলে যোগদান করেন। শিক্ষকতা জীবনে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু সে সময় বিরাজিত অস্থির ও সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে অনেক পাহাড়ী যুবক ইচ্ছে থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এ ধরনের ঘটনা যে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকাতেই হয়েছে এটি ভাববার অবকাশ নেই। দেশের অন্যত্রও হাজার হাজার যুবক ছাত্র জনতা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি সুযোগ সুবিধার অভাব ও পরিস্থিতিগত কারণে। রক্তাক্ত কিন্তু সদ্য স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নিয়ে এম এন লারমার ছিল আকাশ সমান স্বপ্ন ও গভীর ভাবনা। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় তাঁর সেই স্বপ্ন বারবার উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলতেন, দেশের সংবিধান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের আপামর জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করবে এবং সকল প্রকারের জাতিগতÑশ্রেণীগত নিপীড়ন, শোষণÑবঞ্চনার অবসান ঘটাবে। তাঁর বুকভরা আশা ছিল সংবিধানে জাতিÑশ্রেণী নির্বিশেষে সকলেরই অধিকার সংরক্ষিত হবে এবং ঔপনিবেশিক অপশাসনের সকল কালাকানুন ও দমন-পীড়নের চির অবসান হবে, বিশেষ করে পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক অধীনতা থেকে পাহাড়ী মানুষ পাবে মুক্তির স্বাদ।
সংগ্রামী বন্ধুগণ
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আশা করেছিলেন, জাতিগত নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী শক্তির প্রতিভূরা জুম্ম জাতির শত বছরের বঞ্চনার বেদনা বুঝবেন। তারই আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তিনি গণ পরিষদে বার বার আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি তুলে ধরেন। কিন্তু সাংসদ ও সংবিধান প্রণয়নকারীরা তাঁর এই দাবির আসল নির্যাস না বুঝতে পেরে এবং এর পেছনে প্রচ্ছন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদ ক্রিয়াশীল এই আশঙ্কায় এই দাবিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। বাহাত্তরের সংবিধানে উল্লিখিত হয় যে বাংলাদেশের নাগরিকগণ জাতি ধর্ম লিঙ্গ জাতিসত্তা নির্বিশেষে ‘বাঙ্গালী’ নামে অভিহিত হবে। কিন্তু লারমার দৃষ্টিতে ‘বাঙ্গালী’ নামে পরিচিত মূলত সমতলবাসী জনগোষ্ঠী ভিন্ন একটি জাতি, যা জুম্ম জাতিগোষ্ঠী থেকে নৃতাত্ত্বিকভাবে স্বতন্ত্র। কাজেই জুম্ম জাতি কখনও বাঙ্গালী হতে পারে না। পার্বত্যবাসীরা যেমন ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ, তেমনি তাদের রয়েছে আলাদা ভাষা, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও পৃথক জীবনাচার। তাই সেদিন তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে বের হয়ে আসেন। বারংবার তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন অনেক মন্ত্রী-নেতাদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রমের স্ব-শাসনের কথা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু তাঁর সব আবেদন-নিবেদন ব্যর্থ হয়ে যায় শাসকবর্গের উগ্র জাতিয়তাবাদী দাম্ভিকতায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭২ সালে ১৫ই ফেব্র“য়ারি তারিখে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা প্রতিষ্ঠা করলেন জুম্ম জনগণের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। তিনি ছিলেন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। এই সংগঠনে তিনি জুম্ম জনগণের প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক অংশকে যুক্ত করেছিলেন। এর অঙ্গসংগঠন পাহাড়ী ছাত্র সমিতি, মহিলা সমিতি, যুব সমিতির মাধ্যমে আপামর জুম্ম জনগণকে তিনি জনসংহতি সমিতির পতাকাতলে সংগঠিত করেন। ১৯৭৩ সালে জনসংহতি সমিতির সভাপতি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
প্রিয় সুধি
১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনসংহতি সমিতির পক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলে এম এন লারমা ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে চাথোয়াই রোয়াজা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং দু’জনেই বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নসহ দেশের মেহনতি মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পক্ষে ছিলেন বরাবরই সোচ্চার। ১৯৭৪ সালে সরকারের পার্লামেন্টারী প্রতিনিধি হিসেবে লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান করেন। বরাবরই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজেছেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে দেশের রাজনীতি নতুন মোড় নিলে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়মাতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল পথ রুদ্ধ হয়। এই পরিস্থিতিতেই বাধ্য হয়ে তিনি জুম্ম জনগণকে তাদের সমস্যা সমাধানে এবং নিজেদের আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র তুলে নেবার আহ্বান জানান। শুরু হয়, তাঁর নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলন, লক্ষ্য আধিপত্যবাদী বাঙালির আগ্রাসী শক্তি ও তার প্রতিভূ সেনা কর্তৃত্ব থেকে জুম্ম জাতির মুক্তি ও স্বায়ত্তশাসন অর্জন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, সে যুদ্ধ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর ভোর রাতে ১০ নম্বর বিপদসংকেত চলাকালীন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে জনসংহতি সমিতির বিভেদপন্থী গ্র“পের বিশ্বাসঘাতকতামূলক সশস্ত্র হামলায় তিনি খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির গভীর জঙ্গলে এক গোপন আস্তানায় নির্মমভাবে নিহত হন। সেই আক্রমণে তাঁর সঙ্গে আরো আটজন সহযোদ্ধা মারা যান।
বন্ধুগণ
আজ ১০ নভেম্বর পার্বত্য জনপদবাসীর এই বিপ্লবী নেতার ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। জাতীয় পর্যায়ে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী পালন উপলক্ষে গত ১৯ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে ‘মানবেন্দ্র নারাযণ লারমা’ ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন জাতীয় কমিটি - ২০০৯’ গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক : বিচারপতি গোলাম রাব্বানী, সদস্য সচিব : দীপায়ন খীসা। জাতীয় পর্যায়ে বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, কবি, লেখক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, আইনজীবী, নারী নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী’র ১০০ জন সম্মানিত নাগরিক এ কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেনÑঅধ্যাপক ডালেম চন্দ্র বর্মণ, নুমান আহম্মদ খান, অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ, ড. মুহাম্মদ সামাদ, নারী নেত্রী রোকেয়া কবীর, রোবায়েত ফেরদৌস, সৌরভ সিকদার, আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং, চিকিৎসক নেতা ডা. রশিদ-ই-মাহবুব, নিশি দেওয়ান, পল্লব চাকমা, চৈতালী ত্রিপুরা, উদ্দীপন চাকমা, জোবায়দা নাসরীন কণা, ইলোরা আজমী, ফাতেমা ইয়াসমীন, জাগরণ চাকমা, শেখ শফিউল ইসলাম, ফিরোজ জামান চৌধুরী, হিরণ মিত্র চাকমা প্রমুখদের নিয়ে গঠিত একটি কার্যকরী কমিটি। আজ ১০ নভেম্বর এম এন লারমার মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে যেসব কর্মসূচী হাতে নেওয়া হয়েছে তাহলো: মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, স্মরণ সভা, স্মরণীকা প্রকাশ, কবিতা আবৃত্তি ও গণ সংগীত। এছাড়া জাতীয় কমিটি সরকারের কাছে রাঙ্গামাটি থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়টিকে ‘এম এন লারমা মহাসড়ক’ নাম করার প্রস্তাব উত্থাপন করছে এবং ঢাকা অথবা চট্টগ্রামে লারমার ভাষ্কর্য নির্মাণের দাবি জানাচ্ছে। সেই সঙ্গে জাতীয় শিক্ষা পাঠক্রমে লারমার জীবনী অন্তর্ভুক্ত করার জন্যও সরকারের কাছে দাবি তুলছে।
জাতীয় কমিটির পক্ষে ঘোষণাপত্রটি তৈরি করেছেন
রোবায়েত ফেরদৌস
লেখক, গবেষক এবং সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার
সংক্ষিপ্ত তথ্যাবলী
নাম : মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা
ডাক নাম : মঞ্জু
জন্ম : ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সাল
জন্মস্থান : মহাপ্র“ম, বুড়িঘাট মৌজা, নানিয়ারচর থানা, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা। (বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদের নীচে)
বিবাহ : ১৯৭১ সাল
পিতার নাম : চিত্ত কিশোর চাকমা
মাতার নাম : সুভাষিণী দেওয়ান
স্ত্রীর নাম : পঙ্কজিনী চাকমা
সন্তান : ১ ছেলে, ১ মেয়ে
ছেলে-জয়েস লারমা (জ্যেষ্ঠ সন্তান)
মেয়ে-পারমিতা লারমা (কনিষ্ঠ সন্তান)
ভাইবোন : জ্যোতিপ্রভা লারমা, মিনু (বড় বোন)
শুভেন্দু প্রভাস লারমা, বুলু (বড় ভাই)
জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা,সন্তু (ছোট ভাই)
শিক্ষা জীবন : প্রাথমিক শিক্ষা- মহাপ্র“রম জুনিয়র হাই স্কুল
ম্যাট্রিক- ১৯৫৮ সাল, রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
আই এ-১৯৬০ সাল চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ
বি এ-১৯৬৫ সাল, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ
বি এড-১৯৬৮ সাল
এল এল বি-১৯৬৯ সাল
কর্মজীবন : ১৯৬৬ সালে দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন
১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনী হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন
১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বার এসোসিয়েশনে আইনজীবি হিসেবে যোগদান করেন
রাজনৈতিক জীবন
১৯৫৬ সাল থেকে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনে পদার্পন।
১৯৫৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা।
১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন।
১৯৬০ সালে পাহাড়ী ছাত্র সমাজে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬১ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিতকরণ।
১৯৬২ সালে অনুষ্ঠিত পাহাড়ী ছাত্র সম্মেলনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন।
১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্র“য়ারি নিবর্তনমূলক আইনে আটক (চট্টগ্রামের পাথরঘাটস্থ পাহাড়ী ছাত্রাবাস হতে)।
১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ চট্টগ্রাম কারাগার থেকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি লাভ।
১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত।
১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট ৪ দফা সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবী নামা পেশ করেন।
১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গঠন ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।
১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ সংবিধানে জুম্মদেরকে ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রতিবাদে গণ পরিষদ অধিবেশন বর্জন।
১৯৭৪ সালে সরকারের পার্লাামেন্টারী প্রতিনিধি হিসেবে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান উপলক্ষে লন্ডন সফর।
১৯৭৫ সালে বাকশালে যোগদান।
১৯৭৫ সালের ১৬ আগষ্ট থেকে আত্মগোপন করেন।
১৯৭৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ১ম জাতীয় সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে পুন:নির্বাচিত।
১৯৮২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ২য় সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে পুন:র্ন্বিাচিত।
১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর ভোর রাতে বিভেদপন্থী গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্রের বিশ্বাসঘাতকতামূলক অতর্কিত আক্রমণে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার খেদারাছড়ার থুমে নির্মমভাবে নিহত হন।
লারমাকে নিয়ে গান
রঘুবীর
জুম্ম জাতির মহান নেতা
মুক্তি পথের আলোকনামা
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা
নাই নাই তাঁর মৃত্যু নাই
কুলাঙ্গার বেঈমান বিশ্বাসঘাতক ওরা
শাশ্বত দর্শন ও বিপ্লবী চেতনায় যারা
বেঁচে আছে আজো তারা,
সাবধান!
শাশ্বত সত্যের হবেই হবে জয়।
পাহাড়ী সত্তায়
আজ জেগেছে চাকমা, লুসাই, ত্রিপুরা, খিয়াং
মগজকোষে লারমা নিয়ে
প্রস্তুত এখন মারমা, খুমি, চাক, বোম, পাংখো, মুরং
ছোট্ট নদী মহাপুরম স্বাক্ষী মানি
মেহনতি, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের হবেই জয়
মৃত্যুঞ্জয়ী যে, নাই নাই তাঁর মৃত্যু নাই।
মৃত্যু নাই মৃত্যু নাই
তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০০৯
সূচনা সংগীত
(কথা ও সুর : শুচি রহমান)
মহাপ্র“ম থেকে একটি মানুষ
সূর্য দেখবে বলে
আঁধার পেরিয়ে আলো হাতে নিয়ে একলাই পথ চলে।
লারমা নামের সেই মানুষটি
সূর্য দেখবে বলে
আঁধার পেরিয়ে আলো হাতে নিয়ে এখনো পথ চলে।
জানে সে মানুষ,
পরিচয়হীন বেঁচে থাকাকে বেঁচে থাকা বলে না,
বেঁচে থাকা মানে নিজ পরিচয়ে বাঁচা
বেঁচে থাকা মানে মাথা উঁচু করে বাঁচা
আমাদের কথা বলবো কি আর,
আমরা কচুুরিপানা
সংস্কৃতিতে ভীষণ ধরেছে ঘুন
বিশ্বায়নের সহস্র স্রোত আমাদের খায় গিলে
নিজেকে আমি নিয়ত করি খুন।
ভোগী সভ্যতা আমার শিশুকে বস্তু স্বপ্নে ভাসায়
মগজ ধোলাই হচ্ছে নিয়ত
যে জাতি তোমার নিজ পরিচয় ভুলতে বলেছিলো
সে জাতির আজ নিজের সত্তা হত।
কে বলবে এই বাংলাদেশ একদিন
প্রাণ দিয়েছিলো মাতৃভাষার জন্য
কে বলবে এই বাংলাদেশ একদিন
যুদ্ধ করেছিলো আপন জাতিসত্তার জন্য
সেই বাংলাদেশের কানে কানে গেয়ে যাই আবার...
তোমার মতো আমারো আছে এই অধিকার
অধিকার আছে নিজ পরিচয়ে বাঁচার
তোমার মতো লারমারও আছে এই অধিকার
অধিকার আছে নিজের ভাষায় বলার
অধিকার আছে মাথা উঁচু করে বাঁচার।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার
২৬ তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন জাতীয় কমিটি
আহ্বায়ক : বিচারপতি গোলাম রাব্বানী
সদস্য সচিব : দীপায়ন খীসা
সদস্য
পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য
হায়দার আকবর খান রনো
কামাল লোহানী
ড. ডেনিস দিলীপ দত্ত
সেলিনা হোসেন
রোকেয়া কবীর
খুশী কবির
অজয় রায়
ড. ডালেম চন্দ্র বর্মণ
সঞ্জীব দ্রং
তারেক আলী
মমতাজ লতিফ
ড. মুহাম্মদ সামাদ
ড. ইসরাফিল শাহীন
অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহাবুব
অধ্যাপক এম এম আকাশ
মুনীরুজ্জামান
মোশারেফা মিশু
মোহাম্মদ আলী
নুমান আহম্মদ খান
সৌরভ সিকদার
রোবায়েত ফেরদৌস
রাগিব আহসান মুন্না
শাহরিয়ার সালাম
ব্যারিষ্টার সারা হোসেন
ব্যারিষ্টার সাদিয়া আরমান
স্বাগতম চাকমা
চৈতালী ত্রিপুরা
হিরণ মিত্র চাকমা
উদ্দীপন চাকমা
মো: মাসুদুর রহমান
ড. সাদেকা হালীম
অধ্যাপক এইচ কে এস আরেফিন
অধ্যাপক মেজবাহ্ কামাল
ডা. শামীম ইমাম
ফকির আলমগীর
জোয়াদ-আল-মালুম
শামসুল হুদা
ঈশানী চক্রবর্তী
শরীফ এ কাফী
ড. কাবেরী গাইন
কফিল আহমেদ
অপরাজিতা দেওয়ান
মো: তৌহিদুল আলম
গোপাল কোচ
জোবাইদা নাসরিন কনা
এ্যাডভোকেট রবিউল আলম রবি
রফিকুল ইসলাম নতুন
উষারঞ্জন কোচ
আইয়ুব রানা
দীপংকর সাহা দীপু
তন্দ্রা চাকমা
উসিংমং চৌধুরী
অভিলাষ ত্রিপুরা
বরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা
নিশি দেওয়ান
প্রিসিলা রাজ
মংসিংঞো
এড. হেমন্ত ত্রিপুরা
ফরিদা আক্তার
ব্যারিষ্টার তানিয়া আমীর
শমীমা নাসরিন
শামীমা বিনতে রহমান
কবি সাখাওয়াত টিপু
শিবানী দাস
সাবিনা হক লিসু
চঞ্চনা চাকমা
করুনাময় চাকমা
চির রঞ্জন সরকার
পারী সিংসাম
রোজালিন ডি কস্তা
ফিরোজ জামান চৌধুরী
রাখী ম্রং
সন্তোষ ত্রিপুরা
ডা. প্রতীক দেওয়ান
জেবুন্নেছা জেবু
পল্লব চাকমা
পাভেল পার্থ
উজ্জল আজিম
রবীন্দ্রনাথ সরেন
নাজমুল হক সুমন
কবিতা
নজরুল ইসলাম মিঠু
নজরুল কবীর
কেরিনা হাসদা
অদিতি ফাল্গুনী
সোহরাব হাসান
আহসান হাবীব সোহেল
গোবিন্দ বর্মন
বুলবুল চাকমা
নেপেলিয়ান চাকমা
নিটল চাকমা
মাহামুজ্জামান বাবু
এস ডি আকতার
প্রসেনজিত চাকমা
কীর্তি নিশান চাকমা
নিকোলাস চাকমা
তুহিন চাকমা
জুঁই চাকমা
তিতাস চাকমা
ফয়েজ আলম
উদয়ন ত্রিপুরা
বিশ্বজিৎ কোচ
সৈকত বিশ্বাস
সানি মারমা
দিলারা রেখা
ধীরাজ চাকমা
সাবিনা সুলতানা নুপুর
রাজীব নূর
বিপ্লব রহমান
আমিনুল এহসান
হানা সামস আহমেদ
সোহেল হাজং
প্রধাংশু বর্মন
সুজন হাজং
অনন্ত বিকাশ ধামাই
ইলোরা আজমী
ফাতেমা ইয়াসমিন
নিমাই মন্ডল
ত্রিজিনাদ চাকমা
মিতি ত্রিপুরা
একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?
হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন
আসলে কেউ ফেরে না।
মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর
যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।