কোনদিন এ শহর নেক্রোপলিশ হয়ে গেলে
আমি অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না:
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই এসে বহন করুক: আমি প্রয়োজন বোধ করি না
জীবনানন্দ দাশ: উনিশশো চৌত্রিশের
ইদানীং একটা অভ্যাস হয়ে গেল, সুযোগ পেলেই একবার ঘুরে যাওয়া। সামহোয়ার ইন ব্লগ। কম্পুযন্ত্রের সাথেই দিনরাত বসবাস, তাই সময় অসময় থাকে না। মাঝে মাঝে খুব ভয় হয়, এমন প্রযুক্তি নির্ভরশীলতাটা কেমন। আমরা কতটুকু মানুষ থাকতে পারছি, কম্পুযন্ত্রের মতোই আর একটি মানুষযন্ত্র। ভাবনার কলকব্জাগুলোও সেরকম। খুব বেশী মানবিক ভাবনা ভাবতে পারি না। বিস্ময়বোধ নেই। খুব ছোটবেলার দিনগুলি, যখন একটি জোনাকীর দিকে ভয়ে, বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। আহ কেমন যে ছিল। পাড়ার ধানক্ষেতের ভিতরে লুকিয়ে সব ডানপিটেরা মিলে কাঁচা ধানের দুধ খাওয়ার মুহূর্ত। অমিয় স্বাদ ছিল সেইসব। কী অসাধারণ মুহূর্তই না ছিল সেদিন, প্রথম একটি অর্থপূর্ণ শব্দের মঞ্জরী বানিয়ে বাবার কাছে নিয়ে গেলাম। কাঠপেন্সিলে লেখা, অনেক কষ্টে আহরিত পুরনো নিউজপ্রিন্টে। প্রচুর ভুল বানান শুধরে দিয়েছিল বাবা। ইদানীং খুব নিকটতম সময়ের মধ্যে কলম আর কাগজ দিয়ে কিছু লিখেছি মনে পড়ে না। অথচ তার অনুভূতি কী যে অন্যরকম, বুঝাতে পারবো না। মোমের আলোর নিভৃতিতে বসে আমি যার কাছে চিঠি লিখতাম, সে কি এখন আমার ইলেক্ট্রনিক মেইলের ভাষা বুঝতে পারবে? আমার বন্ধু নীলকে অনেকদিন চিঠি লেখা হয়ে উঠে না। ইমেইল করি। অথচ আমরা কত কত চিঠি লিখতাম। ভাবতে পারা যায়, আমার কাছে এখন নীলের কোন ঠিকানাই নেই। জানি না, জানার প্রয়োজন হয় নি। আর ডাকেতো কোন চিঠি ছাড়াই হয় না আজকাল। যাদের সাথে চিঠির যোগাযোগ ছিল, তাদের সবার ইলেক্ট্রনিক এড্রেস তৈরী হয়েছে। ভারচুয়াল এড্রেসের ভিতরে মানুষের বাস্তবের ঠিকানাটা প্রায় হারিয়ে গেছে। এখন কর্পোরেট যোগাযোগের চিঠিগুলো ছাড়া আর কোন চিঠি লেখা হয়ে উঠে না।
আবার এখন ব্লগ লিখছি, কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে।
মাঝে মধ্যে ভেবেছি কেন লিখি এসব। সম্ভবত আমরা সভ্য হচ্ছি। গুটেনবার্গের কাল থেকে, বা আরো অনেক আগে যখন কাগজ আবিষ্কৃত হলো, এটার শূরু। আগে ভাব রক্ষিত হতো শ্রুতিতে। তারপর কাগজে। তারপর ভারচুয়াল স্পেসে। মানুষ থেকে ক্রমশই দূরে, প্রযুক্তির একাধিপত্যে। চিন্তা চেতনা এবং ভাবের বিশাল আগাছা গড়ে তুলেছি। এখন সব সভ্য মানুষই কাগজের কেরানী, অথবা কম্পুযন্ত্রের দাস। অসভ্যরা কৃষি কাজ করে। সভ্যতা আমাদের শিখিয়েছে কি করে শষ্যের আবাদ না করেও শুধু তার হিসাব নিকেশ করেই কৃষক থেকে খাদ্য কেড়ে নিতে হয়। ভাবা যায়, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে একটুও জড়িত না হয়ে শহুরে সভ্য মানুষেরা কৃষকের শষ্যের ভাগ পায়।
তবুও ভাবি মাঝে মধ্যে, কেন লিখি এসব? আমারতো অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে হবে না: আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে, পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করার অবসর আছে। জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা অন্য সবাই এসে বহন করুক: আমি প্রয়োজন বোধ করি না। কিন্তু আবার ভাবি: কোনদিন এ শহর নেক্রোপলিশ হয়ে গেলে, তার আগ পর্যন্ত একে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, একে যতটুকু সম্ভব মানবিক করে তোলা, এটাও কম কী!
কোনদিন পুরোপুরি মানবিক হয়ে গেলে বেঁচে যাবে এ শহর।
অনিন্দিতা, নারীত্ব ও নারীবাদ
আমার সাথে অনিন্দিতার দেখা যখন হলো, তখন আমার ইলেক্ট্রনিক এড্রেস ছিল না। তাই যোগাযোগটা সহজতরো হল। আমরা মুখোমুখি বসতাম। আমাদের আয়নার সামনে। আমাদের কত সহজ আলাপ হতো। তখনো তার নারীবাদ তৈরী হয়নি, তখন তার ছিল নারীত্ব, আমার ছিল ভালবাসা। অনেকদিন পর, যখন আমাদের ইলেক্ট্রনিক এড্রেস হলো, অনিন্দিতার সাথে আমার দূরত্ব তৈরী হল। ভীষণ তর্ক হতে লাগলো কখনো কখনো। আমি বলেছি যে, নারীত্ব আর নারীবাদের মৌলিক তফাত আছে। নারীবাদে কর্পোরেট কোম্পানীগুলোর স্বার্থ আছে, আর আছে সাম্রাজ্যবাদের প্রকল্প। কিন্তু নারীত্ব হলো তোমার।
ফরহাদ মজহারের একটি লিঙ্ক, মাহবুব মোর্শেদ এবং অবজারভার
প্রতিক্রিয়াশীলতার অনেক রূপ আছে, বুদ্ধিবৃত্তির দৈনতাও কম নয়। অবজারভার সাহেব ফরহাদ মজহারকে ধরতে পারছেন না, এটা কি প্রতিক্রিয়াশীলতা, নাকি দৈনতা। আমি বুঝতে অক্ষম। কারণ তিনি কমেন্ট করেছেন, বিতর্ক বা আলোচনায় যাননি। এটা কোন ভীন্নমতকে মোকাবেলার সঠিক পদ্ধতি কি! ফরহাদ মজহারকে পঠন পাঠন রপ্ত করা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকতার একটি দায়িত্ব জ্ঞান করি। তাকে পড়তে এবং বুঝতে না পারলে আমরা ব্যর্থ হবো। তিনি নয়াদিগন্তে লিখুন আর জামাতি সংগ্রামে লিখুন। অথবা প্রথম আলোতে লেখার মতো ভুল করুন। কুছ পরোয়া নেই।
অনিন্দিতাকে লেখা আমার সর্বশেষ চিঠি
কিছুদিন হল তোমাকে খুঁজে পাচ্ছি না কোত্থাও, অথচ ভীষণ জরুরী কিছু খবর দেয়ার ছিল তেমাকে। ইদানীং আমি পথে পথে এমনভাবে ঘুরছি, যাতে লোকেরা আমাকে শুকতারার সাথে তুলনা করে আসনে বিতণ্ডা চালায়।
ওরা বিতর্ক করতে থাকুক।
পারতপক্ষে আমি কোন তর্কের বিষয়বস্তু হতে চাই না কখনো। কেননা আমি এমন শান্ত-শিষ্ট মানুষ যে, জরুরতহীন তর্ককে হামেশাই এড়িয়ে চলি। কিন্তু তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিনা কেন, এ নিয়ে একদিন বিতর্ক করতে ইচ্ছে করে তুমুল।
এখন যা হচ্ছে তা হল তোমাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।
শুনো মেয়ে, একটা তুমুল বিতর্ক হবে আমাদের। আমাদের এ বিতর্কটা মেট্রোপলিটন শহরের কোন ব্যস্ততম ক্যাফেতে হবে না। প্রাণহীন কোন নির্জন কফিহাউজেও কখনো নয়। তাহলে কোথায় হতে পারে এই বিতর্কটা!
শুনো, আমাদের একটা অসুখ তৈরী হচ্ছে ক্রমশ। সময় আমাদের হাতে খুব কম।
একজন ব্লগারের লেখায় কমেন্ট
চুপ করে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। ভেবে কুল কিনারা পাওয়ার চেয়ে, মানুষের আরো কিছু করার আছে। মানুষকে নিয়েও ভাবার আছে। আমরা আমাদের পারিপার্শ্বিক অসুন্দর এবং সুন্দর সবকিছু নিয়েই মানুষ। আমি কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীকে ঘৃণা করি না, বলি যে পরিবর্তন দরকার। মানুষের উপমা দিই ফিনিক্স পাখির সাথে। মরে আর ধুলো থেকে পুনরুজ্জ্বীবিত হয়। তাই বিপ্লব হলো স্বাভাবিকতার মধ্য দিয়ে আমুল পরিবর্তন। নিরন্তর সৃষ্টিশীলতা। এই অসাধারণ লেখাটির জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ফারজানাকে।
কম্পুযন্ত্র শব্দটি মানস চৌধুরীর। কৃতজ্ঞতা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

