রবিউল করিম
বস্তুত একটি হাঁসের চেয়েও তুমি লঘুপক্ষ
স্যালাইন নাকি স্বপ্ন নিঃশব্দে পাইপের অভ্যন্তর বেয়ে একটা ফোঁটা এক ফোঁটা করে ছুটে যায় বন্ধুটির শরীরের অভ্যন্তরে স্বপ্নহীন পরবাসে। শাদা ধবধবে বিছানায় হলদেটেকালো শরীর। হাসপাতালে বিছানার চাদরগুলো কেন শাদা আর খাটগুলো লোহার, এ বড় রহস্যের। উত্তরহীন এই প্রশ্ন যতবার হাসপাতালে যাই ততবার তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। হাঁসের রঙ সাদা আর পাতাল বললেই বন্দিশালা, এমন ভাবনাতেই কি হাসপাতাল নামকরণ? নাকি অন্যকিছু? হাসপাতালে গেলে আমার ভালো লাগে, স্বস্তি পাই। ওখানে কেউ ভণিতা করে না। জানা যায় সকলেই অ-সুখে। মিথ্যের জন্য আশ্রয় খোঁজে না সহজে। অবলীলায় বলে ফেলে, মাস তিনেক আগে পতিতালয়ে গমনের পর থেকেই এমন গেল সপ্তাহে বউ বাড়ি গেলে সারারাত বেডে মাতাল হয়ে সদররাস্তায় কুকুরের সাথে গলাগলি, এমন শত কথা ছোটে- ছোট ছেলেটা বিয়ের পর থেকে আর দেখে না, বহুমূত্র, উচ্চরক্তচাপ, ফিসফিস সবে গোপন, রাতের বাতি নিভে গেলে পর শোনা যায়। ওখানে থাকলেই সকলে সত্যবাদী, ধার্মিক, প্রতিজ্ঞা, সমব্যথী আর দোয়ার ছড়াছড়ি। সুস্থ হয়ে ছাড়া পেলেই ভাঁড়ামি, মিথ্যা, বুকের ভেতরে চড়চড় করে ফেটে যাচ্ছে প্রচণ্ড খরদাহে কিংবা যে গোপন প্রস্রবণ পিঠের ছায়া ঘেঁষে বহমান তাতে দাবানল ছড়িয়ে পড়লেও বোয়াল মাছের মতো মুখ ফাঁক, দেঁতো হাসি- ভালো আছি।
এক মুখ দাড়ি, চোখের দু’কোলে দুঃস্বপ্নের কালচে থাবা, কপালে শত কাটাকুটি নিয়ে বন্ধুটি আমার হাসপাতালের বিছানায় চেতন আর অচেতনের মাঝে ডুব সাঁতার দেয়। মাঝে মাঝে বুকের লোমশ গহীন থেকে অনুচ্চারিত শব্দ আছড়িয়ে পড়ে বুকের খোলা জমিনে। বুকটা একটু ফুলে ওঠে, শোনা যায় কি যায় না- উহ! আমি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখি। বন্ধু মুজিবের স্বপ্ন, তার হাহাকার- বাঁচবো তো? বেঁচে থাকার স্বপ্ন তাকে কুরে কুরে খায়। আমার হাসি পায়। হা-হা করে হাসি। সে বোঝে না হাসির মর্ম, মুখে মৃদু হাসি জড়িয়ে পরিবেশ হাল্কা করে অথচ তার চোখে আমি আমার মৃত্যুদৃশ্য প্রত্যক্ষ করি। কে বোঝাবে তাকে, এভাবে বেঁচে থাকার অর্থটা কী? আর এই যে চারপাশে এত মানুষ, সকলেই তো দেখতে এসেছে এক মজার খেলা- এক জীবন্ত মুজিব অসুখে হাত পা বাঁধা কীভাবে একটা হা করা হাঙরের মুখের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, আর্তনাদ করছে, মরে যাচ্ছে তার চমৎকার দৃশ্য অবলোকন করবার জন্য। তাদের জন্য তো অন্তত একবার মরে গিয়ে হা-হুতাশ করবার ব্যবস্থা করা সঙ্গত, নাকি! ওদের ঐ মরা চোখ, মলিন চেহারার গোপনাবরণ খোলারও তো দরকার পড়ে মাঝে মধ্যে। রাত জেগে তার পাশে শুয়ে শুয়ে অনুভব করি কী আশ্চর্য সব দুঃস্বপ্নে সে বারবার ঠোঁট কামড়ে, মুখটাকে দ্বিভঙ্গ করে যুদ্ধ করে চলে। আমি থাকি আমারি ঘোরে।
সন্দীপনের ছায়া হয়ে তার সাথে সাথে ঘুরি আর আত্মহত্যার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করি। পাশের বাড়ির সেই মায়াবতী রমণী, ময়ূরের সাপ ভক্ষণ, পারেক সাহেব, বিজন, হা অশান্তি। পতন, পতনের ছায়াদৃশ্য ধরে রাখে। ঘুম আসে না। মগজ কেন যে পরিশ্রান্ত হয় না। কত লক্ষ কোটি বছরের আশা, নিরাশা, আনন্দ, বেদনা, পাওয়া, না-পাওয়া, কষ্ট, হাহাকার, ঘুরতে থাকে মাথার চারপাশে। ঘুম নেই। স্বপ্ন নেই। শুধু নেই। বড় ভয় করে। হারিয়ে যাবার ভয়। শৈশবে স্বপ্নে যেমন মুতে দিলে অনিবার্যভাবে বিছানাটা ভিজে উঠতো বাস্তব হয়ে, সেই ক্ষমতাকে যখন হারিয়ে ফেলেছি তখন একদিন স্বপ্ন দেখবার বাসনাটিকেও হারিয়ে ফেলবো কি না সেই ভয়েই তটস্থ থাকি। কিংবা ভয়ে থাকি জীবনানন্দের মতো এক স্বপ্নহীন রাতকে,
কোথাও চলিয়া যাব একদিন;- তারপর রাত্রির আকাশে?
অসংখ্য নক্ষত্র নিয়ে ঘুর যাবে কতকাল জানিব না আমি;
জানিব না কত কাল উঠানে ঝরিবে এই হলুদ বাদামী
পাতাগুলো- মাদারর ডুমুরের-সোদা গন্ধ...
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০০৮ সকাল ১১:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



