somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... মা- আমার প্রথম উপন্যাস
২। লেখকের নাম: রেজা ঘটক

৩। প্রকাশকের নাম: আল আমিন প্রকাশন

৪। মূল্য: ২৫০ টাকা

৫। প্রাপ্তিস্থান: আল আমিন প্রকাশন, স্টল নং-৪৪, অমর একুশে বইমেলা, বাংলা একাডেমী
ও রেডটাইমসবিডিডটকম, লিটল ম্যাগাজিন চত্বর]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29533825 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29533825 2012-02-02 13:02:41
মা- আমার প্রথম উপন্যাস ।। রেজা ঘটক কখনো একই গল্প মায়ের কাছে আমি বারবার শুনতে চাইতাম। দেখতাম, মা ঠিক আগের বারের মতো করেই বলার চেষ্টা করছে। একই গল্পে কোনো নতুনত্ব থাকবে কিনা এটা জানার জন্যেই আমি পুনরায় ওই গল্প শুনতে চাইতাম। আমার অনুসন্ধানী প্রশ্নের জবাবে কখনো কখনো নতুন বিষয় বেড়িয়ে আসতো। আর গল্পের এই নতুন বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করাটাই আমার এক সময় নেশা হয়ে গিয়েছিল। কখনো আমি অন্য গল্পের বিষয় ইচ্ছে করেই মায়ের বলা গল্পে ঢুকিয়ে দিয়ে প্যাচ লাগিয়ে দিতাম। দেখতাম, মা ঠিকই তা ধরে ফেলতো আর তখন সেই গল্পটাও বলা শুরু করতো। এতে আমার সুবিধা হতো যে মাকে আরো কিছুটা সময় আমার সঙ্গে আড্ডায় আটকে রাখতে পারতাম। মা কখনো কাজের ফাঁকে ফাঁকে গল্প শোনাতো। কাজ চলছে, গল্প বলাও চলছে। আমার নিজের কোনো বিষয় হলে সেই গল্প বলার সময় অন্য কাউকে আমি এলাউ করতাম না। কিন্তু মা সবাইকে এলাউ করতো। মায়ের এই সহজ সরল দিকটা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতো।
পরিবারে মা ছিল আমার প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা। আমার বিরুদ্ধে কেউ কিছু রটালে মায়ের মাধ্যমে আমি ঠিকই তা জানতে পারতাম। এক কথায় মা ছিল আমার একটা আপন ভূবন। আসলে এসএসসি পরীার পর থেকেই পড়াশুনার অযুহাতে মায়ের কাছ থেকে আমার দূরে বসবাস শুরু। অনার্স-মাস্টার্সে পড়ার সময় সেই দূরত্ব আরো বাড়লো। তারপর নানা ঘটনা অঘটনার আড়ালে বাড়িতে যাওয়া কিংম্বা মায়ের কাছে থাকার সুযোগ রইলো না। তবু মাকে আমি সব সময় ভালোবাসি। সেই ভালোবাসার খবর সবচেয়ে মা-ই বেশি জানতো। এক কথায় বাংলাদেশের একজন গ্রামীণ সহজ সরল মা বলতে আমরা যা বুঝি আমার মাও একেবারে তাই। সবাইকে মা যেমন বিশ্বাস করতো তেমনি ভালোও বাসতো। বিনিময়ে মাকেও সবাই ভালোবাসতো। আমার মায়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিা ছিল না। গ্রামের পাঠশালা বা মক্তব বা প্রাইমারি পর্যন্ত যাবার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। বাংলা ও আরবি পড়তে পারতো। ইংরেজি বর্ণমালা চিনতো। দুই একটা শব্দ বা সরল বাক্য পড়তেও পারতো।
মাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছে আমার ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু আমার মায়ের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কি উপন্যাসের বিষয়-আশয় হতে পারে কিনা এই নিয়ে সংশয় ছিল। এখনো পরিচিত অপরিচিত উপন্যাসের বিষয়-আশয়ের সঙ্গে আমার লেখা উপন্যাসের সত্যিকারের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি সেই চেষ্টাও করিনি। উপন্যাসের সীমাবদ্ধ গণ্ডির বাইরে গিয়ে আমি একটা কিছু লিখতে চেয়েছি। তাই সাহিত্যের বাঘা বাঘা সমালোচক বা পাঠক হয়তো এটাকে ঠিক উপন্যাস বলতে রাজী হবেন না। কিন্তু উপন্যাস নিশ্চয়ই কোনো বাইবেল না। যে সেই নিয়ম হুবহু অনুসরণ করতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই নিয়ম অনুসরণ করার পপাতীও নই। তাই আমার উপন্যাসে কিছুটা ঔদ্বত্ত্ব যেমন আছে তেমনি কিছু সঙ্গতি অসঙ্গতির মিশ্রণও আছে। আমি এভাবেই লিখতে চেয়েছি।
আমার এই উপন্যাসে ভূগোল আছে। ইতিহাস আছে। অর্থনীতি আছে। বিজ্ঞান আছে। ধর্ম আছে। রাজনীতি আছে। পরিবেশ আছে। ন্যাচারাল ডিজেস্টার আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আছে। দুর্ভি আছে। ষড়ঋতু আছে। দেশ বিভাগ আছে। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা আছে। ভাষা আন্দোলন আছে। সামরিক শাসন আছে। জাতীয় নির্বাচন আছে। মুক্তিযুদ্ধ আছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আছে। জাতীয় ও পারিবারিক শোক আছে। আর আছে কিছু নির্মোহ সত্যের অনুসন্ধান। নিয়মিত উপন্যাসের সঙ্গে এখানে যার কোনোই মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে অনেক ঘটনা আমাকে নিজ বুদ্ধিতে বিচার বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। সঠিক ইতিহাসের সন্ধানে অনেক ব্যক্তির সঙ্গে ইমেইলে বা সরাসরি যোগাযোগ করতে হয়েছে। অন-লাইন, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, ইতিহাসের অনেক বই, মুক্তিযুদ্ধের দলিল, দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক পত্রিকা, সাময়িকী, ম্যাগাজিন ইত্যাদি তাবৎ বিষয়ের সাহায্য গ্রহন করেছি। এই যাবতীয় বিষয় ও ব্যক্তির প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার সহধর্মিণী মায়া লোহানী এই উপন্যাসের প্রথম সমালোচক। প্রতিটা অধ্যায় লেখার পর মায়া গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনেছে, মতামত দিয়েছে এবং পাঠকের যাতে ভালো লাগে সে বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছে। সেজন্য আমি মায়া’র প্রতিও গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
এই উপন্যাস পাঠকের হাতে তুলে দেবার জন্যে শ্রদ্ধেয় আল আামিন ভাই বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদান ও সারাণ তাগাদা দিয়ে যেভাবে সব সময় সহযোগিতা করেছেন সেজন্য তাঁর প্রতিও আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই। বইটির প্রচ্ছদ আমি নিজেই করেছি। বইটির প্রথম প্রকাশে কিছু বানান বিভ্রম থাকাটা বিচিত্র নহে। যা হয়তো পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করা সম্ভব হবে। এছাড়া বইটির সর্বপ্রকার গঠনমূলক সমালোচনা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে প্রহন করার ইচ্ছে রইলো। বইটির পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত বিশেষ করে আল আমি ভাই, এম. জি. হাফিজ ও আবদুল্লাহ সহ সবাইকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29525007 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29525007 2012-01-19 12:06:18
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভাণ্ডারের টাকা কারা পায়? প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভান্ডারের অর্থের উৎস কী?যাকাত, দান, খয়রাত। সারা দেশের মানুষ, প্রবাসী বাংলাদেশীরা এমন কি স্কুলের ছেলেমেয়েরা তাদের টিফিনের পয়সা থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভান্ডারে দান করেন। সাধারণত দুর্যোগের সময় দুর্যোগ মোকাবেলার সহায়তার জন্যে প্রধানমন্ত্রী ওই ভান্ডার থেকে দান করেন। এছাড়া দুঃস্থদের জন্যেও ওই ভান্ডার থেকে প্রধানমন্ত্রী দান করেন। মানে কেবল দুঃস্থ বা গরিব লোকদের জন্যে প্রধানমন্ত্রী ওই ভান্ডার থেকে দান করেন। এমনটি রেওয়াজ।
কিন্তু বাংলাদেশে ধনিরা সেই রেওয়াজ মেনে নেয় কী করে? প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভান্ডারের টাকাও তাদের লাগবে। আর তাদের সেই কাজে সহযোগিতা করেন আরেক দল ধনি দালাল। দালালে দালালে মাসতুত ভাই। ধনি ধনি বিজয় কেতন। দুঃস্থদের সেই কথা বোঝার উপায় নেই। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভান্ডার থেকে কোন কোন দুঃস্থ লোক টাকা পেল তারা তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা মনে করে যারা টাকা পেয়েছে তারা সত্যি সত্যি ভাগ্যবান। যারা পায় না তারা কিন্তু ওই টাকার জন্যে কাজকর্ম বন্ধ করে দেয় না। বাঁচার জন্যে নিজেরাই কাজে নেমে পরে। কিন্তু ধনিরা সেই নিয়ম মানে না। তাদের ভালো করে জানা আছে দেশের কোথায় কোথায় টাকা আছে? কোন টাকা কীভাবে ছাড় করানো যায় সেই মন্ত্রও তারা ভালো জানেন। কাকে ধরলে টাকা পাওয়া সহজ হবে তাও তারা জানেন। কাকে কতো ভাগ দিলে টাকা ছাড়াতে কতো কম সময় লাগবে তাও কারা ভালো করেই বোঝেন। কারণ, তারা এই কাম করেই ধনি হয়েছেন।
দুঃস্থদের জন্যে গঠিত ত্রাণ তহবিল বাংলাদেশে ধনিদের জন্যে ব্যবহৃত হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ, এই দেশে সব কিছুই সম্ভব। এখানে বিচারপতিরা চিকিৎসার জন্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার থেকে টাকা নেন! মন্ত্রীরা- আমলারা টাকা নেন। পুলিশ- সাংবাদিকরা টাকা নেন। দলের নেতাকর্মীরা টাকা নেন। তাদের পোষ্যরা টাকা নেন। আর মাঝে মধ্যে দুঃস্থদেরকেও কিছু টাকা দেওয়া হয় বটে।
ধনিরা শুধু জানে কী করে টাকা মুঠি করতে হয়। সেটা কীসের টাকা তা বড় কথা নয়। টাকা টাকাই। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভান্ডারের টাকাও টাকা। একজন ভিখারির থলের টাকাও টাকা। বড় বড় লুটের টাকাও টাকা। চোরাকারবারীর টাকাও টাকা। অসৎ ব্যবসা থেকে আসা টাকাও টাকা। কিডনি ব্যবসা থেকে আসা টাকাও টাকা। নারী ও শিশু পাচার থেকে আসা টাকাও টাকা। রিলিফ চুরির টাকাও টাকা। ধনিদের কাছে টাকা সব সময় টাকা। টাকাই কিবলম। তাদের কাছে টাকাই সব।
দুঃস্থ বা গরিব না হয়েও যারা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভান্ডার থেকে যারা টাকা নিয়েছেন তারা আসলে মানসিকভাবে গরিব। মানসিক দৈন্যতাই তাদের ওই টাকার প্রতি লোভ জাগিয়েছে। যারা সেই কাজে সহায়তা দিয়েছেন তারাও সমানভাবে মানসিক দৈন্যতার শিকার। আমাদের দেশে মানসিক দুঃস্থদের জন্যে আলাদা একটা মন্ত্রণালয় থাকলে ভারী ভালো হতো। অর্থমন্ত্রী প্রতি বছর বাজেটে ওই মন্ত্রণালয়ের জন্যে কিছু বরাদ্দ রাখতেন। তখন তারা আরো বেশি আনন্দে সুখে শান্তিতে বাস করতে পারতো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29447208 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29447208 2011-09-13 10:03:04
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আমাদের কুটনৈতিক কুটনীতি । রেজা ঘটক বাংলাদেশের জাতীয় ইস্যুতে সরকার কেন সকল পক্ষকে নিয়ে একটি বৈঠক করেন না? ভারতের সঙ্গে আমরা কী কী বিষয়ে নিস্পত্তি চাই সেই বিষয়গুলো কেন সরকার সবাইকে নিয়ে আলোচনা করেন না? বিষয়গুলো আগে নির্বাচন না করে জনগণকে কিছুই না জানিয়ে সবাইকে পাশ কাটিয়ে গুটিকয়েক দিপুমনি আর গওহর রিজভী দিয়ে যে আসল সমস্যার সমাধান করা যায় না তা আবারো প্রমাণ হলো। কিন্তু আমাদের লজ্জ্বা নেই। আমরা ভবিষ্যতেও এই রকম ভাবেই চালিয়ে যাব।
ভারতের সঙ্গে আমরা কী কী বিষয় নিস্পত্তি করবো তা সবাইকে সঙ্গে নিয়েই ঠিক করতে হবে। এটাই আসল বিষয়। সরকার যদি একটা উন্মুক্ত আলোচনা শুরু করতেন যে ভারতের সঙ্গে আমরা কী কী বিষয় কীভাবে চাই আসুন আমরা আলোচনা করে ঠিক করি। ডিজিটাল বাংলাদেশ ব্যবহার করেও এই বিষয় অতি অল্প সময়ে ঠিক করা যেতো। বাংলাদেশে যতোগুলো রাজনৈতিক দল আছে তারা কীভাবে কী কী চায় তাদের কাছে সরাসরি জানতে চাইতে পারতো। যারা সেই আবেদনে সারা দিতেন না, জনগণ তাদের এমনিতেই প্রত্যাখ্যান করতো। তাদের মিথ্যা কথায় জনগণের আর ভুল বোঝার সুযোগ থাকতো না।
ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে পালা করে মিটিং করা যতো।মিডিয়ার সঙ্গে পালা করে মিটিং করা যেতো। বিশেষজ্ঞ মহলের সঙ্গে পালা করে মিটিং করা যেতো। সংসদে পালা করে একটা একটা বিষয়ে আলোচনা করা যেতো। সবশেষে পতিকায় গণ জরীপ চালিয়ে প্রত্যেকটি বিষয়ের উপর জনমত যাচাই করা যেতো। এভাবে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয় গুলো জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আগে ভাগেই ঠিক করাটা খুব একটা ঝামেলার কাজ নয়। আসল ঝামেলা সদ্দিচ্ছায়।
এভাবে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা কীভাবে মিটমাট হবে তা জনগণ আগেভাগে সরকারকে যদি উপায় বলে দিতো, তখন সরকারের পক্ষে ভারত প্রতিপক্ষকে যুক্তি দেখেনা যেতো যে দেখো এটা আমরা বাংলাদেশের সকল জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এভাবে ঠিক করেছি। আমরা এর কোনো উল্টাপাল্টা হলে চুক্তি করতে পারবো না। তোমাদের খোড়া যুক্তি আমাদের সচেতন জনগণ মানবে না। আমরা বিদেশ নীতি দেশের সবার মতামত নিয়ে ঠিক করেছি। এটা কোনো একক সরকারের দায় নয়। তখন ভারতীয় পক্ষ সেই বিষয়ে চূড়ান্ত আমলে নিতে বাধ্য। ভারত যদি বুঝতে পারে যে এটা বাংলাদেশের সকল জনগণের কথা। সেটাকে ফেলে দেকার চেষ্টা তারা করলে তাদের সঙ্গে কঠোর অবস্থানে তখন যাবে বাংলাদেশ। তখন আর নতজানু পররাষ্ট্র নীতির তকমা গায়ে লাগবে না। কিন্তু আমরা গুটি কয়েক রিজভী, দিপুমনি আর কায়েস নির্ভর হয়ে চলি। আমাদের সারা বিশ্বে গোয়েন্দা সংস্থার লোক লাগানো। একজন মমতা ব্যানার্জী কার উস্কানীতে সবকিছু এলোমেলো করে দিলো তা কেউ জানলো না। আর এখন সব শেষমেষ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো।
একজন দিপুমনি বা একজন রিজভী বা একজন কায়েস কী এখন বিগত ১০ মাসে ভারত বিষয়ে রাষ্ট্রের যতো টাকা খরচ করেছেন তা এখন জনগণকে ফিরিয়ে দেবেন? কিংম্বা কেউ এই ব্যর্থতা স্বীকার করে নিজ পদ থেকে পদত্যাগ করবেন? কিংম্বা প্রধানমন্ত্রী এই ব্যর্থতার জন্যে কাউকে বরখাস্ত করবেন? আমরা জানি না।
বাংলাদেশে জনগণের চেয়ে দল বড়। দলের চেয়ে নেতা বড়। নেতার চেয়ে দলপ্রধান বড়। দলপ্রধানের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর বাংলাদেশের ভাগ্য ঝুলে থাকে। আর এখানে একদল চামচা সারা বছর সেই ফাঁক গলিয়ে আখের গোছায়। এই চর্চা আর কতোদিন চলবে আমরা জানি না। আমরা বোকা জনগণ শুধু জানি আমাদের বিএসএফ গুলি করে মারবে। আমাদের সীমান্তে কালোবাজারী চলবে। আমাদের সংসদ সারা বছর অকার্যকর থাকবে। আমাদের বিরোধীদল সারা বছর সংসদের বাইরে গলাবাজী করবে। আর বছর ঘুরে নির্বাচন আসলে আমরা মুর্খের দল সেই উৎসবে ঝাঁপিয়ে পড়বো। আমাদের বিদেশ নীতি কোনোদিন সঠিক হবে না। কারণ আমরা তা ঠিক করতেই চাই না। আমাদের দিপুমনিদের মনোমুগ্ধ হাসিতে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29444141 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29444141 2011-09-07 08:35:16
আজ মহান মে দিবস: বাংলাদেশে এখনো শিশু শ্রমিক নির্যাতন চলছে
ক্ক্সবাজার সিবিজ পৃথিবীর দীর্ঘতম সিবিজ। এই সিবিজকে ঘুরে চলছে নানা ধরনের কারবারী। এই কারবারীর সঙ্গে জড়িত এদেশের সংখ্যালঘিষ্ঠ কতিপয় ব্যবসায়ী। এরা কারা? এরা ধনিক শ্রেণী। এরা কারা? এরা বণিক শ্রেণী। এরা কারা? এরা সরকারের দালাল। এরা কারা? এরা সরকারের পোষ্য বাহিনী। এরা কারা? এরা সরকারের লেলিয়ে দেওয়া লুটেরা। এরা কারা? এরা সরকারের প্রতক্ষ্য নজরদারীতে কারবারী করতে থাকা বিশিষ্ট শ্রমশাসক বাহিনী। এরা খোদ সরবারের চেয়েও কখনো কখনো শক্তিশালী। কারণ, এদের রয়েছ এমপি। এদের রয়েছে মিনিস্টার। এদের রয়েছে আমলা। এদের রয়েছে বিচারপতি। এদের রয়েছে থানা পুলিশ। এদের রয়েছে আজগুবি টেলিফোন। এদের রয়েছে গডফাদার। এদের রয়েছে কথিত গ্যাং। তাই এরা বড়োই শক্তিশালী।

বাপ্পী নামের ছেলেটির বয়স মাত্র ৬ বছর। কক্সবাজার সিবিজে বাপ্পী দৈনিক ১৪ ঘণ্টা কাজ করে। সকাল ৬টায় বাপ্পী কাজ শুরু করে। রাত ১০টায় বাপ্পী কাজ শেষ করে। বাপ্পী রোজ কয়টাকা ইনকাম করে? আমরা কেউ বলতে পারিনা। বাপ্পী তার একমাত্র মাকে রোজ কয়টাকা দিতে পারে আমরা কেউ জানিনা। আমরা শুধু জানি বাপ্পী রোজ ১৪ ঘণ্টা সিবিজে কাজ করে। সিবিজে বাপ্পীকে সব্বাই চেনে। সিবিজে যারা বাপ্পীকে দিয়ে কাজ করায় এবার শোনা যাক তাদের বক্তব্য:
বাপ্পী রোজ ১০০ টাকা আয় করে। যদি ১০০ টাকার কম হয়, তাহলে সে ১০০ টাকা পুরতে যতোটাকা দরকার, পরিচিত তাদের থেকে বাপ্পী ততোটাকা ধার নেয়। তারপর পাহাড়ের ঢিবির উপর মায়ের কাছে চলে যায়।
বাপ্পীর মা ওই ১০০টাকা কী রোজ পায়? আমরা জানিনা। বাপ্পী ইস্কুলে যায় না। কারণ, ইস্কুলে তো রোজ তাকে কেউ ১০০টাকা দেবে না। তাই বাপ্পীর মা তাকে সিবিজে পাঠায়।
গত ২৬শে এপ্রিল থেকে ২৯শে এপ্রিল ২০১১ আমি বাপ্পীর উপর খোঁজখবর রেখেছি। বাপ্পীর কখনো একঘণ্টায় ১০০টাকা ইনকাম হয়। কিন্তু বাপ্পীর কাছে সেই টাকা থাকে না। অজ্ঞাত কেউ বাপ্পীর কাছ থেকে সেই টাকা সংগ্রহ করে। সারাদিনে বাপ্পী একবারের জন্যও বাড়িতে যায় না। বাপ্পীর মা কখনো তার অসুস্থ শরীর নিয়ে সিবিজে কাপ্পীকে খুঁজতে আসেনা। কিন্তু সিবিজে বাপ্পী যে টাকা ইনকাম করছে তা তাহলে কে নিয়ে যাচ্ছে? আমরা জানিনা। বাপ্পী বাড়িতে যায় কীনা তা নিয়েই যথন আমার সন্দেহ হল তখন এক আজব জিনিস আবিস্কার হল। আমার সহধর্মিনী মায়া আমাকে দেখাল, দেখো বাপ্পী ঘুমিয়ে গেছে। ও কখন বাড়িতে যাবে? প্রধম দিন আমরা সন্দেহ করেছিলাম। পরদিন বাপ্পীর বয়সি অন্যদের দিকেও নজর দিলাম। খেয়াল করলাম একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর বাপ্পী এবং বাপ্পীর বয়সি যারা সিবিজে কাজ করে, তারা সবাই থেমে থেমে ঘুমায়। এই ঘুমের রহস্য উদ্ধার করতে লেগে গেল আরো একদিন। বাপ্পীরা সবাই প্রায় ঘণ্টা খানেক ঘুমায়। আবার জেগে ওঠে। আবার কাজে নেমে পড়ে। ওই ঘুমের সময়টায় তাদের ইনকাম করা টাকাটা চুরি হয়। চুরি কারা করে? বাপ্পীদের যারা ক্ক্সবাজার সিবিজে পালন করছে অজ্ঞাত এই শ্রেণীর একটা বাহিনী আছে। তারা খুউব কৌশলে বাপ্পীরা যখন ঘুমায় তখন তাদের টাকা পয়সা সব কেড়ে নেয়। ঘুম থেকে জাগার পর বাপ্পীদের কিছুই মনে থাকেনা। কারণ, বাপ্পীরা সব্বাই থাকে নেশাগ্রস্থ। খাবারের সঙ্গে তাদের নেশা জাতীয় জিনিস খুউব কৌশলে খাইয়ে দেয় ওরা। ঘুম থেকে জাগার পর বাপ্পীদের আর পিছনের কিছুই মনে থাকেনা।

বাপ্পীরা আমাদের দেশের কোমলমতি শিশু। তাদের দিয়ে ব্যবসা করছে এক শ্রেণীর পিচাস। এই পিচাসদের কোনো মানবতাবোধ নেই। কোমলমতি এইসব শিশুদের তারা ইনকাম করার সহজ উপায় হিসাবে ব্যবহার করছে। বাপ্পীরা কেউ তা টের পাচ্ছেনা। বাপ্পীদের মা-বাবারাও তা টের পাচ্ছেনা।
বাপ্পীরা জানেনা তারা রোজ কতো টাকা ইনকাম করছে। বাপ্পীদের মা-বাবারাও জানেনা তাদের সন্তানরা রোজ কতো টাকা ইনকাম করছে। তারা কেউ জানেনা তাদের সন্তানদের নেশাজাতীয় জিনিস খাওয়ানো হচ্ছে। তারা কোনোদিন এর প্রতিকারও পাবেনা। এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ, এই প্রতিকার করার যারা রাঘববোয়াল, আমাদের সরকার, আমাদের পুলিশ বাহিনী, আমাদের আমলা, আমাদের বিচারপতি, তারা সব্বাই বাপ্পীদের এই ইনকাম থেকে মাসোহারা পায়। আর বাপ্পীরা ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে চলে যায়। আমরা আমজনতা কিচ্ছু টের পাইনা।
বাপ্পীদের নিয়ে যারা ব্যবসা করছে তাদের নিয়ে আমাদের মিডিয়া কেনোদিন কিছু লেখেনা। বাপ্পীদের নিয়ে আমাদের হাজার হাজার টেলিভিশন চ্যানেলের কেউ কোনোদিন রিপোর্ট করেনা। বাপ্পীরা নিরবে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকে। কারণ, বাপ্পীরা গরিব মা-বাবার সন্তান। বাপ্পীদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই।

.......................সময় সুযোগ হলে বাপ্পীদের নিয়ে একটা ধারাবাহিক লেখার ইচ্ছে রইল।

০১ মে ২০১১, বনানী, ঢাকা ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29372972 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29372972 2011-05-01 10:20:42
চলনবিলের হু হু হাওয়ায় হাঁটতে থাকা মানুষের গান ।। রেজা ঘটক বর্ষকালের কোনো এক অদ্ভুত ঘোর লাগা রাতে জিন্দান-শাহ পীরের তাবিজে ভর করে চলনবিলের ধর্মপ্রাণ যুবক আবদুর রহিম স্বপ্নে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করে। আবদুর রহিম বড়োই ভীতুমনের দুর্বল চিত্তের পুরুষ হলেও পুরো উপন্যাসে আমরা তাকে দু’বার খুব সাহসী ভূমিকা পালন করতে দেখি। আর সেই সুযোগ আর রহস্যকে হাতিয়ার করে এই সময়ের শক্তিমান কথা সাহিত্যিক জাকির তালুকদার অমন এক ভীতু চরিত্র আবদুর রহিমের মধ্যেও এক ধরনের আরোপিত সংগ্রামবোধ জাগানোর প্রয়াসে অনায়াসে ১৪৪ পৃষ্ঠা কখন যে ভরাট করে ফেলেন, তার স্বভাবসুলভ ঘটনা অনুঘটনার হাত ধরে পাঠক তা একটুও টের পান না। চলনবিলের চালচিত্র, আর্থ-সামাজিক প্রোপট, ওখানকার সহজ সরল মানুষের পাশাপাশি রাষ্ট্র কর্তৃক প্রত্য বা পরো ভাবে তৈরি করা শোষক শ্রেণীর দৈনন্দিন অনাচারের বিবরণ, গ্রামীণ সহজ সরল মানুষগুলোর কঠিন জীবন সংগ্রাম, লঘুবুদ্ধি, ধর্মান্ধতা, শ্লেষ, মুর্খামী, ভণ্ডামী, আচার-আচরণ, কৃষ্টি সংস্কৃতিকে ঘিরে এগিয়ে চলে উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র লালসালু’তে মজিদ যেমন একটা যুক্তিসঙ্গত মাজারের সন্ধান পায়। জাকির তালুকদারের ‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’ উপন্যাসে সেই ধরনের একটা প্রচেষ্টা আবদুর রহিমকে কী করানো হয়েছে? যেখানে জিন্দান-শাহ পীরের অলৌকিক তাবিজের পেছনে যুবক আবদুর রহিমকে ছোটানোর ব্যাপারটা কী তাহলে পুরনো বোতলে নতুন মদ ঢেলে খাবার আকাঙ্খার মতো ব্যাপার। পড়তে গিয়ে পাঠক সন্ধান পাবেন এক বোবা যুবতীর। স্বপ্নে তাবিজের পরিবর্তে বোবা যুবতী মেয়েটি হয়তো যৌবন উন্মাদনা দেয়। এই বোবা মেয়েটি হয়তো আবদুর রহিমের স্বপ্নের নায়িকা। ‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’ জাকির তালুকদারের কোন ধরনের উপন্যাস? একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে কিছু পার্শ্ব চরিত্রের আরোপিত সাহায্য নিয়ে কয়েক মাসের ঘটনার কিছু রিপোর্টং ফলাফলকে পুঁজি করে দিলেই উপন্যাস হয়ে যায় কীনা তা জানার জন্য জাকির তালুকদারকে আমি তাড়িয়ে বেড়াবো। উপন্যাসে যারা জনগোষ্ঠী, তাদের কী কী বিষয় উঠে আসাটা উপন্যাসের স্বার্থপূরণের জন্য জরুরী, চরিত্রের পুনঃপুনঃ কেন্দ্রিকতার জন্য কী কী সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্য প্রয়োগ করা প্রাসঙ্গিক, কোন কোন বিষয় আশয় উপস্থাপনের মতা থাকলে উপন্যাসের প্যাটার্ন বদল করা সম্ভব, উপন্যাসের সময় কাল কতোটুকু হওয়া চাই, পাত্রপাত্রীরা কী কী করবে, কী কী করবে না, পরিবেশ পরিপার্শ্বিকতা কী হবে, শুধু রাতের গল্প বলা হবে নাকি দিনের আলোতে একই চরিত্রগুলো কী করে কী করে না তার পূর্ণাঙ্গ নাকী আংশিক বিষয়াবলী উপন্যাসের আঙ্গিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় উত্যাদি বিষয়ে আমি জাকির তালুকদারের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। তখন হয়তো তাঁর ‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’ উপন্যাসটা আমার কাছে আরো বেশি বোধগম্য হয়ে যাবে।
নাকী জাকির তালুকদার কিছু অলৌকিক ঘটনার সীমাবদ্ধতার গ্যারাকলে আমাদের যাদুবন্ধী রেখে শুধু গল্প শুনিয়ে যেতে চান। শাজেরজাদী যেমন রোজ রাতে রাজাকে একটা নতুন গল্প শোনাতেন আমরাও জাকির তালুকদারের কাছে তাই শুনতে থাকি। কারণ, নতুন গল্প শুনাতে না পারলে রাজা শাহেরজাদীকে হত্যা করবেন। পাঠক হয়তো তা না করে জাকির তালুকদারকে শুধু এড়িয়ে চলবে। কিন্তু জাকির তালুকদার তাই নানা ফন্দি করে নতুন ঘোর লাগানের চেষ্টা করেন পাঠককে। পিসিখালি মসজিদের খাদেমের ছোট মেয়ে টুলটুলি তাই খুব বেশি কথা বলে। পাঠকের তখন না হেসে আর কী উপায় আছে?
‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’-এর দীর্ঘ প্যাঁচালীতে সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র আলাউদ্দিন মাস্টার তাই কিছুটা দাপুটে অবস্থান নিয়ে গল্পকে ধরে রাখেন। গৌরাঙ্গকে পাগল বানানো আর ভালো বানানোর মাধ্যমে যে গল্প জাকির তালুকদার পাঠককে শুনতে বাধ্য করেন, সেখানে গৌরাঙ্গকে পাগল না বানিয়েও চরিত্রটি কিন্তু পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু জাকির তালুকদার শেক্সপেরিয়ান ভঙ্গিতে যখন তাকে খুন করান তখন তা আমার কাছে অনেকটা খেলো হয়ে যায়। পেছনে ধরা পড়ে তার বঙ্গভাই নিয়ে ঘটনার সাবালিক বয়ান আর এন্তাজ ও নান্নুর কারবার। খাদেম সাহেবকে কী করে ভুলে যাবে মানুষ? সে না হয় বাদ দিলাম, বোবা যুবতী মেয়েটা উপন্যাসে যে প্রবল শক্তিশালী মোচড়ের ঝিলিক মেরেছিল, জাকির তালুকদার সচেতনভাবে তা যেন এড়িয়ে গেলেন। এখানে আমার অনেক প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে জাকির তালুকদারকে। বোবা মেয়েটি তো অনেক কিছু করতে পারত। করল না কেন? নাকি প্রকাশকের কোনো অদৃশ্য তাড়না খেয়ে জাকির তালুকদার উপন্যাস শেষ করতেই ব্যস্ত ছিলেন তখন?
উপন্যাস লেখার আগে তার ব্যাপ্তি, অবয়ব, পাত্রপাত্রী, কল্পকাহিনী, কাল সচেতনতা ইত্যাদি বিষয়ের যে প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনীয়তা তা ধরে রাখতে গিয়ে জাকির তালুকদার যেন ইচ্ছে করেই কদমের মতো শক্তিশালী ক্যারেক্টারকেও আহত করে হাসপাতালে শুইয়ে রাখেন। অথচ যে দেশি কুকুরটি মিছিলের পিছু পিছু যাচ্ছিল, তাকে মেরে ফেললে তো উপন্যাস বিলিন হয়ে যাবার কথা। পাঠক হিসেবে আমার তখন খুব কষ্ট হয়। কী সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হওয়া এমন একটা উপন্যাস শেষ করার ইচ্ছে জাকির তালুকদার নিজেই যেন গুটিয়ে রাখেন। জাকির তালুকদারের কী হাত ব্যথা করে? কেন তা আমার মাথায় আনে না। চলনবিলের বর্ষাকালের রাত যেমন পাঠককে নস্টালজিয়ায় ডুবিয়ে রাখে, দিনের বেলায় সেই চলনবিলের দিকে জাকির তালুকদার যেন পাঠককে ইচ্ছে করেই নিতে চাননি। অথচ পাঠক হিসেবে বারবার আমার শুধুমাত্র বর্ষকাল নয় বাংলার ছয় ঋতুর দিনরাত আর চলনবিলের যে রূপ পরিবর্তন তা দেখার ইচ্ছে ছিল ‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’ উপন্যাসে। যেসব পাঠক জীবনে এবকারও চলনবিল দেখেননি তাদেরকে জাকির তালুকদার ইচ্ছে করেই যেন চলনবিলের সেই নস্টালজিক পরিবর্তনের গান শোনাতে চাননি। কিন্তু সকল পাঠক তো আর চলনবিলের মানুষ নয় যে বাকী সময়টা তারা এমনিতেই বুঝে নিতে পারবেন। চলনবিলের দিন রাত্রি ঋতু পরিবর্তন কী সকল পাঠক হুট করে বুঝতে পারবেন? এেেত্র জাকির তালুকদার অযথা যেন একটু বেশি কঞ্জুস রয়ে যান। একজন চলনবিল বাসী হয়েও জাকির তালুকদার তাই অনায়াসে চলনবিল শুকানোর দিনগুলোতে সেখানে যে প্রাণের জোয়ার স্রোতের মতো বইতে থাকে তা রহস্যময় কারণে উপো করেন। তখন পাঠক হিসেবে আমার ভারী কষ্ট হয়। অথচ যা হয়তো এই উপন্যাসে খুবই জরুরী বিষয় হতে পারত। যা ‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’ উপন্যাসে পাঠক হিসেবে আমি খুঁজতে গিয়ে পাইনি। পেয়েছি জাকির তালুকদারের পছন্দের চরিত্র ঝিমানো স্বভাবের আবদুর রহিমের চোখে অপরিপক্ক এক চিত্র, যা শেষ পর্যন্ত কী আবদুর রহিমের মতো অপরিপক্ক হয়ে যাবার অছিলা খোঁজে কীনা জানি না?
‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’ উপন্যাসে শক্তিশালী ক্যারেক্টার গুলো হল চলনবিল, আলাউদ্দিন মাস্টার, বোবা যুবতী, কদম আর গৌরাঙ্গ। এদের সকল বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে জাকির তালুকদারের কেন এতো গরিমসি করেন নাকি সচেতনভাবেই তাদের সকল বৈশিষ্ট্য তুলে আনতে লেখকের সময় নেই আমার বুদ্ধিতে কুলোয় না? আমার তখন পাঠক হিসেবে জাকির তালুকদারের উপর চল্লিশ হাজার বছরের রাগ তৈরি হয়। আহা কতো সম্ভাবনাময়ী ক্যারেক্টারগুলোকে একজন লেখক এভাবে এড়াতে পারলেন? উল্টো যখন দেখি ভাড়া করা অনুযোগী ক্যারেক্টারগুলো যেমন এন্তাজ, মুন্না, বঙ্গভাই, এদের কর্মকাণ্ড নিয়েই জাকির তালুকদার বোগল বাজাতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তখন আমার রাগ ােভ থেকে বিােপের দিকে ধাবিত হয়। ইচ্ছে করে জাকির তালুকদারের হাতের কলমটি কেড়ে নিয়ে নিজেই বাকীটা লিখকে বসি।
সব দিক বিচার করে হাঁটতে থাকা মানুষের গান’কে উপন্যাসের খণ্ডাংশ বললে বরং অতিরিক্ত আদিতোই দেখায়। পাঠক হিসেবে বলতে পারি জাকির তালুকদার খুব যতেœ উপন্যাসের যে গ্রাউন্ড তৈরি করেছেন তা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু ইট বালি সরকি সিমেন্ট যেমন বিল্ডিং বানানোর উপাদান কিন্তু দ ইঞ্জিনিয়ার, ক্রিয়েটিভ আর্কিটেক্ট, কুশলি রাজমিস্ত্রী আর সুন্দর নকশা না হলে বিল্ডিং যেমন অসুন্দর হয়ে যাবার আশংকা থাকে, বিল্ডিংয়ে যেমন প্রটেকশান থাকে না, ভূমিকম্প থেকে ওই বিল্ডিং রা পাবে কীনা কেউ জানে না, ওই বিল্ডিংংে পর্যাপ্ত আলো বাতাস এফোড় ওফোড় হুটোপুটি করতে পারবে কীনা দুশ্চিন্তা থাকে, তেমনি নেয়ামুল কোরআন বুকে নিয়ে আবদুর রহিমের মাধ্যমে জাকির তালুকদার যতোই একটা ভালো উপন্যাস লেখার চেষ্টা চালান ততোই বুঝি তার সম্ভাবনাকে আতুর ঘরেই মেরে ফেলার দুর্বলতা ধরা পড়ে বা সময় উপোর বিষয় উন্মেচিত হতে থাকে।
আমরা যদি ঢাকার অভিজাত চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী আর্ন্তজাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে কয়েকজন কথা সাহিত্যিককে তিন দিনের জন্য আটকে রাখি আর বলি আপনারা প্রত্যেকে একটা করে উপন্যাস লিখুন। যাঁর উপন্যাস শ্রেষ্ঠ হবে তাঁকে বাংলাদেশী নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে। আপনাদের জন্য সময় মাত্র তিন দিন। পুরস্কারের মূল্যমান দশকোটি টাকা। খাবার দাবার, ঘুমানোর ব্যবস্থা, লাইব্রেরি, ডিকশোনারি, বিনোদন সকল বিষয়ের যথেষ্ট সাপোর্ট দেওয়া হবে। কারণ, এই প্রজেক্টে হয়তো চোখ বন্ধ করে মাল্টি কর্পোরেট কোম্পানির কেউ কেউ বিনিয়োগ করবেন। নাচ, গান, বিনোদন, সুইমিং, সকল সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা দেওয়া হবে। কিন্তু এই তিন দিন কোনো লেখক আমাদের কার্যক্রম শেষ না করে বাসায় যেতে পারবেন না। কাছের কোনো আত্মীয় মারা গেলেও না। উপন্যাস তাঁকে তিন দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। কারণ, আমরা জানি অমর একুশের বইমেলা উপলে আপনারা কেউ কেউ এক রাতেও উপন্যাস শেষ করার মতো রেকর্ডধারী। যদি সত্যি সত্যিই এমন একটা আয়োজন করে আমাদের লেখকদের দিয়ে উপন্যাস লেখানোর একটা প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়, চলুন দেখা যাক এবার সেখানে কে কী লিখছেন। কারণ এই লড়াইটা লেখকদের হলেও এটা অনেকটা আমাদের ইস্কুল সময়ের শীতকালীন বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মতো। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করাই এখানে আসল কাজ। তো চলুন আমরা ঘুরে ঘুরে দেখি কে কী লিখছেন?
হুমায়ূন আহমেদ শুরু করেছেন একটা আজিব টাইপের নয়া হিমু ক্যারেক্টার দিয়ে। দিনের বেলায় এই হিমু সম্মেলন কেন্দ্রের ছাদে উঠে বসে থাকে। রাতের বেলায় হলে ঢুকে কাপের্টের নিচে তার নিখোঁজ প্রেমিকাকে দুরবীন দিয়ে খোঁজে। হিমুর ধারণা তার প্রেমিকা হয়তো হাওয়া খেতে পাশের চন্দ্রিমা উদ্দ্যানে একা একা ঘুর ঘুর করছে। কিন্তু তার নাগাল সে কিছুতেই পাচ্ছে না। মুহম্মদ জাফর ইকবাল শুরু করেছেন সূর্যের আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি নিয়ে আদম নামের এক বিজ্ঞানীর গবেষণা দিয়ে। আকাশের অদৃশ্য সেই ফুটোটি বন্ধ করার উপায় বের করবেন আদম। আর এজন্য তার আছে তেরো জন লিলিপুট বিজ্ঞানী। যাদের বয়স তেরো থেকে ঊনিশ। যারা আন্ডারগ্রাউন্ডে দিনরাত আদমের নের্তৃতে গবেষণায় মত্ত। পৃথিবীর তাপমাত্রা স্বাভাবিক করতে গ্রিন হাইজ এফেক্ট তারা যে করেই হোক ঠেকাবেন। নইলে পৃথিবীকে আর রা করা যাচ্ছে না। সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। পরিবেশ প্রকৃতি দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আদম মনে করেন তাদের গবেষণা ব্যর্থ হলে পৃথিবী নিশ্চিত ধ্বংস হয়ে যাবে।
সৈয়দ শামসুল হক শুরু করেছেন এক অদ্ভুত মানুষ টাকু সোলায়মানের গল্প। এই টাকু সোলায়মান শুধু হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকতে পারেন। জন্মের সময় টাকু সোলায়মান দেখতে হয়েছিল একশো কুঁড়ি বছরের বৃদ্ধের মতো। মাথায় তার বিশাল টাক। মুখ ভরতি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। যতোই তার বয়স বাড়ে ততোই এই টাকু সোলায়মান বৃদ্ধাবস্থা থেকে ইয়ং হতে থাকে। সবাই বয়স বাড়লে যেমন বুড়ো হয় এই টাকু সোলায়মান তার ঠিক উল্টো। তার লাইভ সাইকেল উল্টো। বৃদ্ধ থেকে ধীরে ধীরে সে একদিন শিশু হয়ে যাবে। এবং একেবারে ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো হয়ে যাবার পর এই টাকু সোলায়মানের হয়তো মৃত্যু হবে। তার একমাত্র মেয়ের মেয়ে মানে তার নাতনী তখন তাকে কোলে করে ঘুরবে। কারণ, টাকু সোলায়মানের বউ ততোদিনে একশো বছরের বৃদ্ধা। সেলিনা হোসেন শুরু করলেন এক মুক্তিযুদ্ধের সাহসী নারীকে দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই নারীর বিয়ের রাতেই তার স্বামী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ঘর ছাড়েন। আজো তার স্বামী বেঁচে আছেন কীনা সখিনা বিবি তা জানেন না। সারা বাংলাদেশের বদ্যভূমি গুলো সে চষে বেড়ায়। সখিনা বিবির ধারনা তার স্বামী যদি যুদ্ধে মরেও যায় বদ্যভূমিতে সে তাঁর লাশ খুঁজে পাবে।
ইমদাদুল হক মিলন শুরু করলেন ভারত বাংলাদেশ বর্ডারের নো ম্যানস ল্যান্ডে বিএসএফের গুলিতে নিহত এক কিশোরীর গল্প দিয়ে। ছিটমহলের বাসিন্দা এই কিশোরী হেনা। কিশোরী হেনা গুলিতে নিহত হবার আগে কয়েকজন দুষ্টু কর্তৃক ধর্ষিত হয়েছিল। অমাবস্যার রাতে সে ছিটমহলের বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে গিয়েই বিএসএফের গুলির মুখে পরে। তারপর যত্তোসব বিপত্তি। নাসরিন জাহান শুরু করেছেন অদ্ভুত এক কালো বিলাই দিয়ে। এই কালো বিলাই দিনের বেলায় লেখকদের টেবিলের নিচে আরামে ঘুমিয়ে থাকে। রাতের বেলায় এই কালো বিলাই ভৌতিক সব কর্মকাণ্ড শুরু করে। কালো বিলাইকে আটক করার জন্য সিকিউরিটির লোকজনদের সাথে বিশাল এক ঝামেলা হয়। সেখানে র‌্যাব পর্যন্ত আসে। ঘটনা কোন দিকে যাবে বোঝা যাচ্ছে না।
কাজী আনোয়ার হোসেন শুরু করেছেন এক গোয়েন্দার গল্প দিয়ে। এই গোয়েন্দার নাম মাসুদ রানা। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্র“য়ারি ঢাকার পিলখানায় যে বিডিআর বিদ্রোহ হয়েছিল তার নেপথ্যে কে বা কারা জড়িত ছিল তাদের খুঁজে বের করতে মাসুদ রানা অভিযান শুরু করেছেন। বর্তমানে সে বিভিন্ন বিডিআর ক্যাম্পে ইমাম সেজে তার গোয়েন্দা কাজ করছেন। বর্তমানে মাসুদ রানা কুড়িগ্রামের রৌমারী ক্যাম্পে যাবার জন্য পুরাতন ব্রম্মপুত্র ঘাটে অপো করছেন। আনিসুল হক শুরু করেছেন এক বোবা মেয়ের প্রেমের গল্প দিয়ে। বোবা মেয়েটি ইন্টারনেটে চ্যাট করতে করতে এক সময় শহরের সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসী, পুলিশের তালিকায় যে কীনা এক নম্বর দাগী আসামী তাকে ভালোবাসতে থাকে। যেদিন বোবা মেয়েটি তার প্রেমিকের সাথে দেখা করবে, সেদিন বাংলাদেশ পুলিশ ওই সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে। মেয়েটি যে বোবা তা সে ওইদিন-ই প্রথম বুঝতে পারে। জেলখানায় সে মনে মনে শপথ করে ছাড়া পেলে সে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ছেড়ে দিয়ে বোবা মেয়েটিকে বিয়ে করে বিদেশে কোথায় চলে যাবে।
ঘুরতে ঘুরতে আমরা যখন আমাদের জাকির তালুকদারের সামনে আসি দেখি, তিনি শুরু করেছেন চলনবিলের নিচে এক বিশাল রতœভাণ্ডারের খোঁজে একদল খনিশ্রমিক দিনরাত খনন করে যাচ্ছেন এমন এক জটিল আজগুবি গল্প দিয়ে। সেখানে উপস্থিত বাংলাদেশী ভূতাত্ত্বিকবিদ, খনি গবেষক, প্রকৌশলী আর খনিশ্রমিকদের ধারনা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী পারমানবিক বোমা তৈরির উপাদান ইউরোনিয়াম আর সাদা গ্রাফাইটে চলনবিলের তলদেশ পুরোপুরি ভরপুর। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশী যে সকল ভূতাত্ত্বিক এই কাজে জড়িত তারা সবাই এটা ঠিকমতো বুঝতে পারছেন না। রাজনৈতিক দলগুলো আবার এটা নিয়ে মহা ক্যাচাল শুরু করেছে। কেউ বলছে রাশিয়া বা ভারত থেকে খনি বিশেষজ্ঞ আনা হোক। কেউ বলছে আমেরিকা বা পাকিস্তান থেকে আনা হোক। একদল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক আর ছাত্রছাত্রীরা আবার দেশী বিশেষজ্ঞ দিয়ে কাজটা করানোর জন্য মহা আন্দোলনে যাবার হুমকি দিচ্ছেন। খনি থেকে ইউরোনিয়াম আর সাদা গ্রাফাইট তোলার কাজ আপাতত বন্ধ। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কোনদিকে যায় সেই অপোয় সবাই। তার মধ্যে গুজব শোনা যাচ্ছে কে বা কারা যেন রাতের অন্ধকারে চলনবিলের নানা পয়েন্টে খনন কাজ করছে। তারা কখন কী করছে কী নিয়ে যাচ্ছে এই নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। পত্র পত্রিকা টেলিভিশনের চোখ এখন চলনবিলের অজ্ঞাত ওই গুপ্ত সম্পদের দিকে।
আমরা নাসরিন জাহানের কালো বিলাইয়ের দেখা মিলতেই ভয়ে দ্রুত সম্মেলন কেন্দ্রের বাইরে চলে আসি। কে জিতবে প্রথম বাংলাদেশী নোবেল এই নিয়ে আমাদের আড্ডা চলছিল। আড্ডায় কেউ একজন বলল, অদ্বৈত মল্লবর্মণের একটা নদী ছিল। সেই নদীর নাম তিতাস নদী। যা থেকে তাঁর হাতে সৃষ্টি হয়েছে তিতাস একটি নদীর নাম। জাকির তালুকদারের একটা চলনবিল আছে বটে। কিন্তু সেই চলনবিল থেকে জাকির তালুকদার কতোটুকু সম্পদ তুলতে পারবেন তার জন্য আমাদের হয়তো আরো অপো করতে হবে। নাকি তিনি শুধু জোসনা রাতে চলনবিলে ঘুরে ঘুরে রাতের তারা গুনবেন তাও সময় বলে দিবে।
‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’ জাকির তালুকদারের এক রহস্যময় উপন্যাস। কোথাও কোথাও লম্বা বাক্য পাঠকের খেই ঘুরিয়ে দিতে পারে। তবু ভরসা চলনবিল আছে। হু হু হাওয়া আছে। জাকির তালুকদার সেই হাওয়ায় ভর করে পাঠককে ছুটিয়ে নিয়ে চলেন।

বনানী, ঢাকা
০৭-০২-২০১১
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29321871 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29321871 2011-02-07 13:34:05
শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য দশমিক শূন্য
রেজা ঘটকের গদ্য বই
বের করেছে আল-আমিন প্রকাশন
স্টল নং - ১৬, অমর একুশে বইমেলা ২০১১, বাংলা একাডেমী, ঢাকা

প্রচ্ছদ: এ্যান্টনিও ক্যানোভার দ্য কুপিড কিস অবলম্বনে লেখক
মূল্য: ১৮০.০০ টাকা বা ১৫ মার্কিন ডলার]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29318873 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29318873 2011-02-02 12:07:01
সাধুসংঘ ।। রেজা ঘটক রেজা ঘটকের ছোটগল্প সংকলন `সাধুসংঘ'।
প্রচ্ছদ: মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর দ্য মোসেস অবলম্বনে লেখক
মূল্য: ১৪০.০০ টাকা, অথবা ১৩.০০ মার্কিন ডলার
আইএসবিএন: ৯৭৮-৯৮৪-৩৩-১০৯৪-৬
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29310847 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29310847 2011-01-20 13:20:07
হারানো বিজ্ঞপ্তি একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি: ভূতের গলি নিবাসী কানামোড়ের পাশ থেকে আট নয় দিন বয়সি একটি ফুটফুটে বিড়ালছানা আজ সকালে হারিয়ে গেছে। ফুটফুটে সুন্দর বিড়াল ছানাটির গায়ের রঙ সাদা। পেটের ওপর কালো ডোরা কাটা। কান দুটো খাড়া। চোখ দুটো হালকা বেগুনি। গায়ের লোম বড়বড়। আদরে বিড়াল ছানাটি মিউমিউ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। সে কেবল তার মায়ের নাম ‘মিউ’ বলতে পারে। যদি কোন সহৃদয়বান ব্যক্তি আদুরে ফুটফুটে বিড়াল ছানাটির সন্ধান দিতে পারেন, তাহলে যোগাযোগের ঠিকানা Ñ ৩৬, পটলতোলা গলির মাথা, ভূতের গলি, ঢাকা, বাংলাদেশ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29269641 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29269641 2010-11-10 10:00:47
আজ `বাংলার মাটি বাংলার জল'-এর প্রিমিয়ার শো : জাতীয় নাট্যশালা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী : সন্ধ্যা ৭:০০টা ছিন্নপত্র অবলম্বনে
`বাংলার মাটি বাংলার জল'
-এর
আজ প্রিমিয়ার শো ।
রচনা : সৈয়দ শামসুল হক
নির্দেশনা : আতাউর রহমান

ভেন্যু : জাতীয় নাট্যশালা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী
সময় : সন্ধ্যা ৭:০০টা
তারিখ : ৭ নভেম্বর ২০১০

সবাই আমন্ত্রিত।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29268088 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29268088 2010-11-07 11:58:18
২৭ শে জানুয়ারি ২০০৯ ।। রেজা ঘটক ২৭ শে জানুয়ারি ২০০৯ রেজা ঘটক
এ বছর বসন্তকাল কৃষ্ণপক্ষে শুরু।
দুরু দুরু বুকে ডুবি ডুবি চাঁদ
ঢাকা টাওয়ারের ওপাশে হঠাৎ চুপচাপ
কৃষ্ণপক্ষে এ বছর বস্তকালের শুরু।

ধূলো আর উলোট হাওয়া
বার বার আমাকে করে কাবু
তবু, ফুল ফোঁটে রোজ তোমার ঠোঁটে
নীল প্রজাপতি উড়ে উড়ে শেষে
ক্লান্তি রেখে যায় আমার খোলা জানালায়।
বুনো বাতাস আর ধূলো আমার অজাতশত্রু।

শীত আর গরমের মিশ্রণে
বঙ্গদেশে এখন ফাল্গুন মাস;
পাতা নড়ে, পাতা ঝরে, পাতা ওড়ে
কবি আর সমুদ্র ভারী অস্থির।
বহু যত্নে লালন করা রঙ
তুলির আঁচড়ে বিস্ময় বিমূর্ত সকাল !!!

ঠিক বারো বছর পঞ্চাশ দিন পরে
২৭ জানুয়ারি ২০০৯ শুক্রবার
মা আমার বাবার কাছে গেছে
নিস্তব্ধ কবরে ।।

১০০ কাঁঠালবাগান, ঢাকা
৫ ফাল্গুন ১৪১৫

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29248964 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29248964 2010-10-03 15:08:03
বাস্তিল দুর্গ ।। রেজা ঘটক বাস্তিল দুর্গ ।। রেজা ঘটক

কে ওখানে? - কোথায়? - কাঁঠালবাগান।
একটি ঘর- একটা দরজা, একটা জানালা, একটা ঘুলঘুলি;
কে থাকে ওখানে? - কোথায়? - বিচ্ছিন্নপুর।
একটা রশ্মিতে হাঁটু পর্যন্ত ভাঁজানো একটা প্যান্ট ঝুলছে,
তারপাশে সদ্য ঝোলানো একটা ফ্যাট জিন্স, একটা স্কাই চেক
হাফ শার্ট, কয়েকটা ফাঁকা হ্যাঙার তার মধ্যে একটা টি-শার্ট উল্টো করা,
পাশে একটা লাল রুমাল, একটা অফ-হোয়াইট টি-শার্ট উল্টানো, পাশেই
একটা তোয়ালে ঝুলছে তো ঝুলছে- কার জন্য? এবং কেন?

কে ওখানে? - কোথায়? - অনিদ্রাপুরী।
একজোড়া সু, মুখে তার ছেঁড়া মোজা, পাশে একটা
বিশ কেজি’র আপেলের কার্টুন, তার ওপারে একটা প্লেট
উপুর করা, একটা চিড়ার প্যাকেট, এক টুকরা
আখের গুড়ের পাটালি। - খাদ্য মজুদ?

না, কার্টুনের মধ্যে কিছু পুরনো গল্পের পাণ্ডুলিপি
এখনো অবিক্রিত, কিছু পুরনো সংবাদপত্রের চুম্বক
কালেকশান, কিছু ম্যাগাজিন, কিছু বই, আর কিছু
অসমাপ্ত গল্প একটা পলিথিনে মোড়ানো;

কে ওখানে থাকে? - কোথায়? - দিবা ঘুমালয়।
সোনালী আঁশের একটা নয়া ব্যাগ- ভিতরে কী?
একটা পাটের হাতব্যাগ পুরনো অসামপ্ত গল্পে আর
পুরনো পত্রিকায় ভরপুর; তার ওপরে একটা কালো ছোট
ব্যাগ প্রায় ফাঁকা, পকেটে কিছু পুরনো ঠিকানা আর ফোন নম্বর;
তার ওপরে একটা পুরনো ট্রাভেলিং ব্যাগ- কয়েকটা পুরনো গেঞ্জি,
একটা হাফ প্যান্ট আর একটা পুরনো ডায়েরিতে ভরতি- তারপর
চেন দিয়ে আটকানো।

কে ওখানে? - কোথায়? - বসতবাড়ি।
একটা পুরনো ট্রাংক, পুরনো কাগজে মোড়ানো, তার ওপরে
একটা চেক শার্ট লন্ড্রি থেকে ফেরা, একটা হাফ প্যান্ট, একটা
থ্রি কোয়ার্টার, একটা গেঞ্জি- বাসি কাগজে ঢাকা; তার পাশে
একটা মোবাইল চার্জার, কয়েকটা পুরনো সাহিত্য সাময়িকী
আর একটা অসমাপ্ত গল্পের পাণ্ডুলিপি।
আর ট্রাংকের ভিতরে?
একগাদা অকার্যকর সনদের ফাইল, পলিথিনে মোড়ানো
একগাদা পুরনো চিঠিপত্র, একটা পুরনো হাফ প্যান্ট
একটা পুরনো ছবির অ্যালবাম, কিছু অসমাপ্ত গল্পের পাণ্ডুলিপি
কিছু হারানো দিনের স্মৃতি, কয়েকটা চোরা বই, কয়েকটা কেনা বই
আর কয়েকটা পুরনো দিনের লেখায় ভরা ডায়েরি
আর ফাইল ভরতি কিছু পুরনো ম্যাগাজিন
একটা পুরনো সানগ্লাস, একটা স্কেল আর কিছু পুরনো কলম
কোনটায় কালি নেই- সব স্মৃতির চিন্থ।

কে ওখানে? - কোথায়? - ট্রাংকনগরি।
একটা ব্যাগ, কতগুলো ফাইল অসমাপ্ত লেখায় ভরা
কয়েকটা পুরনো খাতা, একটা প্লাস্টিক ফাইল- পুরনো সংবাদপত্রে
ভরতি, দুইটা পুরনো ডায়েরি, একটা নোট বুক, একটা ইংলিশ বই
‘কমন মিসটেক ইন ইংলিশ’ আর একখানা উপন্যাস- হেনরি রাইডার
হ্যাগার্ড-এর ‘এরিক ব্রাইটিজ’;
একটা কস টেপ, তিনটা পেন্সিল, ছয়টা কলম, একটা মার্কার
একটা মালবরো সিখারেটের খালি প্যাকেট, কিছু ভিজিটিং কার্ড
একটা প্যারিস সেন্ট, একটা ফপি ডিস্ক বক্স, তার মধ্যে একটা ফপি ডিক্স,
দুইটা দিয়াশলাই, এক প্যাকেট ভাঙা গোল্ডলিফ,
তার নিচে কাগজে মোড়ানো কিছু মারিজুয়ানা।
পাশে একটা টুথ ব্রাশ, একটা কোলগেট ফ্যামিলি সাইজ টুথপেস্ট
একটা ওয়ান টাইম রেজার, একটা কোল সেভিং ক্রিম, একটা ওষুধের প্যাকেট
একটা আইড্রপ, একটা সেভিং ব্রাশ আর একটা দিয়াশলাই।

কে ওখানে? - কোথায়? - আরসিনগর।
পুরনো ক্যালেন্ডারের পাতা কসটেপে জোড়া দিয়ে বানানো একটা ম্যাট
তার ওপরে আগে জানালার পর্দা হিসেবে ব্যবহৃত একটা প্যান্টের কাপড়
কিছুটা ছেঁড়া, তার ওপরে একটা নয়া তোশক, একটা পুরনো কাঁথায় ঢাকা;
তার ওপরে একটা কবিতার বই, একটা উপন্যাস- ওসামু দাজাই-এর ‘দি
সেটিং সান’, একটা পুরনো ডায়েরি, একটা ব্যবহারিক বাংলা অভিধান,
কয়েকটা কালের খেয়া, একটা নয়া নোট বুক থরে থরে সাজানো,
তার পাশেই একটা দিয়াশলাই। এসবই একপাশে আর অন্যপাশে?
একটা বোর্ডে অসমাপ্ত কিছু লেখনি, কয়েকটা শাদা পৃষ্ঠা, দুইটা পুরনো
পত্রিকা, একটা কালের খেয়া, একটা নয়া ডায়েরি, পাশেই একটা গোল্ডলিফের
প্যাকেট, ভিতরে তিনটা সিখারেট, তার ওপরে একটা দিয়াশলাই, একটা অ্যাসট্রে
তার মধ্যে একটা গাঁজার গোয়া াণিক আগেই খাওয়া হয়েছে, পাশেই একটা পানির বোতল, দুইটা বাঁশের বসার মোড়া, একটার ওপরে গত সপ্তাহের স্টার ম্যাগাজিন,
তার নিচে ফোরে দুই ইঞ্চি একটা পোড়া ক্যান্ডেল, একটা ১০০ ওয়াটের ফিলিপস
লাইটের বাকশো - এখনো অস্থায়ী বা বিকল্প অ্যাসট্রে; পাশেই একগাদা পুরনো সংবাদপত্র- আমাদের সময়, দি ডেইলি স্টার, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সাপ্তাহিক একাত্তর, সাপ্তাহিক এখন, একটা আর্ট কালেকশান-
হাশেম খানের চিত্রমালা ২০০৫- মধুর গম্ভীর।

কে ওখানে? - কোথায়? - চিত্রপুরী।
একটা ঝাড়–, একটা ময়লার ঝুড়ি প্রায় ভরতি
পাশেই এক জোড়া পুরনো বার্মিজ স্যান্ডেল।
বিছানায় আর কী আছে?
- একটা মোবাইল ফোন, একটা উলঙ্গ বালিশ
আর কাগজে মোড়ানো এক কপি ‘গুরু’- নাসির আলী মামুন-এর
কালেকশান ‘সুলতান এর যতো সময়’। আর কিছু আছে ওখানে?
একটা ১০০ ওয়াটের ভালব সারারাত অনাহারে জ্বলে আছে।

কে ওখানে? - কোথায়? - বিছানায় শুয়ে।
একটা আউলা লোক- কলম পিশে চলতে চায়, পারে না,
চাকরি নেই, পকেটে টাকা পয়সা নেই, খাবার নেই;
বন্ধু নেই, বান্ধবী নেই, ভাইবোন নেই, আত্মীয়স্বজন নেই
মনের মানুষ হয়তো নেই! কী আছে লোকটার?
অনেক হারানো গল্প, অনেক অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি,
ছাপা না হওয়া অনেক কবিতা, ক্লান্ত দুটো চোখ
আর রাশি রাশি দীর্ঘশ্বাসে লুকানো একটা ক্ষীণকায় শরীর।

কে ওখানে? - কোথায়? - অরুণালয়ে।
একজন ঋণগ্রস্থ মানুষ- খবরের কাগজ, সিখারেট
আর ফোন বিল যার এখনো বাকি; কয়েকজন
পরিচিত লোকও টাকাপয়সা পায়, আর শুনেছি
কয়েকটা পত্রিকা অফিসে লোকটার কিছু লেখক বিল পাওনা আছে,
যা দিয়ে ঋৃণ শোধ হবার নয়।

কে ওখানে? - কোথায়? - লিখে যাচ্ছে?
আমি। এই ঘরের নতুন ভাড়াটিয়া ।


৩০ এপ্রিল ২০০৬
৩২/১, কাঁঠালবাগান, ঢাকা
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29241772 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29241772 2010-09-19 09:01:57
বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখা ।। রেজা ঘটক বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখা রেজা ঘটক
আমি তখন কাস ফাইভে পড়ি। ১৯৮০ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের ঘটনা। সম্ভবত দিনটি ছিল রোববার। আমি আর আমার বন্ধু প্রকাশ, দু’জনে মিলে ঠিক করলাম টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যাব। দু’জনেই তখন মাত্র নতুন সাইকেল চালানো শিখেছি। কিন্তু কারোরই দূরযাত্রার অভিজ্ঞতা নেই। এক ঢিলে দুই পাখি মারার ইচ্ছা নিয়ে আমরা সকালের দিকেই সুজিতদা’র গ্যারেজে উপস্থিত হই। সুজিতদা’র গ্যারেজে রাজ্যের যতো সাইকেল। কোনোটির ব্রেক নেই। কোনোটির মাডগার্ট নেই। কোনোটির টায়ার লিক। কোনোটির বেল নেই। কোনোটির স্পোক ভাঙা। কেনোটির ঘন ঘন চেইন পড়ে। কোনোটির প্যাডেল ভাঙা। কোনোটির বডি ছুটে গেছে। কোনোটির স্ট্যান্ড নেই। কোনোটির মেরুদন্ড ভেঙে গেছে। এরকম বাহারি সাইকেলগুলো সার্ভিসিংয়ের জন্য সুজিতদা’র গ্যারেজে জমা হয়। আর প্রত্যেকটি সাইকেলই সুজিতদা’র হাতের যাদুতে তাজা সাইকেল হয়ে ওঠে। এমনিতে সুজিতদা’ আমদের ঘন্টায় এক টাকা দরে সাইকেল ভাড়া দেয়। কিন্তু আমরা তার হাতের কিছু কাজ করে দিলে খানিক ওভার টাইমও চালানো যায়। আমরা প্রায়ই ওই সুযোগ কাজে লাগাই। দু’জনের সম্বল মাত্র বারো টাকা। ডাবলিংটা শেখা থাকলে কিছু টাকা বাঁচানো যেত। কিন্তু সুজিতদা’ আমাদের মতো ছোটদের ডাবলিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। আমারা সুজিতদা’র চালাকি পুরোপুরি ধরতে পারি। কিন্তু আমরা যেহেতু টুঙ্গিপাড়া যাব সেজন্যে দু’জন একত্রে না গিয়ে, আধা ঘন্টা বিরতি দিয়ে একটি করে সাইকেল নিয়ে কেটে পড়ি। দীঘিরজান বাজারের কাঠের পুলের ওপর দু’জনে দুই সাইকেলে পুনরায় মিলিত হই। এর আগে হরিদাস কাকার কাছ থেকে টুঙ্গিপাড়া যাওয়ার পথঘাট শুনে নিয়েছি আমরা। মাটিভাংগা পর্যন্ত আমরা নিজেরাই চিনি। সে পর্যস্ত কোনও সমস্যা নেই।

মাটিভাংগা বাজারে এসে অম্বরেশ বাবু’র দোকানে জিজ্ঞেস করলাম- বাংলাবাজার যাব কোন পথে ? অম্বরেশ বাবু আমাদের পথ দেখিয়ে দিলেন। বাংলাবাজারের পথে দেখা হলো মহানন্দদা’র সাথে। বাংলাবাজারের ওপারে শৈলদাহ গ্রামে মহানন্দদা’র মামা বাড়ি। মামীমাকে নিয়ে মহানন্দদা ফিরছিল। আমাদের জিজ্ঞেস করল- কই যাও তোমারা ? আমারা বলি- বাংলাবাজার। তাহলে জোড়ে চালাও, খেয়া এপার আছে, মহানন্দদা’র জবার। আমরা খেয়াঘাটে পৌঁছে অন্য কোনো যাত্রীর দেখা না পেয়ে নিজেরাই খেয়া চালিয়ে ওপারে রওনা হই। কিন্ত বলেশ্বরের এই জায়গাটা বানিয়ারীর যেখানে আমাদের বাড়ি ওখানকার চেয়ে খরস্রোতা। তাই আমরা অনেক ভাটিতে খেয়া থামাই ওপারে। মাঝি যে ওপারে ছিল, তা বুঝতে পারি ঘাটে ঠিকমতো খেয়া নিতে না পারায়, ওপার থেকে সে আমাদের গালাগাল দিচ্ছিল- তার হুঙ্কার শুনেই। হিসাবে এক টাকা ভাড়া হয় (দু’জন চার আনা করে আট আনা আর সাইকেল চার আনা করে আট আনা)। কিন্তু— ব্যাটা আমাদের থেকে দুই টাকা নিবে। আর আমরা নিজেরা চালিয়ে এসেছি বলে আট আনা দিতে চাই। এই নিয়ে মহা ক্যাচাল। শেষে কাছের কাঠের আড়ৎঘর থেকে এক বয়সি চাচা উঠে এসে আট আনায়-ই ব্যাপারটির রফা করে দেয়। চাচার কাছ থেকে আমারা শৈলদাহ যাবার পথ চিনে নেই। আর মনে মনে তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দেই। শৈলদাহ আসার পথে ল্য করলাম প্রকাশের সাইকেলের পেছনের চাকায় হাওয়া কমে যাচ্ছে। পথে একজন বলল- রাজনগর একটা গ্যারেজ আছে। সেখান থেকে সাইকেলে হাওয়া দিলাম। দরকার ছিল প্রকাশের সাইকেলের পেছনের চাকার। কিন্ত আমার সাইকেলের সামনের চাকায়ও একটু হাওয়া দিলাম। তাই দেখে প্রকাশও ওরটার সামনের চাকায় হাওয়া দিল। হাওয়া দেয়ার বিল হয় বারো আনা। কিšু— গ্যারেজ অ’লা এক টাকার কম নিবে না শুনে আমার সাইকেলের পেছনের চাকায়ও হাওয়া দিলাম।

সাইকেলে হাওয়া একটু বেশি দেয়ায় আর রাস্তা একটু খারাপ থাকায় দু’জনেই ঝাঁকিটা খুব টের পাচ্ছি। ঝাঁকি কমাতে আমরা চিংগইরের পথে একবার একটু একটু হাওয়া উভয় সাইকেল থেকে কমিয়ে নিলাম। সামনে মধুমতি খেয়াঘাট। নদী বড় তাই ভাড়াও ডাবল। জনপ্রতি আট আনা করে আর সাইকেল প্রতি আট আনা। মোট দুই টাকা। এখানে আমরা শুধু পরস্পর চোখাচোখি ছাড়া অন্য কোনও দুষ্টু বুদ্ধি খাটানোর সাহস পেলাম না। ওপারে নেমে কিছুদূর যাবার পরেই একটা বড়বাজার। ওখান থেকে আমরা জল খেলাম। আর চারটি চকলেট কিনলাম। দোকানদার আমাদের টুঙ্গিপাড়ার রাস্তা দেখিয়ে দিল। দু’পাশে সবুজ পাট তে। মাঝখানে বড় রাস্তা। রাস্তার সমান্তরাল খাল। বড় রাস্তা পেয়ে আমরা আনন্দে একটু জোড়ে সাইকেল চালাই। আর একটু অসাবধানতায় প্রকাশের সাইকেলের পিছনের চাকা লিক হল। এবার দু’জনেই সাইকেল ঠেলে নিচ্ছি। আর একটু এগোলে গ্রাম। দু’দিকে দুই রাস্তা। কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে। আমাদের ধারণা ছিল বড় রাস্তা ধরেই বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। কিন্তু এক লোক আমাদের দেখিয়ে দিল ছোট রাস্তা। আমরা পরম্পর চোখোচোখি করলাম। লোকটি আমাদের সন্দেহ আন্দাজ করতে পেরে বলল- সামনেই একটা রাইস মিল আছে। ওখানে গ্যালিই শ্যাখের বাড়ি দ্যাখফানে। আমরা সাইকেল ঠেলে রাইস মিল পর্যন্ত যাই। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি কোনটা জানতে চাই। বয়স্ক এক চাচা বলল- ওইতো। আমরা এখানে সাইকেল রাখতে পারি কিনা জানতে চাইলে, সে আবার বলে- না কিচ্ছু হবে নানে, থুইয়া যাও না। আমরা রাইসমিলের সামনে একটা কড়ই গাছের সাথে সাইকেল ঠেস দিয়ে রেখে বঙ্গবন্ধু’র বাড়ির দিকে হাঁটা ধরি।

দু’বন্ধুর কারোরই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা ছিল না। কাস টুয়ের বাংলা বইতে যতটুকু পড়েছি, ওইটুকু সম্বল স্মরণ করে করে আমরা বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়াই। বাড়িতে ঢোকার মুখে একটা ছাদওয়ালা বৈঠকখানা। আমরা তাই মনে করেছি। ওখানে কিছুণ বসলাম। দেখি সামনে দুটো কবর সুন্দর করে পাথরে বাঁধানো। স্মৃতিফলকে বঙ্গবন্ধুর মা-বাবার জন্ম ও মৃত্যু সন উল্লেখ করা দেখে বুঝলাম এটা আসলে গোরস্থান। আমাদের ওভাবে বসাটা মনে হয় উচিত হয়নি। দেখি, উঠানে মাঝবয়সি একজন লোক মুরগি তাড়া করে এদিকে আসছে। আমরা তার কাছে জানতে চাইলাম বঙ্গবন্ধুর কবর কোথায় ? লোকটি আমাদের কথা শুনে মুরগি তাড়ানো বন্ধ করে এক পলক আমাদের দেখল। তারপর বলল- ওই তো, ওই যে বঙ্গবন্ধুর কবর।

আমরা গুটি গুটি পায়ে বঙ্গবন্ধুর কবরের দিকে এগোলাম। একদম কাছে গিয়ে দু’জনেই চুপচাপ অনেকণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। লাল পুরনো ইটগুলো বেরিয়ে আছে। কবরের তেমন কোনও যতœ নেই। পাশে একটা ডালিম গাছ। তার ছায়া কবরের ওপরে বাতাসের দোলায় শুধু নড়ছে। কবরের পশ্চিম পাশে কিছু ফুলগাছ। দু’চারটা ফুল তখনো ফুটে আছে। আমরা কী করব বুঝতে পারি না। দু’জনে এদিক-ওদিক ভাল করে দেখে ওখান থেকে দু’টো ফুল ছিঁড়ে চুপচাপ কবরের ওপরে রেখে দিলাম। বঙ্গবন্ধু তা দেখলেন কী না আমরা জানি না। লোকটি আমাদের কাছে ডাকল। আমরা জানতে চাইলাম- বঙ্গবন্ধু কোন ঘরে ঘুমাতেন, কোথায় বসতেন, কোথায় খাবার খেতেন- এসব। লোকটি আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দো’তলা বাড়িটার আগাগোড়া দেখাল। আমরা এই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে চিনতে শুরু করলাম। এরপর লোকটি আমাদের নিজেদেরকে ইচ্ছামতো ঘুরতে বলে পাশের খালে গোসলের জন্য গেল। আর এক মহিলাকে ডেকে বলল- ওরা যেন ভাত খেয়ে যায় তার ব্যবস্থা করতে। আমরা মহিলার চোখ ফাঁকি দিয়ে একবার দোতালায় উঠলাম। আবার পরণেই নামলাম। এরপর পা টিপে টিপে আবার বঙ্গবন্ধুর কবরের কাছে যাই। সেখানে মিনিট খানেক উঁকিঝুঁকি মেরে সোজা রাইসমিলের ওখানে। দেখি, সেই লোকটি গোসল সেরে বাড়ির ভেতরে ঢুকছে। এই ফাঁকে আমরা দু’জনেই সাইকেলে চাপি। প্রকাশের সাইকেল আগে থেকেই লিক ছিল, আর জোরে চালানোতে তার আরও বারোটা বাজল। বড় রাস্তায় এসে দেখি- আমার সাইকেলটারও একই দশা। তারপর পাটগাতী বাজার পর্যন্ত ঠা ঠা রোদে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে বঙ্গবন্ধুর কথা আমরা সত্যিই কি ভুলে গেছিলাম? বঙ্গবন্ধুর সেই কবরের কথা তো আজও ভুলতে পারল্মা না। বাঙালি জাতির জন্য তার অবদানের কথা না হয় না-ই বললাম। এভাবেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাঙালি বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখেছিলাম। তাই আগস্ট এলেই বারবার মনে পড়ে আর প্রায়শই রবীন্দ্রনাথের সেই গানটি গেয়ে উঠি- নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।



গল্পটি প্রকাশিত হয়- সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ৭ বর্ষ ৩৭ সংখ্যা ১২ আগস্ট ২০০৫, ২৮ শ্রাবণ ১৪১২


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29222898 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29222898 2010-08-15 00:44:51
কবিতা : তুমি আমার ঢেউ : রেজা ঘটক তুমি আমার ঢেউ

বসুন্ধরার মতো ঝকঝকে কেবল তোমাকে চাই,
সমুদ্রে নিশানা হারানো কোন জাহাজের সারেং আমি
ভেসেছি মলয় কিংম্বা বঙ্গোপসাগরে...

দুর বন্দরে নিবুনিবু বাতির মতো ঝাপসা চারপাশ
তুমি কি আমার ঝড়? তুমি কি আমার কাঁটা কাম্পাস?
ওপারে যুদ্ধ আছে জানি, ওপারে দেয়ালে ঘেরা নিসর্গ রোম
রাজপ্রাসাদে বন্দি তুমি, কেমনে কাটছে ওগো তোমার দিন?
ভয় নাই, ভয় নাই হেলেন; আর কটা দিন পরে
অলিম্পাসে হবে আমার বাড়ি। মনে রেখো আমি তোমার ইউলিসিস ।।

কাঠের ঘোড়ার পালকিতে আজ তোমাকে চড়াবো
তুমি আমার ঢেউ, তুমি আমার আফ্রোদিতি, গ্রিস দেশের কেউ ।।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29220686 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29220686 2010-08-12 11:22:19
জীনের বাদশাহ ।। রেজা ঘটক
আষাঢ়ের মেঘ গুড়ি গুড়ি জটলা পাকিয়ে আমাদের ঘিরে বসেছে স্বাধীনতা চত্বরে। উদ্যানের গাছগুলো সারাদিন আষাঢ়ের ঘন বর্ষায় স্নান করে করে এখন গা শুকিয়ে নিচ্ছে। প্রকৃতি যেন এখন সদ্য স্নান হওয়া এক উর্বষী বালিকা। শরীরে তার ভেঁজা ঘ্রাণ। সোডিয়াম লাইটগুলো এক লাফে জ্বলে উঠে জানান দিল রাজধানীতে এখন ঝুপ ঝুপ অন্ধকার ছাপিয়ে সন্ধ্যা নামছে। ঝিঁঝিঁ পোকারা থেমে থেমে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গেয়ে যাচ্ছে। মৃদু বাতাস না শীত না উষ্ণ প্রকৃতি বেশ শান্ত যেন গল্প শোনার জন্য অপো করছে। আমাদের অপোর পালাও শেষ। মামু জুয়েল এসে যোগ দিল আড্ডায়। মামু জানতে চাইল মডেল হওয়ার ঘটনাটা আসলে কি? আমারেও ফোন করেছিল ওরা। আমি তখন ভীষণ ব্যস্ত। তাই ওদের সাথে ঠিকমত কথা বলতে পারিনি। আর আমার মনে হয়েছে ওরা কোন এ্যাড ফার্ম নয়, আমার কোন বন্ধু হয়তো দুষ্টামী করছে। আমরা মামুর কথায় হেসে তখন গড়াগড়ি। মডেল হবার ফর্মুলাটা বেশ চমৎকার। এই নিয়ে আমাদের কাছে দশজনের খবর আসল। আর একজন হলেই এগারো জনের টিম করব আমরা। এগারো জন মডেল। এগারো জন নতুন তারকা। বিল বোর্ডে সবার বড় বড় ছবি। আহ কী মজা। রাতারাতি তারকা। মামু জুয়েল বাদে নয়জনের মধ্যে চারজন মডেল হতে গিয়ে মোবাইল খুইয়েছে। যেতে পারেনি পাঁচজন। শিশির, ইভা, সাগর, শর্মী আর মিজান। মডেল হতে গিয়েছিল বরিশাল থেকে তুহিন, ছবির হাট থেকে লিমন, শ্যামলী থেকে রং আর ইস্কাটন থেকে আমাদের শুভ। এবার আমরা ফয়সালের মুখে শুনব শুভ মডেল হতে গিয়ে কী অভিজ্ঞতা অর্জন করল।
সেদিন ছিল শুক্রবার। সকাল ১০ টায় শুভ’র সেল ফোনে একটা ফোন আসে। আপনি কী শুভ ভাই বলছেন? আমরা দিকবিদিক এ্যাডভারটাইজিং হাউজ থেকে বলছি। আমরা ঢাকাসহ সারা দেশে একটা কনজুমার প্রোডাক্টের বিল বোর্ডে বিজ্ঞাপনের জন্য মডেল খুঁজছি। আমরা জানি, আপনি একটা নাট্যদলে কাজ করেন এবং আপনার অভিনয় দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। আমাদের বিল বোর্ডে বিজ্ঞাপনের জন্য মডেল হিসেবে আপনাকে আমরা পছন্দ করেছি। ন্যুনতম এক বছরের জন্য আপনাকে আমরা আমাদের প্রোডাক্ট মডেল হিসাবে বাছাই করেছি। আপনি যদি মডেল হতে ইচ্ছুক হন এবং আমাদের সাথে কাজ করতে রাজী থাকেন তাহলে আজ দুপুর ১২টার মধ্যে গুলশান-২-এ চলে আসুন। শুভ তখন কিছু পাল্টা প্রশ্ন করেছিল বটে কিন্তু এমন চমকে দেবার মত একটা সুযোগ হাতছাড়া করে কীভাবে? আধঘণ্টার মধ্যে রেডি হয়ে শুভ গুলশান রওনা দিল। দিকবিদিক এ্যাডের একজন মার্কেটিং অফিসার শুভকে গুলশানে রিসিপ করলেন এক ঘণ্টা পর। এবার তিনি ডিরেক্টারকে ফোন দিলেন। ডিরেক্টার জবাবে জানালেন ওনাকে উত্তরা নিয়ে আসো। আমি শুটিংয়ে আছি। মার্কেটিং অফিসার বললেন- চলুন উত্তরা, ডিরেক্টার স্যার ওখানে আছেন, ফাইনাল কথাবার্তা স্যারই বলবেন।
তারপর ওরা একটা হলুদ ট্যাক্সিক্যাব হায়ার করে। পথে মার্কেটিং অফিসার বসের সঙ্গে একবার কথা বলেন। সেই ফাঁকে তিনি জানান- আমরা ট্যাক্সিক্যাবে আসতেছি। স্যার আমার ফোনের চার্জ শেষ, এসে কথা বলব। কিছুণ পরে ডিরেক্টার স্যার স্বয়ং শুভ’র মোবাইলে ফোন করেন। হ্যা, আপনারা মাসকাট প্লাজার সামনে আসুন। আর ফোনটা আপনার সাথে থাকা আমার লোককে একটু দেন। ইতিমধ্যে ট্যাক্সিক্যাব উত্তরা রাজলীর সামনে একটু থেমেছে মার্কেটিং অফিসারের ইসারায়। কথা বলতে বলতে তিনি গাড়ির দরজা খুলে বাইরে নামেন। এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কথা বলতে বলতেই রাজলী মার্কেটের মধ্যে ঢুকে পড়েন। এতোণে শুভ বুঝতে পেরেছে ঘটনা আসলে কী ঘটল! শুভ এখন বিখ্যাত মডেল। মোবাইল ফোনের তারকা মডেল। সারা দেশে বড় বড় বিল বোর্ডে শুভ’র বড় বড় ছবি। হা হা হা হা... .... ....
মামু জুয়েল সব শুনে বলল- আল্লাহ বাঁচাইছে। ভাগ্যিস আমি ব্যস্ত ছিলাম, নইলে হয়তো আমিও যাইতাম। আমরা আরেক পশলা যে যার গায়ে হেসে গড়াগড়ি। মামু তুমি মডেল হবার সহজ চাঞ্চ মিস করলা? হা হা হা হা .... .... ....
এরপর ইখতার জানাল যে ওই এ্যাড হাউজের সর্বশেষ শিকার আমাদের লিমন। তাই নাকী? কস কী? লিমন মানে আমাদের ডিরেক্টার কাম স্ক্রিপ্ট রাইটার অভিনেতা লিমন? লিমনের ঘটনা তো শুনিনি। ক’তো লিমনের কী হইছিল? ইখতার শুরু করল- ওইদিন লিমনের মোবাইলে ওইরকম একটা ফোন আসে। তারা জিগায়- আপনি কী লিমন ভাই বলছেন? আমরা দিকবিদিক এ্যাডভারটাইজিং হাউজ থেকে বলছি। আমরা ঢাকাসহ সারা দেশে একটা কনজুমার প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনের জন্য স্ক্রিপ্ট রাইটার খুঁজছি। আমরা জানি, আপনি একটা নাট্যদলে কাজ করেন এবং আপনার অভিনয় আর টিভির জন্য লেখা নাটকগুলো দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। আপনার স্ক্রিপ্ট লেখার কৌশলটা ভারী চমৎকার। আমাদের বিজ্ঞাপনের জন্য স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে আপনাকে আমরা পছন্দ করেছি। ন্যুনতম এক বছরের জন্য আপনাকে আমরা আমাদের প্রোডাক্ট স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসাবে পেতে চাই। আপনি যদি আমাদের স্ক্রিপ্ট রাইটার হতে আগ্রহী হন এবং আমাদের সাথে কাজ করতে রাজী থাকেন তাহলে বনানী আমাদের অফিসে চলে আসুন। জবাবে লিমন জানতে চায়- আপনাদের অফিসের ঠিকানা বলুন। ওপাশ থেকে জানতে চাওয়া হয়- আপনি এখন কোথায়?
- আমি শাহবাগ। লিমনের জবাব।
- আচ্ছা শুনুন, আপনি যদি ছবিরহাটের দিকে যান, ওখানে আমাদের একজন আছেন এখন, ওনার সাথে চলে আসতে পারেন।
এরপর লিমনকে ছবিরহাট থেকে ওদের এক প্রতিনিধি ফোন করেন। তার সাথে দেখা হবার পর লিমন আর সে ট্যাক্সিক্যাব নিয়ে বনানী রওনা দেয়। মহাখালী গিয়ে একইভাবে ফোন নিয়ে সটকে পরে ওত পেতে থাকা এ্যাড হাউজের সেই লোকটা। খালি হাতে ফেরৎ আসে স্ক্রিপ্ট রাইটার লিমন। আমরা আবারো হো হো করে গড়াগড়ি যাই।
শিশির, শর্মী, ইভা, মিজান, সাগরও ওদের ফোন পেয়েছিল। ওরা কেউ কেউ যাবার জন্য উতলাও ছিল। কেউ কেউ সময় করতে পারেনি। কেউ কেউ পরের দিন ভুলে গেছে। তবে শিশির ডাউট করেছিল যে ওরা কোন সমস্যা করতে পারে। তাছাড়া দেখি না একবার কারা আমাকে মডেল বানাতে চায়। তাই শিশির মিজানকে ফোন করেছিল। আর মিজান জানায় সেও একই রকম ফোন পেয়েছে। সময় পেলে যেতে চেষ্টা করবে। কিন্তু শিশির বিষয়টা নিয়ে অনেক চিন্তা করে র‌্যাবের এক অফিসারের সাথেও কথা বলেছে। র‌্যাবের ওই মহিলা অফিসার পরামর্শ দিয়েছিলেন- আপনি একা যাবেন না। সঙ্গে কাউকে নিয়ে যান। আর সমস্যা দেখলে আমাদের জানাবেন। মিজানও সময় করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত শিশিরের আর যাওয়া হয়নি।
এই ফাঁকে আমরা চিড়ার মোয়া আর সিখারেট খাই। আর মামু জুয়েল জানায়- এরচেয়ে জীনের বাদশাহর খবর আরো ইন্টারেস্টিং। আমরা সমোস্বরে জানতে চাই- জীনের বাদশাহ আবার ক্যাঠায় গো মামু?
মামু জুয়েল শোনায়- ওইডা আমার শ্বশুরের ঘটনা।
রোজ রাতে আমার শ্বশুর একজনের সাথে মোবাইলে কথা বলেন। কিছু দিন যেতে না যেতে দেখা গেল শ্বশুর আমার বদলে যাচ্ছে। ওদিকে পরিবারের সবাই তখন তাঁকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। কার সাথে কথা বলেন কিছুই উনি স্বীকার করতে চান না। আমার দাদী শ্বাশুড়ি অনেক পিড়াপিড়ি করলে জবাবে শ্বশুর মশাই বলেন যে- আমি জীনের সাথে কথা বলি। শুনে আমরা সবাই আরো বিস্মিত হই। এরপর আমরা গোপনে পরিকল্পনা করে ঠিক করি- ওনার টেলিফোন কথোপকথনের সময় ঘরের সবাই ওৎ পাতব।
রাত আড়াইটা। শ্বশুরের ফোন আসল। শ্বশুর মশাই মনে করেছেন আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছি। উনি জীনের সাথে কথা বলা শুরু করলেন। আমরা শুনতে পাচ্ছি- শ্বশুর মশাই ফোনের এপাশে শুধু বাবা বাবা করছেন। তারপর আমরা সবাই তাঁর ঘরে ঢুকলাম। আজ আপনাকে বলতে হবে কার সাথে কথা বলেন? কী নিয়ে কথা বলেন? শ্বশুর মশাই বলতে চান না। আমার দাদী শ্বাশুরি, শ্বাশুরি, আমার বৌ সবাই মিলে আমরা ওনাকে চেপে ধরলাম। আজ বলতে হবে ঘটনা কী?
এরপর শ্বশুর মশাই স্বীকার করলেন যে জীনের সাথে ওনার কথা হয়। আমরা জানতে চাই কী কথা হয়? শ্বশুর মশাই বলেন- জীনের বাদশা বাংলাদেশে দুইজন লোক খুঁজে পেয়েছেন। একজন ওনার খাদেম আরেকজন আমি। আমাদের এই দুইজনকে উনি কিছু সোনার মহর দিয়ে সৌদি আরব চলে যাবেন। আমাকে উনি ওনার কথিত জায়গায় দেখা করার জন্য বলেছেন। আগামী অমাবশ্যার রাতে ওনার খাদেম যে মাজারে আছেন সেখানে আমাকে যেতে বলেছেন। আমরা জানতে চাই আর কী কী বলেছেন?
শ্বশুর মশাই জানান- যাবার সময় আমাকে একটা গরু, এক মণ সিন্নির চাল আর মাজারের জন্য কিছু খরচ সঙ্গে নিতে বলেছেন। আমরা জানতে চাই- মাজারের খরচ কতো?
- এক লাখ বিশ হাজার টাকা। শ্বশুর মশাইর জবাব।
- আপনি কী সেখানে যেতে চান? ওনার মেয়ের প্রশ্ন।
- হ্যা, আমি আগামী অমাবশ্যার রাতেই যেতে চাই।
- কিন্তু জায়গাটা কোথায়? আমার জানতে চাই।
- ওটা বাবা তিন দিন আগে জানাবেন।
- তারপর? আমাদের সমোস্বরে জিজ্ঞাসা।
রোজ রাতে তাদের কথা হতে থাকে। জীনের বাদশা বলেন- কোরআন শরীফ আমার মুখস্থ। আমরা নূরের তৈরি আর তোমরা মানুষ। আল্লাহ আমাদের ভুলের জন্য একটা শাস্তি দিয়েছেন। তাই তোমাদের মত আমরা পৃথিবীতে বসবাস করতে পারিনা। আমরা আকাশে থাকি। কিন্তু আমাদেরও আল্লাহর সেবা করতে হয়। কোরআন শরীফ পড়তে হয়। নামাজ কায়েম করতে হয়। মানুষের উপকার করতে হয়। আমাদের ওপর আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ- তোমরা আসল মুসলমানকে সব সময় উপকার করবে আর আমার কথা স্মরণ করিয়ে দিবে। বাংলাদেশে আমি এবারের জন্য দুইজন খাঁটি মুসলমান পেয়েছি। একজন আমার সত্যিকার খাদেম। আরেকজন তুমি। আমাকে সৌদি আরবে হজ পালনে যেতে হবে। আর তার আগেই তোমাদের দুজনকে আমার সোনার মহরগুলো দিয়ে যেতে চাই। মনে রেখো- অমাবশ্যার রাতে আমার খাদেমের মাজারে তুমি আসবে। যা যা বলেছি, যেভাবে যেভাবে বলেছি সব সঙ্গে আনবে। মনে রেখো, যদি কোন ভুল করো তোমার অনেক তি হবে। তোমার বংশ নিঃবংশ হয়ে যাবে। তোমার নিজের মৃত্যুর সময় প্রচুর কষ্ট হবে। তোমার বংশে কেউ আর জীবিত থাকবে না। সবাই অপঘাতে মারা যাবে। মনে রেখো- আমি তোমার জীনের বাদশাহ। আর আমার কথা তুমি অগ্রাহ্য করলেই তোমার বিপদ। তুমি বিপদ চাও নাকি আল্লাহর পাঠানো উপঢৌকন নিতে চাও, তা তুমিই ঠিক করো। মনে রাখবা- পৃথিবীতে তোমাদের সকল কর্মকাণ্ডের একদিন বিচার হবে। আর সেদিন আমি তোমার পক্ষে নাকি বিপক্ষে সাক্ষি দিব তা তুমিই ঠিক করো হে মানব সন্তান।
শ্বশুর মশাই জানতে চায়- আচ্ছা আপনি তো জীনের বাদশাহ। আপনি মোবাইলে কথা বলেন কীভাবে? জবাবে জীনের বাদশা বলেন- আজ আর কোন কথা নয়। আগামীকাল ঠিক রাত বারোটায় আমি ফোন করব। তুই আমার এই নাম্বারে এক হাজার টাকা পাঠাস। নইলে তোর অমঙ্গল হবে। আর শোন, এই ফোনটা আমার খাদেমের। উনি একটা মসজিদের ইমাম। উনি রাত এগারোটায় ঘুমিয়ে যান। উনি ঘুমিয়ে গেলে আমি ওনার ফোন নিয়ে তোকে ফোন করি, বুঝলি। আরেকটা কথা তুই বিশ্বাস রাখিস- জীনেরা সবকিছু দেখতে পায়। এখন ঘুমিয়ে পড়। আর নামাজ কাযা করিস না। দুনিয়া দুই দিনের বাহাদুরি। যা এখন ঘুমা। আর ফোনে টাকা পাঠাতে ভুলিস না যেন। হক মাওলা। জীনের বাদশাহর ফোন কেটে যায়।
পরদিন শ্বশুর মশাই একহাজার টাকা পাঠান ওই মোবাইলে। ঠিক রাত বারোটায় জীনের বাদশাহ আবার ফোন করেন। আমার শ্বশুর শুধু এপাশে জী বাবা, জী বাবা করতে থাকেন। শ্বশুর মশাইয়ের সুস্পষ্ট ধারণা উনি জীনের বাদশাহ-ই হবেন। পুরো কোরআন ওনার মুখস্থ। ওনেক সময় কথা না বলে উনি শুধু কোরআন তেলোআত করেন। আমরা ক্রমে উদ্বিগ্ন হতে থাকি। শ্বশুর মশাই কী পাগল হয়ে যাচ্ছেন! নইলে এইরকম আচরণ কেন করছেন? তিনি ঠিক করেছেন আগামী বুধবার অমাবশ্যা। আর ওই রাতেই তিনি সবকিছু নিয়ে রওনা হবেন। সেই অনুযায়ী উনি একট বড় গরু কিনেছেন। এক মণ চাল কিনেছেন সিন্নির জন্য। আর মাজারের খরচ বাবদ এক লাখ বিশ হাজার টাকা আলাদা করে রেখেছেন। আমরা কেউ ওনাকে কিছু শোনাতে পারছি না। উনি যাবেন-ই যাবেন। আর ফোনে কথা বলার সময় উনি আমাদের কাউকে ফোন দিতে চান না।
গত রবিবার রাতে জীনের বাদশা ফোনে শ্বশুর মশাইকে দিনাজপুরের একটা মাজারের ঠিকানা দিয়েছেন। বলেছেন ওখানে অমাবশ্যার রাতে তাকে সোনার মহর হস্তান্তর করেই তিনি সৌদি আরবে রওনা হবেন।
আমরা জানতে চাই দিনাজপুরে কোন মাজারের কথা বলেছেন? আর ওখানে আপনি কীভাবে যাবেন? কীভাবে যেতে বলেছেন? জবাবে শ্বশুর মশাই বলেন- আমাকে গাবতলি থেকে বাসে উঠতে বলেছেন। যে বাসে আমি উঠব সেই বাসের নাম, সিট নম্বর আর আমার সময় সূচি ফোন করে বাবাকে জানাতে বলেছেন রওনা দেবার আগে। আমরা জানতে চাই আপনি কী যেতে চাচ্ছেন? শ্বশুর মশাইর জবাব- না গিয়ে আমার আর কোন উপায় নেই। তোমরা আল্লাহ আল্লাহ করো। আমরা আবদার করি- আমরা একবার জীনের বাদশাহর সঙ্গে কথা বলতে চাই। কিন্তু শ্বশুর মশাই রাজী না।
মঙ্গলবার রাত দেড়টায় জীনের বাদশাহ আবার ফোন করেন। শ্বশুর মশাই ফোন ধরে বলেন- জী বাবা, আমি ভোরেই রওনা দেব। সব কিছু ঠিক মত গুছিয়েছি। এখন আপনার দোয়ায় সকালে রওনা হব। ঠিক এই সময় আমার দাদী শ্বাশুরি চিৎকার করে ওঠেন। কীসের জীন সে? দে ফোনটা আমারে দে, আমি কথা বলব। ওপাশ থেকে জীনের বাদশাহ হুঙ্কার দেন- তোর ঘরে মেয়ে মানুষের কণ্ঠ কেনরে? তুই নিজের তি নিজে ডেকে আনছিস! শ্বশুর মশাই জবাব দেন- উনি আমার মা। আপনার সাথে কথা বলতে চায় বাবা। জীনের বাদশাহ জবাব দেয়- আমি মেয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলিনা বোকা। তুই নিজের তি করিস না। আমার কথা মত রওনা দে।
দাদী শ্বাশুরি তখন শ্বশুর মশাইর কাছ থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করে- তুই কোথাকার জীন আমারে ক? আমি তোর জীনের বাপ! শয়তান কোথাকার? আমারে চিনোস তুই? তোর জীন গিরি আমি পানিতে চুবাইয়া ছুডাইয়া দিমু। ফাজিল কোথাকার?
ওপাশ থেকে জীনের বাদশাহ জবাব দেন- তুই স্ববংশ নিঃবংশ হবি। তোর ঘরে দুবলা গজাবে। তুই ধ্বংস হয়ে যাবি। ওদিকে শ্বশুর মশাই সবাইকে সাবধান করে দেন- আমরা যেন বাবার সাথে বেয়াদবি না করি। কারণ, উনি নাকি সত্যি সত্যিই জীনের বাদশাহ। কিন্তু আমার দাদী শ্বাশুরি তখন জীনের বাদশাহর সঙ্গে প্রচণ্ড গালাগালিতে লিপ্ত। এক পর্যায়ে দাদীর থেকে ফোনটা আমি নেই। জীনের বাদশাহর কাছে জানতে চাইÑ আপনি তো জীনের বাদশাহ। বলেন তো আমি কে? আমার বাড়ি কোথায়? আমি কী করি? আমি আপনার ভক্তের কে? আমি একটা আরবি বলব আপনি বাংলা অর্থ বলবেন?
ওপাশ থেকে জীনের বাদশাহ জবাব দেন- আমি ভক্ত ছাড়া কারো সাথে কথা বলিনা। আর তুই আমার সঙ্গে বেয়াদবি করছস। তুইও মরবি। তোর বউ মরবে। তোর বংশও ধ্বংস হবে। আমার সঙ্গে বেয়াদবি! আমি পাল্টা প্রশ্ন করি- দিনাজপুরে কোথায় যেতে হবে বল। তোর জীনের গুষ্ঠি আমি দেখে আসব। ফাজিল কোথাকার? ফাজলামো পাইছস? এবার জীনের বাদশার মেজাজ আরো চড়া হয়। জীনের বাদশাহ জবাবে বলেন- তোর কেমন মতা তুই পারলে দিনাজপুরে আয়? তোরে মাটির সঙ্গে মিশাইয়া দেব শয়তান কোথাকার। জীনের সঙ্গে বেয়াদবি! ইনসানে তোর বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে।
এরপর আমি জীনের বাদশাহকে বলি- তোর এতো মতা থাকলে পারলে ঢাকায় আয়? দেখি তোর কেমন মতা? জীনের বাদশাহ জবাবে বলেন- আমি ঢাকায় যাই না। তুই সাহস থাকে তো দিনাজপুরে আয়। আর শোন ফোনটা তুই আমার ভক্তকে দে। নইলে তোর এখনই রক্ত বমি শুরু হবে। আর তুই পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিশ্চিন্থ হয়ে যাবি। পৃথিবীর আলো বাতাস তোর জন্য হারাম হয়ে যাবে।
এরপর ফোনটা আমি আবার শ্বশুর মশাইর হাতে দেই। জীনের বাদশাহ বলেন- শোন, তুই আমার সঙ্গে বেইমানী করেছিস। তোর বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তোর মেয়ে মরবে। তোর ছেলে মরবে। তোর বউ মরবে। তোর মা মরবে। তোর চৌদ্দ গুষ্ঠি মরবে। তুই মরবি। তোর ঘরে দুর্বা ঘাস গজাবে। আর শোন, তোর জন্য এখনো একটা সুযোগ আছে। তোর মাজারের খরচ এখন পাঁচ লাখ লাগবে। শ্বশুর মশাই বাবা বাবা করতে থাকেন। আর বলেন- এতো টাকা আমি কোথায় পাবো বাবা? জীনের বাদশাহ জবাবে বলেন- তোর টাকা আছে আমি জানি। আমাকে মিথ্যা বললে তোর আরো তি হবে। ভালো চাস তো আজ রাতেই রওনা দে। নইলে সকালেই তোর ঘরে আগুন লাগবে। তোর জন্য আর মাত্র আড়াই ঘণ্টা সময় আছে। এখন তুই ঠিক কর। কী করবি? গরু, সিন্নির চাল আর টাকা নিয়ে রওনা দিবি নাকি বংশ নিয়ে মরবি। তুই ঠিক কর। তুই ঠিক কর। তুই ইজ্জত কর। কর কর কর কর কর.. .. ..
জীনের বাদশাহ ফোন কেটে দেয়। আমার শ্বশুর মশাই হায় হায় করতে থাকেন। এখন কী হবে উপায়। তাছাড়া আমরা সবাই অনেক বেয়াদবি করেছি জীনের বাদশাহর সঙ্গে।
শ্বশুর মশাই পাঁচ লাখ টাকা নিয়েই রওনা দিতে রাজী। আমাদের কারো কথা তিনি শুনবেন না। সারা ঘরে একটা উদ্বিগ্ন। এখন কী হবে? শ্বশুর মশাই কারো কথাই আর শুনতে চাইছেন না। তিনি রেডি হচ্ছেন। সারা ঘরে একটা লংকা কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে। শ্বশুর মশাই রেডি। আমরা ওনাকে যেতে দিব না। উনি যাবেন। ভোরবেলা আযান দেবার আগে আগে শ্বশুর মশাই আমাদের শত বারণ অমান্য করে জীনের বাদশাহর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। আমরা ঠায় শূন্য ঘরে বসে থাকি।
মামু জুয়েলের গল্প বলা শেষ হয়। আমরা অন্ধকারে সবাই চুপ মেরে যাই। আষাঢ়ের আকাশে ঘন মেঘের গুরু গম্ভীর নিরবতা। তারপর কী হল? অনেকণ নিরাবতা। এবার জুয়েল মামু অট্টহাসী দিয়ে জানায়- ওই দিন ভোরে মিরপুর থেকে জীনের বাদশাহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়। জীনের বাদশা এখন র‌্যাবের বড় মডেল। ইনসানের মডেল।

২৮ জুন ২০১০ । ১৪ আষাঢ় ১৪১৭ । সোমবার
গাবতলা, মগবাজার, ঢাকা।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29188016 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29188016 2010-06-29 18:38:19
মাকে খুব মনে পড়ে \ রেজা ঘটক মাকে খুব মনে পড়ে \ রেজা ঘটক

গত বছর ২৭ জানুয়ারি আমার মা মারা গেল। পৃথিবীতে কারো যদি মা মারা যায় আমার ধারণা ওই দুঃসংবাদটি প্রত্যেক মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন দুঃসংবাদ। পৃথিবীতে এরচেয়ে বড় আর কোনো দুঃসংবাদ আছে বলে আমার জানা নেই। ১৯৯৬ সালের ৬ ডিসেম্বর যখন আমার বাবা মারা যায় তখন আমরা ভাইবোনেরা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সেই শোককে ধীরে ধীরে কাটানোর চেস্টা করেছি। আমাদের পরিবারটি ছিল পিতৃতান্ত্রিক। বাবাই পরিবারের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিতেন। একজন বাঙালি মা বলতে এককথায় যা বুঝায় আমার মা ছিল ঠিক তেমনি সহজ সরল একজন বাঙালি মা। বাবা যা বলতেন মা মুখ বুজে সব মেনে নিতেন। কারণ আমার মা’র ধারণা ছিল বাবা পরিবারের জন্য সব সময় সঠিক সিদ্ধান্তটিই নিতে জানেন। আমার মা’র যখন বিয়ে হয় তখন তার বয়স মাত্র ৯ বছর। আর বাবার ১৬ বছর। আমার চেয়ে মা ৩৩ বছর আর বাবা ৪০ বছরের বড়। আমার দাদী তার বড় পুত্রের এই ছোট্ট বউটিকে নিজের মতো করে সংসারের সবকিছুতে প্রশিক্ষণ দিলেন। সংসারের যাবতীয় কাজে মায়ের হাতেখড়ি আমার দাদীর কাছে। মা তার ছোট্টবেলার সেইসব গল্প বলার সময় দাদীকে খুব শ্রদ্ধা দেখাতেন। কারণ, মা যেসব কাজ পারেন তার সবকিছুইরই গুরু যে আমার দাদী।
এমনিতে আমাদের বিশাল পরিবার। আমার দাদুভাইর ছিল দুই দুটো সুন্দরী বউ। আর চার ছেলে আট মেয়ে। আমার বাবা সবার বড়। দাদুর বড় বউ মানে আমার আসল দাদী আর ছোট বউ মানে আমার স্টেপ-দাদী। আমরা ডাকতাম বড়বু আর ছোটবু। আমরা ভাইবোনেরা অবশ্য বড়বুকে দেখিনি। কিন্তু তার অনেক গল্প শুনেছি কাকাদের কাছে, ফুফুদের কাছে, মা’র কাছে, বাবার কাছে। এমনকি দাদুর কাছেও বড়বু’র অনেক গল্প শুনেছি কিন্তু তা এখন আর মনে নেই। কারণ, আমার বয়স যখন ৬ বছর তখন আমার দাদু মারা যায়। আমরা নয় ভাইবোন। পাঁচ ভাই চার বোন। আমার দাদুর আবার চার ছেলে আট মেয়ে। দাদুর দুই বউই ছিল ফর্সা আর সুন্দরী। আমার বাবা, কাকা, ফুফুরা সবাই ফর্সা। আমাদের নয় ভাইবোনদের মধ্যে শুধু আমার গায়ের রং কালো। এছাড়া আমার চেহারা, গায়ের রং আর বদ মেজাজ তিনটাই নাকি হুবহু আমার দাদুভাইয়ের মতো। তাই আমার ফুফুরা ছোট্টবেলা থেকেই আমাকে বাবা ডাকে। ফুফাদের আমরা জামাই ডাকি। জামাইরা আবার আমাকে ডাকে শ্বশুর।
১৯৭৬ সালের ১৫ জুলাই শুক্রবার আমার দাদু মারা যায়। দাদু মারা যাবার ঘটনাটা এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। কারণ, ওই রাতে আমি বাড়িতে ছিলাম না। পরিবারের অন্য কেউ ছাড়া ওটাই ছিল আমার একাকী অন্য কোন বাড়িতে রাতে থাকার প্রথম ঘটনা। বড় খালার বাড়িতে গেছি বেড়াতে। আমার বড় খালার বাড়ি আর চতুর্থ ফুফুর বাড়ি একই বাড়ি। আমার দুই খালাতো ভাই আর দুই ফুফাতো ভাই আবার আমার বয়সি। তাই ওই বয়সে বলেশ্বরের ওপারে শিকদার বাড়ি বেড়াতে গেলে আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতাম। একসাথে আমরা অনেক খেলাধুলা করতে পারতাম। মামা বাড়িতে গিয়েও আমি ছোটবেলায় অতো আনন্দ পেতাম না যেটা পেতাম শিকদার বাড়ি গেলে। বড় খালাদের রান্নাঘর আর ফুফুদের রান্নাঘর একেবারে গায়েগায়ে ঘেঁষা। আমরা কখন যে কোন ঘরে খাচ্ছি সেই হিসাবই মনে থাকতো না। খুব মজা করতাম বেড়াতে গিয়ে।
শুক্রবার আর সোমবার তারাবুনিয়ার হাট। হাটের দিন সাধারণত কোন মেহমান বাড়ি থেকে যায় না। আমাদের ওদিকে এমনটিই চল। কারণ, হাটের দিন ভালো বাজার হবে, খাওয়া দাওয়া একটু ভালো হবে। পরের দিন মেহমানদের যাবার নিয়ম। শুক্রবার খুব সকাল বেলা। আমার মেঝোভাই খালাবাড়িতে হাজির। বড়খালুকে রান্নাঘরে ডেকে নিয়ে কিছু একটা কানাঘুশা করলেন। কিন্তু সেই কানাকানি অল্প সময়ের মধ্যে বড়খালা, খালাতো ভাইবোন হয়ে মুহূর্তে কীভাবে যেনো ফুফুর কানে গিয়ে পৌঁছালো। তারপর ফুফুর সেই যে উথালি পাথালি আজও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে ফুফু আমার দাদু মারা যবার পর কীভাবে কেঁদেছিল। দাদুর মৃত্যু ছিল আমার জীবনে প্রথম শোনা কোনো বড় দুঃসংবাদ। তখন আমি আসলে বুঝতে পারিনি যে দাদু আর কোনো দিনও আমাকে আর তার সুঠাম ঘাড়ে বসিয়ে বাজারে নিয়ে যাবেন না। কোনো দিন আর জিজ্ঞাসা করবে না সদ্য গাভীর ওলান থেকে নামানো কাঁচা দুধ খাবো কীনা? কোনো দিন আর কেউ ডেকে বলবে না বিচি কলা খাবি কীনা? কিংম্বা কেউ আর কোনো দিন আদরের সুরে কাছে ডেকে বলবে না- কোনো কাজই তো পারিস না, নে আমার আঙুল গুলো মটকে দে? পরের বছর থেকে আমাদের বাড়িতে একটা নিয়ম চালু হল- ঠিক ১৫ জুলাই দাদু আর দাদীর মৃত্যুবার্ষিকী একসাথে পালন করা। ওই দিন আমার আট ফুফুর মধ্যে জীবিত ছয় ফুফু-জামাই আর তাদের ছেলেমেয়েরা এবং আমার তিন চাচা-চাচী আর তাদের ছেলেমেয়েরা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতো। আমাদের অন্যান্য অনেক আত্মীয়ও সেদিন আসতো। গ্রামের অনেক গন্যমান্য লোকজনও আসতেন। কুরআন খতম মিলাদ আর ভালো খাওয়া-দাওয়া হতো সেদিন। আমরা ছোটরা আবার পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করতাম। কারণ, ওইদিন আমাদের সারা বাড়িতে বিশেষ করে আমাদের ছোটদের জন্য একটা উৎসব উৎসব ব্যাপার ছিল। সেই উৎসবের মধ্যেও দেখতাম ফুফুরা কান্নাকাটি করছেন। কারণটা বড় হতে হতে কীভাবে যেনো বুঝে গেছি।
২০০০ সালে আমাদের বংশের মৃত্যু রহস্য নিয়ে আমি একা একা একটা গবেষণা করেছিলাম। সেই গবেষণা থেকে আমি একটা জিনিস আবিস্কার করলাম। প্রতি ১০ বছর অন্তর আমাদের পরিবারে একজন করে মানুষ মারা যায়। যেমন ১৯৫৬ সালে মারা যায় আমার বড়বু। মানে আমার দাদী। ১৯৬৬ সালে মারা যায় দাদুর বোন মানে আমার বাবার বড় ফুফু, আমাদের ধলাবু। দাদুভাইর এই বোনটি ছিল ছয় ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা। ঠিক আমার বাবার সমান লম্বা। গায়ের রং ছিল ব্রিটিশদের মতো একেবারে শাদা। তাই আমরা ডাকতাম ধলাবু। মা’র কাছে ধলাবুর অনেক গল্প শুনেছি। আমার দাদুভাই ছিল সাড়ে ছয় ফুট লম্বা কালো তাগড়া জোয়ান। দাদুভাইর বাবা ছিলেন সাত ফুট। ধলাবু মারা যাবার ঠিক দশ বছর পর ১৯৭৬ সালের ১৫ জুলাই মারা যায় আমার দাদুভাই। আবার ১৯৮৬ সালের ৫ মার্চ মারা যায় আমার সেজো কাকা। পরের দিন আমার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। ১৯৯৬ সালের ৬ ডিসেম্বর মারা যায় আমার বাবা। ২০০০ সালে করা আমি সেই গবেষণার শেষে প্রশ্ন রেখেছিলাম ২০০৬ সালে কে? ২০০৬ সালের এই কে হতে পারে তা নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর আমার মাথায় নানান দুঃচিন্তা কাজ করেছে। ২০০৬ সালের ১০ নভেম্বর মারা যায় আমার ছোটবু মানে আমার ছোট দাদী। এরপর আমি আবার ২০১৬ সালের জন্য ভীতরে ভীতরে যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ঠিক তখন ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি শুক্রবার যখন আমার মা মারা যায়। তখন মৃত্যু সম্পর্কিত আমার গবেষণাটি কীভাবে যেনো মাটি হয়ে গেল। এখন আর আমার ওই বিদঘুটে গবেষণাটির ফলাফল মাথার মধ্যে উল্টাপাল্টা রিপোর্ট করে না। এখন আমার কাছে মৃত্যু মানে একটা অনিশ্চিত ব্যাপার বলে মনে হয়। যেখানে এক সেকেন্ডেরও নেই কোনো ভরসা। যে কোনো মুহূর্তে যে কেউ মারা যেতে পারে। আর মৃত্যু একটি অনিবার্য কারণ। জন্মগ্রহণ করা যে কোনো প্রাণীর বেলায় তা সত্য। আর তা প্রাণী মাত্রই বরণ করতে হবে। আমার ধারণা মৃত্যু হল জীবদ্দশায় কোনো প্রাণীর জীবনে সর্বাপেক্ষা চরম বা পরম সুখ। যা প্রাণী মাত্রই একবার মাত্র উপভোগ করার সুযোগ পায়। এরপর তার আর পুনরায় জীবদ্দশার কোনো ভূমিকা পালনে ফিরে আসার সুযোগ নেই। অর্থাৎ জীবদ্দশায় প্রাণী মাত্রই একবার মাত্র ওই চরম বা পরম সুখ ভোগ করার সুযোগ পায়। আর তা ভোগ করার পর তার শারীরিক কাজকর্ম থেমে যায়। আর ধীরে ধীরে সে পৃথিবীতে পুরাতন হতে থাকে।
জন্ম আর মৃত্যু দুটোই বড় বিচিত্র বিষয়। একটায় অস্তিত্ব প্রমাণের বিষয়। আর আরেকটায় অস্তিত্ব বিলীন ঘোষণা করে। কোত্থেকে সে এলো কোথায় আবার সে চলে যাচ্ছে আমরা কেউ এই রহস্যের মর্ম জানি কী? আমরা কেউ জানি না মৃত্যুর পরে মানুষ বা অন্য প্রাণীর মনটা কোথায় যায়? মন ভ্রমরটা কী তখন মহাশূন্যের গহীন শূন্যতার মধ্যে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়? যে স্বাধীনতার জন্য আসলে তার জন্ম আর পরবর্তীতে চরম বা পরম সুখ ভোগ বা মৃত্যুর মাধ্যমে তার সমাপ্তি। জন্মের চেয়ে মৃত্যু রহস্য অনেকটা বেশি জটিল। কারণ, আজ পর্যন্ত মৃত কোনো প্রাণী পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে এসে আমাদের কোনো তথ্য প্রদান করেনি। করলে বিষয়টার রহস্য হয়তো কিছুটা হলেও উদ্ঘাটন করা যেতো। আমরা আসলে মরার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি আর আমরা এই কাজটা খুব সঠিকভাবে করি। এই কাজটায় আজ পর্যন্ত কোনো প্রাণী ভুল করেনি। আমরা যারা এখনো জীবিত আছি আমরাও হয়তো এই বিষয়ে কোনো ভুল করব না। অর্থাৎ আমাদের জন্যও নিশ্চিত মৃত্যু তা সে যতোই কঠিন হোক অপেক্ষা করছে। আর আমরা সেই চরম বা পরম সুখ উপভোগ করার জন্য আমাদের বয়স কেবল বাড়িয়ে চলছি।
গত ১৪ মে ২০১০ আমার বন্ধু আলফ্রেড খোকনের মা চলে গেলেন। কোথায় গেলেন তিনি? আমাদের এভাবে নিসঙ্গ করে রেখে কোথায় গেলেন তিনি? তাঁর কী ওই দিন চলে যাবার কথা ছিল? মহাশূন্যের এতোবড় অজানা অচেনা জায়গার মধ্যে কোথায় গেলেন তিনি? পৃথিবীতে চরম বা পরম সুখ উপভোগ করার জন্য তিনি কী ওই ১৪ মে ২০১০ কে পছন্দ করলেন? কেনো করলেন? আমরা কেউ কী সেই রহস্য জানি? ছেলেমেয়ে সংসার ফেলে কোথায় নিরুদ্দেশ হলেন তিনি? একজন মা এভাবে কেনো নিরুদ্দেশ হন? আমার মা কেনো গত বছর নিরুদ্দেশ হল? খোকনের মা কেনো সেদিন ওভাবে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হলেন? নিরুদ্দেশ হয়ে এঁরা সবাই কোথায় যায়? কেনো যায়? কীসের সন্ধানে যায়? আমরা কেউ কী সেই প্রশ্নের জবাব জানি? নাকি জানার জন্য আমরাও একদিন নিজের নিজের পছন্দের দিনে ওই একই নিরুদ্দেশ পথে রওনা হব? কেনো আমরাও তাই করব? আমরা কেউ জানি না? বরিশাল থেকে ফিরে খোকন আমাকে ফোন করল। কারণ, খোকন ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছে এই দুঃসংবাদটি আমি শুনিনি। শুনলে আমি খবর নিতাম। অন্যান্য দিনের মতোই স্বাভাবিক একটা ফোন মনে করে আমি খোকনের ফোন রিসিপ করি। আমি কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই খোকন শুধু আস্তে করে বলল- মা তো চলে গেল রে!!! মা চলে গেল!!! কোথায় গেল মা??? কেনো গেল? আমি খোকনের এই কথার কী জবাব দেব? আমি সেদিন খোকনের সাথে আর স্বাভাবিক কথাও বলতে পারিনি। কেনো পারিনি জানি না! ঠিক গত বছর এমনিভাবে আমার মা যখন ২৭ জানুয়ারি নিরুদ্দেশ হল। আমি তখনও কিছু বলতে পারিনি। ঢাকায় ফিরে বাংলা একাডেমীর অমর একুশে বই মেলায় খোকন যখন আমার ঘাড়ে শক্ত করে হাত রেখে আমাকে শান্তনা দেবার চেস্টা করেছিল, আমি তখনো কিছু বলতে পারিনি। কারণ, মা চলে গেলে সেই দুঃসংবাদিটি পৃথিবীতে সবচেয়ে কস্টের। হয়তো আমরা এই অভিজ্ঞতা নিচ্ছি কারণ একদিন আমরাও নিরুদ্দেশ হব। তখন আর এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে না। আমরা স্বাধীন হয়ে যাবো। আমরা তখন ইচ্ছে মতো মহাশূন্যের গোটা রহস্য নিয়ে বিচরণ করতে পারবো।
মায়ের মৃত্যু যে কতো বড় দুঃসংবাদ এটি যার অভিজ্ঞতা নেই তাকে বোঝানো যাবে না। আর এটা বোঝানোর বিষয়ও নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষটি চলে গেলে একজন মানুষের কেমন লাগতে পারে তা হয়তো এখন আমি বা খোকন অনুভব করতে পারি। আর আমরা শুধু নিজেদের মনকে শক্ত করার জন্য প্রলাপ করতে পারি অথবা আমরা চুপচাপ কিছু না বলে বসে থাকতে পারি। খোকন তোকে শান্তনা দেবার শক্তি আমার নেই। তুই শুধু মনে কর গত বছর তুই যেভাবে আমাকে মন শক্ত করার জন্য বলেছিলি, আমার কিছু বলার যদি থাকে হয়তো তোর কথাকেই নিজের মুখে আবার বলব তোকে। এর বেশি কিছু নয়। আমি এখন মাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার কথা ভাবি। হয়তো এমন ভাবনা তোর মাথায়ও উঁকি দেবে। যদি এমন কোনো উঁকি থেকেও আরেকবার মাকে দেখা যায় ক্ষতি কী?
মা। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট্ট শব্দ। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত শব্দ মা। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ মা। পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের শব্দটি মা। শব্দ নিয়ে পৃথিবীর নানা ধরণের জরীপের ফলাফল বলছেÑ মা শব্দটি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ। মা শব্দটি পৃথিবীর সবচেয়ে আপন শব্দ। প্রাণী মাত্রই মা শব্দটি তার কাছে সবচেয়ে আপন। প্রাণী মাত্রই মা শব্দটি সবচেয়ে প্রিয়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় শব্দটিও মা। কেনো মা এতো প্রিয় তার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। পৃথিবীতে শব্দ নিয়ে গবেষণার ফলাফল দাবী করে যে, মা শব্দটির পরে সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত শব্দটি নাকি গড, খোদা, আল্লাহ, ঈশ্বর, বা ভগবান। অর্থাৎ স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার চেয়েও বেশিবার উচ্চারিত শব্দটি হল মা। পৃথিবীর সবচেয়ে আপন হল মা। সেই মাকে যে হারায় তার যে কতো কষ্ট তা পৃথিবীর তাবৎ ভাষার সকল শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করলেও সেই কষ্টকে হয়তো সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সেই অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে তারাই শুধু তা বুঝতে পারে। বাকীরা হয়তো সহানুভূতি সহমর্মিতা ইত্যাদি দেখাতে পারে। কিন্তু মনের ভিতরের কষ্টটাকে আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
খোকন তুই মাকে নিয়ে কিছু একটা কর। তাহলে হয়তো কিছুটা কষ্ট লাঘব হবে। আমি মাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখব। তুই তো এখন ছবিও আঁকিস। মা’য়ের ছবিটা খুব মন দিয়ে আঁক। মাকে নিয়ে পৃথিবীর সেরা কবিতাটা লেখ। মাকে নিয়ে পৃথিবীর সেরা লেখাটা লেখ। মাকে নিয়ে পৃথিবীর সেরা গানটা লেখ। মাকে নিয়ে পৃথিবীর সেরা কাজটা শুরু কর। তাহলে হয়তো কিছুটা হলে মানসিকভাবে রিলিফ পাবি। আমার তোকে শান্তনা দেবার মতো কোনো সাহস বা শক্তি নেইরে বন্ধু। যখন মা চলে যায় তখন তাকে আর কোনোভাবে প্রকাশ করলেও সেই শক্তিটা আর আমি পাই না। পৃথিবীর সবকিছু যার কাছে প্রকাশ করা যেতো, পৃথিবীর সব আবদার যার কাছে দাবী করা যেতো, সেই মা যখন চলে যায় তখন পৃথিবীতে সবকিছু কেমন শূন্য শূন্য লাগে। বিশাল এক শূন্যতা যেনো পেয়ে বসে। খোকন, এই শূন্যতা কাটানোর কোনো উপায় আমার জানা নেইরে বন্ধু। আমিও গত এক বছর ধরে এই শূন্যতা কাটানোর অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। আমার ধারণা তুই মাকে নিয়ে যা কিছু করবি সেটাই সেরা হবে। মা, তুমি কেমন আছো মাগো। কেনো তুমি এভাবে চলে যাও, মা। তোমাকে দেখতে না পেয়ে যে আমার পৃথিবী অচল হয়ে যায়। সবকিছু কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কেমন একা একা লাগে। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষটি মনে হয় নিজেকে। কেনো এমন মনে হয় আমি জানি নারে বন্ধু। খোকন, তুই কী জানিস?


রেজা ঘটক \ ২৬ মে ২০১০ \ গাবতলা \ মগবাজার \ ঢাকা \
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29166791 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29166791 2010-05-31 15:35:24
আপনি কী বিনা খরচে চন্দ্রে যেতে চান? রেজা ঘটক আপনি কী বিনা খরচে চন্দ্রে যেতে চান? রেজা ঘটক

হঠাৎ কোন এক দৈব দুর্ঘটনায় পৃথিবীর সাতজন মানুষ একেবারে জীবনমরণ সমস্যার মুখোমুখি হল। জীবন বাঁচাতে তারা দৈব অশুভ শক্তির সাথে প্রাণপণ লড়াই করছেন। কিন্তু কিছুতেই তারা ওই দৈব অশুভ শক্তির সাথে লড়াইয়ে পেরে উঠছেন না। ঠিক সেই সময় ঘটনাস্থলে হাজির হলেন করুণাময়ী পরহিতৈষী সেবাব্রতী শর্তাবাহী দুর্গাময়ী নির্ভিক এক আকাশ দেবী। দৈব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সেচ্ছায় বর্জ্রকঠিন দুর্দান্ত লড়াই করে তিনি ওই সাতজন মানুষের জীবন বাঁচালেন। বিপদ থেকে সদ্য উদ্ধার পাওয়া ওই সাতজন হতবিহ্বল মানুষকে এরপর এক কঠিন প্রস্তাব করলেন আকাশ দেবী।

তিনি বললেন, এখন তোমাদের কাছে আমি সামান্য একটা জিনিস চাই, আর নিজেদের ভূতভবিষ্যৎ দুর্গতির আসু স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে ইচ্ছে করলে তোমরা তা দিতেই পারো। তবু দূরভবিষ্যতের নির্বোধ খচ্চরের মতো অদূরদর্শী অকর্মন্য কালোত্তীর্ণ তোমরা যদি তা দিতে না চাও, তাহলে এখন থেকে ঠিক ১০৫ বছর পরে আবারো তোমরা একই ধরনের জীবনমরণ সমস্যার মুখোমুখি হবে। আর তখন তোমাদের বাঁচানোর জন্য কেউ এগিয়ে আসবে না।

প্রিয় পাঠক, বলতে হবে আকাশ দেবী ওই সাতজন মানুষের জীবন বাঁচিয়ে তাদের কাছে তখন কি অমন দূর্লভ বস্তু দাবী করেছিলেন? আর কেনইবা ওই সাতজন মানুষ জীবন বাঁচানোর পরেও অমন একজন পরোপকারী আকাশ দেবীর নিরহঙ্কার প্রলোভনে রাজী হয়নি?

প্রিয় পাঠক, প্রশ্নের জবাবগুলো আপনারা শুধু মনে মনে ঠিক করতে পারলেই ঈশ্বরের একান্ত সচিব মিস্টার চিত্তগুপ্ত বাবুর মাধ্যমে আয়োজকদের দপ্তরে পৌঁছে যাবে। সঠিক জবাব দানকারীদের মধ্যে লটারি করে শ্রেষ্ঠ একজনের জন্য রয়েছে অত্যন্ত লোভনীয় একটা পুরস্কার।

আগামী ২০১১ সালের ২১ শে জুলাই মার্কিন মহাকাশ কেন্দ্র নাসা চন্দ্রপৃষ্ঠে যে নভোযান পাঠাতে যাচ্ছে, পুরস্কার বিজয়ী বিনা খরচেই সেই নভোযানের একজন সৌভাগ্যবান নভোচারী হতে পারবেন। আপনাদের শুধু বলতে হবে আকাশদেবী আসলে ওই সাতজন মানুষের কাছে তখন কি চেয়েছিলেন? আর তারা-ইবা কেন তা দিতে রাজী হয়নি?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29157087 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29157087 2010-05-17 23:04:36
সুরের কন্যা রুপশী রুপশ্রী।। রেজা ঘটক
সেদিন ছিল ২রা এপ্রিল ২০১০ শুক্রবার। ছুটির দিন। চৈত্রের তাপদাহ ভ্যাবসা গরমে ঢাকার সড়কগুলো কিছুটা যেনবা ফাঁকা ফাঁকা। লোকজন তবে কি আজ বাইরে বের হতে চাচ্ছে না? এমনিতে লোডসেডিংয়ের তাণ্ডবে সবাই ভারী অতিষ্ট। তবু ঘরে বসে থাকাটা কেমন যেন বিরক্তিকর। আলস্য ভেঙে এক সময় সিদ্ধান্ত নিলাম বাইরে যাওয়া যাক। পকেটের অবস্থা যদিওবা তথৈবচ। তবু বন্ধু মিজানকে বললাম গুলশানে একটা সঙ্গীত সন্ধ্যায় গেলে কেমন হয়! মিজান জানতে চাইল কে গান করবে? জবাবে বললাম শিল্পী আমার কাছেও নতুন। আমাদের হাতে আছে ৫০ মিনিট। আগে বলো আমরা মগবাজার থেকে ৫০ মিনিটে গুলশান-১ এ পৌঁছাতে পারব কিনা? মিজান বলল আজকে রাস্তাঘাটের যে অবস্থা আমরা একটা রিক্স নিলে পারতেও পারি। আমি শীতল কণ্ঠে বলি রিক্সটা নিলে কেমন হয়? মিজান হ্যা সূচক সায় দেয়। আমরা গাবতলা পালাকারের রিহার্সেল রুম থেকে ঝটপট বেরিয়ে পড়ি। তার আগে একবার চা আর সিখারেট খেয়ে আরেকবার সময় নিয়ে কঠিন হিসাব নিকাশ করি। কারণ সঙ্গীত অনুষ্ঠানে এক মিনিট লেট হলে নাকী আর প্রবেশ করা যাবে না বলে বন্ধু বাবলীর হুঁশিয়ারীটা বারবার পেন্ডুলামের মতো মাথায় চক্কর মারতে থাকে। আমরা ঠিক করলাম যদি গান শোনা না যায় তাহলে বেশি অর্থ খরচের কোনো মানে হয় না। ঝটপট মগবাজার চৌরাস্তা থেকে বলাকায় উঠে পড়ি। মহাখালী নেমে আবার বাস অথবা রিক্সা নেবার ইচ্ছে। কী আশ্চার্য মহাখালী পৌঁছালাম মাত্র ১৫ মিনিটে। ঘড়ির কাঁটায় ৭:১০টা। মিজান বলল আমরা বাসে গেলে লাগবে ১০ মিনিট। আর রিক্সায় গেলে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। আমরা রিক্সাই পছন্দ করলাম। তাহলে বড়লোক পাড়ায় অন্তত কিছুটা হাওয়া খাওয়া যাবে ফ্রি ফ্রি। রিক্সায় উঠেই সময়টা আরেকটু বাঁচাতে বাবলীকে ফোন দিলাম। আমরা এখন মহাখালী। কোন পথে আসলে দ্রুত আসা যাবে বলো। বাবলীর কণ্ঠের অবস্থা আজ কিছুটা উন্নতির দিকে। ২৬শে মার্চ থেকে বাবলীর কণ্ঠের বারোটা বেজে আছে। যাক বেচারা হয়তো আমার টিপস ফলো করেছে। টিপস হিসেবে বলেছিলাম- তোমার প্রোগ্রামের আগে কারো সাথে কথা বলবে না। হাতে কাগজ কলম নিয়ে লিখে লিখে কথা বলো। আর লবণ দিয়ে কুসুম গরম জল খাও। আর প্রতি ঘণ্টায় গলার মধ্যে একটা লবঙ্গ চালান করতে ভুলো না যেন। বাবলী শর্টকার্ট পথের দিকনির্দেশ দিল। আমরা ঠিক ৭:২৫টায় বসতি ড্রিমের নীচে পৌঁছালাম। হাতে এখনো ৫ মিনিট। আরেক পশলা চা আর সিখারেট না হলে আর জমে না। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সন্ধ্যা ৭:৩০ টা। আমরা লিফট থেকে কয়েক সিড়ি নীচে নেমেই বাবলীর সাউন্ড অব মিউজিক পেয়ে গেলাম। দরজা ঠেলে উঁকি দিতেই বাবলীর চাঁদমুখখানা হাসিতে চকচক করে উঠল। ঘর ভরতি মানুষ। কোথায় বসি আমরা? বসার আগে আমাকে ওজন কমাতে হবে। বাবলীকে বাম হাতের কনে আঙুল দেখালে ও বুঝতে পারল আমার কী চাই।
গাদাগাদি করে বসলাম একেবারে শিল্পী থেকে মাত্র তিন হাত দূরে। শিল্পী ডক্টর নুসরাত মমতাজ রুপশী। ভায়োলিন হাতে আসন গ্রহণ করলেন। বাকশ থেকে ভায়োলিন বের করলেন। খুব মন দিয়ে টিউন করলেন। চারদিকে এক নজর তাকালেন। তারপর মুখ খুললেন। আমি ছয় বছর ভায়োলিন বাজাই। ভায়োলিনে ডক্টরেট করেছি। কিন্তু আমি মনে করি এখনো আমি ছাত্র। ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতেই আমি স্বাচ্ছন্দবোধ করি। এখানে আমার টিচারও উপস্থিত আছেন। আমি একটা চেস্টা চালাব। আজ আমি রাগ বাজাব। আমি সাধারনত রাগ-রাত্রি দিয়ে শুরু করি। আর শেষ করি রাগ-ভৈরবী দিয়ে। আপনারা কেউ বুঝতে না পারলে বুঝব আমার চেস্টা ব্যর্থ হয়েছে। আর যদি আপনাদের মধ্যে টু পারসেন্টও বুঝে থাকেন আমি কী বাজালাম, তাহলে বুঝব ওরা যেহেতু বুঝেছে। তার মানে আমার বোঝানোর ক্ষমতা ওইটুকু। তো শুরু করি। আমি যে রাগটা দিয়ে শুরু করব- ওটায় আপনাদের মন খারাপ হতে পারে। মনে হতে পারে মনের সব দুঃখবোধ বুঝি উজানের মতো আপনাকে তাড়া করেছে। এমনকি আপনাদের কান্নাও পেতে পারে। আবার ভালো লাগাও তৈরি হতে পারে। আর কথা নয়। এবার শুরু করি। এরপর রুপশী তাঁর সহশিল্পী হিসেবে তবলায় আর ড্রামে যাঁরা আছেন তাঁদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। রুপশী বাজানো শুরু করেন।
সত্যি কথা বলতে কী আমি গানের একজন কঠিন সমঝদার হলেও ওইদিন প্রথম কোনো ভায়োলিন প্রোগ্রামে যাওয়া। অন্যান্য যন্ত্র সঙ্গীত আমার অনেক শোনা হয়েছে। সেসব অনুষ্ঠানে ভায়োলিন হয়তো বেজেছে। কিন্তু সরাসরি ভায়োলিন লিড করছে সেরকম প্রোগ্রাম এটাই প্রথম। সেজন্য বন্ধু বাবলী যার আসল নাম ফৌজিয়া জেড চৌধুরী, সাউন্ড অব মিউজিক ইস্কুলের যিনি প্রিন্সিপাল তাঁকে একটা মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম। রুপশী ভায়োলিন বাজাচ্ছে। আমরা ঘর ভরতি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রোতা পিন পতন নিরাবতায় তা উপভোগ করছি। আমার মনে হচ্ছে আমি তখন নরওয়ের রাজধানী অসলোর কোনো নির্জন রাস্তা ধরে একাকী হাঁটছি। দুপাশে সারি সারি কমলা, বাতাবি আর আপেল গাছ। সময়টা হয়তো গ্রিস্মেও কোনো অপরান্থ। ঝাঁকে ঝাঁকে তারার মতো ঝুলে থাকা কমলা বাতাবি আর আপেল ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমি কোনো হেমিলিনের বাঁশীওয়ালার পিছু নিয়েছি। যতোই হাঁটছি ততোই ভালো লাগছে। বাঁশীওয়ালা সম্ভবত আমাকে যাদু করেছে। কী আশ্চার্য আমি যতোই তার কাছাকাছি যাচ্ছি বাঁশীওয়ালা ততোই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছেন। এক সময় আমি আপেল বনে পথ হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু কানে বাজছে বাঁশিওয়ালার সেই মন ভোলানো যাদুকরী সুর। আর সেই সুরে যেনবা বাজছে- পথ হারালে খোকা আমায় পাবে না। কিন্তু আমি পথ ভুলে গেছি। চিনচিন একটা বেদনাবোধ ভিতরে ভিতরে আমাকে কী একটু একটু কাবু করে ফেলেছে? নাকী গহীন আপেল জঙ্গলে বিদেশ বিভুঁই আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ়! নাকী আমি তখন বাসন্তী মেঘের সাথে পাল্লা দিয়ে আপেল বনে খুঁজে ফিরছি হেমিলিনের বাঁশীওয়ালাকে! একটু পরেই সূর্য ডুবে যাবে। আর একা আমি ছোট্ট খোকা পথ হারিয়ে কার বাড়িতে যাবো? অসলোর রাস্তায় আমাকে যে কেউ চেনে না। হায়। ঠিক সেই সময় রুপশীর ভায়োলিনের প্রথম রাগ-রাত্রী শেষ হল। দেখলাম আমি অসলোর আপেল জঙ্গলে মন খারাপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস দাঁড়িয়ে নয়। আমি বাবলীর গানের ইস্কুলের ছোট্ট কক্ষে এক ভায়োলিন বাজনেওয়ালীর পাশে চুপটি করে বসে আছি। রুপশীর হাতের আঙুলগুলো আমার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে চোখ বন্ধ করে বাকী জীবন এই বাজনা শুনে শুনে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি।

রাত্রী যতো গভীর হচ্ছে রুপশী ততোই যেনবা সুরের মূর্ছণায় চারপাশ মাতিয়ে তুলছে। কাছে কোথাও হয়তো বা কামিনী ফুল ফুটেছে। আকাশ ভরা জোসনা। একটু আগে বুঝি বর্ষা এসে গাছগাছালিকে স্নান করিয়ে গেছে। আজগুবি রহস্য নিয়ে মেঘদুত মেতেছে লাখো মাইল দৌড় প্রতিযোগীতায়। চরাচরে আজ আর কেউ জেগে নেই। একা আমি আর ওই দূরপ্রবাসী মন পাগল করা চাঁদ। বাতাস গান করছে। কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ছলনাময়ী হিহি টিপ্পনিমারা হাসি ভেসে আসছে যেনবা নদীর ওপার থেকে। আর আমি এক জোড়া ডানার অভাবে এপাশ ওপাশ করছি। সময় তুমি সবুজ ডাইনি। সন্ধ্যার উঠোনে নাবিকের হাড় দিয়ে কবেকার সেই হারিয়ে যাওয়া জাহাজের ছবি একে একে তুমি আমাকে একটা গল্পই কেবল শুনিয়ে যাও। আর বোকা আমি কেবল তোমার সেই না ফুরানো রহস্যময় গল্পটাই শুনতে থাকি। পৃথিবীর উপকূল থেকে আমাকে তুমি কোথায় নিয়ে যেতে চাও শুনি?
দূর নক্ষত্ররা যেখানে থাকে সেখানে আর কার কার বাড়ি আছে বলো? সেখানে কী পৃথিবীর মতো মায়া আছে? ছায়া সুনিবিঢ় শান্তির গ্রাম আছে? মন চুরি করা চন্দ্রমুখী আছে? প্রাণ উদাস করা গানের পাখী আছে? দূর থেকে ভেসে আসা নির্জন মধ্যরাতের গির্জার ঘণ্টার ঢং ঢং বিদারী আছে? নইলে আমার মন এতো উচাটন করছে কেন আজ? রুপশীর হাতে সত্যি সত্যি এক অভিনব যাদু আছে। সুরের সেই যাদুতে আমরা হাবুডুবু খেতে খেতে মাঝ নদীতে নৌকা না ডুবিয়ে তীরের যখন প্রায় কাছাকাছি, তখন রুপশী আবার কথা বলেন। রাগ ভৈরবী দিয়ে শেষ করতে চান আজকের আসর। রুপশী বলেনÑ বধূ বিদায় বা কনে বিদায়ের সময় আমাদের মনে যেমন একটা না বলা চাপা কষ্ট ছটফট করে, তেমন একটা কষ্ট হয়তো বাজাবো এবার। আমরা কষ্ট নেবার জন্য আরো নিবিষ্ট হই সুরে। হয়তো তখন ভোর। পূবাকাশে একাকী শুকতারা জ্বলজ্বল করছে। একটু আগে চাঁদ ডুবেছে। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে মধুমতীর তীরে বধূ বিদায় দিতে দাঁড়িয়ে পিসিমা। ছেলেটা তার কলকাতায় নতুন ডাকঘরের ডাকহরকরার চাকরি নিয়ে ছয়মাস ধরে সেখানে। প্রিয় বধূ তার ছেলের কাছে যাচ্ছে একা একা। মনে তার স্বামীকে দেখার বাসনা। দীর্ঘদিন ছয় মাস পরে ভালোবাসা বুকে নেবার আশা। আর পিসিমার মন সেই কাকডাকা ভোরে কীসের কষ্টে অতো মলিন। পিসিমা কতোক্ষণ মধুমতীর তীরে ওভাবে একাকী কুয়াশার মধ্যে মন উদাস করে দাঁড়িয়ে ছিল আমরা জানি না। তার প্রিয় পুত্রবধূ কখন যে কুয়াশার মধ্যে ছদ্মবেশ নিয়ে কতোক্ষণে আড়াল হল আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি সূর্য ব্যাটার তীর্যক ঝলক যখন পিসিমার মুখমণ্ডলে এসে গরম একটা হুহু লাগিয়ে দিল, তখন পিসিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। কী ছিল তার মনের দুঃখ! নাকী ছেলের সুখের কথা ভেবে পিসিমা নিজেকে নিজে প্রবোদ দেনÑ তুই ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকিরে খোকা।
রুপশী যখন গান শেষ করলেন, তখন আমরা পিসিমাকে ছেড়ে বাবলীর ইস্কুলে হৈহৈ করে উঠি। সত্যিই মুগ্ধ করার মতো একটা সন্ধ্যার সাথে অনেক দিন পর আমার সাক্ষাৎ হলো। এমনিতে গোধূলীর বাউলি লাগলে আমি কেমন উদাস হয়ে যাই। ইচ্ছে করে ওই দূর পাহাড়ে গিয়ে একাকী কোনো টিলায় বসে থাকি। আদিবাসী প্রনয়ী মেয়েটি ওই পথ থেকে যাবার সময় আলতো করে পেছন থেকে আমায় ছুঁয়ে দিয়ে মেঘের আড়ালে পালিয়ে যাবে। আর আমি গোটা সন্ধ্যে তার চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে শত-সহস্র সনেট বানাই। হ্যা, রুপশীর ভায়োলিন আমি আরো শুনতে চাই। শুনতে চাই ভরা বর্ষার কোনো মাতাল করা রাতে রুপশী আমাদের সুরের যাদুতে নতুন কোনো জগতে নিয়ে যাক। সারারাত শুধু সুরের মায়ায় আমরা দলবেধে হারিয়ে যাই নতুন কোনো ঠিকানায়। বর্ষা রাতে ভায়োলিন হয়তো রুপশীর হাতে আরো যাদুকরী ডাক দিয়ে আমাদের নতুন কোনো তীর্থে যাবার জন্য তাড়িয়ে বেড়াবে। আমরা সেই ভরা বর্ষার মোহনীয় রাতের প্রাণ মাতাল করা সুরের হাতছানিতে ভুলে যেতে চাই। হতে চাই বর্ষারাতের কোনো তীর্থযাত্রী। জয়তু ভায়োলিন। জয়তু রুপশী সুরশ্রেষ্ঠা।

৫ এপ্রিল ২০১০। ২২ চৈত্র ১৪১৬। সোমবার। গাবতলা, মগবাজার।।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29129564 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29129564 2010-04-05 18:47:59
অপারেশন সার্চলাইট এবং আজকের শপথ।। রেজা ঘটক
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ট্যাংক, মেশিনগান, কামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে নিরিহ বাঙালির ওপর। সেই রাতে নির্বিচারে যে নরহত্যা করা হয়েছে বিশ্বের ইতিহাসে তা কালোরাত্রী নামে আর বাঙালির হৃদয়ে স্বজন হারানোর সাক্ষী হয়ে আছে। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো, সেনা প্রধান টেক্কা খান, জেনারেল এএকে নিয়াজী আর তাদের দোসররা মিলে অপারেশন সার্চ লাইট নামে যে নীল নকশা করে তা ওই রাতে বাস্তবায়ন করা হয়। এই অপারেশনের প্রধান টার্গেট ছিল পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক স্বাধীনতার লড়াইকে চিরতরে গুড়িয়ে দিয়ে অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার নামে এদেশের নারী পুরুষ নির্বিচারে সবাইকে হত্যা করা। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর পৃথিবী এক রাতে এতো নির্বিচারে হত্যা আর কোনদিন প্রত্যক্ষ করেনি। সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ গোটা ঢাকায় এক সাথে নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপরে ঝাঁপিয়ে পরে পাক সাঁজোয়া বাহিনী। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে তারা নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধা ভিখারী পথচারী লেখক কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক শিক্ষক উকিল ব্যাংক কর্মকর্তা কর্মচারী শ্রমিক মজুর রিকশাচালক স্বর্ণকার কর্মকার ব্যবসায়ী মুদি দোকানি কাঁচামাল বিক্রেতা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ব্যারিস্টার শিল্পী আর্টিস্ট পেশকার সবাইকে।
গোটা ঢাকা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় এক মৃতপুরীতে পরিণত হয়। লাশে লাশে ঢেকে যায় রাজপথ মাঠ ঘাট পথ স্টেশন ঘরবাড়ি কলোনি আবাসিক এলাকা বস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস মার্কেট দালানকোঠা পার্ক হাটবাজার পত্রিকা অফিস মেঠোপথ দুর্বাঘাস। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। পৃথিবী নির্বাক। ইতিহাসে অমন পরিকল্পিত সংঘবদ্ধ হত্যা আর একটাও নেই। বিশেষ করে এই হত্যার বিপরীতে সেই রাতে কোনো প্রতিরোধ বা পাল্টা হামলা ছিল না। ছিল না কোনো দয়া মায়া মমতা। ছিল না কোনো বাছবিচার নির্বিচার। সারা ঢাকা শহর তথন এক রক্তের শহর। সারা ঢাকা নগরী তখন এক মৃতপুরী। চারিদিকে শুধু শকুন আর পাক হায়ানা। পৃথিবীর ইতিহাসে সেই নির্বিচারে গণহত্যার এখন পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি। এখন পর্যন্ত সেই হত্যার কোনো রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা প্রার্থণা হয়নি। হয়নি কোনো ক্ষতিপূরণ। হয়নি কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার। হয়নি কোনো দায় স্বীকার। হয়নি কোনো সম্পদ ফিরিয়ে দেবার প্রতিশ্র“তি। হয়নি কোনো রাষ্ট্রীয় চুক্তি যার আওতায় পাকিস্তান সব কিছুর ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। অথবা হয়নি কোনো পরিকল্পিত দাবী যার আওতায় পাকিস্তান অন্তত বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়। আমরা সেই গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো জোড়ালো দাবী আন্তর্জাতিক আদালতে উত্থাপন করতে পারিনি। পারিনি পাকিস্তানকে কোনো ধরনের বিচারের সম্মুখিন করতে। আমরা ৩৯ বছরে আসলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারিনি। এটা জাতী হিসাবে আমাদের চরম ব্যর্থতা। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেউলিয়ত্ব আর স্বার্থপর রাজনীতির চরম বহিপ্রকাশ হল আমরা এখনো শুধু মুখে বড় কথা বলি আর কর্মে একেবারে গোবর গনেশ।

২৫ মার্চের সেই গণহত্যা থেকে বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যার পরিণতি পরবর্তী নয় মাসের গণযুদ্ধ। আরো হত্যা আরো লাশ। আরো ধর্ষণ আরো লুপটরাজ। আরো জ্বালাও পোড়াও আরো ধ্বংস। গোটা বাংলাদেশ এক ধ্বংস ¯তূপে পরিণত হয়। খালী হয় ত্রিশ লাখ মায়ের কোল। ধর্ষিত হয় আট লাখ বাঙালি বীরাঙ্গনা মা। শেষ হয়ে যায় এদেশের আড়াই লাখ বুদ্ধিজীবী পেশাজীবী নরনারী। শেষ হয়ে যায় গোটা বাংলাদেশ।
সব শেষ সব শেষ শুধু প্রাণ হাতে বেঁচে থাকল ধুকধুক বাংলাদেশ। একটা প্রলয় মনুষ্য সৃষ্ট ধ্বংসলীলার পর ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিল। যারা বেঁচে থাকল তাদের দায়িত্ব পরল দেশটাকে আবার সোনায় সোনায় ভরিয়ে দেবার। কিন্তু তারা কী তাই করল? নাকী তারা নিজেদের স্বার্থ নিয়েই টানা হেঁচরা শুরু করল। তারা আবার নতুন করে চুরি লুটতরাজ হত্যা দখল শুরু করল। তারা কারা?
তারা আমাদের এই সোনার বাংলার শাসক। তারা আমার এই সোনার বাংলার ঘাতক। তারা আমার এই স্বাধীন দেশের শোষক। তারা আমার এই খাঁটি মাটির রক্তচোশক। তারা আমার এই বাংলাদেশের ক্ষমতাবান মুর্খ রাজনীতিক। তারা আমার এই সোনার বাংলার মানুষ খেকো নতুন পিচাশ। তারা আমার এই নতুন বাংলার নয়া শকুন। তারা কারা? তারা আওয়ামীলীগ। তারা বিএনপি। তারা জাতীয় পার্টি। তারা জামাতী ইসলামী। তারা দালাল। তারা ডাকাত। তারা লুটকারী। তারা হত্যাকারী। তারা ক্ষমতাসীন। তারা বিরোধীদল। তারা সাংসদ। তারা চেয়ারম্যান। তারা কেয়ার নেন বাংলাদেশের। কীভাবে? চুরি করে। ডাকাতি করে। লুটতরাজ করে। দুর্নীতি করে। দখল করে। ছিনতাই করে। ক্ষমতা দেখিয়ে। শাসিয়ে শোষণ করে। তারা কারা? তারা পাক হানাদারদের নব্য দোসর। তারা কারা? তারা রাজনীতির নামে স্বর্থপর এক শ্রেনী শাসক। ৩৯ বছরে তারা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই দেখেনি। তারা এখনো লুটতরাজ করছে। এখনো ছিনতাই করছে। এখনো দুর্নীতি করছে। এখনো শাসন করছে আর ভাগাভাগি করছে। কাদের মধ্যে ভাগাভাগি? নিজেদের মধ্যে। নিজেরা কারা? আওয়ামীলীগ। বিএনপি। জাতীয় পার্টি। জামাতী ইসলামী। দিবস পালন এদের একটা উপলক্ষ্যমাত্র। চুরিতে তারা থামেনি। ডাকাতিতে তারা থামেনি। ছিনতাইতে তারা থামেনি। দখলে তারা থামেনি। শাসনে তারা থামেনি। শোষণে তারা থামেনি। মিটিংয়ে তারা থামেনি। মিছিলে তারা থামেনি। চিৎকারে তারা থামেনি। মিথ্যা বলায় তারা থামেনি। ধন সম্পদ বৃদ্ধিতে তারা থামেনি। বিদেশ সফর করতে তারা থামেনি। বিদেশে টাকা পাচার করতে তারা থামেনি। মানুষ হত্যা করতে তারা থামেনি। মিথ্যা মামলা করতে তারা থামেনি। ওমরা হজ করতে তারা থামেনি। মোটকথা নিজেদের স্বার্থ তারা মোটেও ভোলেনি। তারা মোটেও থামেনি। নাটক করতে তারা ভোলেনি। নাটক দেখাতে তারা হটেনি। ক্ষমতা যে কী তারা তা ভোলেনি ছাড়েনি।

বাংলাদেশ গত ৩৯ বছরে শুধু ভাগ হয়েছে। বাংলাদেশ গত ৩৯ বছরে শুধু লুট হয়েছে। বাংলাদেশ গত ৩৯ বছরে শুধু ধর্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ গত ৩৯ বছরে শুধু পুড়েছে। বাংলাদেশ গত ৩৯ বছরে শুধু নিঃশেষ হয়েছে। এজন্য কারা দায়ী? দায়ী আমাদের গত ৩৯ বছরের শাসক। দায়ী আমাদের গত ৩৯ বছরের শোষক। দায়ী আমাদের গত ৩৯ বছরের ক্ষমতাসীন ভণ্ড রাজনীতিক। তারা কারা? তারা আওয়ামীলীগ। তারা বিএনপি। তারা জাতীয় পার্টি। তারা জামাতী ইসলামী। তারা মুখোশ পরা স্বার্থপর খুনি টেক্কাখানদের দোসর। তারা মুখোশ পরা একদল চটুল চাটুকর। তারা একদল স্বার্থপর ভণ্ড রাজনীতির বাঁদর। তারা একদল রক্তখোর হায়ানার আসর। তারা একদল মিথ্যেচারী বদমায়েস খাটাস। তারা একদল নরখাদক পিচাশ।

গত ৩৯ বছরে বাংলাদেশ এদের থেকে এক মিনিটের জন্য রেহাই পায়নি। গত ৩৯ বছরে বাংলাদেশ এদের থেকে এক দিনের জন্য মুক্তি পায়নি। গত ৩৯ বছরে বাংলাদেশ এদের থেকে একটা মাসের জন্য রক্ষা পায়নি। গত ৩৯ বছরে বাংলাদেশ এদের থেকে একটা বছরের জন্যও স্বস্থিতে থাকতে পারেনি। এরা গত ৩৯ বছরে বাংলাদেশের অবশিষ্ট সম্পদটুকু নিজেদের মধ্যে শুধু ভাগ বাটোয়ারা করার এক কঠিন খেলায় মেতে রয়েছে। আমার বাংলাদেশ ভাগ হয়ে যাচ্ছে। আমার বাংলাদেশ শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার বাংলাদেশ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশকে বাঁচাতে হবে। এই নব্য হায়ানার দোসরদের হাত থেকে আমার বাংলাদেশকে বাঁচাতে এখনই প্রয়োজন কঠিন শপথ এবং সে অনুযায়ী নতুন প্রজন্মকে সেই দায়িত্ব নিতে হবে। এই দায়িত্ব কার? এই দায়িত্ব আমার আপনার সকলের। এই দায়িত্ব ছাত্র শিক্ষক শ্রমিক কৃষক সকলের। এই দায়িত্ব পেশাজীবী বুদ্ধিজীবী কর্মজীবী সকলের। এই দায়িত্ব মাঝি মাল্লা মুটেরার। এই দায়িত্ব স্বর্ণকার কর্মকার পেশকারের। এই দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব প্রদান আর দখলের। এই দায়িত্ব কর্তৃত্ব স্থাপনের নয় মোটেও পূর্ব দোসরদের নকলের। এই দায়িত্ব মা বোন ভাই সবাই সকলের। এই দায়িত্ব ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ব্যারিস্টার উকিলের। এই দায়িত্ব তাঁতী জেলে ছুতার কুমার কামারের। এই দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের আমাদের সকলের।

চলবে ... চলবে ...
আপনারা নিচের লিংকটা পড়তে পারেন।।
Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29129073 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29129073 2010-04-04 22:18:38
মাই ডটার শান্তা ডায়েড এ্যাট ১১পিএম অন ফ্রাইডে ।। রেজা ঘটক
শান্তার মুখখানা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কী মিষ্টি কচি কমলার মতো মুখখানা। চোখ দুটোতে না বলা কতো যে জিজ্ঞাসা! আমার মনে পড়ে গত রমজান মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজের চার তলার মহিলা কেবিনে শাদা বিছানায় শুয়ে থাকা শান্ত চুপচাপ হাজারো কষ্ট লেখা অবুঝ শান্তার নির্বাক সেই ছোট্ট মুখখানা। শান্তার চোখের দিকে আমি সরাসরি তাকাতে পারিনি সেদিন। আমার সাথে ছিল বন্ধু নাহিদ। আমি নাহিদের পায়ে আস্তে একটা চাপ দেই। নাহিদ আমার ইসারা বুঝতে পারে। প্রায় সমস্বরে নাহিদ আর আমি শামীম ভাইকে বলি- চলেন, বাইরে যাই। শান্তার আসল পরিস্থিতি কী তা ওর সামনে জানতে চাওয়াটা উচিত হবে না। ওর শান্ত নির্বাক চোখের ভাষায় ভয়ঙ্কর কিছু লেখা। যার অর্থ হয়তো আমরা কেউই জানি না।

ঢাকা মেডিকেলের মেইন গেট থেকে রাস্তা ক্রস করে আমরা টোঙ দোকানের সামনে চায়ের অসিলায় বসি। শামীম ভাই একটানা আমাদের শুনিয়ে যায়। গতকাল রাত থেকে যে কী রকম ঝড় গেছে আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না। রাত দুইটা পর্যন্ত এমার্জেন্সির সামনে মাটিতে শুয়ে আছে মেয়েটা। আমার মাথায় কিচ্ছু কাজ করছিল না। বড় ছেলেটা আমাকে শান্তনা দিচ্ছিল, জানেন। আব্বু তুমি মাথা ঠাণ্ডা রেখে একবার ভাবো, দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে। সঞ্জিব (চৌধুরী) মারা যাবার পর থেকে আমি নিজেও কয়েক দিন ধরে বেশ অসুস্থ। কিচ্ছু ভালো লাগে না। চোখ বন্ধ করলেই সঞ্জিবকে দেখি। তার মধ্যে শান্তার এই অবস্থা। বলেন, কার মাথা ঠিক থাকে? তারপর মাথা ঠাণ্ডা করে বাইরে আসি। ছেলেটা আমার সঙ্গে আসে। রাস্তা ক্রস করে এইখানটায় আসি। কাকে বলবো, কীভাবে বলবো, কিচ্ছুই মাথায় আসে না। কয়েক জায়গায় ফোন করি। অতো রাতে আমাগো মতো পাগল ছাড়া আর কে জেগে থাকবে বলেন? যাদের দিয়ে কাজ হতে পারে তাদের কেউ অতো রাতে কী খামাখা জেগে থাকার কথা! কয়েক মিনিট অনেক কিছু ভাবলাম। ছেলেটা বলল- আব্বু তুমি ফোনের বদলে বরং ওনাদের রিকোয়েস্ট করো। ওনারা তোমার কথা শুনতে পারে। মনে মনে ভাবলাম, ছেলেটার কথাটা যেন সত্যি হয়। মানুষ তো মানুষেরই জন্য, তাই না। সোজা উপরে গিয়ে ডিউটি ডক্টর নার্স আয়া যাকে হাতের কাছে পেলাম, খুব করে বললাম মেয়েটার কথা। জানেন, পৃথিবীতে যে মানুষ এখনো মানুষের কথার অর্থ বুঝতে পারে, ঠিকঠাক বলতে পারলে যে কাজ হয়, তা কাল প্রমান পেলাম হাতেনাতে। মাত্র পঁয়ত্রিস মিনিটের মধ্যে শান্তাকে এই কেবিন আনার ব্যবস্থা হল। ওনাদের তাৎক্ষণিক অমোন সুন্দর ব্যবহারে আমি বড়োই কৃতজ্ঞ। শেষের দিকে ওনারা জানতে চাইলেন- আপনি কী করেন? মুখে কিছুই বললাম না। আমার আইডি কার্ডটা তখনো বুকের কাছে ঝুলছিল। হঠাৎ সেদিকে নজর পরায় ওটা ওল্টাতেই ওনারা বললেন- আপনার পরিচয়টা প্রথমে দিলে মেয়েটা আরো আগে এখানে আসতে পারতো। আমি এখনো ভেবে পাইনা, ওনারা আমার পরিচয়টা তারপরেও ক্লিয়ারলি কনে জানতে চাইলেন না। জানেন, সেই রাতের ড্রেসে একটানা এখনো আছি। আম্মা আসছিল সকালে। আম্মাকে নিয়ে ছেলেটা বাসায় গেছে। আম্মার শরীরটাও ভালো না।

সারাটা সকাল গেছে এই টেস্ট, সেই টেস্ট। আর এখন লিভারের টেস্টটা আসার পর ডাক্তাররা বোর্ড মিটিং করে জানাবেন, শান্তার আসলে কী হয়েছে। কিন্তু, আমি ওর এক্সরে রিপোর্ট দেখে খুবই ভয় পেয়েছি। আল্লাহ না করুক, ওইটুকু মেয়ের অতো বড় একটা অসুখ। লিভারে একদম ঘা হয়ে গেছে। সব আসলে আমার দোষ। দুপুর থেকে আমি নিজেকে নিজে অনেক দোষারোপ করেছি। না আমার ঠিক মতো ওদের দিকে নজর দেয়া হয়নি। এটা আমার ব্যর্থতা। বাচুম না, সঞ্জিবের মতো যে কোনো সময় দেখবেন, আমিও নাই। শালার জীবনে কী করলাম বলেন। তিনটা ছেলেমেয়ে, তাদের দিকে ভালো করে নজর দিতে পারলাম না। কতো বড় ব্যর্থ বাবা আমি। আম্মাকে আচ্ছামতো গালাগাল করেছি। তুমি থাকতে ওরা এভাবে অসুখ বাধালো। তুমি আমাকে একটা বারও জানালে না, শান্তা খাবারটা পর্যন্ত ঠিক সময়ে খায় না। কোই, প্রতি শুক্রবার-ইতো তোমাদের দেখতে আসি। কিচ্ছু লাগবে কিনা, জানতে চাই। একবারও তো কখনো বলোনি যে শান্তা এভাবে অনিয়ম করছে। জানেন না, মেয়েটা আমার ভারী অভিমানী। আম্মা তবু আমাকে এখনো বকাঝকা করেন। বাট, ওরা কখনোই আমার কাছে কিচ্ছু চায় না। সবসময় আম্মার ধমক খেয়ে আমার মনে পরে। তারপর ওদের এটাওটা কিনে দেই।

এই পর্যায়ে আমি জানতে চাই- শান্তার মা কী ওর এই খবর জানে? শামীম ভাই ফোড়ন কাটেন- ধুস, আমার মাথায় আসলে কিচ্ছু কাজ করছে না। আপনারা যখন কেবিনে গেলেন, শান্তার মা তখন ছিল তো। আপনাদের সাথে পরিচয় করালাম না। দেখেন কারবার! নাহিদ তকণ ম।ম।ম।স্বরণ করিয়ে দেয়- কেবিনে তো শান্তা ছাড়া আর কেউ ছিল না। শামীম ভাই আবার বলেন- ওর মা বাথরুমে ছিল। আপনাদের আসার কথা ছেলের মুখ থেকে শুনেছে। তাই হয়তো ইচ্ছে করেই বাথরুমে পালিয়ে ছিল।
আমি তখনপাল্টা প্রশ্ন করলাম- কত বছর পর ছেলেমেয়েদের দেখতে পেলো? শামীম ভাই জবাব দেন-না, বছর হবে কেনো? ওদের সাথে তার নিয়মিতই দেখা হয়। আমি কিচ্ছু জানতে চাই না। ওরা মুখ ফুটে বললে চুপচাপ শুধু শুনি। বড় হবার পর থেকে আমি ওদেরকে একদিন সব বলেছি। দেখো, তোমরা ইচ্ছে করলে তোমাদের মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারো। আমি চাই তোমরাও তোমাদের মাকে নিজেরাই দেখে আবিস্কার করো, কে ভুল করেছে? আমি, না তোমাদের মা? প্রথমে ওরা যেতে চাইতো না। আমিই জোর করে ওদের পাঠিয়ে দিতাম। মাকে দেখতে ইচ্ছে করলে যাও, দেখে আসো। ওরা তেমন আগ্রহ দেখাতো না। আপনারা জানেন না, ওরা কতো লক্ষী। শান্তা তো রীতিমতো এখন আমাকে শাসন করে। গত সপ্তাহেও আমাকে শাসিয়েছে- তুমি যদি আব্বু সিখারেট খাওয়া না ছাড়ো, আমরা তোমার সাথে কথা বলবো না। জানেন, এখন আমি শুক্রবার শুক্রবার যাত্রাড়িতে গেলে সিখারেট খাই না। আর ওদের সামনে তো আগে থেকেও খেতাম না। কিন্তু শান্তা ঠিকই ধরে ফেলতো, আব্বু, তুমি ছাইপাশ খেয়ে ঘরে ঢুকেছো কেনো? যাও, ব্রাশ করে আসো। মেয়েটা দিনদিন আমার আম্মার সব গুনই দখল করছে। আম্মার পরে এখন আমি ওকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পাই। শামীম ভাই তারপর বলতে থাকেন- এখন আল্লাহ জানেন, ওর কী হলো! আপনারা শান্তার জন্য একটু দোয়া করবেন। আর রেজা সবাইকে বলে রাখবেন- ব্লাড লাগবে। ডাক্তার বলেছেন, অনেক ব্লাড লাগবে শান্তার। একেবারে নাকি সিভিয়ার পর্যায়ে। নিজেকে খুব অপরাধী লাগে। বাবা হয়ে আমি ওদের এইটুকু খোজখবর রাখি না। সারাদিন খালি অফিস আর অফিস। বাচুম না। আমিও আর বাচুম না। কার বাঁচতে ভালো লাগে কন? আমি মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। গত বছর ও গোল্ডেন এ পাবার পর, কী যে খুশি হয়েছিলাম। নাহিদকে ইঙ্গিত করে শামীম ভাই বলেন- আপনি তো ছিলেন না, ওর রেজাল্টের মিষ্টি জাফর আর রেজা পেয়েছিল। আর বুঝি রিয়াজও ছিল।

এরপর নাহিদ প্রশ্ন করে- ওকে কোথায় ভর্তি করেছেন? কোন কলেজে? শামীম ভাই জবাব দেন- মতিঝিল আইডিয়াল কলেজে। জানেন না, ও খুব ভালো নাচে। নিজে একটা নাচের ইস্কুল খুলেছে। আর ওই নাচের ইস্কুল খোলার পর থেকেই ওর এই পরিণাম। সকালে বাসা থেকে কী খেয়ে বের হতো, কোনোদিন হয়তো কিছুই খেতো না। আম্মা আর কতোক্ষণ খেয়াল রাখতে পারে, বলেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত কলেজ, ক্লাস, প্রাইভেট, নাচের ইস্কুল। কোনোদনি হয়তো সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছুই খেতো না। ধীরে ধীরে এভাবে ওর আলচার হয়ে যায়। আম্মাও টের পায় নাই। আর আমি তো শুক্রবার ছাড়া ওদের সাথে দেখাই হয় না। আগে কাঁঠালবাগান থাকতে সপ্তাহে দু-তিন দিন দেখা হতো। কল্যানপুরে যাবার পর আর শুক্রবার ছাড়া আমি সময় করতে পারি না। ছেলেটা আবার আগামী সপ্তাতে জাপান যাচ্ছে। ওদের নাটকের গ্রুপ যাচ্ছে জাপানে শো করতে। ওর জন্য অনেক কিছু কেনাকাটা করতে হবে। আমি কয়দিক সামলামো কন? অফিসে কিচ্ছু বলবার জো নেই। শালার নতুন বিল্ডিংয়ে যাবার পর ভাবছিলাম এবার বুঝি বকেয়া বেতনগুলো দিয়ে দেবে। অবস্থার কোনো পরিবর্তন নাই। এখনো ছয় মাসের বেতন বাকী। কন, দুই দুইটা সংসার চালানো কী চাট্টিখানি কথা। আমাগো ঢাকায় কী আছে কন? শালার মাস শেষে বেতনের পুরোটা না পাইলে চলুম কেমনে? তাও আম্মা এখনো জীবিত, তাই ওদের নিয়া আমার একদম টেনশান নাই। আম্মা সব সামলান। সামনে ঈদ, ওদের জন্য কী কিনবো, আম্মার জন্য একটা শাড়ি কিনতে হবে, গিন্নির অনেক বায়না। তারমধ্যে শান্তুটার এই অবস্থা। কোনদিক সামলামো কন!

গত রমজানের ঈদের ঠিক দুই দিন আগে শান্তা ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিল। গোটা ঈদের সময়টা শামীম ভাই হাসপাতালে শান্তাকে নিয়ে। তখন রোজই আমরা বন্ধুরা ঢাকা মেডিকেলে শান্তাকে দেখতে যাইতাম। বিশেষ করে ওর যখনই রক্ত প্রয়োজন হতো, তখনই আমাদের যেতে হতো। বন্ধুদের মধ্যে আমিনুর রহমান মুকুল যেদিন রক্ত দিল, শামীম ভাইয়ের মুখে সেদিন কী যে হাসি। শামীম ভাই সেদিন বারবার বলছিলেন- আগামীকাল ওকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিচ্ছে। এখন বাকী সময়টা ঠিকঠাক রিকোভার করলে আল্লাহ মাফ করেন। কারো বাচ্চার যেনো এরকম ভয়াবহ অসুখ ধরা না পরে। শান্তার যখন পেটে ব্যথা উঠতো, এমনিতে ও ভীষণ শান্ত। কিন্তু আপনারা জানেন না, সেই রাতের ওর চিৎকার আর কান্না এখনো আমার কানে বাজে। কী কষ্টটা যে আমার মেয়েটার উপর থেকে গেছে। ডাক্তার, নার্স, আয়া সবাই এই কয়দিনে ওর ভক্ত হয়ে গেছে। যখনই যিনি শোনেন, ও খুব ভালো স্টুডেন্ট, নাচ শেখায়। তখন সবাই ওকে খুব আদর করেন। আমার লাকটাও অনেক ভালো। ঢাকা মেডিকেলে বিনা তদবিরে অতো অল্প সময়ে কেবিন পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। এখন ভালোয় ভালোয় ও ভালো হয়ে গেলে বাঁচি। মুকুল শামীম ভাইকে শান্তনা দেয়- না, ও দেখবেন ঠিকই ভালো হয়ে উঠবে। ও এতো কিছু করে, কোনোদিন তো বললেন না শামীম ভাই। এখন থেকে শান্তার খোজ আপনি না দিলেও আমরা নিজেরা নেবো। ওকে গ্রুপে নিয়ে আসবেন।

শান্তার কেবিন থেকে বের হয়ে আমরা ঢাকা মেডিকেলের সামনে এসে সেদিন অনেকক্ষণ আড্ডা দেই। শামীম ভাই আমাদের আসস্থ করেন, আর কোনো অসুবিধা না হলে আগামীকাল আমরা ওকে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি। আপনারা শান্তার জন্য দোয়া করবেন। তারপর শামীম ভাই ঢাকা মেডিকেলে থেকে যায়। আমরা আমিনুর রহমান মুকুল, অজয় দাশ, কাজী ফয়সাল, ইকতারুল ইসলাম আর আমি হেঁটে হেঁটে দোয়েল চত্বরে আসি। মুকুল আর আমি বাংলা একাডেমীর রাস্তা ধরে অনেকক্ষণ পায়ে হেঁটে আড্ডা মারি। অজয় ফয়সাল আর ইকতার চলে যায়। ওই রাতেই শেষবার আমি শান্তাকে দেখেছিলাম। তারপর শামীম ভাইয়ের সাথে যতোবার দেখা হয়েছে, যতোবার আমরা ভোরের কাগজে গেছি, যতোবার ফোনে কথা হয়েছে, শান্তার প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আমাদের আলাপে এসেছে। সেই শান্তা এখন নেই। এটা ভাবতে পারছি না। মনে মনে ভাবলাম অন্য বন্ধুরা কী দুঃসংবাদটা পেয়েছে? ওদের মনের অবস্থা জানার চেষ্টা করি। আর নিজেকে নিজেই শান্তনা দেই। শান্তা মরতে পারে না। ও চিরদিন আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

তারপর আমি বন্ধু মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ নাহিদকে প্রথমে ফোন করি। নাহিদ ফোন ধরামাত্র আমি জানতে চাই- কোনো খবর জানো কীনা? নাহিদ পাল্টা প্রশ্ন করে- কীসের খবর। বলি, শামীম ভাইর কোনো খবর জানো? নাহিদ জবাব দেয়- না। ক্যানো, কী হইছে? জবাবে বলি- শামীম ভাইর মেয়ে শান্তা গতরাতে মারা গেছে। টের পেলাম ফোনের ওপাশে নাহিদের শ্বাস-প্রশ্বাসও আমার মতো ঘন হয়ে গেছে। নাহিদ পাল্টা প্রশ্ন করে- তুমি কখন জানলা?
: এইতো একটু আগে।
: কীভাবে?
: শামীম ভাই এসএমএস করেছে।
: শামীম ভাইর সাথে কথা হইছে তোমার?
: না। শামীম ভাইর দুটো ফোনই বন্ধ। তুমি কী বের হবা?
: হ্যা, ঘণ্টাখানেক লাগবে।
: আচ্ছা। শোনো, আজ আবার আমাদের শিল্পকলা একাডেমীতে শো আছে। নোরার তিনকন্যা। চারটা থেকে শিল্পকলায় রিহার্সেল। তার আগে কিন্তু যাত্রাবাড়ি থেকে ফিরতে হবে।
: তুমি কোই থাকবা?
: আমি এখন শিল্পকলায় যাবো, তুমি ওখানে আসো।
: ঠিক আছে।

এরপর আমি আমিনুর রহমান মুকুলকে ফোন করি। ফোনের ওপাশে মুকুলের অবস্থাও একই। বলো কী!! শান্তা মেয়েটা মারা গেছে!!! আহারে... খুব খারাপ সংবাদ। শামীম ভাইকে কীভাবে শান্তনা দেবো বলো। এটা কী মানার মতো খবর।
এরপর জাফর আহমদ রাশেদকে ফোন করি। জাফরের ফোন বন্ধ। তারপর টোকন ঠাকুরকে ফোন করি। বলি- ঠাকুর, খুব খারাপ একটা দুঃসংবাদ এখন আপনাকে দিতে হচ্ছে। ঠাকুরের পাল্টা প্রশ্ন- কী???
: শামীম ভাইর মেয়েটা, শান্তা গতরাতে মারা গেছে।
: বলেন কী?!! কীভাবে???
: শামীম ভাই শুধু একটা এসএমএস পাঠিয়েছে। শামীম ভাইর ফোন বন্ধ পাচ্ছি।
: আয় হায় রে, শামীম ভাইকে এসময় কীভাবে শান্তনা দেবো? শামীম ভাইর ওদিকে আপনারা যদি যান, আমাকে জানাইয়েন, আমিও যাবো।
: নাহিদ রওনা হইছে। আমরা শিল্পকলায় একসাথ হবো।
: আচ্ছা, আমিও আসবো। আমাকে একটু সময়টা জানাইয়েন। ঠিক আছে।

এরপর আমি ফিরোজ এহতেশামকে ফোন করি। ফিরোজ ফোন রিসিপ করার পর শুনতে পেলাম- একটা মহিলা কণ্ঠসর থেকে কবিতা ভেসে আসছে। ফিরোজ বলল- আমি একটা প্রোগ্রামে, কী বলবেন দ্রুত বলেন। বললাম, ভোকা শামীম ভাইর বড় মেয়েটা, শান্তা গতরাতে মারা গেছে। ওপাশ থেকে জবাব আসে- কীভাবে, কী হইছিল, কখন, বলেন কী!!! আচ্ছা, আমি পরে কথা বলছি। প্রোগ্রাম থেকে বের হয়ে। ওকে।

এরপর পুলক বিশ্বাসকে ফোন করি। পুলক ফোন রিসিপ করেই জানায়- আমি একটা মিটিংয়ে আছি। ব্যাপার কী বলো? বললাম, ভোরের কাগজের শামীম ভাইর বড় মেয়েটা, শান্তা গতরাতে মারা গেছে। জবাব আসল- বলো কী??? আচ্ছা, আমি তোমার সাথে পরে কথা বলছি। মিটিংটা শেষ হোক।

এরপর ফোন করি খোকন কায়সারকে। ফোন রিসিপ করে খোকন কায়সার জানতে চায়- হ ভাইজান কন, কী কইবেন? বললাম- ভোকা শামীম ভাইর বড় মেয়েটা, শান্তা গতরাতে মারা গেছে। ওপাশ থেকে জবাব আসে- কন কী?!! কী হইছিল??? তারপর!!! শামীম ভাই মানে আমাদের শামীম ভাই তো? বললাম- হ্যা, মেয়েটা তো দীর্ঘদিন ধরে আলচারে ভুগছিল। একেবারে সিভিয়ার পর্যায়ে ছিল। শামীম ভাইর সাথে আমারও বেশ কয়েকদিন দেখা হয় না। ওপাশ থেকে আবার জবাব আসে- আহারে, শামীম ভাইর এখন কী হবে!!! ইস, বেচারা এরকম একটা আঘাত পাইল। ওর বয়স কত? জবাব দিলাম- এইতো এবছর ইন্টার দেবার কথা ছিল। খোকন কায়সার ওপাশে আফসোস করতে থাকে। আমি ফোন কেটে দেই।

এরপর ফোন করি রোকন রহমানকে। রোকন ফোন রিসিপ করে ঠিকই, কিন্তু পাশে অন্য কাকে যেনো নির্দেশ দিচ্ছে- যা কইতাছি, তাড়াতাড়ি আসবি। হ্যা, কও, টাকা আমি ঢাকা আসলেই পাইবা। জবাবে বললাম- শোনো, তোমাকে একটা দুঃসংবাদ জানানোর জন্য ফোন করেছি। টাকার জন্য নয়। হ, কও, কীসের সংবাদ। শামীম ভাইর বড় মেয়েটা, শান্তা গতরাতে মারা গেছে। ওপাশের জবাব- তাই নাকি, ক্যান কী হইছিল? ক্যামনে? জবাবে কইলাম- তুমি শামীম ভাইরে ফোন দিয়া জাইনা লইও, চান্দু। সক্কাল বেলায়ই মালের হিসাব করতাছো, মাগী।

এরপর ফোন করি রাজীব নূরকে। রাজীব দা ফোন ধরে জানতে চায়- হ্যা, বলেন কী বলবেন? রাজীব দা, আমাদের শামীম ভাইর বড় মেয়েটা, শান্তা গতরাতে মারা গেছে। রাজীব নূরের জবাব- বলেন কী!!! তারপর? বলি- না, এই খবরটা দেবার জন্য ফোন করছি। ঠিক আছে রেজা, আমি একটু বিজি আছি। ওকে বাই।

ভিতরে ভিতরে আমি একটা জিনিস টের পাচ্ছি। শামীম ভাইকে আমাদের বন্ধুদের কে কতোটা মুখে ভালোবাসে আর কে কতোটা অন্তরে ভালোবাসে তার একটা নিখাদ চেহারা এই ফোনালাপের মধ্য দিয়ে আমার সামনে ধরা পরতে লাগে।

এই সময় কাজী ফয়সাল উকি দেয়। ফয়সালকে বললাম- খুব খারাপ একটা দুঃসংবাদে ঘুম ভাঙল ফয়সাল। কী সংবাদ রেজা ভাই? বললাম- ভোরের কাগজের শামীম ভাইর বড় মেয়েটা, শান্তা গতরাতে মারা গেছে। দেখলাম ফয়সালের নাকমুখ মুহূর্তে শুকিয়ে খাক। ফয়সাল পাল্টা জানতে চাইল- ঢাকা মেডিকেলে যাকে দেখতে গেছিলাম, ও? বললাম- হ্যা। খেয়াল করলাম, ফয়সাল প্রায় মিনিটখানেক আর কোনো প্রশ্ন করতে পারল না। কারণ, শান্তাকে ফয়সাল ঢাকা মেডিকেলে সর্বশেষ দেখেছিল। আমি শুধু বললাম, তুমি চলে যাও, আমি একটু পরে যাবো। ফয়সাল শিল্পকলার উদ্দেশ্যে যাবার আগে আরো একবার আমাকে তাড়া লাগায়। রেজা ভাই একটু তাড়াতাড়ি আইসেন। মুকুল ভাই কী জানে? বললাম- হ্যা আমার কাছে শুনেছে।

এরপর ফোন করি অশোক দাশগুপ্ত অপুকে। ফোন রিসিপ করে অপু বলে- হ্যা রেজা ভাই বলেন। ওইদিন কখন চলে গেলেন টের পেলাম না। বললাম, খুব খারাপ একটা দুঃসংবাদ দেব। শামীম ভাইর বড় মেয়েটা গতরাতে মারা গেছে। অপু ফোনের ওপাশ থেকে বলে উঠল- এইবার আর শামীম ভাইকে বাঁচানো যাবে না। ইস বেচারা... হ্যা শুনছিলাম তো ও হাসপাতালে, শামীম ভাই তাই নিয়া খুব ব্যস্ত। কিন্তু এভাবে শেষ পর্যন্ত মারাই গেল। না, শামীম ভাইকে আর বাঁচানো যাবে না।

এরপর ফোন করি মাহবুব কবীরকে। হ্যা রেজা বলেন? বললাম, শামীম ভাইর বড় মেয়েটা গতরাতে মারা গেছে। বলেন কী? আয় হায় রে.. শেষ পর্যন্ত বাঁচলো না মেয়েটা। সত্যি খুব খারাপ খবর এটা। শামীম ভাইকে যে কী দিয়ে শান্তনা দেব এখন!

এরপর ফোন করি মঈনুল বিপ্লবকে। ফোন বেজে চলে। কেউ রিসিপ করে না। শুক্র আর শনিবার বিপ্লব এই সময় ঘুমেই থাকার কথা। বিকালে বিপ্লব পাল্টা ফোন করে বলে- আমি টের পাই নাই। ঘুমাইতেছিলাম। তারপর বলো কেনো ফোন করছিলা? বললাম- আমাদের শামীম ভাইর বড় মেয়েটা গতরাতে মারা গেছে। বিপ্লব পাল্টা জিজ্ঞাসা করে- মানে যে মেয়েটা হাসপাতালে ভর্তি ছিল ওইটা?
: হ্যা।
: আহারে, বাঁচলো না শেষ পর্যন্ত!!! শামীম ভাই তো খুব চেষ্টা করছিল। ও কি আর ভালো হয় নাই। আয় হায় রে.. না, সত্যি খুব খারাপ লাগছে শুনে। এই রকম খবর মানাটা খুব কষ্টের। শামীম ভাইর খুউব কষ্ট হবে। খুউব। বুঝলা, আমার না, এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, ইস, ওর কথা শামীম ভাই প্রায়ই বলতো। এখন কী হবে!!!

এরপর ফোন করি রিয়াজ হককে। হ্যা রেজা বলো? বললাম- শামীম ভাইর মেয়েটা মারা গেছে।
: কখন? তুমি জানলা কীভাবে?
: শামীম ভাই এসএমএস করেছে। কিন্তু শামীম ভাইর দুটো ফোনই বন্ধ। তুমি চেষ্টা করো দেখো পাওয়া যায় কীনা।
: শামীম ভাই এখন কোথায়?
: কিছুই জানি না। আচ্ছা তুমি কী যাত্রাবাড়ির বাসা চেনো?
: ধোলাইখাল সিনেমা হলের পাশে। বেটার তুমি যাবার সময় ভোরের কাগজ থেকে এ্যাড্রেস কালেক্ট করে নিও। ওরা বলতে পারবে।
: নাহিদের ঘণ্টাখানেক লাগবে বলল। তুমি কী বের হতে পারবা?
: আজ তো আবার আমাদের বোর্ড মিটিং পড়ছে। দেখি। তোমরা যাবার সময় একটু জানাইও। আর ভোরের কাগজ হয়ে আসো, ওরা এ্যাড্রেস দিতে পারবে।

ওদিকে ফাঁকে ফাঁকে আমি শামীম ভাইর দুটো নাম্বারে আর জাফরকে ফোন করতে থাকি। শামীম ভাইকে একটা এসএমএস করে রাখি। যাতে ফোন খোলা মাত্র ওটা পায়। আরো অনেককেই জানানোর ইচ্ছে হচ্ছিল। আবার আমার শিল্পকলায় যাবার তাড়া। কোনটা রেখে কোনটা করি। শান্তার শান্ত চুপচাপ মুখটা বারবার চোখের সামনে ভাসতে থাকে। কিছুতেই আর ওকে ভুলতে পারছি না।
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
ঠিক চারটায় শিল্পকলা একাডেমীর এক্সপারিমেন্টাল হলে আমাদের রিহার্সেল শুরু হয়। এর কিছুক্ষণ পর বিপ্লবের ফোনটা পাই। না, রিহার্সেলে মন বসছে না আমার। অথচ ঠিক সাতটায় নোরার তিনকন্যার শো। বাইরে এসে একটার পর একটা সিখারেট ফুঁকছি। শামীম ভাইকে ফোন করে যাচ্ছি। এই সময় কবি জাফর আহমদ রাশেদের ফোন। হ্যা রেজা, আপনি ফোন দিয়েছিলেন, আমার ফোনটা ওই সময় বন্ধ ছিল। জাফর বলতে থাকে- আয় হায় রে, শামীম ভাইর এখন কী হবে। ইস, মেয়েটা কতো ভালো ছিল। এরকম একটা দুঃসংবাদ, বলেন এটা কী মানার মতো। আপনারা এখন কোথায়? বললাম- শিল্পকলা একাডেমী। আজ পালাকারের শো আছে। আমি এখন রিহার্সেলে। ৭টায় শো। পারলে চলে আসেন। জাফরের জবাব- দেখি, আমি চেষ্টা করব। শামীম ভাইকে কী যে বলবো, বুঝতে পারছি না। খুউব খারাপ লাগছে খবরটা শুনে।

রিহার্সেলে আবারো ঢুকে পরেছি। এইসময় দেখলাম শামীম ভাইকে যে এসএমএস করে রেখেছিলাম, ওটা ডেলিভারড ওকে মেসেজ আসল। তারমানে এখন শামীম ভাইর ফোন খোলা। আমি আবার হলের বাইরে এসে শামীম ভাইকে ফোন করলাম। ফোন রিসিপ করলেন ভাবী। জানতে চাইলেন- কে? বললাম- ভাবী আমি রেজা। শামীম ভাই কি পাশে আছেন? ভাবী বললেন- ওর তো ফোন বন্ধ। আর এই ফোনটা বাসায় ফেলে গেছে। গতরাত থেকেই ওর অবস্থাও খুব খারাপ। কী বলব বুঝতে পারছি না। বললাম- ভাবী, এই সময়টা আপনাকে খুউব শক্ত হতে হবে। শামীম ভাইকে দেখে রাখার সকল দায়িত্ব এখন আপনার উপর। আপনি ভেঙে পড়লে তাকে কে সামলাবে। আরো জানতে চাইলাম- মারা গেছে কোথায় বসে? জবাবে ভাবী বললেন- ঢাকা মেডিকেলে। আমি আর কথা বাড়াতে পারছিলাম না। শুধু চোখের সামনে ভাসছিল শান্তার চুপচাপ শান্ত নির্বাক সীমাহীন দুর্লঙ্ঘনীয় কষ্ট মাখানো না বলতে পারা মায়াবি দুটো চোখ, যে চোখের ভাষা বোঝার সাধ্য আমাদের কারো নেই। সেই দুঃসাধ্য চোখের ভাষা পৃথিবীর কোনো ভাষায় অনুবাদ করার সামর্থও আমরা আর কোনো দিন পাবো না। শুধু নির্জন কোনো ক্ষণে বা গমগমে কোনো আড্ডায় যখনই শান্তার কথা আমাদের মনে পড়বে তখন আমরা চিরায়ত সহ্যের সীমাকে কেবল এই বলে বুঝ দেব- শান্তা তুমি আমাদের অন্তর দখল করেছো ঠিক যেমনটি তোমার করার কথা ছিল। তুমি বেঁচে আছো আমাদের সকলের হৃদয়ে ঠিক শান্ত নদীটার মতোন। আমাদের শান্তা মা-মনি হয়ে।।

১৩ মার্চ ২০১০
রাত ৪.৩০ মিনিট
গাবতলা, ঢাকা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29116256 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29116256 2010-03-14 18:17:55
বই পড়ায় পুলিশের আগ্রহ এবং আমার উদ্দ্যোগ কথায় কথায় আমি বললাম- গোটা বই মেলায় আপনাদের যে কজন বাংলা একাডেমীতে ডিউটি করেছেন- রোজ সবাই যদি একটা করে বই পড়ার অভ্যাস করতেন, খুবই ভালো হতো। বাট, আপনারা লেখক, কবি, সাহিত্যিক, প্রকাশকদের ঠেঙ্গিয়ে বেড়ালেন। আপনারা বই পড়ার অভ্যাস করলে বই মেলাটা আরো জমতো। নয়া পরিচিত হওয়া ওসি সাহেব বললেন- আমরা তো বই পড়তে চাই। কিন্তু আমাদের কে বই দেবে?
বললাম- বই পড়ায় সত্যিই যদি আপনাদের আগ্রহ থাকে তাহলে আজই আপনাদের হাতে বই তুলে দেওয়া হবে। মোরশেদ ভাই যোগ করলেন এটা কিন্তু খুব ভালো আইডিয়া রেজা।
ঠিক ওই সময়ে সেখানে প্রবেশ করলেন গণি ভাই। বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য প্রকাশক ওসমান গণি। গণি ভাইকে বললাম- চলেন গণি ভাই, পুলিশের জন্য কিছু বই সংগ্রহ করি। ওনাদেরকেও সঙ্গে থাকার অনুরোধ করলাম।
গণি ভাই ভীষণ ব্যস্ত মানুষ হলেও আমার আর মোরশেদ ভাইয়ের রিকোয়েস্ট ফেলতে পারলেন না। তারপর আমরা বই মেলা থেকে ওনাদের সঙ্গে নিয়ে পুলিশের জন্য বই সংগ্রহ অভিযান শুরু করলাম। আমি বেশ পুলকিত যে এই একই পুলিশ গতকাল আমার সঙ্গে কী আচরণই না করেছিল। আর পরদিন তাদের হাতে বই ধরিয়ে দিতে পারলাম।
ঘণ্টা দুই ওই কাজে সময় দেবার পর দেখলাম গণি ভাই বেশ এনজয় করছেন। আমি গণি ভাইকে বললাম আমার খুব জরুরী একটা কাজে পল্টন যেতে হবে। আপনি ওনাদের জন্য বই সংগ্রহ করতে থাকুন।
পুনরায় সন্ধ্যায় মেলায় ফিরে জানতে পারি- প্রায় ২৫০ বই সংগৃহীত হয়েছে। পুলিশ অফিসার আমাকে ওনার বাড়ি নেত্রকোনায় যাবার নিমন্ত্রন দিলেন। জবাবে বললাম- তাইতো বলি- আপনি কেনো বই পড়ায় এতো আগ্রহী! আমার অনেক বন্ধু আছে নেত্রকোনায়। দুজনকে আপনি চিনবেন। ওনারা সিনিয়র- কবি নির্মলেন্দু গুন আর হুমায়ুন আহমেদ। আমার খুব কাছের বন্ধু কবি মাহবুব কবীর, মাহমুদ সীমান্ত, কমল, আর গ্রেটার ময়মনসিংহ বললে- প্রচুর। মুজিব মেহদী, অতনু তিয়াস, সিদ্ধার্ত টিপুকেও ময়মনসিংহ ধরা যায়। আর সোমেশ্বরী নদী, ব্রহ্মপুত্র নদ, গাড়ো পাহাড় ওরাও আমার খুব ভালো বন্ধু। শুনে পুলিশ অফিসার হো হো করে হেসে ওঠেন।
আগামী বই মেলায় পুলিশকে আরো বই দিতে হবে। আমি লিখছি, বন্ধুদেরকেও লিখতে বলবো। পুলিশকে বই পড়ায় আগ্রহী করতে পারলে আমাদের-ই লাভ হবে বেশি।
.......................................... চলবে।। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29112620 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29112620 2010-03-08 20:47:03
অনাকাঙ্খিত ২৬ মিনিট : ইউ আর আন্ডার এ্যারেস্ট ।। রেজা ঘটক ।।
গতকাল ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০ রোজ শুক্রবার সন্ধ্যা ঠিক ৬:০০টায় রমনা কালীমন্দির গেট থেকে বাংলা একাডেমী অমর একুশে বই মেলায় প্রবেশ করার সময় বাংলাদেশ পুলিশের মহান সদস্যরা সর্বজনাব এস.আই. সহিদ, এস. আই. মিজান, এস.আই. আনোয়ার, কনস্ট্যাবল কালাম, কনস্ট্যাবল ছালাম, কনস্ট্যাবল বেলায়েত সহ বেশ কিছু পুলিশের সঙ্গে বইমেলা প্রাঙ্গনে ঢোকা নিয়ে প্রথমে বচ্চা শুরু হয়। পুলিশের বক্তব্য আমাকে মেইন গেট থেকে ঘুরে ঢুকতে হবে। ওনাদের কাছে আমার একান্ত রিকোয়েস্ট ছিল আমার এক লেখক বন্ধু বাংলা একাডেমীর প্রধান ফলকে আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে, আর এনটিভি-তে আমার ইন্টারভিউ নেয়ার জন্য একদল টিভি সাংবাদিক লিটল-ম্যাগ-চত্তরে অপেক্ষা করছেন। সময় জ্ঞান মাথায় রেখেই আমি সোজা পথ ধরেছি। মেইন গেটের ঘুর পথে অনেক সময় নষ্ট হবে। প্লিজ আমাকে যেতে দিন। সময়টা একটু বিবেচনা করুন। ঠিক যে সময়টায় পুলিশের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল, তখন আমার সামনে দুইজন মহিলা ওই একই গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করছিলেন। আমার প্রশ্ন ছিল ওনাদের জন্য আপনাদের এই আইনটি দেখালেন না কেন? পুলিশের জবাব ছিলÑ ওনারা ঢুকে গেছেন, কি করব বলুন। আপনারা আমাদের কথা না শুনলে আমরা কি করতে পারি? আমি বললামÑ আর আমি রিকোয়েস্ট করায় আমাকে হাতির পাঁচ পা দেখাচ্ছেন, না? আমি এই পথেই ঢুকব, পারলে ঠেকান? পুলিশ আমার সঙ্গে তখন খুবই উক্তেজিত অবস্থায়। আমিও রাগের চরম মুহুর্তে। আমার সঙ্গে ছিল আমার বন্ধু নাট্যকার ও অভিনেতা আমিনুর রহমান মুকুল। মুকুল খুব ঠা-াভাবে তখন পুলিশের স্বনামধন্য অফিসারদের কাছে আমাদের তাড়ার হেতু গুছিয়ে বর্নণা করছিল। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। আমাদের নির্লজ্জ পুলিশ, অশিক্ষিত বর্বর পুলিশ, সরকারের সরকারি লাঠিয়াল বাহিনী, আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় বেতনভুক পুলিশ, জনগণকে সেবা প্রদানের পরিবর্তে জনতাকে বেহায়ার মতো তিক্ততা সরবরাহকারী পুলিশ, জনতার স্বাধীন চলাফেরায় অনাকাঙ্খিত নাক গলানো পুলিশ, সংবিধানে প্রদ্ত ৫৪-ক্ষমতাধারী জনতা নির্যাতনকারী পুলিশ মুকুল আর আমার কোন রিকোয়েস্ট শুনলেন না। তারা শুনলেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এস.আই. সহিদের কথা। পুলিশ ডিটারমাইন্ড আমাকে ওই পথে যেতে দেবেন না। আমি ডিটারমাইন্ড আমি ওই পথেই যাবো। পৃথিবী উল্টে গেলেও এখন ওই পথেই আমাকে বাংলা একাডেমী বইমেলা প্রাঙ্গনে ঢুকতে হবে। কারণ, আমার সময়ের অনেক মূল্য। পুলিশের সময় জ্ঞান নেই। পুলিশের সঙ্গে ভদ্রতা করার সকল সৌজন্যতা পুলিশই আগ মাড়িয়ে নষ্ট করেছে। আমি তখন পাল্টা প্রশ্ন করলাম, মহিলা দুইজন ঢুকেছে, বুঝলাম, ওনারা লেডিস, ওনাদের আপনারা ছাড় দিছেন। পরে যে আরো দুই দফায় তর্ক-বিতর্ক চলাকালীন পুরুষ লোক ঢুকলো, তারা কারা? তারা ঢুকতে পারলে আমি ঢুকতে পারবো না কেন? তাছাড়া অমর একুশে বইমেলা হচ্ছে লেখক, প্রকাশক, পাঠক, দর্শকদের মেলা। বাঙালির প্রানের মেলা। পুলিশের বরং এই মেলায় অনুপস্থিত থাকার কথা। অথচ সেই আপনারা অযথা আমাদের সঙ্গে বচ্চা করছেন। এটা ঠিক নয়। একই রাষ্ট্রে একই স্থানে আইনের দুই রকম, চার রকম ব্যবহার হতে পারে না। এটা অন্যায়। আপনারাও অন্যায় করছেন। আমি এই অন্যায় আচরন মানি না। আমি একজন লেখক হিসেবে এই পথেই ঢুকব। দেখি কোন পুলিশে আমাকে আটকাতে পারে।
এরপর আমি রমনা কালীমন্দিরের ছোট্ট গেট দিয়ে বাংলা একাডেমীর সড়কে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, তখন আমার পিছন দিক থেকে এস.আই. সহিদ প্রথমে আমাকে ধাক্কা মেরে গেট থেকে সরিয়ে দেন। আমি আবারো চেষ্টা করলে আরো দুজন পুলিশ সদস্য এস.আই. সহিদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমাকে গেট থেকে থাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। ওই পর্যায়ে আমি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি। একেবারে বিনা মেঘে বর্জ্রপাতের মতো শুরু হয়ে গেল হাতাহাতি।
সরকারের প্রশিক্ষিত পুলিশের সঙ্গে আমার মতো সাহিত্য লেখিয়ে পরোটা-চা খাওয়া শক্তিশালী ফাইটারের বেশিক্ষণ টেকার কথা নয়। এক পর্যায়ে আমি খেয়াল করলাম তিনজন পুলিশ আমাকে চ্যাংদলা করে ওই ছোট্ট গেট থেকে ঢুকিয়ে বাংলা একাডেমীর সড়ক দিয়ে একাডেমী প্রাঙ্গনের মূল ফটকের কাছে অস্থায়ী পুলিশ কন্ট্রোল রুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তখন সত্যিই অসহায়। আমি বারবার ওদের বলছিলাম যে আমাকে কোথায় নিতে চান বলুন, আমি আপনাদের সাথে হেঁটে যাই। আমি দৌড়ে পালানোর মতো কেউ নই। আমি একজন লেখক। এই বইমেলায়ও আমার চারটা বই প্রকাশ পেয়েছে। আমাকে এভাবে অপমান করাটা আপনাদের উচিত হচ্ছে না। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশের বেজন্মা তিন কুত্তার বাচ্চা আমাকে তখন অন্য ভয় দিচ্ছিল। তারা বলছিল, থানায় নিয়ে তোর সব ক্ষমতা আমরা দেখব। আমি তখনো বলছিলাম, আমার কোনো ক্ষমতা নেই। আমি কোনো হুমকিও দিচ্ছি না। এসব কি বলছেন আপনারা? পুলিশ তখন আমার ঘাড়ে দু-তিনবার গুতা মারল। আমি এরপর চুপ হয়ে গেলাম।
সন্ধ্যা ৬:১৫ মিনিট। বাংলা একাডেমী মূল ফটকের প্রবেশপথে পুলিশের অস্থায়ী কন্ট্রোল রুমে পুলিশের একজন উর্ধ্বতন অফিসারের সামনে আমাকে হাজির করা হল। আমি কোন কিছু বলার আগেই এস.আই. সহিদ ব্যাখ্যা করছিল যেভাবেÑ স্যার, ও পুলিশকে চুততে চায়। এসবিকে চুততে চায়। ক্ষমতা দেখাতে চায়। আমাদের ওপরে চড়াও হয়েছিল, স্যার।
পুলিশের শাদা পোষাকধারী অফিসারের জবাব ওই রুমে আটকে রাখো। গাড়ি আসলে তুলে দিও। থানায় নিয়ে ওর ব্যাপারে শুনবো।
আমি জানতে চাইলামÑ আমার অপরাধ কি? আর আমি কখন গালি দিলাম? কি গালি দিলাম? কাকে গালি দিলাম? ওনারা মিথ্যা বলছেন। আপনি ওনাদের কথা শুনবেন না। আমি নিজে মিথ্যা বলাকে প্রচ-ভাবে ঘৃণা করি। মিথ্যা বলা অপছন্দ করি। ওনারা মিথ্যাচার করছেন। এটা ঠিক নয়। এটা অন্যায়। আমি কেনো গালি দিতে যাবো? আমার কথা আপনি মন দিয়ে শুনুন প্লিজ। আমি একজন রাইটার। আমি ওনাদের কাছে ওই গেট দিয়ে প্রবেশ করার ব্যাপারে সদয় রিকোয়েস্ট করছিলাম। কারণ, আমার সময়ের তাড়া ছিল।
অফিসারটি আমার কথা কিছুই গুরুত্ব দিলেন না। গুরুত্ব দিলেন তার স্বনামধন্য এস.আই. আর কনস্ট্যাবলদের কথা। আমি তখন আবারো রিকোয়েস্ট করছিলাম আর আমার হাতে থাকা আমার সদ্য প্রকাশিত গল্প সংকলন সোনার কঙ্কাল বইটি ওনাকে দেখার জন্য রিকোয়েস্ট করছিলাম। কিন্তু উনি আমার কথাকে একেবারেই আমলে নিলেন না। উল্টো আমাকে বললেনÑ ইউ আর আন্ডার এ্যারেস্ট। যাও ওই রুমে আটকে রাখো।
আমাকে পাশের রুমে নিয়ে আসা হলো। আমি তখন মোবাইল বের করে বন্ধু টোকন ঠাকুরকে ফোন করে বলিÑ পুলিশ আমাকে এ্যারেস্ট করেছে। গেটের কন্ট্রোল রুমে আছি। টোকন আমার কথা শুনতে পেল কিনা আমি তখন জানি না। কারণ, এস.আই. সহিদ ততোক্ষণে আমার মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। আমি তখন চিৎকার করে বলছিলাম- ওরা আমাকে আটকে রেখেছে। এস.আই. সহিদ মোবাইলটা আমার হাতে পুনরায় দিয়ে বললেনÑ এটা বন্ধ কর। আর তোর ক্ষমতা থানায় নিয়ে দেখাচ্ছি। আমি মোবাইলটা পুনরায় হাতে পেয়ে ওটা বন্ধ না করে বন্ধু আলফ্রেড খোকনকে রিং করলাম। খোকন ফোন ধরার আগেই ওরা আবারো মোবাইলটা ছিনিয়ে নিয়ে গেল।
এবার আরেক পুলিশ কনস্ট্যাবল এসে আমাকে বলতেছিলÑ বয় শালা, এই মাটিতে বয়। নইলে ঘাড় মটকে দেব। আমি ওকে পাত্তা না দিয়ে কাচের বাইরে তাকাছিলাম পরিচিত কাউকে দেখলে দরজা ঠেলে জোর করে আবারো বাইরে যাবো কিনা? নাকি কাচ ভেঙ্গে বাইরে চলে যাবো? আমি তখন দ্বিধাহীন। আমি তখন অসহায়। আমি তখন দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে। আমি জানি না আমার কি অপরাধ? আমি জানি না আমি কী করণে এ্যারেস্ট? আমি জানি না আমাকে কেন ওরা আটকে রাখছে? আমাকে কেন ওরা থানায় নিতে চায়?
আমার মাথায় তখন হাজারো প্রশ্ন। ওরা কি গতকাল আমাকে মিছিলে দেখেছে। জাতীয় জাদুঘর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত গতকাল একটা মিছিল হয়েছে। তিনটার সময়। পাহাড়ি জনপদে নতুন করে সৃষ্ট সহিংস ঘটনার প্রতিবাদে সেই মিছিল হয়েছিল। ওই মিছিলে শ্লোগান ছিলÑ পাহাড়ে গুলি কেন? শেখ হাসিনা জবাব চাই। আমার মা কাঁদে কেন? সেনাবাহিনী জবাব চাই। আমার ভাই মরল কেন? জবাব চাই, জবাব চাই ইত্যাদি। আমি অবশ্য ওই মিছিলের পুরোটা ছিলাম না। মিছিল টিএসসি রাজু চত্বর ক্রস করার সময় আমি মিছিল থেকে নিজেকে গুটিয়ে বইমেলায় যাবার জন্য বাম পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। রাজু চত্বরে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ছাত্রছাত্রীরা মিছিলে তখন যোগ দিচ্ছিল আর মিছিলটা শহীদ মিনারের দিকে চলে যাচ্ছিল। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মিছিলের সঙ্গে আমার একাত্মতা কামনা করছিলাম। আর তাদের দাবীর পক্ষে আমার সমর্থণ জানিয়েছিলাম মাত্র। তবে কী ওরা আমাকে এই করণে আজ এভাবে আটকে দিল?
আমি তখন হাজারো চিন্তা করছিলাম। নিকট ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি তখন অনেকটা অসহায়। আমি কেবল ভাবছিলাম, টোকন আমার কথা শুনতে না পেলেও মুকুল তো বাইরে আছে। দেখি ওরা কী করে আর আমার বন্ধুরা কী করে! আমি ভিতরে ভিতরে মোটেও নার্ভাস না হয়ে বরং বিষয়টার শেষ কী দাঁড়ায় তা দেখার জন্য অসহায় অপেক্ষা করছিলাম। পুলিশ কনস্ট্যাবল আমাকে অন্তত ছয়বার মাটিতে বসবার জন্য জোরাজুরি করছিল। আমি তাতে কোন ধরনের পাত্তা না দিয়ে উল্টো ঘোষণা করলামÑ আমি মরে গেলেও মাটিতে বসবো না। পাশেই একটা চেয়ার খালি পড়েছিল। আমি বরং ওটাতে বসতে চাচ্ছি। ওরা আবারো ঘোষণা দিলÑ থানায় নিয়ে তোর ক্ষমতা আজ দেখব?
আমি ঠিক জানি না আমি আগের জন্মে এইসব অসভ্য পুলিশ সদস্যদের শত্রু ছিলাম কীনা? আমি ঠিক জানি না কেন আজ ওরা আমার উপর চড়াও হোল। আমি ঠিক জানি না কেন ওরা এতো আস্ফালন করছে? ওরা কি কোন দাগী সন্ত্রাসীকে এইমাত্র পাকরাও করেছে? নাকি নিরিহ একজন লেখককে আটক করেছে? আমি ওদের কোন কথার আর কোন জবাব না দেবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি ঘোষণা দিলাম আমি দাঁড়িয়েই থাকবো। ওরা তখন হুমকি দিচ্ছিলÑ শালাকে তিন-চারটা খুন আর আমর্স কেসে জড়িয়ে দেব, শালা ক্ষমতা দেখাতে আর জায়গা পাও না ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমি কী তখন ঝিম মেরেছিলাম? আমি কী তখন স্বজ্ঞানে ছিলাম? আমার কী তখন কোন বুদ্ধি কাজ করছিল? আমি কেবলই তখন অসহায় অপেক্ষা করছিলাম। কখন ওদের গাড়ি আসে তার জন্য অপেক্ষা তখন আমার। আমি আর কিচ্ছু জানিনে। আমার কী তখন প্রচ- ঘাড় ব্যথা করছিল? আমার মনে পড়ে না। আমার কী তখন প্রচ- কান্না পাচ্ছিল? আমার বিছুই মনে পড়ে না। আমার কী তখন নিজের প্রতি নিজের প্রচ- ঘৃণা হচ্ছিল? আমার কিছুই মনে পড়ে না। আমার কী তখন নিজেকে পৃথিবীর সেরা বেকুফ মনে হচ্ছিল? আমার কিছুই মনে পড়ে না। আমি কেবলই ঠায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সন্ধ্যা ৬:২২ মিনিট। পুলিশের সেই শাদাপোষাকের অফিসার সাহেব আমার রুমে আসলেন। জানতে চাইলেনÑ
: কী করেন? আমি বললামÑ আমি একজন লেখক ও গবেষক।
: কী প্রমাণ?
: আমি আমার হাতের বইটা ওনাকে দেখিয়ে বললাম, এটা গতকাল প্রকাশ পেয়েছে। এখানে আমার সব পরিচয় পাওয়া যাবে।
উনি আমার বইটা হাতে নিলেন। উল্টে পাল্টে ভালো করে দেখলেন। তারপর প্রশ্ন করলেনÑ: পুলিশকে গালি মারলেন কেন?
: ওনারা আগে আমাকে ধাক্কা মেরেছে। আপনাকে কেউ বিনা কারণে ধাক্কা মারলে আপনি কী বলতেন?
: না, আপনারা কবি সাহিত্যিকরা পুলিশকে মানুষ মনে করেন না? আপনি থানায় যাবেন। আপনার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না।
: আমার বই এটা। আমি আবারো বলছিÑ আমি কোন সন্ত্রাসী নই যে আমাকে থানায় যেতে হবে এ্যারেস্ট হয়ে।
ঠিক তখন কাচের দরজা ঠেলে বন্ধু আমিনুর রহমান মুকুল আবারো ওখানে হাজির হল। এবার পুলিশ অফিসারটি মুকুলের কথা শুনতে চাইলেন। মুকুল জানালোÑ আগে ওনারা ধাক্কা দেবার পরে ও গালি দিয়েছে। পুলিশ অফিসারের পাল্টা মুকুলকে জেরাÑ
: গালি দেওয়াটা উনি ভুল করেছে?
: মুকুলের জবাব, হ্যা, গালি দেওয়াটা উচিত হয়নি। কিন্তু ধাকাকা না দিলে ও গালি দিতো না।
: আপনি ওনাকে চেনেন?
: জি, আমার বন্ধু। আমি ঘটনার সময় ওর সঙ্গেই ছিলাম।
পুলিশ অফিসারটি এবার আমার দিকে তাকালেন। বললেনÑ আপনারা শিক্ষিত মানুষ পুলিশকে কোনো মানুষ মনে করেন না। আপনারা লেখালেখি করেন। আপনারা সবকিছু একটু বেশি বুঝতে চান। যান, এখন থেকে নজরে থাকবেন।
আমি বললামÑ শুনুন, আপনি যেভাবে এখন আমার সাথে ভদ্র ব্যবহার করলেন, কই, এখন কিন্তু আপনাকে আমি গালি দিলাম না। একজন নিরিহ মানুষ কখন আপনাদের গালি দেয় তাকি আপনারা বুঝতে পারেন? আপনাদের কী সে বিষয়ে কোনো ট্রেনিং দেওয়া হয়? আপনারা অনেক কিছু পারেন। আজও সেটা আমার বেলায় প্রমান হল।
পুলিশ অফিসারটি এবার নরম গলায় বললেনÑ আপনার ভয়েস এখনো সেই একই টোনে আছে। আপনারা কবিরা একটু বেশি ঝামেলার। যান, চলে যান। এখন থেকে নজরে থাকবেন।
আমি পুলিশ অফিসারকে থ্যাঙ্ক ইউ জানিয়ে মুকুলের সাথে কাচের দরজার দিকে পা রাখলাম। আমার ঠিক পিছনে পুলিশ অফিসারটিও বের হচ্ছেন। আমি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললামÑ সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ সব বাহিনীতেই আমার পরিবারের সদস্যরাও আছেন। কেউ ওদের গালি দিলে সেটা আমার গায়েও লাগে। ইচ্ছে করে কেউ গালি দেয় না। আর আমি মোটেও বেশি বুঝিনি। হুদাই আমার সময়টা নষ্ট হল।
পুলিশ অফিসারটা আর কোন কথা বললেন না। কাচের দরজা ঠেলে আমাদের আগেই বেড়িয়ে গেলেন। পিছন পিছন আমরাও। বাইরে তখন বাংলা একাডেমী মঞ্চে গান হচ্ছিলÑ জাত গেল জাত গেল বলে.... আমরা গান শুনতে শুনতে পাকা সড়ক ধরে বাংলা একাডেমীর লিটল-ম্যাগ চত্তরের দিকে হঁটতে থাকলাম। পিছনে পড়ে থাকল জীবনের অনাকাঙ্খিত ২৬টি মিনিট।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29107969 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29107969 2010-03-01 16:53:23
গল্প ।। সোনার কঙ্কাল ।। রেজা ঘটক ।।
মায়ের লাশ চুরির মাধ্যমেই চুরি বিদ্যায় তার হাতেখড়ি। আর বয়স-ইবা তার কতো তখন? বড়জোর নয় কি দশ। অথবা বারো কি তেরো বছর। অথচ ওই বয়সে যে বালকের মা-মাসী, পিসি-খুড়া, জ্যাঠা-মামা, দাদা-দাদী, নানা-নানীর নিঃশর্ত স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে ওঠার কথা। অন্য দশটি শিশুর মতো তারও তখন স্কুলে যাবার কথা। সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়ার কথা। মাঠে গিয়ে খেলনা হারিয়ে মন খারাপ করে বাড়ি ফেরার কথা। অথবা স্রেফ বাড়ির উঠোনে জ্যাঠীমার একগাদা মুড়ির ধানের মধ্যে পেঁপের নল দিয়ে পাওয়ার পাম্প বানিয়ে জল ঢেলে ঢেলে সারা উঠোনে একটা লংকাকাণ্ড ঘটানোর কথা। সেই বালক কিনা ওসব কিছু ছাড়িয়ে সবার অজান্তে আদিবাসী কমিউনিটির বাইরে আদীম এক পাহাড়ের গুহায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বসতি স্থাপন করেছে। যার খাদ্যই হল শুধু মরা মানুষের মাংস। আদিবাসী কমিউনিটিতে কেউ মারা গেলে গোরস্থানে রাখা সেইসব লাশ চুরি করা আর তা খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করার পর লাশের কংকালটি গুহার মধ্যেই একটা নির্দিষ্ট কর্নারে সংরক্ষণ করাই হল বালকের একমাত্র কাজ। কারণ, বালকের ধারণা, তার দরবেশ বাবার উপদেশ যদি সত্যি হয়, তাহলে লাশগুলি সব আসলে সোনার কংকাল। আদিনাথ পাহাড়ে তখন আজকের এই বালকই আগামীর এক অবিসংবাদিত সম্রাট। আর তার সেই যজ্ঞের শুরুটা অবশ্যই মায়ের লাশ চুরির মাধ্যমে। আর খাদ্যাভ্যাস তার লাশের মাংস।
প্রকৃত জনশ্র“তি হলÑ আদিনাথ পাহাড়ের সমুদ্রের ওপারে যে আরো জনবসতি থাকতে পারে, সেই বিষয়টি আদিবাসী কমিউনিটিতে ওই বালকের বাবা ছাড়া আর কেউ তেমন একটা জানতো না। যদিও ওই বালকের যিনি ঠাকুরদা, তিনি আইজলের খ্রিস্ট্রিয় চার্জ থেকে শিক্ষা পাওয়া ওই আদিবাসী কমিউনিটির প্রথম খ্রিশ্চিয়ান। পরবর্তীতে যিনি ওই কমিউনিটিতে অনেককেই খ্রিস্টধর্মে উৎসাহিত করে খ্রিশ্চিয়ান বানিয়েছেন। এমনকি নিজেদের পাহাড়ি উঠোনে ইট সুরকি পাথর দিয়ে কেমন এক অট্টালিকা মার্কা প্যালেস বানিয়ে ওটার সুউচ্চ চূড়ায় একটা বিশাল ঘণ্টা ঝুলিয়ে কতো কাণ্ডকারখানা করে ওটার ফটকে লিখলেনÑ খ্রিষ্টীয় চার্জ। আর তখন থেকে ধীরে ধীরে আদিবাসী কমিউনিটির প্রায় প্রত্যেকটা মানুষ ঘণ্টা বাজার পর সকাল সন্ধ্যায় সেই প্যালেসে গিয়ে কেমন নিরব প্রার্থণা করায় অভ্যস্থ হয়ে গেল। প্রভু সর্বজনাব যীশু-ই তখন থেকে তাদের একমাত্র ত্রাণকর্তা। এভাবে আদিনাথ পাহারের আদিবাসী কমিউনিটির একটা অংশে ধীরে ধীরে একটা কমোন বৈশিষ্ট হয়ে ওঠলÑ সকাল সন্ধ্যায়, বিপদে আপদে, জন্ম মৃত্যু বিবাহে, ঝড় ঝাপটায়, এমন কি মাছ ধরা বা নতুন কোনো প্রাণী শিকার বা উৎসব পার্বণেও প্রভু যীশুর নাম নেওয়া। প্রভু যীশুই ঈশ্বর। তিনিই তাদের সবাইকে রক্ষা করবেন। অথচ তখনো আদিনাথ পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় বিশাল এক তাম্রমুর্তিতে স্বয়ং ভগবান বৌদ্ধই ধ্যানমগ্ন। নতুন পুরাতন আদিবাসী কমিউনিটির প্রায় সবাই আগে সেখানে গিয়ে প্রার্থণা করতো। আর এখন সেখানে যীশুরও উপস্থিতি। আদিবাসী কমিউনিটি দুভাগে বিভক্ত হতে থাকল। আদিনাথ পাহাড়ের আদিবাসী কমিউনিটিতে তখন একদিকে খ্রিস্টধর্মের প্রসার আর অন্যদিকে বৌদ্ধধর্মের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে শুরু হল একটা শীতল যুদ্ধ। সেই নিরব ধর্মযুদ্ধের মধ্যে ওইটুকু বালক অমোন একটা কাণ্ড ঘটাতে লাগল বরং কমিউনিটির প্রায় সবারই অজান্তে।
আদিনাথ পাহাড়ের খ্রিস্টিয় কমিউনিটিতে তখন এমন একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, প্রায়াত বিদ্যাপ্রতীম জগৎময় মোহান্তি রডরিক, যাঁর হাতে ওই কমিউনিটিতে খ্রিস্টান ধর্মের শুরু, তাঁর একমাত্র ছেলে শরৎময় মোহান্তি রডরিক নাকি পার্শ¦বর্তী ভগবান টিলার কোনো অজ্ঞাত বুদ্ধ মেয়ের সাথে কঠিন প্রণয়ে লিপ্ত। আট দশ কান হয়ে সেই খবরটি যখন শরৎ পতœী জয়ারাম রডরিক শুনলেন, তখন অনিবার্যভাবে স্বামীস্ত্রী কলহ শুরু হল। আর সেই কলহের শেষ পরিনতী ছিল খুবই ভয়ংকর। রাতের আঁধারে শরৎময় মোহান্তি রডরিক নিজের বউকে শিশুপুত্র অনির্বাণের সামনেই খুন করল। আর খুনের পর অসুস্থ শয্যাশায়ী বৃদ্ধা মা আর ওইটুকু শিশুপুত্র অনির্বাণকে ফেলে শরৎময় মোহান্তি রডরিকের সেই রাতেই কমিউনিটি ছেড়ে নিরুদ্দেশ কোথাও পলায়ন।
ছোট্ট অনির্বাণ তখন কার কাছে বড় হবে? একদিকে ঘরে অসুস্থ শয্যাশায়ী ঠাকুরমা। যার সেবা শুশ্র“ষার জন্যই যেখানে কমিউনিটির কারো না কারো প্রত্যক্ষ সহযোগিতা লাগে, সেখানে ওইটুকু অনাথ বালক অনির্বাণের কে খোঁজ রাখে? বালক অনির্বাণ তখন মায়ের কবরের পাশে শুয়ে বসে ঘুমিয়ে, খেয়ে না খেয়ে পরে থাকে। হঠাৎ করে অমোন প্রলয়ধ্বংসের মুখোমুখি একটা পরিবারের ওইটুকু বালকের মধ্যেও তখন রহস্যময় অজ্ঞাত এক ঘোর লাগা শুরু হয়। অনির্বাণ খাইলো নাকি ঘুমাইলো, অনির্বাণ ঘরে নাকি বাহিরে, অনির্বাণ তখন কোথায় কীভাবে পরে থাকলো, সেই খবর নেওয়ার মতো ওই কমিউনিটিতে কে আছে বালকের? কিছুদিন অমোন ঘোরের মধ্যেই কাটল বালক অনির্বাণের। এভাবে হয়তো একদিন বালক অনির্বাণের একমাত্র শয্যাশায়ী ঠাকুরমাও ঘুমের মধ্যে মারা গেল। হয়তো বালক অনির্বাণের ঠাকুরমাকেও পুরানা গোরস্থানে কবর দেওয়া হল। কিন্তু বালক অনির্বাণের কী হল সেই খবর কি কমিউনিটির কেউ আর রেখেছে? আদিনাথের আদিবাসী কমিউনিটিতে বালক অনির্বাণের বসবাসের আর কোনো সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না।
হয়তো ওদিকে ততোদিনে অনির্বাণ তার ঠাকুরমার লাশটাও চুরি করেছে। আর তা সযতেœ সেই অন্ধকার গুহার কোনো প্রান্তে লুকিয়ে রেখেছে। মায়ের লাশের মাংস খাওয়া শেষ হলে ঠাকুরমার লাশের মাংস খাবে। কারণ হয়তো ইতোমধ্যে বালক অনির্বাণ লাশের মাংস দিয়ে উদর পূরণে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে। প্রথম প্রথম আদিনাথ পাহাড়ের কমিউনিটিতে সবাই ধারণা করেছিলÑ হয়তো অনির্বাণের বাবা কোনো এক রাতে এসে বালক অনির্বাণকে চুরি করে নিয়ে গেছে। অথবা বালকটা স্রেফ কোথাও হারিয়ে গেছে। নতুবা পাহাড়ের কোনো খাদে পড়ে মরে শুকোচ্ছে। অথবা শেয়াল শকুনের পেটে হয়তো ঠাঁই নিয়েছে বালক অনির্বাণ। নইলে ওইটুকু বালক আর কোথায় যাবে? এভাবে শরৎময় মোহান্তি রডরিকের মতো তার শিশুপুত্র অনির্বাণ মোহান্তি রডরিকও আদিনাথ পাহাড়ের কমিউনিটি থেকে একদিন হারিয়ে গেল। কমিউনিটির কেউ আর বালক অনির্বাণকে আদিনাথ পাহাড়ের কোথাও দেখতে পেল না। ধীরে ধীরে আদিনাথ পাহাড়ের খ্রিস্টিয় কমিউনিটিতে বালক অনির্বাণও একদিন নির্বাসিত হল।
ওদিকে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত বালক অনির্বাণ অজ্ঞাত পাহাড়ের অন্ধকার গুহায় লাশের মাংস খেয়ে লাশ আর কংকালের সাম্রাজ্যে বড় হতে থাকল। আদিবাসী কমিউনিটির গোরস্থান থেকে লাশ চুরি করা, সেই লাশের মাংস ভক্ষণ করা আর কংকালগুলো সারি সারি করে গুহার মধ্যেই সাজিয়ে রাখাই অনির্বাণের তখন একমাত্র কাজ। শুধুমাত্র অন্ধকারেই অনির্বাণের চলাফেরা। অন্ধকারেই অনির্বাণের বসবাস। অন্ধকারই অনির্বাণের অনিবার্য কর্মকাল। আদিনাথ পাহাড়ে কেউ আর বালক অনির্বাণের কথা মনে রাখল না। অথচ সবার অজান্তেই অজ্ঞাত পাহাড়ের গভীর গুহায় অনির্বাণ এক কংকালের সাম্রাজ্য স্থাপন করে চলল। যেন আদিনাথ পাহাড়ের চলতি সভ্যতার উল্টোপাশে বালক অনির্বাণ আরেক সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছে। ধর্ম নিয়ে সৃষ্ট কলহের উর্ধ্বে নতুন এক সভ্যতার শ্রষ্ঠা অনির্বাণ অন্ধকারেই আরেক বিপরীত রাজ্য স্থাপন করেছে। যেখানে মরা মানুষের মাংসই হল একমাত্র খাদ্য। অনির্বাণ লাশের মাংস খেয়েই বড় হচ্ছে। লাশ চুরি যার পেশা। দরবেশ বাবা যার ধ্যানগুরু।
এক সময় আদিনাথ পাহাড়ে একটা খবর বেশ চাউর হল। কে বা কাহারা যেন মৃত ব্যক্তির লাশ চুরি করে নিয়ে যায়। কেন লাশ চুরি করে? কারা লাশ চুরি করে? কীসের জন্য লাশ চুরি করে? এমন সব প্রশ্ন কমিউনিটির কারো কারো মাথায় আসলেও কয়েকদিন যেতে না যেতেই লাশ চুরির ঘটনা আলোচনা থেকে অটোমেটিক উধাও হয়ে যেত। তবে এ বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ রইল না যে, লাশ শুধুমাত্র আদিনাথ পাহাড়ের গোরস্থান থেকেই চুরি হয় না। পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের কমিউনিটি থেকে বা পশ্চিমের ভগবান টিলায়ও নাকি লাশ চুরির ঘটনা তখন ঘটছে। ধীরে ধীরে লাশ চুরির এই ঘটনা নিয়ে আদিনাথ পাহাড়ের খ্রিস্টান কমিউনিটি এবং কেয়াং প্রধান বৌদ্ধ কমিউনিটির মধ্যে পারস্পারিক সন্দেহ আর কলহ দানা বাঁধতে লাগল। লাশ চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদিনাথ পাহাড়ের খ্রিস্টান এবং বৌদ্ধ কমিউনিটির আদিবাসীরা তখন মুখোমুখি। কলহে উত্তপ্ত পাহাড়ি জনপদ। কমিউনিটিতে কারো লাশ চুরি হলেই তখন উভয় পক্ষে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়। ফলাফল পাহাড়ি আদিবাসী জনপদে গুপ্ত হত্যার সংখ্যাও যেমন বাড়ল, লাশ চুরির ঘটনাও বাড়তে লাগল। কিন্তু লাশ চোর ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কিছুতেই লাশ চোর সনাক্ত করাও যাচ্ছে না। লাশ চোরকে ধরাও যাচ্ছে না। হয়তো কেউ মারা গেল। দুচারদিন গোরস্থানে এক ধরণের পাহারা বসানো হলো। সেই পাহারা আর কতোদিন-ইবা বসানো সম্ভব? মরা মানুষের লাশ কতোদিন আর পাহারা দিয়ে রাখা যায়? যেভাবে হোক গোরস্থানে পাহারা বন্ধ হওয়ামাত্র সেই লাশও চুরি হয়ে যায়। কিন্তু লাশ চোর ধরা ছোঁয়ার উর্ধ্বে। আদিনাথ কমিউনিটিতে কেউ আর লাশ চোরকে ধরতে পারে না। অনির্বাণ দুঃসাহসি রাজার মতোই একা একাই তার সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলে।
অশান্ত পাহাড়। অশান্ত পাহাড়ি আদিবাসী জনপদ। অশান্ত ধর্মের দোহাই দিয়ে টিকে থাকা পাহাড়ি স¤প্রদায়গুলো। কলহ, বিপদ, ভয়, গুম, হত্যা, আর লাশ চুরি। অবশেষে পাহাড়ি জনপদে চরম অসন্তোস বিরাজ করলে সরকার সেখানে রাষ্ট্রীয় সেনা মোতায়েনে বাধ্য হল। নইলে নাকি আদিবাসীদের গোপন কিলিং মিশন বন্ধ হবে না। বরাবরের মতো কলহ বন্ধের জন্য সরকার নিরপেক্ষ না থেকে কোনো এক পক্ষকে সমর্থণের যে কৌশল ব্যবহারে অভ্যস্থ, সেই সুযোগে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সেনাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ আর সহযোগিতায় পাহাড়ে চিরায়ত দা-বর্ষা ঢালের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্রের ব্যবহার ও আগমন বাড়তে থাকল। এভাবে ধীরে ধীরে আদিনাথের পাহাড়ে শত্র“ দমনের সেই অমিমাংসিত খেলায় শত্র“-মিত্র খেলাটি বেশ জমে ওঠল। আর এক সময় অশান্ত পাহাড়ি গোষ্ঠীগুলো সরকারি নিরাপত্তা সেনাদের বিরুদ্ধেই স্বার্থ আর দ্বন্দ্বের শ্রেষ্ঠত্বে লিপ্ত হল। তখন কে কাকে হত্যা করে, কি কারণে হত্যা করে, হত্যায় কার লাভ ওতো সব হিসাব নিকাশ না করেই পাহাড়ি শান্ত জনপদ চিরস্থায়ী অশান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিনত হল। পাহাড়ে তখন মৃত্যু মানে পাল্টা মৃত্যু। গুম মানে পাল্টা গুম। হত্যা মানে পাল্টা হত্যা। ধীরে ধীরে পুরো আদিনাথ পাহাড় এক নরবলীর পাহাড়ি জনপদ হয়ে ওঠল।
এতে অনির্বাণের কোনই অসুবিধা হল না। বরং দরবেশ বাবার খাঁটি আর্শিবাদে অনির্বাণ তখন অন্ধকার গুহা সোনার কংকালে ভরপুর করতে থাকে। দরবেশ বাবা অনির্বাণকে এক অতি আশ্চার্য আর্শিবাদ দান করেছেন। বস্তুটি দেখতে অনেকটা আয়নার মতো হলেও ওটি আকার আর গঠনে আসলে একটা চাকু। খোলা আকাশের নিচে অনির্বাণ যদি দরবেশ বাবার দেখা পেতে চায়, তাহলেই কেবল ওই চাকুটি ব্যবহার করে অনির্বাণ। চাকুর সূচালো ফলাটি আকাশ বরাবর ধরার পর রশ্মির মতো তীব্র উজ্জ্বল এক আলোর সরলরেখা আকাশপথে অনির্বাণের সাথে তখন সাক্ষাৎ দেয়। এই আলোর রেখার মধ্যেই দরবেশ বাবাকে স্পষ্ট দেখতে পায় অনির্বাণ। দরবেশ বাবা অনির্বাণকে যেসব উপদেশ দেন বা অনির্বাণ যা জানতে চায় তার বিনিময় হয়। আর দরবেশ বাবার সাক্ষাৎ পাবার জন্য অনির্বাণকে এর আগে তিনটি কাজ করতে হয়। তিনবার লাশের মাংস খেতে হয়। মনে মনে তিনবার দরবেশ বাবাকে স্মরণ করতে হয়। আর তিনবার মুখে একটা মন্ত্রটা আস্তে আস্তে উচ্চারণ করতে হয়। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। অমনি আকাশ পথে আলোক রশ্মির মতো নেমে আসেন জীবন্ত দরবেশ বাবা। পা তাঁর ভূবনে আর মাথা ওই সর্বোচ্চ আকাশে। এক আশ্চার্য আলোক রশ্মি তখন অনির্বাণের সাথে ভাব বিনিময় করে। অনির্বাণকে নির্দেশ দেয় অথবা উপদেশ দেয়। অনির্বাণ ছাড়া দরবেশ বাবাকে আর কেউ দেখতে পায় না।
দরবেশ বাবার সাথে অনির্বাণের প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাও বেশ রহস্যজনক। অনির্বাণের মা তার বাবার হাতে খুন হবার পরদিন ঠিক মধ্যান্থের সময়। বালক অনির্বাণ তখন তার মার কবর ঘেঁষে মন খারাপ করে বসেছিল। নাকি মার কাছে যাবার জন্য অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হবার পর কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সেই ঘুমের মধ্যেই বালক অনির্বাণ শুনতে পেলÑ আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে একটা ঝাঁঝাল শব্দ। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। ঘুমন্ত অনির্বাণ চোখ খুলে কি ভয় পেল? নাকি কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে কিংকর্তব্যবিমুঢ় বালক! ভয় পেয়ে অনির্বাণের কি কোথাও পালানোর মতো জায়গা আছে? ভীত সন্ত্রস্থ বালক অনির্বাণ তখন ভয়ের পরিবর্তে হয়তো বিস্ময় চোখে দরবেশ বাবাকে দেখতে লাগল। দরবেশ বাবা আবারো উচ্চারণ করলেনÑ দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। অনির্বাণ কি ভয় পেল? নাকি সে অভয় পেল? অনির্বাণ কি সাহস হারাল? নাকি সে দুঃসাহসি হল? অনির্বাণ কি উৎসাহী হল? নাকি সে উৎকণ্ঠায় আবারো ঘুমিয়ে পড়ল। অনির্বাণ কি জ্ঞান হারাল? নাকি সে সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ল? অনির্বাণ কি আবারো স্বপ্ন দেখল? অনির্বাণ ঘোরের মধ্যে আসলে কি কি দেখল? অনির্বাণ কি ঘুমের মধ্যে আবারো দেখলÑ দরবেশ বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। আর জোড়ালো কণ্ঠে বলছেনÑ দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। আধো ঘুমন্ত আধো জাগা বালক অনির্বাণ তখন সুতীক্ষè এক আলোক রশ্মির মুখোমুখি। বালক অনির্বাণ জানতে চায়Ñ কে তুমি?
পাহাড়ি মধ্যান্থের দাপদগ্ধ হাওয়া উলম্ফভাবে অনির্বাণের কান ঘেঁষে শা-শা শব্দে কথা বলে ওঠেÑ আমি কেউ না খোকা।
অনির্বাণ আবারো জানতে জায়Ñ কি চাও তুমি?
উত্তপ্ত নরম গরম হাওয়া প্রলম্বিত হতে হতে জবাব দেয়Ñ কিছুই না। কিছুই নারে, খোকা।
অনির্বাণ তখন পাক্কা সেয়ানার মতো উচ্চারণ করেÑ দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। অনির্বাণ তখন পুরোপুরি চেতনে। অনির্বাণ তখন সুস্থির চিন্তা করার চেষ্টা করে। স্থির দেখতে পায় আলোক রশ্মির ভিতরে আকাশ পাতাল সাদা ধবধবে এক দরবেশ বাবা দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে। অনির্বাণ আবারো সুস্পষ্ট উচ্চারণ করেÑ দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। এবার দরবেশ বাবা অনির্বাণের সামনে আরো সুস্পষ্ট হল। অনির্বাণ যেন ঠিক পাহাড়ি জনপদেরই পরিচিত কোন আপন মানুষের সাথেই কথা বলছে। দীর্ঘদিন যার সাথে অনির্বাণের জানাশোনা। দরবেশ বাবা যেন বা অনির্বাণের কতো পুরনো চেনা কেউ। দরবেশ বাবাকে দেখতে দেখতে অনির্বাণ বুঝতে পারে সে বুঝি খুব শক্তি অনুভব করছে শরীরে। ওই যে মায়ের কবর, ওই যে ওদিকে তাদের বাড়ি, ওই যে দূরের গাছপালা, বাড়িঘর, পাহাড় সবকিছু ঠিকই আছে। তবু তার মনে হতে থাকেÑ সে বুঝি মুহূর্তে সবকিছু তছনছ করে গুড়িয়ে দিতে পারার মতো শক্তি পাচ্ছে শরীরে। কীসের শক্তি টের পাচ্ছে অনির্বাণ? অনির্বাণ কেন এতো শক্তি পাচ্ছে শরীরে? অনির্বাণের কি কিছু হল? কে এই দরবেশ বাবা? অনির্বাণের কাছে সে কি চায়?
সেই থেকে অনির্বাণ যথেষ্ট শক্তি পায় শরীরে। তবে কি এই শক্তির উৎস দরবেশ বাবা। আর এই শক্তির মন্ত্রÑ দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। কোথায় কি কিভাবে বদলে যাচ্ছেÑ অনির্বাণ বুঝতে চেষ্টা করে। অনির্বাণ কিছুই বুঝতে পারে না। অনির্বাণ চোখ কচলায়। অনির্বাণ বুঝতে পারে না কি করতে হবে। ঠিক তখন স্বয়ং দরবেশ বাবাই অনির্বাণকে নির্দেশ দেয়Ñ পালিয়ে যা। এখান থেকে পালিয়ে যা বলছি। কবরের ওই লাশ নিয়ে পালিয়ে যা। যাহ...।
অনির্বাণ বুঝতে চেষ্টা করে দরবেশ বাবা কি বলছেন। অনির্বাণ চারদিকে তাকায়। অনির্বাণ বুঝতে পারে না কি করতে হবে। দরবেশ বাবা তখন আবারো কথা বলেনÑ লাশ নিয়ে পালিয়ে যা। সোনার কংকাল পাবি। যা পালিয়ে যা বলছি। যাহ...।
অনির্বাণ কি তখন ওঠে? মায়ের কবরকে খুব ভালো করে একবার দ্যাখে। খুব ভালো করে চারদিকটায় তাকায়। না কোথাও কেউ নেই। অনির্বাণ নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়। মায়ের লাশ নিয়ে অনির্বাণ পালানোর ফন্দি করে। অনির্বাণ ঘরে ফিরে আসে। অনির্বাণ ঘরের বাইরে আসে। অনির্বাণ অসুস্থ ঠাকুরমার ঘরে উঁকি দেয়। অনির্বাণ আবার ঘরের বাইরে আসে। অনির্বাণ যেন পাগল হয়ে যাচ্ছে। মধ্যান্থের অনির্বাণের সাথে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার কথা আদিনাথ পাহাড়ের কেউ কিছুই জানল না। অনির্বাণ অস্থির হয়ে ঘর বাহির করতে থাকে। মনে মনে অনির্বাণ বলতে থাকেÑ দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা। দাদ্রিং মাদ্রিং রোদ্রিং রা।
আদিনাথ পাহাড় থেকে দক্ষিণে তাকালে অথৈ সাগর। বাকি তিনদিকে পাহাড় আর পাহাড়। পশ্চিমে তাজিংডং, কেওক্রাডাং, ভগবান টিলা, অযোধ্যা, মাটিরাঙ্গা, সুভলং, চিম্বুক। আরো পশ্চিমে সীতা, কুণ্ডি, কৈবল্যধাম। আর উত্তরে মিজু, ত্রিদিব, চণ্ডি, বাল্মিকী, ত্রিফলা। আরো উত্তরে ব্রক্ষ্মা, অগ্নি, শৈল, ত্রিপুঠ। আর পূর্বে কালী, মেঘাই, চৈতাল, পঞ্চবটি। আরো পূর্বে ঋতু, নমঃ, পুনঃ, শ্যামঃ। আদিনাথ সবার দক্ষিণে। হাজার বছর আগে হিমালয় কন্যা কাঞ্চনজঙ্ঘার সাথে প্রেম বিরহের বিদ্রোহী এক যোদ্ধা এই আদিনাথ। সমুদ্র দর্শন তার চাই। প্রয়োজনে প্রিয়তমা কাঞ্চনকেও ত্যাগ করতে রাজী আদিনাথ। সৌন্দর্য সম্রাজ্ঞী হিমালয় কন্যা কাঞ্চন আদিনাথের কথায় শুধু মুখ টিপে হাসল। আদিনাথ অভিমান আরো বাড়িয়ে দিল। কাঞ্চন সাথে যেতে না চাইলেও সমুদ্র দর্শন তার চাইই চাই। ফলাফল আদিনাথ আর কাঞ্চনের স্থায়ী বিচ্ছেদ। আদিনাথ পাহাড়ে এখন যারা বসবাস করেন তাদের কমিউনিটিতে এমনটি ধারণা করা হয়। কাঞ্চনের বিদ্রোহী প্রেমিক আদিনাথকে তাই কমিউনিটির সবাই দেবতা মানেন। আদিনাথকে তারা সবাই পূজা দেয়। কাঞ্চনকে আদিনাথের সবাই হিংসে করেন। একমাত্র আদিনাথই তাদের দেবতা।
সেই আদিনাথকে সরিয়ে সেখানে এখন অন্য অনেকের আগমন ঘটেছে। সবার আগে এসেছেন বুদ্ধদেব। তারপর এসেছেন শ্রী শ্রী চৈতন্য। তারপর শ্রী শ্রী মঙ্গলাদেব। তারপর শ্রী যিশুখ্রিস্ট। শ্রী মোহাম্মদ খবরটি পেলেন সবার পরে। কারণ উনি তখন কাবুল দখল নিয়ে মহাব্যস্ত। অথবা রেঙ্গুনের দিকে নজর দেবার সময় তাঁর আরো পরে। এক সময় দেখা গেল আদিনাথের আদিবাসীরা ছোট ছোট নানান স¤প্রদায়ে বা দেবতাকে ঘীরে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শে কমিউনিটি বৃদ্ধি করে চলছে। দর্শন বুঝিবা পৃথিবীময় নিজে নিজেই এভাবে ছড়ায়। গৌতমেরটা যেভাবে ছড়ায়, যিশুরটাও একইভাবে ছড়ায়। শ্রীকৃষ্ণেরটাও একই নিয়মে টিকে থাকে। মোহাম্মদেরটাও একই উপায়ে ছড়ায়। দর্শন জনমতের কাছে পৌঁছাবেই। এটাই হয়তো দর্শনের নিজস্ব ক্ষমতা। যে কারণে কার্ল মার্ক্স টিকে থাকবে। যে কারণে পুঁজিবাদও টিকে থাকবে। যে কারণে ধর্মযুদ্ধও টিকে থাকবে। যে কারণে যুগ যুগের ইতিহাস হলো ক্রুসেড। রক্ত, হত্যা, বলি, নরবলি। আর এসবের যৌথ নাম হল মতাদর্শ। আর সেই মতাদর্শের লিখিতরূপের ক্ষমতা সবার চেয়ে বেশি। যে কারণে ত্রিপাঠক, বেদ, বাইবেল, কোরআন দীর্ঘদিন টিকে থাকবে। যে কারণে কার্ল মার্ক্স, এঙ্গেলস, ডারউইন, নিউটন, আইনস্টাইন, বোস, পিথাগোরাসের কথা মানুষ দীর্ঘদিন মনে রাখবে। অথবা হিটলার, নেপোলিয়ন, তৈমুর লং, সাদ্দামের কথা মানুষ দীর্ঘদিন ভুলবে না। আবার অনেকের কথা পৃথিবীর কোন কোন কমিউনিটি হাজার হাজার বছরেও জানতে পারবে না। যেমন পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা কতো, তা কেবল আমরা অনুমান করতে পারি। পৃথিবীতে পাখির সংখ্যা-ইবা কতো, যা আমরা কেবল অনুমান করেই বলতে পারি। পাখির সংখ্যা, ভাষার সংখ্যা সবই অনুমান নির্ভর। ঠিক তেমনি পৃথিবীতে ধর্মের সংখ্যাও অনুমান নির্ভর। পাখি, ভাষা, ধর্ম সবই আসলে অনুমান নির্ভর। শুধু যোগসূত্রের ঘাটতি। আশ্চার্য জগদীশ চন্দ্র বসু যেমন হঠাৎ ঘোষণা দিলেনÑ গাছেরও প্রাণ আছে। অমনি জগৎসুদ্দু লোকজন একটু নড়ে চড়ে বসলেন। কেউ কেউ বিপক্ষে গিয়ে দেখলেন বিরোধীতা করে এই দলটিকে বেশি দিন টেকানো যাবে না। অতএব জগদীশের কথা মেনে নাও। সিদ্ধান্ত হলÑ হ্যা, গাছেরও প্রাণ আছেÑ এক্কেবারে খাঁটি কথা।
আদিনাথের মতো পাহাড়ে জগদীশের নাম না পৌঁছালেও সেখানকার মানুষজন নিজেদের অজান্তেই হয়তো গাছেরও প্রাণ আছে কথাটি মানে। কারণ তারা প্রকৃতির প্রকৃতি বিচারে তাদেরকে দেবতা মানে। গাছকেও। পাহাড়কেও। তাই তারা আসলে আদিনাথকেও দেবতা মানে। সেখানে আরো কতো দেবতা আছেন তা হয়তো যাছাই করা সম্ভব কমিউনিটিগুলোর সামাজিক উৎসব আর পার্বণগুলোর উৎস অনুসন্ধান করা গেলে। কিন্তু অতো জটিল ভাবনা আজকাল আর কেউ ভাবেন না। অনেকে আবার ডগায় ডগায় নেচে নেচে পণ্ডিৎ হতে চান। গভীর উপলব্ধিতে মনের গভীরে যা ধরা দেয়, সেই শৃৃংঙ্খলিত ভাবনাই আসল সত্য। ইতিহাস তাকে অগ্রসর করে মাত্র। যীশু যা ভাবতেন বা মোহাম্মদ যা করতেন, তা সময়কে প্রতিনিধিত্ব করছে নিজ নিজ ভাবনার শক্তি ও সামর্থের জোড়ে। তাই আদিনাথ ভাগ হচ্ছে। হিমালয় ভাগ হচ্ছে। আটলান্টিক ভাগ হচ্ছে। ভাগ হচ্ছে সভ্যতা, উন্নয়ন ও চিন্তা। মানুষের দ্বন্দ্ব আরো দিন দিন বহুমখী হচ্ছে। কারো সাথে কারো দুইশো ভাগ দ্বন্দ্ব। কারো সাথে কারো চারশো ভাগ দ্বন্দ্ব। সবকিছুই স্বার্থজনিত দ্বন্দ্ব। আর বালক অনির্বানও হয়তো নিজের স্বার্থের জন্য অমন কষ্টকর এক গুহাবাসী জীবন বেছে নিল। যেখানে লাশের মাংস হল একমাত্র ক্ষুধা নিবারনের উপায়। বেঁচে থাকার জন্য যেখানে আর কোন সভ্যতা লাগে না। অন্ধকার গুহার মধ্যে লাশের মাংস খেয়েই লাশের কংকালের সাথে বেঁচে থাকা সম্ভব। অনির্বান সেই সভ্যতার শ্রষ্ঠা। অনির্বানও বেঁচে থাকল। বুনো মানুষের মতো গুহাবাসী নতুন এক মানুষ খেকো মানুষ হিসেবে অনির্বান বাঁচতে লাগল।
এরপরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সেনাদের হাতে গভীর রাতে গোরস্থান থেকে লাশ চুরি করার সময় অনির্বাণ হাতে নাতে ধরা পরে। কারণ, সর্বশেষ যে লাশটি অনির্বাণ চুরি করতে গিয়ে সেনাদের হাতে ধরা পরলÑ ওটা ছিল মুংখিল রৈথালা নামে এক আদিবাসী নেতার লাশ। ধারণা করা হয়, কোন গোপন নিষিদ্ধ সশস্র দলের হাতে খুন হয়েছে রৈথালা। পাল্টা হতাহতের সম্ভাবনায় তখন থমথমে পাহাড়। অশান্ত পাহাড়ি জনপদ। কিন্তু নিরাপত্তা সেনাদের দায়িত্ব পাহাড় শান্ত রাখা। কিন্তু কিভাবে?
মেজর জুলমতের নের্তৃত্বে সাত সদস্যের একটা চৌকশ সেনাদলের গোপনে জোড়ালো নজরদারি ছিল মুংখিলা রৈথালার কবরে। যদি কোন পক্ষ মুংখিলার লাশ গায়েব করার চেষ্টা করে তাহলে ওই গোপন মিশনের কাছে তারা ধরা পরবে। গভীর রাতে যথারীতি অনির্বাণও ধরা পরল জুলমতদের হাতে। অনির্বাণ বুঝতে পারে না তার কি অপরাধ। সে তো এই সভ্যতার বাইরে অন্য এক সভ্য জগতের মানুষ। যেখানে কেবল মানুষের মৌলিক মানুষ থাকার সুযোগ আছে। অনির্বাণও একজন মৌলিক মানুষ। সভ্য জগতের আচার আচরণ শিষ্টাচার অনির্বাণ জানে না। অনির্বাণ কিছুতেই সেনাদের বোঝাতে পারল না যেÑ এই লাশের মৃত্যুর সাথে সে কোনভাবেই জড়িত নয়। সে এটার সংগ্রাহক আর ভক্ষক মাত্র। আবার এই জগতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার কিছুই জানে না অনির্বাণ। কেবল লাশের সন্ধানে আসা নিশাচর এক লাশখেকো মানুষ সে। অন্ধকারেই যার কেবল চলাফেরা। অন্ধকারেই যার বসবাস। অনির্বাণ সেনাদের হাতে আটক হল।
কোন ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য বের করার জন্য আমাদের প্রশিক্ষিত বাহিনীর সদস্যরা কেমন আচরণ করেÑ আমরা হয়তো জানি না। আমরা শুধু অনুমান করতে পারি কেমন প্রচেষ্টা তারা জংলী যুবকের ওপরেও চালাতে পারে। অনির্বাণ নতুন জগতের এইসব নতুন মানুষদের কাণ্ডকারখানার সাথে মোটেও পরিচিত নয়। তাদের এই অদ্ভুত আচরণের কোন অর্থও তার জানা নেই। সবচেয়ে দুরুহ যে ব্যাপারটি সেটা হল অনির্বাণের ভাষা। কোনপক্ষই কারো ভাষা বোঝে না। অনির্বাণ আহতবস্থায়ই সেনাদের সেই জিজ্ঞাসা সেলে পরে থাকল। অনির্বাণের কি আর জ্ঞান ফিরবে? জিজ্ঞাসা সেলের কৌশলগুলো বুঝি সব অমোনÑ খানিক জ্ঞান হারাবে Ñ খানিক জ্ঞান ফিরবে। ক্ষণে ক্ষণে নতুন নতুন ব্যাপার স্যাপার।
মাঝরাতে কি অনির্বাণ জ্ঞান ফিরে পেয়েছিল? নাকি অনির্বাণের তার দরবেশ বাবার কথা মনে পড়েছিল? অথবা অনির্বাণ স্রেফ সুইসাইড করার আগে ক্ষত বিক্ষত দেহের রক্ত দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে যা লিখল বা আঁকল, তার সবকিছু কেন উদ্ধার করা যাচ্ছে না? এমন অদ্ভুত ভাষা আর অভিব্যক্তি, এমন সুগাঢ় আর আকৃষ্ট করার মতো নিখাদ সেই আহবানÑ এসব দিয়ে অনির্বাণ আসলে কি বোঝাতে চেয়েছে? অনির্বাণ নিজের রক্ত দিয়ে দেয়ালে আসলে কি প্রকাশ করেছে? সে কি নিজের পরিচয়টা নিজের রক্তে প্রকাশ করেছে? সে যে নিজের মায়ের লাশ চুরি করেছে, সে যে লাশের মাংস খেয়ে বেঁচে থেকেছে, সে যে এক দরবেশ বাবার উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে,Ñ এসবই কি সে নিজের রক্তে দেয়ালে খোদাই করেছে? কোথাও শুধু নির্বাক কিছু অভিব্যক্তি। কোথাও শুধু অনির্বাণের রক্ত মাখা হাতের ছাপ। কোথাও শুধু অনির্বাণের একটুখানি আকুতি। কোথাও হয়তো অনির্বাণের সত্য প্রকাশের আহাজারি। কোথাও হয়তো শুধু অনির্বাণের রক্তমাখা হাতের শেষ নড়াচড়া। ছাপগুলো কেমন ধীরে ধীরে নিথর হয়ে গেছে। অথবা এসবই আমরা কেবল অনুমান করছি মাত্র। অনির্বাণ যা কিছু প্রকাশ করেছে আমরা হয়তো তার কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে অনির্বাণ সর্বশেষ যে ঘরে ছিল শুধু সেই ঘরের সাদা দেয়াল, মেঝে আর গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে অনির্বাণের শেষ সময়টুকুর কিছু কর্মকাণ্ডের ছাপ পাওয়া গেল।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটল সকাল বেলায়। এক দায়িত্বরত সেনা যখন অনির্বাণ যে ঘরটায় বন্দি ওটার বাইরে থেকে তালা খুলে দরজা সরাল তখন। সেকি? ঘরের কোথাও অনির্বাণ নেই। জানালা দরজা সব খুলে দেখা গেলÑ দেয়ালে দেয়ালে অসংখ্য আঁকিবুকি। লেখা বা অভিব্যক্তির চিন্থ। ছোপ ছোপ জমাট রক্ত। অনির্বাণ কোথাও নেই। শুধু মেঝেতে পরে আছে একটা সোনার কংকাল।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29107953 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29107953 2010-03-01 16:30:41
দশমহল ।। গল্প ।। রেজা ঘটক
বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে এখনো সংখ্যালঘু হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, কৃষ্ণনগর গ্রাম তার একটি। কাজেই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কৃষ্ণনগরে মুসলমানরাই বরং সংখ্যালঘু। বৃহত্তর খুলনা জেলার বাগেরহাট মহকুমার চিতলমারী থানায় এই কৃষ্ণনগর গ্রাম। হিন্দু প্রধান দশমহল নামেই যা বেশি পরিচিত। কৃষ্ণনগরকে বরং দশমহলের একটা মহল বলাই ভালো। বর্তমানে বাগেরহাট জেলা আর চিতলমারী উপজেলা খ্যাতি পেলেও কৃষ্ণনগরের রূপ কিন্তু একটুও পাল্টায়নি। কোথাও কোথাও গ্রামের পুরনো রাস্তাঘাট ফুটখানেক উঁচু হয়েছে। আর কয়েকটা ভাঙা সেতুর জায়গায় ২৪ বা ৩৬ ফুটের কালভার্ট। তা আবার নগেন মন্ডল মেম্বার হওয়ায় তাঁর বাড়ির সামনের জীর্ণ সেতুটা, বিশ্বাসদের প্রভাব প্রতিপত্তি থাকায় তাঁদের ঘাটের তেলতেলে মসৃণ সাঁকোটা আর ডাকাতিয়া হাইস্কুল পথের খেজুর গাছের ভাংগা সেতুটা কালভার্ট হয়েছে। শশধর পাড়ার লোকদের বেশি যাতায়াত খাসেরহাটের দিকে। ওই পথের ভাঙা সাঁকোটা এখনও আগের মতোই অচল। তবে অচল পয়সার মতো নয়। ধৈর্য আর সাহস থাকলে এ সাঁকোও নিশ্চিন্তে পার হওয়া যায়।

যেমন এই ভাংগা সাঁকোটা পার হওয়া লক্ষ্মীরাণীর কাছে শিশুর হাসির মতো সহজ কাজ। চাঁদের আলো কোনরকম পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই যেমন কৃষ্ণনগরের পথঘাট, মাঠপ্রান্তর, উঠোনবাগান সর্বত্র অবলীলায় ছড়িয়ে যায়, তেমনি সূর্যের আলো যতোক্ষণ থাকে দিনের ততোক্ষণ লক্ষ্মীরাণী কৃষ্ণনগরের এমাথা থেকে ওমাথা বাড়ি বাড়ি ঘুরে অন্ন যোগানের ব্যবস্থায় ভারি ব্যস্ত দিন কাটায়। সে কারণে দিনে কমপক্ষে দু’বার লক্ষ্মীরাণীকে শশধর পাড়ার এই ভাংগা সাঁকোটা পারাতে হয়। সকালে ঘর থেকে বেরিয়েই একবার, আর সন্ধ্যায় ফিরতি পথে আবার। কৃষ্ণনগরের এমাথা থেকে ওমাথা মোট কত কদম পথ তা লক্ষ্মীরাণীর হিসাবে না থাকলেও কৃষ্ণনগর গ্রামের প্রধান রাস্তার দু’পাশের সকল বাড়িঘরের কার কী নাম, কার কয়টা ছেলেমেয়ে, কার হালে কয়টা বলদ, কার কয়টা দুধের গাভী, কার বউয়ের পেটে বাচ্চা, কার বউয়ের আতুর চলে, কে কেমন রবিশস্য পেল, কার কার পেটের অসুখ, কার অম্বলের বা গ্যাস্ট্রিকের ব্যারাম, কোন ছেলের বিয়ের কথা হচ্ছে, কার মেয়ের ঘরে রাতে জিন নামে, কোন বাড়িতে সোমত্ত মেয়ে দেখতে পাত্রপক্ষ থেকে অতিথি আসছে, কোন কোন বাড়ির গৃহস্থ বউয়ের পরকীয়া প্রেম আছে, এমন সব ধরনের হাঁড়ির খবরই লক্ষ্মীরাণীর কাছে আছে। এক কথায় কেউ যদি কৃষ্ণনগরের কোন খবর জানতে চায়, তার শুধু লক্ষ্মীরাণীর সঙ্গে দেখা মিললেই যথেষ্ট। কৃষ্ণনগর গ্রামের জীবন্ত সংবাদপত্র এই লক্ষ্মীরাণী বসু। কৃষ্ণনগরের অনেক আউবুড়ো মেয়ের বিয়ে হয়েছে লক্ষ্মীরাণীর কাছ থেকে পাত্র পক্ষের পাওয়া নিরপেক্ষ তথ্যের ভিত্তিতে। আবার অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবার কৃষ্ণনগরে মেয়ের বিয়ে দেয়ার আগে লক্ষীরাণীর শরণাপন্ন হয়েছেন, ছেলের পরিবার সম্পর্কে খবর জানতে।

যার চরিত্রে যতটুকু ভালো গুণ তা যেমন লক্ষ্মীরাণী প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না, তেমনি কেউ দুশ্চরিত্রের হলে ঢোল না পিটিয়ে হলেও অকপটে জানাতে লক্ষ্মীরাণীর মোটেও ভয়ডর নেই। সে এডভোকেট কালীদাস বড়াল হত্যাকান্ডের কথাই হোক আর নৌকায় ভোট দেয়াই হোক না কেন। কৃষ্ণনগরে যা কিছু ঘটুক তার খবর লক্ষ্মীরাণী পাবেই। সে কারণে কৃষ্ণনগরের ধনী-গরীব, জোয়ান-বুড়ো, নেতা-মাস্তান সকলেই লক্ষ্মীরাণীকে একটু সমীহ করেই চলে। কেবল স্কুল পালানো ছেলে ছোকরারা মঝে মধ্যে তার পিছে লেগে প্রাত্যহিক ভিক্ষাবৃত্তির কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটিয়ে আনন্দ লুটে নিলেও, লক্ষ্মীরাণীর চরিত্রে আভিজাত্য বলতে তার ওই সত্য ভাষণটুকুই। সত্য বলতে সে পুলিশ, ডাকাত কি মাস্তান কাউকেই ভয় পায় না। তাই আসল শত্র“র চেয়েও ধীরেন বিশ্বাসের ভয়টা ওই লক্ষ্মীরাণীকে নিয়েই বেশি। কারণ গত তিনদিনে বিশ্বাস বাড়িতে একবারও আসেনি লক্ষ্মীরাণী। মাঝেমধ্যে বিরূপ আবহাওয়া থাকলে অথবা কোন ঘটনায় লক্ষীরাণী ভীষণ গোস্যা করে স্বেচ্ছায় অভুক্ত থেকে থেকে নিভৃত কুঁড়েঘরের জীর্ন বিছানায় শীর্ণ শরীরটাকে রহস্যময় এক অভিমানী বেড়িতে জোর করে বন্দি করলেই কেবল এরকমটা হয়ে থাকে। তাও চার নম্বর সিগন্যাল পর্যন্ত লক্ষ্মীরাণী বসে থাকে না। কৃষ্ণনগর গ্রামের শেষ প্রান্তের ওই ধীরেন বিশ্বাসের বাড়ি পর্যন্ত অন্তত দিনে একবার লক্ষীরাণীর আসা চাই। পেটের দায়েই কৃষ্ণনগরের এমাথা-ওমাথা চক্কর দিতে হয় লক্ষ্মীরাণীকে। তাছাড়া গত পঁচিশ বছরে যতোবার লক্ষ্মীরাণী গ্রামে বের হয়নি, সে হিসাব একেবারে হাতেগোনা। যেমন এডভোকেট কালীদাশ বড়াল যেদিন বাগেরহাটে প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হলেন, সেদিনের সেই ভয়ংকর দুঃসংবাদটি শোনার পর, পরবর্তী তিনদিন ছেলে হরানোর শোকের মতো ষাট উর্ধো লক্ষীরাণী কোথাও বের হয়নি। লক্ষীরাণী জীবনে বিয়ে করেনি কিন্তু এডভোকেট কালীদাশ বড়ালকে তার নিজের সন্তানের মতো জানতো। দেখা হলেই বুকে জড়িয়ে ধরে বলতো Ñ কালারে আমার, সাবধানে চলিস বাপ।

এডভোকেট কালীদাশ বড়ালের অতো সময় কোথায় কৃষ্ণনগরের এক ভিখারি বুড়িমার কথা মেনে সারাক্ষণ সাবধানে চলবেন? একদিকে তাঁর আইন ব্যবসা অন্যদিকে রাজনীতি। গোটা দশমহল, বাগেরহাট, ঢাকা, কলকাতা কতো জায়গায় কতো ধরনের দৌড়ঝাঁপ। কতো কিসিমের লাইনঘাট। কতো টাইপের মানুষের সঙ্গে ওঠবস। কতো ধরণের খবরে খেয়াল রাখতে হয় তাঁকে। কতো হাজারো কাজে লাখো টাইপের বোঝাপড়া। দম ফেলানোর সময় কোথায় কালীদাশের? এসবের মধ্যেও অসুস্থ সহকর্মীকে দেখতে সময় বের করতে হয় তাঁকে। এডভোকেট মজুমদারের বাসা থেকে ফেরার পথে সাধনার মোড়ে দাঁড়িয়ে পত্রিকায় চোখ বোলাতে বোলোতে গরম চায়ে চুমুক দেয়ামাত্র আগে থেকে সেখানে ওৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করলো। এক্কেবারে নির্ভুল নিশানা। এই লাইনে পুরোপুরি হাত পাকানো দক্ষ লোকদের টার্গেট কি কখনো মিস হয়? মুহূর্তে সে খবর রাষ্ট্র হয়ে কৃষ্ণনগরের লক্ষীরাণীও পেল। তারপর টানা তিনদিন লক্ষীরাণী কৃষ্ণনগরের কোথাও বের হয়নি। চতুর্থ দিনে নগেন বড়ালের বাড়িতে যখন কালীদাশের লাশ পৌঁছাল সেখানে তখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ওই ভিড়ের মধ্যে লক্ষীরাণীকে আবার দেখা গেল ফসিলের মতো শুকিয়ে কাঠ হওয়া হাড় সর্বস্ব শরীরটা নিয়ে উথালি পাথালি করতে।

এরপর থেকেই যেন লক্ষীরাণী ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকল। আগের মতো কোন বিষয়ে কথা বলতেও তেমন আর আগ্রহ পায় না। কালীদাশ বড়ালের নিহত হওয়ার ঘটনায় থাতস্থ হতে লক্ষীরাণীর অনেকদিন লাগল। নিজের জীবনের তাগিদেই আবার সে কৃষ্ণনগরের এমাথা ওমাথা চক্কর দিতে লাগল। যেন কৃষ্ণনগরের সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছে। জীবনে কালীদাশের মৃত্যুর মতো অনেক কিছুই মেনে নিতে হয় এমনটাই নিজেকে প্রবোদ দিল লক্ষীরাণী। হিমালয় সমান জটিল জীবনের বোঝাগুলোকে ইঁদুরের মতো ছোট্ট হৃদয়টার মেনে নেয়াই বুঝিবা জীবনের নিয়তি? দশমহলের অভিজাত হিন্দু পরিবারের একমাত্র সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা বর্তমান সময়ের লক্ষীরাণীর পরিচয় যে শুধুই একজন ভিক্ষুক। অথচ এক সময়ে তার বাবা রমেশ বসু ছিলেন শুধু কৃষ্ণনগর কেন গোটা দশমহল সমাজের মাথা। ধীরেন বিশ্বাসের বাবা নিরোদ বিশ্বাসের সঙ্গে তার বাবার জমিজমার মামলায় হেরে পরিবারসহ দেশত্যাগ করার পর লক্ষীরাণীর জীবন কেমন রাতারাতি পাল্টে গেল। দশমহলের জমিদার কন্যা থেকে একেবারে কৃষ্ণনগরের পথের ভিখারি। বাবার মৃত্যু, কলকাতায় রেললাইনের বস্তির জীবন, মা-মামাদের ফেলে বারো বছরের মাথায় আবারো কৃষ্ণনগরে তার প্রত্যাবর্তন, আবার সেই নিরোদ বিশ্বাসের ছেলে ধীরেন বিশ্বাসের দয়ায় ভিখারির মতো বাপের ভিটায় কুঁড়েঘরে ঠাঁই। কতো বিচিত্র জীবন যে লক্ষীরাণী বয়ে বেড়াচ্ছে, যা জীবন চক্রের কোন নিয়তির অনিবার্য ফলাফল? এক জীবনের এই ছোট্ট মাথায় কোন ভাবেই লক্ষীরাণী সময় আর জীবনের অমন গোলক ধাধার জবাব পায় না। তাই দুঃখ আর শোক ভুলে রক্ষীরাণীকে আবরো স্বাভাবিক হতে হয়। কৃষ্ণনগরের এমাথা ওমাথা চক্কর দিতে হয় নিরর্থক জীবন রহস্যের আসল অর্থ উদ্ধার করতে।

ওদিকে লক্ষীরাণীর বাবা রমেশ বসুর সঙ্গে দীর্ঘ কুঁড়ি বছরে জমিজমা নিয়ে যার সঙ্গে মামলা চলল, সেই নিরোদ বিশ্বাসের একমাত্র ছেলে ধীরেন বিশ্বাসের তো উত্তরাধিকার সূত্রে মামলায় জেতা জমিজমা নিয়ে পরলোকি বাবা নিরোদ বিশ্বাসের চেয়েও দাপটে থাকার কথা। তাঁর একমাত্র কন্যা শিখার উচ্চ মাধ্যমিক রেজাল্টের পর, গত তিন দিনে কোথায় গেল তাঁর সেই চণ্ডাল জমিদারি? কৃষ্ণনগরের আরো অনেকের মতো চিতলমারী কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের দিকে ভিখারি লক্ষীরাণীর বা কেন এতো আগ্রহ যা খুব গোপনে সে লালন করছে? ধীরেন বিশ্বাসের মেয়ে শিখার পরীক্ষার রেজাল্টের সাথে লক্ষীরাণীর কীসের সম্পর্ক? শিখার রেজাল্ট যা হবার তাই হল। সারা গ্রামে তখন গুজবের আকারে একটা কথাই শুধু ছড়াল যেÑ পরিমল ছেড়ির মাথাডা খাইছে।

পরীক্ষার আগে পরিমলের সঙ্গে শিখার প্রেমঘটিত সম্পর্ক নিয়ে সারাগ্রামে একবার কানাঘুষা হয়েছিল, যে ধীরেন বিশ্বাসের মেয়ে এবার চমৎকার রেজাল্ট করবে। তা যে এমন জঘন্য চমৎকার হবে তাকি কৃষ্ণনগরের কেউ জানতো? শিখার রেজাল্টে বার সাবজেক্টের মধ্যে মাত্র তিনটাতে পাস। তাও মাত্র ৩৪, ৩৭ আর ৩৯ নম্বর। হঠাৎ শহরে বিদ্যুৎ চলে গেলে যেমন কারখানার চাকাগুলো মুহূর্তে আটকে যায় তেমনি পুরো কৃষ্ণনগর যেন শিখার অমন জঘন্য রেজাল্টে কিছুটা হলেও ধমকে গেল। অথচ দুবছর ধরে চিতলমারী কলেজে প্রথম বিভাগের জন্য যার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হতো, সে নামটা ছিল ধীরেন বিশ্বাসের একমাত্র কন্যা শ্রীমতি শিখা রাণী বিশ্বাসের। আর যাকে নিয়ে ধীরেন বিশ্বাসের চেয়েও বেশি গর্ব করতো ওই রমেশ বসুর মেয়ে লক্ষীরাণী। এমন কি এডভোকেট কালীদাশ বড়ালকে পর্যন্ত আগ মাড়িয়ে সে বলে রেখেছিলÑ ধীরেনের মেয়েটার ঢাকায় পড়াশুনার ব্যবস্থা করবি, মেয়েটার মাথা ভালো। যে মেয়ের ক্লাস ফাইভ ও এইটে ট্যালেন্টপুলে স্কলারশিপ, ম্যাট্রিকে পাঁচ বিষয়ে লেটারসহ আটশর কাছাকাছি নম্বর, তার উচ্চ মাধ্যমিক ফলাফল এতো জঘন্য হবে, তা শিখার নিজেরও কি বিশ্বাসে ছিল? অমন খবর পাওয়ার পরে রহস্যময় নিরাবতায় তাই আবারো লক্ষীরাণী তার জীর্ন কুঁড়েঘরে শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিল।

মানুষের ওপর বিশ্বাসগুলো কেন এভাবে উল্টোপাল্টা হয়ে যায় লক্ষীরাণী তা কিছুতেই বুঝতে পারে না। মানুষ কেন বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না? মানুষের বিশ্বাস থাকে কোথায় আর কেনই বা তারা তা বারবার হারায়ে ফেলে? লক্ষীরাণী নিজের মনকে বুঝাতে পারে না শিখা এমন রেজাল্ট কেমনে করে? যাকে সে পরীক্ষার আগে টানা তিন মাস মনীন্দ্র মাস্টারের বাড়ি থেকে বিশ্বাস বাড়ি পর্যন্ত সারাটা পথ এগিয়ে দিয়েছে, একাকি পথে শিখার যাতে কোন অসুবিধা না হয়। শিখার তখনকার মনের আসল খবর লক্ষীরাণী জানবে কীভাবে? অথবা আসলেই শিখা তখন কি করে বেড়াতো? মনীন্দ্র মাস্টারের বাড়িতে শিখার প্রাইভেট পড়ার খবর লক্ষীরাণী বিশ্বাস করতো। কিন্তু কলেজ থেকে মনীন্দ্র মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত শিখা কার সঙ্গে আসতো শুনি? পরিমল আর শিখা মনীন্দ্র মাস্টারের বাড়িতে পড়ার নামে তখন আসলে কী করে বেড়াতো, যে অমন ভালো ছাত্রীর এতো জঘন্য রেজাল্ট? লক্ষীরাণী কিছুতেই এসব প্রশ্নের জবাব মিলাতে পারে না। যে পরিমলের ব্যাপারে লক্ষীরাণী নিজে থেকেই শিখাকে আগেই সাবধান করে দিয়েছিলÑ ‘ছ্যাড়াডার তিন হাত দূরে থাকবি। ওর কতা জানি কেমুন!’ শিখা সেই পরিমলের মধ্যে কী অমন গুপ্তধন আবিষ্কার করল, যে পরীক্ষার প্রস্তুতির চেয়েও তার সঙ্গে মাখামাখিটা বেশি জরুরি হয়ে পরল? লক্ষীরাণী শিখার রেজাল্ট শুনে তাই নিজেকেই গুটিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত তো নিতেই পারে।

এখন কি শিখাও তার নিজের জীবনের কোন হিসাব মিলাতে পারছে? যে পরিমলকে অন্য দশটা ছেলের থেকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে সে। সেই পরিমল তপাদার শিখাকে জড়িয়ে দশ গ্রামে যতো উপকথা, ব্যঙ্গ-রসিকতার কোন প্রতিবাদ তো করলই না, উল্টো সবার কাছে সেই গুজব কথাকে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ দিয়ে রাতের অন্ধকারে অনেকটা ছিঁচকা ছাকা চোরার মতো পালাল। লক্ষীরাণীর কথা মনে রাখলে কী শিখার আজ সারাগ্রামে সবার কাছে এতো উপহাসের পাত্রী হতে হতো? পরিমলকে এখন কী বলতে পারে শিখা? কাপুরুষ? কেবল এই একটা মাত্র শব্দই ব্রেক কশা কোন দ্রুতগামী দশটনি ট্রাকের মতো শিখার গলা বেয়ে ওষ্ঠ পর্যন্ত এসে হঠাৎ আবার আটকে গেল। এতটুকু সাহস নিয়ে কুঁড়িটা বসন্ত পার করে শিখাকে মুগ্ধ করার পেছনে পরিমলের ভেতরে যে ভয়ঙ্কর ভীতু’র হাতছানি ছিল, তা জানলে কী শিখা অমন কুলাঙ্গার ছেলের প্রেমে ধরা দেয়।

প্রেম না ছাই। সামাজে মুখ তুলে কথা বলার স্পর্ধা যার ধমনিতে নেই, সে আবার কেমন প্রেমিক? শিখার মনে পড়ে- ধীরাজ চট্রোপাধ্যায়ের ‘যখন পুলিশ ছিলা’ম বইটার লেনদেন নিয়ে পরিমলের সাথে তার সখ্যের শুরু। পুরুষ জাতির কলঙ্ক মোছার দায়ভার পরিমল নিজের কাঁধে নিয়ে কৃষ্ণনগরের এ যুগের মাথিন শিখাকে ভালোবাসার যে চ্যালেঞ্জ সেদিন শিখার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল, তার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে নিজের অজান্তে শিখার মনে মাথিন হবার যে বাসনা চেপেছিল, যার অনিবার্য ফল পরিমলকে শিখার ভালোবাসা। অথচ পরিমল যে ধীরাজদেরই বংশজাত, পুরুষ জাতির অন্য এক উত্তরাধিকার, তা যেমন সেদিন শিখার টিনেজ বয়সের কুসুমকমল উড়–নচন্ডি হাওয়াই মনে আমলে আসেনি, তেমনি মাথিনের ভাগ্যের চিরায়ত বাস্তবতা যে একদিন নিজেকেও এমন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে, তা কি শিখা জানত? তাই আজ নিজেকেই সবচেয়ে বেশি অপরাধী মনে হয় শিখার। কাকে কাপুরুষ বলবে শিখা? দোষ তো তারই। নইলে মাত্র এক বছর চার মাসের লাই পাওয়া সম্পর্কে কেনবা পরিমলের শয্যাসঙ্গী হতে যাবে সে? কেনবা বাবার দশমুখে এমন কলঙ্ক লাগাবে? কেনবা সুন্দর পৃথিবীর সব মায়া ভুলে নিজেকে শেষ করে দেয়ার ইচ্ছা জাগবে শিখার মনে? সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো কেন ওই ইচ্ছাটা বারবার তার পারানটারে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে? কোন কিছুই ভালো লাগে না কেন শিখার? শিখা কী এখন নিজের প্রতিই নিজে খুব বিরক্ত? লক্ষীরাণীর কাছেও কি কোন ধরণের পরামর্শ করার মতো এখন আর তার সেই সোনামুখটা নেই? শিখা কী তবে আত্মহননের পথ বেছে নেবে? কী এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে যে শিখা নিজেকে শেষ করে দিতে চায়?

এই সময়ে শিখা যার সাথে এ বিষয়ে নিশ্চিন্তে পরামর্শ করতে পারতো সেই লক্ষীরাণী বা কেন গত তিনদিনে বিশ্বাস বাড়িতে আসে না? নাকী লক্ষী পিসিও শিখার প্রতি ভীষণ অভিমান করেছে? যার ভালো রেজাল্টের প্রত্যাশায় লক্ষী পিসি পরীক্ষার দিনগুলোতে সারাদিন ভগবানের নামে উপোস থাকলো, তাকে শিখা কীভাবে কোন মুখে এখন কাছে ডাকে? শিখা কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দ্রোহী হয়ে ওঠে। মানুষ কী শেষ আশ্রয়স্থল হারালে শিখার মতো বিদ্রোহ দেখাতে শুরু করে? নাকী পৃথিবীর মায়াজালের বন্ধনে একবার জড়ালে সহজে আর মুক্তির উপায় নেই? হতাশা আর বিদ্রুপ মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়? শিখা আজ কীসের মধ্যে বাঁচার উৎসাহ অনুসন্ধান করছে? বাবা ধীরেন বিশ্বাসকে বা আজ সে কী বলতে উদ্যত? মা তুলসী রানীকে কেন সে রেজাল্টের পর থেকে আর সহ্য করতে পারছে না? বিনিদ্র সারারাত জেগে জেগে শিখা কীসের সন্ধান করেছে? আজ কী সে কোন একটা রহস্যের উন্মোচন বা সমাপ্তি চায়? শিখা নিজে কী ভাবছে এখন?

না। মাথিনের মতো নিজিরি শেষ করতি পারি না আমি। আমার ভিতরি যে বড়ো হোচ্ছে, তার তো কোন দোষ নেই। তাকে হত্যা করার কোন অধিকার তো আমার নেই। কিসির সমাজ? কিসির এতো কানাকানি? আমারে নিয়ি এতো কতা কিসির? আমি শিখা। আমার প্রবাহ আমার অহংকার। আমার উপস্থিতি না থাকলি কিসির সমাজ? কিসির সংসার? আমারে নিয়িই তো সংসার, সমাজ। না, আমি মরবো না। এ সমাজ মাথা ঠুকি মরলিও আমার কিছু যায় আসে না। আমি এ সামাজরে আজ দ্যাখফো। এ সামাজের আদালতি আমিও এক অভিন্ন সত্তা। না, আমি মরতি পারি না। বাঁচতি হবে। আমাকে বাঁচতি হবে। আমার আমিকেও বাঁচাতি হবে। আমি যে নতুন ভগবানের মা। আমি যে স্রষ্টা। আমি কেন মরতি যাবো? এমন অসংখ্য যুক্তি পাল্টা যুক্তির মহড়া শিখার মনের মধ্যে সারা রাত খেলে যায়। অতঃপর সাজ সকালে প্রকাশ্যেই মা-বাবার সামনে শিখা ঘোষণা করল- হ্যা, পরিমলের সন্তান আমার পেটে। তাতে কী অইছে?

সকাল বেলা এমন দৃঢ়কণ্ঠে শিখার বিদ্রোহী ঘোষণায় বাবা হিসেবে ধীরেন বিশ্বাসের চিন্তিত হবারই কথা। কিন্তু ধীরেন বিশ্বাস মেয়ের অমন উদ্ভট ঘোষণায় যতোটা না চমকিত, তার চেয়ে বেশি বিস্মিত আজ তিনদিনে লক্ষ্মীরাণীকে এ পাড়ার কোথাও না দেখে। তাহলে কী শিখার ঘটনা শোনার পর লক্ষ্মী পণ করেছে আর বিশ্বাস বাড়িতে আসবে না? মধ্যরাতে বাঁশবাড়িয়ার হাট করে মধুমতী ঘাটে কোন নাও না পেলে হতভাগ্য হাটুরে যাত্রীরা যেমন দিশাহারা হয়ে যায়, তেমনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় ধীরেন বিশ্বাসের ফ্যাসফেসে কণ্ঠ থেকে এক অস্ফুট শব্দ বের হয় । হায় ভগবান! আমি এ্যাহোন কোতায় যাই?

অথচ দেশ বিভাগের পর যে কয়েক ঘর হিন্দু পরিবার কলকাতা না গিয়ে পূর্ববঙ্গেই থেকে যাবার দৃঢ়তা দেখাল, তার মধ্যে লক্ষ্মীর বাবা রমেশ চন্দ্র বসু ছিলেন অন্যতম। যেমন ছিল তাঁর অঢেল প্রভাব প্রতিপত্তি, তেমনি ছিল তাঁর অনেকটা বৃটিশ রাজপরিবারের মতো আভিজাত্যের বড়াই। কৃষ্ণভক্ত লোকটা গ্রামের সকল ধর্মের মানুষকেই খুব আপন ভাবতেন। নিজের খরচে বছরে অন্তত একবার হলেও বাড়িতে পদাবলী কীর্তন দিতেন। প্রতিবছরই তাঁর নেতৃত্বে কৃষ্ণনগরের কৃষ্ণভক্তরা ওরাকান্দি যেতো। ওরাকান্দি থেকে ফেরার পর তাঁর বাড়িতে বসতো টানা তিনদিনের রামায়ণ পালা। ধীরেন বিশ্বাসের স্পষ্ট মনে পড়ে, শেষ যেবার লক্ষ্মীদের বাড়িতি রামায়ণ শুনতি গ্যালাম, কীভাবে পালিয়ে গ্যাছিলাম। বাবা শুনলি হাত-পা ভেঙে গুড়ো করি দেবে, সে ভয় থাকার পরেও গ্যাছিলাম। চাদর মুড়ি দিয়ে মুখ ঢাকলেও সেদিন রমেশ বাবু ঠিকই ধীরেন বিশ্বাসকে চিনেছিলেন। রমেশ বাবু মেয়ে লক্ষ্মীরে ডেকে বল্লেন- দ্যাখচিস কিছু? ওই যে ওটা নিরোদ বিশ্বাসের পোলা না? লক্ষ্মী আমার দিকি একবার চাইয়ে সোজা রান্ন্াঘরে গেল। লক্ষ্মীর বাবা যতোই ধীরেন বিশ্বাসের কাছাকাছি আসতে লাগল, ধীরেন বিশ্বাস ততোই চাদরে নিজেকে লুকানোর বৃথা চেষ্টা করলেন। পুলিশ যেমন দাগী আসামি নাগালে পেলে রসিকতা করার সুযোগ দেয়না, তেমনি রমেশ বাবু পুরুষালী হাতের ঔদ্ধত্য তাগড়া মুঠিতে খপ করে ধীরেন বিশ্বাসের ডানাটা ধরে ফেলেন। সাপে ব্যাঙ ধরলে ব্যাঙের যেমন দশা হয় তারচেয়েও ভয়ঙ্কর দশা তখন ধীরেন বিশ্বাসের। কারণ জমিজমার মামলা নিয়ে রমেশ বাবু’র সঙ্গে তার বাবা নিরোদ বিশ্বাসের তখন ছিল প্রকাশ্যে শক্রতা। এক্কেবারে ষাঁড়ে-মহিষি লড়াই। নিরোদ বিশ্বাসের ছেলে ধীরেন বিশ্বাস শুধু এই পরিচয়টুকুই তার মুণ্ডুপাতির জন্যে তখন যথেষ্ট। উপস্থিত রামায়ণ শ্রোতাদের প্রায় সকলেও জানে ধীরেন বিশ্বাসের বাবা আর রমেশ বাবুর সর্ম্পক কেমন সুতায় বাঁধা। মেঘনাদকে হাতের মুঠোয় পেয়ে স্বয়ং ভগবান রাম যেখানে রাবনপুত্র ইন্দ্রজিৎকে ক্ষমা করেনি, সেখানে নিরোদ বিশ্বাসের ছেলে ধীরেন বিশ্বাসকে কী রমেশ বাবুর ছেড়ে দেবার কথা? অথচ সবাইকে অবাক করে ধীরেন বিশ্বাসকে বিস্ময়ের সাত সমুদ্রে ভাসায়ে লক্ষ্মীর বাবা রমেশ বাবু সেদিন অত্যন্ত করুণ কণ্ঠে বল্লেন- ধীরেন না? আসো, আসো বাবা, দুইটা ডাল-ভাত খাবে। তোমার বাবায় তো আসবে না জানি, তোমার ঠাকুর মায় তো আসতি পারত?

অথচ যার বাবার কাছে মামলায় হেরে মনের কষ্টে কৃষ্ণভক্ত রমেশ বাবু দেশ ছাড়লেন। কলকাতার শিয়ালদাহ রেল স্টেশানে এক প্রকার উদ্বাস্তু জীবন যাপনেও যাঁর কোন পিছুটান থাকল না। এমন কি বছর না ঘুরতে যে লোকটা রেলে একটা পা পর্যন্ত হারালেন। আর পরবর্তীতে কৃষ্ণনগরের নাম শুনলে যাঁর চোখে আগুন বৃষ্টি ঝরত। সেই লোকটা মাত্র তিন বছরের মধ্যেই কেমন রহস্যজনক ভাবেই পরলোকে চলে গেলেন। কী এমন দুঃখ পেয়েছিলেন রমেশ বাবু যার কারণে তাঁর দেশ ছাড়তে হলো? অভিজাত হিন্দু পরিবারের সকল অহংকার জলাঞ্জলি দিয়ে কলকাতায় কেন তাঁকে বস্তির জীবন বেছে নিতে হলো? নিরোদ বিশ্বাসের সঙ্গে যে জমিজমা নিয়ে তাঁর মামলা তা তো শুধু মামলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। সামাজিক নানান কর্মকান্ডের একই অনুষ্ঠানে তাঁদের দুজনকে তো তবু মাঝেমধ্যে হঠাৎ একত্রে পাওয়া যেতো। সরাসরি হয়তো কথা হতো না। দুজন দুজনকে এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু কখনো কেউ তো কারো সঙ্গে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। অথচ মামলার রায় রমেশ বাবুর বিপক্ষে গেলে হঠাৎ করে কৃষ্ণভক্ত লোকটা কেন এভাবে পাল্টে গেলেন? কী রহস্যময় কারণে রমেশ বাবু এভাবে পাল্টে গেলেন? আর কলকাতা চলে যাবার পর তাঁর সামনে যে অনেক দুঃখ আর সীমাহীন দুর্ভোগের হাতছানি তাতো জেনে শুনেই তিনি গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু নিয়ে দশমহলের সবাই যা জেনেছে তা কতোটুকু বিশ্বাসযোগ্য? কী ঘটেছিল রমেশ বাবুর শেষ দিনগুলোতে? তিনি কী তবে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন, যা লক্ষীরাণী বা তার কাছের কেউ কখনো স্বীকার করে না? কী ঘটেছিল রমেশ বসুুর মৃত্যুর সময়ে?

রমেশ বসুর মৃত্যু গোটা দশমহলে একটা রহস্য হয়েই থাকল। কেউ ওই বিষয়টা নিয়ে আর যেনো ইচ্ছে করেই আগাতে চাইল না। অনেকটা ইংল্যান্ডের ডা. জন কেলীর মৃত্যু রহস্যের মতো। ডা. জন কেলী কী সুইসাইট করেছিলেন নাকি তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল? তা যেমন টনি ব্লেয়ারের বৃটিশ সরকার এবং মার্কিন মদদপুষ্ট বৃটিশ গোয়েন্দা বিভাগ বিশ্ব দরবারে বুশের চক্রান্তে ইচ্ছে করেই রহস্যাবৃত রাখল, তেমনি কলকাতায় রমেশ বসুর মৃত্যু বিষয়টাও আজো পুরো দশমহলে রহস্য হয়েই থাকল। লক্ষীরাণীকেও এখন আর কেউ তার বাবার মৃত্যুর বিষয়ে কোন কথা জিজ্ঞাসা করে না। কারণ ওই বিষয়ে লক্ষীরাণীও খাসেরহাটের বুড়ো তালগাছটার মতো রহস্যময় নিরবতা পালন করে শুধু ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে।

অনেকে অবশ্য রমেশ বসুর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি বলে নানা কথা বলেন। কেউ বলেনÑ রেলে ঝাঁপ দিয়েই বেচারা আত্মহত্যা করেছেন। কেউ বলেনÑ লক্ষ্মী পালিয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসলে রমেশ বসু পাগল হয়ে যায় এবং শহর বাসের নিচে চাপা পড়ে মরেছেন। কেউ বলেনÑ লক্ষ্মীই তার বাপকে ভাতের সাথে বিষ মিশিয়ে খাইয়েছে, যাতে সে কৃষ্ণনগরে এসে ধীরেন বিশ্বাসকে বিয়ে করতে পারে। কারণ রমেশ বসু জীবিত থাকতে নিরোদ বিশ্বাসের মতো চিরশত্র“র ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে যে কোনদিনই হওয়া সম্ভব নয়। হয়তো লক্ষ্মীরাণী ওরকম কিছু একটা করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে পারে। এ বিষয়ে লক্ষ্মীরাণী প্রথম দিকে যা বলত তা কী সত্যি?

Ñ রেলে পা কাঁটার পর থাইকা বাবার মুখের কথা বন্ধ। যে রাতে আমারা ভারতে যাই, সেই রাত থাইকাই বাবায় অবশ্য কথা কম কইতো। ক্ষণেক্ষণে একা একা শুধু প্রলাপ বকতোÑ ‘নাই, নাই, দ্যাশে বিচার নাই। আবার কহনো কইতোÑ ‘সব অমানুষ। ঠাকুর আমায় লইয়া যাও, গো।’ সেদিন আছিল শনিবার। আমি গ্যাছি ধর্মতলায় কম দামের চাল কেনতে। লোম্বা লাইন। ভাদ্দোর মাসের খরায় আড়াই ঘন্টা খারাই থাইকা ট্যাবিলের কাছে যাওয়ার পর, ওপাশ থাইকা ঘোষণা আইলÑ ‘আজকের মত চাল বিক্রি বন্ধ। আপনারা অযথা ভিড় করবেন না। আমাদেরকে হিসাব মিলাইতে দিন।’ অগত্যা চাল ছাড়াই ধর্মতলা থাইকা পায় হাঁইটা আইসা দ্যাখি, মোগো খুপরি ঘরের সামনে ব্যাবাক জটলা। মায়ের আথালি-পাথালি কাঁন্দন। লোক ঠেইলা ভিতরে ঢুইক্কা দ্যাহি- বাবায় অজ্ঞান হইয়া পাইরা আছে। বাবার গায়ে আছিল হরে-কৃষ্ণ হরে-রাম লেহা গেরুয়া ধুতি। পরে মাইনসে হেইসহ বাবায়রে শ্মশানে নেয়।

রমেশ বসুর পরলোকে যাবার খবর লক্ষীরাণী কৃষ্ণনগরে আসার অনেক আগেই গোটা দশমহলের মানুষ জানল। কিন্তু রমেশ বসুর পরিবার ভারতে যাবার পর নিরোদ বিশ্বাস কি পেরেছেন মামলায় জেতা জমির ষোলো আনা ভোগ করতে? যে জমির মামলায় বিগত কয়েক পুরুষের বসু আর বিশ্বাস গোষ্ঠীর সুগভীর সম্পর্কে মাত্র কুঁড়ি বছরের মধ্যে চিতা জ্বলল, সেই জমির ভোগদখল নিরোদ বিশ্বাস পুরোপুরি পেতে না পেতে সাত বছরের মধ্যে তো তারও চিতায় যাবার খবর আসল। পুত্রবধূর হাতে ইলিশ-পোলাউ খাবার কতো শখ ছিল লোকটার। দশমহলে কম করে হলেও বারোটা মেয়ে যাচাই করেছেন নিরোদ বিশ্বাস। সেই শখ কি তাঁর পূরণ হয়েছিল? মামলায় জিতে রমেশ বসুর অনুকরণে বাড়িতে অনেক খরচ করে কীর্তন দিয়ে কতো জনকে খাওয়াতে পেরেছিলেন নিরোদ বিশ্বাস? আত্মীয়স্বজন ছাড়া দশমহলের কেউ তো গেল না সেই গান শুনতে। আদালতের রায় বুঝলাম নিরোদ বিশ্বাসের পক্ষে গেছে। তাই বলে কৃষ্ণনগরের মানুষ কি নিরোদ বিশ্বাসকে জমির মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে? নইলে এতো জমিজমা, এতো সম্পত্তি, এতো আধিপত্যের পরেও পুরো দশমহলের একটা মেয়েকে কেন পুত্রবধূ করতে পারলেন না নিরোদ বিশ্বাস? নিরোধ বিশ্বাসের মৃত্যুর পরেই তাই ধীরেন বিশ্বাসকে বিয়ে করতে হলো এই আশায় যে, কখন আবার তার মায়েরও ওপার থেকে ডাক আসে। আর তুলসীর সঙ্গে বিয়ের পর বছর না ঘুরতেই জন্ম হয় শিখার। তুলসীকে এক কন্যা শিখাকে মানুষ করতে কেনবা এতো কাঠখড় পোড়াতে হয়? হাতের কাজটা করার জন্য কেন তাকে এতো মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হয়?

কিন্তু কৃষ্ণনগরের মানুষগুলো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে আজব রহস্যময় প্রাণী। কখন যে তাদের মতিগতি কোন দিকে যায় তা হয়তো স্বয়ং ভগবানের পক্ষেও ঠাওর করা কঠিন। শিখা যতোই বড়ো হতে লাগল, ততোই মা তুলসীর দুঃখ লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুচতে লাগল। বাবা ধীরেন বিশ্বাসকেও কৃষ্ণনগরের সবাই নিরোদ বিশ্বাসের মতো সমাজের সকল কাজে ডাকতে শুরু করল। দশমহলের মানুষ বিশ্বাস আর বসুদের মধুবৃক্ষ প্রতারণা বিষের মতো কলহটা ধীরে ধীরে ভুলে গেল। কিন্তু বারো বছরের মাথায় আবার যখন লক্ষীরাণী কৃষ্ণনগরে এসে উঠল, তখন কেন আবার পুরনো হিসাবটা পাল্টে যেতে থাকলো? মানুষ আসলে মানুষের কী কী দেখতে পছন্দ করে? কী কী না দেখলে মানুষের ভালো লাগে না?

অথচ কতো কিছুই তো হতে পারতো। নিরোদ বিশ্বাসের সঙ্গে রমেশ বসুর জমিজমা নিয়ে মামলা না থাকলে, ধীরেন বিশ্বাসের সঙ্গেই হয়তো লক্ষ্মীরাণী বসুর বিয়ে হতে পারতো। এমনকি পুরো দশমহলে লক্ষ্মীর যোগ্যপাত্র হিসাব করলে যে কাউকেই তো ওই ধীরেন বিশ্বাসের সঙ্গেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হতো। তাছাড়া মেয়ের যাকেই পছন্দ তাকেই যে রমেশ বসু জামাই বানাবেন- তা তো বাবা-মেয়ের সম্পর্ক দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। আর যে রাতে ধীরেন বিশ্বাস রামায়ণ শুনতে গিয়ে রমেশ বসুর বাড়িতে অনেকটা জামাই আদরে ভাত খেতে বাধ্য হলেন, তখন ধীরেন বিশ্বাসকে খাবার পরিবেশনের সময় লক্ষ্মীকে অতিমাত্রায় যতœশীল হতে যাঁরা দেখেছেন, সেই দৃশ্যের খোটা কী ধীরেন বিশ্বাস অস্বীকার করতে পারবেন?

সম্ভব হোক আর না হোক, বারো বছরের মাথায় লক্ষ্মীরাণী যখন আবার কৃষ্ণনগরে এসে উঠল, তখন ওই ধীরেন বিশ্বাস ছাড়া তো দশমহলের আর কোন প্রাণী লক্ষ্মীরাণীকে একটু আশ্রয় পর্যন্ত দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসলো না। সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া কোন জাহাজের বন্দরের নিশানা পাওয়ার মতো বাপের ভিটায় অন্তত একটা কুঁড়েঘর লক্ষ্মীরাণীর জন্য তখন কম কিসে? যে কিনা শপথ করেই বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলÑ প্রয়োজনে ভিক্ষা কইরা খামু, তবু বাপের ভিটায় ঠাঁই আমার চাই। তাই একে যারা ধীরেন বিশ্বাসের দয়া বলে মানেন, তেমনি লক্ষ্মীরাণীর মনের জোর যে মোটেও কম নয়, তা বলার জন্য অন্যপক্ষের দাবি কি উড়িয়ে দেবার মতো?

উড়িয়ে দেবার মতো আরও অনেক কথা আছে। এই যেমন লক্ষ্মীরাণী যদি ধীরেন বিশ্বাসকে বিয়ে করার উদ্দেশ্য নিয়েই মা-মামাদের সঙ্গে বিবাদ করে, বাপটাকে খুন করে ওভাবে একাকী যাযাবরের মতো বাংলাদেশে ফেরত আসে। তখন কি তার জানার কথা যে, গত বারো বছরে বাংলাদেশের কী কী পরিবর্তন হয়েছে? ধীরেন বিশ্বাসের বা এতোদিনে কী হয়েছে? গোটা দশমহলের বা ওই বারো বছরে কি কি পরিবর্তন হয়েছে? একা লক্ষীরাণীর পক্ষে তখন কোন কোন খবর জানার সাধ্য হয়েছিল? লক্ষ্মীরা যখন ভারতে যায়, তখন বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের অংশ, অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান। আইউব খানের সামরিক শাসনে দিকভ্রষ্ট পূর্ববঙ্গের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তখন ভীষণ হুমকির মুখে। গোটা দশমহলের হিন্দুরা তখন ভয়ংকর আতঙ্কের মধ্যে বিকল্প কোন উপায় না দেখে একাট্টা হয়ে জোট পাকাল। এডভোকেট কালীদাশ বড়ালের বাবা নগেন্দ্র নাথ বড়াল, মনীন্দ্র মাস্টার, রেবতী বসু, রমেশ বিশ্বাস, কালীদাশ বৌদ্ধ, ডা. সুধীর মন্ডল, মহেন্দ্র নাথ মন্ডল, কানাইলাল মন্ডল, ডা. শিবচন্দ্র হীরা, যোগেশ হালদার, চিত্তরঞ্জন বসু, অনন্ত মজুমদার, প্রভাস মজুমদার, মনীন্দ্রনাথ মজুমদার, জওহরলাল হালদার, নিতাই বিশ্বাস, ধীরেন বিশ্বাসের বাবা নিরোদ বিশ্বাস এবং আরো অনেক গন্যমান্য হিন্দু সমাজপতিরা সেদিন দশমহলে অশোকদের বিশাল উঠোনে মিটিং করলেন। এই বঙ্গে টিকে থাকতে হলে প্রতিরোধের কোন বিকল্প নেই। যদি মুসলমানেরা সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাতে হিন্দুদের উপর কোন ধরণের আক্রমন চালায়, তাহলে হিন্দুরাও তাদেরকে জান থাকতে ছেড়ে দেবেন না। তবে হিন্দুরা আগ মাড়িয়ে মুসলমানদের কখনোই আক্রমন করবে না। সবাই ঘরে ঘরে ঢাল সড়কি, ল্যাজা, রামদা নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রইল। সেই সময়ে গোটা দশমহলের হিন্দুরা আত্মরক্ষার্থে যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল, যার খবর মুসলমানেরাও সহসাই পেয়ে যায়।

মুসলমান সমাজপতিরাও একটা মিটিং বসালেন সাত্তার চেয়ারম্যান সাহেবের উঠোনে। চেয়ারম্যান আবদুস সাত্তার, নূর মোহাম্মদ মোল্লা, পাঁচু মিঞা, অধ্যাপক রেজাউল করিম, জয়নাল আবেদীন হাওলাদার, আবদুর রাজ্জাক, দীন মোহাম্মদ, আবুল কাসেম, মুন্সী ঝিল্লুর রহমান, গোলাম সরোয়ার, আলাউদ্দিন মাস্টারসহ অনেকে সেই মিটিংয়ে সেদিন হিন্দু-মুসলমান স¤প্রীতির পক্ষে কথা বললেন। দশমহলের বাইরে বানিয়ারী, দীঘিরজান, হরিপাগলা, বরইবুনিয়া, মাটিভাঙ্গা, ভাইজোড়া, খাসেরহাট, উমাজুরী, কালিগঞ্জ, আমতলীসহ নাজিরপুর আর চিতলমারী থানার ওই অঞ্চলে সেদিন সা¤প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমান সমাজপতিদের স¤প্রীতির উদ্যোগ আর পারস্পরিক দায়বদ্ধতার কারণে। নইলে পিরোজপুর এবং বাগেরহাট মহকুমার অনেক গ্রামে সেদিন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা লেগেছিল। যেমন কুমারখালী, গজালিয়া, রঘুনাথপুর, বাইনকাঠী, কাঁঠালিয়া, বুইচাকাঠী, রুহিতলাবুনিয়া, চালতাবাড়ি, শাঁখারীকাঠী, শ্রীরামকাঠী, ঘোষখালী, দীর্ঘা, সাচিয়া, মালিখালী, দেউলবাড়ি দোবড়া, বাইশারী, বানড়িপাড়া, স্বরূপকাঠী, জলাবাড়িসহ গোটা দক্ষিণবঙ্গে সেদিন স্বার্থান্বেসী মুসলমানেরা অনেক হিন্দুর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, জোড় করে তাঁদের বাড়িঘর দখল করেছে, ধন সম্পদ লুট করেছে, এমনকি কুমারী হিন্দু মেয়েদের জোর করে উঠিয়ে নিয়েছে, ধর্ষণ করেছে, মুসলিম ধর্ম গ্রহণে বলপূর্বক বাধ্য করেছে। গোটা দক্ষিণাঞ্চলে সেদিন হিন্দু-মুসলমান যে দাঙ্গা শুরু হয়ে গিয়েছিল, দশমহল আর এর আশেপাশের কয়েকটা গ্রামে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল কেবলমাত্র ওইসব অকুতোভয় হিন্দু-মুসলিম সমাজপতিদের পারস্পারিক সমঝোতা আর মহানুভবতায়।

পঁয়ষট্টি সালের পাক-ভারত যুদ্ধ গোটা দশমহল ও তার আশেপাশের দশ গ্রামের হাজার হাজার হিন্দু মুসলিম পরিবারকে যেন সবার উপরে মানুষ সত্যের চিরায়ত বাণীকে আবারো প্রতিষ্ঠা করালো। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বুঝি মানুষকে মানুষ আথবা পশু হিসেবে চেনার কৌশল শিখিয়ে দেয়? লক্ষীরাণীর বাবা রমেশ বসু তখন দেশে থাকলে তিনিও যে একই বিষয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। যা গোটা দশমহলের সবাই আজ বিশ্বাস করবেন। তারপর ছয় বছরের মাথায় সারা বাংলায় দীর্ঘ নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ গেল। পুরো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গোটা দশমহল ছিল পুরোপুরি অনেকটা হিন্দুদের সংরক্ষিত এলাকার মতো। বিছিন্ন কয়েকটা ঘটনা ছ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29087890 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29087890 2010-01-29 15:58:36
বিদ্রোহ ।। গল্প ।। রেজা ঘটক বিদ্রোহ রেজা ঘটক
মধুমতি নদী থেকে উঠে আসা বড়খালের জোয়ার ভাটার পানিতে সাঁতার কাটার সময় ওরা এক আলাদা জগত তৈরি করে। ওরা প্রায় সবাই কিশোর বয়সের। তবে ভালো সাঁতার জানা ছোটদের কেউ কেউও ওই খেলায় খেলার সুযোগ পায়। দেখলে মনে হবে ওরা বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দদায়ক ওই খেলা খেলছে। আর সে খেলায় ওরাই সবচেয়ে সেরা। এই খেলায় অন্যসব খেলার মতো কোন সুনির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে সীমিত নয়। সংখ্যাটি এখানে উন্মুক্ত। যে কেউ যখন খুশি তখন এই খেলায় অংশ নিতে পারে অন্যদেরকে শুধু আনুষ্ঠানিক একটা জানান দিয়ে। সাঁতার কাটার সময় হলেই এই খেলায় ওরা মেতে ওঠে। কবে কখন কোথায় এই খেলা প্রথম চালু হয়েছিল তার কোন ইতিহাস যদিও বা কেউ বলতে পারে না। তবে পৃথিবীর যাদেরই জলের পাশাপাশি বসবাস তারা প্রায় সবাই বলতে গেলে অমন সব জলখেলা খেলে অভ্যস্থ। কারণ এই খেলায় কোন সরঞ্জাম লাগে না। শুধু সাঁতার জানলেই চলে। দলনেতা নির্বাচনটাও হয় ঝটপট। দলের কোন একজন স্বেচ্ছায় খালপাড় থেকে একটু মাঝখানে গিয়েই নিজেকে নেতা হিসেবে ঘোষণা দেয়। নেতার প্রস্তুতি শেষে রেডি ওয়ান টু থ্রি বলার পর অন্যরা তার উদ্দেশ্যে ছুট লাগায়। এই খেলায় জলের উপরে মাথা থাকা অবস্থায় যে প্রথম নেতার মাথা ছুঁয়ে দিতে পারবে সে-ই হবে পরবর্তী টার্গেট ম্যান বা পরবর্তী নেতা । জলের নিচে মাথা ছুঁয়ে দিলে বা জোড় করে নেতাকে আটকে রাখলে তাকে ওই খেলা থেকে পরবর্তী নেতা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বহিস্কার করা হয়। নতুন নেতা নির্বাচিত হলে বহিস্কার হওয়া খেলোয়ার আবারো এই খেলায় অংশ নিতে পারে। আর তার উপরে আগের নিষেধাজ্ঞা অটোমেটিক উঠে যায়।
সাধারণত দুপুর বারোটায় এই খেলা সবচেয়ে বেশি জমে। কারণ তখন খেলোয়ারের সংখ্যা থাকে অনেক বেশি। বেশি খেলোয়ারকে তে কতো বেশি সময় ধরে খাটাতে পারল, তা দিয়েই এই খেলায় নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ব যাচাই করা হয়। এমনিতে কেউ একজন স্বেচ্ছায় প্রথমে নিজেকে নেতা ঘোষণা দেয়। অন্য কারো আপত্তি না থাকলে তাকে দিয়েই খেলা শুরু হয়। আর যদি প্রথম নেতা হবার জন্য একাধিক আগ্রহী খেলোয়াড় থাকে তখন ওরা টস করে নেতা নির্বাচন করে। নেতা নির্বাচন শেষেই শুরু হয় খেলা। যদি কেউ কোনদিন প্রথম বারের মতো স্বেচ্ছায় নেতা নির্বাচিত হতে না চায়, তাহলে অন্যরা সবাই মনে মনে ধরে নেয়Ñ হয়তো আগের রাতে সে মাওলানা সাহেবের সাথে ঘুমিয়েছিল। আর যে-ই মাওলানা সাহেবের সাথে রাতে ঘুমায় পরের দিন সে নেতা হওয়া তো দূরের কথা রহস্যময় কোনো কারণে জলেই নামে না। মাওলান সাহেবের সাথে ঘুমানোর পরের দিন সে বরং নিজেকে এই আনন্দদায়ক খেলা থেকে স্বেচ্ছায় নিবৃত রাখে। আর তীরে বসে অন্যদের কেবল উৎসাহ যোগায়। তাছাড়া এই খেলায় জোড়জবরদস্তি করে কাউকে নেতা বানানোর নিয়মও নেই।

ধীরে ধীরে হোস্টেলের প্রায় সবাই মাওলানা সাহেবের মধ্যরাতের আলো আঁধারি শরীরি পাঠে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু দিনের বেলায় ওসব নিয়ে রা করার মতো দুঃসাহস দেখায় না কেউ। ভিতরে ভিতরে সবাই মাওলানাকে সায়েস্তা করার ইচ্ছা পোষণ করলেও ছাত্রদের প্রায় প্রত্যেকেই মনে করে বিষয়টা সম্ভবত অন্য কারো বেলায় হয়তো ঘটে না। পাছে অন্যদের কাছে নিজের ইজ্জত বিষয়ক গোপন খবর রাষ্ট্র হয়ে যায় আর ইমেজ সংকটের বারোটা বাজে। আর তখন মাদ্রাসা ত্যাগ না করে কি উপায় আছে? ফলে ভিন্ন ভিন্ন রাতে ভিন্ন ভিন্ন ছাত্রের সাথে মাওলানা সাহেবের মধ্যরাতের ওইসব ব্যাপার স্যাপার আসলে ধামাচাপাই থাকে। সেই সুযোগে গহরডাঙ্গা এবতেদিয়া মাদ্রাসার রেসিডেন্সিরাল পরিচালক মাওলানা কুতুব উদ্দীন বরং দুপুরের খানাপিনা সেরে নাকে তেল দিয়ে আরামছে ঘুমান। ভুক্তভোগীরা সেই সুযোগ হাতছাড়া করে কিভাবে? এমনিতে ফজরের আজানের পর থেকেই কঠোর সব নিয়ম কানুনের মধ্যে কখন দুপুর গরিয়ে যায়। এরপর ঘন্টা খানেকের একটা বিরতি। ওই সময়টা খেলাধূলা আর সাঁতারে সবাই ব্যস্ত হয়ে পরে। তারপর যোহরের আযান, নামাজ, দুপুরের খাবার। একেবারে টাইট সিডিউল।
ফলে লান্সের পর একটু না ঘুমালে সন্ধ্যায় পড়ার আসরে যাদের চোখ ঢুলু ঢুলু, তাদের মধ্যে কোন একজনের ওই রাতে মাওলানা সাহেবের সঙ্গে ঘুমানোর নিয়ম। দুপুরে খাবারের পর আছরের আযান পর্যন্ত যারা না ঘুমিয়ে দুষ্টামি বা অন্য কোন কাজে ব্যস্ত থাকে, তারা কেউ আজ পর্যন্ত মাওলানা সাহেবের চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি। আশ্চর্য জাদুর কৌশলে মাওলানা কুতুব উদ্দিন সেই সব ছাত্রদের চট করেই বাছাই করতে পারেন। লম্বা চিকন কাঁচা বেতের দু-চার ঘা পরলেই না ঘুমানোর কারণটাও বেরিয়ে যায় দ্রুত। তারপর রাতের খাবার পর্যন্ত তাদের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ার নিয়ম। পড়া না পারলে আবার বাড়তি শাস্তি তো আছেই। কোন কোন দিন এমন হয় যে, শাস্তির মাত্রা তীব্র হলে ওইসব ছাত্ররা ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত করতে পারে না। আর তখন ø্রেেহর পরশে মাওলানা সেই ছাত্রটিকে ওইরাতে নিজের সঙ্গে ঘুমানোর প্রস্তাব করেন। ওই প্রস্তাবে আজ প্রর্যন্ত যারাই দ্বিমত পোষণ করেছে তারা বরং আরো ভয়ংকর শাস্তিও পেয়েছে। শেষ পর্যন্ত ওই সব ছাত্রের কারো পইে আর মাওলানা সাহেবের সহশয্যা এড়ানো খুবই কঠিন ব্যাপার।

তাই ভিতরে ভিতরে মাওলানা সাহেবের ওপর হোস্টেলের প্রায় সকল ছাত্রেরই একটা কমোন ােভ কেবল বিস্ফোরণের অপোয় ছিল। যে করেই হোক মাওলানাকে একটা কঠিন শিা দেওয়া চাই। ােভ ধীরে ধীরে বিােভে রূপ না নিয়ে কৌশলের দিকে গড়াল। ওরা আবিষ্কার করল যে মাওলানা সাহেব দিনের বেলায় অনেকটা মরার মতো পরে পরে ঘুমান। পাশাপাশি ভয়ংকর রকম নাক ডাকেন। কৌশল আর কুশলীদের যৌথ প্রযোজনায় ঠা ঠা রোদের কাঁঠালপাকা গরমের মধ্যেও ওরা আমগাছের ডালে এক এক করে সবাই জড়ো হয়। যেন আজ এই মাদ্রাসায় মাওলানা কুতুবউদ্দীন ছাড়া কোন ছাত্রেরই কোন ভাবেই দুপুরের ঘুম আসে না। ঘটনা সরাসরি দেখতে পাওয়ার আনন্দটাই বুঝি আলাদা। পূর্ব পরিকল্পনা মতো রমজান আর সুলতান বিড়ালের মতো নিঃশব্দে হেঁটে হেঁটে ঘুমন্ত মাওলানা কুতুবউদ্দিনের পায়ের কাছে গিয়ে বসে। অন্যরা কেউবা তখন বাইরের জানালায়। কেউবা তখন আম গাছে। কেউবা তখন মাঠ এবং রাস্তায় সতর্ক পাহারা দিচ্ছে। যাতে মাওলানা সাহেবের কাছে কেউ আসলে ওরা নিরাপদে কেটে পরতে পারে। পাক্কা ট্রেনিংপ্রাপ্ত সৈনিকদের মতো ওরা সবাই সবার ইসারা আর কৌশল চটপট বুঝিবা বুঝতে পারে। দীর্ঘ দিন যেনো ওরা সবাই এই লাইনে কঠোর আর কঠিন সব অনুশীলন রপ্ত করেছে। সবাই যেনো এক এক জন গেরিলা। এক এক জন বিপ্লবী কমরেড।

এক নাম্বার নাইলনের বারো নম্বর সুতা। সুতা দিয়ে ফাঁস বানানোর কাজে রমজানরা প্রায় সবাই ওস্তাদ। দ হাতে মাওলানা সাহেবকে ওরা ফাঁসের টোপে বেঁধে চুপচাপ বাইরে এসে আমগাছের তলায় অপো করতে থাকে।

অপো খুবই অসহ্য ব্যাপার। কারো কারো মাথায় হঠাৎ বুদ্ধি চাপল, আযান হতে পারে এক নম্বর মহা ওষুধ। এই একটা বিষয়ে ওরা মাওলানা সাহেবকে খাঁটি মাবুদের বান্দা মানে। যতো বেহুসের মতোই মাওলানা ঘুমাক না কেন, আযানের সুর শোনা মাত্র তাঁর ঘুম ভাঙবেই। বেলালের আযান শুনেই মাওলানা কুতুব উদ্দিন সাহেব পাশ ফিরে শরীরের আলস্য ছাড়ানোর চেষ্টা করেন। অমনি মাওলানার লিঙ্গে সুতার টান পরে। ঘুমের ঘোরে ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে মাওলানা উঠে বসার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেন না । লিঙ্গ তার কঠিন ভাবে বাঁধা পরেছে। ছাড়ানোর চেষ্টা করলে নিশ্চিত ওটা দ্বিখন্ডিত হবে।

বাইরে আমগাছে আর মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে তখন আনন্দের উৎসব বয়ে যায়। আজ যেন রমজানদের উৎসব করার দিন। আজ অন্তত মাওলানার ওপর একটা যুতসই বদলা নেওয়া গেছে। উৎসব আর হৈ হুল্লোর দেখে প্রতিবেশীদের ভীড় বাড়ার আগেই ওরা যে যার মতো মাদ্রাসা সীমানা ছেড়ে পালায়....
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29075890 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29075890 2010-01-10 20:04:44
বাদলধারা অথবা জললীলা ।। রেজা ঘটক বাদলধারা অথবা জললীলা

সা...
আমি ঠিক জানি নাÑ উপন্যাস নিয়ে আলোচনা লিখতে কি কি লিখতে হয়? কী কী আলোচনা করতে হয়? কীভাবে কীভাবে করতে হয়? আমার স্বল্প পাঠ অভিজ্ঞতার বিপরীতে উপন্যাস বিষয়ে আলোচনা লেখাটা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। আমি যখন কোন উপন্যাস পড়ি, তখন কি কি বিষয় আমার মধ্যে ঘুরপাক খায়Ñ তার আলোকে উপন্যাস পাঠ শেষে আমার মধ্যে কী কী বিষয় নাড়া দেয়Ñ তাই একটু এখানে বলার চেষ্টা করবো। আর উপলক্ষ্য হিসাবে অবশ্যই পঠিত কোন উপন্যাস হওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত। তার আগে বলে রাখিÑ আমি কিন্তু খুবই খুঁতখুঁতে টাইপের লোক। মন্দকে মন্দ এমনকি গালমন্দ পর্যন্ত করি। আর ভালোকে আলোর মতোই প্রকাশ করতে পছন্দ করি। আমি পড়াশোনা করেছি অর্থনীতি বিষয়ে, কিন্তু সাহিত্যের প্রতি ছোটবেলা থেকেই এক ধরনের প্রীতি ছিল। হাতের কাছে যা পেতাম, খুঁটে খুঁটে পড়তাম। আমার আর একটা বদ অভ্যাস হলোÑ সর্বশেষ পঠিত কোন সাহিত্য রচনার চরিত্রগুলোর সাথে আমার আশেপাশের বাস্তবের মানুষগুলোর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলীর মিলÑঅমিলে অনুসন্ধান চালানো। এটা ক্যানো করি? নিজেও জানি না। এবং কিছুদিন গেলে, উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে ভুলতে বসলে, ধীরে ধীরে এই কর্মটিতে আলসেমি আসে। আবার নতুন কোন বই পড়লে, এই ঘোড়ারোগটি আমাকে আবারো সংক্রামকের মতো পেয়ে বসে। আর একটা বিষয় হলোÑ আমি যখন কোন উপন্যাস পড়িÑ মনের অজান্তেই ওই উপন্যাসের ঔপন্যাসিককে শত্র“ বানিয়ে ফেলি। তার সঙ্গে একটা মনযুদ্ধ ঘোষণা করেই আমি তার বইটা পড়তে বসি। দ্যাখি, তুমি আমাকে কতোটা সময় আটকে রাখতে পারো? আমি আসলে তখন নিজের বিরুদ্ধেও একটা যুদ্ধ ঘোষণা করি। যেভাবে হোক পড়া শেষ করতে হবেÑ এমন ইচ্ছাটা শুরুতে খুব থাকে। কিন্তু লেখক যদি আমার সেই ইচ্ছাকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পাঠক হিসাবে আমার তখন কিছুই করার থাকে না। অনেক সময় দুঃখবোধের জন্ম হয়। আমি আসলে একটা বেওকুভ। কোন বই পড়তে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হবার জন্য, আমি তাই ওই লেখকদেরকে পরবর্তীতে এড়িয়ে চলি।

১৯৮৫ সালের জুন-জুলাই মাসে, বর্ষা-মৌসুমে স্কুলে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলছে। তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র আমি। পরের দিন অংক পরীক্ষা। বিকালে এক বন্ধুর বাড়িতে আমরা চারজনে খুব জমিয়ে কেরাম খেলছি। আমার পার্টনার খুব জোড়ে হিট করায় একটা গুটি কোথায় উড়ে গেছেÑ সেটাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি বিছানায় একটা বইÑ ‘দ্য ওল্ড ম্যান এ্যান্ড দ্য সি’ আর্নেস্ট হেমিংওয়ের নোবেল জয়ী উপন্যাস। তারপর গুটি না পাওয়ায় খেলা আর হয়নি। গুটি না পেয়ে বইটি উল্টিয়ে দেখলাম। বন্ধুকে বললামÑ এটা আমি নিয়ে যাচ্ছি। বন্ধু বললÑ একদিনের জন্য হলে নিতে পারিস। অংকে একটু ভালো ছিলাম, তাই একপৃষ্ঠা পড়েই বন্ধুকে জবাব দিলামÑ একদিনও লাগবে না, কাল পেয়ে যাবি। আরো জানতে চাইলামÑ এই বই তুই কোথায় পাইলি? জবাবে বন্ধু তুহিন বললÑ তোরে যে আমি বইটা দিলাম, কেউ জানার আগেই তুই ফেরৎ দিবি। নইলে আপা আমারে খুন কইরা ফ্যালাবে। আপা যে সাহিত্যের ছাত্রী, সেদিন প্রথম বুঝলাম। কারণ ভয়ে কোনদিন জিজ্ঞাসা করা হয়নি। এমনিতে দেখতামÑ আমরা হৈহুল্লোর করে খেলছি। আর কাছাকাছি কোথাও আপা কোন একটা বই নিয়ে খুবই মশগুল। আমরা তখন এর অর্থ বুঝতাম না। কারণ আমরা গল্পের বই পড়তাম অনেকটা লুকিয়ে লুকিয়ে। ক্লাসের পড়া রেখে গল্পের বই পড়ছি, বাড়ির কেউ দেখেছে তোÑ খবর খারাপ। পরের দিন অংক পরীক্ষার হলে হাজির হতে দেড় ঘন্টা লেইট। পরীক্ষা ভুলে আমি তখন সান্টিয়াগোর সাথে বর্হিসমুদ্রে মাছ ধরছিলাম। ভাগ্যিস বৃষ্টি বাদলা ছিল। আবার বর্ষাকালে স্কুলে যাবার পথটাও আমার পৃথিবী ভ্রমণের মতো দীর্ঘ। আমার স্কুল আমাদের বাড়ি থেকে মাইলখানেক পূর্বদিকে। কিন্তু বর্ষাকলে আমাকে পশ্চিম দিকে হাঁটা দিয়ে বড় রাস্তা ধরে পশ্চিম-দক্ষিণ পূর্ব পথে অথবা পশ্চিম-উত্তর-পূর্ব রাউন্ড পথে যেতে হতো। আর হালদার বাড়ির জোড়া কালভার্ট পর্যন্ত পুরো সময়টা মাঠের মধ্যের আমাদের বাড়িটা তখন চোখে পড়তো। সেদিন অবশ্য হাটু পানি মাড়িয়ে সোজা পূর্বের রাস্তায় স্কুলে গিয়াছিলাম। আর দেড় ঘন্টা লেইটের বিপরীতে হেড স্যার অবশ্য লাইব্রেরি কক্ষে বাড়তি আধাঘন্টা দিয়েছিলেন। হয়তো আমি ফার্সবয় বলে! কিন্তু কেউ জানলো না যে, আমার পরীক্ষার হলে দেরিতে পৌঁছানোর সেদিনের একমাত্র কারণ ছিল আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। পরীক্ষা না ছাই, সান্টিয়াগোর মাছ ধরার কৌশল তার চেয়ে অনেক মজার। দীর্ঘ বাইশ বছর পরেও সান্টিয়াগোর কথা দিব্যি মনে আছে। এটায় কিন্তু আমার কোন পাণ্ডিত্য নাই। সবটাই লেখকের যাদু । তার মানে লেখককে আশ্চার্য এক যাদু জানতে হবে। যাদু ভালো না লাগলে পাঠকের কিছুই করার থাকে না।



রে...
বন্ধু সুমন শামস আর আমি দৈনিক সমকালে ঢু মারতেই বন্ধু সৈকত হাবিবের সঙ্গে দ্যাখা। অনেক কথার ফাঁকে সৈকত জানতে চাইলোÑ রাখাল রাহা’র ‘অমাবতী’ উপন্যাসটা পড়েছি কিনা? বললামÑ না। ক্যানো অমাবতীতে কি খই-ছাতু-গুড়-টুর খাওয়ায় নাকি? বইটা পড়ে একটা লেখা দেবার অনুরোধ করলো সৈকত। আমি পড়ে গেলাম মহাবিপদে। বইটা আগে পাঠসূত্রে গিয়ে রাজীব নূরের থেকে সংগ্রহ করতে হবে। তারপর পড়তে হবে। তারপর ওটার ওপর লিখতে হবে। কী ঝামেলারে বাপু! তাছাড়া কয়েকদিন আগে রাজীব নূরের থেকে একটা গল্পের বই নিয়েছি। শর্তছিলো বইটার দাম ৩০% কমিশনে ৬৫টাকা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। আগের পাওনা-ই পরিশোধ হয়নি, এখন কী করে আবার আরেকটা বই চাই? সৈকত বললÑ আমি রাজীবকে বলে দিচ্ছি, তুমি শুধু সংগ্রহ করো। তারপর দেশে জরুরি অবস্থা জারী হলো। অনেক ত্রানের টিন উদ্ধার হলো। অনেক দুর্নীতিবাজ গ্রেফতার হলো। তারা আবার রাজবন্দীর মর্যাদায় দিন কাটাতে লাগলেন। কিন্তু আমার আর বইটি সংগ্রহ করা হয় না। ধানমণ্ডি নদীর তীরে আমরা রোজ আড্ডা দেই। সন্ধ্যার সেই আড্ডায় সত্যজিৎ পোদ্দার বিপু বললোÑ রাখাল রাহা’র অমাবতী পোড়েছেন? জবাবে বলালামÑ না পড়িনি; ক্যানো? বিপু বললোÑ পইরেন, ভালো লাগবে। পাশ থেকে নাহিদ বললোÑ আমি পড়তাছি, ভালো লাগতাছে। শুনে কবি ফিরোজ এহতেশাম বললোÑ তাইলে পড়েন। ভালো লাগলে কইয়েন, আমিও পড়বো। এবার আমি কিছুটা আগ্রহী হয়ে উঠলাম এবং সেই রাতেই রাজীব নূরের থেকে অমাবতী সংগ্রহ করি।

গা...
এমনিতে প্রতিবছর অমাবতীর সময় আমাদের এলাকায় একটা উৎসব হয়। বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলা। বৃষ্টি বাদলায় কারো কোনো কাজ কাম থাকে না। কয়েকটা দিন সবাই উৎসব আনন্দ করে কাটায়। তাই ইচ্ছে করেই বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলা তিন-চারদিন ধরে ড্র রাখা হয়। যখন সবাই আবার যার যার কাজে চলে যাবার খবর দেয়, তখন একদিন নিষ্পত্তি হয় সেই খেলা। আর সেদিন সবাই মিলে বিধান দা’র বাড়িতে খাসী, মোরগ, মাছ, সব্জি সব জড়ো করে আড়ম্বর করে খাওয়া হয়। খেতে খেতে আবার আগামী বছর কিসের বাজীতে খেলা হবে তা নিয়ে সবাই আলোচনা করে। বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলার পরিচালক আমাদের সবার প্রিয় রেফারি মনোজ কাকার কাছে বছরের বাকী সময়টা আমরা শুনিÑ মজার মজার সব ঘটনা। বিতর্কিত কোন কোন গোলে কার কী পরামর্শ ছিলো, কে কে তাকে কী কী বলেছে, ক্যানো বলেছে, এসব। পরের বছর আবারো অমাবতী লাগত। বিতর্কিত গোলে ভূমিকা রাখা পরিচিত সেই মুখগুলোকে আমরা বেমালুম ভুলে যেতাম। আর আবারো জমে ওঠতো বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলা। ছেলেবেলায় দেখা এবং নিজে যখন খেলোয়ার প্রায় প্রত্যেকটি বিয়াতো-অব্বিয়াতো খেলার ফাইনালে আমরা অব্বিয়াতোরাই শেষ পর্যন্ত জিততাম। একবার কি দু’বার মাত্র বিয়াত্বোরা জিতেছে। আমরা যারা ভালো খেলতাম, তারা হয়তো সেদিন বাইরে কোথাও হায়ারে খেলতে গ্যাছি, সেদিন ওরা বিয়াতোরা ষড়যন্ত্র করে, ফাইনাল খেলে ফেলতো আমাদের অবশিষ্ট অব্বিয়াতো দুর্বল টিমের বিরুদ্ধে। ফলে পরের বছর পর্যন্ত আমরা সেই জ্বালা এবং খোটা সহ্য করতাম। আর যারা বিয়াতোদের এই খোঁচা সহ্য করতে পারতো না, তারা উভয়পক্ষকে সাথে নিয়ে বিয়ার কাজটা সেরে, পরের বছর আমাদের বিরুদ্ধেই খেলতে নামতো, ভারি দেমাগের সাথে।

অমাবতী নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের মিথ রয়েছে। বিভিন্ন ধরণের চর্চা এবং আনুষ্ঠানিকতাও রয়েছে। তবে মুসলমানরা দু’একজন শখে পালন করে। আর হিন্দু স¤প্রদায়ের প্রায় সবাই সেটা আনন্দেরই সাথে রীতি হিসাবে পালন করে। অমাবতীর উৎসব আমার ছেলেবেলা থেকেই ভালো লাগতো। আর ভালো ফুটবলার হিসাবে এলাকায় সুনাম থাকায় অব্বিয়াতো দলের অপরিহার্য খেলোয়ার ছিলাম আমি। ফলে অমাবতীর সমস্ত আনন্দ উৎসবে সরাসরি অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা এখনো নাগরিক বর্ষাকালে আমাকে খুব নস্টালজিয়ায় ভোগায়। অতএব, রাখাল রাহা’র ‘অমাবতী’ উপভোগ্য হতে পারে, এমন ভাবনার দোলে দোল খেতে খেতে বইটা পড়া শুরু করলাম। রাখাল রাহা’র সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। কোনো গ্রামোফোন রেকর্ড বা ভাঙা সিডির মতো মোটা কোন বস্তু নিশ্চয়ই তিনি নন। তিনি একজন মানুষ, যার টুটুল নামে একটা ভাই হারিয়ে গেছে। রাখালও আমার মতো অর্থনীতির ছাত্র। কিন্তু অমাবতী লেখার কারণে এভাবে পরিচয় হচ্ছে। ‘কিডা যাচ্ছিস কলপাড়ে? এক বদনা পানি আনে দে তো। অজু করে নামাজ পড়ি’। দুন্দির দাদীর মতো আমি কিন্তু নামাজ পড়িনা। তাই রাখালকে তুলোধুনো করতে চাইলে আমার অজু বানানোরও দরকার নাই। মনে হচ্ছে, অজু ছাড়াই পারবানে। তার আগে গাড়াগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে সর্বরোগের মহৌষধ বিক্রেতা ফকের আলী টিঙটিঙে হ্যালফ্যালে এক লোককে সবার সামনে হাজির করে কি বলে শুনি Ñ‘দ্যাকো রে ভাই দ্যাকো, এর কি হাল দ্যাকো! এর বউ নাঙ না করে কি করবি, কও’? গোল জটলার মধ্যে জাফরও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফকের আলীর সেই তামাশা উপভোগ করছিল। ফকের আলী গলার গামছাটা দিয়ে জাফরকে টানতে টানতে একেবারে আসরের মাঝখানে এনে ফেলেÑ ‘এই দ্যাকেন, ভাইসব! এর নাম হলো শরীল। গাছে মারলি ফিরে আসপি! এ লোকের বউ জীবনে ডানি-বাঁয়ে ঘাস খাবিনে। ঠিক যাগা মতো অট্ করে দাঁড়ায়ে থাকপি। নাকি বেঠিক কলাম ভাই’? অমাবতী নিয়ে লিখতে গিয়ে আমাকেও ফকের আলী না হয়ে উপোয় নেই, ভাই রাখাল!

মা...
কোন একটি উপন্যাসকে যদি সমালোচনার কাঠ গড়ায় বিবেচনা করতে হয়, তাহলে পাঠককে অবশ্যই বই নিয়ে বসতে হয় এবং লেখকের সঙ্গে এক ধরণের যুদ্ধে অবতীর্ন হতে হয়। একটি উপন্যাসকে যেভাবে যেভাবে দেখা সম্ভব, তার বিভিন্ন উপায় এবং একজন ঔপন্যাসিক তার কাজকে যেভাবে যেভাবে দেখতে পারেন, তারও বিভিন্ন উপায়কে বিবেচনায় রাখা উচিত। সেজন্য উপন্যাস আলোচনার জন্য উপন্যাসের বিভিন্ন বিষয়-আশয়কে যেমন, উপন্যাসের কাহিনী কী? উপন্যাসের পাত্রপাত্রী বা মানুষজন কারা? উপন্যাসের মূল কথাবস্তু কী কী? উপন্যাসে কোন অলীক কাহিনীর প্রচ্ছয় আছে কীনা? উপন্যাসে কোন দিব্যিবাণী বা কোন সুনির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি ভবিষ্যৎবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে কীনা? উপন্যাসের আঙ্গিক প্যাটার্ন বা নকশারূপ কেমন? উপন্যাসে বিথোফেনের (ইববঃযড়াবহ)-এর পঞ্চম সিম্ফনির ‘ডিড্ডিডি ডুম’ Ñএর মতো কোন ছন্দরূপ আছে কীনা? কিংবা ৫০ হাজার শব্দের অধিক কোন গদ্য কাহিনীকে উপন্যাস বলবো কিনা? অথবা উপন্যাসের মানবিক মূল্যবোধ এবং সৃজনশীল দ্বন্ধগুলোকে কীভাবে বিবেচনা করা হবে? Ñএমন হাজারো অমিমাংসীত বিষয়ে একজন সমালোচকের উৎকণ্ঠা থাকাটা কী প্রয়োজনীয় নয়? এতোসব বিষয় বিবেচনায় নিতে পারলে হয়তো সুনির্দিষ্ট উপন্যাসটি সম্পর্কে একটি অনুমান নির্ভর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু উপন্যাসের চারিত্রগুলোকে নিয়ে উপহাস করা, ধূমপান করা অথবা রসিকতার নামে নির্যাতন করা সম্ভবত প্রত্যাখান করা উচিত। সেক্ষেত্রে অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে উপন্যাসের উপর আক্রমণ চালানো হবে কীভাবে? সেক্ষেত্রে আমরা সবাই কিন্তু শাহেরজাদীর স্বামীর মতোই নিষ্ঠুর। এরপর কী ঘটবে? সে সম্পর্কে বাদশাহ’র [পাঠকের] মনে অসীম উৎকণ্ঠা জাগাতে না পারলে, শাহেরজাদীর নিশ্চিত মৃত্যু। সেখানে শাহেরজাদী যেভাবে ঘটনার অতি সুক্ষ্ম বর্ণনা দেন, যেমন তীক্ষ্ম তার বিচারবুদ্ধি, ঘটনার পর ঘটনা তৈরির তার যে অসীম উদ্ভাবনী ক্ষমতা, যেমন তার অনন্য নীতিবোধ, চরিত্র নির্মাণে তার কুলশতা, প্রাচ্যের তিনটি রাজধানী সম্পর্কে যে গভীর জ্ঞান প্রদর্শনের মাধ্যমে কাহিনী বর্ণনা করতেন, তেমনি লেখককে অবশ্যই শাহেরজাদীর মতো কুশলী এবং দক্ষ হতে হবে। নইলে সূর্য ওঠা পর্যন্ত বাদশাহ অপেক্ষা করতে পারেন কিন্তু পাঠক হয়তো অপেক্ষা না করে, বইটি রেখে ঘুমিয়ে যাবে অন্য কোন স্বপ্নভ্রম রচনা করতে। অর্থাৎ পাঠককে একই সঙ্গে উৎকণ্ঠার মধ্যে যেমন রাখতে হবে, তেমনি পাঠকের কৌতূহল ব্যবহার করার আদিম সেই ক্ষমতা লেখকের মধ্যে থাকতে হবে। সেদিক দিয়ে কাহিনী বর্ণনায় রাখাল ততোটা পটু না হলেও এক ধরনের আরোপিত কৌতুহলে তিনি পাঠককে তীর মারেন।

মানুষের জীবনের অসংখ্য বিষয় থেকে যদি আমরা মাত্র পাঁচটি বিষয়কে বিবেচনা করিÑ জন্ম, খাদ্য, নিদ্রা, ভালোবাসা এবং মৃত্যু। এবং এই পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে নিজেদেরকে একবার প্রশ্ন করি যেÑ এসব বিষয়ে আমাদের জীবনে কি কি ভূমিকা রয়েছে? এবং পাশাপাশি উপন্যাসে এই বিষয়গুলোর ভূমিকা ক্যামন? তাহলে হয়তো উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্যে আমরা আসলে কীসের অনুসন্ধান চালাই, তা অনেকটা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। কোন উপন্যাসের কোন চরিত্র দুষ্ট প্রকৃতির হওয়ার পরেও যদি পাঠকের কাছে তা আনন্দদায়ক হয়, তাহলে তাকে আমরা কীভাবে বিচার করিÑ তাও আমাদের মনে রাখা দরকার। কাকে আমরা উপন্যাসের শক্তি বলবো? হয়তো একগুচ্ছ মানুষ এবং একগুচ্ছ নানারকম জিনিস বা উপাদান, যেগুলো কিন্তু মানুষ নয়, মানুষের প্রয়োজন মেটায় এমন একগুচ্ছ জিনিসÑ এই দুই গুচ্ছকে ঔপন্যাসিক হয়তো উপন্যাসের শক্তি হিসাবে ব্যবহার করেন। কিন্তু একজন ভালো ঔপন্যাসিক শব্দের পর শব্দ বসিয়ে এমন একটা খেলা খেলেন যে, এই শক্তিগুচ্ছ শব্দের মায়াজালে ফিতাকৃমির মতো জড়াতে থাকে। আর তখন কে কতো ভেলকি দ্যাখাতে পারলো, কোথায় কোথায় উৎকণ্ঠা? কোথায় কোথায় কীভাবে গল্পটি বুনট সৃষ্টি করলো, কতো শৈল্পিকভাবে তা করলো, কতোটা মুগ্ধতার সাথে পাঠক গিলবে? কী কী ঢং থাকবে ইত্যাদি বিষয়গুলো হয়তো ঔপন্যাসিকদের মাথায় রাখতে হয়। এতোকিছুর পরেও যদি আসল কাজটা না হয়, তখন পাঠক হয়তো প্রত্যাখ্যান করবে সেই লেখা। একজন ভালো ঔপন্যাসিক গুচ্ছ গুচ্ছ বিষয় এবং ঘটনাকে চরিত্রগুলোর দাবী অনুযায়ী সুন্নিবদ্ধ করেন। রাখাল যে কাজটি করেছেনÑ তাতে অনেক কিছুই আছে আবার কী যেন নাই। সেই কী টা যে আসলে কি, তা হয়তো আমিও জানি না। হয়তো সেই কী’ এর সন্ধানেই আমি পুরো অমাবতী পড়েছি। কিন্তু সেই কী’র সন্ধান না পেয়ে বড়োই হতাশ হয়েছি। রাখাল হয়তো জানেন কোন কী’ আমি অমাবতীতে খুঁজেছি এবং ক্যানো আমি কিছু লিখতে বসলে আগে কাগজ কলম নেই, তারপর হয়তো একটা সিগারেট ধরাই, তারপর দেখা গেল কলমটা কোন ঝামেলা করছে, বা যা লিখতে চেয়েছিলাম, সে বিষয়ে তখন আর ইচ্ছার তীব্রতাটা আগের মতো নেই, বা যদি থাকে ফটাফট কিছুক্ষণ হয়তো লিখলামÑ এবার হয়তো কি হচ্ছে একটু চেঁকে দ্যাখার জন্য যেই পড়তে শুরু করলামÑ ওমা, এ কার লেখা? তখন মনে হয় এ লেখা কখনোই আমার হতে পারে না। কলমটি নিশ্চয়ই অন্য কোন অপরিচিত লোকের হাতে ছিল। হতেই পারে না এমন করে লিখবো আমি। তখন অনেক লেখাই বাতিল হয়ে যায়। আগে আমি খুব লিখতাম। যা মনে আসতো, যেভাবে আসতো, সেভাবে তা লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করতাম। দেখা গেল একই দিনে হয়তো তিনটা গল্প লিখে ফেল্লাম। রাজীব নূর আমাকে থামালো। বললো ধীরে রেজা, আরো ধীরে লেখো। একমাসে একটা গল্প লেখো। তিনমাসে একটা লিখলে আরো ভালো। রাজীব নূরের পরামর্শটি আমাকে ভিতরে ভিতরে মারাত্মক ফল দিচ্ছে। এখন আমার মাথায় গল্প আসলে, গল্পের চরিত্রগুলোকে নিয়ে অনেক সময় নিয়েই আমি খেলা করি। তবে এর একটা খারাপ দিকও আছে। হয়তো খেলতে খেলতে এক সময় গল্পটা কিছুই না বলে কোথাও চলে গেল। কোথায় চলে গেল গল্পটা? কেনই বা চলে গেল? তখন হাজারো চেষ্টা করেও আর তাকে ফেরানো যায় না। আমি পারিনা। যারা এই কাজটা পারেন, তারা মহান। সত্যি কথা বলতে কি, অমাবতীকে আমি উপন্যাস হিসাবে স্বীকার করতে চাই না। যদি স্বীকার করি, সাহিত্যের বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের কোপানলে তখন না জানি একদিন আমাকে পুণ্ডুপাত করতে হয়। ভাই রাখাল, সেই রিক্স আমি নিতে পারবো না। উপন্যাসকে আমি যেভাবে বুঝি, তার সঙ্গে পৃথিবীর দ্বিতীয় কোন মানুষের বোঝার অমিল থাকতে পারে। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু উপন্যাস বলতে আমি যাকে বুঝি, তা অমাবতী পুরোপুরি রক্ষা করেনি। একে কি বড়ো গল্প বলবো? তখন আবার গল্পের প্রয়োজনীয় রসদ, মাল মশলার সাথে অমাবতী কি কি মিটমাট করতে সমর্থÑ তা বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে। তবে অমাবতী অবশ্যই পাঁচালী এবং সেটা গদ্যে লেখা। উপন্যাসের মধ্যে একটা না শোনা গানের সুমিষ্ট সুর থাকবে। ফিরে ফিরে বাঁকে বাঁকে, পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সেই না শোনা গানটির সুমধুর সুরটি কেবল খুঁজি আমি। সেই সুরের চলার পথ উপন্যাসে যারা সৃষ্টি করতে পারেন, হয়তো তাদের লেখাটি পাঠকের কাছে ততো বেশি আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে।

আজকাল আমাদের মধ্যে একটা প্রবণতা মারাত্মক সংক্রামকের মতো ছড়াচ্ছে। কয়েক পৃষ্ঠা লিখে, কয়েকটা এনজিও বা সাহিত্য পাতার সম্পাদকদের মনতুষ্টি করে, জুতসই একজন প্রকাশক ম্যানেজ করে, একুশের বইমেলা উপলক্ষে একটা বই বের করা। আর হাটে ঘাটে, বাজারে, কাগজে, আড্ডায় সবখানে কিছু পছন্দের দালাল লেলিয়ে দেয়া। এরা শর্তহীনভাবে সেই লেখকের পক্ষে ঢোল পেটাতে থাকে। মুড়ির টিনের ঢোল। বেসুরা ঢোল যাকে বলে। তাদের বক্তব্য অমুকের ওই বইটা যা হয়েছে না। এক ধরনের মিডিয়াবাজি আর কি। অর্থাৎ ঠাপ দিয়ে হলেও পাঠক ঠকাও। যতোখুশি ঠাপাও। যতোখুশি ঠকাও। সাহিত্যের মধ্যেও আমলাগিরি আছে। একশ্রেণীর নয়া ঠাপনেওয়ালীরা সেই আমলাগিরি চালু করেছেন। তারা দালালদের মাধ্যমে পাঠক ঠাপিয়ে বেড়ান। আপনি যদি সত্যিকারের পাঠক হয়ে থাকেন, উল্টো তাদের ঠাপিয়ে দেন। আর আমার কাছে এসে বলুনÑ নগদ পুরষ্কার দেবো। নতুবা নতুন ঠাপ শিখিয়ে দেবো। রাখাল রাহা’র সঙ্গে আমি আড্ডা দিতে চাই। অমাবতী লেখার আগে রাখাল কী কী ভাবতো? কীভাবে কীভাবে ভাবতো? সেই ভাবনাগুলো নিজের ইচ্ছার সাথে মিলিয়ে অমাবতীতে সেভাবে উঠে এসেছে কীনাÑ তা আমার জানতে ইচ্ছা করবে। অমাবতী লেখার সময় কলমটি কি রাখাল রাহা’র হাতে ছিল? নাকি অপরিচিত অন্য কারো হাতে? রাখালের নিজের কী মনে হয়? এসব বিষয়ে আমার জানাতে ইচ্ছা করবে। আবার হয়তো কিছুই জানার আগ্রহ নাও জাগতে পারে।

অমাবতী বের হয়েছে পাঠসূত্র থেকে। পাঠসূত্রের এবারের বইগুলো চমৎকার। গেটআপ, মেকআপ, বাইন্ডিং, প্রচ্ছদ, বইয়ের সাইজ, কাগজের রং, পৃষ্ঠা নিদর্শনী চিহ্ন, বইয়ের পেছনের পাতায় মজার মজার সব বিজ্ঞাপনÑ সবকিছু মিলিয়ে সুন্দর গোছানো প্রডাকশন। অমাবতীর প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী মিস্ত্রী। প্রচ্ছদের ডানাওয়ালা মায়াবী পরীটা কোথায় উড়ে যাচ্ছে? সে কী কেঁচো রাজার সাত রানীর কোনো রানী? নাকি সেই অদৃশ্য সুর করনেওয়ালী, যে কিনা উপন্যাসের মধ্যে উৎকণ্ঠার চোরাগলি ধরে কেবলই হারিয়ে যাওয়া পথে চলতে থাকে? কে সে? আমি জানি না। অমাবতীতে পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৬। ইনার এবং কভার বাদ দিলে মূল লেখা ৮৭ পৃষ্ঠা। গড়ে পূর্ণপৃষ্ঠায় ৩২ থেকে ৩৩ লাইন, আর প্রত্যেক লাইনে গড়ে ৮ থেকে ১২ শব্দের কাঠামো। গোটা অমাবতীতে মোট ১৩টি পর্ব বা অধ্যায়। অমাবতীর ইংরেজি করা হয়েছে ‘ঞযব এড়ফফবংং ড়ভ গড়হংড়ড়হ’- যার অর্থ দাঁড়ায় ‘বৃষ্টির দেবী’। প্রচ্ছদে হয়তো সেই দেবীকে তুলে ধরা হয়েছে। অমাবতী’র মূল্য ধরা হয়েছে একশ টাকা আর প্রকাশকাল ফাল্গুন ১৪১৩, ফেব্র“য়ারি ২০০৭। নির্বাহী প্রকাশক রাজীব নূর, পাঠসূত্র। আর অমাবতীকে যদি উপন্যাসিকা বা ক্ষুদ্র উপন্যাস বলতে চাই তাহলে ‘ঞযব এড়ফফবংং ড়ভ গড়হংড়ড়হ সধু নব ধ হড়াবষবঃঃব যিরপয ঢ়ৎড়ারফব ঃযব ংঃড়ৎু ড়ভ সধৎমরহধষ ঢ়বড়ঢ়ষব রহ ঃযব বিংঃবৎহ ৎবমরড়হ ড়ভ ইধহমষধফবংয বংঢ়বপরধষষু ড়হ ষড়পধষ ষধহমঁধমব নু জধশযধষ জধযধ ঃযধঃ ঢ়ঁনষরংযবফ রহ চধঃযংঁঃৎড়, উযধশধ ড়হ ঋবনৎঁধৎু ২০০৭. ওঝইঘ : ৯৮৪-৩০০-০০০১৩৭-ই.


পা...
অর্থনৈতিক কর্মদিবসকে আমরা যদি দুই ভাগে ভাগ করি, যেমন- কার্যকর কর্মদিবস আর অকার্যকর কর্মদিবস। তাহলে কার্যকর কর্মদিবসের বিপরীতে অবশ্যই মজুরি প্রাপ্তির বিষয় থাকবে। আর অকার্যকর কর্মদিবসে মজুরি নাই বা মজুরি অপ্রাপ্তির ব্যাপার থাকবে। কৃষকদের মধ্যে যারা শ্রম বিক্রি করেন (কৃষিজীবী শ্রমিক), তাদের অধিকাংশরা বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ছদ্ম বেকারত্ব বা মৌসুমী বেকারত্বের শিকার হন। এদের মধ্যে অনেকে তখন পেশা বদল করেন। কেউ বা দূরের অন্য কোন অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমের চাষীদের সন্ধানে বের হয়Ñ বেকারত্ব ঘোচাতে। কারণ এই মানুষগুলো বোকা। এই মানুষগুলো সহজ, সরল। এই মানুষগুলো অশিক্ষিত। এই মানুষগুলো অনেকটাই মৌলিক। এই মানুষগুলো কোন ধরনের জটিলতা বোঝেন না। এই মানুষগুলো প্রকৃতির মতোই স্বচ্ছ। পুঁজিবাদ সমর্থনপুষ্ঠ পুঁজিবাদের দালালদের পরিকল্পিত শ্রেণী বৈষম্য বিদ্যমান রাখার কৌশলগুলো, ওইসব সহজ, সরল, বোকা, অশিক্ষিত, স্বচ্ছ এবং মৌলিক মানুষগুলো কখনোই বুঝে উঠতে পারেন না। তাই এই মানুষগুলো পৃথিবীর সকল দেশেই এভাবে একই পদ্ধতির ভেতর একই ধরনের বা ভিন্নভিন ধরনের গ্যারাকলে আবদ্ধ থাকছে। আবার এই মানুষগুলো আশ্চার্যজনকভাবে বঞ্চিত থেকেও যেনোবা খুব খুশি। এতেই যেনো তাদের অনেক শান্তি। আবার এই মানুষগুলো বর্তমান কালের চেয়ে পরকালের ওপর মানসিকভাবে যেনোবা বেশি নির্ভরশীল। এই মানুষগুলো ভীতু এবং খোদা, ভগবান, গড বা ঈশ্বরে খুবই বিশ্বাসী। অর্থাৎ এই মানুষগুলো বাস্তবের চেয়ে ধর্ম সমর্থিত পরকালের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির প্রতি বেশি আস্থাশীল।

অতএব, এই মানুষগুলোকে ঠকানো তো খুবই সোজা। সেই সোজা কাজটি পুঁজিবাদের পক্ষের লোকগুলো কম শ্রম ব্যয় করে, মেধা আর পুঁজির কৌশলে যুগ যুগ ধরে করে আসছেন। তাদের কৌশলটিও খুব সোজা। শুধুমাত্র পরিশ্রম আর শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে হঠাৎ দু’চারজন শ্রমজীবী হয়তো কখনো পুঁজির দেখা পায়। কিন্তু ধনবানদের যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, তার সাথে সুসম্পর্ক এবং গোপন সম্পর্ক স্থাপন করতে না পারলে, তারাও শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব হারিয়ে ছিটকে পড়তে বাধ্য হয়। আর এই রেসে যে বা যারা টিকে থাকে, ওই গোষ্ঠী এবং তাদের স্ট্রং নেটওয়ার্ক তখন তাকে বা তাদেরকেও দলের বা একই ফোরামের সদস্য হিসাবে মেনে নেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুঁজিবান লোকের সংখ্যা শ্রমবান মানুষগুলোর চেয়ে কমই থাকে। তবুও এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য গরীব, অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও এখনো বিদ্যমান। তাই পৃথিবীব্যাপী এখন একটাই যুদ্ধÑ সম্পদ বন্টনের যুদ্ধ। এখানে পক্ষমাত্র দুটোÑ পুঁজি আছে বা পুঁজিপুষ্ট পুঁজিপতি পক্ষ। আর সম্পদ নাই বা পুঁজি বঞ্চিত শ্রমবান বিপক্ষ। এই পক্ষ ও বিপক্ষ দলদুটো পৃথিবীর সকল দেশে সকল সমাজে, গোত্রে বর্ণে, গোষ্ঠীতে এখনো বিদ্যমান। তেমনি এক পুঁজিবঞ্চিত দুর্বল পক্ষের চরিত্র ‘জাফর’ অমাবতীর কার্যত প্রধান চরিত্র। যদিও তা কেবল আমাবতীর আঙ্গিক পুষ্টতা, কলেবর বৃদ্ধি আর ছোট ছোট নানা ঘটনায় একটু যা ধরা পড়ে।

‘অমাবতী’ রাখাল রাহা’র প্রথম প্রচেস্টা। রাখাল রাহা’র গল্পটি যদিওবা ঝিনাইদহ এলাকার গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক শ্রেণীর দৈনন্দিন জীবন গাঁথাকে কেন্দ্র করে মাত্র একদিনের গল্প। গল্পটি হয়তো বুধবার সকালে শুরু হয় আর শেষ হয় বৃহস্পতিবার বিকালে। যখন দুন্দি বিষ খায় আর সেই ভীড়ের মধ্যে জাফরের অনিশ্চিত চলে যাওয়ার মধ্যে শেষ হয়। কিন্তু বাস্তবে এই গল্পটি, এই গল্পের চরিত্রগুলোÑ পৃথিবীর অনেক দেশে এখনো এভাবেই আছে। রাখাল গল্প হিসাবে আমাবতীর জন্য যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বেছে নেন, তা আঞ্চলিকতা ছাড়িয়ে সারাবিশ্বের বঞ্চিত শ্রেণী গোষ্ঠীর বিদ্যমান বেদনাগুলোকে যেনো স্মরণ করিয়ে দেয়। এই মানুষগুলো কেমন অল্প পেয়েও কতো সুখী। রাখাল সেই সব সুখী মানুষদের বঞ্চনা এবং জীবনযাত্রার যে সরলতা, খাঁটিত্ব, একেবারে শিকরের মানুষগুলোর ভাষা ব্যবহারের যে প্রাকৃতিক ধরন ও বৈশিষ্ট্যাবলী, অসংখ্য বৈচিত্রময় চরিত্রের সমাহারে অমাবতীতে তুলে ধরেন, তা এক কথায় চমৎকার।

ধা...
আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহে কৃষকরা যে আহ্নিক শাস্ত্র পালন করেন, যাকে আমরা অমাবতী বলি, তা আসলে প্রকৃতির বর্ষা মৌসুমের অনেকদিনের একটা রেকর্ডেড ফলাফল। অমাবতীতে দুন্দি, দুধবুড়ি, গুড়মুড়ি ও ফুটফুটির দাদী তথা ইকারুলের নানীর জবানীতে আমরা প্রথম অমাবতী পাই। আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহে কেঁচো রাজার সাত রানী তাদের বাপের বাড়ি থেকে স্বামী কেঁচো রাজার কাছে কীভাবে ফিরে আসেন, তা আমরা বুড়িমার কাছে শুনতে পাই। স্বামীর বাড়িতে ফেরার সময় সাত রানী যে কান্নাকাটি করেÑ তাই আষাঢ়ের ঢল বা বাদল হয়ে টানা সাতদিন ঝরতে থাকেÑ যাকে আমাদের গ্রামীণ চাষীরা অমাবতীর মিথ হিসাবে মানেন। তাইতো অমাবতীর সাতদিনে গৃহস্থ ঘরের কোনো কর্তা বা কর্ত্রী ঝারের বাঁশ কাটে না, গাঙের মাছ মারে না, গরু-ছাগল বিক্রি করে না, হাঁস-মুরগি জবাই করে না, মাঁচার থেকে ধান চাল পাড়ে না, ঘরের ঝুল ঝাড়ে না, কাউকে কিছু ধার দেয় না, কোনো লেনদেন করে নাÑ সবাই এক ধরনের সাধনা করে কিছু নিয়ম বা রীতি মেনে চলেনÑ যা অমাবতী নামে পরিচিত। অমাবতীর সময় এমনিতে অনেকেই কাজকর্ম করেন না। বেকার অলস সময় কাটান। কেউ বা বউয়ের সাথে দিনে রাতে সোহাগ করে কাটান। আবার যারা একেবারে প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ, যারা অমাবতীর জাফরের মতো গরীব, তাদের তো পেটের ক্ষুধা অমাবতীর কারণে বন্ধ হয়না। ক্ষুধা লাগার সময় হলেই ক্ষুধা লাগে। ক্ষুধাতো কোন শাস্ত্র মানে না। তাই জাফরকেও অমাবতীর মধ্যে কাজের সন্ধানে বের হতে হয়। গাড়াগঞ্জের হাটে জাফর এমনি একজন মহাজনকে [দুন্দির বাবা] ভাগ্যক্রমে পেয়েও যায়। যে মহাজনের কোন ছেলেপুলে নাই। চারটা ঢাংগর মেয়ে। বড়োটা দুন্দি আবার ফুফাতো ভাই ইকারুলের প্রেমে হাবুডুবু খায়। তারা মাঝরাতে ঢেঁকি ঘরে প্রেমের উৎসব করে বাদল নামায়। গোটা অমাবতীতে হাজারো প্যাঁচালির ভীড়ে দুন্দি আর ইকারুল আসলে ওই জনগোষ্ঠীর আধুনিক রোমিও-জুলিয়েট। হঠাৎ অমন করে দুন্দিকে বিষ খাওয়ানোর মাধ্যমে রাখাল অমাবতীর যে ইচ্ছাকৃত সমাপ্তি টানতে চেয়েছেনÑ আসলে নতুন একটা পর্বের শুরুটা এখান থেকেই হতে পারতো। জাফর যেভাবে ভীড়ের মধ্যে দুন্দির দাদীর থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়, আর পেছনে পরে থাকে এক অমীমাংসীত ঘটনাÑ দুন্দি কী বাঁচবে নাকি মারা যাবে? ইকারুল তো আগেই ভাগলো। দুন্দির কিছু না হওয়া পর্যন্ত পাঠককে রাখাল ধরে রাখতে পারতেন। রাখাল সেটি না করে সমাপ্তি টানলেন!

অমাবতীর সবচেয়ে মজার ক্যারেক্টার বুড়ো মোনজের মুল্লা, ভুল চিকিৎসায় নেয়া তার চশমা এবং চ্যাংরা করমআলীর লিলিপুট বাহিনী। ভুল চিকিৎসায় পাওয়া যে চশমা মোনজের মুল্লা চোখে দেন তা দিয়েই সে চলাফেরার কাজটা চালান। মাঝমধ্যে দূরের শ্রীপুর গ্রামটা দেখার শখ জাগলে তিনি চশমাটা উল্টো করে ধরে দেখার চেষ্টা করেন। বুড়োর প্রতিদ্বন্দ্বি চ্যাংরা করম আলীর দল তখন কলার ভেওয়ার পরিবর্তে খেলার নতুন একটা বিষয় পায়। ‘ও বুড়ো, ভিডিও করবা না? ভিডিও করো’। মোনজের মুল্লা চরিত্রটি ইতিহাসের অনেক গল্প শোনায়। এখানে অমাবতীর কাঠামোগত ভিত্তিটার প্রারম্ভ হলেও চরিত্রগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। রাখাল চরিত্রগুলোর কথা বেমালুম ভুলে যান। কিন্তু পাঠক কি ভুলে যায়? একমাত্র জাফর যেদিকে যায়, রাখালও সেই দিকের চরিত্রগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ফলে চরিত্রগুলো চরিত্র হয়ে ওঠার আগেই অমাবতীর প্রগাঢ় বাদলে কোথায় যেনো ভেসে যায় বা হারিয়ে যায়। চরিত্রগুলোকে এভাবে অবহেলায় এড়িয়ে যাবার কৌশলকে পাঠক যদি রাখালের লেখনির দুর্বলতা বা অমাবতীর অসম্পূর্ণতা হিসাবে বিচার করেন তার জন্য রাখালকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

নি...
উপন্যাস আমরা কাকে বলবো? একের পর এক চরিত্রের সাথে পরিচয় হওয়াকে যদি উপন্যাস হিসাবে স্বীকার করতে হয়, তাহলে রাখালকে ঔপন্যাসিক না বলে অমাবতী’র মোনজের মুল্লা’র সাথেই কেবল তুলনা করা সম্ভব। যে কিনা কাছে লোক পেলেই শুধু পুরানা দিনের গল্প শোনায়। যার সাথে ইতিহাস বা বাস্তবের কোন মিল নেই। গ্রামের সবাই মোনজের মুল্লার সাথে মজা করার জন্যই ইচ্ছে করে গল্পের শুরুটা ধরিয়ে দেয়। শেষ করার দায়িত্ব মোনজের মুল্লার। রাখালের সমস্যা তার চরিত্রগুলো শুধু কথা বলে। গ্রামের অশিক্ষিত কম শিক্ষিত মানুষগুলোর অমার্জিত বাক্যালাপের মধ্যেই অমাবতীর দৃশ্য বর্ণিত হয়। গ্রামের কোন মার্জিত শিক্ষিত ভদ্রলোকদের কথা রাখাল যেন ইছে করেই এড়িয়ে যান। অর্থাৎ তারা রাখালের চোখেই পড়ে না। তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সামগ্রিক শৈল্পিক দলিল না হয়ে অমাবতী দ্বিধাদ্বন্দের এক অমীমাংসীত আংশিক আখ্যানে বন্দি থাকে। অমাবতীতে এটাই রাখাল রাহার সীমাবদ্ধতা। দ্বন্দ্ব থাকলেও সবাইকে স্ট্রংলি আনতে পারেননি। অংশ বিশেষ এসেছে। বাকী অংশের খবর রাখাল যেনো ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু কেন তা আমার বোধগম্য হয়নি। রাখালের একটাই অর্জনÑ আঞ্চলিকতাকে সে বাক্যের ফুলঝুড়িতে ঠাপ মারেন। তার নায়ক জাফর আঙ্গিক গতিকে ঘুরিয়ে দেবার জন্য শক্ত করে কষে কাছামারেন। পৃথিবীকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে উল্টো করে সে আজ ঘুরিয়ে দেবে। অথচ জাফরকে অমাবতীর কোথাও অমন শক্তিশালী সামর্থ্যবান পুরুষ মনে হয়নি। যে কিনা বাবার পরিচয় না দিয়ে ভাইয়ের পরিচয় দিতেই [রাজার ভাই/নাজার ভাই] স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অমন দুর্বল চরিত্র যে সংকল্প করে তা আসলে আষাঢ়ে গল্পের মতো। আর রাখালের প্রচেষ্টাকে সবমিলিয়ে অমাবতীর কাটালে আঘাতপ্রাপ্ত আষাঢ়ে প্যাঁচালি বলার মতো একটা সুযোগ আসতোÑ যদি কিনা সে দুন্দি’র সাথে জাফরের কোন ধরনের সম্পর্ক স্থাপন পর্যন্ত পাঠককে ধরে রাখতেন। আমি বলব অমাবতী উপন্যাসের প্রথম অংশ রাখাল ইতিমধ্যে শেষ করেছেন। আর একটা জিনিসÑ সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষগুলো একটু অপারদর্শী, অলস, বোকা বা কিছুটা সহজ সরল। রাখালও যেনো উপন্যাস লিখতে গিয়ে ওরকম বোকা সোকাই থেকে যেতে ভালোবাসেন। উপন্যাসের যে কাঠামো তিনি অতি যতেœ দাঁড় করিয়েছেনÑ তাকে এভাবে অকাল অমাবতীর বাদলে ভেসে যেতে দিলে পাঠক হিসাবে আমার ভারী কষ্ট হয়। পাঠককে জাফরের মতো অন্য কোথাও পালানোর জন্য রাখাল নিজেই উৎসাহিত করেন। অমাবতীকে আরো কয়েক পর্বে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে রূপ দেয়ার কোন ইচ্ছা রাখালের থাকলে ভালো। সেখানে দৃশ্য বর্ণনায় রাখাল যদি আঞ্চলিক কথ্য ভাষার পরিবর্তে লেখক শৈলীর হাজারো বৈচিত্র্য ও নানান নান্দনিকতার প্রকাশ ঘটাতে পারেন, তাহলে রাখাল রাহাও একদিন পাঠক প্রিয় ঔপন্যাসিক হবেন। তার আগে তার প্রথম প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ না জানালে অকৃতজ্ঞতা করা হবে। উপন্যাসের রস, প্রাণ, অঙ্গ, দেহ, বৃদ্ধি সব ফলজ হলেই আষাঢ়ের ঢলেও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। সবশেষে, রাখাল রাহাকে আন্তরিক ধন্যবাদ তার অমাবতীর জন্য।





রেজা ঘটক
১০০/ কাঁঠালবাগান
ঢাকা-১২০৫ \
ফোন ঃ ০১৬৭৪১৮০১৬৩.



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29074654 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29074654 2010-01-08 22:07:50
হ্যারল্ড পিনটার: ব্রিটিশ নাটকের নটবর ।। রেজা ঘটক হ্যারল্ড পিনটার: ব্রিটিশ নাটকের নটবর


২০০৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হন ব্রিটিশ নাট্যকার হ্যারল্ড পিনটার। সুইডিশ একাডেমী হ্যারল্ড পিনটারকে ইংরেজি নাটকে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ‘দি টাওয়ারিং ফিগার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বৃহষ্পতিবার (১৩ অক্টোবর ২০০৫) সুইডিশ একাডেমীর সাহিত্য বিষয়ক নোবেল কমিটির স্থায়ী সেক্রেটারি হোরেস ইংডাল (ঐড়ৎধপব ঊহমফধযষ) পুরষ্কার ঘোষণায় বলেনÑ –‘দৈনন্দিন পাঁচালীর আদ্যোপান্ত উম্মোচনে এবং জটিলতাতাড়িত বদ্ধ ঘরের ভেতরে নিয়ে যেতে প্রলুদ্ধ জাগাতে হ্যারল্ড পিনটার বড়োই অমায়িক।’ ইংডাল বলেন- ‘পিনটার থিয়েটারের মৌলিক উপাদানগুলোতে উজ্জীবন ঘটিয়েছেন, কেননা মানুষ নিজেদেরকে কেবল অভাবনীয় সংলাপের ভেতরই খুঁজতে চায়, যেখানে সব ধরণের ভণ্ডামীর সমাপ্তী দেখতেই তারা কেবল পছন্দ করে । আর পিনটারের নাটকে আমরা শুধু সেইসব ভাষাই খুঁজে পাই।’

পিনটারের নোবেল প্রাপ্তিতে মিডিয়াজগত ও গুনিজনদের ভাষ্য: হ্যারল্ড পিনটারের এক সময়ের কঠোর সমালোচক লন্ডনের ‘দ্য র্গার্ডিয়ান’ পত্রিকা জানায় যেÑ ‘এমন একজন লেখককে এবছর নোবেল দেয়া হলো যিনি লেখার কাজটি শুধু সুন্দর ভাবেই করেন না বরং অনেকের কাছেই অনুকরনীয় এমন একটা নতুন ঘরনাও তিনি সৃষ্টি করতে পেরেছেন নাটকে। জীবনের প্রকৃত সত্য আসলে কী এবং শিল্প জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা পিনটার নাটকের মাধ্যমে আমাদের দেখিয়ে দেন।’ নোবেল প্রাপ্তির পর পিনটার সম্পর্কে ফরাসি পত্রিকা ‘লা মঁদ’ লিখেছেÑ ‘পশ্চিমাদের কাছে হ্যারল্ড পিনটার কেবল ইরাক যুদ্ধের একজন কট্টর সমালোচক হলেও তাঁর নাটকে যে জীবনের রহস্যময় বাঁকগুলোর মিশলে বাস্তব সত্যের প্রায়ই পুনঃপুনঃ সন্ধান মেলে, তা কার্যত নোবেল কমিটি স্বীকার করে নিলেন।’ বিশিষ্ট সমালোচক ক্রিষ্টোফার হিসেন্স বলেনÑ ‘সাহিত্য কর্মের জন্য হ্যারল্ড নোবেল পেলেও তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য এবং যুদ্ধনীতির বিপরীতে তাঁর কঠোর অবস্থানকে মোটেও খাটো করে দেখার উপায় নেই।’ অপর সমালোচক কোরিন রেডগ্রেভ বলেনÑ ‘মুনাফা লুটের আশায় যারা সাধারণ মানুষকে শোষণ করেন, তাদের বিরুদ্ধে হ্যারল্ড বরাবরই একটি তীব্র প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। আর অবশ্যই তা একজন বড় প্রার্থীর বড় রকমের বিজয়।’ ডাবলিনের ‘দ্যা গেট থিয়েটার-এর শিল্প নির্দেশক মিশেল কোলগ্যান বলেনÑ ‘আমাদের মতো থিয়েটার ওয়ালারা হ্যারল্ডের বরাবরই গুনমুদ্ধ থাকলেও,বাস্তবে কখনোই তাঁর কাজের ঠিকঠাক মূল্যায়ন করা হয়নি। সুইডিশ একাডেমী এবার সেই অসামান্য কাজটিই করলো।’ আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘দ্য নিউ ক্রাইটেরিয়ন’-এর সম্পাদক বলেনÑ ‘হ্যারল্ডের হাস্যরসাত্মক ব্যাঙ্গ নাটকের আছে অতি নিরব এক প্রতিবাদী ভাষা। তাই ইরাক ও আফগানিস্তানের জনগনের ওপর ইঙ্গ-মার্কিন বোমা হামলাকে এবং র্নিবিচারে গনহত্যা চালানোর র্মার্কিন-ব্রিটিশ নীতিকে হ্যারল্ড কখনোই সমর্থন করতে পারেননি।’

ব্রিটিশ লেখক জন গ্রেডি পিনটারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পিনটারের ঢঙটাই অনুসরন করে একটি নাটক লিখলেন । (ডিনার টেবিল)
জ্যাক : তো ... ... (বিরতি), সে তাহলে নোবেল
জিতলো! (বিরতি)
জিল : হু !
জ্যাক : হ্যা ........(র্দীঘশ্বাস)। (বিরতি)।
জ্যাক : লোকটাকে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে।
জিল : হুঁ ।
জ্যাক : ও, অপেক্ষাও করেছে অনেক। (বিরতি)
জিল : হ্যা, খুব দীর্ঘ অপেক্ষা .......। (বিরতি)
জ্যাক : আমার কী মনে হয় জানো ?.........(বিরতি)
জিল : ... ... ... (বিরতির পর) কাজগুলো ওর ভালোই,
তুমি কী বলো ?
জ্যাক : হ্যা।
জিল : ঠিক তাই। (বিরতি)
জ্যাক : এখন সবাই তাই-ই বলবে। আরো বলবে ওয়েলডান।
জিল : (সামান্য বিরতির পর) সত্যিই ওয়েলডান (মৃদ্যুস্বরে)
জ্যাক : হ্যা, সবাই এখন তাই বলবে।
জিল : (দীর্ঘ বিরতির পর) খাবারটা দারুন হয়েছে,
তাই না ?
জ্যাক : হু, ঠিক ওই খবরটির মতোই দারুন। (বিরতি) \

পিনটারের শৈশব ও স্কুল : ১৯৩০ সালের ১০ অক্টোবর লন্ডনের ইস্ট ইন্ড-এর পার্র্শ্ববর্তী হ্যাকনি শহরের এক ইহুদি পরিবারে হ্যারল্ড পিনটার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন নিতান্তই একজন পোশাক নির্মাতা (দর্জি)। ফলে শ্রমজীবি পরিবেশে পিনটার বেড়ে উঠেছেন। কিন্তু বালক পিনটার একা একা থাকতেই বেশি পছন্দ করতেন। চারপাশের বাস্তব জগতটাকে তৃতীয় নয়ন দিয়ে যাচাই বাছাই করার অভ্যাসটা তিনি তখন থেকেই রপ্ত করেছেন। ফলে সম্পূর্ন ভিন্ন একটা ধারায় তাঁর মনের বিকাশটা ঘটেছে। হ্যাকনি ডাউন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর পিনটার তাঁর ভাবনাগুলোকে গল্প ও কবিতায় রূপ দিতে শুরু করেন। পোয়েট্রি লন্ডন ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে। এর আগে ১৯৪৮ সালে তিনি ‘রয়্যাল একাডেমী অব ড্রামাটিক আর্ট কলেজে’ ভর্তি হন। কিন্তু মাত্র দুই টার্ম পরেই তাঁর মোহ নিবিষ্ট হয় অভিনয়ের প্রতি। আর কলেজ ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন অভিনয়। অভিনয়ের নেশা তাঁকে এতোই পাগল করেছিল যে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ১৯৪৯ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অতি লোভনীয় সরকারি চাকরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। একজন বিবেকবোধ সম্পন্ন প্রতিবাদী মানুষ হওয়ার জন্য, এরপর তিনি শুধু বিরামহীন লিখেছেন। অভিনয়ের ফাঁকে ফাঁকে যতোটুকু সময় পেতেন শুধু লিখতেন কবিতা আর নাটক।

নাট্যকার হ্যারল্ড : ১৯৫৭ সালে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধে মাত্র ৪ দিনে পিনটার লিখেন তাঁর প্রথম নাটক ‘দ্য রুম’। নাটকটি তখন এতোই হৃদয়গ্রাহী আর জনপ্রিয় ছিল যে, তৎকালীন ‘সানডে টাইমস’-এর নাট্য উৎসব সংখ্যায় ‘দ্য রুম’ নাটকটির পুরোটাই তখন প্রকাশিত হয়েছিল। পিনটারের ভাষায় ‘ প্রায়ই আমরা যে শব্দগুলো শুনি তা অশ্র“ত শব্দ মালারই দিক নির্দেশ করে। আর এসব শব্দমালাকে আমি নাটকে প্রবেশ করাই। ‘দ্য রুম’ প্রকাশের পর থেকেই ইংরেজি নাটকে পিনটারের সত্যিকারের নটবরের ভূমিকায় যাত্রা শুরু। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় পিনটারের দ্বিতীয় নাটক ‘দ্য বার্থডে পার্টি’। যা একই সঙ্গে পিনটারের প্রথম ধ্র“পদি নাটক। স্টানলির সমুদ্র উপকূলের একটি বোডিং-এ এক রহস্যময় দম্পত্তি বাস করেন। যারা তাঁদের পালক সন্তানের জন্মদিনের উৎসবে দারুনভাবে আনন্দে মত্ত। বালকটি সেই উৎসবের কিছুই ঠাওর করতে পারে না। একজন শিল্পীর প্রতিকৃতি যেমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে, বালকটি সেই রকম কি কল্পনায় বুদ হয়ে থাকে। ১৯৬০ সালে আইটিভি চ্যানেলে ‘দ্য বার্থডে পার্টি’ স¤প্রচারিত হওয়ার পর পিনটারের নাট্য খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে যায়। পিনটারের তৃতীয় নাটক ‘দ্য কেয়ারটেকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। এরপর একে একে তিনি লেখেন ‘দ্য হোম কামিং’ (১৯৬৪), ‘বিট্রেয়াল’ (১৯৬৫)। পিনটারের প্রথম দিকের এসব নাটকের গল্প অতি সাধারণ হলেও কথোপকথন আর লুকোচুরি খেলার মতো তা ধীরে ধীরে নাটককেই কেবল সুসংহত করে । যা অনেকটা এ্যাবসার্ড নাটকের বর্ধিত সংস্করনের মতো। এভাবে ধীরে ধীরে পিনটার কমেডি লিখতে মনোনিবেশ করেন। যে সব নাটকের চরিত্রগুলোতে এমন কতগুলো মানুষ, যারা অন্যের একেবারে অর্ন্তগত জীবনে অনার্থক প্রবেশের বিরুদ্ধে ভীষণ সজাগ। এবং নিজেদের কামনা বাসনার মধ্যেই নিজেদেরকে নিয়ন্ত্র—ন করতে পছন্দ করেন অথবা নিজেদের অস্তিত্বের মধ্যেই নিজেরাই কেবল পুলকিত হন। পিনটারের নাটকের চরিত্রগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট হলো অস্থির চিত্ততা আর বিস্মৃতি মুগ্ধতা। ঝাঁ-ঝাঁ, ঝিঁ-ঝিঁ। কেবল নিজের মতোই ছুটে চলা। যা কেবল চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকেই অনুসরন করে।

বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে পিনটারের নাটকগুলোতে ধীরে ধীরে গীতিময় আর কাব্যিক ঢঙ পরিস্ফুটিত হতে থাকে। তাঁর ‘ল্যান্ডস্কেপ’ (১৯৬৭) এবং ‘সাইলেন্স’ (১৯৬৮) যেনো রবীন্দ্র ঘরনারই নাটক। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘মনোলোগ’। যা টেলিভিশনের পর্দায় স¤প্রচারিত তাঁর প্রথম রঙিন নাটক। নাটক লেখা ও অভিনয়ের পাশাপাশি মাঝেমাঝে তিনি নাটক পরিচালনাও করতেন। পিনটার মোট ২৭টি নাটক পরিচালনা করেছেন। এছাড়া তিনি চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লিখেছেন প্রায় ২১ টি । চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যে ভাষার ব্যবহার প্রসঙ্গে পিনটার বলেনÑ ‘মানুষের কথোকথনের মধ্যে যদি আপনি কান পাতেন, শুনবেন- সবাই কেমন একটা অনিবার্য নগ্নতাকে আড়াল করার কী প্রানান্ত চেষ্টাই না করেন।

রাজনীতিতে যোগদান : আশি’র দশকের শেষদিকে পিনটার বৃটেনে বাম রাজনীতিতে নাম লেখান। তখন থেকেই তিনি সারা বৃটেনে একজন সোচ্চার প্রতিবাদী কন্ঠী হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সারা জাগানো নাটক ‘নো-ম্যানস-ল্যান্ড’। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয তাঁর ‘অন ফর দ্য রোড’। ১৯৮৮ সালে ‘মাউন্টেন ল্যাঙ্গুয়েজ’ এবং ১৯৯১ সালে ‘দি নিউ ওয়ার্ল্ড ওয়ার’ প্রকাশিত হলে রাজনৈতিক নাটক হিসেবে অনেকেই তা তখন প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৮৫ সালে মার্কিন নাট্যকার আর্থার মিলারের সঙ্গে পিনটার তুরস্কে রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিতদের পরিদর্শনে নামেন। মার্কিন দূতাবাস মিলারের সম্মানে এক নৈশ ভোঁজের আয়োজন করলে পিনটারও সেখানে বক্তব্য রাখার সুযোগ পান। তুরস্কে রাজনৈতিকভাবে নির্যাতন চিত্রের সেই সব ভয়াল ঘটনা পিনটার বর্ননা শুরু করেন। একপর্যায়ে দূতাবাসের ক্ষুদ্ধ কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে তাঁকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করলে পিনটার থু থু মেরে দূতাবাস থেকে বেড়িয়ে আসেন।

১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বৃটেনের ‘হাউজ অব কমনস’-এ পিনটার নিকারাগুয়ার পক্ষে বক্তৃতা দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সার্বিয়ায় যখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোবাহিনী বোমা হামলা চালায় তখন গার্ডিয়ানের পাতায় পাতায় ছাপা হতো পিনটারের হাজারো ধিক্কার আর প্রতিবাদ। বৃটেনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকা তখন পিনটারের অনেক বক্তব্যকে খোঁচা মেরে অথবা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ছাপাতো। এক পর্যায়ে গার্ডিয়ানের সাথে পিনটারের দ্বন্দ্ব যুদ্ধ শুরু হয়। ২০০১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পিনটার কঠোর সমালোচনা করেন। আফগানিস্থানে মার্কিন আগ্রাসন এবং ইরাকে ইন্দো-মার্কিন হামলার সমালোচনা করতে গিয়ে পিনটার দু‘টো দেশের দুই নেতাকে যুদ্ধাপরাধী আখ্যা দেন। পিনটারের ভাষায়Ñ ‘টনি ব্লেয়ার হলো গাধাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হাবা আর বুশ হলো হিটলারের চেয়েও বড় হত্যাকারী।’

১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় পিনটারের বিখ্যাত নাটক ‘এ্যাসেজ টু এ্যাসেজ’। এই নাটকে তিনি দেখিয়েছেনÑ কীভাবে নাজিরা ঠান্ডা মাথায় গণহত্যার পাশাপাশি যৌন নিপীড়ন চালয়। নাটকে এক নারী তার প্রেমিকের ভালোবাসা কতোটা রোমান্টিক ও আনন্দময় ছিল, সেই স্মৃতি রোমন্থন করেন। আর দেখেন- কীভাবে নাজি বাহিনী মায়েদের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে সমুদ্রের কাছে জড়ো করে। আর সাগরের প্রবল জোযার এসে সেইসব শিশুদের কীভাবে নির্দয় ভাবে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আর তখন সেই উঁচু উঁচু ঢেউগুলোতে কেবলই ভাসতে থাকে ওইসব শিশুদের পরিত্যক্ত জামাকাপড় আর খেলনা।

হ্যারল্ড পিনটার এ পর্যন্ত ৩০ টির মতো নাটক লিখেছেন। তাঁর সর্বশেষ নাটক ‘রিমেমবারেন্স অফ থিংস পাস্ট’ ২০০০ সালে প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে এই নাটকটি লন্ডনের ন্যাশনাল থিয়েটার-এ (হাউসফুল দর্শককূলের উপস্থিতিতে) বেশ কয়েকবার মঞ্চায়িত হয়েছে।

পিনটারের জীবনীকার মাইকেল বিলিংটন তাঁর ‘ওল্ড টাইমস’ নাটকটিকে একটি ‘সুন্দর স্মৃতিকাতরময় বিষন্নতা ও নৈতিক বিকৃতির নিদর্শন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ওই নাটকে কেট, তার স্বামী ও তাদের বন্ধু আন্নার সাথে ২০ বছর পর পুনরায় মিলিত হয়ে স্বৃতিচারণ করেন। কিন্তু দেখা যায় যতোই তারা পুরোনোদিনের কথা স্মৃতিচারণ করছেন, ততোই তারা পরস্পর এক ধরনের সন্দেহ আর অবিশ্বাসের গ›দ্ধ অবিষ্কার করেন এবং শেষদিকে তারা পরস্পর পরস্পরকে কেবল ভৎসনা করেন। এছাড়া পিনটারের ‘মাষ্টার অব ড্রামাটিক পজ’ নাটককে রাজনৈতিক ইস্যুতে তাঁর নৈতিকতা ও মানবতার সপক্ষে তাঁকে একজন আমৃত্যু যোদ্ধা হিসেবে আমরা পাই । ২০০১ সালে বিখ্যাত সাংবাদিক ম্যাথু টেমপেস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পিনটার আর্ন্তজাতিক আদালতে সার্বিয়ার স্বৈরশাসক স্লোবোদান মিলোসোভিচের প্রহসনমুলক সাজানো বিচারকে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানান । পিনটারের ভাষায়Ñ ‘মিলোসোভিচ হলো বেলগ্রেডের কসাই।’

বিয়ে বিচ্ছেদ ও পছন্দ: ব্যক্তিগত জীবনে হ্যারল্ড পিনটার ছিলেন প্রেমিক পুরুষ। দীর্ঘদিন তিনি টেলিভিশন উপস্থাপিকা জোয়ার বেকওয়েলের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করেছেন। তাঁর এই প্রেমের গল্প জানা সত্ত্বেও অভিনেত্রী ভিভিয়েন মার্চেন্ট পিনটারের প্রেমে মুº হন এবং ১৯৫৬ সারে তাঁরা বিয়ে করেন। কিন্তু ১৯৭৭ সালে তাঁদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর ১৯৮০ সালে পিনটার আবারো বিয়ে করেন লংফোর্ডের সপ্তম লর্ডের বড় কন্যা ল্যাডি অ্যান্টনিও ফ্রেজারকে। বউয়ের মতো পিনটার ক্রিকেট খেলারও অসাধারন ভক্ত । ক্রিকেটের প্রতি তাঁর অপরিসীম আগ্রহকে সম্মান দেখিয়ে লন্ডনের গেইটিস ক্রিকেট ক্লাব তাঁকে ক্লাবটির চেয়ারম্যান পদে অভিষিক্ত করেন।

সাহিত্যে অন্যান্য ব্রিটিশ নোবেল লরিয়েটদের পাশে পিনটার: সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হয়ে ৭৫ কছর বয়সী হ্যারল্ড পিনটার স্বদেশী যাঁদের দলে নাম লেখালেন তাঁরা হলেনÑ স্যামুয়াল ব্যাকেট (ঝধসঁবষ ইবপশবঃঃ), জন স্টিনব্যাক (ঔড়যহ ঝঃবরহনবপশ), স্যার উইনস্টাইন চার্চিল (ঝরৎ ডরহংঃড়হ ঈযঁৎপযরষষ), টি. এস. ইলিয়ট (ঞ.ঝ. ঊষরড়ঃ), ফ্রেন্সম্যান জিনপল সার্ত্রে (ঋৎবহপযসধহ ঔবধহ-চধঁষ ঝধৎঃৎব) ও ভি. এস. নাইপল (ঠ.ঝ. ঘধরঢ়ধঁষ)। এরমধ্যে ১৯৬৪ সালে সার্ত্রে সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পেলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

পুরষ্কার ও সম্মাননা: ‘দ্য লাভার’ নাটকের জন্য ১৯৬৩ সালে পিনটার জেতেন ‘প্রিক্রা ইতালিয়া টেলিভিশন এওয়ার্ড।’ ১৯৬৬-তে তাঁকে দেয়া হয় ‘সিবিই’ পুরষ্কার। এছাড়া তিনি পান ‘শেক্রাপিয়ার প্রাইজ’ (হামবার্গ); ‘দ্য ইউরোপিয়ান প্রাইজ ফর লিটারেচার’ (ভিয়েনা); ‘দ্য পিরেনভেলো প্রাইজ’ (পালেরমো); ‘দ্য ডেভিড কোহেন ব্রিটিশ লিটারেচার প্রাইজ; ‘লরেন্স অলিভিয়ার এ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘মলিয়ের ডি অনার’ নামক একটি আজীবন সম্মাননা। ব্রিটিশ সরকারের ‘রয়্যাল নাইট’ উপাধি তাঁকে দেয়া হলে তিনি তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। এছাড়া বিশ্বের প্রায় ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সম্মানজনক ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

নোবেল পাওয়ার খবর শুনে: গার্ডিয়ান প্রতিনিধি মাইকেল বিলিংটোনের কাছে পিনটার নোবেল প্রাপ্তিতে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেন এভাবেÑ ‘বৃহষ্পতিবার থেকে আমি ছিলাম ডাবলিনে একটা চমৎকার উইক-এন্ড উৎসবে। গেট থিয়েটার আমাকে সেখানে সম্মানিত করেছে। সোমবার ফিরতি উড়োজাহাজ ধরার জন্য আমি এয়ারপোর্ট যাচ্ছিলাম। তখন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। গাড়ি থেকে নামার সময় ছড়িটা রাস্তায় পেছলে গেলে আমি পড়ে গিয়ে রক্তারক্তি কান্ড। ৯টা সেলাই লাগলো কপালে। টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদ পাঠকদের আমার মৃত্যু সংবাদ পাঠ করার কথা ছিল। কিন্তু তাঁরা সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে জানাচ্ছে যে হ্যারল্ড পিনটার নোবেল সাহিত্য পুরষ্কার জিতেছে। তার মানে দাঁড়ালো আজ আমার পুর্নজন্ম হলো! অ্যান্তোনিওকে নিয়ে আমি শ্যাম্পেন খেলাম। সারাদিন ব›দ্ধুরা ফোন করল, অভিনন্দন জানালো। আর সাংবাদিকরা আমাকে জ্বালিয়ে মারছে। দরজায় তারা সারাদিন ধরে ঘন্টা বাজাচ্ছে। যেনো আমি একটা শিম্পানজি আর তারা খেলা দেখার জন্য দলবেঁধে আসছে। লাখ লাখ লোক বাদ দিয়ে বিরল প্রজাতির এক চর্ম রোগ আমার মুখেই বাসা বেঁধেছে। গামলা ভরতি ওষুধ গিলছি। যদিও খাদ্যনালীর ক্যান্সারটা ২০০২ সাল থেকেই খুব ভোগাচ্ছে। কিন্তু সকালে যখন অ্যান্তোনিও আমাকে ক্যানবেরি জুস দেয় আর আমি গার্ডিয়ান পড়তে থাকি, তখন জীবনটা আর রাজনৈতিক থাকে না গো।



রেজা ঘটক
১০০ কাঁঠালবাগান
ঢাকা।
ফোনঃ ০১৬৭৪১৮০১৬৩ .
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29074648 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29074648 2010-01-08 22:00:51
[ংন]র্দশকরে মুখোমুখি নর্মিাতা টোকন ঠাকুর ...রজো ঘটক[/ংন] দর্শকের মুখোমুখি নির্মাতা টোকন ঠাকুর রেজা ঘটক
গত ১১ ডিসেম্বর ২০০৯, শুক্রবার বিকাল ৫ টায় বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর উদ্যোগে দর্শকের মুখোমুখি নির্মাতা শিরোনামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ধানমন্ডির আলমগীর কবির চলচ্চিত্র কেন্দ্র অডিটরিয়ামে। ডিজিটাল সালে চিত্রিত চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর রচিত ও পরিচালিত চলচ্চিত্র ব্ল্যাকআউট -এর সর্বশেষ এডিটিং ভার্সান প্রদর্শিত হয় এবং প্রদর্শনী শেষে হল ভরতি দর্শকের সাথে এক আনন্দঘন প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর কৌতুহল দর্শকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। দর্শকদের প্রশ্নের জবাবে নির্মাতা টোকন ঠাকুর উচ্চারণ করেন তিন বছরেরও অধিক কাল ধরে ব্ল্যাকআউট –এর এডিটিং কালের নানা অভিজ্ঞতা, এক্সপারিমেন্ট, যন্ত্রণা, বাচ্চা প্রসব করার বেদনা সর্বোপরি নানা মহলের সহমর্মিতা ও সহযোগিতার কথা। বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর সভাপতি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা বাদল রহমানের অসুস্থতা জনিত অনুপস্থিতির কারণে উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর সাধারণ সম্পাদক সুশীল সুত্রধর। অনুষ্ঠানে ব্ল্যাকআউট ছবিটির উপর আলোচনা করেন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা মতিন রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এসিট্যান্ট প্রফেসর ও চলচ্চিত্র গবেষক ফাহমিদুল হক, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান ইমাম চৌধুরী ও বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর সাধারণ সম্পাদক সুশীল সুত্রধর। অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন মুভ্যিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর যুগ্ম সম্পাদক বেলায়াত হোসেন মামুন। উক্ত অনুষ্ঠানে দর্শকদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চোখ ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি মামরুল ইসলাম। ওই অনুষ্ঠানেই মামরুল ইসলাম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চোখ ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে অনুরূপ একটি আয়োজনের ঘোষণা দেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুরকে ব্ল্যাকআউট-এর সর্বশেষ এডিটিং ভার্সান প্রদর্শনের নিমন্ত্রণ করেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর সাদরে সেই নিমত্রণ গ্রহন করেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, খুব শিগগিরই ব্ল্যাকআউট-এর ফাইনাল এডিটিং ভার্সান সরকারি সেন্সর বোর্ডের কাছ থেকে সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে হল পর্যায়ের দর্শকদের মুখোমুখি হবে ব্ল্যাকআউট।

সেই সূত্র ধরেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চোখ ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে গত ২১ থেকে ২৩ ডিসেম্বর ২০০৯ আয়োজন করা হয় প্রথম শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভাল ২০০৯। উল্লেখ্য, ফ্যাস্টিভালের নামকরণে প্রথম শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভাল বলা হলেও ব্ল্যাকআউট ছবিটিই ছিল ওই ফ্যাস্টিভালের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ফুললেন্থ চলচ্চিত্র। এছাড়া ফ্যাস্টিভালে যে সকল চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয় সেগুলো হলো- ডেডলাইন বাংলাদেশ, ঈশ্বরের কাছে খোলা চিঠি, আননোসেন্ট ফেস, মানুষ কয়টা আসছে? (২১ ডিসম্বের), শিকড়, জলছাপ, স্নোরি, ব্ল্যাকআউট (২২ ডিসেম্বর), পিস, পাতার নৌকা, কুমির, দুধ কয়লা, বাউল করিম (২৩ ডিসেম্বর)। অনুষ্ঠানে চালচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষে মিট দ্য ডিরেক্টর পর্বে উপস্থিত ছিলেন যথাক্রমে এনামুল করিম নির্ঝর (২১ ডিসেম্বর), টোকন ঠাকুর (২২ ডিসেম্বর) ও শ্যামল কান্তি ধর (২৩ ডিসেম্বর)।

৭:০০ টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে !
২১ ডিসেম্বর ২০০৯ সকাল ৬:৩০ টা। আমরা (টোকন ঠাকুর, রেজা ঘটক, জন রোমেল, শাকিল সৈকত, ইমন কল্যাণ) কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশানে গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছি আর ভিতরে ভিতরে টেনশন মামুন কি পারবে ট্রেন ধরতে! কারণ আমাদের ট্রেনের টিকিট বেলায়াত হোসেন মামুনের কাছে। আর মামুন তখনো ফার্মগেট ট্যাক্সির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। ৬:৫৯ টা, অথচ মামুনের দেখা নাই। স্টেশান কর্মকর্তা জানালেন আপনারা না উঠলেও পারাবত এক্সপ্রেস ঠিক ৭:০০ টায় সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, ওদিকে অনেকটা দৈব ঘটনার মতো কোত্থেকে এসে যেন হঠাৎ উপস্থিত হলেন মামুন। তারপর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশানের প্লাটফরমে সকাল বেলার ঐতিহাসিক সেই ঘোড়ার দৌড়। ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরাও দৌড়াচ্ছি। ডানপাশে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে মহানগর প্রভাতীও রেডি। আর ঠিক বামপাশে পারাবত এক্সপ্রেস সিলেটের উদ্দেশ্যে ছুটছে। আমরাও সমান তালে পাল্লা দিয়ে ছুটছি। স্টেশানের প্লাটফরম যেখানে শেষ ঠিক সেই পর্যায়ে হঠাৎ আবিস্কার হল আমরা সবাইও ট্রেনের শেষ বগিতে সওয়ার। কিন্তু আমাদের জন্য নির্ধারিত বগি হলো ঙ। এবার ট্রেনের মধ্যে হাঁপাতে হাঁপাতে হাঁটা। অবশেষে ঙ নম্বর বগিতে ১৭-২২ নম্বর সিট আবিস্কার করতে আর কোনো ঝামেলা নেই।

কুয়াশা মোড়া রাজধানী
শীতের শান্ত সকাল। কুয়াশা মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে প্রিয় ঢাকা শহর। যেন আমাদের রাজধানী ছেড়ে যাবার খবরে ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙছে ৪০০ বছরের পুরনো শহর ঢাকার। আলস্য কাটিয়ে সরব হয়ে ওঠার জন্য তার বুঝিবা প্রস্তুতি। পূর্ব দিগন্তে রবি বাবুর আগমণের সাথে পাল্লা দিয়ে যেন জেগে উঠছে ব্যস্ততম মহানগর আজকের ঢাকা। সোডিয়াম বাতিগুলো শীতে কুকড়ি মুকড়ি দিয়ে ঝিমুচ্ছিল আর আমরা ছুটছিলাম শান্ত ঢাকার ঘুম কাতুরে ঢুলুঢুলু চেহারা দেখতে দেখতে।

পারাবত এক্সপ্রেস ও কিছু টুকরো স্মৃতি
২০০৪ সালের যে রাতে তৎকালীন বিএনপি সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলে হামলা চালায়, পরদিন সকালে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আমরা চার বন্ধু (নাজির, রিয়াজ, পুলক আর আমি) এয়ারপোর্ট থেকে পারাবত এক্সপ্রেসে উঠেছিলাম বিনা টিকিটে। গন্তব্য ছিল আখাউড়া বন্ধু নাজিরদের বাড়িতে। ওই দিনই সন্ধ্যায় ঢাকামুখি ফিরতি পারাবত এক্সপ্রেসে অবশ্য আমরা টিকিট কেটেই ফিরছিলাম। বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা নেবার জন্য ওটা ছিল আমাদের স্রেফ প্রমোদ ভ্রমণ। ২০০৭ সালের নভেম্বরে মিরপুর ২ নম্বর স্টেডিয়ামের কাছে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় আমাদের প্রিয় বন্ধু নাজির প্রাণ হারালে আর কোনোদিন নাজিরের উদ্যোগে অমোন করে বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়া হয়নি। আমাদের আর কোনোদিন আখাউড়া যাওয়াও হয়নি।

পারাবত এক্সপ্রেস কি একজন ঘাতক ! ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ করে নিখোঁজ হলো আমাদের প্রিয় বন্ধু আমিনুল ইসলাম স্বাধীন। পাঁচটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় স্বাধীনের ছবিসহ নিখোঁজ সংবাদ ছাপানো হলো। স্বাধীনকে ঠিক পাঁচ দিন পর আবিস্কার করা গেলো এয়ারপোর্টের কাছে খিলক্ষেত ট্রেন লাইনে। হাত পা বাঁধা দু-টুকরো স্বাধীনকে আমরা পেলাম লাশ আকারে। বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তখন জানিয়েছিল পারাবত এক্সপ্রেসেই কাটা পড়েছে স্বাধীন। স্বাধীন আসলে অপহৃত হয়েছিল আর অপহরণকারীদের স্বাধীন হয়তো খুব ভালো করেই চিনে ফেলেছিল। কারণ, ঘাতকরা তখন টেলিফোনে পাঁচ লাখ টাকা দাবী করেছিল জাকিয়া আপার কাছে। স্বাধীনকে আমরা ফেরৎ পেয়েছিলাম এই পারাবত এক্সপ্রেসে কাটা পরা লাশ হিসেবে। অথচ রাষ্ট্রের কেউই আজ পর্যন্ত স্বাধীনের মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে মাথা ঘামায় নি। কোনো রহস্যও আর আবিস্কার হয়নি। এখনো উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের পাশ দিয়ে যখন পারাবত এক্সপ্রেস ছুটে যায় জাকিয়া আপা নির্বাক হয়ে চলে যাওয়া পারাবত এক্সপ্রেস দেখতে থাকেন। পারাবত এক্সপ্রেস তুমিও মিশে আছো আমাদের কিছু টুকরো স্মৃতির সঙ্গে।

দুপুর ১:৩০ টায় সিলেট
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দুপুর ১:৩০ টা। আমরা সিলেটে পা রাখলাম। স্টেশানে আমাদের রিসিপ করলেন চোখ ফিল্ম সোসাইটির সংগঠক এমরান দেওয়ান আর আবু তাহের। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে পৌঁছালাম ঠিক দুপুর ২:০০ টায়।

ক্যাম্পাস পরিদর্শন, পরিচয় পর্ব ও ফটো সেশান
সিলেট শহর থেকে প্রায় ১০ কি.মি দূরে ছোট ছোট টিলা আর পাহাড়ি উঁচু নিচু সবুজ শ্যামলিমায় বেশ পরিছন্ন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সারি সারি বাহারি গাছ আর আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সকল উৎকর্ষে সমৃদ্ধ এই বিশ্¦বিদ্যালয়ে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই দৃষ্টি কাড়ে। ছাত্রছাত্রীরা ছোট ছোট গ্রুপে স্ট্যাডি অথবা আড্ডায় মত্ত। আর চোখে পড়ার মতো তাদের সাথে যে জিনিসটি খুব বেশি রয়েছে সেটি হলো ল্যাপটপ। বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারটির অবস্থান সবচেয়ে নজর কাড়ার মতো। উঁচু এক পাহাড়ে সুদৃশ্য ১০০ সিঁড়ি মাড়িয়ে আমরা যখন শহীদ মিনারের লাল সূর্যের দেখা পেলাম, ঠিক তার পিছনে তখন মেঘালয়ের সারি সারি বড় বড় পাহাড়ের মায়াবি হাতছানি। ক্যাম্পাস পরিদর্শনের পাশাপাশি ছিল চোখ ফিল্ম সোসাইটির সংগঠক জান্নাতুল ফেরদৌস তৃষ্ণা, বিবেক, হাবিব, রোমেলসহ অন্যান্য কর্মিদের সাথে বিভিন্ন স্পটে পরিচয় পর্ব আর ফটো সেশান।

গাজী কালুর দরগাহ
গাজী কালু নিশ্চিত কবি ছিলেন। নইলে শহরের কোলাহল থেকে দূরে অমন সুউচ্চ নির্জন টিলায় আস্তানা গড়ার রহস্য কোথায়? উত্তরে মেঘালয় আর দক্ষিণে সমতল ভূমি হয়ে বয়ে গেছে শ্রীমতী সুরমা সুদর্শনী। মাঝখানে নেড়ে মাথার সুউচ্চ টিলায় গাজী কালুর দরগাহ। দিবালোকে প্রকৃতির সবটুকু সৌন্দর্য উপভোগ আর যামিনী কালে অমন নির্জন টিলায় কেবল ধ্যানমগ্ন কবি-ই পারে সবকিছু ভুলে থাকতে। গাজী কালু হয়তো সেই গোত্রের কোনো বঙ্গীয় বাল্মীকি ছিলেন।

সন্ধ্যা ৬:০০ টায় উদ্ধোধন
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সন্ধ্যা ৬:০০ টা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল-নীল পতাকা আর আলোক সজ্জিত কনফারেন্স কমপ্লেক্স অডিটরিয়মে প্রথম শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভালের শুভ উদ্ধোধন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ডক্টর সালেহউদ্দীন। উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা এনামুল করিম নির্ঝর, চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর, পেট্রোলিয়াম ও জিও-রিসার্স ইনজিনিয়রিং বিভাগের প্রফেসর মোহাম্মদ জাকারিয়া, মুভ্যিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট বেলায়াত হোসেন মামুন, চোখ ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মামরুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেন চোখ ফিল্ম সোসাইটির সংগঠক আবু তাহের। সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষে জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে শুরু হয় প্রথম শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভাল ২০০৯ ।

ইকো বিভ্রাট:
ডেডলাইন বাংলাদেশ ডকুমেন্টারি প্রদর্শন দিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চোখ ফিল্ম সোসাইটির ফার্স্ট শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভাল। কিন্তু কনফারেন্স কমপ্লেক্স অডিটরিয়ামের নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় শুরু হয় ইকো বিভ্রাট। চলচ্চিত্র নির্মাতা এনামুল করিম নির্ঝর ও চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুরের সক্রিয় অনুরোধে চোখ ফিল্ম সোসাইটির আয়োজক দল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সাড়া দিয়ে পরবর্তী ফিল্ম শো-র ভ্যানু পরিবর্তন করে এ বিল্ডিংয়ের মিনি অডিটরিয়ামে ব্যবস্থা করেন। প্রথম দিনের ফিল্ম শো শেষ হয় রাত ১০:৩০ টায়।

তীব্র শীতের শহর সিলেট
অডিটরিয়ম থেকে বের হবার পর আমরা প্রথম টের পেলাম সিলেট আসলে তীব্র শীতের শহর। ঘন গাছপালা আর মুহূর্মুহু শিয়ালের হু-আক্কা-হু-র মধ্যে আমরা ক্যাম্পাস গেটে সংক্ষিপ্ত আড্ডা শেষে অগত্যা বিশ্ববিদ্যালয় রেস্ট হাউজে বাকি আড্ডার জন্য রওনা হলাম।

পাতা কুড়ানি মা
ক্যাম্পাস পরিছন্ন রাখার জন্য আনুষ্ঠানিকতার বাইরে সবচেয়ে যেটি বেশি নজর কাড়ার মতো সেটি হলো পাতা কুড়ানি মায়েদের তৎপরতা। পাতা কুড়ানি মায়েরা দলবেধে সারি সারি গাছের তলা থেকে ঝড়া পাতা কুড়িয়ে নিচ্ছেন। আমরা জানিনা বস্তা ভরতি ঝড়া পাতা মাথায় নিয়ে পাতা কুড়ানি মায়েরা বাড়ি ফিরে আসলে কি রান্না করবেন। অথবা আদৌ তাদের রান্না করার মতো চাল চুলো আছে কিনা? তবে রোজ সকালে ওইভাবে ক্যাম্পাস থেকে ঝড়া পাতা কুড়িয়ে পাতা কুড়ানি মায়েরা ক্যাম্পাস পরিছন্নতায় যেভাবে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন, তার মূল্য অবশ্যই তাদের শীর্ণ শরীরের জীর্ণ ছিন্ন বস্রের তুলনায় ঢের অমূল্য।

শাহজালালের মাজারে রমরমা ফিকিরি
শাহজালালের মাজারে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে যে সাইনবোর্ড সেটি হলো- ‘সাবধান : পকেট চোর, ছদ্মবেশী ধোকাবাজ হইতে সাবধান’। সাইনবোর্ডের আধিক্য থেকেই অনুমান করা যায় কতো নিরিহ লোকজন সারা বছর ওই সব ধরিবাজ ফিকিরি কারবারিতে কতো কিছুইনা বিসর্জন দিচ্ছেন। একটি সংগঠিত চোরাকারবারি সিন্ডিকেট চক্র মাজার এলাকায় প্রকাশ্যে যে কেনাবেচার হাট বসিয়ে কারবারি করছেন, তা দেখে যে কারো মনে হবে ওটা বাংলাদেশ সরকারের শাসনের বাইরে অন্য কোন স্বাধীন চোরাকারবারি ভূখন্ড। মাজারের আড়ালে চলছে ধর্মান্ধ নিরিহ মানুষদের নিয়ে প্রকাশ্য ফিকিরি। আর আমাদের জাতীয় নেতা নেত্রীরা মাজার সংস্কৃতির বিজ্ঞাপন মডেলের নামে ওসব জেনেও না জানার ভান করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ককে স্যালুট
শাহজালালের মাজার থেকে আমরা হাজির হলাম মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী সাহেবের কাছে। তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকআউট টিম সামরিক কায়দায় চিরকুমার এই জেনরেলকে স্যালুট করে। আমরা জানি ব্যাচেলর ছাড়া কারো পে এরকম একটা গণযুদ্ধের সর্বাধুনিক হওয়া চাট্টিখানি কখা নয়। এক মিনিট নিরাবতা পালন শেষে আমরা ঘুরে ঘুরে দেখি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির অকাল প্রায়াত নায়ক শালমান শাহ’র কবর, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার হুমাযুন রশীদ চৌধুরীর কবর। ধর্ম ব্যবসার বাইরে ওই কবর চত্বরেই আমরা বরং কিছুটা বেশি সময় কাটাতে স্¦চ্ছন্দবোধ করেছিলাম।

ব্ল্যাকআউট শো সন্ধ্যা ৭.১৫ টায়
২০০৬ সালে চিত্রিত চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর রচিত ও পরিচালিত চলচ্চিত্র ইখঅঈকঙটঞ -এর সর্বশেষ এডিটিং ভার্সান প্রদর্শিত হয় ২২ ডিসেম্বর ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:১৫ টায় সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বিল্ডিংয়ের মিনি অডিটরিয়ামে। প্রদর্শনী শেষে হল ভরতি দর্শকের সাথে এক আনন্দঘন প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর কৌতুহল দর্শকদের নানামুখি প্রশ্নের জবাব দেন। প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতে নির্মাতা টোকন ঠাকুর দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ছবিটির সহকারী পরিচালক রেজা ঘটক ও জন রোমেলকে। এছাড়া তিনি মঞ্চে ডাকেন মুভ্যিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট বেলায়াত হোসেন মামুন এবং টোকন ঠাকুরের ফিল্ম কার্যক্রমের সহকারী পরিচালক শাকিল সৈকত ও ইমন কল্যাণকে। সিলেটে ইখঅঈকঙটঞ দর্শকদের সামনে ছবির পরিচালক টোকন ঠাকুর তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বিশেষ করে ইখঅঈকঙটঞ সিলেট জার্নিতে কাজের চাপে আসতে না পারা ইখঅঈকঙটঞ -এর চিত্রগ্রাহক ও সম্পাদক সামির আহমেদ, মিউজিক ডিরেক্টর অর্ণব, আর্ট ডিরেক্টর আবদুল হালিম চঞ্চল, প্রধান সহকারী পরিচালক রাজীব আশরাফ, স্থির চিত্রগ্রাহক রিচার্ড রোজারিও এবং ছবির কুশীলবদের কথা, যারা এই ছবিতে সর্বোচ্চ প্রেম দিয়ে অভিনয় করেছেন যেমনÑ তানভীর হাসান, রাহুল আনন্দ, তিনা, সারা, কফিল আহমেদ, ধ্র“ব এষ, বাপ্পি আশরাফ, বেলায়েত, জাহেদউদ্দীন, জুয়েনা ফেরদৌস মিতুল, দাদু, বিমল বাউল...

শো-র আগেই ভোঁজের নিমন্ত্রণ
আমাদের বন্ধু দম্পতি গল্পকার প্রশান্ত মৃধা ও ফারজানা সিদ্দিকা রনি দীর্ঘদিন ধরে সিলেটবাসী। দুজনেরই পেশা শিক্ষকতা। প্রশান্ত সিলেট এম এম কলেজের বাংলা বিভাগে আর রনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। ব্ল্যাকআউট শো শেষে ওদের সুন্দর পরিপাটি বিশাল দাওয়াখানায় দুঘন্টার আড্ডা আর ভোঁজ ছিল অবশ্যই মনে রাখার মতো। বাড়তি ছিল ওদের ৪ বছরের তাতা-র সঙ্গে ব্ল্যাকআউট টিমের সবার বন্ধুতা।

সদর দফতর
পরদিন ২৩ ডিসেম্বর খুব সকালে ডিরেক্টর টোকন ঠাকুরের ডাকে ঘুম ভাঙল। উদ্দেশ্য সবাই ঘুম থেকে জাগার আগেই ক্যাম্পাস ও আশেপাশে একটা ঝটিকা ট্যুর। সঙ্গে রইল অবশ্যই ফুৃজি এফ-১০০ ক্যামেরা। শাহপরান হল আর দ্বিতীয় ছাত্র হলের পিছনে ফাঁকা সমতল মাঠ পেড়িয়ে সুউচ্চ টিলার উপরে যে পরিত্যক্ত অট্টালিকা ওটি কার? কাহার সেই পরিত্যক্ত ভিটায় হয়তো একদিন আমরা দলবেধে চলে যাবো। আর তাঁবু গাড়বো নতুন ছবি স্যুটিংয়ের সদর দফতর হিসেবে। তাহাতে কাহারো কি কোন আপত্তি থাকার কথা!

দিনভর আড্ডা
অতঃপর দিনভর দলবেধে ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে আড্ডা। শহীদ মিনারে দেখা মিলল অবুঝ বুড়িমা আর তার নিরিহ পুত্রবধূর সঙ্গে। দোয়া চাইলেন যেন তার সংগ্রহ করা পানি পড়া খেয়ে তার পুত্রবধূর অন্তত একটা সন্তান লাভ হয়। আমরা বুড়িমাকে নিঃশর্ত আশির্বাদ দিলাম। কি জানি হয়তো হুজুরের পানি পড়ার ফিকিরে একটা ফুটফুটে অবুঝ শিশু আসবে অবুঝ নিরিহ পুত্রবধুর কোলে আগামী শীতের আগেই।

পাঠানটোলার চা বাগানে চাঁদ ডুবল যখন
পাঠানটোলার চা বাগানের খোলা আকাশের নিচে যখন আমরা কুয়াশা মাড়িয়ে শীত পাহাড়া দিচ্ছি, তখন মুঠোফোনে প্রশান্ত আবদার করল টোকন যেন ওর কাছে চা বাগানের বোতল নিয়ে পালিয়ে যায়। কি ছিল তার মনে, তাহার মনে, আমরা জানিনা। শুধু জানি পাঠানটোলার চা বাগানে চাঁদ ডোবার পর মামরুল, হাবিব, এমরান, রোমেল, বিবেকরা আমাদের লাস্ট বাসে তুলে দিয়েছিলেন। প্রিয় পাঠক, সারা পথে একটা জিনিসই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলÑ খুব শিগগিরই আমরা ব্ল্যাকআউট-এর ফাইনাল ভার্সান আপনাদের দেখাতে পারবো দেশ বিদেশের সিনেমা দর্শকদের সামনে। ব্ল্যাকআউট-এর বাংলা নাম মনে নেই। জয়তু ব্ল্যাকআউট ট্যুর। জয়তু ব্ল্যাকআউট ।।

২ জানুয়ারি ২০১০।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29070597 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29070597 2010-01-02 21:52:23
[ংন]র্দশকরে মুখোমুখি নর্মিাতা টোকন ঠাকুর ...রজো ঘটক[/ংন] দর্শকের মুখোমুখি নির্মাতা টোকন ঠাকুর রেজা ঘটক
গত ১১ ডিসেম্বর ২০০৯, শুক্রবার বিকাল ৫ টায় বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর উদ্যোগে দর্শকের মুখোমুখি নির্মাতা শিরোনামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ধানমন্ডির আলমগীর কবির চলচ্চিত্র কেন্দ্র অডিটরিয়ামে। ডিজিটাল সালে চিত্রিত চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর রচিত ও পরিচালিত চলচ্চিত্র ব্ল্যাকআউট -এর সর্বশেষ এডিটিং ভার্সান প্রদর্শিত হয় এবং প্রদর্শনী শেষে হল ভরতি দর্শকের সাথে এক আনন্দঘন প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর কৌতুহল দর্শকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। দর্শকদের প্রশ্নের জবাবে নির্মাতা টোকন ঠাকুর উচ্চারণ করেন তিন বছরেরও অধিক কাল ধরে ব্ল্যাকআউট –এর এডিটিং কালের নানা অভিজ্ঞতা, এক্সপারিমেন্ট, যন্ত্রণা, বাচ্চা প্রসব করার বেদনা সর্বোপরি নানা মহলের সহমর্মিতা ও সহযোগিতার কথা। বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর সভাপতি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা বাদল রহমানের অসুস্থতা জনিত অনুপস্থিতির কারণে উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর সাধারণ সম্পাদক সুশীল সুত্রধর। অনুষ্ঠানে ব্ল্যাকআউট ছবিটির উপর আলোচনা করেন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা মতিন রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এসিট্যান্ট প্রফেসর ও চলচ্চিত্র গবেষক ফাহমিদুল হক, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান ইমাম চৌধুরী ও বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর সাধারণ সম্পাদক সুশীল সুত্রধর। অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন মুভ্যিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি-এর যুগ্ম সম্পাদক বেলায়াত হোসেন মামুন। উক্ত অনুষ্ঠানে দর্শকদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চোখ ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি মামরুল ইসলাম। ওই অনুষ্ঠানেই মামরুল ইসলাম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চোখ ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে অনুরূপ একটি আয়োজনের ঘোষণা দেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুরকে ব্ল্যাকআউট-এর সর্বশেষ এডিটিং ভার্সান প্রদর্শনের নিমন্ত্রণ করেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর সাদরে সেই নিমত্রণ গ্রহন করেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, খুব শিগগিরই ব্ল্যাকআউট-এর ফাইনাল এডিটিং ভার্সান সরকারি সেন্সর বোর্ডের কাছ থেকে সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে হল পর্যায়ের দর্শকদের মুখোমুখি হবে ব্ল্যাকআউট।

সেই সূত্র ধরেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চোখ ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে গত ২১ থেকে ২৩ ডিসেম্বর ২০০৯ আয়োজন করা হয় প্রথম শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভাল ২০০৯। উল্লেখ্য, ফ্যাস্টিভালের নামকরণে প্রথম শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভাল বলা হলেও ব্ল্যাকআউট ছবিটিই ছিল ওই ফ্যাস্টিভালের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ফুললেন্থ চলচ্চিত্র। এছাড়া ফ্যাস্টিভালে যে সকল চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয় সেগুলো হলো- ডেডলাইন বাংলাদেশ, ঈশ্বরের কাছে খোলা চিঠি, আননোসেন্ট ফেস, মানুষ কয়টা আসছে? (২১ ডিসম্বের), শিকড়, জলছাপ, স্নোরি, ব্ল্যাকআউট (২২ ডিসেম্বর), পিস, পাতার নৌকা, কুমির, দুধ কয়লা, বাউল করিম (২৩ ডিসেম্বর)। অনুষ্ঠানে চালচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষে মিট দ্য ডিরেক্টর পর্বে উপস্থিত ছিলেন যথাক্রমে এনামুল করিম নির্ঝর (২১ ডিসেম্বর), টোকন ঠাকুর (২২ ডিসেম্বর) ও শ্যামল কান্তি ধর (২৩ ডিসেম্বর)।

৭:০০ টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে !
২১ ডিসেম্বর ২০০৯ সকাল ৬:৩০ টা। আমরা (টোকন ঠাকুর, রেজা ঘটক, জন রোমেল, শাকিল সৈকত, ইমন কল্যাণ) কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশানে গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছি আর ভিতরে ভিতরে টেনশন মামুন কি পারবে ট্রেন ধরতে! কারণ আমাদের ট্রেনের টিকিট বেলায়াত হোসেন মামুনের কাছে। আর মামুন তখনো ফার্মগেট ট্যাক্সির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। ৬:৫৯ টা, অথচ মামুনের দেখা নাই। স্টেশান কর্মকর্তা জানালেন আপনারা না উঠলেও পারাবত এক্সপ্রেস ঠিক ৭:০০ টায় সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, ওদিকে অনেকটা দৈব ঘটনার মতো কোত্থেকে এসে যেন হঠাৎ উপস্থিত হলেন মামুন। তারপর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশানের প্লাটফরমে সকাল বেলার ঐতিহাসিক সেই ঘোড়ার দৌড়। ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরাও দৌড়াচ্ছি। ডানপাশে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে মহানগর প্রভাতীও রেডি। আর ঠিক বামপাশে পারাবত এক্সপ্রেস সিলেটের উদ্দেশ্যে ছুটছে। আমরাও সমান তালে পাল্লা দিয়ে ছুটছি। স্টেশানের প্লাটফরম যেখানে শেষ ঠিক সেই পর্যায়ে হঠাৎ আবিস্কার হল আমরা সবাইও ট্রেনের শেষ বগিতে সওয়ার। কিন্তু আমাদের জন্য নির্ধারিত বগি হলো ঙ। এবার ট্রেনের মধ্যে হাঁপাতে হাঁপাতে হাঁটা। অবশেষে ঙ নম্বর বগিতে ১৭-২২ নম্বর সিট আবিস্কার করতে আর কোনো ঝামেলা নেই।

কুয়াশা মোড়া রাজধানী
শীতের শান্ত সকাল। কুয়াশা মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে প্রিয় ঢাকা শহর। যেন আমাদের রাজধানী ছেড়ে যাবার খবরে ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙছে ৪০০ বছরের পুরনো শহর ঢাকার। আলস্য কাটিয়ে সরব হয়ে ওঠার জন্য তার বুঝিবা প্রস্তুতি। পূর্ব দিগন্তে রবি বাবুর আগমণের সাথে পাল্লা দিয়ে যেন জেগে উঠছে ব্যস্ততম মহানগর আজকের ঢাকা। সোডিয়াম বাতিগুলো শীতে কুকড়ি মুকড়ি দিয়ে ঝিমুচ্ছিল আর আমরা ছুটছিলাম শান্ত ঢাকার ঘুম কাতুরে ঢুলুঢুলু চেহারা দেখতে দেখতে।

পারাবত এক্সপ্রেস ও কিছু টুকরো স্মৃতি
২০০৪ সালের যে রাতে তৎকালীন বিএনপি সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলে হামলা চালায়, পরদিন সকালে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আমরা চার বন্ধু (নাজির, রিয়াজ, পুলক আর আমি) এয়ারপোর্ট থেকে পারাবত এক্সপ্রেসে উঠেছিলাম বিনা টিকিটে। গন্তব্য ছিল আখাউড়া বন্ধু নাজিরদের বাড়িতে। ওই দিনই সন্ধ্যায় ঢাকামুখি ফিরতি পারাবত এক্সপ্রেসে অবশ্য আমরা টিকিট কেটেই ফিরছিলাম। বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা নেবার জন্য ওটা ছিল আমাদের স্রেফ প্রমোদ ভ্রমণ। ২০০৭ সালের নভেম্বরে মিরপুর ২ নম্বর স্টেডিয়ামের কাছে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় আমাদের প্রিয় বন্ধু নাজির প্রাণ হারালে আর কোনোদিন নাজিরের উদ্যোগে অমোন করে বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়া হয়নি। আমাদের আর কোনোদিন আখাউড়া যাওয়াও হয়নি।

পারাবত এক্সপ্রেস কি একজন ঘাতক ! ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ করে নিখোঁজ হলো আমাদের প্রিয় বন্ধু আমিনুল ইসলাম স্বাধীন। পাঁচটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় স্বাধীনের ছবিসহ নিখোঁজ সংবাদ ছাপানো হলো। স্বাধীনকে ঠিক পাঁচ দিন পর আবিস্কার করা গেলো এয়ারপোর্টের কাছে খিলক্ষেত ট্রেন লাইনে। হাত পা বাঁধা দু-টুকরো স্বাধীনকে আমরা পেলাম লাশ আকারে। বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তখন জানিয়েছিল পারাবত এক্সপ্রেসেই কাটা পড়েছে স্বাধীন। স্বাধীন আসলে অপহৃত হয়েছিল আর অপহরণকারীদের স্বাধীন হয়তো খুব ভালো করেই চিনে ফেলেছিল। কারণ, ঘাতকরা তখন টেলিফোনে পাঁচ লাখ টাকা দাবী করেছিল জাকিয়া আপার কাছে। স্বাধীনকে আমরা ফেরৎ পেয়েছিলাম এই পারাবত এক্সপ্রেসে কাটা পরা লাশ হিসেবে। অথচ রাষ্ট্রের কেউই আজ পর্যন্ত স্বাধীনের মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে মাথা ঘামায় নি। কোনো রহস্যও আর আবিস্কার হয়নি। এখনো উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের পাশ দিয়ে যখন পারাবত এক্সপ্রেস ছুটে যায় জাকিয়া আপা নির্বাক হয়ে চলে যাওয়া পারাবত এক্সপ্রেস দেখতে থাকেন। পারাবত এক্সপ্রেস তুমিও মিশে আছো আমাদের কিছু টুকরো স্মৃতির সঙ্গে।

দুপুর ১:৩০ টায় সিলেট
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দুপুর ১:৩০ টা। আমরা সিলেটে পা রাখলাম। স্টেশানে আমাদের রিসিপ করলেন চোখ ফিল্ম সোসাইটির সংগঠক এমরান দেওয়ান আর আবু তাহের। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে পৌঁছালাম ঠিক দুপুর ২:০০ টায়।

ক্যাম্পাস পরিদর্শন, পরিচয় পর্ব ও ফটো সেশান
সিলেট শহর থেকে প্রায় ১০ কি.মি দূরে ছোট ছোট টিলা আর পাহাড়ি উঁচু নিচু সবুজ শ্যামলিমায় বেশ পরিছন্ন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সারি সারি বাহারি গাছ আর আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সকল উৎকর্ষে সমৃদ্ধ এই বিশ্¦বিদ্যালয়ে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই দৃষ্টি কাড়ে। ছাত্রছাত্রীরা ছোট ছোট গ্রুপে স্ট্যাডি অথবা আড্ডায় মত্ত। আর চোখে পড়ার মতো তাদের সাথে যে জিনিসটি খুব বেশি রয়েছে সেটি হলো ল্যাপটপ। বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারটির অবস্থান সবচেয়ে নজর কাড়ার মতো। উঁচু এক পাহাড়ে সুদৃশ্য ১০০ সিঁড়ি মাড়িয়ে আমরা যখন শহীদ মিনারের লাল সূর্যের দেখা পেলাম, ঠিক তার পিছনে তখন মেঘালয়ের সারি সারি বড় বড় পাহাড়ের মায়াবি হাতছানি। ক্যাম্পাস পরিদর্শনের পাশাপাশি ছিল চোখ ফিল্ম সোসাইটির সংগঠক জান্নাতুল ফেরদৌস তৃষ্ণা, বিবেক, হাবিব, রোমেলসহ অন্যান্য কর্মিদের সাথে বিভিন্ন স্পটে পরিচয় পর্ব আর ফটো সেশান।

গাজী কালুর দরগাহ
গাজী কালু নিশ্চিত কবি ছিলেন। নইলে শহরের কোলাহল থেকে দূরে অমন সুউচ্চ নির্জন টিলায় আস্তানা গড়ার রহস্য কোথায়? উত্তরে মেঘালয় আর দক্ষিণে সমতল ভূমি হয়ে বয়ে গেছে শ্রীমতী সুরমা সুদর্শনী। মাঝখানে নেড়ে মাথার সুউচ্চ টিলায় গাজী কালুর দরগাহ। দিবালোকে প্রকৃতির সবটুকু সৌন্দর্য উপভোগ আর যামিনী কালে অমন নির্জন টিলায় কেবল ধ্যানমগ্ন কবি-ই পারে সবকিছু ভুলে থাকতে। গাজী কালু হয়তো সেই গোত্রের কোনো বঙ্গীয় বাল্মীকি ছিলেন।

সন্ধ্যা ৬:০০ টায় উদ্ধোধন
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সন্ধ্যা ৬:০০ টা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল-নীল পতাকা আর আলোক সজ্জিত কনফারেন্স কমপ্লেক্স অডিটরিয়মে প্রথম শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভালের শুভ উদ্ধোধন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ডক্টর সালেহউদ্দীন। উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা এনামুল করিম নির্ঝর, চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর, পেট্রোলিয়াম ও জিও-রিসার্স ইনজিনিয়রিং বিভাগের প্রফেসর মোহাম্মদ জাকারিয়া, মুভ্যিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট বেলায়াত হোসেন মামুন, চোখ ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মামরুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেন চোখ ফিল্ম সোসাইটির সংগঠক আবু তাহের। সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষে জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে শুরু হয় প্রথম শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভাল ২০০৯ ।

ইকো বিভ্রাট:
ডেডলাইন বাংলাদেশ ডকুমেন্টারি প্রদর্শন দিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চোখ ফিল্ম সোসাইটির ফার্স্ট শর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভাল। কিন্তু কনফারেন্স কমপ্লেক্স অডিটরিয়ামের নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় শুরু হয় ইকো বিভ্রাট। চলচ্চিত্র নির্মাতা এনামুল করিম নির্ঝর ও চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুরের সক্রিয় অনুরোধে চোখ ফিল্ম সোসাইটির আয়োজক দল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সাড়া দিয়ে পরবর্তী ফিল্ম শো-র ভ্যানু পরিবর্তন করে এ বিল্ডিংয়ের মিনি অডিটরিয়ামে ব্যবস্থা করেন। প্রথম দিনের ফিল্ম শো শেষ হয় রাত ১০:৩০ টায়।

তীব্র শীতের শহর সিলেট
অডিটরিয়ম থেকে বের হবার পর আমরা প্রথম টের পেলাম সিলেট আসলে তীব্র শীতের শহর। ঘন গাছপালা আর মুহূর্মুহু শিয়ালের হু-আক্কা-হু-র মধ্যে আমরা ক্যাম্পাস গেটে সংক্ষিপ্ত আড্ডা শেষে অগত্যা বিশ্ববিদ্যালয় রেস্ট হাউজে বাকি আড্ডার জন্য রওনা হলাম।

পাতা কুড়ানি মা
ক্যাম্পাস পরিছন্ন রাখার জন্য আনুষ্ঠানিকতার বাইরে সবচেয়ে যেটি বেশি নজর কাড়ার মতো সেটি হলো পাতা কুড়ানি মায়েদের তৎপরতা। পাতা কুড়ানি মায়েরা দলবেধে সারি সারি গাছের তলা থেকে ঝড়া পাতা কুড়িয়ে নিচ্ছেন। আমরা জানিনা বস্তা ভরতি ঝড়া পাতা মাথায় নিয়ে পাতা কুড়ানি মায়েরা বাড়ি ফিরে আসলে কি রান্না করবেন। অথবা আদৌ তাদের রান্না করার মতো চাল চুলো আছে কিনা? তবে রোজ সকালে ওইভাবে ক্যাম্পাস থেকে ঝড়া পাতা কুড়িয়ে পাতা কুড়ানি মায়েরা ক্যাম্পাস পরিছন্নতায় যেভাবে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন, তার মূল্য অবশ্যই তাদের শীর্ণ শরীরের জীর্ণ ছিন্ন বস্রের তুলনায় ঢের অমূল্য।

শাহজালালের মাজারে রমরমা ফিকিরি
শাহজালালের মাজারে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে যে সাইনবোর্ড সেটি হলো- ‘সাবধান : পকেট চোর, ছদ্মবেশী ধোকাবাজ হইতে সাবধান’। সাইনবোর্ডের আধিক্য থেকেই অনুমান করা যায় কতো নিরিহ লোকজন সারা বছর ওই সব ধরিবাজ ফিকিরি কারবারিতে কতো কিছুইনা বিসর্জন দিচ্ছেন। একটি সংগঠিত চোরাকারবারি সিন্ডিকেট চক্র মাজার এলাকায় প্রকাশ্যে যে কেনাবেচার হাট বসিয়ে কারবারি করছেন, তা দেখে যে কারো মনে হবে ওটা বাংলাদেশ সরকারের শাসনের বাইরে অন্য কোন স্বাধীন চোরাকারবারি ভূখন্ড। মাজারের আড়ালে চলছে ধর্মান্ধ নিরিহ মানুষদের নিয়ে প্রকাশ্য ফিকিরি। আর আমাদের জাতীয় নেতা নেত্রীরা মাজার সংস্কৃতির বিজ্ঞাপন মডেলের নামে ওসব জেনেও না জানার ভান করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ককে স্যালুট
শাহজালালের মাজার থেকে আমরা হাজির হলাম মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী সাহেবের কাছে। তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকআউট টিম সামরিক কায়দায় চিরকুমার এই জেনরেলকে স্যালুট করে। আমরা জানি ব্যাচেলর ছাড়া কারো পে এরকম একটা গণযুদ্ধের সর্বাধুনিক হওয়া চাট্টিখানি কখা নয়। এক মিনিট নিরাবতা পালন শেষে আমরা ঘুরে ঘুরে দেখি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির অকাল প্রায়াত নায়ক শালমান শাহ’র কবর, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার হুমাযুন রশীদ চৌধুরীর কবর। ধর্ম ব্যবসার বাইরে ওই কবর চত্বরেই আমরা বরং কিছুটা বেশি সময় কাটাতে স্¦চ্ছন্দবোধ করেছিলাম।

ব্ল্যাকআউট শো সন্ধ্যা ৭.১৫ টায়
২০০৬ সালে চিত্রিত চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর রচিত ও পরিচালিত চলচ্চিত্র ইখঅঈকঙটঞ -এর সর্বশেষ এডিটিং ভার্সান প্রদর্শিত হয় ২২ ডিসেম্বর ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:১৫ টায় সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বিল্ডিংয়ের মিনি অডিটরিয়ামে। প্রদর্শনী শেষে হল ভরতি দর্শকের সাথে এক আনন্দঘন প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর কৌতুহল দর্শকদের নানামুখি প্রশ্নের জবাব দেন। প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতে নির্মাতা টোকন ঠাকুর দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ছবিটির সহকারী পরিচালক রেজা ঘটক ও জন রোমেলকে। এছাড়া তিনি মঞ্চে ডাকেন মুভ্যিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট বেলায়াত হোসেন মামুন এবং টোকন ঠাকুরের ফিল্ম কার্যক্রমের সহকারী পরিচালক শাকিল সৈকত ও ইমন কল্যাণকে। সিলেটে ইখঅঈকঙটঞ দর্শকদের সামনে ছবির পরিচালক টোকন ঠাকুর তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বিশেষ করে ইখঅঈকঙটঞ সিলেট জার্নিতে কাজের চাপে আসতে না পারা ইখঅঈকঙটঞ -এর চিত্রগ্রাহক ও সম্পাদক সামির আহমেদ, মিউজিক ডিরেক্টর অর্ণব, আর্ট ডিরেক্টর আবদুল হালিম চঞ্চল, প্রধান সহকারী পরিচালক রাজীব আশরাফ, স্থির চিত্রগ্রাহক রিচার্ড রোজারিও এবং ছবির কুশীলবদের কথা, যারা এই ছবিতে সর্বোচ্চ প্রেম দিয়ে অভিনয় করেছেন যেমনÑ তানভীর হাসান, রাহুল আনন্দ, তিনা, সারা, কফিল আহমেদ, ধ্র“ব এষ, বাপ্পি আশরাফ, বেলায়েত, জাহেদউদ্দীন, জুয়েনা ফেরদৌস মিতুল, দাদু, বিমল বাউল...

শো-র আগেই ভোঁজের নিমন্ত্রণ
আমাদের বন্ধু দম্পতি গল্পকার প্রশান্ত মৃধা ও ফারজানা সিদ্দিকা রনি দীর্ঘদিন ধরে সিলেটবাসী। দুজনেরই পেশা শিক্ষকতা। প্রশান্ত সিলেট এম এম কলেজের বাংলা বিভাগে আর রনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। ব্ল্যাকআউট শো শেষে ওদের সুন্দর পরিপাটি বিশাল দাওয়াখানায় দুঘন্টার আড্ডা আর ভোঁজ ছিল অবশ্যই মনে রাখার মতো। বাড়তি ছিল ওদের ৪ বছরের তাতা-র সঙ্গে ব্ল্যাকআউট টিমের সবার বন্ধুতা।

সদর দফতর
পরদিন ২৩ ডিসেম্বর খুব সকালে ডিরেক্টর টোকন ঠাকুরের ডাকে ঘুম ভাঙল। উদ্দেশ্য সবাই ঘুম থেকে জাগার আগেই ক্যাম্পাস ও আশেপাশে একটা ঝটিকা ট্যুর। সঙ্গে রইল অবশ্যই ফুৃজি এফ-১০০ ক্যামেরা। শাহপরান হল আর দ্বিতীয় ছাত্র হলের পিছনে ফাঁকা সমতল মাঠ পেড়িয়ে সুউচ্চ টিলার উপরে যে পরিত্যক্ত অট্টালিকা ওটি কার? কাহার সেই পরিত্যক্ত ভিটায় হয়তো একদিন আমরা দলবেধে চলে যাবো। আর তাঁবু গাড়বো নতুন ছবি স্যুটিংয়ের সদর দফতর হিসেবে। তাহাতে কাহারো কি কোন আপত্তি থাকার কথা!

দিনভর আড্ডা
অতঃপর দিনভর দলবেধে ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে আড্ডা। শহীদ মিনারে দেখা মিলল অবুঝ বুড়িমা আর তার নিরিহ পুত্রবধূর সঙ্গে। দোয়া চাইলেন যেন তার সংগ্রহ করা পানি পড়া খেয়ে তার পুত্রবধূর অন্তত একটা সন্তান লাভ হয়। আমরা বুড়িমাকে নিঃশর্ত আশির্বাদ দিলাম। কি জানি হয়তো হুজুরের পানি পড়ার ফিকিরে একটা ফুটফুটে অবুঝ শিশু আসবে অবুঝ নিরিহ পুত্রবধুর কোলে আগামী শীতের আগেই।

পাঠানটোলার চা বাগানে চাঁদ ডুবল যখন
পাঠানটোলার চা বাগানের খোলা আকাশের নিচে যখন আমরা কুয়াশা মাড়িয়ে শীত পাহাড়া দিচ্ছি, তখন মুঠোফোনে প্রশান্ত আবদার করল টোকন যেন ওর কাছে চা বাগানের বোতল নিয়ে পালিয়ে যায়। কি ছিল তার মনে, তাহার মনে, আমরা জানিনা। শুধু জানি পাঠানটোলার চা বাগানে চাঁদ ডোবার পর মামরুল, হাবিব, এমরান, রোমেল, বিবেকরা আমাদের লাস্ট বাসে তুলে দিয়েছিলেন। প্রিয় পাঠক, সারা পথে একটা জিনিসই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলÑ খুব শিগগিরই আমরা ব্ল্যাকআউট-এর ফাইনাল ভার্সান আপনাদের দেখাতে পারবো দেশ বিদেশের সিনেমা দর্শকদের সামনে। ব্ল্যাকআউট-এর বাংলা নাম মনে নেই। জয়তু ব্ল্যাকআউট ট্যুর। জয়তু ব্ল্যাকআউট ।।

২ জানুয়ারি ২০১০।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29070595 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29070595 2010-01-02 21:51:37
গ্রাফিক-আর্ট ও প্রচ্ছদ শিল্পী মানেবন্দ্র সুর আর নেই ! সৃজনশীল গ্রন্থজগতের প্রচ্ছদ শিল্পের নেপথ্যের এই মানুষটির আকস্মিক প্রয়াণ আমাদের প্রকাশনা শিল্পের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ধ্রুব এষের বাসায় গিয়ে তাঁর চোখে চোখ রাখতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল মানবেন্দ্র সুরের অনুপস্থিতি। শাঁখারীবাজার বারোয়ারি পুজা মিন্দর থেকে প্রতি বছর শারদীয়া দুর্গোৎবে প্রকাশিত দৃষ্টিনন্দন সাহিত্য সাময়িকী `অকাল বোধন' এর সম্পাদক ছিলেন মানবেন্দ্র সুর। অকাল বোধনে দেশের প্রতিষ্ঠিত সব লেখকই গল্প কবিতা উপন্যাস লিখতেন প্রধানত মানবেন্দ্র সুরের সাথে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই। আর মানবেন্দ্র সুরের সম্পাদকীয় রুচি ও প্রকাশনার আভিজাত্যবোধ দেশের প্রধান লেখক কবি সাহিত্যিকদের জানাই ছিল। কারণ তাদের অধিকাংশ বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষ এবং সেই প্রচ্ছদের গ্রফিক্স-প্রসেস বা ফিল্ম পজিটিভ হয়েছে অকাল প্রায়াত এই সজ্জন মানুষটির মেধায়, পরিশ্রম, পেশাজীবিতায়।

মানবেন্দ্র সুরের অনুপস্থিতিতে সর্বোচ্চ ক্ষতি ও শোকগ্রস্থ তাঁর শিশু কন্যা স্ত্রী পরিবার-পরিজন- সবার সঙ্ঙ্গে আমরা এই শোক ভাগ করে নিতে চাই।

বিশেষ একটি তথ্য, আমাদের প্রথম ডিজিটাল ছবি `ব্ল্যাকআউট'-এর প্রিমিয়ার প্রদশর্নির সময় প্রায় অর্ধ লক্ষ টাকা বিনিয়োগে ধ্রুব এষের সঙ্গে `ব্ল্যাকআউট প্লেইয়িং কার্ডস' বা `মনে নেই তাসগুলো'-র মুদ্রণ সমন্বয়ক ছিলেন গ্রাফিক ডিজাইনার মানবেন্দ্র সুর। আমাদের প্রিয় মানু-দা। এবং ব্ল্যাকআউট শ্যুটিংয়ের সময় এই ছবিতে অভিনয় করা থেকে রেহাই পাবার জন্য লাজুক ধ্রুব এষ পালিয়ে থাকলেও মানু-দা ছবির পরিচালক টোকন ঠাকুরকে ধ্রুব এষকে ধরতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন।

১৩ সেপ্টম্বর ২০০৬ রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার অডিটরিয়ামে যখন ব্ল্যাকআউট প্রিমিয়ার প্রদশর্নী হয়, মানু-দা তখন স্বপরিবারে উপস্থিত ছিলেন। হয়তো উদ্দেশ্য ছিল ধ্রুব এষ ব্ল্যাকআউট ছবিতে কি অভিনয় করেছেন তা দেখা, কিংম্বা আমাদের মানু-দা থেকে যাবেন আমাদের সেঙ্গই। এই তো....
আজ সবই স্মৃতি। কিছু স্মৃতি মনে থাকবে, কিছু স্মৃতি ভুলে যাবো। কিছু স্মৃতি কোনোদিন ভোলা হবে না। মানু-দা তারই অংশ।

মানবেন্দ্র সুর অমর রহে...
ব্ল্যাকআউট টিম
২৪ ডিসেম্বর ২০০৯, বিষ্যুদবার, ঢাকা
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29065109 http://www.somewhereinblog.net/blog/rezaghatokblog/29065109 2009-12-25 02:26:58