somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নোটবুক: ২: সেপ্টেম্বর ২, ২০০৮

০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একজন সারস ও একটি প্রজাপতি

আমার মেঘেলা শার্টটি খুলতে চেষ্টা করি। পারি না।
শার্টটাকে খুলতে যেয়ে ছিঁড়ে ফেলি সূর্যের বোতাম।
একটি মমির মানুষ আস্তে আস্তে আরো মমি হয়।
একটি মেঘের মেয়ে আমার নিকটে বসে প্রাণপন হাসে।

রাতের জানালাটা খুললেই, জিপসি পাখির মতো চাঁদ উড়ে যায়। যেতে যেতে বলে, যাবি! আমি তখন তখনই উড়ে যাবার পাখি। ছোট্ট জিনসের ব্যাগটা গুছিয়ে, কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। এত্ত ছোট জীবন, একটি জিনসের ব্যাগে ঢুকিয়ে নেওয়া যায়। নিয়ে, তারপর, কমলা রোদ্দুরে হাঁটতে থাকো। রোদ্দুর কইরে! বেশ ভরা জোসনার শ্রাবণ। পেঁজা তুলোর মত চাঁদ উড়ে, সেই শ্রাবণে। আমার ঘুম, ঘুমমমম চলে আসে। কী সসসসসসুখ। তোমার হাত ধরে, জোসনার ভিতরে পা ডুবিয়ে, বেরিয়ে পড়ো। ভরা জোসনায় তোমার চোখ আর চুলে কী প্রগাঢ় ঘুমালো আবেশ। তুমি কে গো মেয়ে!- বড়ো গভীর চেনা মনে হয়, যেন বহুকাল ধরে তোমার সান্নিধ্যে ছিলাম, তবু কোনদিন দেখা হয় নাই।

কে যেন ডাকছে, মিতুউউউউ-উ-উ-উ-! সুখ পাখির মতো মিষ্টি ডাক। অজান্তেই চোখ মুদে যায়, সুখে।

একদিন ভরদুপুরে ক্লাস ছুটি হয়ে গিয়েছিল। বাইরে ঠাঠা রোদ্দুর, চোখে ঝিম ধরিয়ে দেয়। ক্লাস থেকে বেরিয়ে আমরা তিন বন্ধু বাড়ির পথ ধরলাম। কিছুই করার নেই। অথচ এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেতেও ভাল লাগছে না। রোদের ভিতরে অনেক্ষণ এলোপাথারি হাঁটলাম, তারপরে একটা মাঠ পেয়ে গোল হয়ে দৌড়ুলাম। আমি অল্পক্ষনেই ক্লান্ত হয়ে যাই, দৌড়ুতে আর পারি না। দীপু হাসতে হাসতে লুটায়। নিপুও। কী সারসের ঠ্যাংরে তোর বাপু। হাঁটতে ওস্তাদ; দৌড়ুতে পারিস না?

পায়ে আমার ঝিম ধরে যায়, আমি সত্যিই দৌড়ুতে পারি না। দীপু নীপু হাসতে হাসতেই, দৌড়ুতে দৌড়ুতেই, আমাকে ফেলে অনেকদূর চলে যায়। আমি তাদের পেছন পেছন দৌড়ুতে থাকি, সারস কি দৌড়ায়? আমার সারসের পা, ওরা বলে।

অবশেষে দীপু নীপুর কাছে চলে এসে ওদের হাত ধরলাম আবার, তারপর অনেকক্ষণ রোদের ভিতরে পা ডুবিয়ে হাঁটলাম তিনজনে, এলেবেলে।

আকাশে ভয়ঙ্কর নীল আর রোদ্দুর, তার নীচে বিশাল আখক্ষেত, আর এটির পরেই শুরু হয়েছে ছোট এক জঙ্গুলে বাগান। আমার দাদার আমলের, এখন বাগানটির মালিক বাবা। আরো আধ মাইলখানেক হাঁটলেই আমাদের বাড়ি। দীপু নীপুর বাড়ি আরেকটু পরে।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দীপু আখক্ষেতটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই দাঁড়ালাম। দীপু নীপু চোখাচোখি করল, চোখের ভিতরে কী যেন বলাবলি হল, চোখ টিপল পরস্পরকে।

দিপু বলল, চল ভিতরে যাই-

তারপরে কিছূ বোঝার আগেই দে দৌড়, আখক্ষেতের ভিতর। দিপু আর নিপু দুজনেই। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম রাস্তায়। রোদ ঝিঝি ধরিয়ে দিচ্ছে চোখে, রোদটাকে ঠাহর করতে করতেই ওরা হারিয়ে গেল, আমার জন্য অপেক্ষা করল না।

দুপুর জুড়ে রোদের শ্রাবণ।

আমার চোখ, চোখের নির্বোধ পাতা আর শরীরের কচি চামড়া মোমের মতো পুড়ে যাচ্ছে।

রোদ ভালবাসতাম। আর দুপুর। নির্জন দুপুরগুলিতে কী যে হত, মন আনচান করত। বেরুলে মনে হত- দিগন্ত রোদের ঝিকিমিকি মাদকতায় মিশে যাই। আশা ভালবাসা স্বপ্ন উষ্ণতা ভয় শৈত্যপ্রবাহ ঘুম অভিমান- সব কেমন মিলে মিশে জিপসি হয়ে যেত। ছোট্ট স্কুল বালকের জিপসি মন হাঁটত, দুপুরের পাড় ধরে, একা একা।

আখক্ষেতটা অনেক বড়, তারপরে জঙ্গুলে বাগান। থ্রীতে পড়ার সময় বাবার সাথে এসে একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম এই বাগানে। সেকি খোঁজাখুঁজি। পাড়ার সব লোক ভেঙে পড়েছিল। মনে পড়লে এখনো ভয় ধরে যায়। এখন, আখক্ষেতটা পেরিয়ে যতটুকু চোখ যায়, আমার ছোট্ট চোখ, সেখানে দিগন্তের সাথে নারকেল আর সুপারি গাছের পাহাড়। এরপরে নীল আর নীল। পেঁজা তুলোর মত ছোট ছোট শাদা মেঘ। ক'একটি চিল, সোনালী ডানা মেলে ধরে মাতাল ঘুড়ির মত উড়ছে। রোদে পুড়ছে। দূরে, অনেক দূরে। দেখতে দেখতে চোখ ছোট হয়ে যায়। সামনে জুড়ে থাকা বিশাল আখক্ষেত আর বুনো বাগানটাতে দুপুর অদ্ভুত নিরবতায় লুকিয়ে গেছে। রহস্যপুরী। রোদ ঝিমঝিম দুপুরটা অচেনা লাগছে। ভয় লাগছে। জোসনা রাতে হারিয়ে যাবার মতো ভয়ঙ্কর এক মোলায়েম ভয়। হঠাৎ।

দিপু নিপুকে হারিয়ে, ওদেরকে খুঁজতে যেয়ে, আমি আবার হারিয়ে গেলাম। সেই জঙ্গুলে আখক্ষেত, সেই পুরনো ভয়। বাহিরে রোদের শ্রাবণ, ভিতরে বিপুল জোসনার ভয়। আমার চোখ ভিজে এল।

একটি উঁচু ডিবির উপর, চোখ বন্ধ করে, দুপুরের সমস্ত ভয় এবং বিষাদ, নির্জনতা এবং জোসনা, রোদ্দুর এবং রুক্ষতা, ভালবাসা এবং অভিমান বুকের ভিতরে নিয়ে বসে রইলাম।

একটি রঙীন খুব সুন্দর প্রজাপতি আমার কানের কাছে ফরফর করে উড়ে গেল। আমি প্রথমে ভয়ে পিছলাতে গিয়ে ডিবিটার উপর পড়ে গেলাম, একটি আখগাছের সাথে ধাক্কা লাগল। কর্কশ আখপাতার ধারে লেগে আমার হাত মুখ জ্বালা করে উঠল। করুণ হয়ে মুখের জ্বলা যায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে যখন বুঝতে পারলাম, এটি একটি প্রজাপতি, পুরো দুপুরটাকে ভুলে হঠাৎ তারপরে হেসে উঠলাম শব্দ করে। প্রজাপতি আমাকে ভয় থেকে স্বপ্নে নিয়ে এল। ভয় এবং বিহবলতার জটিল কাচগুলো ভেঙে দিতে দিতে, প্রজাপতি আমাকে গান শোনাল। স্বপ্নের ভিতর সুখ পাখির মতো মিষ্টি ডাক, মিতুউউউউ-উ-উ-উ-!

অনেক্ষণ পর, প্রজাপতির সঙ্গে আমার আলাপ যখন জমে গেল, হঠাৎ দিপু নিপুরা পরির রাজ্যের পোশাক পরে হৈ হৈ করতে করতে আমার চারপাশে এসে দাঁড়াল।

আমার বিকেল হয়ে যায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:৫৪
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×