কিশোরদের জন্য লেখা এই ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ যে কতটা সহজভাবে মানব হৃদয়ের অন্তঃস্থলকে দু এক কথায় বলে ফেলেছেন তা এই বয়সে পড়ে রীতিমত অবাকই হতে হয় । কবি গুরু বুঝি মানুষের মনোভাবকে ঠিক ঠিক বুঝতে পারতেন । আর তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে ততোধিক সহজভাবেই উনি মনের কথাগুলিকে কালো কালির অক্ষরে প্রকাশ করতে পারতেন।
দুই কি তিন বছর আগের কথা, কোন একটা ঘটনা মনটাকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে গেলো। যা ঘটে গেছে তা আর বদলানো সম্ভব নয় । তারপরও কিছুতেই যেন মন মানে না । দেখা গেলো সারাক্ষণ শুধু সেইটি নিয়েই ভাবছি । ভাবনাগুলি যেন মাথার একটি পাশ পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে নিলো ।
আমি ভাবছি আর ভাবছি, “কি করে পারলে? একটি বারও কি ভালোমতো ভাবলে না ? কি করে সম্ভব? সেই তুমি...? কি করে এমন করলে? ঠিক মতো বলেও গেলা না কিছু । কি আজিব । ধুর ছাই, বুঝি না।“
হঠাৎ হাতের কাছে... রবীন্দ্রনাথের “কিশোর গল্পসমগ্র” বইটি পড়লো। অন্য সময় হলে হয়ত পড়ার আগ্রহ দেখাতাম না। নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যই পড়া শুরু করলাম। এক একটি গল্প পড়ি আর আমি নিজের অজান্তেই যেন আমার মনে ঘুরপাক খাওয়া এক একটি প্রশ্নের উত্তর পেতে থাকি। এইতো...এইরকমই তো ব্যাপারগুলো... যে জিনিসগুলি ব্যাখ্যা করার ভাষা আমি পাচ্ছিলাম না, তাই যেনো রবিঠাকুর গল্প করাচ্ছলে সহজেই বলে চলেছেন.... আমি যেন মনে মনেই উঁচুস্বরে পড়তে থাকি....
“যখন নৌকায় উঠিলেন এবং নৌকা ছাড়িয়া দিল, বর্ষাবিস্ফারিত নদী ধরণীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশির মতো চারি দিকে ছলছল করিতে লাগিল, তখন হৃদয়ের মধ্যে অত্যন্ত একটা বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন - একটি সামান্য গ্রাম্য বালিকার করুণ মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যথা প্রকাশ করিতে লাগিল। একবার নিতান্ত ইচ্ছা হইল, "ফিরিয়া যাই, জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি" - কিন্তু তখন পালে বাতাস পাইয়াছে, বর্ষার স্রোত খরতর বেগে বহিতেছে, গ্রাম অতিক্রম করিয়া নদীকূলের শ্মশান দেখা দিয়াছে - এবং নদীপ্রবাহে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্ত্বের উদয় হইল, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী। পৃথিবীতে কে কাহার।”
তাইতো... “জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী। পৃথিবীতে কে কাহার।“ এই ভাবটুকুই যে যত তাড়াতাড়ি আয়ত্তে আনতে পারে তারই লাভ। হয়ত শ্রাবণও ঠিক এমনটা ভেবেই সবকিছু সহজেই ভুলে গেছে ।
কিন্তু আমার ভ্রান্তি আর কিছুতেই ঘুচে না, আমি যেন তারি অপেক্ষায় থাকি প্রতি ক্ষণে, এই বুঝি সে ফিরিয়া আসিলো, এই বুঝি তারি ফোনে মোবাইলটা আবার গেয়ে উঠলো....তারো্ উত্তর পেয়ে যাই কিছুক্ষণের ভিতর...পরবর্তী প্যারায় ।
“কিন্তু রতনের মনে কোনো তত্ত্বের উদয় হইল না। সে সেই পোস্ট্আপিস গৃহের চারি দিকে কেবল অশ্রুজলে ভাসিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। বোধ করি তাহার মনে ক্ষীণ আশা জাগিতেছিল, দাদাবাবু যদি ফিরিয়া আসে-সেই বন্ধনে পড়িয়া কিছুতেই দূরে যাইতে পারিতেছিল না। হায় বুদ্ধিহীন মানবহৃদয়! ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না, যুক্তিশাস্ত্রের বিধান বহু বিলম্বে মাথায় প্রবেশ করে, প্রবল প্রমাণকেও অবিশ্বাস করিয়া মিথ্যা আশাকে দুই বাহুপাশে বাঁধিয়া বুকের ভিতরে প্রাণপণে জড়াইয়া ধরা যায়, অবশেষে একদিন সমস্ত নাড়ী কাটিয়া হৃদয়ের রক্ত শুষিয়া সে পলায়ন করে, তখন চেতনা হয় এবং দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশে পড়িবার জন্য চিত্ত ব্যাকুল হইয়া উঠে। “
হা হা হা, ঠিক তাই, এ যে আমারি কথা,আমারি তৎকালীন অবস্থা... “হায় বুদ্ধিহীন মানবহৃদয়! ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না, অবশেষে একদিন সমস্ত নাড়ী কাটিয়া হৃদয়ের রক্ত শুষিয়া সে পলায়ন করে, তখন চেতনা হয় এবং দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশে পড়িবার জন্য চিত্ত ব্যাকুল হইয়া উঠে।“
যতই বলি, পোস্টমাস্টার বৈষয়িক, বাস্তববাদী । কিন্তু শেষ পর্যন্ত রতনের অনুভূতিকেই শ্রদ্ধা জানাতে হয়, যারা কিনা হৃদয়ের ভালোবাসার আবেগকে পৃথিবীর দার্শনিক তত্ত্বে কখনো বন্দী করে না। জগতের চর্ম চক্ষে তাদের হার হলেও মানুষ হিসেবে তারাই(রতনরাই) সেরা ।
তাই গল্পের শেষে আমি পোস্টমাস্টারদের কাপুরুষ আর পলাতকই বলবো। আর রতনদের জন্যই থাকবে..... হৃদয়ের সবটুকু শ্রদ্ধামিশ্রিত দুঃখ অনুরাগ। রতন তুমি ভালো থেকো, বোকা হৃদয় ।
***"পোস্টমাস্টার" গল্পের অংশবিশেষ টাইপ করার হাত থেকে মুক্তিদানের জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা: প্রজেক্ট বর্ণমালা(http://barnamala.org/barnamala/155)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



