বিডিনিউজে প্রকাশিত আমার এই লেখাটিতে ব্লগাররা তাদের সংবিধান-ভাবনা নিয়ে আলাপ করতে পারেন। এখানে অথবা লেখার মূল লিঙ্কে। এখানে চুম্বকাংশ শেয়ার করা হল। পুরো লেখাটা বিডিনিউজের মতামত-বিশ্লেষণ থেকে পড়তে হবে।
..সংবিধান বানানো ও সংশোধনের ব্যাপারটাকে চায়ের টেবিলে নিয়ে সমাধান করার চেষ্টা পুরোপুরি একটি অরাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াটাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করা খুবই জরুরী। বাংলাদেশে বর্তমানে চায়ের টেবিলে বসে সংবিধান বানানো ও সংশোধনের নামে রাষ্ট্রের উপর দলীয় খায়েশ ও দলের স্বার্থ সংশ্লষ্ট ইচ্ছে-অনিচ্ছে চাপিয়ে দেয়ার যে উন্মাদনা চলছে, তার বিষয়ে আমাদের নাগরিকতার জায়গা থেকে একটি পর্যালোচনা খাড়া করানো এই লেখার অভিমুখ। আমরা একই সাথে মনে রাখছি, এটি বাংলাদেশে পূর্বাপর দলীয় দুর্বৃত্তপনার ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সাথে মিলিয়ে পাঠ করার বিষয়। রক্তাক্ত প্রতিরোধ সংগ্রামের মাধ্যমে ইংরেজি ১৯৭১ সালে ‘স্বাধীনতা’ লাভের পর থেকে এই পর্যন্ত ঐতিহাসিকভাবে শাসকগোষ্ঠি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংবিধান নিয়ে ধারাবাহিক অপকর্ম করেছে, ফলশ্রুতিতে এই সংবিধান আর এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠির জন-ইচ্ছের দলিল হিশেবে হাজির নেই। কাজেই গণতান্ত্রিক এবং প্রায়োগিক বিচারে সংবিধান নামের এই বস্তুটি বর্তমান বাংলাদেশে নষ্ট অর্থহীন কাগজের দলাতে পরিণত হয়েছে। বিশেষত সংবিধান পুনর্মুদ্রণের সাম্প্রতিক জগাখিচুড়ি ঘটনাবলিতে- কতকটা ‘মহামান্য’ বিচার বিভাগের আদেশে, কিছুটা ‘সার্বভৌম’ সংসদীয় কমিটির ইচ্ছেয়, এটি এর আইনগত ও বাস্তবিক অস্তিত্বের (de jure and de facto) ব্যাপারেও নাগরিকদের মধ্যে যথেষ্ট বিভ্রম ছড়িয়েছে।..
---------------------------------------
..উপমহাদেশের ইতিহাসে চায়ের আড্ডায় আলোচনা সেরে বৃটিশ উপনিবেশ থেকে ‘স্বাধীনতা’র মোয়া ভিক্ষা ও ব্রিটিশ শাসক শ্রেণী কাম ভারতীয় নেতৃবৃন্দের যৌথ ইচ্ছে-অনিচ্ছেতে দেশ বিভাগ ও ভূখণ্ড ভাগ-বাটোয়ারার ঘটনা আছে। এই ধরণের ঘটনায় ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতার অন্তর্নিহিত মর্মার্থ- এদেশের মানুষের হাজার বছরের লড়াই, সংগ্রাম ইত্যাদির ভিতরকার নানা বাঁক, টানাপোড়ন ও শক্তির জায়গাগুলো উপেক্ষিত হয়েছে বলে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলি। সেই চা-চক্রের খেসারত হিশেবে বিশ বছরের অধিক কাল বাংলার ভূখণ্ড ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হিশেবে থাকলেও তার পরে এদেশের জনগণের গণইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে ইংরেজি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামে। ইতিহাস থেকে শিক্ষার কারণে, এদেশের জনগণ কাউকে দেশবিভাগের মত হঠকারী উপায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মীমাংসা চায়ের টেবিলে সারার সুযোগ দেয় নাই। যদিও সেসময়কার দলীয় নেতৃত্ব সবসময় চায়ের টেবিলে ও ক্ষমতার ভাগাভাগিতেই গণ-ইচ্ছের টুঁটি চেপে ধরার প্রয়াস খুঁজছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। জনগণ স্বেচ্ছায় গণপ্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে নেতৃত্বের এমন ইচ্ছেকে সফল হতে দেয় নাই। প্রতিরোধ সংগ্রামে এদেশের জনগণ জয়ী হবার পর, আবারো তাদের উপর সেই চা-চক্রের অগণতান্ত্রিক শক্তি এবং তাদের প্রণীত সংবিধান চেপে বসে, যাকে আমরা ভক্তিভরে ৭২ এর সংবিধান নামে ডাকি। হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং বক্তব্য অনুযায়ী ইংরেজী ২০১১ সালের বর্তমান বাংলাদেশ এখন ৭২ এর সংবিধানেই বিরাজ করছে। পাকিস্তানের সংবিধান সভার জন্য নির্বাচিত আওয়ামীলীগের সদস্যগণ কর্তৃক গৃহীত এই সংবিধানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্নগুলি, অথবা একটি স্বাধীন দেশের হৃদয়ের ভিতর থেকে কেন নতুন সংবিধান সভা আহ্বান করা হলো না, সেই বিতর্ক এ ক্ষেত্রে খুবই জরুরী প্রশ্ন হলেও, সেই সময়ে প্রণীত সংবিধানের অগণতান্ত্রিক চরিত্রের কথাটির আলোচনা আরো বেশি জরুরী। এটি এমনই এক অগণতান্ত্রিক ও অথর্ব সংবিধান ছিলো, এর প্রণেতা বালাদেশের তৎকালীন নেতা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দেশের ক্ষমতাকেন্দ্রে নিজের চিরস্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কলমের এক খোঁচায় চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এর ফাঁসি কার্যকর করেন। যার কোন প্রতিরোধ বা প্রতিকার এই সংবিধান নিজের ক্ষমতা-পরিধিতে করতে পারে নাই।
---------------------------------------
..ইতিহাসের ঘণ্টাধ্বণি আবার নাড়িয়ে দিতে সবাই প্রস্তুত। কিন্তু দেখা গেল, সেই সম্ভাবনার মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামের এক অগণতান্ত্রিক এলিট ভূত এসে চেপে বসল বাংলাদেশের জনগণের ঘাড়ের উপর। সাংবিধানিক বিতর্কের আসরে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধারণার গণতান্ত্রিকতাকে প্রশ্ন করে- এমন আলোচনাগুলোকে প্রাসঙ্গিক করতে ব্যর্থ হয়েছেন আমাদের বুদ্ধিজীবী মহল এবং সাথে সাথে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বরং তার সুযোগ নিয়েছে। নিজ নিজ দলীয় ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার ধান্ধায় তারা এই সরকারব্যবস্থাকে বাতিল অথবা জারি করার মতলবে থাকছে সবসময়- গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত, মৌলিক মানবাধিকার হরণ ও এ সংক্রান্ত বিতর্কগুলোর চোখে ধুলো দিয়ে । লক্ষ করার বিষয়, বর্তমানে আদালতের মর্যাদা রক্ষার নামে ‘আদালত অবমাননা’ আখ্যা দিয়ে এক ধরণের জুরিস্টোক্রেসি বা বিচার বিভাগীয় অভিজাততন্ত্র সক্রিয়ভাবে বহাল আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রব্যবস্থায়। এটি বহুলাংশে আমাদের সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকারের বিপরীতে হুমকি হিশেবে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাতেই বাংলাদেশে এই বিচারবিভাগীয় অভিজাততন্ত্রের বীজ। এই ব্যবস্থাতে সব রাজনীতিবিদ বা নাগরিকের বিপরীতে বিচারপতিদেরকে ঐশ্বরিক পবিত্রতা দেয়া হয়েছিল। জেনে রাখা ভাল, এই পবিত্র ঈশ্বরগণকে আমাদের সংবিধান রাষ্ট্রের বিপরীতে জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করেছে, যার কারণে হাইকোর্টে রীট অধিকার নিয়ে নাগরিকগণ ফরিয়াদি বনে যায়। দেখা যাচ্ছে, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা-বলে তাঁরাই এখন সেই রীটের অধিকারসম্পন্ন নাগরিকগণকে ‘আদালত অবমাননা’র অযুহাতে বিনা বিচারে কাটগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখে, অথবা যেমন ইচ্ছে সাজা দিয়ে, এমনকি অ-আদালতীয় ভাষায় অপমানও করছেন কোন কোন ক্ষেত্রে। এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নাগরিক অধিকার হননের বিরুদ্ধে আইনি বা সাংবিধানিক প্রতিকার কোন কর্তৃপক্ষ দেবেন, আমাদের অগণতান্ত্রিক সংবিধানে সেই কথাটিও স্পষ্ট নেই। আবার এই একটি ব্যবস্থাবলেই, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত এখন দলীয় রাজনীতির আখড়া ও ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।..
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০১১ রাত ৮:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


