somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তুমি আছো সবই আছে!

৩০ শে আগস্ট, ২০১৭ বিকাল ৫:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে শিল্পী আবদুল জব্বার গ্রিন রোডের যে বাসায় ভাড়া থাকতেন, একই বাসায় আমরা বন্ধুরাও থাকতাম। শিল্পী আবদুল জব্বার থাকতেন তৃতীয় তলায়। আর ছয় তলা বিল্ডিংয়ের ঘষ্ঠ তলা ছিল ব্যাচেলরদের জন্য। আমরা থাকতাম সেই ব্যাচেলর ফ্লোরে। বাড়িওয়ালা আবুল কালাম আজাদ আংকেল পরিবার নিয়ে থাকতেন নিচতলায়।

তৃতীয় তলায় শিল্পী আবদুল জব্বার যে পাশে থাকতেন, সেই দরজায় একটা সাইনবোর্ড ছিল। সেখানে লেখা ছিল 'জাতীয় কণ্ঠ শিল্পী আবদুল জব্বার'। এই সাইনবোর্ড নিয়ে প্রায় রাতেই আমরা মজার কিছু ঘটনা ঘটতে দেখতাম। সেই ঘটনার নায়ক ছিলেন দুই পার্টনার। বাড়িওয়ালা আবুল কালাম আজাদ আংকেল ও শিল্পী আবদুল জব্বার।

প্রায়ই ওনারা দু'জন রাতের বেলায় একসঙ্গে ড্রিংক করতেন। সাধারণত রাত বারোটা থেকে একটার মধ্যে ওনারা বাসায় ফিরতেন। ড্রিংক করা ও আড্ডা ঠিকঠাক চললেও কোনো এক রহস্যময় কারণে ঠিক বাসার বাইরের গেটে এসেই দু'জনে দুনিয়ার যত মাতলামি করতেন। আশেপাশের বাসার লোকজনদের মত আমরাও মধ্যরাতের সেই বিনোদন দেখতে ব্যালকনিতে ঠিকই বসে থাকতাম।

মাঝেমাঝে দু'জনের মুখ থেকে অশ্রাব্য ভাষা বের হতো। সেদিন হয়তো ওনারা বেশি টাল থাকতেন। আজাদ আংকেল খোটা দিতেন- 'তুই আমার চ্যাটের বাল আবদুল্লাহ। আমার বাসায় ভাড়া থাকোস, আবার সাইনবোর্ড ঝুলাইছোস- 'জাতীয় কণ্ঠ শিল্পী'। তুই আমার বালের শিল্পী'! জবাবে শিল্পী আবদুল জব্বারও মুখ খারাপ করতেন। পাল্টা জোরগলায় বলতেন, 'তুই আমার চ্যাটের বাড়িওয়ালা। তোর তো কোনো সাইনবোর্ডই নাই। তোরে ক্যাডা চিনে? আমি দয়া করে তোর বাসায় থাকি বলে অনেকে তোরে চেনে!'

তো এই বচ্চা কিছুক্ষণ চলার পর তৃতীয় তলা থেকে শিল্পী আবদুল জব্বারের স্ত্রী কবি হালিমা জব্বার নিচে নেমে শিল্পী আবদুল জব্বারকে ধরে টেনে তুলতেন তিন তলায়। আর আমাদের মাথার উপরে ছাদে থাকতেন আজাদ আংকেলের এসিসট্যান্ট করিম। করিম সাত তলা থেকে নেমে আজাদ আংকেলকে ধরে নিয়ে যেতেন তার ঘরে। কারণ আজাদ আংকেলের কাছে ওই সময়ে করিম ছাড়া আর কেউ যেতে পারতো না।

তখনো চিঠিযুগ শেষ হয়নি। সবার হাতে মোবাইল নেই। আজকের মত ফেসবুকও আসে নাই। তখন ওই বাসায় দু'জনের নামে খুব চিঠি আসতো। তার একজন হলেন কবি হালিমা জব্বার। আর দ্বিতীয় জন স্বয়ং এই অধম। অন্যদের সে তুলনায় চিঠি খুব কম আসতো। এমন কি শিল্পী আবদুল জব্বারের চেয়েও আমাদের নামে বেশি চিঠি আসতো। তো নিচতলার লেটারবক্স থেকে এই চিঠি নেওয়ার সময়ই একদিন পরিচিত হয়েছিলাম কবি হালিমা জব্বারের সাথে।

ওই বাসায় সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটতো দুপুরের দিকে। তখন শিল্পী আবদুল জব্বার গান করতেন। আমরা তিন ফ্লোর উপরে থাকলেও শিল্পীর কণ্ঠ ঠিকই আমাদের ব্যাকুল করে দিত। মান্না দে'র গানগুলো উনি খুব আয়েশ করে করতেন। এমন হয়েছে অনেকবার যে, ওনার গান গাওয়া শেষ হয় না। আমাদের স্নান করতে যাবার অপেক্ষাও শেষ হয় না। কারণ স্নান করতে গেলে আর ভালো করে শিল্পী আবদুল জব্বারের গান শোনা হবে না। তাই আমরা ওনার গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকতাম।

সুরের সঙ্গে শিল্পী আবদুল জব্বারের যে আত্মার যোগাযোগ ছিল, সেটা হারমোনিয়ামে উনি যখন একা একা গান করতেন, তা না শুনলে ঠিক বোঝা যেতো না, কতোটা তন্ময় হয়ে আমরা তা মনযোগ দিয়ে শুনতাম। আমরা অনেকদিন দুপুরের খাবার বিকেলে খেয়েছি কেবল ওনার গান শোনা মিস করব না এটা ভেবে। উনি যখন সারগম রেওয়াজ করতেন, তখন আমরা অবশ্য ততোটা মনযোগী শ্রোতা হতাম না। কিন্তু যখনই গান ধরতেন, তখন আমাদের অন্য সকল কাজ অনেকটাই ফ্রিজ হয়ে যেত।

শিল্পী আবদুল জব্বারকে আমাদের মনে থাকবে। জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘তুমি কি দেখেছ কভু’, ‘পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি’, ‘সুচরিতা যেয়ো নাকো আর কিছুক্ষণ থাকো’, ‘ওরে নীল দরিয়া’, 'নীলা গগন হে, 'রোদে পুড়ে পীচ গলে', 'নাচের পুতুল', 'তুমি আছো সবই আছে'সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের জন্য শিল্পী আবদুল জব্বারকে বাংলার মানুষ চিরকাল মনে রাখবে।
-----------------------
৩০ আগস্ট ২০১৭
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১৭ বিকাল ৫:০৮
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ হাসিনা বাংগালীদের চেয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বেশী রক্ষা করছেন?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ৮:৪৬


News Link

ভারতের মাটির নীচে তেল নেই, তারপরও বাংলাদেশ সরকার জ্বালানী তেলও ভারত থেকে আমদানী করছে, এবং ভবিষ্যতে ওদের উপর নির্ভরশীল থাকার জন্য "পাইপ লাইন" গড়ার প্রকল্প উদ্বোধন করেছে;... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাকালের মহানায়ক(কবিতা) -তামিম-মুশির বীরোচিত লড়াইকে কবিতার ফ্রেমে বন্ধী করার আমার অতি ক্ষুদ্র প্রয়াস ।

লিখেছেন রাকু হাসান, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:৫৬

কবিতাটি উৎসর্গ করলাম-তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহমানকে ।



আমি চোখের সামনে দেখেছি পাঁজর ভাঙ্গতে ,
শুনেছি বিশ্বজয়ী যৌবনা শুকনো পাতার মড়মড় করে উঠা কান্না ,
কখনও বা চঞ্চলা অবিচল যাত্রায় কেঁদে উঠেছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশে অমুসলিমদের অবদান “বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়”!!!

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ভোর ৪:২৯



২০০ বছর আগেও বাংলাদেশে হিন্দু রাজা ছিলো !!! ২০০ বছর আগে বাংলাদেশে হিন্দু রাজা ও পরবর্তীতে হিন্দু জমিদার দ্বারা স্কুল, কলেজ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠিত হয়, যার কিছু নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ দেশ করে মাথা খাচ্ছে তারা, যত নক্সালবাদীর দল !

লিখেছেন অভিশপ্ত জাহাজী, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ভোর ৬:০০


একজন মানুষ তার জীবনের খুব কম সময় নিরপেক্ষ ভাবে কোনো কিছু চিন্তা করে বা করতে পারে। আবার সাময়িক ভাবে মনে হতে পারে সে নিরপেক্ষ ভাবে চিন্তা করছে। কিন্তু আসলেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

শ্বশুরবাড়ি আসল বাড়ি" কিন্তু মুসলিম আইন কী বলে? (জানাটা খুবই জরুরী)

লিখেছেন সৈয়দ ইসলাম, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১২:১৪


(একজন বোনের থেকে পাওয়া ম্যাসেজ..)

মুসলিম আইনে স্ত্রীর ‘শ্বশুরবাড়ি’ নামক বাসস্থান বা এই শ্বশুরবাড়ি সংশ্লিষ্ট দায়-দায়িত্বের কোনই অস্তিত্ব নাই। এই ‘শ্বশুরবাড়ি কালচার’ আমাদের নিজস্ব আবিষ্কার।
বিয়ের পর স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর আইনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×