রবিউল করিম
মরিয়ম, তোমার অরক্ষিত বাগানে
আমি মরিয়মের হাত ধরে বাড়ির সবাইকে ভাতঘুমে রেখে খাঁ খাঁ দুপুরে পালিয়ে যাই। কে মরিয়ম? সে তো জননী নয়! কোনো এক সবুজগ্রাম থেকে তাকে ভাগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল আমার দেখভাল করবার জন্য দুবেলা খাওয়াপরার লোভ দেখিয়ে। তার শরীরে লাল ফ্রক, বুকের কাছেতে কুচি, ঝালর কাটা। মাথার দু’পাশে ছোট্ট দুটি বেণির শেষে লাল লেসফিতার ফুল। চুলে জবাকুসুম তেলের ঘ্রাণ। আমার কোমরে ঝিণুক, গলায় কালো সুতোয় ভূত তাড়ানিয়া তাবিজ বাঁধা পরনে সাদা প্যান্ট। ছুট... ছুট...। সে ভোলেনি কিছুই কিংবা আমিই ভুলিনি গত। পুকুরের ছোট্ট তালগাছটির বিশাল পাতার নিচে ছায়াময় শীতল ধুরোয় আমরা খেলায় মেতে উঠি কিংবা ছোট ছোট পায়ে আমি ছুটতে থাকি তার পিছু পিছু বহুদূরে ফেলে আসা সেই সময়কে ধরতে। কিছুতেই ফেরা হয় না। আঁধার ঘনিয়ে আসে, মরিয়মের চোখে শঙ্কা, আমার শরীরে অবোধ্য অলসতা। সে তো বহুকাল। জীবনের যে আগুনপ্রান্তর ঘেঁষে ছুট চলে এক তেজীঘোড়া বল্গাহীন, তারা রাশ টেনে ধর রাখবার ক্ষমতা কেইবা সংরক্ষণ করে। হাওয়া ওঠে, সবকিছু ওড়ে, রাশহীন হয়ে উড়তে থাকে, স্বপ্নের কাচের টুকরো ঝিলিক দেয়, আছড়িয়ে পড়ে, ভাঙে, খানখান হয়, ছড়িয়ে পড়ে লক্ষ লোকি মিহি গুড়ায়। সেগুলোকে হাতের তালুবন্দি করতেই রক্তক্ষরণ- প্রতিটি স্বপ্নের ক্ষরণ, প্রতিটি মিহি দানার ক্রন্দন। কেন সেগুলোতে ঠাসা থাকে বিষের থলে আর কেনইবা তা হয় শক্ত, অভঙ্গুর, তীক্ষ, আত্মঘাতী? আজ এতকাল এসব প্রশ্নের উত্তরে ‘আমি’ দাঁতকপাটি লেগে পড়ে থাকেন অচেতনের শক্ত খোলসে, কাছিমের পিঠের বক্রতায় শতায়ু হয়ে। উত্তর আসে না, ফিরে আসে প্রশ্ন মাথার ভেতরে রক্তবীজের মতো সহস্র সহস্র প্রশ্নের জন্ম নিয়ে। তার লকলকে জিহ্বা উত্তরে যায়, দক্ষিণে যায়, পুব আর পশ্বিমকে পেঁচিয়ে ধরে। হা শান্তি! ক্ষমতাহীন আর অষ্টপ্রহর। তখন লোকালয় ছেড়ে একটু দূরে যে বিশাল বৃক্ষ তার কাছে নিজেকে সমর্পিত করতেই হয়। না করলে মনে প্রবল তাপে জরা আসে, শরীরে উত্তাপ বাড়ে, বিকেলের বর্ণচ্ছটা ম্লান হয়, আঁধার ঘনিয়ে আসে এবং আমি বিষন্ন এক বাদুড় হয়ে অনন্ত নক্ষত্রের ডানা ধরে ঝুলে ঝুলে চাঁদের ক্ষয়ে যাওয়া দেখতে থাকি।
সেখানে যেতে হয় হেঁটে হেঁটে, একাকী। নিজের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, খালি পায়ে। ওখানে ফুরফুরে বাতাস ওড়ে, কানের দুপাশের চুল দোলে, ছায়াছায়া ঘোর ঘোরে। আর তাই সেখানে বাস্তবতা নামক বাদামের শক্ত খোল বাতাসে উড়িয়ে চকচকে মসৃণ স্বপ্নকে দু চোয়ারের ভাঁজে পিষে ফেলে স্বাদ নেয়া যায়, সে প্রেমিকাটি ফিরে গেছে তার প্রিয়তমের কাছে,-শপথের ঘোরে, তার জন্য শুভাশীষটুকু কিংবা যে প্রেমাস্পদ শত অনাদরে অবহেলায় করেনি ঘৃণা প্রিয়তমাকে, তার জন্য রক্তশুদ্ধ একটা প্রার্থনা করা যায়। একটার পর একটা বাদামের কুমারীত্ব ভেঙে যে কথাটি, স্মৃতিটি বহুকাল ধরে মনের কালো রঙের টিনের ট্রাঙ্কে বন্দি, তা অবলীলায় অন্যকে বলে মুক্ত হওয়া যায়, (সকালের মনের ভেতরেই তো একটা কালো রঙের টিনের ট্রাঙ্ক থাকে, যেখানে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় সবকিছুই জমা থাকে অসচেতনে, সময়ের যাত্রায় তাতে বেড়ে যায় মূল্যমান স্মৃতির রাংতা। তারপর একদিন দুই ছাই, ঠাঁই নাই এই ভেবে ঝেড়েঝুড়ে সব ফেলে দিতে গেলে একটা ছেঁড়া কাগজ, রঙিন খাম, একটু আধুলি, ফাটা ঝরনা কলম সবকিছুই সময়ের নাগরদোলায় চেপে একবার মূল্যহীন, একবার মূল্যবান করে তোলে।) কিংবা যা না করার জন্য ইচ্ছের পায়ে লোহার বেড়ি পেরিয়ে রাখি প্রতিনিয়ত তা অনায়াসেই করে ফেলা যায়।...
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০০৮ সকাল ১১:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



