
এটি একটি অনিরাপদ লেখা হতে পারে, একটি পপুলার গণমাধ্যমের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংবিধান পুনর্মমুদ্রণ ইত্যকার বিষয়ে আমার সাম্প্রতিক নোটগুলোকে রিএরেঞ্জ করেছিলাম এই শিরোনামে। যা প্রকাশ করার বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের অপারগতা জানতে পারি আজ। ব্লগে লেখালেখি করি, যতটা সম্ভব পপুলার গণমাধ্যমের নিরাপদ ভাষায় লেখাটারে ট্রান্সলেট করেছি- যেমন উকিল এর পর ডিগ্রি নির্দেশক ড. সংযোজন এবং মহামান্য শব্দের অভদ্র ও যথাবিধি ব্যবহার ইত্যাদি। যারা এই অতিরিক্ত অ-ভদ্রতার উৎপাতে অভ্যস্ত নন- তাদের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী।
বটে, এটি একটি মুদ্রণ ব্যবসার জিনিশ; মোটামোটি মুদ্রাক্ষরিক বিষয়াশয়। অবশ্যই সেরকমই হয়ে আসছিল, এটি একটি মুদ্রণ ব্যবসার রসদ ছাড়া আর কিছু ছিল না- জনগণের অধিকার রক্ষায় এর ভূমিকা ঠুটো জগন্নাথই ছিল, সেই বাহাত্তর থেকে এখনতক। এমনকি সেই সময় এটির মুসাবেদাকারীগণও যে এই ব্যবসায় বড় অঙ্কের টুপাইস কামায়নি, তাও হলফ করে বলা যায় না। আইনমন্ত্রণালয়ও এটি বিক্রি করে ভাল অর্থকড়ি কামায়- বটতলার আইনকাম মুদ্রণব্যবসায়ীরাতো বটেই। তাই, সংবিধান এখন বেশ মুদ্রনব্যবসার আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে যখন, অবাক হবার কিছু নেই।
পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় এবং এর পরের ঘটনাপঞ্জি এ বিষয়ে নতুন করে কথা বলতে উসকে দিল বরং। এ মামলার ফলাফল নিয়ে সংবিধান ব্যবসায়ী উকিল ড. কামাল হোসেন প্রথম গবেট মন্তব্যটি যখন করেছিলেন- তখনো এই ব্যবসায়ীরা একজোট হতে পারেন নাই সম্ভবত। তিনি বলেছিলেন: ‘পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের পর সংশ্লিষ্ট সংশোধনীগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সংবিধানে প্রতিস্থাপিত হয়ে গেছে। এখন পুরনো সংবিধানের কোন অস্তিত্ব নেই।’ জ্যোষ্টতা লঙ্ঘন করে নিযুক্ত সদ্যনতুন মাননীয় প্রধান বিচারপতি, যিনি স্বাধীনতার ঘোষক মামলা, শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা মামলা সহ বেশ কিছু সরকারপছন্দ মামলার রায়দাতা- শুধু তাই নয়- ভবিষ্যত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুগত প্রধান উপদেষ্টা বানানোর ইচ্ছেতেই যাকে নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছে বলে বিরোধীদলের অভিযোগ আছে- সেই মহামান্য এবিএম খায়রুল হক তাঁর প্রথম পাবলিক আলাপচারিতায় সংবিধান পুনর্মুদ্রনের আহবান জানিয়েছেন সরকারের প্রতি। একটি হাস্যকর অবাস্তব আইনবহির্ভূত আহ্বান- উকিলের মুখে শুনতে কৌতুক লাগলেও প্রধান বিচারপতির মুখে শুনতে মোটেই কৌতুক লাগে নাই, বরং মনে হয় বড়ো রকমের কিছু ঘাপলা ঘটছে। কেবল রায় এবং গায়ের জোরে সংবিধান পরিবর্তনের এই ভয়ানক খেলায় তিনি কেবল রায় দিয়েই ক্ষান্ত হন নাই- বরং পাবলিক ফোরামে প্রথম সুযোগেই সরকারকে সংবিধান পরিবর্তন নয়, পুনর্মুদ্রনের আহ্বান জানালেন। যদিও সরকারী দল লোক দেখানোর জন্য হলেও তথাকথিত সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে- কিন্তু জনাব খায়রুল হক সাহেব একধাপ এগিয়ে গেছেন- তিনি সংসদীয় কমিটির এই কর্মযজ্ঞকেও থোড়াই তোয়াক্কা করছেন, তার আগেই সরকারকে সংবিধান পুনর্মুদ্রনের আহ্বান জানিয়েছেন। দেখা গেল, মাননীয় নতুন প্রধান বিচারপতির এই আহ্বানের প্রায় সাথে সাথেই তাঁর অন্য অনেক সাহাবীও জুটে গেলেন এবং তৎপর হলেন। সর্বজনাব বিচারপতি গোলাম রব্বানী, উকিল রোকনউদ্দীন মাহমুদসহ সুযোগের আরো প্রচুর উকিল-কোকিলবৃন্দ। তাঁরা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় রীতিমত ঝড় তুললেন এবং আইনমন্ত্রী- এমনকি সংসদীয় কমিটির সবাইকে আদালত অবমাননাকারী হিশেবে দুষলেন। তার ক’দিন পরেই হাইকোর্টের নবনিযুক্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ একটি রীট মামলার রায়ে বললেন, বাংলাদেশ এখন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এবং সবশেষে মাননীয় আইনমন্ত্রীর ঘোষণা- সংসদীয় কমিটির আগামী বৈঠকেই সংবিধান পুনর্মুদ্রণের সিদ্ধান্ত। এবং অবশেষে সংসদীয় কমিটির বৈঠক থেকে ঘোষণা আসল আজ, সংবিধান পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের আলোকে পুনর্মুদ্রিত হবে, সংশোধন নয়।
হাঁ, সে বেশ আলো বটে, যার অন্ধকারে পুরা দেশশুদ্ধ মানুষ, আওয়ামীলীগ, সংসদীয় কমিটি, এমনকি খোদ বিচারকরাও বিভ্রান্ত ছিল এতদিন। এই আলোর গতি এত ধীর যে, নতুন প্রধান বিচারপতি এসে তাঁর পিড়িতে বসার আগ পর্যন্ত আমরা তার দ্বারা অলোকিত হতে পারলাম না। আবার নতুন প্রধান বিচারপতির এতই অলৌকিক ক্ষমতা যে, তিনি উচ্চারণ করলেন 'হও’- অমনি সংবিধান পুনর্মুদ্রিত হওয়া আরম্ভ করল। পনেরশ শতকীয় জর্মান মুদ্রক জোহান্স গুটেনবার্গ ভেবে আশ্চর্য হতে পারবেন হয়তো- তাঁর উদ্ভাবিত মুদ্রণপ্রযুক্তিই এখন স্রেফ একটা ‘হও’ এর মাধ্যমে সব কিছুর নিয়ন্তা- স্রেফ লেখার হরফে মুদ্রিত হলেই একটা রাষ্ট্রিয় সংবিধান পর্যন্ত হয়ে যায়- আর কিচ্ছু লাগে না।পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় কেমন হলো- না-হলো এই তর্ক্ক জ্ঞানীদের, তা বিস্তর হয়েছে, তবে একটা বিষয় পরিস্কার যে, এই রায়ের কোন অর্থপূর্ণ ও কার্যকর ফলাফল নেই। ফলত আইনি গুরুত্ব নেই- শোরগোল তৈরী করা ছাড়া। প্রায়োগিক গুরুত্ব থাকত, হাইকোর্ট যদি যে কোন অসাংবিধানিক ঘটনা ঘটার পরপরই স্ব-প্রণোদিত (sou moto) হয়ে তাকে অবৈধ ঘোষণা করত- এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সংবিধান সমুন্নত করার নির্দেশ দিত। যদিও জিয়ার ক্ষমতা দখলের কোনও সংবিধান ও আইনি ভিত্তি নাই, ‘অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে তৈরি হওয়া ক্ষমতা, আইনশাস্ত্রের ভাষায় যাকে বিশুদ্ধ ক্ষমতা বলে পরিচয় করানো হয়- যে ক্ষমতা আইনের বাইরে থেকে এসে আইন প্রণয়নের নিজস্ব হিম্মত খাটায়’- সেই ক্ষমতাবলেই জিয়ার পঞ্চম সংশোধনী বৈধ ছিল এবং অনিবার্যও ছিল, জিয়া না হলে অন্য কাউকে এর দায় নিতে হত- বিশেষত চতুর্থ সংশোধনীর পর এর কালো অংশগুলো বাতিল করার দায়। পচাত্তরের পনেরই আগষ্ট দুঃখজনকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের পতনের পর যে রাজনৈতিক ও পদ্ধতিগত শূন্যতা রাষ্ট্রে বজায় ছিল, জিয়া এবং পঞ্চম সংশোধনী তার মধ্যে একটি ব্রীজ, যা বর্তমান জনপ্রিয় ‘বহুদলীয়’ গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ তৈরী করেছে এবং আওয়ামীলীগসহ দেশের বর্তমান সব রাজনৈতিক দল এই সংশোধনীর বেনিফিশিয়ারী এবং তাদের বৈধতাও এখান থেকেই। হাইকোর্ট তাই এই অনিবার্যতাকে পুরোপুরি 'বাতিল' ঘোষণা করতে পারে নাই- যদিও 'অবৈধ' ঘোষণা কিছু বিভ্রান্তি তৈরী করেছে। এ বিষয়ে বরং বিডিনিউজে প্রকাশিত আমার গত লেখায় উদ্ধৃত ভারতীয় ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের বক্তব্য ধার করি, তিনি বলেছেন, ‘আমরা বর্তমানের রাজনীতি দিয়ে অতীতের ইতিহাসকে পরিবর্তন করতে পারবো না’।
এই সব তর্কই যে সংবিধান নিয়ে, বৈধতা-অবৈধতা নির্ণয়ের আইনি হট্টগোলের বাইরে আরো একটু ভিতরে আতুড় ঘরের আলাপ পাড়ি- আমাদের বিচারকবৃন্দের এই মোটাদাগের বৈধতা-অবৈধতারে ডিঙিয়ে। সেটি হলো, মূলত গঠনদশায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য উকিল-মোক্তাররা মিলে যে সংবিধান মুসাবেদা করেছিলেন তার জন্য একটি পৃথক সংবিধানসভা ডাকার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন সচেতন রাজনৈতিক মহল; অথচ তাদের সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে, একটি রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব- তার সংবিধান এডাপ্ট করেছিলেন অব্যবহিত পূর্বের পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংবিধানসভার জন্য নির্বাচিত সদস্যরাই-,যে রাষ্ট্রের নিপীড়ণের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ সংগ্রামের ফল এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র। ফলত যে মুসাবিদা সংবিধানটি আমরা পেলাম তা প্রচুর টোকাটোকি এবং উদ্ভট কলোনিয়াল ধারণায় ভরপুর- এবং বঞ্চিত হলাম একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্তরের ভিতর থেকে তার নিজস্ব সংবিধানের উন্মেষমুহূর্ত থেকে। এই সংবিধানকে তাই রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক রূপান্তরে বিশ্বাসী কেউ চাইলেই চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, এমনকি আইনিভাবেই।
যাই হোক, বাংলাদেশের একটি সংবিধান হয়েছে, মোটামোটি কোন কোন ক্ষেত্রে আসমানি কেতাবের সাথে এর তুলনা করা যায়। এই সংবিধানের বিশেষজ্ঞরও অন্ত নেই- হরহামেশাই তাঁরা এ বিষয়ে কথা বলতে ঠাকুরমার ঝুলি খুলে বসেন। এ বিষয়ে তারাই অনেক ভাল বলতে পারবেন। আমরা মূর্খরা যদিও এ বিষয়ে মাঝে মধ্যে নাগরিক অবস্থান থেকে নিজেদের অধিকারের জায়গায় কথা বলার চেষ্টা করি, বুঝি যে, এ বড় উচ্চমানের সাহিত্য- যেন, এখানে সাধারণ্যের প্রবেশ নিষেধ- প্রবেশ যদিওবা কোনরকমে করতে পারি- মৌলবাদি ‘বিশেষজ্ঞবৃন্দ’ সাথে সাথে তরবারি নিয়ে হাজির হন- যেন বা এটি বেদগ্রন্থ- ব্রাহ্মণ ছাড়া কারো কিছু কইতে নেই এ বিষয়ে- কইলেও কিছু বিশেষ রকম ‘অবমাননা’ মামলা হয়- আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে যায় বলে। তবুও, মাননীয় প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর নতুন জন্ম নেওয়া সাহাবীবৃন্দকে বিনীতভাবে একটু ধৈর্য ধরে পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের শেষ দুটি লাইন পড়তে অনুরোধ করবো। যদি আশে পাশে না থাকে বিডিনিউজ থেকেই এই রায়টি ডাউনলোড করে পড়ে দেখতে পারেন, ওখানে লেখা আছে: “However, it is the Parliament which can make law in this regard. Let us bid farewell to all kinds of extra constitutional adventure for ever.”.. মানে, ‘এই রায়ে যাই থাকুক না কেন, এ বিষয়ে একমাত্র সংসদই পদক্ষেপ নিতে পারবে, আর কেউ নয়’। আমার ইংরেজি বিদ্যা ভাল নয়, মোটামোটি উম্মি মানুষ, তাই অন্য কোন ‘বিশেষজ্ঞ’ যদি এই বাক্যটির অন্যতর অর্থ হাজির করতে পারেন আমি বাধিত হবো। ভাল কথা, মাননীয় প্রধান বিচারপতি, আপনি এই জাজমেন্ট মানছেন তো? নাকি, আপনাকেই সেই মহামান্য জ্ঞানী বলে মানব, যিনি এর নতুন কোন ব্যাখ্যা হাজির করবেন আমাদের কাছে?
অবশ্য জনাব সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, যিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কর্তৃক গঠিত সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি, তিনি আমাদের তথ্য দিচ্ছেন, যে, আদালতের রায়ের ভিত্তিতে এই ধরণের সংবিধান পুনর্মুদ্রণের ব্যাপার এর আগে বহুত হয়েছে বিএনপির আমলে, তখন এই ব্যাপারে কেউ আপত্তি তোলে নাই। শুনে, মনে হবে, তাই তো! কিন্তু, সুরঞ্জিত গুপ্ত সাহেব এখানে আমাদেরকে নতুন করে বিভ্রান্ত করার সুযোগ নিলেন। প্রকৃত সত্য হলো, সংসদে বিল আকারে পেশ করার পর পাশ হয়ে এসে তারপরই সংবিধানে সেটি স্থান পেয়েছে- স্রেফ আদালতের রায়ে একটি সংবিধান পুনর্মুদ্রণ বা পরিবর্তন হয় নাই। সুরঞ্জিতের দেওয়া তথ্যটি একটি গবেট তথ্য- যার মধ্যে আইন ও সত্য কোনটাই নেই।
তাহলে, এই সময়ে কোর্ট-কাছারি-উচ্চ আদালতের কাঁধের উপর বন্দুক রেখে, বিচারালয়ের ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের দলীয় যজ্ঞ এবং একই সাথে এই যজ্ঞে বিচারালয়ের কুশিলবদের নগ্ন অত্যুৎসাহ- এইসবের জরুরী পাঠ দরকার বলেই মনে করি। অন্তত নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এর কোনটাই খুব ভাল ইঙ্গিত নয়। রাজনৈতিক বিষয়-আশয়ে কোর্ট-কাছারির এই অতি-আগ্রহ কতটা গ্রহণযোগ্য এই বিতর্কটি খুবই জরুরী প্রপঞ্চ হিশেবে হাজির এই সময়ে আমাদের কাছে, রাজনীতিবিদ-বুদ্ধিজীবী-আইন ব্যবসায়ী সবার মূর্খতা এবং অথবা সুবিধাবাদিতা ও ফ্যাসিবাদি মনোবিকারের কারণে। এই মনোবিকার, আওয়ামী হিসিটিরিয়ার কল্যাণে, এখন ‘মাননীয়’ হাইকোর্ট পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। দেখা গেল, আওয়ামী বুদ্ধিজীবীগণ একটি দল বা ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে ইচ্ছুক- তাও হাইকোর্টের কাঁধে বন্দুক রেখে; পঞ্চম সংশোধনী মামলার কল্যাণে, নিজেরা সাহসিকতার সাথে তার দায় নিতে রাজনৈতিকভাবে তৈরী নয়। মূলত রাজনীতির মোকাবেলায় হাইকোর্টই এখন শাসকমহলের হাতিয়ার। ‘বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানো’ এই ব্রিটিশরাজদের ঠাট্টা এখন আওয়ামীলীগ করছে- যত্রতত্র, সব বিষয়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদিও একটি দলের নেতা, এবং তাঁর মহান পিতার মতই প্রশংসা, চাটুকারিতা এইসব ভালবাসেন- নিজেকে কেন্দ্র করে জননৈরাজ্যকে উপভোগ করেন খুব- কিন্তু এইসবের ফলাফল কি তিনি কল্পনা করতে সক্ষম না?
বর্তমান বাংলাদেশের জনপ্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নাগরিকদের মধ্যে সরকার ও আওয়ামীলীগের পেশি শক্তির প্রতি যে সন্ত্রস্থ ও অস্থিরতার ভাব বিরাজমান- গণমাধ্যম, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক তৎপরতার উপর যে প্রতিনিয়ত খড়গ, যে ভয়ঙ্কর মানবাধিকার পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশে- গণবিরোধী ও ফ্যাসিবাদি অবস্থানের কারণে সরকারের সাথে জনগণের যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে- আমরা ভাবতে চাই- সম্ভবত উল্লেখিত চাটুকারবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীকে সেইসব বিষয়ে যথাযথ সংবাদ দিচ্ছে না। যার প্রমাণ জাতিসংঘের টুনকো অনুষ্ঠান থেকে দেশে ফেরার পর প্রধান সড়কগুলো ব্লক করে কয়েক ঘন্টা ধরে জনগণকে দুর্দশায় ফেলে দেশের আনাচে কানাচে থেকে কর্মী জড়ো করে প্রধানমন্ত্রীকে সম্বর্ধণা প্রদান, যেন তাঁর ভ্রম হয় এখনো এই সরকার এবং তাঁর উপচে পড়া জনপ্রিয়তা বিদ্যমান। দেখা গেল, বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে না যাওয়ায় ৪৪ ছাত্রলীগ কর্মীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে বাহির করে দেওয়া হয়েছে। পাবনার প্রশাসনিক ক্যাডারের কর্মকর্তাগণকে পরীক্ষার হলে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সম্মিলিত পিটুনি- প্রতিকার চাওয়ায় বদলী এবং সবাইকে ওএসডি করে দেওয়ার ঘটনা, প্রশাসনে দলীয়করণের ব্যাপারে কয়েকজন কেবিনেট মন্ত্রী এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য ঘোষণা- বিপরীত কিছু করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগ এর অবিরাম পরষ্পর খুনোখুনি, তারপর তার প্রতিকার না করে দলের ভিতর ছাত্রশিবির বা ছাত্রদলের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার- যেখানেই আন্দোলন, বিরুদ্ধ মত, ছাত্র বা শ্রমিক অসন্তোষ- সেখানেই শিবির বা যুদ্ধাপরাধীদের ষড়যন্ত্র খুঁজে পাওয়া- এইসবের শেষ কোথায়?
প্রধানমন্ত্রী কি বুঝতে অক্ষম যে, একটি অন্যরকম জরুরী অবস্থা জারি রেখেছেন তিনি, তাঁর দল এবং তাঁর চারপাশের এইসব ক্ষতিকর চাটুকরবৃন্দ- যা তাঁকে এবং তাঁর দলকে গণবিরোধী অবস্থানে নিয়ে এসে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এবং জনগণ কখনো কাউকে ক্ষমা করে না। এবং জনগণ কখনো পরাজিত হয় না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

