বাড়ি, বাড়ি, বাড়ি৷ কতদিন পর বাড়ি যাচ্ছি আমি!
গোধুঁলীর আলোয় বাড়ির রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকি৷ ইট বিছানো রাস্তা, দু'পাশ দিয়ে বেড়ে উঠেছে নানারকম গাছ৷ আমার এক পাগল বন্ধু আছে, সে এখন আমার সাথে থাকলে তার হেঁড়ে গলায় বলত, “গোঁধুলীর আলোয় আজি ফিরছি এ কাঁঠাল ছাঁয়ায়...”
বাড়ি পৌছতে পৌছতে সন্ধ্যা হয়ে যায়৷ উঠানে পা রাখতেই ছোট বোনটা চিৎকার করে ওঠে, “ভাইয়া!”
আমি হাসি৷ শিলার কাছে গিয়ে মাথাটা নেড়ে দিয়ে বলি, “কিরে পাগলী, কেমন আছিস?”
“ভালো আছি৷ তুমি কেমন আছো? এতদিন পর আসলা?”
শিলার হৈচৈ শুনে মা বের হয়ে আসে৷ আমি সামনে গিয়ে মাকে সালাম করি৷ মার চোখে পানি৷ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “এতদিন পর আসলি?”
আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতে থাকে৷ আসলেই অনেকদিন পর বাড়ি আসলাম৷ কিন্তু বাড়ি আসতে গেলে অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে যায়, তার চেয়ে টাকাটা বাড়ি পাঠালে কাজে লাগে৷ তাই আসা হয় না৷
মার সাথে আমার বেশি কথা কখনো হয় না৷ আজও হলো না৷ “যা কাপড় চোপড় খুলে হাতমুখ ধুয়ে নে”, বলে মা রান্না ঘরে ঢুকে যায়৷ মা এখন আমার জন্য ভালোমন্দ রান্না করতে বসবে৷ যদিও জানি আমাদের সংসারে বেশি ভালো কিছু রান্না করার সাধ্য মার নাই৷
আমাদের ছোট টিনের বাড়িটায় তিনটা ঘর৷ একটায় বাবা-মা, একটায় শিলা থাকে৷ আর একটা আমার জন্য৷ অনেক আগে করা বলেই এটুকু আছে, নাহলে আজকাল এটুকু করার সাধ্যও আমাদের নাই৷
শিলা আমার ঘরটা খুলে দেয়৷ আমি গিয়ে ব্যাগটা নামিয়ে বসতে বসতেই দেখি শিলা কাকে যেন টানতে টানতে নিয়ে আসছে৷ তাকিয়ে দেখি মায়াবী চেহারার সুন্দর একটা মেয়ে৷ মেয়েটাকে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে শিলা হাসতে হাসতে বলে, “ভাইয়া, এ হচ্ছে আমার বান্ধবী সম্পা৷”
“স্লামালাইকুম৷” সম্পা লাজুক মুখে বলে৷
“ওলাইকুমাস সালাম৷” আমি বলি৷ তারপর আবার বলি, “বসেন৷”
সম্পা বসে৷ কিন্তু কি বলব আমি ঠিক বুঝতে পারি না৷ অনেক্ষন ভেবে বলি, “কি করেন আপনি?”
শিলা হি হি করে হাসে৷ বলে, “ভাইয়া, বললাম না ও আমার বান্ধবী? আমার সাথে পড়ে৷ তুমি ওকে আপনি করে বলছো কেন? হি হি হি...”
আমার কান লাল হয়ে ওঠে৷ শিলা এবার কলেজে ভর্তি হয়েছে, অতি চপলমতি হয়েছে৷ ফিক ফিক করে হাসতে থাকে সে৷ মেয়েদের সাথে মেশার অভ্যাস আমার নেই, তাই কেমন যেন লজ্জা লাগতে থাকে৷ সম্পা হেসে বলে, “আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন৷”
শিলা সম্পাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে, “এই তোরা গল্প কর, আমি দেখি মা কি করছে৷”
সম্পা লাজুক মুখে আমার সামনে বসে থাকে৷ আমি কিছু বুঝতে পারিনা৷ এভাবে সম্পাকে আমার সামনে বসিয়ে রেখে যাবার মানে কি? আমার মনে হতে থাকে এর পিছনে অন্য কোন উদ্দ্যেশ্য আছে৷
উদ্দ্যেশ্যটা বুঝতে পারি আরেকটু পরে৷ তখম সম্পা তার বাসায় চলে গেছে৷ মা রান্না বান্না করে খেতে ডাকেন৷ পল্লীবিদ্যুতের আলোয় তেজ নাই, সবকিছু কেমন মরা মরা লাগে৷ মরা আলোয় আমরা খেতে বসি৷ আমার সামনে বসে বাবা অনেক্ষন উসখুস করতে থাকেন৷ মাকে বলেন, “ওকে মাছের মাথাটা তুলে দাওনা৷”
মা একটু বিরক্ত হয়ে বলে, “ও মাছের মাথা খায় না৷”
বাবা বিরক্ত হয়ে বলে, “আরে খাবে খাবে, বাঙালীর ছেলে মাছের মাথা খায় না সেটা হয় নাকি?”
মা তখন মাছের মাথাটা আমার পাতে তুলে দেয়৷ মাছের মাথায় অনেক কাঁটা বাঁছতে হয় বলে আমার ভালো লাগে না৷ মাথাটা শিলার পাতে তুলে দিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলি, “আমার ভালো লাগে না, ও খাক৷:
বাবা তখন বলে ফেলেন, “সম্পাকে তোর কেমন লাগলো?”
আমি বুঝতে পারছিলাম এরকম কিছু শুনতে হবে৷ বাবা মার সাথে এইসব বিষয় নিয়ে কখনো কথা বলিনি৷ আমার লজ্জা লাগতে থাকে, কি বলব বুঝতে পারি না৷
“ওকে আমাদের খুব পছন্দ৷” মা বলে৷ “আমরা ওর বাবা মার সাথেও কথা বলেছি৷ এখন তুই রাজি হলেই হয়৷”
সম্পাকে অপছন্দ করার কিছু নাই৷ আমার বেশি রকমই পছন্দ হয়েছে৷ কিন্তু আমার খুব লজ্জা লাগতে থাকে৷ লজ্জা কাটাতে রাগের ভান করে বলি, “হ তোমাদের যেমন কথা৷ যে দিনকাল পড়ছে, সবকিছুর দাম বাড়তি৷ যে কয় টাকা বেতন পাই তা দিয়ে নিজেদেরই চলে না তার আবার আরেকজন৷”
“চলে না আবার কি?” মা রাগ করে বলে৷ “যা চলে তাই আল্লার কাছে হাজার শুকুর৷ জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে বলে কি বিয়া শাদি করতে হবে না? সারা জীবন আইবুড়ো হয়ে থাকবি? আর মানুষের দিন সবসময় একরকম যায় না৷ ভালো দিন আসবে ইনশাআল্লাহ৷”
আমি লাজুক মুখে চুপ করে বসে থাকি৷ বাবা হঠাৎ খুশির গলায় বলে ওঠেন, “ওর মেয়ে পছন্দ হয়েছে৷”
শিলা হৈ চৈ শুরু করে, “ভাইয়ার সম্পাকে পছন্দ হয়েছে, হি হি হি...”
বাবা হা হা করে হাসতে থাকে৷ বহুদিন আমি বাবাকে এরকম প্রাণ খুলে হাসতে দেখিনি৷ আমার খুব লজ্জা করতে থাকে৷ কান টান সব লাল হয়ে ওঠে৷ শিলাটা এমন পাজি, ইচ্ছে করে ওর কান ধরে টেনে দিয়ে বলি, “বড় ভাইয়ের সাথে ফাজলামী?”
আমি ভাত ফেলে রেখে উঠে পড়ি৷ মা হা হা করে ওঠে, “কোথায় যাচ্ছিস?”
“ঘুরে আসি৷” আমি বলি৷
“খাওয়া শেষ করে যা৷”
“এসে খাব৷”
আমি বের হয়ে পড়ি৷ পিছনে শুনি সবাই হাসছে৷
ঐ ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটা আমার বউ হবে? আমার মত ক্ষুদ্র তুচ্ছ মানুষের বউ হয়ে আসবে সে? আমার বিশ্বাস হতে চায় না৷ সবকিছু অবিশাস্য মনে হতে থাকে৷ মনে হয় স্বপ্ন দেখছি৷ কিন্তু অসহ্য ভালোলাগায় আমার ভীতরটা ভরে যায়৷ সম্পাকে হঠাৎ খুব দেখতে ইচ্ছা করে৷ পৃথিবীটা হঠাৎ খুব সুন্দর মনে হতে থাকে৷ পল্লীবিদ্যুতের মরা আলোকেও খুব ঝলমলে মনে হয়৷ আমার চোখে পানি চলে আসে৷ ভিজে যাওয়া ঝাপসা চোখ নিয়ে আমি আকাশের দিকে তাকাই৷ আহ, পৃথিবীতে এত সুখ!
© রোডায়া
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে এপ্রিল, ২০০৮ বিকাল ৩:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



