করিম সাহেব বাজারে যাবেন, তার আবার প্রতি সোমবার বাজার করার অভ্যাস। ঝড়-তুফান কোনো কিছুই আটকিয়ে রাখতে পারেনা তাকে, বাজারে তিনি যাবেনই। তো আজ সোমবার, কিন্তু সকাল হতেই তার মেজাজটা খিটমিট করছে, কাউকে পেটাতে পারলে ভাল হত। করিম সাহেবের রাগ হলে হুশজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, কাউকে না পেটানো পর্যন্ত তার রাগ কমেনা। আজ কাকে পেটাবেন সেটা ভাবছেন। গত সোমবার তার শ্যালককে পিটিয়ে সে এক মহা গ্যান্জাম, শ্যালককে পিটিয়ে কমোডের মধ্যে মাথা চেপে ধরে রেখেছিলেন ১ ঘন্টা। বেচারা এখন কমোড দেখলেই ভয় পায়।
রোজ সকালে তিনি রং চা পান করেন। তার রং চা আবার আমরা যেমন করে খাই তেমন করে করা হয় না। তার চায়ের পানি "মাম" কোম্পানির ১২ টাকার বোতলের পানি হতে হবে, বড় বোতল হলেও হবেনা, ছোট বোতল হলেও হবেনা
এটার একটা কাহিনী আছে, সে কথায় পরে আসছি। আর তার চা পাতা আসে দার্জিলিং থেকে, সেখানে তার ছোট ছেলের শশুরের ভাইয়ের মেয়ের জামাই থাকে, উনি প্রতি মাসে ৭৫০ গ্রাম ( কোন কোন মাসে ৭৭৫ গ্রাম)চা পাতা পাঠিয়ে দেন। প্রতিদিন করিম সাহেব ২৫ গ্রাম চা পাতার চা খান।
তার চা বানানোর জন্য আলাদা একজন লোক আছে, তার নাম হাসমত। ছোটবেলায় তার চেহারা হাঁসের মত চোখা ছিল তাই তার নাম হাসমত রেখেছিল তার চাচার মামা। চায়ের উপাদানগুলো করিম সাহেবের দেরাজে থাকে, তিনি সকালে হাসমত কে সবকিছু বুঝেয়ে দেন। আর তার চায়ের পানি ফুটাতে দেওয়া হয় ঠিক সকাল ৬টা ১৯ মিনিটে, এই সময়ের প্রতি আবার করিম সাহেবের বিশেষ দুর্বলতা আছে, সেই কাহিনীতে পরে আসব। তিনি চা পান করেন ঠিক ৬টা ২৯ মিনিটে।
আজ ৬টা ৩২ মিনিট হয়ে গেল, চা আসছেনা, যাক মাইর দেওয়ার মত একজন কে পাওয়া গ্যাছে, মাইরের মধ্যে ফযিলত আছে।
আজ হাসমত কে রামধোলাই দেওয়া হবে। কারণ চা এর পানি চুলায় চাপিয়ে দিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, গত ২৫ বছরে করিম সাহেব এই প্রথম চা এর শিডিউল মিস করেছেন।বাসার সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে হাসমত আর একপাশে আরাম কেদারায় করিম সাহেব, সবাই এখন " মাইরের ঘর" এ উপস্হিত।
করিম সাহেব বাসার শেষপ্রান্তে এই ঘরটি তৈরি করেছেন- আগে তিনি তার ছেলেমেয়েদেরকে শাস্তি দিতেন, মাঝখানে বিরতির পর নাতি-নাতনিদের। নাতি-নাতনিরা তাকে "ভয় দাদু" বলে ডাকে। যমের মত ভয় পায় তাকে, যদিও তাদের প্রতি তিনি খুব স্নেহশীল।
এই ঘরে শাস্তি দেওয়ার অনেক উপকরণ আছে। হাসমত এই প্রথম এই ঘরে ঢুকেছে, সে চারদিকে ভয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে "মাইরের উপকরণ"গুলি। ভয়ে তিরতির করে কাঁপছে তার সারা শরীর। হঠাৎ হাসমতের দু'পা বেয়ে নেমে আসল গরম পানির ধারা।
চা খাওয়া হয়নি করিম সাহেবের। মাথার বামপাশের রগটা তিড়িক তিড়িক করে লাফাচ্ছে।চোখদুটো লাল হয়ে আছে। এমন সময় হাসমতের এমন কাণ্ডে তিনি কিছুক্ষণের জন্যে হলেও রাগ ভুলে হাসমতের মাথা হতে পা পর্যন্ত লক্ষ্য করলেন। ৫৫ বছর বয়সি হাসমতের নাড়ীনক্ষত্র তার নখদর্পনে।তারপরেও কেমন যেন অচেনা লাগছে আজ তাকে। লুঙ্গিটা ভিজে গিয়েছে, মূত্রের দূর্গন্ধে ভয় ঘরে থাকায় দায় হয়ে গিয়েছে, তারপরেও করিম সাহেব চেয়ার হতে উঠে দাঁড়ালেন। এগিয়ে গেলেন হাসমতের দিকে। করিম সাহেবের একমাত্র ছেলে জুলফত ভাবছে, আজ বাবা নির্ঘাত হাসমত চাচাকে মূত্র খাওয়াবে।
ছোটবেলার একটা ঘটনা তার মনের আয়নায় ভেসে উঠল- বাবার কাছ থেকে সদ্য পাওয়া ফুটবলটি হারিয়ে ফেলায় এভাবেই তাকে একদিন কাঠগড়ায় উঠতে হয়েছিল। ভয়ে সেদিন হাসমতের মত কাণ্ড করে ফেলেছিলেন তিনি। ফ্লোরের উপর গড়িয়ে যাওয়া সবটুকু মূত্র চেটে খাওয়ার পরেই মুক্তি মেলে তার। এরপর হতে কোনো কিছু চেটে খেতে গেলেই তিনি মূত্রের গন্ধ পান। ছোটবোন কণিষ্ঠার কনুইয়ের গোঁতাতে বাস্তবে প্রবেশ করল জুলফত। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস, আজ হাসমত চাচার কপালে দুঃখ আছে।
হাসমতের সামনে করিম সাহেব। দূরত্ব ২ ফুট ৯ ইঞ্চি। কারো সাথে কখা বলতে করিম সাহেব এই দূরত্ব বজায় রাখেন। হঠাৎ উপস্হিত সবার দিকে তাকিয়ে তিনি গম্ভীর কণ্ঠে সবাইকে বাইরে যেতে আদেশ দিলেন। একে একে সবাই বাইরে চলে গেল। হাসমত মনে মনে আয়াতুল কূরসি পড়া শুরু করেছে।
- হাসমত, আজ তোমাকে কোনো শাস্তি দিবনা। একবার ভেবেছিলাম মূত্র পান করিয়ে বিদায় করে দিব তোমাকে। ঠিক তখনি মনে পড়ে গেল, জুলফতের মায়ের কাছে দেওয়া আমার কথাটি- তোমাকে কোনোদিন এই বাড়ি ছাড়া করবনা।আমি তার কাছে দেওয়া কথা ফেলতে পারলামনা। তুমি এখন যাও। আমি বাজারে যাব। গোসল করে নতুন কাপড় পড়ে বাজারের ব্যাগ নিয়ে আস।
হাসমত কি বলবে ভেবে না পেয়ে অবাক হয়ে করিম সাহেবের দুটি চোখের দিকে তাকালেন। মানুষটির চোখ দেখে কিছুই বুঝা যায়না। মাতালের মত চাহনি অথচ জ্বলজ্বল করছে মণিদুটো। একবার তাকিয়েই ঘর থেকে বের হয়ে গেল হাসমত।
করিম সাহেব তার নিজের মধ্যে এই পরিবর্তনে অবাক হয়ে গেলেন। তিনি কোনোদিন মিথ্যা কথা বলেননি। আজ তাহলে কেন বললেন? তাও একজন অপরাধীর কাছে? আসলে তিনি তার মৃত্যু পথযাত্রী স্ত্রীর কাছে কোনো ওয়াদা করেননি।তাহলে কেন এমন মিথ্যা বললেন তিনি? তার জীবনে খুব বেশি ব্যতিক্রম ঘটেনি, আজ ব্যতিক্রম ঘটার দিন।
(চলবে)
জনাব হুমায়ুন আহমেদীয় ফর্মূলায় লেখা গল্প : চাঁদের আলোয় ছায়া পড়েনা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১৫টি মন্তব্য ১০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।