পরের বাসটাতেও একই রকম গাঁদাগাদি ভীর৷ দরজায় কতগুলো মানুষ সেটা দেখলেই আতংক হয়৷ কলকাতায় একটা মজার ব্যাপার দেখেছিলো শফিক৷ ওখানকার একটা বাসে লেখা দেখেছিলো, 'ত্রিশ জন বসিবেক, দাঁড়াবেক পনেরো জন'৷ এদেশেও এরকম ব্যাপার করলে মন্দ হয় না৷ তবে সংখ্যাটা লিখতে হবে, 'ত্রিশ জন বসিবেক, দাঁড়াবেক অসীম সংখ্যক'৷
হঠাৎ করে এই বাসটাতেই উঠে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলো সে৷ দরজার কাছে গিয়ে ছোটখাটো একটা মারামারি করে পাঁদানিতে পা রাখতেই অন্যরা পিছন থেকে ঠেলে তাকে উপরে তুলে দিলো৷
গাঁদাগাঁদি ভীর৷ স্বাভাবিকভাবে পা রাখার জায়গা নেই৷ ঘামের গন্ধে ভারি হয়ে আছে বাতাস৷
মাথার উপরে হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শফিক আবিষ্কার করলো তার ঠিক সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ ছেড়ে দেয়া চুল পিঠ পর্যন্ত্য ঝুলে আছে৷ পরনে একটা আকাশী নীল রঙের সালোয়ার কামিজ৷ মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে শফিকের দিকে পিছন ফিরে৷ তার মুখটা কিভাবে দেখা যায় চিন্তা করছিলো শফিক৷ বেশিক্ষন ভাবতে হলো না, অন্য একজন মেয়েটিকে ঠেলে আরো ভীতরে যাওয়ার চেষ্টা করায় মেয়েটি মুখ ঘুরালো, আর সেই ফাঁকে শফিকের সাথে তার চোখাচোখি হয়ে গেলো৷
'বাহ, বেশতো!' ভাবলো শফিক৷ 'সুন্দর একটা মেয়ে৷ কি সুন্দর কোমল চেহারা! টানা টানা চোখ দু'টায় বোধহয় কাজল দিয়েছে৷ কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ৷ এরকম একটা মুখ দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়৷ এই মেয়েটি আমার বউ হলে কেমন হয়?'
মুখ টিপে হাসলো হাসলো সে৷ এই এক সমস্যা, কোন মেয়েকে পছন্দ হলেই খালি মনে হয়, 'এই মেয়েটি আমার বউ হলে কেমন হয়?'
মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে আবার শফিকের দিকে পিছন ফিরেছে৷ সে আবার তাকাবে এই আশায় তার দিকে তাকিয়ে থাকলো শফিক, কিন্তু মেয়েটির মধ্যে তাকানোর কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছে না৷ এদিকে বাসটা চলতে শুরু করেই জ্যামে পড়েছে৷ রাইফেলস স্কয়ার পার হতেই বিশাল জ্যাম৷ ইহজনমে এই জ্যাম ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না৷ গত দশ মিনিটে বাসটা দশ পা এগিয়েছে৷ দূর! এর চেয়ে হেঁটে গেলেই ভালো হতো৷
আহ, গরমে খালি ঘুম পায়৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমুনি ধরে গেলো তার৷ দু'হাতে বাসের হাতল ধরে ঢুলতে লাগলো সে৷ ঝিমুনির মধ্যে চারপাশের মানুষের কথা কানে আসছিলো৷ নানা বিষয়ে কথা বলছে সবাই৷ এই দেশের মানুষ সব সময় দেশ উদ্ধারে ব্যস্ত থাকে৷ কেউ ক্রিকেট মাঠে দুনিয়া কাঁপিয়ে দেশ উদ্ধার করে ফেলে, কেউ রাজনীতি নিয়ে প্যাঁচাল পাড়তে পাড়তে দেশ উদ্ধার করে৷ আসলে দেখা যায় কাজের বেলায় এই মানুষগুলা নিজেদের কাজই ঠিকমতো করে না৷ আজিব দুনিয়া!
বাস থেকে নেমে বসুন্ধরা সিটিতে ঢুকলো সে৷ এস্কালেটরে দাঁড়িয়ে উপরে উঠতে গিয়ে সামনের মেয়েটির দিকে চোখ পড়ে গেলো তার৷ মেয়েটি মুখটা একপাশে ঘুরিয়ে রাখায় সে শুধু পাশটা দেখতে পাচ্ছে৷ যেটুকু দেখলো তাতেই মেয়েটিকে ভালো লেগে গেলো তার৷ 'বাহ, কি সুন্দর একটা মেয়ে!' ভাবলো শফিক৷
এস্কালেটর থেকে নেমে মেয়েটি গেলো বাম দিকে, শফিক গেলো ডান দিকে৷ ডান দিকে ঘুরে গিয়ে পরের এস্কালেটর ধরবে সে৷ মেয়েটিও যদি পরের এস্কালেটর ধরার জন্য গিয়ে থাকে, তাহলে দু'জনের মুখোমুখি দেখা হবে৷ এজন্যই সে গেলো মেয়েটির উল্টা দিকে৷
ঘটলোও তাই৷ এস্কালেটরে ওঠার আগ মূহুর্তে দু'জনের চোখাচোখি হয়ে গেলো৷ এবার তাকে সামনে থেকে দেখতে পেলো শফিক৷ সেই ভালোলাগাটা আবার জেগে উঠলো মনের মধ্যে৷ হঠাৎ তার মেয়েটিকে চেনা চেনা মনে হলো৷ কোথায় দেখেছি? ভ্রু কুঁচকে ভাবতে লাগলো সে৷
মনে করতে পারলো না৷ মেয়েটি তার এক সিঁড়ি উপরে দাঁড়িয়ে আছে৷ এর মধ্যে মেয়েটি বার দুয়েক মুখ ফিরিয়ে শফিককে দেখেছে৷ শফিক এক সিঁড়ি উপরে উঠে মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু মনে করবেন না, আপনাকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে৷
মেয়েটি শফিকের দিকে তাকালো৷ একটু হেসে বলল, হ্যাঁ আমারও তাই মনে হচ্ছে৷ সেদিন ধানমন্ডিতে বাসে আপনার সাথে দেখা হয়েছিলো, তাই না?
এতক্ষনে শফিক মেয়েটিকে চিনতে পারলো৷ উজ্জ্বল হয়ে উঠে বলল, ঠিক বলেছেন৷ কি আশ্চর্য, আমি এতক্ষন ধরে মনেই করতে পারছিলাম না! আপনি সেদিন আকাশী নীল রঙের একটা সালোয়ার কামিজ পড়েছিলেন, তাই না?
মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল, সেদিন কি পড়েছিলাম সেটা বলা কঠিন, আমার মনে নেই৷
শফিক হেসে বলল, আমার মনে আছে৷ আপনি সেদিন আকাশী নীল সালোয়ার কামিজ পড়েছিলেন, চোখে কাজল দিয়েছিলেন, কপালে ছিলো একটা কালো টিপ৷
বাব্বা! এতও মনে রেখেছেন? মেয়েটি মুখ টিপে হেসে বলল৷ তার দু'চোখে স্পষ্ট ভালোলাগা৷
মনে থাকবে না? শফিক হাসিমুখে বলল৷ আপনাকে খুব সুন্দর লাগছিলো৷
মেয়েটি এ কথার উত্তরে কিছু বলল না৷ মুখ নীচু করে হাসলো৷ শফিক আবার বলতে লাগলো, আপনি খুব সুন্দর, আপনাকে আজকেও খুব সুন্দর লাগছে৷ আমি শফিক, আপনি?
আমি নিলা৷ মেয়েটি মুখ তুলে হাসিমুখে বলল৷
খুব সুন্দর নাম৷ আর খুব জনপ্রিয়ও৷
জনপ্রিয় কেন? নিলা অবাক হয়ে জানতে চাইলো৷
জনপ্রিয় কারন সম্ভবত আপনার নামটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি গান লেখা হয়েছে৷ নিলাকে নিয়ে অনেক গান আছে৷
নিলা মুখ নীচু করে হেসে ফেললো৷ মুখ তুলে বলল...
বাসটা সামান্য একটু স্পীড নিয়েছিলো৷ হঠাৎ সামনে কোথা থেকে একটা রিক্সা উদয় হওয়ায় প্রানপন ব্রেক করলো সেটা৷ ঢুলুনি থেকে চটকা মেরে উঠে পড়লো শফিক৷ হুড়মুড় করে গিয়ে পড়লো সামনে দাঁড়ানো সেই নীল জামা পড়া মেয়েটির উপর, যার নাম এতক্ষনের কল্পনায় সে দিয়েছে নিলা৷
শফিক খুব বিব্রত হয়ে পড়েছিলো৷ তার সাথে ধাক্কায় মেয়েটির প্রায় পরে যাবার অবস্থা হয়েছিলো৷ সে তাড়াতাড়ি মেয়েটির হাত কনুইয়ের কাছে চেপে ধরলো৷ মেয়েটি পতনের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে শফিকের দিকে ঘুরলো৷ শফিক বিব্রত মুখে তাড়াতাড়ি বলল, স্যরি স্যরি, আমি ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছিলাম৷
মেয়েটি খুব শীতল চোখে তাকিয়ে রইলো শফিকের দিকে৷ তারপর শান্ত ভাবে বলল, মেয়ে দেখলেই হামলে পড়তে ইচ্ছে করে, না? যত অসভ্যের দল!
শফিকের কান পুরাপুরি লাল হয়ে গেলো৷ মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো৷ লজ্জায় থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো সে৷ কিন্তু মেয়েটিকে সে কিছু বলল না৷ পুরা ঘটনাটা অনিচ্ছাকৃত, এটা যদি মেয়েটি না বুঝে থাকে তাহলে তাকে বোঝাতে যাওয়ার কোন মানেই হয়না৷
শফিকের পাশেই দাঁড়িয়েছিলো ওর কাছাকাছি বয়সের একটা ছেলে৷ সে ছেড়ে দিলো না৷ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, এর মধ্যে অসভ্যতার কি দেখলেন? বাসটা কেমন ব্রেক করেছে আপনি জানেন না? এই রকম কড়া ব্রেক করলে এরকম হতেই পারে৷ আপনার যদি সহ্য না হয় তাহলে এরকম ভীর বাসে ওঠেন কেন?
চুপ করেন আপনি! মেয়েটি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ধমক দিলো৷ আপনিতো সাপোর্ট দেবেনই, আপনারা সব পুরুষই এক রকম৷ মেয়ে দেখলেই আপনারা নোংরামি শুরু করেন৷ অসভ্য কোথাকার!
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

