সামহোয়ারইনে সুযোগ পেলেই আসি, পড়ি পাতার পর পাতা, কোন নির্দিষ্ট লক্ষ নিয়ে নয়, অভ্যেসবশত। কখনো কখনো একটি হঠাৎ লেখায় থমকে দাঁড়াই, মুগ্ধতায়। কখনো একটি লেখার সামনে কথা বলবার দায় দাঁড়িয়ে যায়, আমি পড়ি আর ভাবি, কিছু বলবো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু বলা হয় না। এই আমার কুঁড়েমি। আমার অসহনীয়রকমের দীর্ঘতা সমৃদ্ধ কুঁড়েমি। কথা বলার থাকলেও বলা হয় না, অথবা কমেন্ট করলেও এত সংক্ষিপ্ত, লেখক বিরক্ত হন। অথবা অপেক্ষা করেন, সম্ভবত পরের কথাগুলোর জন্য। আর আমি চুপ মেরে যাই। কখনো বা বলি যে, কথা আছে, আর একদিন বলে যাবো। আর কোনদিন বলে যাই না। চুপি চুপি দেখে চলে আসি, আমার কথাগুলো না বলা থেকে যায়, আমার ভাবনাগুলোর সমাপ্তি ঘটে। এইভাবে আমার না বলা কথাগুলোর মৃত্যু ঘটে, আমার দিনগুলো এমন যে, আমি তার জন্য শোক পর্যন্ত প্রকাশ করি না।
আমি এই লেখাটা কেন লিখছি সে প্রশ্নও আমি আর করি না। কিন্তু কিছু এলোমেলো ভাবনা লিখছি, এই বুঝতে পারি। এই উদ্দেশ্যহীন লেখার ব্যাপারটা ভাল লাগতে শুরু করেছে তাই আরো কিছুক্ষণ লিখবো সম্ভবত। অনেকটা শ্যামুয়েল ব্যাকেটের নাটকের চরিত্রের মতো, জুতাটা খুললাম, আবার পরে নিলাম, আবার খুললাম, আবার পরলাম, ফিতাটা কেমন ঢিল হয়ে আছে, খুলে আবার মজবুদ করে লাগালাম, তারপরে, এসো আমরা কিছুক্ষণ কথা বলি, কোন কথা যদি না থাকে বলার, তাহলে ঝগড়া করি, তারও কোন বিষয় খুঁজে না পাও যদি- তাহলো ঝগড়ার বিষয়বস্তু বানাও; এ্য্যই যে ব্রাদার, তুমি অমন অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন- দিব এক গাট্টা.. ....
এদিকে হয়েছে কি, বৃষ্টিতে আমরা কয়েকজন দেবদূত আজ অনেকক্ষণ ভিজেছি। শহরে হেঁটেছি। সেই শহর, যার গভীর স্মৃতিতে আমাদের নাম ছিল হাঁটুরিয়া। আমরা ভিজতাম, এবং হাঁটতাম, আর শ্রাবণের অসুখগুলো আমাদের হৃদয়ে জমা করতাম। জোনাক পোকার মতো ছোট ছোট অসুখ, অপরূপ, অপরূপ। বুকের ভিতর এই অপরূপ অসুখগুলোরে জড়ো করে নিয়ে আবার নগরীর গভীর গহনে একা হয়ে যেতাম। মোমের আলোর নিচে, অনেক গভীর হলে রাত্রি, জোছনায় অবরুদ্ধ বুক ছেঁকে ছেঁকে জোনাক ফুটাতাম। সেই জোনাকগুলো, আহা সেই জোনাকগুলো কি বেঁচে আছে আজ?
ভিজতে ভিজতে আচমকা একটি কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল, যখন সচেতন হলাম, মনে করার চেষ্টা করলাম এই লাইনটা কার। প্রথমে মনে পড়লো না। আহা, পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ছিল বুঝি আমাদের কয়েকটি কবির হৃদয়। পরে বাসায় ফিরে অনেক পুরনো হয়ে যাওয়া লালচে কভারের কবিতার বইটি খুললাম।-
...আমি যার ক্রীতদাস মাঝে মাঝে সম্রাটের মতো/ উড়ে আসে অবিবেকী সেই জাদুকর।/ সোনার মলাটে লেখা পুঁথিপত্র নিয়ে/ শেখায় সে মায়াময় যে-সব অক্ষর/ সকালেই ভুলে গিয়ে সেই সব শ্লোকময় কথা/ হৃদয়ের দলগুলি ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলি।/ হয়তো বা ক্ষণকাল ইনিয়ে বিনিয়ে/ কেঁদে কেটে ক্লান্ত হয়ে পুরাতন গাথার ভিতরে/ নিজেকে ডুবিয়ে দিই।/ ছিন্নভিন্ন হৃদয়ের চামেলি ও বেলী/ এক হয়ে অন্য এক লোকোত্তর মানুষকে গড়ে।/ পানখ সাপের মতো অন্তরের বিষাক্ত কামনা/ মরে গেলে, আবার হারানো কথা আমার অধরে/ ফিরে এসে উচ্চারিত হতে থাকে ধীরে/ যেন মনে হয়,/ পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ছিল বুঝি/ আমাদের কয়েকটি কবির হৃদয়।...
আহা, পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ছিল বুঝি আমাদের কয়েকটি কবির হৃদয়!
এইসব উল্টাপাল্টা ভাবনাগুলিরে বিদায় করতে, কিছুক্ষণ কিছু বৈষয়িক প্রশ্নে আগ্রহ পাতলাম। ক্ষিদে নিবারণ, ক্ষুণ্ণিবৃত্তি, ভীষণ দরকারী ব্যাপার, জীবনের তাগিদেই। বাসার সামনেই মুদির দোকান, একটা ডিম, দুটো পেয়াজ, পাঁচ টাকার তেল, তারপরে কড়াইতে নামাতে গিয়ে যখন দেখি দেশলাই নাই, ক্ষিদে উবে যায়। আমার তখন অনন্ত আলস্য, সীমাহীন কুঁড়েমি, আর ডিম মামলেট করা হয় না। বরং আমার মনে পড়ছে আর একটি কবিতা:
তারপর দেশলাইয়ের একটি কাঠি জ্বললো/ আমার সর্বকনিষ্ঠ ছেলেটির হাতে/ একবিন্দু আগুন। পাশে কয়েকটি রক্তাভ মুখ/ আমি মোম খুঁজে না পেয়ে কর্তব্যবিমূঢ়ের মতো/ একটি শিশুর হাতের দিকে অসহায়ের মতো/ তাকিয়ে আছি। অথচ আমার সামনে/ রবীন্দ্রনাথের বই,/ গ্যেটের প্রেম পত্র,/ কনফুসিয়াসের দর্শন। যা অনায়াসে/ এই আগুনকে স্থায়ী রাখতে পারে/ আর দেয়ালজুড়ে পৃথিবীর মানচিত্র/ আইল বাঁধা জমির মতো বিচিত্র এবং দাহ্য।/ একটা শিশু আর কতক্ষণ এই/ দ্রুত দহনশীলতাকে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।/ দ্বিধায় আমার হাত কাঁপতে লাগল।..
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



