ভাস্কর্য এবং তৎসংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে ফাজলামোর একটা সীমা থাকা দরকার, এবং ভাস্কর্য বিতর্ক: কয়েকটি প্রশ্ন ও কিছু ফুটনোট, এই দুইটি লেখার পর এ বিষয়ে আর পোস্ট দেবো না ঠিক করেছিলাম। কিন্তু এ সংক্রান্ত কয়েকটি প্রতিক্রিয়ার পোস্ট এলো আবার, এবং সেইসাথে ভাস্কর্য রাজনীতির আরো জরুরী কিছু দিক নজরে আনা দরকার বলে মনে হয়েছে, যা আমাকে আবার নোট আকারে এই লেখার প্রয়োজনকে উস্কে দিয়েছে। সর্বশেষ ফারুক ওয়াসিফ নামের একজন ব্লগারের পোস্ট।
ফারুক ওয়াসিফ যে পোস্ট দিয়েছেন, তার মূখ্য জায়গা হলো, কওমি মৌলভিদের ধর্মীয় বা অন্যান্য সম্ভব অবস্থানের সাথে রিফাত হাসানের পোস্টের অবস্থানকে এক করে দেখা। তিনি সম্ভবত আমার এই অবস্থানটিতে কথা বলতে সংকোচ বা বিহবল বোধ করেন, যে, মৌলভীদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াগুলো যে ভাষা এবং প্রক্রিয়ায় হয়েছে, তার ব্যাপারে প্রশ্ন করা। এটার কারণ হতে পারে, কওমি মৌলভিদের বিরুদ্ধে তার নিজের বর্ণবাদী অবস্থান। যেমন: বাংলাদেশের ইসলামী স্ট্যাবলিশমেন্ট টিকেই আছে রাষ্ট্রের সহযোগিতায় আর পুঁজির কারুণ্যে। দরিদ্র মাদ্রাসা ছাত্রদের কথা বাদ দিলে, এদের নেতারা সবাই সম্পত্তিবান শ্রেণীভুক্ত।
হায়, ফারুক ওয়াসিফ তাদের নেতাদের ভাষা বুঝেন, ভাস্কর্য যারা বানাতে চান তাদের ভাষাও বুঝতে চান, তাদের পক্ষ বিপক্ষ হয়ে কথা বলতে ব্লগ লিখেন, কিন্তু মূর্খ দরিদ্র মাদ্রাসার ছাত্রদের ভাষা বোঝার প্রয়োজন অনুভব করেন না। তাই, সবসময় দরিদ্র মাদ্রাসার ছাত্রদের বাদ দিয়েই কথা বলতে আগ্রহী। এই বর্ণবাদী মন দিয়ে তিনি কোন অবস্থান গ্রহণ করতে চান?
এই প্রশ্নটির উত্তর কিছুটা পরিস্কার হয়, তিনি যখন বলেন: ভাস্কর্য ভাঙ্গাই যদি প্রগতিশীলতা হয় তাহলে সাদ্দামের মূর্তি ভেঙ্গে বুশও একজন দশাশই প্রগতিশীল। ব্যাস, তাহলে সমস্যাটারে কি ফারুক প্রগতিশীলতা সংক্রান্ত সমস্যা বলেই চিহ্ণিত করছেন শেষমেষ। কারণ, আমি নিশ্চিত সেরকম কোন সমস্যায় তাড়িত হয়ে বা তার উল্লেখ করে আমার পোস্টের অবতারণা করিনি। এখানে, এই জায়গায় এসে তাই, আমাকে থমকে দাঁড়াতে হয়। কারণ, আমি যদ্দুর বুঝি, আমাদের প্রগতিশীলতার কোন সমস্যা নেই, এই মহার্ঘ জিনিশটার কোন দরকার আছে বলেও আমি মনে করি না আমাদের জন্য। এই জিনিশটা নিয়ে ফালতু সময় ব্যয় করা একটা আর্ট হতে পারে, এই ভাস্কর্য যেমন আর্ট, ভাঁড় নাট গোষ্ঠির জন্য, তেমন।
এবার দেখি এর রাজনীতিগুলি বুঝতে গিয়ে তিনি কী দেখেন। তিনি এখানে খুব আশ্চর্য হয়ে দেখেন, জামাত নেতা মুজাহিদকে আড়াল করার জন্যই এ্কটি ভাস্কর্য ভাঙ্গার নাটকের মহড়া হলো সরকারের পক্ষ থেকে। তার এই দেখাটি দেখে তার রাজনৈতিকতাবোধ এবং ডগমেটিক অবস্থান নিয়ে আমার খটকাগুলো পোক্ত হয়। বলা বাহুল্য, এই প্রপঞ্চটিই ভাস্কর্য সংক্রান্ত পপুলার আলোচনাগুলির উপজিব্য যা একটু সিরিয়াস হওয়ার ভাণ করেছে, এবং আলোচনার গভীরে প্রবেশ করতে গিয়েও থেমে গিয়েছে। ফারুক ওয়াসিফের এই পোস্টের বিবিধ জরুরী পর্যবেক্ষণ থাকা স্বত্ত্বেও, এই ডগমেটিক অবস্থানটি তার লেখাটিরে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরাতো এটা বিশ্বাস করি না যে, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে সরকারের অজান্তে মুজাহিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোওয়ানা দিয়েছে, আর সরকারকে এই বিষয়টিকে আড়াল করার জন্য ভাস্কর্য ভাঙ্গার নাটক করতে হচ্ছে। কারণ, আমরা জানি, কী সাধু এবং স্বাধীন এই সরকারের বিচার বিভাগ! এমন আবালরকম স্বাধীন যে, আদালতের রায়ের আগের দিন সাংবাদিকদের সামনে উপদেষ্টা সেই রায়ের অনুলিপি পড়ে শুনান।
কিন্তু আমি ভাস্কর্য বিরোধীতাকে সমর্থন করি। কেন করি, সেটির একটি আলোচনা আমি করেছি, আমার এ সংক্রান্ত দ্বিতীয় পোস্টটিতে। আমি একটি স্পষ্ট বাক্য বলেছি, যে, একটি পাবলিক স্পেসে এই ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রাস্ট্র নাগরিকদের সাথে যেহেতু এ সংক্রান্ত রাজনৈতিক বোঝাপড়া শেষ করে নাই, তাহলে এটি রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের অনুমিত এগরিমেন্ট এর ভায়োলেশন কিনা। এবং এও বলেছি যে, এটি কোন ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি হল আইকনকে ব্যবহার করে রাস্ট্রের ধর্ম হওনের কাঙ্ক্ষা, যেইটারে প্রতিরোধ করা সব নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু তিনি এই পয়েন্টে 'আত্মহারা হয়ে' যান, এবং লুঙ্গি পড়া মাদ্রাসা ছাত্রদের বিপরীতে তার কল্পিত আরেক লুঙ্গি পরা কৃষক বাউলের ভাস্কর্যরে দাঁড় করান। তার অবস্থান কি এটাই নয়, যারা বলে, ওরা বোঝে না ফুল কী, সংস্কৃতি কী, গান কী, কবিতা কী। আমি যে ধরণের অবস্থান সম্পর্কে দ্বিতীয় পোস্টটিতে বলেছি যে, নতুন পরিস্থিতির ডাইনামিজম হলো, ওরা ফকির লালনকে বাউল পরিচয় দিয়ে এমনই এক পেটিবুর্জোয়া, বর্ণবাদী, ফ্যাসিস্ট লড়াইয়ের জন্য আইকন বানালো।
এবং কয়েকটি ফুটনোট
ক. অনুমিত এগ্রিমেন্ট বা সোশাল কন্ট্রাক্ট কে ইউরোপীয় ধারণার ভিতরকার টার্ম হিশেবে ধরা ভুল হবে। এডওয়ার্ড সাঈদ-উত্তর প্রাচ্যবিদ্যার গভীরতর গবেষণাগুলো য়্যুরোপীয় অভিজ্ঞতার সোশাল কনট্রাক্ট এর ধারণার বাহিরে এটির ঐতিহাসিক ও মৌলিক ধারণার উৎপত্তি ও বিকাশ সনাক্ত করেছে।
খ. মৌলভীদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াগুলো যে ভাষা এবং প্রক্রিয়ায় হয়েছে, তার ব্যাপারে প্রশ্ন করার মানে এই নয় যে, মৌলভিদের কর্মকাণ্ডকে নির্বিচারে সমর্থন করা।
৩. একই কারণে, বাংলাদেশের বর্তমান সংকটকালে, মিনার বানানো বা ভাস্কর্য পুননির্মিত করার দাবী তৈরী করে মৌলভি এবং মৌলভি বিরোধীদের মুখোমুখি অবস্থানটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়ে কাদের লাভ হচ্ছে সেটি ভেবে দেখা দরকার।
৪. কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভর্তিতে বাধা প্রদানের মাধ্যমে মৌলভি এবং মাদ্রাসা ছাত্রদের বিরুদ্ধে এই বর্ণবাদী অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলো?
৫. নির্বাচন কবে হবে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

