somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাটির ময়না ও তারেক মাসুদের লড়াই

২৩ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ৮:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


তারেক মাসুদ

তারেক মাসুদের লড়াই ‘দেশপ্রেম’ গোছের কিছু ছিল না। তারেককে বোঝার এই প্রারম্ভমুহূর্ত আমাকে আলোড়িত করে, কারণ এই ‘দেশপ্রেম’ ব্যাপারটি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী চিন্তা থেকে উদ্ভূত। ফলত সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদের সাথে এর বিভেদ সামান্য, বরং সখ্য আছে। বাংলাদেশ বিপ্লবোত্তর জনপ্রিয় ও আর্ট উভয়ধারার বাংলা চলচ্চিত্রের স্রোত থেকে শুধু নয়, শিল্পের অন্যান্য ধারা থেকেও আলাদা করে তারেকের কাজের গুরুত্ব চিহ্নিত হয় আমার কাছে এই জায়গায় এসে। এটি বোঝার জন্য নোক্তা হল, তারেকের সিনেমা স্রেফ ‘দেশপ্রেমিক’দের প্রকল্প মুক্তিযুদ্ধব্যবসাতে নিমজ্জিত থাকে নাই। বরং তাঁর লড়াই ছিল আধিপত্যবাদি ইতিহাস দ্বারা নির্ণিত ‘অদেশপ্রেমিক’ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ‘অপর’ হয়ে থাকা জনগোষ্ঠিকে বাঙালী জাতীয়তাবাদের আলখেল্লাধারী ‘দেশপ্রেমিক’ এবং সাংস্কৃতিক বর্ণবাদীদের কামনা-বাসনা থেকে আলাদা করে বোঝা।

এই ‘অদেশপ্রেমিক’ অপর জনগোষ্ঠী কারা–তার জন্য একটি ঘটনার বরাত নেবো, সংক্ষিপ্তভাবে। দুই হাজার আট সালে জরুরী অবস্থার কোনো একদিন লালন ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে মাদ্রাসা ছাত্রদের বিরুদ্ধে ‘প্রগতিশীল’ সংস্কৃতিকর্মীরা চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ শ্লোগান দেয়: ”আমাদের লড়াই এমন এক শক্তির সঙ্গে, যারা বোঝে না ফুল কী, সংস্কৃতি কী, গান কী, কবিতা কী–”। এই শ্লোগানটি, এর ভিতরে যে বিদ্বেষী বর্ণবাদ লুক্কায়িত, তা আমি বোঝার চেষ্টা করেছি তখন। এর শেকড় কোথায়?


মাটির ময়নার কাজী সাহেব, স্ত্রী পুত্র কন্যা সহ।

এই ঘটনার বহু আগেই তারেক মাসুদ মাটির ময়না নির্মাণ করেছেন। আবার এসবের বহু আগেই দুই হাজার এক সালের এগার সেপ্টেম্বর দুনিয়াতে ‘নাইন-ইলেভেন’ ঘটে গিয়েছে। ফলত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুলিয়া দুনিয়াবাসীর ঘাড়ের উপর লটকে পড়েছে। তারো বহু আগে ১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয় এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠির রাজনৈতিক অভিজ্ঞান হিসেবে। তারো আগে আক্ষরিক অর্থে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা ঘটে ১৯৪৭ সালে। এসবই ইতিহাস। নজর দিলে দেখা যায়, এইসব ইতিহাসেরই গভীর গোপনে একটি আধিপত্যবাদি ও বর্ণবাদী কুশীলব হাজির ছিল। যা উপরের এই শ্লোগানে হঠাৎ উৎকটভাবে জানান দিয়ে ওঠে আমাদের কাছে, মাটির ময়না নির্মিত হবার বহুদিন পরেও। উপনিবেশের আদলে ও সুবিধাভোগী হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর স্রেফ অনুকরণে এই ভূখণ্ডে হঠাৎ যে ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উন্মেষ, ইতিহাসের এই বর্ণবাদী কুশীলবের বীজ সেখান থেকেই। যারা দৃশ্যত এলিট এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামে সবসময় সুবিধাবাদি ও আপোষকামি। ফলে বাংলাদেশ-বিপ্লবের অন্তর্নিহিত মর্মার্থ–হাজার বছরের লড়াই, সংগ্রাম ইত্যাদির ভিতরকার নানা বাঁক, টানাপোড়েন ও শক্তির জায়গাগুলোকে অস্বীকার ও ঘৃণা করে পুরোপুরি এলিয়েন হয়ে। তাই, সকল লুকোছাপার পরও, এই শ্রেণীর সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিরা মনের গভীর গোপন কথাটি উচ্চারণ করে ফেলেছে সেদিন সেই শ্লোগানে। যে, তাদের নিয়ত লড়াই হল তাদের শ্রেণীর নিজস্ব ফুল পাখি লতা-পাতা-গান সম্পর্কে ‘মূর্খ’ অপর গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। এই শ্লোগানটি ভয়ঙ্কর হলেও, অভিনব ব্যাপার নয়। অন্তত যাদের অভিজ্ঞতায় উপনিবেশের ইতিহাস আছে, যাদের আফ্রিকান কালো মানুষের দাসত্ব এবং আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের পদানত করার ইতিহাস পড়া আছে। এবং সাথে সাথে যারা এটির রাজনৈতিক পাঠ করতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের কাছে। সেই সময়েও এমন কথাটিই শোনা গিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদিদের মুখে। ওরা বোঝে না ফুল কী, সংস্কৃতি কী, গান কী, কবিতা কী। ওরা অসভ্য, তাই ওদের নির্মূল কর, পদানত কর, দাস কর এবং হত্যা কর।..

বিডি আর্টস থেকে ভূমিকাংশ
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ৮:০৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×