অতটা ঝুঁকে না দাঁড়ালেও পারতাম আমি৷ না দাঁড়াতেও পারতাম অতটা ঝুঁকে৷ আমার হাত পা শিরশির করছিলো৷ আমার খুব ইচ্ছে করছিলো এখান থেকে নীচে লাফিয়ে পরতে৷ আচ্ছা এখান থেকে এখন যদি লাফ দিয়ে পড়ি তাহলে কি হবে? নীচের ঐ পরিস্কার ঝঁকঝঁকে লবিতে পড়ে থাকবে আমার মৃতদেহ৷ ওরা বলবে, সে মরে গেছে৷ সামিয়া হয়তো একবার দেখবে৷ কষ্টে তার বুকটা হয়তো একটু মুচড়ে উঠবে৷ ভাববে, “আহা, সে এভাবে নিজেকে শেষ করলো?” লাশ কাঁটা ঘরে ওরা যখন আমার বুকটা চিরে দেখবে, তখন কি ওরা দেখতে পাবে কি প্রচন্ড ভালোবাসা আমি সেখানে জমিয়ে রেখেছিলাম একটি মেয়ের জন্য? কষ্টে, মমতায় তাদের বুকটাও কি একটু কেঁপে উঠবে?
বসুন্ধরা সিটির আটতলার রেলিঙ ধরে ঝুঁকে আমি নীচের লবীর দিকে তাকিয়ে রইলাম৷ সামিয়া নিশ্চয় এই লবী দিয়েই বের হবে৷ শেষবারের মত তাকে দেখে নেবার জন্য আমি কাঙালের মত ঝুঁকে রইলাম৷
তাকে দেখা গেলো৷ ঐতো হেঁটে যাচ্ছে৷ এতটা উপর থেকে তাকে খুব ছোট মনে হচ্ছিলো৷ আমার সব ভালোবাসা সাথে নিয়ে ঐতো মেয়েটি হেঁটে যাচ্ছে৷ মাথা নীচু করে খুব আস্তে সে হাঁটছে৷ কি অসহায় ভঙ্গিতে সে হেঁটে যাচ্ছে! আমার মনটা মমতায় ভরে গেলো৷
এই একটু আগে সে আমাকে বলে গেলো আমাকে সে ভালোবাসে না৷ কখনো সে আমাকে ভালোবাসেনি৷ আমার জন্য তার শুধুই একটু ভালোলাগা ছিলো, তার বেশি কিছু নয়৷ আমার সামনে বসে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে যখন সে কথাগুলো বলছিলো, আমার হা হা করে হাসতে ইচ্ছে করছিলো৷ সে বলছিলো তার পক্ষে আমাকে বিয়ে করা সম্ভব না৷ তার পক্ষে কাউকে ভালোবাসা সম্ভব না৷ তার মনটাই যে মরে গেছে! পাথর হয়ে গেছে তার মন৷ আমাকে বিয়ে করে আমার জীবনটা সে নষ্ট করতে পারেনা!
আমি চুপচাপ তার কথা শুনছিলাম৷ আমার সত্যি খুব জোরে জোরে হাসতে ইচ্ছা করছিলো৷ ইচ্ছে করছিলো সমস্ত জায়গাটা কাঁপিয়ে হা হা করে হাসি৷ আমার সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে আমি যে মেয়েটির জন্য কাঙালের মত পথ চেয়ে বসে আছি, যার অপেক্ষায় আমি পার করে দিয়েছি একটা জীবন, যার চোখ আমি অসম্ভব ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতে দেখেছি, সে বলছে সে আমাকে ভালোবাসে না৷ সে বলছে সে কখনো আমাকে ভালোবাসেনি৷ তার হৃদয় পাথর হয়ে গেছে, কাউকে সে ভালোবাসতে পারেনা৷ আমাকে বিয়ে করে সে আমার জীবনটা নষ্ট করতে পারে না৷ হা হা হা... হা হা হা হা হা... এর চাইতে হাসির আর কি হতে পারে? এর চাইতে বড় রসিকতাতো আর কিছু নেই!
হেঁটে যেতে যেতে সামিয়া থেমে দাঁড়ালো৷ ঘুরে একবার মুখ তুলে উপর দিকে চাইলো৷ ও কি আশা করে ছিলো আমি ওকে দেখব? কি জানি! তারপর খুব ধীর পায়ে হেঁটে বের হয়ে গেলো৷ একবার কি হাত তুলে চোখটা মুছলো ও?
আমার বুক ভেঙে কান্না আসছিলো৷ অসম্ভব কষ্টে আমার ভীতরটা ভেঙে চূড়মার হয়ে যাচ্ছে৷ মনে হচ্ছে আমার হৃদয়টাকে কেউ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলছে৷ আমি সবকিছু ঝাঁপসা দেখছিলাম৷ চীৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, একবার ডাক দিয়ে দেখো সামিয়া, শুধু একবার! পৃথিবীর সব ব্যর্থতা দু'হাতে মুছে ফেলে আমি তোমার কাছে ছুটে আসব৷ শুধু একবার ডাক দিয়ে দেখো৷
কেউ ডাকলো না৷ একলা আমি, পরাজিত আমি, বিধ্বস্ত আমি, একবুক হাহাকার নিয়ে চোখের পানিতে আমার ভালোবাসাকে বিদায় জানালাম৷ আমার সারা জীবনের ভালোবাসা৷ বিড়বিড় করে বললাম, “তুমি ভালো থেকো, সোনা আমার৷”
রাত্রে দেখা হলো আমার বন্ধুর সাথে৷ রাশেদ, আমার ভালো বন্ধু৷ সে আমাকে বোঝে৷ আমাকে অনেক্ষন ধরে ফোন করছিলো, আমি ধরিনি৷ সে আমাকে ঠিক খুঁজে বের করেছে৷ বললো, “কি হয়েছে?”
আমি কিছু বললাম না৷ রাশেদ আমার মুখের দিকে একভাবে তাকিয়ে রইলো৷ তখন আমি বললাম, “সামিয়া চলে গেছে৷”
বলতে বলতে আমার চোখটা পানিতে ভরে উঠলো৷ আমি দু'হাতে মুখ ঢাকলাম৷ কান্নায় আমার বুকটা ফেসে যাচ্ছিলো৷ রাশেদ আমাকে জড়িয়ে ধরলো৷
আমি মুখ তুলতে রাশেদ বলল, “চল আজকে আমরা সারারাত রাস্তায় হাঁটবো৷”
আমি গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম৷ তখন রাশেদ বলল, “সামিয়া চলে গেছে, কিন্তু কি করার আছে বল৷ পৃথিবীর কেউ না কেউ সবসময় চলে যায়, তুইতো প্রথম না৷ যা হবার তা হয়েছে, ভেঙে পড়িস না৷ জীবনে ফিরে আয়৷”
আমি রাশেদের দিকে একভাবে তাকিয়ে রইলাম৷ আমার বড় হাসতে ইচ্ছা করছিলো৷ কেউ না কেউ সবসময়ই ফিরে যায়৷ হা হা হা৷ রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে আমি হা হা করে হাসতে লাগলাম৷ রাশেদ আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “এইতো ঠিক আছে৷ চল হাঁটি৷”
আমরা হাঁটতে লাগলাম৷ রাশেদ বলল, “বড় খিদে লাগছে৷ চল পুরানো ঢাকায় যাই৷ স্টারের কাচ্চি খাব৷ ভালো লাগবে৷”
আমি রাজি হলাম৷ রাশেদ তখন ট্যাক্সি ডাকতে যাচ্ছিলো, আমার হঠাৎ বাসে চড়তে ইচ্ছা করলো৷ আমি বাঁধা দিয়ে বললাম, “না বাসে যাব৷”
তখন রাশেদ ট্যাক্সি ডাকা বাদ দিলো৷ আমরা তখন আমাদের সেই কলেজ জীবনের বাহন একটা মুড়ির টিন বাসে উঠে বসলাম৷ রাত বেশ হওয়ায় বাসটা ফাঁকা৷ কন্ডাক্টর ব্যাটা গোঁটা রাস্তাটায় গলায় মাইক লাগিয়ে চেঁচিয়ে গেলো৷ একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যান৷ আমি চোখ বুঁজে বসে ছিলাম৷ মনে হচ্ছিলো সেই পুরনো দিনগুলোয় ফিরে গেছি৷
কাচ্চি খেয়ে বুড়িগঙ্গার পাড়ে একটা নির্জন জায়গা দেখে আমরা বসলাম৷ আকাশে চকচকে আঁধুলির মত বিশাল চাঁদ উঠেছে৷ সেদিকে তাকিয়ে আমরা চুপচাপ বসে রইলাম৷
রাশেদ বলল, “তুই ওমর খৈয়াম আবৃত্তি কর শুনি৷ তোর ভালো লাগবে৷”
আমি কোন কথা বললাম না৷ চুপ করে বসে রইলাম৷ আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো৷ বুকের ভীতর উথাল পাথাল শূন্যতার অনুভূতি৷ পৃথিবীর সব আলো বুঝি নিভে গেছে!
একটুপর বললাম, “ওমর খৈয়াম না, অন্য একটা কবিতা বলি, শুনবি?”
“তুই লিখেছিস?”
“হ্যাঁ, আজকে দুপুরে৷” আমি বিড়বিড় করে বললাম৷
“বল৷”
বুড়িগঙ্গার কালো পানির বুকে ভাসমান নৌকাগুলায় টিমটিম করে আলো জ্বলছে৷ আমি সেদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে আবৃত্তি করলাম,
ভালোবাসার পঙ্তিমালা আজ নিস্তব্ধ
শুধু তোমার জন্য
শুধু তোমারি জন্য হে প্রিয়তমা
তা পেয়েছিলো প্রান৷
তুমি যখন চলে গেলে
পৃথিবীর সব গান গেলো থেমে
থেমে গেলো, জীবনের সব অভিমান৷
আজ চারদিকে তাই শুধু হাহাকার
নিজের মনটাও যেন বিদ্রোহ করে
বিদ্রোহ করে নিজেকেই, বারবার৷
তাই ভালোবাসার পঙ্তিমালা আজ বড় রিক্ত
হারিয়েছে তার সব শ্রী, সব শুভ্রতা
চারদিকে আজ বড় নষ্ট সময়ের মগ্নতা৷
শুধু তোমার জন্য, তোমারি জন্য হে প্রিয়তমা
আজ থেমে গেছে পৃথিবীর সব কোলাহল৷
একবার ডাক দিয়ে দেখো
ভালোবেসে দেখো শুধু একবার,
শুধু একবার ডাক দিয়ে দেখো
আমি কতটা কাঙাল৷
কতটা কাঙাল আমি, তোমার ভালোবাসার জন্য৷
আবৃত্তি করতে করতে আমার চোখ ভরে পানি চলে এলো৷ আমি হুহু করে কাঁদছি৷ শান্ত নীরব রাতের বাতাস আমাদের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে৷ আমার বড় শীত করছে৷ দূরে কোথাও নিস্তব্ধ রাতের গান বেঁজে যাচ্ছে৷ আমরা উঠে আবার হাঁটতে শুরু করি৷ হাঁটতেতো হবেই৷
© রোডায়া
৮ মার্চ ২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০০৮ দুপুর ১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



