একজন সারস ও একটি প্রজাপতি
আমার মেঘেলা শার্টটি খুলতে চেষ্টা করি। পারি না।
শার্টটাকে খুলতে যেয়ে ছিঁড়ে ফেলি সূর্যের বোতাম।
একটি মমির মানুষ আস্তে আস্তে আরো মমি হয়।
একটি মেঘের মেয়ে আমার নিকটে বসে প্রাণপন হাসে।
রাতের জানালাটা খুললেই, জিপসি পাখির মতো চাঁদ উড়ে যায়। যেতে যেতে বলে, যাবি! আমি তখন তখনই উড়ে যাবার পাখি। ছোট্ট জিনসের ব্যাগটা গুছিয়ে, কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। এত্ত ছোট জীবন, একটি জিনসের ব্যাগে ঢুকিয়ে নেওয়া যায়। নিয়ে, তারপর, কমলা রোদ্দুরে হাঁটতে থাকো। রোদ্দুর কইরে! বেশ ভরা জোসনার শ্রাবণ। পেঁজা তুলোর মত চাঁদ উড়ে, সেই শ্রাবণে। আমার ঘুম, ঘুমমমম চলে আসে। কী সসসসসসুখ। তোমার হাত ধরে, জোসনার ভিতরে পা ডুবিয়ে, বেরিয়ে পড়ো। ভরা জোসনায় তোমার চোখ আর চুলে কী প্রগাঢ় ঘুমালো আবেশ। তুমি কে গো মেয়ে!- বড়ো গভীর চেনা মনে হয়, যেন বহুকাল ধরে তোমার সান্নিধ্যে ছিলাম, তবু কোনদিন দেখা হয় নাই।
কে যেন ডাকছে, মিতুউউউউ-উ-উ-উ-! সুখ পাখির মতো মিষ্টি ডাক। অজান্তেই চোখ মুদে যায়, সুখে।
একদিন ভরদুপুরে ক্লাস ছুটি হয়ে গিয়েছিল। বাইরে ঠাঠা রোদ্দুর, চোখে ঝিম ধরিয়ে দেয়। ক্লাস থেকে বেরিয়ে আমরা তিন বন্ধু বাড়ির পথ ধরলাম। কিছুই করার নেই। অথচ এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেতেও ভাল লাগছে না। রোদের ভিতরে অনেক্ষণ এলোপাথারি হাঁটলাম, তারপরে একটা মাঠ পেয়ে গোল হয়ে দৌড়ুলাম। আমি অল্পক্ষনেই ক্লান্ত হয়ে যাই, দৌড়ুতে আর পারি না। দীপু হাসতে হাসতে লুটায়। নিপুও। কী সারসের ঠ্যাংরে তোর বাপু। হাঁটতে ওস্তাদ; দৌড়ুতে পারিস না?
পায়ে আমার ঝিম ধরে যায়, আমি সত্যিই দৌড়ুতে পারি না। দীপু নীপু হাসতে হাসতেই, দৌড়ুতে দৌড়ুতেই, আমাকে ফেলে অনেকদূর চলে যায়। আমি তাদের পেছন পেছন দৌড়ুতে থাকি, সারস কি দৌড়ায়? আমার সারসের পা, ওরা বলে।
অবশেষে দীপু নীপুর কাছে চলে এসে ওদের হাত ধরলাম আবার, তারপর অনেকক্ষণ রোদের ভিতরে পা ডুবিয়ে হাঁটলাম তিনজনে, এলেবেলে।
আকাশে ভয়ঙ্কর নীল আর রোদ্দুর, তার নীচে বিশাল আখক্ষেত, আর এটির পরেই শুরু হয়েছে ছোট এক জঙ্গুলে বাগান। আমার দাদার আমলের, এখন বাগানটির মালিক বাবা। আরো আধ মাইলখানেক হাঁটলেই আমাদের বাড়ি। দীপু নীপুর বাড়ি আরেকটু পরে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দীপু আখক্ষেতটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই দাঁড়ালাম। দীপু নীপু চোখাচোখি করল, চোখের ভিতরে কী যেন বলাবলি হল, চোখ টিপল পরস্পরকে।
দিপু বলল, চল ভিতরে যাই-
তারপরে কিছূ বোঝার আগেই দে দৌড়, আখক্ষেতের ভিতর। দিপু আর নিপু দুজনেই। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম রাস্তায়। রোদ ঝিঝি ধরিয়ে দিচ্ছে চোখে, রোদটাকে ঠাহর করতে করতেই ওরা হারিয়ে গেল, আমার জন্য অপেক্ষা করল না।
দুপুর জুড়ে রোদের শ্রাবণ।
আমার চোখ, চোখের নির্বোধ পাতা আর শরীরের কচি চামড়া মোমের মতো পুড়ে যাচ্ছে।
রোদ ভালবাসতাম। আর দুপুর। নির্জন দুপুরগুলিতে কী যে হত, মন আনচান করত। বেরুলে মনে হত- দিগন্ত রোদের ঝিকিমিকি মাদকতায় মিশে যাই। আশা ভালবাসা স্বপ্ন উষ্ণতা ভয় শৈত্যপ্রবাহ ঘুম অভিমান- সব কেমন মিলে মিশে জিপসি হয়ে যেত। ছোট্ট স্কুল বালকের জিপসি মন হাঁটত, দুপুরের পাড় ধরে, একা একা।
আখক্ষেতটা অনেক বড়, তারপরে জঙ্গুলে বাগান। থ্রীতে পড়ার সময় বাবার সাথে এসে একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম এই বাগানে। সেকি খোঁজাখুঁজি। পাড়ার সব লোক ভেঙে পড়েছিল। মনে পড়লে এখনো ভয় ধরে যায়। এখন, আখক্ষেতটা পেরিয়ে যতটুকু চোখ যায়, আমার ছোট্ট চোখ, সেখানে দিগন্তের সাথে নারকেল আর সুপারি গাছের পাহাড়। এরপরে নীল আর নীল। পেঁজা তুলোর মত ছোট ছোট শাদা মেঘ। ক'একটি চিল, সোনালী ডানা মেলে ধরে মাতাল ঘুড়ির মত উড়ছে। রোদে পুড়ছে। দূরে, অনেক দূরে। দেখতে দেখতে চোখ ছোট হয়ে যায়। সামনে জুড়ে থাকা বিশাল আখক্ষেত আর বুনো বাগানটাতে দুপুর অদ্ভুত নিরবতায় লুকিয়ে গেছে। রহস্যপুরী। রোদ ঝিমঝিম দুপুরটা অচেনা লাগছে। ভয় লাগছে। জোসনা রাতে হারিয়ে যাবার মতো ভয়ঙ্কর এক মোলায়েম ভয়। হঠাৎ।
দিপু নিপুকে হারিয়ে, ওদেরকে খুঁজতে যেয়ে, আমি আবার হারিয়ে গেলাম। সেই জঙ্গুলে আখক্ষেত, সেই পুরনো ভয়। বাহিরে রোদের শ্রাবণ, ভিতরে বিপুল জোসনার ভয়। আমার চোখ ভিজে এল।
একটি উঁচু ডিবির উপর, চোখ বন্ধ করে, দুপুরের সমস্ত ভয় এবং বিষাদ, নির্জনতা এবং জোসনা, রোদ্দুর এবং রুক্ষতা, ভালবাসা এবং অভিমান বুকের ভিতরে নিয়ে বসে রইলাম।
একটি রঙীন খুব সুন্দর প্রজাপতি আমার কানের কাছে ফরফর করে উড়ে গেল। আমি প্রথমে ভয়ে পিছলাতে গিয়ে ডিবিটার উপর পড়ে গেলাম, একটি আখগাছের সাথে ধাক্কা লাগল। কর্কশ আখপাতার ধারে লেগে আমার হাত মুখ জ্বালা করে উঠল। করুণ হয়ে মুখের জ্বলা যায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে যখন বুঝতে পারলাম, এটি একটি প্রজাপতি, পুরো দুপুরটাকে ভুলে হঠাৎ তারপরে হেসে উঠলাম শব্দ করে। প্রজাপতি আমাকে ভয় থেকে স্বপ্নে নিয়ে এল। ভয় এবং বিহবলতার জটিল কাচগুলো ভেঙে দিতে দিতে, প্রজাপতি আমাকে গান শোনাল। স্বপ্নের ভিতর সুখ পাখির মতো মিষ্টি ডাক, মিতুউউউউ-উ-উ-উ-!
অনেক্ষণ পর, প্রজাপতির সঙ্গে আমার আলাপ যখন জমে গেল, হঠাৎ দিপু নিপুরা পরির রাজ্যের পোশাক পরে হৈ হৈ করতে করতে আমার চারপাশে এসে দাঁড়াল।
আমার বিকেল হয়ে যায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

