সম্প্রতি কথা হলো কবি,চিত্রশিল্পী,অভিনেত্রী,স্ক্রিপ্ট রাইটিংসহ সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে বিচরণকারী চঞ্চলা চঞ্চু'র সঙ্গে। প্রথমেই জানালেন একঘেয়েমিপূর্ণ গতানুগতিক প্রশ্নে আপত্তি তার। বললাম,কিছু কথা তো চিরদিনের দাবি। উত্তরে বললেন,‘ব্যাপারগুলো অতো জটিল এবং দ্বিধাপূর্ণ নয়। আমার মতে, বিশ্বাস এক ধরনের চিন্তা, চিন্তা এক ধরনের ইচ্ছা; প্রচলিত ইচ্ছার বাইরের ইচ্ছা হলে এর প্রকাশ কখনো চেপে রাখা জরুরি, অবশ্য তখনই জরুরি যখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে এখনো আমরা সভ্য হইনি। কিন্তু আমি তো এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিশ্চিত নই!’
চঞ্চলা চঞ্চু'র সঙ্গে কথোপকথনগুলো শেয়ার করলাম ব্লগার বন্ধুদের জন্য-
নাটকে অভিনয়ের শুরুর কথা বলুন। অভিনয় কৌশল কীভাবে রপ্ত হলো?
শুরুটা মঞ্চ থেকে। বলা যেতে পারে, ঢাকা থিয়েটার মঞ্চের সাধারণ গল্প নাটকের বিন্দে চরিত্রটি ঘাত-প্রতিঘাত, প্রেম-বিরহ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত বিচিত্র রঙে উপস্থাপন করার ধারণা নিতে আমাকে কিছুটা সাহায্য করেছে। আর অভিনয় কৌশল? এটা এখনো রপ্ত হয়নি।
টিভি পর্দায় কোন নাটকে নিজেকে প্রথম দেখেন?
সম্ভবত কবি নাসির আহমেদের নাট্যরূপ দেয়া কাজী নজরুল ইসলামের 'কুহেলিকা' নাটকের চম্পা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথম টেলিভিশনের পর্দায় আমাকে দেখা যায়। তখনও আমি বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলাম না।
কতোগুলো নাটকে অভিনয় করেছেন? উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর কথা বলুন।
সংখ্যার দিক বিচার করলে আমার মতো লক্ষ্যহীন একজন অভিনেত্রীর জন্য সন্তুষ্টিজনক একটা তালিকা হয়তো বেরিয়ে আসবে। আগে এসব প্রশ্নের উত্তর সহজেই দিতে পারতাম,এখন কেন যেন পারি না । সঙ্গতি-অসঙ্গতির দিকগুলো বিচারে সব ক’টি নাটকই উল্লেখযোগ্য।
কবিতা লিখছেন,ছবি আঁকছেন,অভিনয়ের কাজটিও থেমে নেই। এই ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমের ভাবনাগুলো আপনাকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে? অর্থাৎ, এই কাজগুলো কতোটা গন্তব্যমুখী?
গন্তব্য ব্যাপারটা কাংঙ্ক্ষিত নয়, অশেষ পথের দিকেই আমার ক্লান্তিহীন চোখ। যখন যেটা ভালো লাগে সেটা ভালোবেসে করি। ভালো না লাগলেও চালিয়ে যেতে হবে এমন দায়বদ্ধতা আমার মধ্যে টের পাই না।
আপনার ছবির একজিবিশন সম্পর্কে বলুন।
ছবি আঁকার ক্ষেত্রটাই একটা মহাসমুদ্রের মতো,এখানে মহা আঁকিয়েরা এতো ভালো ছবি এঁকে রেখে গেছেন এবং আঁকছেন যে, অতীতের একজিবিশনগুলো দুঃসাহস এবং ভুল বলেই মনে করি।
প্রতিযোগিতা কেমন লাগে?
ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করি। প্রতিযোগীর উদ্দেশ্য কাউকে পেছনে রেখে নিজেকে সামনে দাঁড় করানো। অতো যোগ্যতা, দুঃসাহস আমার নেই। আমি শুধু আমাকেই ক্রমে পেছনে ফেলে সময় অতিক্রম করতে চাই।
প্যাকেজ নাটকে খুব বেশি কাজ করতে দেখা যায় না কেন?
এই কেন’র উত্তরটা ব্যাপকভাবে দেয়া যায়। আত্মপক্ষ সমর্থন করলেও দেয়া যায়, না করলেও দেয়া যায়। আমি কাজ করি দু’একজন ভালো মানুষের কিন্তু কাজগুলো আমাকে তেমন কিছুই দেয়ার ক্ষমতা রাখে না এবং আমার কাছ থেকে নেয়ারও ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং এ ক্ষেত্রটায় আমি আমাকে অসম্পূর্ণ দেখছি এখনো।
এ সেক্টরে কাজ করার সময় কিছু বিষয় কি আপনাকে বিষ্ণন্ন করে তোলে?
হ্যাঁ! ভীষণভাবে এবং এ বিষ্ণন্নতার প্রভাব অভিনয়ের ফাঁকফোকরে ঢুকে পড়ে। আসলে ইনিয়ে-বিনিয়ে সুনাম অর্জন করার রাস্তাটি চিনতে চাইনি কখনো। নিজের কাছে লজ্জিত হতে আমার একশ ভাগ আপত্তি আছে, কারণ সারাক্ষণ তো আমার কাছেই আমি থাকি।
এসব আচরণের শিকার কেউ না কেউ নানাভাবেই হচ্ছে, এটা সত্যি কিন্তু এ ব্যাপারগুলো আগাম ভেবে রাখার কী কারণ?
উপায় যেহেতু এখনো হাতে এসে পৌঁছেনি। এছাড়া সমাধান কী আছে এমন? দেশটা স্বাধীন,অনেকটা সুন্দরবনের মতো, বাঘ-সিংহ-হরিণের একত্রে বসবাস। ঘটনা-দুর্র্ঘটনায় চরম কষ্ট পেতে পারি আগাম মাথায় রেখে পথ চলি, হয়তো অনাকাংঙ্ক্ষিত আচরণের শিকার হলে অতোটা মুষড়ে পড়বো না এ প্রত্যাশায়।
নারী-পুরুষ একে-অপরকে সুন্দর দেখতে চায়, সুন্দর নিয়ে কতো না তোলপাড়- এ নিয়ে কি বলবেন আপনি?
আমার একটি কবিতার কথা এ ক্ষেত্রে আসতে পারে। লেখাটির লাইন ক’টি এমন-
‘আলো-আঁধারের দৃশ্যত ঢলে নয়/যদি চোখ রাখি অদৃশ্যে, তবে-/বিবর্তনের গজব চটকে/একটা দীর্ঘ স্বস্তির শাদা বসতে গড়তে পারি।’
দৃশ্যের চেয়ে অদৃশ্যে চোখ রাখার কথা বলা হয়েছে এখানে। বাহ্যিক সুন্দরে যারা অতিমাত্রায় মনোযোগী তারা অসুখী! তারা বিশ্বাস ভঙ্গ করতে বাধ্য হয়, নতুনের দিকে চোখ রাখে,- ফের চোখ রাখে- এভাবেই চলতে থাকে অন্তরদৃষ্টিবর্জিত কিছু চোখের স্বস্তিহীন দিনকাল।
মন থেকে কাউকে প্রার্থনা?
নির্ভেজাল এমনজন তো দেখি না।
শেখার ব্যাপারে কার কাছে ঋণী?
প্রকৃতি এবং আমার চরম ভুলগুলোর কাছে।
প্রিয় রঙ ও পছন্দ-অপছন্দ?
সব রঙ অবস্থান এবং সঠিক ব্যবহার অনুযায়ী স্বতন্ত্র, সুন্দর। পছন্দ- শান্তি এবং অপছন্দ- যুদ্ধ।
দোষ ও গুণ?
দোষ- অকপটে সত্য বলা এবং মাথার চেয়ে মনকে প্রাধান্য দেয়া। আর গুণ- অকপটে সত্য বলা, প্রতিকার, প্রতিরোধের দিকে মনোযোগ, প্রতিশোধপরায়ণ নই একেবারেই!
অতীত,বর্তমান,ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে কিছু বলা যায়?
অতীত আমার কাছে এসেছিল, আমার অজ্ঞতার খুঁটি ধরে! ভবিষ্যতের কাছে যাবো আমি। এখনকার সময়টা একই সঙ্গে উজ্জ্বল এবং ফাঙ্গাস আবৃত।
শেষ কথা?
যার যেমন বোধের গভীরতা সে সেভাবেই বিচার করবে আর আমি আমার সংযত যৌক্তিক ইচ্ছার নির্দেশ মতোই চলবো।
নিন্দুকের ভয়ে কখনোই অসত্য, অনিচ্ছা আঁকড়ে থাকবো না;
সত্য-সুন্দরের জন্য অবাধ্য হবো বয়স্ক নিয়মের রূঢ়তা ভেঙে।
এক নজরে চঞ্চলা চঞ্চু'র কাজ
একক প্রদর্শনী : চারটি। বাংলাদেশে দুটো, দেশের বাইরে দুটো। 'ড্রিম বাংলাদেশ' এবং 'এক্সপ্রেশন' শিরোনামের এক্সজিবিশন দুটো বাংলাদেশে হয়। 'মিক্সড ফিলিংস্' আমেরিকার নিউইয়র্কে এবং ছবিতা কলকাতায়।
নিজের লেখা নাটক : চ্যানেল আইতে ‘শরম’, এটিএন বাংলায় ‘উড়াল’ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মেঘের খড়কুটো’ প্রচারিত হয়েছে।
প্রকাশিত গ্রন্থ : কবিতাগ্রন্থ- একমুঠো গতকাল, ভাঁজভাঙা পৃথিবী, পাঁজরের মাকড়সা, ঠোঁটে পোড়া গোধূলি, বিলাপের তোড়ে ভাসে জিনাখোর ঘোমটা, বাঁশপাতার ঝুনঝুনি, বেহুলার শাড়ি পোড়ে। ছড়াগ্রন্থ- ছড়ায় সাত রং, খুকির ঠোঁটে সূর্য, ঢাকঢোল, তন্ত্রেমন্ত্রে গণতন্ত্র, আঁচড়, ঘুঙুর প্রভৃতি।
ইন্টারভিউ : চঞ্চলা চঞ্চু'র সঙ্গে কিছুক্ষণ
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।