‘জিহাদি বই’ সিন্ড্রোম এবং ‘শিবির’ সন্দেহে গ্রেফতার
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশের প্রেসনোটস এবং মিডিয়াবাণিজ্যে ‘জিহাদি বই’ এর ব্যাপক কাটতি চলছে হঠাৎ। বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং গ্যাস-কয়লা ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছোট্ট এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ‘জিহাদি বই’সহ গ্রেফতার বেশ প্রতিদিনকার ঘটনা এখন এবং ফলত গুরুত্বসহ ভাবনার দাবীদার। এটি খুব উদ্বেগজনক এই কারণে যে, এর ব্যবহার এবং আমদানি কোন স্বাভাবিক জায়গা থেকে নয়। নয়া বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদি ব্যবস্থার মহান ‘পোপ’ আমেরিকার কুখ্যাত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে’ ব্যবহৃত ‘পরিভাষা’ এটি- যা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ট্যাগিংয়ে হরদম ব্যবহার করা হয়। এই ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’ যে কী, সে বিষয়ে এই লেখায় বিস্তর বলার সুযোগ নেই, মোটামুটি সচেতন মাত্রেই ইরাক-আফগানিস্তান প্রমুখ দেশে ‘সন্ত্রাসবাদ দমনে’র নামে সাম্রাজ্যবাদি অক্ষশক্তির লুটপাট ও আঘাত পর্যালোচনা করলে বিষয়টি বুঝতে পারবেন, এখানে শুধু সতর্কবাণী দেওয়াটা কর্তব্য মনে করি। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে, বাংলাদেশ সরকার কেন হঠাৎ এই ‘জিহাদি বই’ সিন্ড্রোমে ভুগছে- এবং এই শব্দবন্ধটি নিজের বুকের উপর টেনে আনছে- তা খতিয়ে দেখা দরকার। মনে রাখা দরকার, ক্ষমতায় আসার আগে এই সরকারের নেত্রী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে’র সাথী হতে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের সাথে এক যৌথ ঘোষণায়। আমরা উদ্বিগ্ন তাই, এটি কি সরকারের সেই পদক্ষেপের একটি অংশ? যত্রতত্র এই শব্দটির ব্যবহারের আগে সরকার বাহাদুর যদি একটু ব্যাখ্যা দিতেন কোন কোন বইগুলিকে তারা ‘জিহাদি বই’ হিশেবে অভিযুক্ত করবেন এবং কোন কারণে, বাংলাদেশ সংবিধানের কোন ধারাবলে এই জিহাদি বই রাখার অপরাধে এদেশের তরুণদেরকে গ্রেফতার এবং নির্যাতন করা হবে- আমরা স্বস্থি পেতাম। আমাদের জানার অধিকার আছে, ‘জিহাদী বই’য়ের সংজ্ঞা কী, কোন শৃংখলার ভিত্তিতে কিছু বইকে ‘জিহাদী’ বলা হবে। দেখা যাচ্ছে মিডিয়া বা পুলিশের ‘প্রেসনোটে’- ‘ইসলাম’ নামাংকিত বইগুলোকেই ‘জিহাদি বই’ আখ্যা দেয়া হচ্ছে। প্রায় নব্বুই ভাগ মানুষ যে দেশে মুসলিম- সেখানে প্রত্যেক ঘরে বা যে কোন তরুণের কাছে ইসলামী বইপত্র থাকবে- এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। এই স্বাভাবিকতার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কি কোনরূপ প্রেসনোট দিয়েছে- যে, নিম্নলিখিত বইগুলোকে ‘জিহাদী বই’ বলা হবে- এবঙ বাংলাদেশের সংবিধান-আইন-আদালত অনুযায়ী এই বইগুলি রাখা ‘দণ্ডনীয় অপরাধ’! আমরা এমনও দেখেছি বিভিন্ন সময়ে মিডিয়াতে ‘জিহাদি বই’য়ের প্রদর্শনীতে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন শরীফও দেখা গেছে। নাকি কুরআন শরীফও ‘জিহাদি বই’?
‘জিহাদি বই’য়ের বিরুদ্ধে সরকারের এই ‘জিহাদে’র সাথে সাথে সাম্প্রতিক মিডিয়া এবং সরকারের ‘প্রেসনোটে’ আর একটি অস্বাভাবিক ঘটনা চোখে পড়ছে, তা হলো: ‘শিবির সন্দেহে’ গ্রেফতার, ‘সরকারের বিরুদ্ধে গোপন সভার প্রস্তুতিকালে' গ্রেফতার, ‘নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে সন্দেহে’ শিবির কর্মী গ্রেফতার- ইত্যাদি। বেশ একটি ‘গোপন সংগঠনে’র আইনের চোখে ‘নিষিদ্ধ তৎপরতা’র মত ভাব। যদ্দুর জানি, বাংলাদেশে শিবির কোন ‘নিষিদ্ধ’ ছাত্রসংগঠন নয়- অন্তত এখন পর্যন্ত। তারপরও ‘জিহাদি বই’, এবং ‘শিবির সন্দেহে’ এইসব গ্রেফতার স্রেফ ‘ইসলাম নামধারি’ এবং ‘শিবির’-এর বিরুদ্ধে হচ্ছে বলে- ‘আধুনিকতা’ ও ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের’র প্রয়গম্বর ভলতেয়ারের ভাবশিষ্যদের অনেকেও বেশ খুশি। কিন্তু আমরা এই ঘৃণা এবং উল্লাসের জায়গাকে উৎরে কতগুলো জরুরী প্রশ্ন করতে চাই। যারা শিবির করছে, এবং বিভিন্ন সময় কথিত ‘জেহাদি বই’ সহ গ্রেফতার হচ্ছে- তাদের পরিচয় কী? তারা কি ‘অন্য কোন গ্রহ’ থেকে বাংলাদেশে এসে পড়েছে? উত্তর নিশ্চিতভাবে এটাই যে, আমার-আপনার মত তারাও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক- এবং তরুণ সমাজের সম্ভাবনাময় অংশ- যারা রাজনীতি সচেতন এবং সম্ভবত আমাদেরই ভাই-বেরাদর বা সন্তান-সন্ততি। কোন নিষিদ্ধঘোষিত গোপন সংগঠনও শিবির নয়, বাংলাদেশের মাঠে ময়দানে রাজনীতি করে, এদেশের আলো-হাওয়ায় বড় হয়েছে শিবির করা ছেলেরা। তাহলে, নাগরিক অবস্থান থেকে আমরা এই প্রশ্ন করতেই পারি যে, একটি প্রকাশ্য সংগঠনকে- যা গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে গণতান্ত্রিকভাবেই তার তৎপরতা ও কাজকর্ম চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক- তার বিরুদ্ধে সরকারের হঠাৎ এই জঙ্গী ও ফ্যাসিবাদি আচরণ কেন? এটিরে স্রেফ বিরোধী পক্ষের তৎপরতা ও মতামত দমন মনে হয় না আমার- এই জংগী মনোভাব এমন কি শিবিরের মুরুব্বি সংগঠন জামাতের ৭১ এর ‘অতীত পাপে’র কারণেও মনে করার কোন যুক্তি নেই। কারণ, খেয়াল করলেই দেখবেন, একইরকম গ্রেফতার-নির্যাতন এমনকি কিছুদিন আগে নিষিদ্ধও করে দেয়া হয়েছে ‘হিজবুত তাহরির’ নামে একটি কথিত ‘ইসলামী’ রাজনীতির দাবীদার সংগঠনকে- যার মধ্যেকার বিরাট অংশ হল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যুবক- এখনো কিছুদিন পরপর যাদেরকে মিডিয়ার পর্দায় কথিত ‘জিহাদি বই’সহ অপরাধীর মত পুলিশের সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের বিরুদ্ধে জামাতের মত কোন অতীত অপরাধ এর অভিযোগ নেই। তাদের এবং ‘শিবির’ কর্মীদের- বয়সহেতু তারা এমনকি ‘যুদ্ধাপরাধী’ হওয়ারও নূন্যতম যোগ্য নয়। এ বিষয়ে খোদ আওয়ামী স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর বক্তব্য স্মরণীয়, তিনি বলেছেন,‘শিবিরের বর্তমান প্রজন্ম বাংলাদেশের অস্তিত্ব ধারণ করে বড় হয়েছে’। তাহলে এদের বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগের এই ‘জঙ্গি’ তৎপরতা- দমন-নিপীড়ন-গ্রেফতার ও জঙ্গি ট্যাগিং প্রদান- উভয়ার্থেই- আমাদের ভীন্নতরো প্রশ্নের মুখোমুখি করে। তাহলো, এই দমন-নিপীড়ণ-এবং জঙ্গি ট্যাগিংয়ের অভিমুখ কি শেষ পর্যন্ত দলটিকে নিষিদ্ধ করে ক্ষুব্ধ তরুণদলকে সত্যি সত্যিই একটি গোপন এবং আওয়ামীলীগের বহুলকাঙ্ক্ষিত ‘জঙ্গি’ ও ‘সশস্ত্র’ তৎপরতার দিকে ঠেলে দেওয়া- যা বাংলাদেশে বহুজাতিক সেনাবাহিনীর আগমণ নিশ্চিত এবং তরান্বিত করবে- এবং বাংলাদেশের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে’ ‘যোগদানে’র ‘বস্তুগত ভিত্তি’ খুঁজে পাওয়া যাবে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার: নতুনভাবে পুরনো প্রশ্ন
সস্তা দলীয় ও জাতীয়তাবাদি আবেগ এড়িয়ে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’ ও এর ‘রাজনীতি’ নিয়ে ভাবনা যারা করতে পেরেছেন এতদিন, অতি সম্প্রতি আওয়ামীলীগ নেত্রী মতিয়া চৌধুরী এবং আরো কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য তাদের চিন্তার খোরাক যোগাবে । নেতৃবৃন্দ বলছেন: ‘জনগণ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধী হিশেবে বিচার দেখতে চায়’। অবশ্যই এই বাক্যের মধ্যে ‘শীর্ষ নেতাদের’ শব্দবন্ধের পর একটি ‘ই’ প্রত্যয় যুক্ত করে পড়লে বুঝতে আরাম হবে, এবং সহায়ক হবে। বাক্যটি হবে: ‘জনগণ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদেরকেই যুদ্ধাপরাধী হিশেবে বিচার দেখতে চায়’। যুদ্ধাপরাধ বিচার- মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার- এর রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বিষয়ে আমরা পূর্বেই এই অনুমাণ করেছিলাম। বলেছিলাম- ‘জামাত বা কথিত ইসলামী রাজনীতিকে মোকাবেলার প্রশ্ন ও অস্ত্র হিশেবে’ই যুদ্ধাপরাধ রাজনীতির জন্ম- এবং তাই এই বিচার প্রক্রিয়া ব্যাপক হটকারিতার জন্ম দেবে এবং জাতীয় জীবনে উল্লম্ফন ও নৈরাজ্য তৈরী করবে। এর দুইরকম রূপ হতে পারে: এক. জামাতের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এইসব অভিযোগ জিইয়ে রেখে দলীয় অপ-রাজনীতি জারি রাখা। দুই. এইসব অভিযোগে স্রেফ জামাতের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিকী বিচার সম্পাদন করে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ রেখে দেওয়া এবং আদতে সম্ভবত তাই হবে । তাই, যুদ্ধাপরাধ বিচারে যাতে মানুষের চোখ স্রেফ জামাত নেতৃত্বের দিকেই থাকে- তার জন্য ভীন্ন একটি মামলায় তাদের গ্রেফতার সেরে নেওয়া হয়েছে এবং নজিরবিহীনভাবে ফাউ কিছু মামলায় তাদের দীর্ঘদিন রিমাণ্ডে রাখা হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, আমাদের আবারো আশঙ্কা প্রকাশ করা উচিত, যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দায় কি স্রেফ জামাতের শীর্ষ নেতৃত্বের বিচার-নাটক করেই শেষ হবে?
ব্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং শিবির: শাদা ও বিভিন্ন পোশাকের কিছু ভূত
একাত্তর এর পরের দিনগুলিতে কিছু শাদা গাড়ি এবং তাদের রহস্যময় আরোহী শহরময় চষে বেড়াত। এই গাড়িতে যাদের তোলা হত তাদের আর খোঁজ পাওয়া যেত না। গত ছয় মাসে প্রায় অর্ধশত মানুষ নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ দিয়েছে একটি নিউজচ্যানেল- শুনে যে কারুই রক্ষীবাহিনীর এইসব শাদা গাড়ির কথা মনে আসা স্বাভাবিক। এই নিখোঁজ হওয়া মানুষের মধ্যে আছে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ি, ছাত্র এবং প্রায় সবার নিখোঁজ হওয়ার খবরের সাথেই জড়িয়ে আছে র্যা ব, গোয়েন্দা সংস্থা, এবং পুলিশের নাম। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ বলছে, গত কয়েকমাসেই ৬১ টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ১০ টি পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এইসব কোনটারই দায় স্বীকার করে নাই র্যা ব, গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশ প্রশাসন। ২৯ জুন আওয়ামী সরকারের আমলে প্রথম হরতালের দিন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের বাসায় কিছু ‘র্যা ব পোশাকধারী’র হামলা, পরিবারের বয়োবৃদ্ধ নারীদের উপরে ‘ছাত্রলীগ স্টাইলে’ লাঠিপেটার দৃশ্য ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে সারা দেশের মানুষ দেখেছে। কিন্তু র্যা ব কর্তৃপক্ষের মিডিয়াকে দেয়া অনেকগুলি ভাষ্যের একটি ভাষ্য হলো,‘মির্জা আব্বাসের বাসায় সেদিন র্যা ব কোন অভিযান পরিচালনা করে নাই- এটি কে বা কারা করেছে তাদের জানা নেই’। একই দিন সংসদ সদস্য এ্যানির উপর লাঠিপেটার ঘটনা মিডিয়ায় দেশবাসি পর্যবেক্ষণ করলেও, আওয়ামী নেতৃত্বের দাবি- ‘পুলিশ তাদের উপর কোন হামলা করে নাই- এটি সাবোটাজ’। সরকার সমর্থিত পত্রিকা প্রথম আলোর তথ্যমতে, কিছুদিন আগে ‘বিএনপির মানববন্ধনের সময়ে এ কর্মসূচি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে- এই অভিযোগে পুলিশ বিএনপি কর্মীদেরকে লাঠিপেটা করে তাড়িয়ে দিয়ে নিজেরাই রাস্তা ব্লক করে মানববন্ধনের মতো দাঁড়িয়েছিল’। কিন্তু মেট্রোপলিটন পুলিশের দাবি- ‘পুলিশ কোন বাধা দেয় নাই’- এখানেও তাহলে পুলিশের পোশাকধারী অদৃশ্য ও রহস্যময় ভূত সম্প্রদায়ের আবির্ভাব। বিএনপির ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমকে ‘বহুদিন আগে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তুলে নিয়ে গিয়েছেন’ বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার, কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থা এখনতক ব্যাপারটি অস্বীকারই করে যাচ্ছে- চৌধুরী আলমের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারো বেশ আগে, গোয়েন্দা সংস্থার কিছু লোক ‘আমার দেশ’ পত্রিকা বন্ধের আগের দিন পত্রিকার প্রকাশক হাশমত আলীকে তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছিল তার পরিবার- কিন্তু বরাবরের মতই তারা ব্যাপারটি অস্বীকার করেছে। এইসব ঘটনার বিপরীতে, একটি অদ্ভূত ও কৌতুককর ঘটনা হলো, কোথাও ক্ষমতাসীনদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের টেণ্ডারবাজি এবং হলদখল, নারী-নিগ্রহ, পরস্পরের মধ্যে খুনোখুনি ইত্যাদি সংঘটিত হলে খোদ আওয়ামী নেতৃত্বই এক ধরণের ‘ভূতের আশঙ্কা’ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন, তা হলো ‘শিবিরের ভূত ঢুকেছে ছাত্রলীগে’। বক্তব্যটি অনেকটা এমন, ‘ছাত্রলীগের ভাল ছেলেদের ভিতরে শিবির ঢুকে এইসব অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে ছাত্রলীগকে যাতে খারাপ প্রমাণ করা যায়’। তো, আমরা বাংলাদেশের মানুষ এইসব রহস্যময় এবং ভয়ংকর ভূতদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবো?
এক-এগারোর পরের বাংলাদেশ: বিরাজনীতিকরণ ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভাষা
এক-এগারোর পরের বাংলাদেশ এবং এর গতি প্রকৃতি নিয়ে বহুত আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হয়েছে ইতিপূর্বে। এক এগারর ভূত কোন ব্যক্তি বিশেষ নয়, এটির প্রকাশ ঘটে এর বিরাজনীতিকরণ ও আরো কিছু বিবিধ চরিত্রে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের উপর ‘ব্রিটিশ কাউন্সিল’ পরিচালিত সাম্প্রতিক এক ‘গবেষণা’ মতে দেশের বেশির ভাগ তরুণ রাজনীতির ব্যাপারে পুরোমাত্রায় উদাসীন, রাজনীতিকে ঘৃণা করে। ভাবনার বিষয় হলো, এক-এগার’র সময় থেকে এ পর্যন্ত রাজনৈতিক তৎপরতার প্রতি তরুণদের এই অনিহাকে উসকে দেওয়া হয়েছে আর এতে ঘি ঢেলেছে এক-এগার’র সুবিধাভোগি ‘সুশিল সমাজ’ ও রাজনৈতিক দলগুলোর ‘সুবিধাবাদি’ অংশ। আর বর্তমানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি রাজনৈতিক দল ‘আওয়ামীলীগ’ সরকারে এসে এই ‘বিরাজনীতিকরণের খেলা’কে বিরোধীদল দমনের উপায়- একই সাথে, সম্ভবত নিজের অজান্তেই এক-এগারর এজেণ্ডা হিশেবে বাস্তবায়ন করছে।
লক্ষণীয় ব্যাপার, নির্বাচনী প্রচারণার একটি সুশিল উপায় বের করেছে এক-এগারর তৈরী করা নির্বাচন কমিশন। বড়ো কোন মিছিল-জনসভা না করা, স্রেফ পোষ্টার লিফলেট এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে ঘরোয়া মিছিল-সমাবেশ চলবে। চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে কোন বৃহৎ জন-সমাবেশের প্রতি নিষেধাজ্ঞা ছিল নির্বাচন কমিশনের। ২৯ জুন বিএনপির হরতালে প্রধান রাস্তাগুলোতে মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ ছিল- ডিএমপি কমিশনার এমনটিই নির্দেশনা জারি করেছিলেন হরতালের আগের দিন। এমনকি মিডিয়ারাজ্যে সুশিল সমাজের রিতিমত হরতাল-বিরোধী এবং আইনত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিবাদের উপায় এই ব্যাপারটারে নিষিদ্ধ করার প্রচারণাও চোখে পড়ার মত। বিএনপি ঘোষিত মানব বন্ধনের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এই অজুহাতে পুলিশের লাঠিপেটার সম্মুখিন ও পণ্ড হয়েছে। হরতাল খুবই খারাপ বস্তু, মানববন্ধনও ব্যাপক খারাপ জিনিশ। মিছিল-মিটিংতো প্রশ্নই আসে না- ভাবটি এরকম। লক্ষণীয়, জামাতের তিন শীর্ষ নেতা গ্রেফতারের পর জামাত-শিবিরের ছেলেদেরও মাঠ-কেন্দ্রিক তৎপরতা নেই। উপরন্তু, ডিএমপি কমিশনার প্রজ্ঞাপন জারি করে জামাত শিবিরের কর্মীদের প্রতি মিছিল-মিটিং-সমাবেশ না করার পরামর্শ দেয়- এবং মিছিল করাটারে আদালত অবমাননা হিশেবে অভিহিত করে এ ধরণের যে কোন প্রচেষ্টাকে কঠোর হস্তে দমনের ঘোষণা দেয়। এবং দেখা যায়, কুটনৈতিক মিশনগুলোতে দলটির তৎপরতার তুলনায়, মাঠে কোন কর্মী নেই। রাজনৈতিক দলগুলোকে কুটনৈতিক মিশনসমূহের ক্রিড়নক হতে আমরা দেখেছিলাম এক এগারর সময়ে- যার ফলে জরুরী অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। মাঠের রাজনৈতিক তৎপরতা- যেখান থেকে ক্ষমতার উৎপাদন হয়- রাজনৈতিক দলগুলো জনসম্পৃক্ততা তৈরী করে, তার প্রতি অদৃশ্য শক্তির বিধি নিষেধ- এবং তরুণদের অনিহা- এবং অথবা রাজনৈতিক দলগুলোর অনিহা আদতে কী অর্থ বহন করে? এবং এই কুটনৈতিক মিশনকেন্দ্রিক অপ-তৎপরতারে এক-এগারর ভূত ছাড়া আর কী বলা যাবে?
এক-এগার পরবর্তী সময়ের আর একটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন বেড়ে গেছে শুধু নয়, নির্যাতনের নতুন পদ্ধতি ও অমানবিক রূপের প্রয়োগ ঘটেছে সবখানে। অনেকেরই আশঙ্কা, শান্তিমিশনে বহুজাতিক সেনাবাহিনীতে থাকার অভিজ্ঞতা এবং আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনীর এমনতরো কর্মকাণ্ড অস্বাভাবিক নয়। তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান এর প্রতি নজিরবিহীন নৃশংস নির্যাতন, আর ইদানিংকার আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের প্রতি অকথ্য অমানবিক আচরণ ও নির্যাতন, র্যা বের ক্রসফায়ারে মৃত্যুর হার এবং পুলিশহেফাজতে একাধিক মৃত্যু লক্ষনীয়। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে’ উন্মাদ আমেরিকার কুখ্যাত আবুগারিব কারাগারের সেইসব কাহিনীর কিছুটা এক-এগারর সময় থেকে বাংলাদেশেও বাস্তব রূপ পেয়েছে। এক-এগাররর সরকারই প্রথম সম্পূর্ণ বিনা কারণে গ্রেফতারের স্বাভাবিকতা ও বৈধতা তৈরী করে।
এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পর বিস্তর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দুই হাজার নয় সালের উনত্রিশ তারিখের বিষ্ময়কর নির্বাচনের মাধ্যমে একদলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার আওয়ামীলীগ সরকার নাজিল হলে, এই পর্বকে আমরা এক-এগার দ্বিতীয় পর্ব হিশেবে অভিহিত করেছিলাম পূর্বের কোন এক লেখায়। প্রথম পর্বে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুবিধাভোগি ও স্বার্থপর অংশ যাদেরকে আমার সুশীল সমাজ হিশেবে চিনি, তাদের মাধ্যমে সমাজের বিরাজনীতিকরণ প্রচেষ্টা ছিল মোটাদাগে, দ্বিতীয় পর্বে বর্তমানে ক্ষমতাসীন একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির মাধ্যমেই সেই একই বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া সমাধা করার চেষ্টা চলছে চতুরভাবে। প্রথম পর্বের তৎপরতার দৃশ্যমান অংশ ছিল মোটা দাগের, যাতে কোনরকম গণতন্ত্রের ভাব না ধরেই রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দল সহ যে কোন রাজনৈতিক তৎপরতার বিরুদ্ধে চরমভাবে দমন ও নিপীড়ণ চালানো হয়েছে, আর দ্বিতীয় পর্বের এই প্রচেষ্টার দুইটি ভীন্ন রূপ আছে। এক. সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময়ী ও স্পর্শকাতর তরুণ সমাজকে ডিজিটাল বাংলাদেশের মত একটি দারুণ অনর্থ ফাঁপা শ্লোগানে মাতিয়ে তাদেরকে পুঁজি ও টেকনোলজির প্রশ্নহীন দাস ও রাজনৈতিকতাবোধহীনভাবে তৈরী করা। দুই. নির্বাচনী গণতন্ত্রের মোড়কে উগ্র ফ্যাসিবাদের উসকানির মাধ্যমে রাজনৈতিক ভীন্ন মতাবলম্বীদের দমন-নিপীড়ণ-নিষিদ্ধকরণের ধমকি- এই ক্ষেত্রে দলীয় গুণ্ডা বাহিনী, পূর্বাপর সুশীল সমাজ ও লেজুড় কোর্ট-কাছাড়ি-উচ্চ আদালত- এই সবকিছুকেই সুবিধামতো ব্যবহার করা হচ্ছে।
মুক্ত গণযোগাযোগ মাধ্যমে সরকারী খবরদারি আসছে
মুক্ত গণযোগাযোগ মাধ্যম যেমন ব্লগ ফোরামের উপর পূর্ণ সরকারী নিয়ন্ত্রণ এবঙ খবরদারির জন্য আইন আসছে- আইন প্রতিমন্ত্রীতো তাই বললেন। এখন তাহলে যে কোন ব্লগে মডারেশন এবং দমননীতি পালনের দায়িত্ব সরকারের।..
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০১০ দুপুর ১২:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


