রবিউল করিম
প্রতিদিন ভেঙে পড়ে পুরোনো সূর্যের রথ
জীবনের সূর্যোদয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সে ব্যাপারে শৈশব থেকেই সন্দেহজ্ঞান কে যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। বাবা সেই শৈশব থেকে যন্ত্রের মতো বলে গেলেন, ‘আর্লি টু বেড এন্ড আর্লি টু রাইজ...।’ কোনো ফলই ফলেনি। বরং সেই সকালের ডাকের মধ্যে তখন এমন ঘুম পাড়ানি সুর ভেসে আসতো যে, আবারও ঘুমের কোলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হতাম ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না মা কান ধরে টেনে তুলে বিছানায় বসিয়ে দিতেন। মাকে বড্ড হিংসুটি মনে হতো তখন। অথচ রাতে ঘুমানোর সময় তার আঁচলের কোণাটি তর্জনীতে না পেঁচিয়ে ধরলে ঘুমই আসতো না। মাঝে মাঝে ভেবেই পেতাম না, মা কখন ঘুমান কিংবা জাগে; নাকি আদৌ ঘুমান না। মায়ের শরীরের গন্ধের মধ্যেই ঘুমের বীজ ছিল সে-সময় পর্যন্ত যতদিন না নিজেকে চিনে ফেললাম! এতদিন পর আজ মনে হয়, আদম-হাওয়া পরস্পরকে চিনতে পেরেছিল বলেই স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। আমিও নিজেকে চিনতে পেরে মা-হারা হলাম এবং বাবার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হলাম। বাবা মানেই বাস্তবতা আর মা মানেই স্বপ্ন। আজ সেই বাবা-শাসনকাল অতিক্রম করে নিজেই বাবার মতো কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছি; আর ঘুম, চুমু, আগডুম-বাগডুম এমনভাবে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে যে স্বপ্ন দেখা ভুলে গেলাম। এমনকি শৈশবে যেসব স্বপ্ন দেখতাম- অনেক বড় হয়ে গেছি, লাল একটা গাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আমার অনেক জুতা, জামা। সকলেই আমার কথা কথায় উঠ্বস করছে। এমনি আরো কত কী। আজ সেসব স্বপ্নই বাস্তব হয়ে চারপাশে ঘোরে। নতুন কোনো স্বপ্ন দেখি না। এখন যা কিছু স্বপ্ন সব দিবাকালে। জেগে জেগে। চাঁদ দেখি, তারা দেখি, পূর্ণিমাতে ভেসে যাই, গন্ধ খুঁজি, হারিয়ে যাই, মৈথুন করি, অপরাধবোধে ভুগি, আত্মগোপন করি,-সবই প্রচণ্ড আলোতে ভেসে, মগজের প্রিজমে।
একটা সত্যিকারের স্বপ্নের জন্য কত হা-পিত্যেশ। রাতকে রাত বিছানা কামড়িয়ে, চোখ বন্ধ করে, উপুড় হয়ে, চিৎ হয়ে, মাথার নিচে বালিশ সরিয়ে, পা উঁচু করে শব হয়ে পড়ে থাকি। শত শত ভেড়ার পাল বুকের উপর দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে পার হয়, ছুটে চলে পাঁজর ঘেঁষে, এক পাল বাইসন ঘাড় উঁচিয়ে, ধুলো উড়িয়ে, খুর নাচিয়ে তেড়ে-ফুড়ে আসে, ঝকঝকে রঙিন মার্বেল যার গহীনে ফুল, প্রজাপতি আর শকুন্তলা স্থির-বন্দি, গড়িয়ে যায় স্বচ্ছ পানির নিচে। আকাশ থেকে সাদা আলোয় অদৃশ্য ঝুলে পড়া সিঁড়িটি বেয়ে একটা লাল টুকটুকে বল টুপ টাপ শব্দ করে সিঁড়ি ভাঙে, শাদা সেই মৌলভী হুজুর যাকে দেখলেই শৈশবে সদর দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়তাম ভয়ে, তিনি থপথপ পায়ে এগিয়ে আসেন আর সব শাদা বক সারিবদ্ধভাবে উড়ে যায় নিঃশব্দে। পাখির পালক বিছানো বিছানায় সূঁচ রাজার মতো সহস্র সূঁচ নিয়ে কাঁপি, শরীরের দিকে অসীম থেকে ছুটে আসে অগ্নিবৃষ্টি, একটা কালো সাপ মাথা দুলিয়ে আমার চিন্তার সূত্রগুলোকে নাচিয়ে বেড়ায় এই সতর্কতায় যে নৃত্যভুললেই নীল বিষ। অথচ আমি ভালো-মন্দ, ভয়-আনন্দ, সুখ-দুঃখ বাহক কোনো স্বপ্নই দেখি না কিংবা এই করতে করতে ঘুমের যে গহীন তলে ডুব দেই সেখানে কোনো সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি কিংবা প্রাণভ্রমরারূপ স্বপ্ন বলে কিছু থাকে না। সব বাস্তব হয়ে ঘটে চলে।...
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০০৮ সকাল ১১:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



